লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

দ্বিতীয় আর্য-আবাস সূত্র

একসময় ভগবান কুরুরাজ্যের কম্মাসধম্ম নামক নগরে অবস্থান করছিলেন। তথায় ভগবান “হে ভিক্ষুগণ” বলে ভিক্ষুদের আহ্বান করলেন। “হ্যাঁ ভন্তে” বলে ভিক্ষুরা প্রত্যুত্তর জানালে ভগবান এরূপ বললেন :

“হে ভিক্ষুগণ, দশটি আর্য-আবাস রয়েছে। যেখানে আর্যগণ পূর্বে অবস্থান করেছিলেন, বর্তমানে করছেন এবং ভবিষ্যতেও অবস্থান করবেন। সেই দশটি আর্য-আবাস কী কী? যথা :

ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুর পঞ্চ অঙ্গ প্রহীন হয়, ছয় প্রকার অঙ্গে সুসমৃদ্ধ হয়, ভিক্ষুটি এক প্রকারে রক্ষিত হয়, তার চার প্রকার অবলম্বন থাকে, ভিক্ষুটির মিথ্যাদৃষ্টিজাত ভ্রান্ত ধারণা অপসৃত হয়, ভিক্ষুটির সর্বতোভাবে স্পৃহা পরিত্যক্ত হয়, সে হয় অনাবিল চিন্তাক্ষম, তার কায়সংস্কার প্রশান্ত হয়, চিত্ত সুবিমুক্ত এবং সে সুবিমুক্ত প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়।

ভিক্ষুগণ, পঞ্চ অঙ্গ কী কী যা ভিক্ষুর প্রহীন হয়? ভিক্ষুগণ, যথা : এক্ষেত্রে ভিক্ষুর কামছন্দ প্রহীন হয়, ব্যাপাদ, আলস্য-তন্দ্রা, ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য (চঞ্চলতা-অনুশোচনা) এবং বিচিকিৎসা (সন্দেহভাব) প্রহীন হয়। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষুর পাঁচটি অঙ্গ প্রহীন হয়।

ভিক্ষুগণ, ভিক্ষুগণ, ছয়টি অঙ্গ কী কী যাতে ভিক্ষু সুসমৃদ্ধ হয়? ভিক্ষুগণ, যথা : এক্ষেত্রে ভিক্ষু চক্ষু দ্বারা রূপ (দর্শনীয় বিষয়) দর্শন করে সুখানুভব করে না, দুঃখও অনুভব করে না। সে স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞাত হয়ে উপেক্ষা ভাব অবলম্বনপূর্বক অবস্থান করে।

এভাবে ভিক্ষুটি কর্ণ দ্বারা শব্দ শ্রবণ করে সুমনা বা দুর্মনা না হয়ে স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে উপেক্ষা ভাব অবলম্বনপূর্বক অবস্থান করে।

এখানে ভিক্ষুটি নাসিকা দ্বারা গন্ধ অনুভব করে তাতে সুমনা বা দুর্মনা না হয়ে স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে উপেক্ষা ভাব অবলম্বনপূর্বক অবস্থান করে।

ভিক্ষুটি জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদনপূর্বক তাতে সুমনা বা দুর্মনা না হয়ে স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে উপেক্ষা ভাব অবলম্বনপূর্বক অবস্থান করে।

ভিক্ষুটি কায় দ্বারা কোনো কিছু স্পর্শ করে তাতে সুমনা বা দুর্মনা না হয়ে স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে উপেক্ষা ভাব অবলম্বনপূর্বক অবস্থান করে।

ভিক্ষুটি মন দ্বারা ধর্মসমূহ (কোন বিষয়) বিজ্ঞাত হয়ে তাতে সুমনা বা দুর্মনা না হয়ে স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে উপেক্ষা ভাব অবলম্বনপূর্বক অবস্থান করে। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষুটি ছয়টি অঙ্গে সুসমৃদ্ধ হয়।

ভিক্ষুগণ, কোন এক প্রকারে ভিক্ষু রক্ষিত হয়? ভিক্ষুগণ, যথা : এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি স্মৃতি সুরক্ষার মাধ্যমে প্রশান্তচিত্ত হয়। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু এক প্রকারে রক্ষিত হয়।

