“আমাকর্তৃক এইরূপ শ্রুত হইয়াছে, এক সময় আয়ুষ্মান নন্দক শ্রাবস্তীর পূর্বারামে মিগারমাতার প্রাসাদে অবস্থান করিতেছিলেন। অতঃপর মিগারের পৌত্র শাল্হ এবং পেখুনিয়ার পৌত্র রোহণ আয়ুষ্মান নন্দক যেখানে ছিলেন সেখানে উপস্থিত হন, উপস্থিত হইয়া মহামান্য নন্দককে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে উপবেশন করেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট মিগারের পৌত্র শাল্হকে আয়ুষ্মান নন্দক এইরূপ বলেন :
“হে শাল্হ, আপনারা জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করিবেন না। পুরুষ পরস্পরাগত বলিয়া বিশ্বাস করিবেন না, ইহা এই রকম বলিয়া অন্ধ বিশ্বাসে বিভ্রান্ত হইবেন না, শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে বলিয়া মানিয়া নিবেন না, তর্ক প্রসূত মতে আস্থা স্থাপন করিবেন না, অনুমানবশত কোনো কিছু গ্রহণ করিবেন না। নিজের মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া সত্য বলিয়া গ্রহণ করিবেন না, ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদ গ্রহণ করিবেন না। কিন্তু শাল্হ, যখন আপনারা নিজেরাই জানিবেন যে, এই ধর্মগুলি অকুশল, এইগুলি দোষজনক, এইগুলি বিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক নিন্দিত, এইগুলি সম্পাদিত হইলে, গৃহীত হইলে অহিতাবহ ও দুঃখাবহ হইবে এইগুলি পরিত্যাগ করিবেন, কেবল তখনিই শাল্হ, আপনারা তাহা বর্জন করিবেন।
“শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? লোভ আছে তো? “হ্যাঁ প্রভু।” “শাল্হ, আমি ইহাকে অভিধ্যা বলি। শাল্হ, লুব্ধ ব্যক্তি কি প্রাণিহত্যা করে না, অদত্তবস্তু গ্রহণ করে না, পরদার গমন করে না, মিথ্যা ভাষণ করে না এবং পরকেও কি তাহাতে প্ররোচিত করে না যাহা দীর্ঘকালের জন্য তাহার অহিত ও দুঃখের কারণ হয়?” “হ্যাঁ ভদন্ত।”
“শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? দ্বেষ আছে তো?” “হ্যাঁ প্রভু, আছে।” “আমি ইহাকে বিদ্বেষ বলি। শাল্হ, যাহার অন্তর বিদ্বেষপূর্ণ সে কি প্রাণিহত্যা করে না, অদত্তবস্তু গ্রহণ করে না, পরদার গমন করে না, মিথ্যা ভাষণ করে না এবং পরকেও কি তাহাতে প্ররোচিত করে না যাহা দীর্ঘকালের জন্য তাহার অহিত ও দুঃখের কারণ হয়?” “হ্যাঁ ভদন্ত।”
“পুনঃ শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? মোহ আছে তো? “হ্যাঁ ভদন্ত।” “শাল্হ, আমি ইহাকে অবিদ্যা বলি। শাল্হ, যাহার অন্তর অবিদ্যাচ্ছন্ন সে কি প্রাণিহত্যা করে না, অদত্তবস্তু গ্রহণ করে না, পরদার গমন করে না, মিথ্যা ভাষণ করে না এবং পরকেও কি তাহাতে প্ররোচিত করে না যাহা দীর্ঘকালের জন্য তাহার অহিত ও দুঃখের কারণ হয়?” “হ্যাঁ ভদন্ত।”
“শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? ইহা কি কুশল না অকুশল?” “ভদন্ত অকুশল।” “এইগুলি কি দোষাবহ না নির্দোষ?” “ভদন্ত, দোষাবহ।” “এইগুলি কি বিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক নিন্দিত না প্রশংসিত?” “ভন্তে, বিজ্ঞ ব্যক্তি কর্তৃক নিন্দিত।” “এইগুলি অনুসরণ করিলে কি অহিত ও দুঃখ উৎপন্ন হয়?” “ভদন্ত, অহিত ও দুঃখ উৎপন্ন হয়।”
