লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

উত্তিয় সূত্র

অনন্তর উত্তিয় পরিব্রাজক যেখানে ভগবান সেখানে উপস্থিত হলেন। ভগবান সকাশে উপনীত হয়ে ভগবানের সহিত প্রীতিপূর্ণ কথা বললেন। প্রীতিপূর্ণ কথা ও কুশল বিনিময়ের পর উত্তিয় পরিব্রাজক একপাশে বসলেন। অতঃপর একপাশে উপবিষ্ট উত্তিয় পরিব্রাজক ভগবানকে এরূপ বললেন :

“হে মাননীয় গৌতম, ‘কী জন্য জগৎ শাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাকৃত (অব্যাখ্যাত) যে ‘জগৎ শাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘কী জন্য জগৎ অশাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ অশাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘জগৎ অনন্ত’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ অনন্ত’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘জগৎ অনন্ত নয়’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ অনন্ত নয়’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না’ কী জন্য ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা?”

“উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না’ ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“মাননীয় গৌতম, ‘জগৎ শাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কেন আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহা আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ শাশ্বত অন্য সব মিথ্যা।’

আবার, মাননীয় গৌতম, ‘জগৎ অশাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কেনইবা আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ অশাশ্বত অন্য সব মিথ্যা।’

আবার, মাননীয় গৌতম, ‘জগৎ অনন্ত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কী জন্য আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ অনন্ত অন্য সব মিথ্যা।’

পুনরায়, মাননীয় গৌতম, ‘জগৎ অনন্ত নয় ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কেনইবা আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘জগৎ অনন্ত নয় অন্য সব মিথ্যা।’

আবার, মাননীয় গৌতম, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কী জন্য আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর।’

পুনরায়, মাননীয় গৌতম, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কেন আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়।’

আবার, মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কী জন্য আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন।’

পুনরায়, মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কেন আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না।’

আবার, মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কী জন্য আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন।’

পুনরায়, মাননীয় গৌতম, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে কেন আপনি এরূপ বলছেন যে ‘উত্তিয়, ইহাও আমার দ্বারা অব্যাখ্যাত যে ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না।’ তাহলে ভো গৌতমের দ্বারা কী ব্যাখ্যাত হয়েছে?”

“উত্তিয়, আমি সত্ত্বদের বিশুদ্ধির জন্য, শোক, পরিদেবন (বিলাপ) অতিক্রমের জন্য, দুঃখ-দৌর্মনস্যের তিরোধানের জন্য, জ্ঞান (আর্যমার্গ) হৃদয়ঙ্গমের জন্য ও নির্বাণ সাক্ষাতের জন্য অভিজ্ঞা দ্বারা শ্রাবকদের নিকট ধর্ম দেশনা করি।

মাননীয় গৌতম, সত্ত্বদের বিশুদ্ধির জন্য, শোক, পরিদেবন (বিলাপ) অতিক্রমের জন্য, দুঃখ-দৌর্মনস্যের তিরোধানের জন্য, জ্ঞান (আর্যমার্গ) হৃদয়ঙ্গমের জন্য ও নির্বাণ সাক্ষাতের জন্য এই যে আপনি অভিজ্ঞা দ্বারা শ্রাবকদের নিকট ধর্মদেশনা করেন তা জগৎকে সর্বতোভাবে কিংবা অর্ধেক, অথবা তিন ভাগের একভাগ মাত্র মুক্তিতে উপনীত করায় কি?”

এরূপ উক্ত হলে ভগবান মৌনাবলম্বন করলেন।

অতঃপর আয়ুষ্মান আনন্দ ভন্তের এরূপ চিন্তার উদ্রেক হলো, “তা কখনোই তদ্রূপ নহে, প্রকৃতপক্ষে উত্তিয় পরিব্রাজকের পাপদৃষ্টি উৎপন্ন হয়েছে, ‘আমার দ্বারা জিজ্ঞাসিত সকল প্রশ্নের মধ্যে প্রশংসিত প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে শ্রমণ গৌতম উত্তর দিতে বিলম্বিত হবেন, সাড়া দিবেন না এবং সমর্থও হবেন না।’

ইহা উত্তিয় পরিব্রাজকের দীর্ঘদিনের অহিত ও দুঃখের কারণ হবে। তার পর আয়ুষ্মান আনন্দ উত্তিয় পরিব্রাজককে এরূপ বললেন :

“তাহলে হে আবুসো উত্তিয়, আমি তোমাকে উপমা প্রদান করব। যেমন, এখানে একশ্রেণির বিজ্ঞব্যক্তিগণ আছেন যারা উপমাযোগে বিষয়ের অর্থ বুঝতে পারেন। যেমন, আবুসো উত্তিয়, কোনো রাজার সীমান্তবর্তী এক ফটকবিশিষ্ট তদ্রুপ সুবিশাল ও সুদৃঢ় প্রাকার-প্রাচীর বেষ্টিত নগর রয়েছে এবং সেই দ্বার বা ফটকে সুদক্ষ, সতর্ক, মেধাবী দ্বাররক্ষক নিযুক্ত রয়েছেন যিনি অপরিচিতদের প্রবেশ না করিয়ে শুধুমাত্র পরিচিতদের নগরে প্রবেশ করান। সে মাঝেমধ্যে সেই নগরের চারদিকে পর্যবেক্ষণ করে। সে পর্যবেক্ষণকালে প্রাকারে কোনো ফাটল ও কোনোরূপ গর্ত দেখতে পায় না। এমনকি বিড়াল বের হওয়ার মতো ছোটো গর্তও দেখতে পায় না। তার এরূপ ধারণা হয় না যে ‘এই নগরে বহু প্রাণী প্রবেশ করছে ও বহির্গত হচ্ছে।’ অধিকন্তু তার মনে এমন ধারণা হয় যে ‘এই নগরে যেকোনো আকৃতির প্রাণী প্রবেশ করুক আর বের হোক না কেন, সবাই এই একটি মাত্র ফটক দিয়েই প্রবেশ করছে ও বের হচ্ছে।’

ঠিক এরূপেই আবুসো উত্তিয়, তথাগতের এরূপ উৎসাহ নেই যে ‘জগৎ সর্বতোভাবে কিংবা অর্ধেক, অথবা তিন ভাগের একভাগ মাত্র মুক্তিতে উপনীত হোক।’ অধিকন্তু তথাগতের এমন মনোভাব জাগে যে ‘যারা এই জগৎ হতে মুক্তি পেয়েছে, কিংবা মুক্তি পাচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে বিমুক্ত হবে, তারা সকলেই পঞ্চ নীবরণ পরিত্যাগ করে, চিত্তের উপক্লেশকে প্রজ্ঞার দ্বারা দুর্বলকরণের মাধ্যমে চারি স্মৃতিপ্রস্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত চিত্ত হয়ে এবং সপ্ত বোধ্যঙ্গ যথাযথভাবে অনুশীলন করেই মুক্ত হয়েছে, কিংবা মুক্তি পাচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে বিমুক্ত হবে। এরূপেই সত্ত্বগণ জগৎ হতে মুক্ত হয়েছে, কিংবা মুক্তি পাচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে বিমুক্ত হবে। আবুসো উত্তিয়, তুমি ভগবানকে ভিন্ন উদ্দেশ্যে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিলে, তাই ভগবান তোমার প্রশ্নের উত্তর দেননি।” পঞ্চম সূত্র।

ব্যাখ্যা [০]