একসময় ভগবান নাতি ইষ্টক নির্মিত আরামে অবস্থান করছিলেন। অতঃপর আয়ুষ্মান সদ্ধ ভগবানের নিকট উপস্থিত হলেন। উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে বসলেন। অতঃপর উপবিষ্ট আয়ুষ্মান সদ্ধকে ভগবান এরূপ বললেন :
“হে সদ্ধ, উৎকৃষ্ট ধ্যানই অনুশীলন কর, নিকৃষ্টতর নয়। নিকৃষ্টতর ধ্যান কিরূপ? যেমন, সদ্ধ, নিকৃষ্ট বংশজাত অশ্ব রশিতে আবদ্ধ হলে ‘ঘাস, ঘাস’ বলে চিন্তা করতে থাকে। তার কারণ কী? কেননা, সদ্ধ, রশিতে বাধা নিকৃষ্ট জাতের অশ্বের এমন চিন্তা জাগে না যে ‘সারথি (বা অশ্বচালক) কী বিষয় আজ আমায় করাবেন এবং আমি প্রত্যুত্তরে কী করতে পারি।’ সে রশিতে বাধা অবস্থায় শুধুই ‘ঘাস, ঘাস’ বলে চিন্তা করতে থাকে।
ঠিক এরূপেই সদ্ধ, এক্ষেত্রে কিছু কিছু নিকৃষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি আছে যে অরণ্য কিংবা বৃক্ষমূল অথবা শূন্যগৃহে উপস্থিত হয়েও কামরাগে পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে এবং উৎপন্ন কামরাগের নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে না। সে কামরাগকে অন্তরে গেঁথে নিয়ে তা ধ্যান করে, মনে মনে সেই বিষয়ের ঝড় তুলে, তা বিবেচনা করতে থাকে এবং সে বিষয়ে অযথা চিন্তা করতে থাকে।
সে ব্যাপাদ বা বিদ্বেষে পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে এবং উৎপন্ন ব্যাপাদের নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে না। সে ব্যাপাদকে অন্তরে গেঁথে নিয়ে তা ধ্যান করে, মনে মনে সেই বিষয়ের ঝড় তুলে, তা বিবেচনা করতে থাকে এবং সে বিষয়ে অযথা চিন্তা করতে থাকে।
সে আলস্য-তন্দ্রায় পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে এবং উৎপন্ন আলস্য-তন্দ্রার নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে না। সে আলস্য-তন্দ্রাকে অন্তরে গেঁথে নিয়ে তা ধ্যান করে, মনে মনে সেই বিষয়ের ঝড় তুলে, তা বিবেচনা করতে থাকে এবং সে বিষয়ে অযথা চিন্তা করতে থাকে।
সে ঔদ্ধত্য-অনুশোচনায় পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে এবং উৎপন্ন ঔদ্ধত্য-অনুশোচনার নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে না। সে ঔদ্ধত্য-অনুশোচনাকে অন্তরে গেঁথে নিয়ে তা ধ্যান করে, মনে মনে সেই বিষয়ের ঝড় তুলে, তা বিবেচনা করতে থাকে এবং সে বিষয়ে অযথা চিন্তা করতে থাকে।
সে বিচিকিৎসা বা সন্দেহ-এর দ্বারা পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে এবং উৎপন্ন বিচিকিৎসার নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে না। সে বিচিকিৎসাকে অন্তরে গেঁথে নিয়ে তা ধ্যান করে, মনে মনে সেই বিষয়ের ঝড় তুলে, তা বিবেচনা করতে থাকে এবং সে বিষয়ে অযথা চিন্তা করতে থাকে।
সে পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু বিষয়কে আলম্বন করে চিন্তা করতে থাকে। আকাশ-অনন্ত-আয়তন, বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন, আকিঞ্চন-আয়তন ও নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন বিষয়কে আলম্বন করে চিন্তা করতে থাকে। সে ইহলোক-পরলোক সম্বন্ধে চিন্তা করতে থাকে এবং যা কিছু দৃষ্ট, শ্রুত, অনুমিত, বিজ্ঞাত, অধিগত, পর্যেষিত এবং মনের দ্বারা বিচিন্তিত বিষয়েও পুনঃপুন চিন্তা করতে থাকে। সদ্ধ, নিকৃষ্টজনের ধ্যান এরূপই হয়।