“সুতরাং শাল্হ, এখন আপনাদের প্রতি আমার বক্তব্য হইল-হে শাল্হ, জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করিবেন না, পুরুষ পরস্পরাগত বলিয়া বিশ্বাস করিবেন না, ইহা এইরূপ বলিয়া অন্ধ বিশ্বাসে বিভ্রান্ত হইবেন না, শাস্ত্রোক্তি বলিয়া মানিয়া নিবেন না, তর্ক প্রসূত মতে আস্থা স্থাপন করিবেন না, অনুমানবশত কোনো বিষয় গ্রহণ করিবেন না, নিজের মতের সঙ্গে সঙ্গতি আছে বলিয়া সত্য বলিয়া গ্রহণ করিবেন না, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদে বিশ্বাসী হইবেন না। কিন্তু শাল্হ, যখন নিজেরাই জানিবেন যে, এই ধর্ম অকুশল, এইগুলি দোষজনক, এইগুলি বিজ্ঞজন নিন্দিত, এইগুলি সম্পাদিত হইলে, গৃহীত হইলে অহিতাবহ ও দুঃখাবহ হইবে, কেবল তখনিই আপনারা তখন বর্জন করিবেন।” ওই সমস্ত উক্তির পিছনে আমার এই যুক্তি।
“এইরূপে শাল্হ, জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করিবেন না, পুরুষ পরস্পরাগত বলিয়া বিশ্বাস করিবেন না, ইহা এইরূপ বলিয়া অন্ধ বিশ্বাসে বিভ্রান্ত হইবেন না, শাস্ত্রোক্তি বলিয়া মানিয়া নিবেন না, তর্ক প্রসূত মতে আস্থা স্থাপন করিবেন না, অনুমানবশত কোনো বিষয় গ্রহণ করিবেন না, নিজের মতের সঙ্গে সঙ্গতি আছে বলিয়া সত্য বলিয়া গ্রহণ করিবেন না, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদে বিশ্বাসী হইবেন না। কিন্তু শাল্হ, যখন নিজেরাই জানিবেন যে, এইসব ধর্ম কুশল, এইগুলি নির্দোষ, এইগুলি বিজ্ঞজন প্রশংসিত, এইগুলি সম্পাদিত হইলে, গৃহীত হইলে হিতাবহ ও সুখ উৎপন্ন হইবে, তখনই শাল্হ আপনারা এইগুলি সম্পাদন করিয়া তাহাতে অভিরমিত হইবেন।”
শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? লোভহীনতা আছে তো? “হ্যাঁ ভদন্ত, আছে।” “শাল্হ, আমি ইহাকে অনভিধ্যা বলি। শাল্হ, অলুব্ধ লোভশূন্য ব্যক্তি কি প্রাণিহত্যা বিরত হয় না, অদত্তবস্তু গ্রহণ বিরত হয় না, পরদার গমন বিরত হয় না, মিথ্যা ভাষণ বিরত হয় না এবং পরকেও কি তাহা হইতে বিরত করে না যাহা দীর্ঘকালের জন্য তাহার হিত ও সুখ সাধন করে?” “হ্যাঁ ভদন্ত।”
“হে শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? দ্বেষশূন্যতা আছে তো?” “হ্যাঁ ভদন্ত।” “শাল্হ, আমি ইহাকে অব্যাপাদ বা দ্বেষহীনতা নামে অভিহিত করি। শাল্হ, বিদ্বেষশূন্য দ্বেষমুক্ত ব্যক্তি কি প্রাণিহত্যা বিরত হয় না, অদত্তবস্তু গ্রহণ বিরত হয় না, পরদার গমন বিরত হয় না, মিথ্যাভাষণ বিরত হয় না এবং পরকেও কি তাহা হইতে বিরত করে না যাহা দীর্ঘকালের জন্য তাহার হিত ও সুখ সাধন করে?” “হ্যাঁ ভদন্ত।”
“হে শাল্হ, আপনাদের কী মনে হয়? অমোহ আছে তো? “হ্যাঁ ভদন্ত, আছে।” “আমি ইহাকে বিদ্যা বলি। শাল্হ, অমূঢ় বিদ্যাযুক্ত ব্যক্তি কি প্রাণিহত্যা বিরত হয় না, অদত্তবস্তু গ্রহণ বিরত হয় না, পরদার গমন বিরত হয় না, মিথ্যাভাষণ বিরত হয় না এবং পরকেও কি তাহা হইতে বিরত করে না যাহা দীর্ঘকালের জন্য তাহার হিত ও সুখ সাধন করে?” “হ্যাঁ ভদন্ত।”
