লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৪]

উপালি সূত্র

সেই সময় আয়ুষ্মান উপালি যেখানে ভগবান অবস্থান করছিলেন সেখানে উপস্থিত হলেন। ভগবান সকাশে উপনীত হয়ে ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একান্তে উপবেশন করলেন অতঃপর একান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান উপালি ভগবানকে এরূপ বললেন :

“ভন্তে, আমি অরণ্যে বানপ্রস্থ জীবন (জঙ্গলের মধ্যে অনেক দূরবর্তী স্থানে অবস্থান) এবং বিজন প্রান্তে (জনহীন স্থানে) শয়নাসন সেবন করতে (অভ্যাস করতে) ইচ্ছা করছি।”

“হে উপালি, অরণ্যে বানপ্রস্থ জীবন, বিজন প্রান্তে শয়নাসন অভ্যাস দুরভিসম্ভব (কষ্টকর), বিবেক-বৈরাগ্য সাধন দুষ্কর এবং দুরভিরাম।

মনে হয় একাকী অবস্থানে যে ভিক্ষু সমাধি লাভ করতে পারে নাই, নিবিড় বন তার মনকে টানে। উপালি, যদি কেউ এরূপ বলে যে ‘আমি সমাধি লাভ না করে অরণ্যে বানপ্রস্থ জীবন এবং বিজন প্রান্তে শয়নাসন অভ্যাস করব।’ তার ইহাই প্রত্যাশিত যে ‘তার চিত্তের নিরুৎসাহ উৎপন্ন হবে ও মনে উদ্বিগ্নভাব জাগবে।’

যেমন, হে উপালি, বিশাল জলাশয়ে (সরোবরে) যদি সাত বা আট হাত উচ্চতার কোনো হাতি আসে তথায় তার এরূপ চিন্তার উদ্রেক হয় যে ‘নিশ্চয়ই আমি এই জলাশয়ে (সরোবরে) অবগাহন করে কর্ণ ধৌত করে যথেচ্ছা ক্রীড়া করব এবং পৃষ্ঠদেশ ধৌত করে ক্রীড়া করব। হাতিটি কর্ণ ও পৃষ্ঠদেশ ধৌত করে, যথেচ্ছা ক্রীড়া করত সেখানে স্নান করে ও পানি পান করে। অতঃপর সেখান হতে উত্থিত হয়ে যেখানে ইচ্ছা সেখানে গমন করে। তার কারণ কী? উপালি, তার কারণ হচ্ছে হাতিটি জলাশয়ের গভীরেও নিজ পা রাখার বা পায়ের খুট পাতার দৃঢ় স্থান লাভ করে।

অতঃপর যদি সেখানে খরগোশ বা বিড়াল এসে এমন চিন্তা করে যে ‘কে আমি আর কেবা হস্তী, নিশ্চয়ই আমিও এই জলাশয়ে নেমে কর্ণ ধৌত করে যথেচ্ছা ক্রীড়া করব এবং পৃষ্ঠদেশ ধৌত করে ক্রীড়া করব। এবং যথেচ্ছা ক্রীড়া করত স্নান করে ও পানি পান করে জলাশয় হতে উঠে যেখানে ইচ্ছা সেখানে গমন করব।’ সে সেই জলাশয়ে না ভেবে না চিন্তে সহসা ঝাপিয়ে পরে। সেহেতু তার ইহাই প্রত্যাশিত যে ‘তার চিত্তের নিরুৎসাহ উৎপন্ন হবে ও মনে উদ্বিগ্নভাব জাগবে।’ তার কারণ কী? উপালি, তার কারণ হচ্ছে সেই খরগোশ বা বিড়ালটি জলাশয়ের গভীরে নিজ পায়ের খুট পাতার দৃঢ় স্থান লাভ করে না।

ঠিক তদ্রূপ, উপালি, যদি কেউ এরূপ বলে যে ‘আমি সমাধি লাভ না করে অরণ্যে বানপ্রস্থ জীবন এবং বিজন প্রান্তে শয়নাসন অভ্যাস করব।’ তার ইহাই প্রত্যাশিত যে ‘তার চিত্তের নিরুৎসাহ উৎপন্ন হবে ও মনে উদ্বিগ্নভাব জাগবে।’

যেমন, উপালি, ছোটো বালক, উত্তানশায়ী শিশু নিজ মল-মূত্র নিয়ে খেলা করে। উপালি, তুমি তা কিরূপ মনে করো, ইহা কি শুধুমাত্র শিশুখেলা নয়?”

