“হে ভিক্ষুগণ, দশবিধ গুণধর্মে সমলংকৃত ভিক্ষুই জগতের মধ্যে আহ্বানীয়, পূজনীয়, দক্ষিণার যোগ্য, অঞ্জলি করার যোগ্য ও অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র। সেই দশবিধ গুণধর্মসমূহ কী কী?
যথা, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি শীলবান হয়; প্রাতিমোক্ষ সংবরণে সংবৃত হয়ে অবস্থান করে; আচার-গোচরসম্পন্ন হয় এবং অণুমাত্র অপরাধে ভয়দর্শী হয়ে শিক্ষাপদসমূহ গ্রহণ করে শিক্ষা করে।
পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি বহুশ্রুত, শ্রুতধর ও শ্রুতসঞ্চয়ী হয়; যে-সকল ধর্মসমূহ আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, পর্যাবসানে কল্যাণ, সার্থক, সব্যঞ্জক এবং যা পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশ করে, সেরূপ ধর্মসমূহ তার বহুবার শ্রুত হয় এবং তা বাক্য দ্বারা বুঝতে পারে, মনে ধারণ করে ও দর্শন জ্ঞানে সম্যকরূপে অনুধাবন করতে পারে।
পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি কল্যাণমিত্র, কল্যাণসহায়, কল্যাণ সহকর্মী হয়।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন হয় এবং সম্যক দর্শনগুণে গুণান্বিত হয়।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু নানাবিধ ঋদ্ধিতে অভিজ্ঞ হয়। যেমন, সে একজন হয়েও বহুজন হয়, বহুজন হয়েও একজন হয়; হঠাৎ অন্তর্হিত হয় এবং হঠাৎ দৃষ্টি পথে আবির্ভূত হয়, আকাশে গমনের ন্যায় সে পর্বত, প্রাচীর ভেদ করে গমন করতে পারে; জলে ডুব দেয়া ও জল হতে উত্থিত হওয়ার ন্যায় সে মাটিতে ডুব দিতে পারে এবং উত্থিত হতে পারে; জলে মাটির ন্যায় পদব্রজে গমন করতে পারে; পক্ষীর ন্যায় আকাশ পথে উড়ে যেতে পারে; মহাঋদ্ধির মাধ্যমে সে চন্দ্র সূর্যকেও হস্ত দ্বারা স্পর্শ করতে এবং পরিমর্দন করতে পারে; সে যতদূর ব্রহ্মলোক রয়েছে ততদূর সশরীরে গমন করতে পারে।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু অতি মানবীয় দিব্যকর্ণসম্পন্ন হয়ে স্বর্গভূমি-মনুষ্যভূমি, দূরবর্তী স্থান ও সন্নিকটের শব্দ বা কথা শ্রবণ করতে পারে।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষু অপর পুদ্গলদের (সত্ত্বদের) চিত্ত ভাব প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত হয়। সে সরাগ চিত্তকে (আসক্ত চিত্তকে) সরাগ চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়; বীতরাগ চিত্তকে (অনাসক্ত চিত্তকে) বীতরাগ চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়; দ্বেষ চিত্তকে (দ্বেষপূর্ণ চিত্তকে) সদ্বেষ চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়; বীত দ্বেষ চিত্তকে (দ্বেষহীন চিত্তকে) বীত দ্বেষ চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, সমোহ চিত্তকে সমোহ চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, বীতমোহ চিত্তকে (মোহহীন) বীতমোহ চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, সক্ষিপ্ত চিত্তকে (আলস্য ও জড়তা ভাবাপন্ন চিত্তকে) সক্ষিপ্ত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, বিক্ষিপ্ত চিত্তকে বিক্ষিপ্ত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, মহদ্গত চিত্তকে (কামলোকের চিত্তকে) মহদ্গত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, সউত্তর চিত্তকে সউত্তর চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, অনুত্তর চিত্তকে অনুত্তর চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, সমাহিত চিত্তকে সমাহিত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, অসমাহিত চিত্তকে অসমাহিত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, বিমুক্ত চিত্তকে বিমুক্ত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়, অবিমুক্ত চিত্তকে অবিমুক্ত চিত্ত বলে জ্ঞাত হয়।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি বহু প্রকারে বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে সক্ষম হয়; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, লক্ষ জন্ম, এমনকি বহু সংবর্ত কল্প, বহু বিবর্ত কল্প, বহু সংবর্ত-বিবর্ত কল্পে, অমুক জন্মে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার, এই ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ আয়ু, সেখান হতে চ্যুত হয়ে এখানে জন্মগ্রহণ করেছি, এই প্রকারে আকার ও গতিসহ বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে সক্ষম হয়।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি বিশুদ্ধ লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা যারা চ্যুত হচ্ছে, পুনরায় উৎপন্ন হচ্ছে, কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগতি-দুর্গতি প্রাপ্ত অপর জীবগণকে দেখতে পায়। সে তাদের এরূপে জানতে পারে যে এই সকল জীব কায়-বাক্য ও মনোদুশ্চরিত্র সমন্বিত, আর্যগণের নিন্দুক, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন ও মিথ্যাদৃষ্টিসম্ভূত কর্ম সম্পাদনের ফলে দেহান্তে (মৃত্যুর পরে) বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়েছে। পক্ষান্তরে, এই সকল জীব কায়-বাক্য ও মনোসুচরিত্র সমন্বিত, আর্যগণের অনিন্দুক, সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন, সম্যক দৃষ্টিজাত কর্ম করার ফলে দেহান্তে সুগতি-স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়েছে। যারা চ্যুত হয়ে পুনরায় উৎপন্ন হচ্ছে, স্ব-স্ব কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগত-দুর্গত, তাদের বিশুদ্ধ লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা সেই ভিক্ষুটি প্রকৃষ্টরূপে জ্ঞাত হয়।
পুনশ্চ, এক্ষেত্রে ভিক্ষুটি ইহজীবনে আসবক্ষয়ে অনাসব এবং স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা চিত্তবিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তি প্রত্যক্ষ করে অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হয়ে অবস্থান করে।
ভিক্ষুগণ, এই দশবিধ গুণধর্মে সমলংকৃত ভিক্ষুই জগতের মধ্যে আহ্বানীয়, পূজনীয়, দক্ষিণার যোগ্য, অঞ্জলি করার যোগ্য ও অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র।” সপ্তম সূত্র।
ব্যাখ্যা [০]