“হে শাল্হ, আপনাদের কি মনে হয়, এইগুলি কি কুশল না অকুশল?” “ভদন্ত, কুশল।” দোষাবহ না নির্দোষ?” “ভদন্ত, নির্দোষ।” “বিজ্ঞজন গর্হিত না প্রশংসিত?” “ভদন্ত, বিজ্ঞজন প্রশংসিত।” এইগুলি সম্পাদিত ও কৃত হইলে কি হিত ও সুখ সাধন করে, না অহিত ও অসুখ সাধন করে?” “ভদন্ত, হিত ও সুখ সাধন করে।”
“হে শাল্হ, তাই আপনাদের প্রতি আমার উক্তি হইল-জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করিবেন না, পুরুষ পরস্পরাগত বলিয়া বিশ্বাস করিবেন না, ইহা এইরূপ বলিয়া অন্ধ বিশ্বাসে বিভ্রান্ত হইবেন না, শাস্ত্রোক্তি বলিয়া মানিয়া নিবেন না, তর্ক প্রসূত মতে আস্থা স্থাপন করিবেন না, অনুমানবশত কোনো বিষয় গ্রহণ করিবেন না, নিজের মতের সঙ্গে সঙ্গতি আছে বলিয়া সত্য বলিয়া গ্রহণ করিবেন না, গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদে বিশ্বাসী হইবেন না। কিন্তু শাল্হ, যখন নিজেরাই জানিবেন যে, এইসব ধর্ম কুশল, এইগুলি নির্দোষ, এইগুলি বিজ্ঞজন প্রশংসিত, এইগুলি সম্পাদিত হইলে, গৃহীত হইলে হিতাবহ ও সুখ উৎপন্ন হইবে, তখনই শাল্হ আপনারা এইগুলি সম্পাদন করিয়া তাহাতে অভিরমিত হইবেন। ওই সমস্ত উক্তির পিছনে আমার এই যুক্তি।”
“হে শাল্হ যখন আর্যশ্রাবক লোভহীন, বিদ্বেষহীন, মোহহীন, জ্ঞানসম্পন্ন আত্ম-সংযত স্মৃতিযুক্ত মৈত্রীচিত্ত, করুণা-চিত্ত, মুদিতাচিত্ত, উপেক্ষাশীল হন তিনি সমগ্র জগৎকে বিপুল অপ্রমাণ মৈত্রীধারায় পৱাবিত করিয়া একদিক পূর্ণ করিয়া অবস্থান করেন, তথা দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ দিকও। তদ্রূপ উর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক সর্বত্র সর্ব প্রকার সর্বাবস্থায় জগৎ পূর্ণ করিয়া উপেক্ষা-সহগত চিত্তে বিপুল ও অপ্রমাণ মৈত্রী পোষণ করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি যথার্থই জানেন যে হীন অবস্থা আছে, উত্তম আছে, এই সংজ্ঞা হইতে নিষ্কৃতি আছে। যখন তিনি এইরূপ জানেন, এইরূপ প্রত্যক্ষ করেন তাঁহার মন কামাসব হইতে মুক্ত হয়, ভবাসব হইতে মুক্ত হয়, চিত্ত অবিদ্যাসব হইতে মুক্ত হয়। এইভাবে বিমুক্ত হইয়া তাঁহার এই জ্ঞান উৎপন্ন হয় যে, তিনি মুক্ত এবং তিনি আশ্বস্ত হন যে তাঁহার পুনর্জন্ম নিরুদ্ধ হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য উদ্যাপিত, করণীয় কৃত, এইরূপ অবস্থা তাঁহার আর হইবে না। ইহাও তাঁহার উপলব্ধি হয় যে-পূর্বে আমার লোভ ছিল, ইহা ছিল অকুশল, এখন ইহা আর নাই, ইহা কুশল। পূর্বে আমার বিদ্বেষ ছিল, ইহা অকুশল। এখন ইহা আর নাই। ইহা কুশল। পূর্বে আমি মোহিত হইতাম। ইহা ছিল অকুশল। বর্তমানে ইহা আর বিদ্যমান নাই, ইহা কুশল। এইরূপে তিনি ইহজীবনেই তৃষ্ণামুক্ত, মুক্ত, শান্ত হইয়াছেন। তিনি নিজে ব্রহ্ম হইয়া সুখ অনুভব করেন এবং তাহাতে অবস্থান করেন।”
ব্যাখ্যা [০]