অনন্তর আয়ুষ্মান সারিপুত্র সমবেত ভিক্ষুদের ‘হে আবুসোগণ,’ বলে আহ্বান করলেন। ‘হ্যাঁ আবুসো,’ বলে ভিক্ষুরা প্রত্যুত্তর দিলে আয়ুষ্মান সারিপুত্র এরূপ বলতে লাগলেন :
“হে আবুসোগণ, এই যে প্রায় বলা হয়, ‘পরিহানধর্মী ব্যক্তি, পরিহানধর্মী ব্যক্তি’ এবং ‘অপরিহানধর্মী ব্যক্তি, অপরিহানধর্মী ব্যক্তি’। আবুসোগণ, ভগবান কর্তৃক সেই পরিহানধর্মী ব্যক্তি এবং অপরিহানধর্মী ব্যক্তি কী প্রকারে ব্যাখ্যাত হয়েছে?”
“আমরা আয়ুষ্মান সারিপুত্রের নিকট এরূপ অর্থ জানার জন্য বহুদূর হতে এসেছি। তা সত্যিই উত্তম হবে যদি আয়ুষ্মান সারিপুত্র এই বিষয়ে আলোকপাত করেন। ভিক্ষুরা আয়ুষ্মান সারিপুত্রের নিকট হতে তা শ্রবণপূর্বক ধারণ করবেন।”
“তাহলে, আবুসোগণ, আপনারা শ্রবণ করুন, উত্তমরূপে মনোযোগ দিন। আমি ভাষণ করছি।”
‘তাই হোক’ বলে ভিক্ষুরা সম্মতি দিলে আয়ুষ্মান সারিপুত্র বলতে লাগলেন :
“হে আবুসোগণ, পরিহানধর্মী ব্যক্তি কিরূপে ভগবান কর্তৃক ব্যাখ্যাত হয়েছে?
এক্ষেত্রে আবুসোগণ, ভিক্ষু অশ্রুতপূর্ব ধর্মশ্রবণ করে না; শ্রুত ধর্মসমূহ ভুলে যেতে থাকে; পূর্বে মনোগোচর হয়নি এমন বিষয়ও তার মনে উদিত হয় না; এবং অজানা বিষয়ও বুঝতে পারে না। আবুসোগণ, পরিহানধর্মী ব্যক্তি এরূপে ভগবান কর্তৃক ব্যাখ্যাত হয়েছে।
আবুসোগণ, অপরিহানধর্মী ব্যক্তি কিরূপে ভগবান কর্তৃক ব্যাখ্যাত হয়েছে?
এক্ষেত্রে আবুসোগণ, ভিক্ষু অশ্রুতপূর্ব ধর্মশ্রবণ করে; শ্রুত ধর্মসমূহ ভুলে যায় না; পূর্বে মনোগোচর হয়নি এমন বিষয়ও তার মনে উদিত হয়; এবং অজানা বিষয়ও বুঝতে পারে। আবুসোগণ, অপরিহানধর্মী ব্যক্তি এরূপে ভগবান কর্তৃক ব্যাখ্যাত হয়েছে।
আবুসোগণ, একজন ভিক্ষু অপরের চিত্ত সম্পর্কে দক্ষ হয় না। সে সংকল্পবদ্ধ হয় যে ‘আমি নিজ চিত্তের গতিপথ সম্পর্কেই দক্ষ হবো।’ এরূপই আবুসোগণ, আপনাদের শিক্ষা করা উচিত।
কিরূপে আবুসোগণ, একজন ভিক্ষু নিজ চিত্তের গতিপথ সম্পর্কে দক্ষ হয়? যেমন, স্ত্রী-পুরুষ, বালক বা যুবক কিংবা সাজসজ্জাপ্রিয় কেউ আয়না কিংবা পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নির্মল জলপাত্রে নিজ মুখাবয়ব দেখার সময় যদি কোনো দাগ বা ময়লা দেখে তাহলে সেই দাগ বা ময়লা বিদূরণের জন্য সাগ্রহে চেষ্টা করে। আর যদি নিজ মুখমণ্ডলে কোনো দাগ বা ময়লা না দেখে তখন সে আনন্দিত হয় এবং ইচ্ছাপূরণহেতু ভাবে যে ‘সত্যিই আমার লাভ হয়েছে, সত্যিই আমি দাগহীন পরিষ্কার আছি।’
এরূপেই আবুসোগণ, ভিক্ষুর কুশলধর্মসমূহের প্রত্যবেক্ষণ বহু প্রকারের হয়; যথা :
