একসময় ভগবান চম্পা নগরের গর্গরা নামক পুষ্করিণীর তীরে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত মধ্যাহ্ণ সময়ে ভগবানকে দর্শনের জন্য চম্পা নগর হতে নিষ্ক্রান্ত হলেন। অনন্তর গৃহপতি বজ্জিয়মাহিতের এরূপ চিন্তার উদ্রেক হলো, ‘এখন ভগবানকে দর্শন করার যথার্থ সময় নয়। ভগবান এখন ধ্যানে নিবিষ্ট থাকবেন এবং ভাবিতমনা ভিক্ষুদের সাথে দর্শনেরও এখন যথার্থ সময় নয়। ভাবিতমনা ভন্তেগণও এখন ধ্যানে নিবিষ্ট থাকবেন। তাহলে আমি এখন যেখানে অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকদের আরাম সেখানেই গমন করি।
অতঃপর গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত যেখানে অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকদের আরাম তথায় উপনীত হলেন। সেই সময়ে অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকেরা একত্রে মিলিত হয়ে কোলাহল করে ও উচ্চশব্দে-মহাশব্দে বহুপ্রকার তিরচ্ছান কথা বা বৃথাকথায় রত হয়ে উপবিষ্ট ছিলেন। সেই অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকেরা গৃহপতি বজ্জিয়মাহিতকে আগমনকালে দূর স্থান হতে দেখলেন। তাকে দেখে পরস্পর পরস্পরকে এরূপ বললেন, “ওহে বন্ধুগণ, অল্পশব্দে অবস্থান করুন, শব্দ করে বাক্যালাপে রত হবেন না। কেননা শ্রমণ গৌতমের শিষ্য (গৃহী) গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত আমাদের আরামের দিকেই আসছেন। শ্রমণ গৌতমের যে-সকল শ্বেতবস্ত্রধারী গৃহী শিষ্য শ্রাবস্তীতে অবস্থান করেন, তাদের মধ্যে এই গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত অন্যতম। সেই আয়ুষ্মানেরা অল্পশব্দকামী, অল্পশব্দে বিনীত এবং অল্পশব্দের প্রশংসাকারী। তা উত্তম হয়, যদি এই পরিষদকে অল্পশব্দসম্পন্ন জ্ঞাত হয়ে এখানে উপস্থিত হওয়া উচিত বলে মনে করেন। অতঃপর সেই অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকেরা তুষ্ণীভাব (নিরবতা) অবলম্বন করলেন। অনন্তর গৃহপতি অনাথপিণ্ডিক সেই অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকদের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের সহিত সম্বোধন ও প্রীতিপূর্ণ আলাপ করলেন। সম্বোধন ও প্রীত্যালাপ করার পর একপাশে বসলেন। একপাশে উপবিষ্ট গৃহপতি বজ্জিয়মাহিতকে সেই অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকেরা এরূপ বললেন :
“হে গৃহপতি, সত্যিই কি শ্রমণ গৌতম অন্যান্য সর্ববিধ তপশ্চর্যাকে নিন্দা করেন। অন্য সব তপস্বীই যৎপরোনাস্তি দুঃখী জীবনযাপনকারী এরূপে সম্পূর্ণরূপে নিন্দা করেন ও অপমান করেন?”
“ভদন্ত, প্রকৃতপক্ষে ভগবান অন্যান্য সর্ববিধ তপশ্চর্যাকে নিন্দা করেন না, অন্য সব তপস্বীই যৎপরোনাস্তিভাবে দুঃখী জীবন যাপনকারী এরূপে সম্পূর্ণরূপে নিন্দা ও অপমান করেন না। ভদন্ত, ভগবান গর্হিতকে গর্হিত বলেন ও প্রশংসার যোগ্যকে প্রশংসা করেন। ভদন্ত, যেহেতু ভগবান গর্হিতকে গর্হিত বলেন ও প্রশংসার যোগ্যকে প্রশংসা করেন সেহেতু তিনি বিভাজ্যবাদী। ভগবান এখানে একাংশবাদী নন।”
গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত কর্তৃক এরূপ উক্ত হলে জনৈক পরিব্রাজক গৃহপতি বজ্জিয়মাহিতকে এরূপ বললেন, “গৃহপতি, আপনি যে শ্রমণ গৌতমের গুণ বর্ণনা করছেন, শ্রমণ গৌতম নাকি প্রচলিত সামাজিক নীতি-প্রথার ধ্বংসকামী এবং অপ্রজ্ঞাপক?”