‘হ্যাঁ ভন্তে, তদ্রূপই।”

“উপালি, সেই শিশুটি পরবর্তী সময়ে বুদ্ধি বৃদ্ধির পর, ইন্দ্রিয়াদির ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে কিশোরদের বিভিন্ন রকমের খেলা রপ্ত করে। যেমন বঙ্কক বা লাঙ্গলখেলা, যষ্ঠি খেলা (লম্বা লাটির আঘাতে ছোটো লাটি দূরে নিক্ষেপ), ডিগবাজি, বায়ুচালিত কল নিয়ে খেলা, তালপাতায় তৈরি আঁঢ়ি নিয়ে খেলা, খেলনার গাড়ি নিয়ে খেলা, খেলনার ধনু নিয়ে খেলা সে আয়ত্ত করে। উপালি, তা কিরূপ মনে কর, এরূপ বিভিন্ন ক্রীড়া উত্তানশায়ী শিশুর খেলার চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, সেই কিশোর পরবর্তীকালে আরও বুদ্ধি বৃদ্ধির পর, ইন্দ্রিয়াদির ক্ষমতা বাড়ার সাথে সাথে পঞ্চকামগুণে সমর্পিত ও তাতে সমন্বিত হয়ে চিত্ত বিনোদন করে, সে চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও কায় দ্বারা জ্ঞাতব্য ইষ্ট, কান্ত, মনোজ্ঞ, প্রিয়, কামোদ্দীপক ও রজনীয় বিবিধ রূপ, শব্দ, গন্ধ, রস ও স্পর্শ সুখে সমর্পিত হয়ে ও তাতে সমন্বিত হয়ে চিত্ত বিনোদন করে। উপালি, তা কিরূপ মনে কর, এরূপ আমোদ-প্রমোদ পূর্বের চেয়েও কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“এক্ষেত্রে উপালি, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, শ্রেষ্ঠ পুরুষদমনকারী সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবান জগতে উৎপন্ন হন। তিনি এই জগৎকে ও দেব-মারসহ ব্র‏হ্মলোক এবং শ্রমণ-ব্রা‏‏‏‏হ্মণ সমেত দেবমনুষ্য ও সকল সত্ত্বদের স্বয়ং অভিজ্ঞান দ্বারা উপলব্ধি করে বিদিত হন। তিনি এমন ধর্ম প্রকাশ করেন যা আদিতে কল্যাণময়, মধ্যেও মঙ্গলপ্রদ এবং পর্যবসানেও কল্যাণপ্রদ; যা সার্থক, সব্যঞ্জক ও কেবলমাত্র পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্র‏‏হ্মচর্য প্রকাশ করে।

তেমন ধর্ম কোনো গৃহপতি কিংবা গৃহপতির সন্তান, অথবা অন্য যেকোনো কুলে জন্মধারী শ্রবণ করে। সে এবম্বিধ ধর্মশ্রবণ করে তথাগতের প্রতি তার শ্রদ্ধা উৎপন্ন হয়। সে তেমন শ্রদ্ধায় গুণান্বিত হয়ে এরূপ বিবেচনা করে যে গৃহবাস বাধাপূর্ণ, আবর্জনা সদৃশ, আর প্রব্রজ্যা উন্মুক্ত আকাশের ন্যায়। এমন পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ও শঙ্খলিখিত ব্র‏হ্মচর্য আচরণ করা গৃহে থেকে সম্ভব নয়। নিশ্চয় আমি কেশ-শ্মশ্রু মুণ্ডন করে, কাষায় বস্ত্র পড়ে আগার হতে অনাগারিক প্রব্রজ্যায় প্রব্রজিত হবো।’

