লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৭]

জানুশ্যোনি সূত্র

“অতঃপর জানুশ্যোনি নামক ব্রাহ্মণ ভগবানকে দর্শন করিতে আসেন। ভগবান যেখানে ছিলেন তথায় উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে উপবেশন করেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট জানুশ্যোনি ব্রাহ্মণ ভগবানকে এইরূপ বলেন, “যদি কেহ দান দিতে চায় বা শ্রাদ্ধ করিতে চায় অন্নদান বা ভিক্ষুককে দেওয়ার যোগ্য বস্তু, তাহা হইলে তাহা ত্রিবিদ্য ব্রাহ্মণকে দেওয়া উচিত।” “কিন্তু ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণেরা ব্রাহ্মণদের ত্রিবিদ্যা কিরূপে বর্ণনা করেন?” “এই ক্ষেত্রে ভবৎ গৌতম, একজন ব্রাহ্মণ উভয় দিকে সুজাত, পবিত্র মাতাপিতার বংশজাত, যাঁহার বংশানুক্রমে সপ্ত বংশ পর্যন্ত পবিত্র, নিষ্কলঙ্ক, জন্মের ক্ষেত্রে অনিন্দনীয়, অধ্যয়নশীল, মন্ত্রধর, ত্রিবেদে পারদর্শী, ধর্মাচরণ পদ্ধতিসহ শুচিতে পারদর্শী, শব্দ বিজ্ঞানে পারদর্শী, পৌরাণিক বিষয়ে দক্ষ, পদ এবং ব্যাকরণ শাস্ত্রে অভিজ্ঞ, লোকায়ত এবং মহাপুরুষ লক্ষণে নিপুণ। “ভবৎ গৌতম, এইভাবেই ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণদের ত্রিবিদ্যা বর্ণনা করেন।” “ব্রাহ্মণ, উত্তম, ত্রিবিদ্য ব্রাহ্মণের এই বর্ণনা এক। আর্যবিনয়ে যে ত্রিবিধ হয় তাহার বর্ণনা সম্পূর্ণ ভিন্নতর।” “কিন্তু ভবৎ গৌতম, আর্যবিনয়ে ত্রিবিদ্যালাভী কিরূপ? ভবৎ গৌতম, আমার জন্য মঙ্গলজনক হয় যদি আর্যবিনয়ে ত্রিবিদ্যা লাভের পদ্ধতি শিক্ষা দেন।” “তাহা হইলে ব্রাহ্মণ, আপনি মনোযোগ-সহকারে শ্রবণ করুন, আমি ভাষণ করিতেছি।” “ভগবান, অতি উত্তম,” জানুশ্যোনি ব্রাহ্মণ উত্তর দিলেন; ভগবান বলেন, “ওহে ব্রাহ্মণ, বুদ্ধশাসনে ভিক্ষু কামনা ও অকুশল (পাপ) ধর্ম হইতে বিরত হইয়া বিতর্ক ও বিচার সহিত নির্জনতাজনিত প্রীতিসুখ সমন্বিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। তৎপর সেই ভিক্ষু বিতর্ক ও বিচার প্রশমিত আধ্যাত্মিক সম্প্রসাদ ও একাগ্রতাযুক্ত অবিতর্র্ক ও বিচার বিহীন সমাধিজনিত প্রীতিসুখ সমন্বিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। প্রীতিতে বিরাগ উৎপন্ন হওয়ায় সে উপেক্ষাশীল বা না-দুঃখ না-সুখ ভাবাপন্ন হইয়া এবং স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান হইয়া কায়িক সুখ অনুভব করে। আর্যগণ তাহাকে “উপেক্ষাশীল স্মৃতি সুখবিহারী” বলিয়া আখ্যায়িত করেন সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। কায়িক সুখ-দুঃখ প্রহীন পূর্বেই মানসিক সুখ-দুঃখ অস্তগত হয়, সেই না-দুঃখ না-সুখ উপেক্ষা স্মৃতি পরিশুদ্ধি নামক চতুর্থধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করে।