সদ্ধ, উৎকৃষ্ট ধ্যান কিরূপ? যেমন, সদ্ধ, উৎকৃষ্ট শ্রেণির অশ্ব রশিতে আবদ্ধ হলে ‘ঘাস, ঘাস’ বলে চিন্তা করে না। তার কারণ কী? কেননা, সদ্ধ, উৎকৃষ্ট জাতের অশ্বের এমন চিন্তা জাগে যে ‘সারথি কী বিষয় আজ আমায় করাবেন এবং আমি প্রত্যুত্তরে কী করতে পারি।’ সে রশিতে বাঁধা অবস্থায় ‘ঘাস, ঘাস’ বলে চিন্তা করতে থাকে না। উন্নত শ্রেণির অশ্ব অঙ্কুশের আঘাত পাওয়াকে ঋণস্বরূপ, নিজের অবরুদ্ধ, দুর্ভাগ্য ও পরাজয় হিসাবে দেখে।
ঠিক এরূপেই, সদ্ধ, এক্ষেত্রে কিছু কিছু উন্নত শ্রেণির ব্যক্তি আছে যে অরণ্য কিংবা বৃক্ষমূল অথবা শূন্যগৃহে উপস্থিত হয়ে কামরাগে পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে না এবং উৎপন্ন কামরাগের নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে।
সে ব্যাপাদ বা বিদ্বেষে পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে না এবং উৎপন্ন ব্যাপাদের নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে।
সে আলস্য-তন্দ্রায় পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে না এবং উৎপন্ন আলস্য-তন্দ্রার নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে।
সে ঔদ্ধত্য-অনুশোচনায় পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে না এবং উৎপন্ন ঔদ্ধত্য-অনুশোচনার নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে।
সে বিচিকিৎসা বা সন্দেহ-এর দ্বারা পর্যুদস্ত ও পরাভূত চিত্তে অবস্থান করে না এবং উৎপন্ন বিচিকিৎসার নিঃসরণ বা বিনাশ সম্বন্ধে যথার্থভাবে জানতে পারে।
সে পৃথিবী, জল, তেজ, বায়ু বিষয়কে আলম্বন করে চিন্তা করতে থাকে না। আকাশ-অনন্ত-আয়তন, বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন, আকিঞ্চন-আয়তন ও নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন বিষয়কে আলম্বন করে চিন্তা করতে থাকে না। সে ইহলোক-পরলোক সম্বন্ধেও চিন্তা করা হতে বিরত হয় এবং যা কিছু দৃষ্ট, শ্রুত, অনুমিত, বিজ্ঞাত, অধিগত, পর্যেষিত এবং মনের দ্বারা বিচিন্তিত বিষয় রয়েছে সে-সমস্তও পুনঃপুন চিন্তা করা পরিত্যাগ করে শুধুই ধ্যান করে। সদ্ধ, উন্নত শ্রেণির ধ্যানী ব্যক্তিকে দেবরাজ ইন্দ্রসহ প্রজাপতি ব্রহ্মাগণও নমষ্কার করেন :
‘পুরুষশ্রেষ্ঠ, পুরুষোত্তম সেই জনকে নমষ্কার
যাহা মোদের অলব্ধ, তাতে করছেন ধ্যান-মনস্কার।”
এরূপ ব্যক্ত হলে আয়ুষ্মান সদ্ধ ভগবানকে জিজ্ঞাসা করলেন :