সে পরবর্তীতে অল্প-বিস্তর ভোগ্যরাশি ও জ্ঞাতিস্বজনদের ত্যাগ করে কেশ-শ্মশ্রু মুড়িয়ে কাষায় বস্ত্র পড়ে আগার হতে অনাগারিক প্রব্রজ্যায় প্রব্রজিত হয়।

সে এরূপে প্রব্রজিত হয়ে ভিক্ষুদের শিক্ষা ও জীবনধারণ প্রণালি অনুসারে প্রাণিহত্যা ত্যাগ করে প্রাণিহত্যা হতে বিরত হয়। সে দণ্ডহীন, শস্ত্রহীন, পাপে লজ্জী, দয়ালু ও সকল প্রাণীর প্রতি হিতানুকমপী হয়ে অবস্থান করে।

সে অদত্তদ্রব্য ত্যাগ করে অদত্তদ্রব্য গ্রহণ হতে বিরত হয় এবং শুধুমাত্র প্রদত্ত বস্তু গ্রহণ করে ও প্রদত্ত বিষয়ই প্রত্যাশা করে। সে বিশুদ্ধভাবে অবস্থান করে, চৌর্যমনা হয়ে নয়।

সে অব্র‏হ্মচর্যা ত্যাগ করে ব্র‏‏হ্মচারী হয় এবং গ্রাম্য ধর্ম মৈথুন হতে বিরত থাকে।

সে মিথ্যাভাষণ ত্যাগ করে মিথ্যা বলা হতে বিরত থাকে। সত্যবাদী, সত্যানুসন্ধী, সত্যনিষ্ঠ, বিশস্ত ও জগতে অবিসংবাদী হয়।

সে ভেদমূলক বাক্য বলা পরিত্যাগ করে তেমন বাক্য বলা হতে বিরত হয়। এর সাথে বিভেদ সৃষ্টির লক্ষ্যে তার নিকট শুনে অন্যকে বলে দেয় না এবং অন্যের সাথে বিভেদ ঘটানোর উদ্দেশ্যে সেই অন্যের নিকট হতেই শ্রুত বিষয় একে বলে দেয় না। এভাবে সে একতা সৃষ্টি করে, সেই বিবাদাপন্নদের বিবাদ মিটায়। সে একতাকরণে স্বস্তি পায়, একতাপ্রিয় হয়, একীভাবকরণে আনন্দ লাভ করে এবং একতামূলক বাক্য ভাষণ করে।

সে কর্কশ বাক্য ত্যাগ করে কর্কশ বাক্য ভাষণ করা হতে বিরত থাকে। যেরূপ বাক্য ত্রুটিহীন, শ্রুতিমধুর, প্রেমোদ্দীপক, হৃদয়স্পর্শী, ভদ্র, জননন্দিত এবং অপরের মনঃপুত সেরূপ বাক্যভাষী হয় সে।

সে বৃথালাপ ত্যাগ করে বৃথালাপ হতে বিরত হয়। সে কালবাদী, সত্যবাদী, মঙ্গলপ্রদ বাক্যভাষী, ধর্মবাদী ও বিনয়বাদী হয়। সে যথাসময়ে ধর্মত ও বিনয়সম্মত বাক্য এবং অর্থপূর্ণ বাক্য বলে।