তৎপর সে এইরূপ সমাহিত চিত্তে, পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, উপক্লেশ-বিহীন, নমনীয়, কমনীয়, স্থিত, অবিচলিত অবস্থায় পূর্ব জন্মের জ্ঞান অর্জনে চিত্তকে নমিত করে। বিভিন্ন উপায়ে সে পূর্ব পূর্ব জন্মের অনুস্মরণ করে : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চার, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, শত, সহস্র, শত সহস্রজন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প, অনেক সংবর্ত-বিবর্তকল্প পর্যন্ত আমি অমুক অমুক স্থানে ছিলাম, এইরূপ ছিল নাম, এইরূপ গোত্র, এইরূপ জাতি, এইরূপ আহার, এইরূপ সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা, এইরূপ আয়ু (এতদিন পর্যন্ত)-সম্পন্ন ছিলাম, তথা হইতে চ্যুত হইয়া অন্যত্র উৎপন্ন হইয়াছি-সেখানেও আমি ছিলাম, এইরূপ ছিল নাম, এইরূপ গোত্র, এইরূপ জাতি, এইরূপ আহার, এইরূপ সুখ-দুঃখের অভিজ্ঞতা, এইরূপ আযু (এতদিন পর্যন্ত)-সম্পন্ন ছিলাম, তথা হইতে চত্যত হইয়া অন্যত্র উৎপন্ন হইয়াছি। এইভাবেই সে বিশেষ বিস্তৃত, বৈশিষ্ট্যপূর্ণ, অনেক প্রকার উপায়ে তাহার পূর্বজন্মের স্মৃতি অনুস্মরণ করে। ইহাই তাহার অধিগত প্রথম বিদ্যা। অবিদ্যা তিরোহিত, বিদ্যা উৎপন্ন, তমঃ বিগত, আলো উৎপন্ন যাহা অপ্রমত্ত, উৎসাহী, প্রশান্ত বিহরণকারীতেই বিরাজ করে।

তৎপর সে এইরূপ সমাহিত চিত্তে পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, উপক্লেশ-বিহীন, নমনীয়, কমনীয়, স্থিত, অবিচলিত অবস্থায় পূর্বজন্মের জ্ঞান অর্জনে চিত্তকে নমিত করে সত্ত্বগণের চ্যুতি-উৎপত্তি জ্ঞান অর্জনে। সে বিশুদ্ধ দিব্যচক্ষু দ্বারা এবং মানবিক কায়া অতিক্রম করিয়া সত্ত্বগণকে চ্যুত এবং উৎপন্ন হইতে দেখে-হীন-উত্তম, সুবর্ণ, দুর্বর্ণ, তাহাদের কর্মানুসারে সুগতি এবং দুর্গতি গমনে-হায়! এইসব গুণবান লোকেরা কায়িক দুষ্কর্ম, বাচনিক দুষ্কর্ম, মানসিক দুষ্কর্ম ও আর্যনিন্দা করিয়া, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হইয়া এবং মিথ্যাদৃষ্টির ফল ভোগ করিয়া এইসব সত্ত্ব কায়ভেদে মৃত্যুর পর অপায়ে, দুর্গতিতে, বিনিপাতে, নরকে উৎপন্ন হইয়াছে, এইসব গুণবান ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক সুকর্ম সম্পাদন করিয়া আর্যনিন্দা না করিয়া, সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন ও সম্যক দৃষ্টির ফল ভোগ করিয়া কায়ভেদে মৃত্যুর পর সুগতিতে, স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছে। ইহা দ্বিতীয় বিদ্যা যাহা সে লাভ করে, তাহার অবিদ্যা বিগত এবং বিদ্যা উৎপন্ন, অন্ধকার বিদূরীত এবং আলো উৎপন্ন যাহা অপ্রমত্ত উৎসাহী প্রশান্ত বিহরণকারীতে বিরাজ করে। যিনি শীলব্রতসম্পন্ন, নির্বাণ প্রবণ চিত্ত, সমাহিত, যাঁহার চিত্ত বশীভূত, একাগ্র, সুসমাহিত, প্রশান্ত, যিনি তাঁহার পূর্বজন্ম সম্পর্কে জ্ঞাত, স্বর্গ-নরক দর্শন করেন, যিনি পুনর্জন্মের ক্ষয় প্রাপ্ত হইয়াছেন, অভিজ্ঞাভূষিত মুনি, যদি কোনো ব্রাহ্মণের এই ত্রিবিদ্যা থাকে তবেই তো আমি তাঁহাকে ত্রিবিদ্য ব্রাহ্মণ বলিয়া অভিহিত করি, নিষ্ফল বাক্যে ব্যবহৃত তথাকথিত ব্যক্তিকে নহে।

এইভাবেই ব্রাহ্মণ, কোনো ব্যক্তি আর্য বিনয়ে ত্রিবিদ্যা প্রাপ্ত হন।

“ভবৎ গৌতম, এই ত্রিবিদ্যা অন্য ত্রিবিদ্যা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভবৎ গৌতম, ব্রাহ্মণদের প্রাপ্ত ত্রিবিদ্যা আর্যবিনয়ে ত্রিবিদ্যার ষোড়াংশের একাংশও হয় না। আশ্চর্য! অদ্ভুত! ভবৎ গৌতম, যেমন অধোমুখীকে ঊর্ধ্বমুখী, আবৃতকে অনাবৃত, পথভ্রান্তকে পথপ্রদর্শন বা অন্ধকারে তৈলপ্রদীপ ধারণ করিলে চক্ষুষ্মান রূপ দর্শন করে, তদ্রুপ ভবৎ গৌতম বিভিন্নভাবে ধর্ম পরিবেশন করেন। ভবৎ গৌতম, আমাকে আমরণ শরণাগত উপাসক হিসেবে গ্রহণ করুন।”

ব্যাখ্যা [০]