ভিক্ষুগণ, ভিক্ষুটির কোন চার প্রকার অবলম্বন থাকে? ভিক্ষুগণ, যথা : এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি বিবেচনা-সহকারে পন্থানুসরণ করে, বিবেচনা-সহকারে কোনো বিষয় সহ্য করে; বিবেচনা-সহকারে (কোন কিছু) পরিবর্জন বা ত্যাগ করে এবং বিবেচনা-সহকারেই (অকুশলধর্মসমূহ) অপনোদন করে। ভিক্ষুগণ, ভিক্ষুটির এ চার প্রকার অবলম্বন থাকে।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষুটির মিথ্যাদৃষ্টিজাত ভ্রান্ত ধারণা অপসৃত হয়? ভিক্ষগণ, এক্ষেত্রে পৃথগ্‌জন বা সাধারণ শ্রমণ-ব্রাহ্মণের ন্যায় দৃষ্টি; যথা : জগৎ শাশ্বত (নিত্য), জগৎ শাশ্বত নয় , জগৎ অনন্ত , জগৎ অনন্ত নয় , যেই জীব (আত্মা) সেই শরীর , যেই জীব সেই শরীর নয় , মৃত্যুর পর তথাগত (স্বত্ত্ব বা জীব) থাকে , মৃত্যুর পর তথাগত থাকে না , মৃত্যুর পর তথাগত থাকেও না আবার থাকে এবং মৃত্যুর তথাগত থাকে ও না আবার না থাকে তাও না এরূপ দৃষ্টি বা ধারণা ভিক্ষুটির বিতারিত হয়, পরিত্যক্ত হয়, উদ্‌গীরিত হয়, নিক্ষিপ্ত হয়, প্রহীন হয়। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষুটির মিথ্যাদৃষ্টিজাত ভ্রান্ত ধারণা অপসৃত হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষু পরিপূর্ণরূপে আকাঙ্ক্ষা রহিত হয়? ভিক্ষুগণ; যথা : এক্ষেত্রে ভিক্ষুর কাম-আকাঙ্ক্ষা প্রহীন হয়, ভব-আকাঙ্ক্ষা প্রহীন হয়, ব্রহ্মচর্য উদ্‌যাপনের আকাঙ্ক্ষা পূর্ণতা পায়। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু আকাঙ্ক্ষা রহিত হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষু অনাবিল সংকল্পকারী বা চিন্তাকারী হয়? ভিক্ষুগণ, যথা : এক্ষেত্রে ভিক্ষুর কামচিন্তা প্রহীন হয়, ব্যাপাদচিন্তা প্রহীন হয়, বিহিংসাচিন্তা প্রহীন হয়। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু অনাবিল সংকল্পকারী হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষুর কায়সংস্কার প্রশান্ত হয়? ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু সুখ ও দুঃখ প্রহান করে তার পূর্বেকার সৌমনস্য ও দৌর্মনস্য বিদূরিত করে, অদুঃখ-অসুখ বা সর্ববিধ বিষয়ে উপেক্ষাভাব পরিশুদ্ধ চতুর্থ ধ্যান প্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করে। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষুর কায়সংস্কার প্রশান্ত হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষুর চিত্ত সুবিমুক্ত হয়? ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুর চিত্ত রাগ বা আসক্তি হতে মুক্ত হয়, দ্বেষ হতে মুক্ত হয়, মোহ বা অবিদ্যা হতে মুক্ত হয়। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু সুবিমুক্ত চিত্তসম্পন্ন হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষু সুবিমুক্ত প্রজ্ঞাসম্পন্ন হয়? ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু প্রকৃষ্টরূপে জানে যে ‘আমার নিকট বিদ্যমান রাগাসক্তি, দ্বেষ ও মোহের মূলোৎপাটন হয়েছে, মস্তকছিন্ন তালবৃক্ষের ন্যায় পুনঃ আবির্ভাবে অক্ষম এবং ভবিষ্যতে তা উৎপন্ন হতে পারবে না।’

ভিক্ষুগণ, যে-সকল আর্যগণ অতীতে আর্য-আবাসে অবস্থান করেছিলেন, তারা সকলেই এই দশ প্রকার আর্য-আবাসেই অবস্থান করেছিলেন; যে-সকল আর্যগণ বর্তমানে আর্য-আবাসে অবস্থান করছেন, তারা সকলেই এই দশ প্রকার আর্য-আবাসেই অবস্থান করছেন এবং যে-সকল আর্যগণ ভবিষ্যতে আর্য-আবাসে অবস্থান করবেন তারাও এই দশ প্রকার আর্য-আবাসেই অবস্থান করবেন।

ভিক্ষুগণ, এই হচ্ছে দশ প্রকার আর্য-আবাস যেখানে আর্যগণ অবস্থান করেছিলেন, করছেন এবং করবেন।” দশম সূত্র।

নাথ বর্গ সমাপ্ত।

তস্সুদ্দান/সূত্রসূচি

“শয্যাসন, পঞ্চাঙ্গ, সংযোজন ও চেতোস্খিল,
অপ্রমাদ, আহুনীয় এথায় হলো বিবৃত;
নাথ, আর্যবাস সূত্র চতুর্গুণে ভাষিত,
দশ সূত্র যোগে হলো নাথ বর্গ সমাপ্ত॥

ব্যাখ্যা [০]