সে বীজ ও চারা বিনষ্ট করা হতে বিরত থাকে। সে একাহারী হয়, রাত্রি ভোজন ও বিকালে ভোজন হতে বিরত থাকে। সে নৃত্য-গান, বাদ্য-বাজনা ও ব্যঙ্গরসাত্মক বিষয় দর্শন হতে বিরত হয়; সে মালা, সুগন্ধি দ্রব্যাদি ব্যবহার ও সাজসজ্জা হতে বিরত থাকে। উঁচু আসন ও মহার্ঘ শয্যা ব্যবহার হতেও সে দূরে থাকে। সে স্বর্ণ-রৌপ্য, আমন ধান, তাজা মাংস গ্রহণ করে না। স্ত্রী-কুমারী ও দাসদাসী গ্রহণ করা হতেও সে বিরত থাকে। ছাগল, মুরগী, শুকর, হাতি, গরু, অশ্ব, বলদ ইত্যাদি গ্রহণ হতেও সে বিরত হয়। সে ক্ষেত্র, বস্তু গ্রহণ করে না। দূতকার্য করা হতেও সে বিরত থাকে। ক্রয় বিক্রয় করা, নিক্তিতে অপরকে ঠকানো ওজনে কম দেয়া কিংবা প্রতারণা করা হতেও সে বিরত হয়। সে অবৈধ বিচারের দ্বারা বঞ্চনা, প্রতারণা ও ঠকানো হতেও বিরত থাকে। ছেদন-বধ, কিংবা বন্ধন করা, ডাকাতি করা, অথবা দিবা গ্রামলুণ্ঠনসহ বিবিধ সন্ত্রাসী কার্যক্রম হতে বিরত থাকে।

সে দেহ আচ্ছাদনের জন্য শুধুমাত্র চীবরেই এবং ক্ষুধা নিবারণের জন্য পরিমিত পিণ্ডপাতেই সন্তুষ্ট থাকে। সে যেখানেই গমন করুক না কেন তাতেই নির্ভর করে গমন করে। যেমন, পাখি কোনোখানে উড়ে গেলে বোঝাস্বরূপ শুধু তার ডানাই সাথে নিয়ে যায়, ঠিক তদ্রূপ, ভিক্ষুটি দেহ আচ্ছাদনের জন্য শুধুমাত্র চীবরেই এবং ক্ষুধা নিবারণের জন্য পরিমিত পিণ্ডপাতেই সন্তুষ্ট থাকে। সে যেখানেই গমন করুক না কেন তাতেই নির্ভর করে গমন করে। সে এরূপ আর্যশীলস্কন্ধে সমন্নাগত হয়ে নিজমধ্যে অনবদ্য সুখ লাভ করে।

সে চক্ষু দ্বারা রূপ দেখে নিমিত্ত গ্রহণ করে না ও ব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। যে কারণে চক্ষু-ইন্দ্রিয় অসংযত রেখে অবস্থান করলে অভিধ্যা (লোভ), দৌর্মনস্যসহ পাপ-অকুশলধর্মাদি স্রাবিত হয়, সেই সমস্যা নিরসনে সে অগ্রসর হয়। চক্ষু-ইন্দ্রিয় রক্ষা করে এবং চক্ষু-ইন্দ্রিয়ে সংযত হয়। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করে নিমিত্ত গ্রহণ করে না এবং অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। যে কারণে শ্রোত্র-ইন্দ্রিয় অসংযত রেখে অবস্থান করলে অভিধ্যা (লোভ), দৌর্মনস্যসহ পাপ-অকুশলধর্মাদি স্রাবিত হয়, সেই সমস্যা নিরসনে সে অগ্রসর হয়। শ্রোত্র-ইন্দ্রিয় রক্ষা করে এবং শ্রোত্র-ইন্দ্রিয়ে সংযত হয়। ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করে নিমিত্ত গ্রহণ করে না এবং অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। যে কারণে ঘ্রাণ-ইন্দ্রিয় অসংযত রেখে অবস্থান করলে অভিধ্যা, দৌর্মনস্যসহ পাপ-অকুশলধর্মাদি স্রাবিত হয়, সেই সমস্যা নিরসনে সে অগ্রসর হয়। ঘ্রাণ-ইন্দ্রিয় রক্ষা করে এবং ঘ্রাণ-ইন্দ্রিয়ে সংযত হয়। জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করে নিমিত্ত গ্রহণ করে না এবং অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। যে কারণে জিহ্বা-ইন্দ্রিয় অসংযত রেখে অবস্থান করলে অভিধ্যা, দৌর্মনস্যসহ পাপ-অকুশলধর্মাদি স্রাবিত হয়, সেই সমস্যা নিরসনে সে অগ্রসর হয়। জিহ্বা-ইন্দ্রিয় রক্ষা করে এবং জিহ্বা-ইন্দ্রিয়ে সংযত হয়। কায় দ্বারা সংস্পর্শন পেয়ে নিমিত্ত গ্রহণ করে না এবং অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। যে কারণে কায়-ইন্দ্রিয় অসংযত রেখে অবস্থান করলে অভিধ্যা (লোভ), দৌর্মনস্যসহ পাপ-অকুশলধর্মাদি স্রাবিত হয়, সেই সমস্যা নিরসনে সে অগ্রসর হয়। কায়-ইন্দ্রিয় রক্ষা করে এবং কায়-ইন্দ্রিয়ে সংযত হয়। মন দ্বারা বিজ্ঞাত হয়ে নিমিত্ত গ্রহণ করে না এবং অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। যে কারণে মন-ইন্দ্রিয় অসংযত রেখে অবস্থান করলে অভিধ্যা, দৌর্মনস্যসহ পাপ-অকুশলধর্মাদি স্রাবিত হয়, সেই সমস্যা নিরসনে সে অগ্রসর হয়। মন-ইন্দ্রিয় রক্ষা করে এবং মন-ইন্দ্রিয়ে সংযত হয়। সে এরূপ আর্য-ইন্দ্রিয় সংবরণে সংবৃত হয়ে নিজমধ্যে বিশুদ্ধ সুখ লাভ করে।