“ভন্তে, কিরূপে সেই উন্নত শ্রেণির ধ্যানীজন পৃথিবী, জল, তেজ ও বায়ুকে আলম্বন স্বরূপ (ধেয়্য বিষয়) গ্রহণ না করে ধ্যান করেন? কিরূপে তিনি আকাশ-অনন্ত-আয়তন, বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন, আকিঞ্চন-আয়তন ও নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন বিষয়কে আলম্বনসরূপ গ্রহণ না করে ধ্যান করেন? কিরূপে তিনি ইহলোক-পরলোক সম্বন্ধেও চিন্তা করা হতে বিরত হয়ে ধ্যান করেন এবং যা কিছু দৃষ্ট, শ্রুত, অনুমিত, বিজ্ঞাত, অধিগত, পর্যেষিত এবং মনের দ্বারা বিচিন্তিত বিষয় রয়েছে সে-সমস্তও পুনঃপুন চিন্তা করা পরিত্যাগ করে শুধুই ধ্যানই করে যান? ভন্তে, কিরূপে ধ্যান করার দরুন সেই উন্নত শ্রেণির ধ্যানীজন দেবরাজ ইন্দ্রসহ প্রজাপতি ব্রহ্মাগণ কর্তৃক এভাবে নমষ্কৃত হন যে,
‘পুরুষশ্রেষ্ঠ, পুরুষোত্তম সেই জনকে নমষ্কার
যাহা মোদের অলব্ধ, তাতে করছেন ধ্যান-মনস্কার।”
“এক্ষেত্রে সদ্ধ, উন্নত শ্রেণির ব্যক্তির নিকট পৃথিবীর প্রতি পৃথিবীসংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়, জলের প্রতি জলসংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়, তেজের প্রতি তেজসংজ্ঞা স্পষ্টরূপে তার নিকট প্রতিভাত হয়, বায়ুর প্রতি বায়ুময় সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে তার মানসপটে প্রতিভাত হয়, আকাশ-অনন্ত-আয়তনের প্রতি আকাশ-অনন্ত-আয়তন-সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়, বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তনের প্রতি বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন-সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে উপলব্ধ হয়, আকিঞ্চন আয়তনের প্রতি আকিঞ্চন-আয়তন-সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় ও নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তনের প্রতি নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন-সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়, ইহলোকের প্রতি ইহলোক-সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়, পরলোকের প্রতি পরলোক-সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় এবং যা কিছু দৃষ্ট, শ্রুত, অনুমিত, বিজ্ঞাত, অধিগত, পর্যেষিত এবং মনের দ্বারা বিচিন্তিত বিষয় রয়েছে তৎপ্রতিও সেরূপ সংজ্ঞা স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয়। সদ্ধ, এরূপে উন্নত শ্রেণির ধ্যানী জন পৃথিবী, জল, তেজ ও বায়ুকে আলম্বন স্বরূপ (ধেয়্য বিষয়) গ্রহণ না করে ধ্যান করে। এরূপেই সে আকাশ-অনন্ত-আয়তন, বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন, আকিঞ্চন-আয়তন ও নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন বিষয়কে আলম্বনসরূপ গ্রহণ না করে ধ্যান করে যায়। একইরূপে সে ইহলোক-পরলোক সম্বন্ধেও চিন্তা করা হতে বিরত হয়ে ধ্যান করে এবং যা কিছু দৃষ্ট, শ্রুত, অনুমিত, বিজ্ঞাত, অধিগত, পর্যেষিত এবং মনের দ্বারা বিচিন্তিত বিষয় রয়েছে সে-সমস্তও পুনঃপুন চিন্তা করা পরিত্যাগ করে শুধুই ধ্যানই করে যায়। সদ্ধ, এভাবেই ধ্যান করার দরুন সেই উন্নত শ্রেণির ধ্যানীজন দেবরাজ ইন্দ্রসহ প্রজাপতি ব্রহ্মাগণ কর্তৃক এভাবে নমষ্কৃত হয় যে,
‘পুরুষশ্রেষ্ঠ, পুরুষোত্তম সেই জনকে নমষ্কার
যাহা মোদের অলব্ধ, তাতে করছেন ধ্যান-মনস্কার।” নবম সূত্র।
ব্যাখ্যা [০]