তৎপর ত্রিকর্ণ নামক ব্রাহ্মণ ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে উপবেশন করেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট ত্রিকর্ণ ব্রাহ্মণ যে সকল ব্রাহ্মণ ত্রিবেদজ্ঞ তাঁহাদের প্রশংসা করেন। ভগবান তখন বলেন, “হ্যাঁ ব্রাহ্মণ, সেইসব ব্রাহ্মণের ত্রিবিদ্যা আছে। আপনি যেইরূপ বলিতেছেন তাঁহাদের তাহা আছে। কিন্তু আপনি বলুন ব্রাহ্মণেরা ব্রাহ্মণদের ত্রিবিদ্যা কিরূপে ব্যাখ্যা করেন?” “এই ক্ষেত্রে ভবৎ গৌতম, একজন ব্রাহ্মণ উভয় দিকে সুজাত, পবিত্র মাতাপিতার বংশজাত, যাঁহার বংশানুক্রমে সপ্ত বংশ পর্যন্ত পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক, জন্মের ক্ষেত্রে অনিন্দনীয়, অধ্যয়নশীল, মন্ত্রধর, ত্রিবেদে পারদর্শী, ধর্মাচরণ পদ্ধতিসহ শুচিতে পারদর্শী, শব্দ বিজ্ঞানে পারদর্শী, পৌরাণিক বিষয়ে দক্ষ, পদ এবং ব্যাকরণ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ, লোকায়ত এবং মহাপুরুষ লক্ষণে নিপুণ। “ভবৎ গৌতম, এইভাবেই ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণদের ত্রিবিদ্যা বর্ণনা করেন।” “ব্রাহ্মণ, উত্তম, ত্রিবিদ্যা ব্রাহ্মণের এই বর্ণনা এক। আর্যবিনয়ে যে ত্রিবিদ্যা হয় তাহার বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিন্নতর।” “কিন্তু ভবৎ গৌতম, আর্যবিনয়ে ত্রিবিদ্যালাভী কিরূপ? “ভবৎ গৌতম, আমার জন্য মঙ্গলজনক হয় যদি আর্যবিনয়ে ত্রিবিদ্যা লাভের পদ্ধতি শিক্ষা দেন।” “তাহা হইলে ব্রাহ্মণ, শ্রবণ করুন, মনোযোগ-সহকারে, আমি ভাষণ করিতেছি।”
“ভবৎ গৌতম, অতি উত্তম”, ব্রাহ্মণ ত্রিকর্ণ উত্তর দিলেন। ভগবান বলেন, “ওহে ব্রাহ্মণ, বুদ্ধশাসনে ভিক্ষু কামনা ও অকুশল (পাপ) ধর্ম হইতে বিরত হইয়া বিতর্ক ও বিচার সহিত নির্জনতাজনিত প্রীতিসুখ সমন্বিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। তৎপর সেই ভিক্ষু বিতর্ক ও বিচার প্রশমিত আধ্যাত্মিক সম্প্রসাদ ও একাগ্রতাযুক্ত অবিতর্র্ক ও বিচারবিহীন সমাধিজনিত প্রীতিসুখ সমন্বিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। প্রীতিতে বিরাগ উৎপন্ন হওয়ায় সে উপেক্ষাশীল বা না-দুঃখ না সুখ ভাবাপন্ন হইয়া এবং স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান হইয়া কায়িক সুখ অনুভব করে। আর্যগণ যাহাকে “উপেক্ষাশীল স্মৃতি সুখবিহারী” বলিয়া আখ্যায়িত করে সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। কায়িক সুখ-দুঃখ প্রহীন পূর্বেই মানসিক সুখ-দুঃখ অস্তগত হয়, সেই না-দুঃখ না-সুখ উপেক্ষা স্মৃতি পরিশুদ্ধি নামক চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করে।