সে গমন ও প্রত্যাগমনে সম্প্রজ্ঞানী হয়, সম্মুখে দর্শন ও পশ্চাতেও দর্শনের সময় সে সম্প্রজ্ঞানী হয়, সে দেহ সংকোচন ও প্রসারণেও সম্প্রজ্ঞানী হয়। সংঘাটি, পাত্র-চীবর গ্রহণকালেও সম্প্রজ্ঞানী হয়। পান-ভোজন ও খাদ্য চিবানোর সময় এবং রস আস্বাদনের সময়ও সে সম্প্রজ্ঞানী হয়। বাহ্য-প্রস্রাব করার সময়ও সে সম্প্রজ্ঞানী হয়। সে গমনকালে, স্থিতবস্থায়, উপবেশনকালে, শায়িতবস্থায় এবং জাগ্রত হওয়ার সময়, কথা বলার সময় ও নিরব অবস্থায়ও সম্প্রজ্ঞানী হয়।

সে এরূপ আর্য-শীলস্কন্ধ, আর্য-ইন্দ্রিয় সংবর ও এরূপ আর্য-স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞানে সমন্নাগত হয়ে অরণ্যে, বৃক্ষমূলে, পর্বতে, কন্দরে বা গিরিগুহায়, নয়তো শ্মশানে, বানপ্রস্থ কিংবা উন্মুক্ত আকাশতলে, তৃণপুঞ্জে নির্জন শয্যাসন রচনা করে অবস্থান করতে থাকে। সে অরণ্যে, বৃক্ষমূলে কিংবা শূন্যগৃহে গিয়ে ঋজুকায়ে পদ্মাসনে বসে সম্মুখে স্মৃতি উপস্থাপিত করে।

সে জগতে অভিধ্যা ত্যাগ করে অভিধ্যাহীন চিত্তে অবস্থান করে এবং অভিধ্যা হতে চিত্তকে পরিশোধিত করে। ব্যাপাদ-প্রদোষ ত্যাগ করে অব্যাপন্নচিত্তে সকল প্রাণীদের প্রতি হিতানুকম্পী হয়ে অবস্থান করে এবং ব্যাপাদ-প্রদোষ হতে চিত্তকে পরিশোধিত করে। সে আলস্য-তন্দ্রা ত্যাগ করে আলস্য-তন্দ্রাহীন হয়ে আলোকসংজ্ঞী হয় ও স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞানী হয়ে অবস্থান করে। আলস্য-তন্দ্রা হতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে।