‘আমি কি অনভিধ্যা বা নির্লোভী হয়ে অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি অব্যাপাদ চিত্তে অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি আলস্য-তন্দ্রা প্রহীনপূর্বক অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি অনুদ্ধত চিত্তে অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি বিচিকিৎসাহীন বা সন্দেহাতীত চিত্তে অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি অক্রোধী হয়ে অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি অসংক্লিষ্ট চিত্তে অবস্থান করছি? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি ধর্ম সম্বন্ধে আত্মপ্রসাদলাভী? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি নিজ চিত্তের একাগ্রতালাভী? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
‘আমি কি অধিপ্রজ্ঞাধর্ম বিদর্শনলাভী? এই গুণধর্ম আমার নিকট কি বিদ্যমান নাকি নয়?’
আবুসোগণ, যদি ভিক্ষুটি এরূপে প্রত্যবেক্ষণকালে সে-সমস্ত কুশলধর্মাদি নিজমধ্যে না দেখে; তবে তাকে সেই কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য অধিকমাত্রায় আগ্রহী, প্রচেষ্টাশীল, উৎসাহী, উদ্যমী, উদ্দীপিত, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হতে হবে। যেমন, কারও কাপড় বা মাথায় যদি আগুন ধরে তবে তা নেভানোর জন্য তাকে যেমনটা অধিকমাত্রায় আগ্রহী, প্রচেষ্টাশীল, উৎসাহী, উদ্যমী, উদ্দীপিত, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হতে হয়; ঠিক তদ্রূপই ভিক্ষুগণ, সেই ভিক্ষুকে কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য অধিকমাত্রায় আগ্রহী, প্রচেষ্টাশীল, উৎসাহী, উদ্যমী, উদ্দীপিত, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হতে হবে।
যদি আবুসোগণ, ভিক্ষুটি এরূপে প্রত্যবেক্ষণকালে সে-সমস্ত কুশলধর্মাদির মধ্যে কিছু পরিমাণ কুশলধর্ম নিজমধ্যে বিদ্যমান দেখতে পায় এবং কিছু পরিমাণ না দেখে; তবে তাকে সেই বিদ্যমান কুশলধর্মসমূহে প্রতিষ্ঠিত হয়ে অবিদ্যমান কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য অধিকমাত্রায় আগ্রহী, প্রচেষ্টাশীল, উৎসাহী, উদ্যমী, উদ্দীপিত, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হতে হবে। যেমন, কারও কাপড় বা মাথায় যদি আগুন ধরে তবে তা নেভানোর জন্য তাকে যেমনটা অধিকমাত্রায় আগ্রহী, প্রচেষ্টাশীল, উৎসাহী, উদ্যমী, উদ্দীপিত, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হতে হয়; ঠিক তদ্রূপই ভিক্ষুগণ, সেই ভিক্ষুকে কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য অধিকমাত্রায় আগ্রহী, প্রচেষ্টাশীল, উৎসাহী, উদ্যমী, উদ্দীপিত, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হতে হবে।
যদি আবুসোগণ, ভিক্ষুটি এরূপে প্রত্যবেক্ষণকালে সে-সমস্ত কুশলধর্মাদি নিজমধ্যে বিদ্যমান দেখতে পায়, তবে ভিক্ষুটির তখন বিদ্যমান কুশলধর্মাদিতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আসবসমূহ ক্ষয়ের জন্য উত্তরোত্তর প্রচেষ্টা করা কর্তব্য।” পঞ্চম সূত্র।
ব্যাখ্যা [০]