“অতঃপর পরিব্রাজক বৎসগোত্র ভগবানকে দর্শন করিতে আসেন। জনৈক পরিব্রাজক বচ্ছগোত্র ভগবান যেখানে ছিলেন তথায় উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে উপবেশন করেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট পরিব্রাজক ভগবানকে বলেন, “ভবৎ গৌতম, আমি এইরূপ শুনিয়াছি যে, শ্রমণ গৌতম এইরূপ বলিয়া থাকেন, “আমাকেই দান দেওয়া উচিত, আমার শ্রাবকদের দান দেওয়া উচিত, অন্যদের নহে, আমার শ্রাবকদের দানের ফল মহৎ, অন্য শ্রাবকদের নহে।” “ভবৎ গৌতম, যাঁহারা এইরূপ বলিয়া থাকেন তাঁহারা কি অসত্য উক্তি দ্বারা ভুল বিবরণ না দিয়া সঠিকভাবে ভবৎ গৌতমের মতবাদের পুনরুল্লেখ করিয়া থাকেন? তাঁহারা কি তাহার শিক্ষানুসারে তাঁহাদের মতবাদ ব্যাখ্যা করিয়া থাকেন যাহার ফলে যে তাঁহার মতবাদী ও চিন্তাধারার সে ইহা ব্যক্ত করিতে গিয়া উপহাস করিয়া না বসে? অবশ্য আমরা ভবৎ গৌতমের ব্যাপারে ভুল বিবরণ না দেওয়ার পক্ষপাতী।” “বৎস, যাঁহারা এইরূপ বলেন তাঁহাদের এই বক্তব্য আমার চিন্তাধারা প্রসূত নহে। অধিকন্তু যাহা সত্য নহে মিথ্যা তাহা বিবৃত করিয়া আমার সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়া থাকেন। প্রকৃত পক্ষে বৎস, যে অন্যকে দান দিতে বারণ করেন তাহাকে তিন বিষয়ে অন্তরায় করেন, তিনটি বিষয়ে পরিপন্থী কাজ করেন। কী কী? তিনি দাতাকে পুণ্যকর্মে বাধা দেন, গ্রহীতাকে দান গ্রহণ হইতে বাধা দেন এবং তিনি নিজেকে নিজে ধ্বংস করেন, সম্পূর্ণ ধ্বংস। বৎস, যে ব্যক্তি অন্যকে দান প্রদানে বাধা দেয় সে তাহাকে এই তিন প্রকারে বাধা দেয়, তিন বিষয় কাড়িয়া নেয়। কিন্তু বৎস, আমি ইহাই ঘোষণা করিতেছি যে যদি কেহ প্রাণীদের প্রতি হিতকামী হইয়া থালাবাসন ধোয়া জল বা মলে যে প্রাণী আছে তাহাদের উদ্দেশ্য নিক্ষেপ করে তাহাও তাহার পুণ্যের উৎস হইবে; আর মনুষ্যদের খাদ্য প্রদান করিলে তো কথাই নাই। বৎস, তবুও আমি ইহা বলিতেছি যে, শীলবানের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত দানের ফল যেইরূপ মহান হয় দুঃশীলকে দান দিলে সেইরূপ মহৎ হয় না। “শীলবান, শব্দটি দ্বারা আমি বুঝি সেই ব্যক্তিকে যে পাঁচটি বিষয় পরিত্যাগ করিয়াছে এবং যে পাঁচটি গুণসম্পন্ন। তাহার পরিত্যক্ত পাঁচটি বিষয় কী কী? কামচ্ছন্দ (কামস্পৃহা), ব্যাপাদ (হিংসা), স্ত্যানমিদ্ধ (আলস্য, নিষ্ক্রিয়তা), ঔদ্ধত্য কৌকৃত্য (গর্ব-অনুশোচনা), বিচিকিৎসা (সন্দেহ-দোদুল্যমানতা)। এই পাঁচটি বিষয় পরিত্যক্ত হয়। কোন পাঁচটি গুণে সে গুণবান হয়? সে অশৈক্ষ্যের (অর্হতের) শীলস্কন্ধ ভূষিত হয়, অশৈক্ষ্যের সমাধিস্কন্ধ, প্রজ্ঞাস্কন্ধ, বিমুক্তিস্কন্ধ, বিমুক্তিজ্ঞানদর্শনস্কন্ধে ভূষিত হয়। এই পাঁচটি গুণে সে ভূষিত হয়। এইরূপ পাঁচটি বিষয় পরিত্যক্ত এবং পাঁচটি গুণে ভূষিত ব্যক্তিকে প্রদত্ত দানের ফল মহৎ হয় বলিয়া আমি বলি।
পশুর পালে যেমন শ্বেত, কৃষ্ণ, লোহিত, তামাটে, চিত্রবিচিত্র, একইরূপ আকার-বিশিষ্ট, পারাবত বর্ণসম্পন্ন-বর্ণ যাহাই হোক না কেন, একটি পোষা ষাঁড় ভারবাহী, শক্তিমান, সুন্দর ও দ্রুতগামী হইলে বর্ণের ভ্র্বক্ষেপ না করিয়া লোকেরা ইহাকে ভার বহনে যোয়াল দেয়। তদ্রূপ মানুষের মধ্যেও সে যেই কুলে জন্ম নেয়, ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য, শূদ্র, চণ্ডাল, পুক্কুস প্রভৃতি কুলে জাত-যাহাই হউক না, যে দান্ত, ধর্মনিষ্ঠ, ন্যায়বান, শীলবান, সত্যবাদী, লজ্জাশীল, জন্ম-জরাবিহীন ব্রহ্মচর্য পরিপূর্ণ, ভারমুক্ত, পার্থিব বন্ধন ছিন্ন, যাহার কর্ম কৃত, যে অনাসক্ত, নির্মল, সর্ব বিষয় উত্তীর্ণ, কোনো কিছুতেই লিপ্ত নহে, সর্বতোভাবে মুক্ত-এরূপ নিষ্কাম ক্ষেত্রে দানের ফল হয় প্রচুর-অপ্রমেয়। কিন্তু নির্বোধ, অজ্ঞতা, বুদ্ধিহীন, অজ্ঞ ব্যক্তিগণ ইহার বহির্ভূত ক্ষেত্রে দান দেয়, শান্তগণের নিকট উপস্থিত হয় না। যাহারা সৎ সংসর্গে আসেন যাহারা প্রজ্ঞাবান, ঋদ্ধিমান হিসেবে শ্রদ্ধার যোগ্য তাহারা সুগত বুদ্ধের শাসনে বৃক্ষমূলের ন্যায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁহারা দেবলোকে জন্ম নেন বা এখানে উত্তম পরিবারে জন্ম নিয়া থাকেন, ক্রমান্বয়ে পণ্ডিতগণ নির্বাণ লাভ করেন।”
ব্যাখ্যা [০]