তৎপর সে এইরূপ সমাহিত চিত্তে, পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, উপক্লেশ-বিহীন, নমনীয়, কমনীয়, স্থিত, অবিচলিত অবস্থায় পূর্ব জন্মের জ্ঞান অর্জনে চিত্তকে নমিত করে। বিভিন্ন উপায়ে সে পূর্ব পূর্ব জন্মের অনুস্মরণ করে : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চার, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, শত, সহস্র, শত সহস্রজন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প, অনেক সংবর্ত-বিবর্তকল্প পর্যন্ত আমি অমুক অমুক স্থানে ছিলাম, এইরূপ ছিল নাম, এইরূপ গোত্র, এইরূপ জাতি, এইরূপ আহার, এইরূপ সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা, এইরূপ আয়ু (এতদিন পর্যন্ত) সম্পন্ন ছিলাম, তথা হইতে চ্যুত হইয়া অন্যত্র উৎপন্ন হইয়াছি-সেখানেও আমি ছিলাম, এইরূপ ছিল নাম, এইরূপ গোত্র, এইরূপ জাতি, এইরূপ আহার, এইরূপ সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা, এইরূপ আযু (এতদিন পর্যন্ত)-সম্পন্ন ছিলাম, তথা হইতে চ্যুত হইয়া অন্যত্র উৎপন্ন হইয়াছি। এইভাবেই সে বিশেষ বিস্তৃত, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, অনেক প্রকার উপায়ে তাহার পূর্বজন্মের স্মৃতি অনুস্মরণ করে। ইহাই তাহার অধিগত প্রথম বিদ্যা। অবিদ্যা তিরোহিত, বিদ্যা উৎপন্ন, তমঃ বিগত, আলো উৎপন্ন যাহা অপ্রমত্ত, উৎসাহী, প্রশান্ত বিহরণকারীতেই বিরাজ করে।
তৎপর সে এইরূপ সমাহিত চিত্তে পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, উপক্লেশ-বিহীন, নমনীয়, কমনীয়, স্থিত, অবিচলিত অবস্থায় পূর্বজন্মের জ্ঞান অর্জনে চিত্তকে নমিত করে সত্ত্বগণের চ্যূতি-উৎপন্ন জ্ঞান অর্জনে। সে বিশুদ্ধ দিব্যচক্ষু দ্বারা এবং মানবিক কায়া অতিক্রম করিয়া সত্ত্বগণকে চ্যুত এবং উৎপন্ন হইতে দেখে-হীন-উত্তম, সুবর্ণ, দুর্বর্ণ, তাহাদের কর্মানুসারে সুগতি এবং দুর্গতি গমনে-হায়! এইসব গুণবান লোকেরা কায়িক দুষ্কর্ম, বাচনিক দুষ্কর্ম, মানসিক দুষ্কর্ম ও আর্যনিন্দা করিয়া, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হইয়া এবং মিথ্যাদৃষ্টির ফল ভোগ করিয়া এইসব সত্ত্ব কায়ভেদে মৃত্যুর পর অপায়ে, দুর্গতিতে, বিনিপাতে, নরকে উৎপন্ন হইয়াছে, এইসব গুণবান ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক সুকর্ম সম্পাদন করিয়া আর্যনিন্দা না করিয়া, সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন ও সম্যক দৃষ্টির ফল ভোগ করিয়া কায়ভেদে মৃত্যুর পর সুগতিতে, স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছে। ইহা দ্বিতীয় বিদ্যা যাহা সে লাভ করে, তাহার অবিদ্যা বিগত এবং বিদ্যা উৎপন্ন, অন্ধকার বিদূরীত এবং আলো উৎপন্ন যাহা অপ্রমত্ত উৎসাহী প্রশান্ত বিহরণকারীতে বিরাজ করে।