“ভদন্ত, এখন আমি আয়ুষ্মানকে প্রমাণিত তথ্য দ্বারা বলছি যে ভগবান কর্তৃক প্রজ্ঞাপিত হয়েছে যে ‘ইহা কুশল, ইহা অকুশল’। যেহেতু ভগবান এরূপ কুশলাকুশল প্রজ্ঞাপনে রত সেহেতু ভগবান সপ্রজ্ঞাপক; এবং ভগবান সামাজিক নীতি-প্রথার ধ্বংসকামী নন।”
গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত কর্তৃক এরূপ উক্ত হলে সেই পরিব্রাজকেরা মৌনাবলম্বন করলেন, হতোদ্যম হলেন, অধোশির, অধোবদন, অনুতপ্ত ও হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকলেন। অতঃপর গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত সেই পরিব্রাজকদের মৌন, হতোদ্যম, অধোশির, অধোবদন, অনুতপ্ত ও তাদের হতবুদ্ধি হয়ে থাকতে দেখে আসন হতে উঠে যেখানে ভগবান অবস্থান করছিলেন সেখানে উপস্থিত হলেন। ভগবান সকাশে উপনীত হয়ে ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপাশে বসলেন। একান্তে উপবিষ্ট গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকদের সাথে যা কিছু আলাপ আলোচনা হয়েছে, সে-সমস্ত ভগবানকে জ্ঞাপন করলেন।
“সাধু, সাধু, গৃহপতি, এরূপেই গৃহপতি মূর্খ পুরুষদের যথা সময়ে প্রমাণিত তথ্য দ্বারা উত্তমরূপে নিগৃহীত করা উচিত। গৃহপতি, আমি সর্ববিধ তপশ্চর্যাকে তপশ্চর্যার যোগ্য বলি না; আবার সর্ববিধ তপশ্চর্যাকে তপশ্চর্যার অযোগ্যও বলি না। আমি সকল রীতি-নীতিকে পালনযোগ্য বলি না; আবার সর্ববিধ রীতি-নীতিকে পালনের অযোগ্যও বলি না; আমি সকল প্রকার প্রধানকে (প্রচেষ্টাকে) প্রচেষ্টার যোগ্য বলছি না; আবার সকল প্রকার প্রধান (প্রচেষ্টাকে) প্রচেষ্টার অযোগ্যও বলছি না; আমি সর্ববিধ পরিত্যাগ বা বিসর্জনকে পরিত্যাগ যোগ্য বলছি না; আবার সর্ববিধ পরিত্যাগ বা বিসর্জনকে পরিত্যাগ অযোগ্য বলছি না; আমি সর্ববিধ বিমুক্তিকে বন্ধন মুক্তির যোগ্য বলছি না; আবার সর্ববিধ বিমুক্তিকে বন্ধমুক্তির অযোগ্য বলছি না।
গৃহপতি, যে-সমস্ত তপশ্চর্যার ফলে অকুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং কুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ তপশ্চর্যাকে আমি তপশ্চর্যার অযোগ্য বলি। আবার যে-সমস্ত তপশ্চর্যার ফলে কুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং অকুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ তপশ্চর্যাকে আমি তপশ্চর্যার যোগ্য বলি।
পুনশ্চ, গৃহপতি, যে-সমস্ত রীতি-নীতি পালনের ফলে অকুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং কুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ রীতি-নীতিকে আমি পালনের অযোগ্য বলছি। আবার যে রীতি-নীতি পালনের ফলে কুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং অকুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ রীতি-নীতিকে আমি পালনের যোগ্য বলছি।
পুনশ্চ, গৃহপতি, যে-সমস্ত প্রধানের (প্রচেষ্টার) ফলে অকুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং কুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ প্রচেষ্টাকে আমি প্রচেষ্টার অযোগ্য বলি। আবার যে প্রচেষ্টার ফলে কুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং অকুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ প্রচেষ্টাকে আমি প্রচেষ্টার যোগ্য বলি।
পুনশ্চ, গৃহপতি, যে-সমস্ত (বিষয়) পরিত্যাগ বা বিসর্জনের ফলে অকুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং কুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ পরিত্যাগকে আমি পরিত্যাগের অযোগ্য বলছি। আবার যে পরিত্যাগের ফলে কুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং অকুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ পরিত্যাগকে আমি পরিত্যাগের যোগ্য বলি।
পুনশ্চ, গৃহপতি, যে বিমুক্তির ফলে অকুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং কুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ বিমুক্তিকে আমি বন্ধন মুক্তির অযোগ্য বলছি। আবার যে বিমুক্তির ফলে কুশলধর্মের অভিবৃদ্ধি হয় এবং অকুশলধর্মের পরিহানি হয়; সেরূপ বিমুক্তিকে আমি বন্ধন মুক্তির যোগ্য বলছি।
অতঃপর গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত ভগবানের নিকট ধর্মকথা শুনে, তা গ্রহণ করে এবং ধর্মকথায় উৎসাহিত ও পুলকিত হয়ে আসন হতে উঠে ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণপূর্বক প্রস্থান করলেন। গৃহপতি বজ্জিয়মাহিতের গমনের পর অনতিবিলম্বে ভগবান ভিক্ষুদের আহ্বান করে বললেন, “হে ভিক্ষুগণ, এই ধর্মবিনয়ে যে ভিক্ষু দীর্ঘ সময়ব্যাপী অল্প কলুষসম্পন্ন সে-ই এরূপে অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকদেরকে প্রমাণিত তথ্যযোগে নিগৃহীত করতে পারে যেমনটি গৃহপতি বজ্জিয়মাহিত কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছে।” চতুর্থ সূত্র।
ব্যাখ্যা [০]