সে ঔদ্ধত্য-অনুশোচনা ত্যাগ করে অনুদ্ধত ও অধ্যাত্মভাবে উপশান্ত চিত্ত হয়ে অবস্থান করে এবং ঔদ্ধত্য-অনুশোচনা হতে চিত্তকে পরিশোধিত করে। সে বিচিকিৎসা বা সন্দেহভাব পরিত্যাগ করে সন্দেহোতীর্ণ ও কুশলধর্মসমূহে সন্দেহমুক্ত হয়ে অবস্থান করে এবং সন্দেহভাব হতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে।

সে এই পঞ্চ নীবরণকে ত্যাগ করে চিত্তের উপক্লেশসমূহ প্রজ্ঞার দ্বারা দুর্বলকরণের মাধ্যমে কাম ও অকুশলধর্মসমূহ হতে পৃথক হয়ে সবিতর্ক-বিচার ও বিবেকজনিত প্রীতি-সুখমণ্ডিত প্রথমধ্যান লাভ করে অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কী শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্ম নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

পুনশ্চ, উপালি, ভিক্ষু বিতর্ক-বিচারের উপশমহেতু অধ্যাত্মভাবে প্রশান্ত ও চিত্তের একাগ্রময় বিতর্ক-বিচারহীন সমাধিজনিত প্রীতি-সুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্মও নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

পুনশ্চ, উপালি, ভিক্ষু প্রীতিতে বিরাগ উৎপন্ন করে উপেক্ষক হয়ে অবস্থান করেন এবং স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে কায়িক সুখ অনুভব করে। যে ধ্যানস্তরে উপনীত হলে আর্যগণ ‘উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী’ বলে অভিহিত করেন, সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করে ভিক্ষুটি অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্মও নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

পুনশ্চ, গৃহপতি, ভিক্ষুর শারীরিক সুখ-দুঃখবোধ প্রহানের পূর্বেই মানসিক সৌমনস্য-দৌর্মনস্য প্রহীন হয় এবং তিনি সেই না-সুখ, না-দুঃখরূপ উপেক্ষা-স্মৃতি পরিশুদ্ধি নামক চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্মও নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

পুনশ্চ, উপালি, ভিক্ষু সর্ববিধ রূপসংজ্ঞা অতিক্রম করে, প্রতিঘ সংজ্ঞার (হিংসাত্মক চিন্তা) বিলয় সাধন করে, নানান সংজ্ঞায় মনোযোগ না দিয়ে শুধুই ‘অনন্ত-আকাশ’ এরূপ ধ্যান করতে করতে আকাশ-অনন্ত-আয়তন সমাধি লাভ করে অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্ম নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

পুনশ্চ, উপালি, ভিক্ষু সর্বতোভাবে আকাশ-অনন্ত-আয়তনকে অতিক্রম করে শুধুই ‘অনন্ত-বিজ্ঞান’ এরূপ ধ্যান করতে করতে বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সমাধি লাভ করে অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্ম নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

পুনশ্চ, উপালি, ভিক্ষু সর্বতোভাবে বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তনকে অতিক্রম করে শুধুই ‘কিছুই নাই বা আকিঞ্চন’ এরূপ ধ্যান করতে করতে আকিঞ্চন-আয়তন সমাধি লাভ করে অবস্থান করে। তা কিরূপ মনে কর, উপালি, এরূপ অবস্থান পূর্বের অবস্থানের চেয়ে কি শ্রেষ্ঠ ও উত্তম?”

“হ্যাঁ ভন্তে।”

“উপালি, বর্তমানে আমার শিষ্যগণ এই ধর্মও নিজমধ্যে দর্শন করে অরণ্যের বানপ্রস্থ শয্যাসন অভ্যাস করে। যাবৎ তার নিজ সদর্থপ্রাপ্ত না হয় তাবৎ সেখানেই অবস্থান করে।

এরূপেই উপালি, তুমি সংঘমধ্যে অবস্থান কর। সংঘমধ্যে এরূপে অবস্থানকারীর সুখ লাভ হবে।” নবম সূত্র।

ব্যাখ্যা [০]