লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৫]

কোকনুদ সূত্র

একসময় আয়ুষ্মান আনন্দ রাজগৃহের তপোদ নামক আরামে অবস্থান করছিলেন। সেই সময় আয়ুষ্মান আনন্দ অতি প্রত্যুষে উত্থিত হয়ে স্নানের জন্য তপোদায় গমন করলেন। তপোদাতে গা ধুয়ে উঠে এসে শরীর শুকানোর জন্য একটি চীবর পরিধান করে রইলেন। সেদিন কোকনুদ পরিব্রাজকও অতিপ্রত্যুষে শয্যা হতে উত্থিয় হয়ে যেখানে তপোদা সেখানে গাত্র প্রক্ষালনের জন্য গমন করলেন। কোকনুদ পরিব্রাজক তথায় আগমন কালে আয়ুষ্মান আনন্দকে দেখলেন। তিনি আয়ুষ্মান আনন্দকে দেখে দূর হতেই এরূপ বললেন, “বন্ধু, আপনি কে?” প্রত্যুত্তরে আয়ুষ্মান আনন্দ বললেন, “আবুসো, আমি ভিক্ষু।”

“বন্ধু, আপনি কোন ভিক্ষু?”
“আবুসো, আমি শাক্যপুত্রীয় ভিক্ষু।”

“যদি আয়ুষ্মান প্রশ্ন করার জন্য অবকাশ প্রদান করেন তাহলে আমরা আয়ুষ্মানকে যৎসামান্য প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছা করি।”

“আবুসো, জিজ্ঞাসা করুন। তা শ্রবণ করে বিদিত হবো।”

“বন্ধু, ‘জগৎ শাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘যথা জগৎ শাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“বন্ধু, ‘জগৎ অশাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘যথা জগৎ অশাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“বন্ধু, ‘জগৎ অনন্ত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘যথা জগৎ অনন্ত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“বন্ধু, ‘জগৎ অনন্ত নয় ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘যথা জগৎ অনন্ত নয় ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।”

“বন্ধু, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর।”

“বন্ধু, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়।”

“বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন।”

“বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না।”

“বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না আবার থাকেন’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন।”

“বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?”

“আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না।”

“বন্ধু, তাহলে কি আপনি অস্থিত্বের অবস্থাকে (ভবকে) জানেন না দর্শন করেন না?”

“আবুসো, আমি জানি না দর্শন করি না তা নয়। তা আমি জানি ও দর্শন করি।”

“বন্ধু, ‘জগৎ শাশ্বত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : যথা জগৎ শাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’

পুনরায়, বন্ধু, ‘জগৎ অশাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : যথা জগৎ অশাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’

আবার, বন্ধু, ‘জগৎ অনন্ত ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : জগৎ অনন্ত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’

বন্ধু, ‘জগৎ অনন্ত নয় ইহা সত্য অন্য সব মিথ্যা কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : যথা জগৎ অনন্ত নয় ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’

পুনরায়, বন্ধু, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর।’

বন্ধু, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয় কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়।’

বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন।’

আবার, বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না’ কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না।’

পুনরায়, বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না আবার থাকেন কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন।’

বন্ধু, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না কী জন্য এরূপ দৃষ্টি বা মতবাদ আছে?’ এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি এরূপ মতবাদী নই যথা : মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না।’

বন্ধু, ‘তাহলে কি আপনি অস্থিত্বের অবস্থাকে জানেন না দর্শন করেন না এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আপনি এরূপ বলছেন যে ‘আবুসো, আমি জানি না দর্শন করি না তা নয়। তা আমি জানি ও দর্শন করি।’

বন্ধু, আপনার এরূপ ভাষণের অর্থ কিরূপে জ্ঞাতব্য?”

“আবুসো, ‘জগৎ শাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’ ইহা হচ্ছে মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা।

আবুসো, ‘জগৎ অশাশ্বত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’ ইহাও মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণার অন্তর্গত।

আবুসো, ‘জগৎ অনন্ত ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’ এরূপ ধারণাও মিথ্যাদৃষ্টির অন্তর্গত।

আবুসো, ‘জগৎ অনন্ত নয় ইহাই সত্য অন্য সব মিথ্যা।’ ইহাও মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণার অন্তর্গত।

আবুসো, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর।’ ইহাও হচ্ছে মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা।

আবুসো, ‘যেই জীব (আত্ম) সেই শরীর নয়।’ এরূপ ধারণাও মিথ্যাদৃষ্টির অন্তর্গত।

আবুসো, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন।’ ইহাও হচ্ছে মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা।

আবুসো, ‘মৃত্যুর পর তথাগত (সত্ত্ব বা জীব) থাকেন না।’ ইহাও মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণার অন্তর্গত।

আবুসো, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেন না আবার থাকেন।’ এরূপ ধারণাও মিথ্যাদৃষ্টির অন্তর্গত।

আবুসো, ‘মৃত্যুর পর তথাগত থাকেনও না আবার না থাকেন তা-ও না।’ ইহাও মিথ্যাদৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণার অন্তর্গত।

আবুসো, যাবৎ বা যতদূর ভ্রান্ত মতবাদ, দৃষ্টিস্থান (কাল্পনিক দর্শনের অবলম্বিত মত বা নীতি), দৃষ্টি অধিষ্ঠান, দৃষ্টি সমুত্থান (উৎপত্তি), দৃষ্টি পর্যুস্থান, দৃষ্টি অপসারণ; ততদূর আমি জানি এবং ততদূর আমি দর্শন করি। তা জ্ঞাতবস্থায় ও দর্শনকারী হয়ে কেন বলব, ‘আমি জানি না দর্শন করি না?’ আবুসো, আমি তা জানি এবং দর্শন করি।”

“আয়ুষ্মান আপনার নাম কী? আপনাকে সব্র‏হ্মচারীগণ কী নামে জানেন?”

“আবুসো, আমার নাম আনন্দ। আমাকে আনন্দ নামেই সব্র‏হ্মচারীগণ জানেন।”

“মাননীয়, মহাআচার্যের সাথে আলোচনার সময় আমরা জানতে পারলাম না যে ইনিই আয়ুষ্মান আনন্দ। যদি আমরা জানতাম যে ইনিই আয়ুষ্মান আনন্দ, তাহলে আমরা এরূপে প্রতিভাষণ করতাম না। আয়ুষ্মান আনন্দ, আমাকে ক্ষমা করুন।” ষষ্ঠ সূত্র।

ব্যাখ্যা [০]