তৎপর সে এইভাবে সমাহিত চিত্তে পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, উপক্লেশ-বিহীন, নমনীয়, কমনীয়, স্থিত, অবিচলিত অবস্থায় আসবক্ষয় জ্ঞান অর্জনে চিত্তকে নমিত করে। সে “ইহা দুঃখ” যথাযথভাবে জানে। “ইহা দুঃখ সমুদয়” যথাভাবে জানে, “ইহা দুঃখ নিরোধ” যথাভাবে জানে, “ইহা দুঃখ-নিরোধগামিনী প্রতিপদা” যথাযথভাবে জানে। “ইহা আসব” যথাভাবে জানে, “ইহা আসব নিরোধগামিনী প্রতিপদা” যথাযথভাবে জানে। সে এইরূপ জানিয়া, এইরূপ দর্শন করিয়া কামাসব, ভবাসব (জন্ম লাভের আসক্তি), অবিদ্যাসব হইতে বিমুক্ত হইয়া বিমুক্ত হইয়াছি বলিয়া জানে যাহার ফলে সে বুঝিতে পারে-জন্ম নিরোধ হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য যাপিত হইয়াছে, করণীয় কর্ম কৃত, আমাকে আর উৎপন্ন হইতে হইবে না। এই তৃতীয় বিদ্যা সে লাভ করে, তাহার অবিদ্যা বিগত এবং বিদ্যা উৎপন্ন, অন্ধকার বিদূরীত এবং আলো উৎপন্ন যাহা অপ্রমত্ত, উৎসাহী, প্রশান্ত বিহরণকারীতে বিরাজ করে।
শীলে অপরিবর্তনশীল, বিজ্ঞ, ধ্যানপরায়ণ, চিত্ত যাহার সংযত, একাগ্র, সুসমাহিত সেই মুনি অন্ধকার বিদূরীত করিয়া ত্রিবিদ্যা লাভ করিয়াছে এবং মৃত্যুকে পরাভূত করিয়াছে, মানুষেরা তাহাকে “দেব এবং মনুষ্য উভয়ের হিতকামী”, “সর্ব পরিত্যাগী”, “ত্রিবিদ্যাসম্পন্ন”, “অবিহ্বল”, “জ্ঞানদীপ্ত”, “জগতে অন্তিম দেহধারী” হিসেবে অভিহিত করে। লোকেরা গৌতমকে এইসব নামে অভিহিত করিয়া থাকে।
যিনি পূর্বজন্ম দেখেন, স্বর্গ-নরক দেখেন, যাঁহার জন্ম ক্ষয়প্রাপ্ত হইয়াছে, যদি কোনো ব্রাহ্মণের এই ত্রিবিদ্যা অর্জিত হইয়া থাকে, অভিজ্ঞাভূষিত মুনি তাঁহাকেই আমি “ত্রিবিদ্য ব্রাহ্মণ” বলিয়া আখ্যায়িত করিয়া থাকি, লোকের দ্বারা অসার বাক্যে অভিহিত অন্য কোনো ব্যক্তিকে নহে। এইভাবেই ব্রাহ্মণ, আর্য বিনয়ে ত্রিবিদ্যা প্রাপ্ত হওয়া যায়।”
“ভবৎ গৌতম, এই ত্রিবিদ্যা অন্য ত্রিবিদ্যা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভবৎ গৌতম, ব্রাহ্মণদের প্রাপ্ত ত্রিবিদ্যা আর্য বিনয়ে ত্রিবিদ্যার ষোড়াংশের একাংশও হয় না। আশ্চর্য! অদ্ভুত! ভবৎ গৌতম, যেমন অধোমুখীকে ঊর্ধ্বমুখী, আবৃতকে অনাবৃত, পথভ্রান্তকে পথপ্রদর্শন বা অন্ধকারে তৈলপ্রদীপ ধারণ করিলে চক্ষুষ্মান রূপ দর্শন করে, তদ্রুপ ভবৎ গৌতম বিভিন্নভাবে ধর্ম পরিবেশন করেন। ভবৎ গৌতম, আমাকে আমরণ শরণাগত উপাসক হিসেবে গ্রহণ করুন।”
ব্যাখ্যা [০]