“হে ভিক্ষুগণ, অকুশল মূল এই তিন প্রকার। তিন কী কী? লোভ, দ্বেষ, মোহ। লোভ অকুশল। লোভাতুর ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক যে কর্ম সম্পাদন করুক না কেন তাহা দোষজনক। লুব্ধক লোভাভিভূত অসংযত চিত্ত অপরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দ্বারা, বন্দী করিয়া, সম্পত্তির ক্ষতি করিয়া, নিন্দা, নির্বাসন দ্বারা দুঃখ প্রদান করে যেন “জোর যাহার মুল্লুক তাহার”। ইহা অকুশল। এইভাবে এইসব মন্দ অবস্থা লোভজাত, লোভ সংযুক্ত, লোভ হইতে উৎপন্ন, লোভ তাহার মধ্যে বিদ্যমান।
হে ভিক্ষুগণ, দ্বেষ অকুশল। বিদ্বেষপরায়ণ ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক যে কর্মই সম্পাদন করুক না কেন অসংযত চিত্তে অপরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দ্বারা, বন্দী করিয়া, সম্পত্তির ক্ষতি করিয়া, নিন্দা, নির্বাসন দ্বারা দুঃখ প্রদান করে যেন “জোর যাহার বাক্য তাহার”। তাহা অকুশল। এইভাবে বিভিন্ন প্রকার দ্বেষজ অকুশল দ্বেষজাত, দ্বেষসংযুক্ত, দ্বেষ হইতে উৎপন্ন, দ্বেষ তাহার মধ্যে বিদ্যমান।
হে ভিক্ষুগণ, মোহ অকুশল। মোহাভিভূত ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক যে কর্মই সম্পাদন করুক না কেন ইহা অকুশল। এইভাবে বিভিন্ন মন্দ অবস্থা মোহজাত, মোহসংযুক্ত, মোহ হইতে উৎপন্ন, মোহের ফল তাহার মধ্যে বিদ্যমান।
অধিকন্তু ভিক্ষুগণ, এইরূপ ব্যক্তি অকালবাদী, অসত্যবাদী, অনর্থবাদী (যে ধর্মের বিরোধ উক্তি করে), অবিনয়বাদী বলিয়া কথিত। কেন সে এইভাবে কথিত হয়? কারণ সে অপরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি, বন্ধন, সম্পদের ক্ষতি, গালি ও নির্বাসন প্রদান করিয়া দুঃখ প্রদান করে যেন “জোর যাহার বাক্য তাহার।” যখন সে সত্যের সম্মুখীন হয় সে তাহা অস্বীকার করে, ইহা উপলব্ধি করে না। যখন মিথ্যার সম্মুখীন হয় সে বিজড়িত হইতে চেষ্টা করে না এই বলিয়া, “ইহা ভিত্তিহীন, ইহা মিথ্যা।” সেই কারণে সে অকালবাদী, অসত্যবাদী, অনর্থবাদী, অবিনয়বাদী বলিয়া কথিত।
এইরূপ ব্যক্তি লোভজ পাপ-অকুশল দ্বারা অসংযত চিত্ত হইয়া ইহজীবনেই সবিঘাত, সউপায়াস, সপরিদাহ দুঃখ ভোগ করে এবং দেহ ভেদে মৃত্যুর পর তাহার দুর্গতি অবধারিত। এইরূপ ব্যক্তি দ্বেষজ পাপ-অকুশল দ্বারা অসংযত চিত্ত হইয়া ইহজীবনেই সবিঘাত, সউপায়াস, সপরিদাহ দুঃখ ভোগ করে এবং দেহ ভেদে মৃত্যুর পর তাহার দুর্গতি অবধারিত। এইরূপ ব্যক্তি মোহজ পাপ-অকুশল দ্বারা অসংযত চিত্ত হইয়া ইহজীবনেই সবিঘাত, সউপায়াস, সপরিদাহ দুঃখ ভোগ করে এবং দেহ ভেদে মৃত্যুর পর তাহার দুর্গতি অবধারিত।
যেমন হে ভিক্ষুগণ, শাল বা ধব বা ফন্দন এই তিন প্রকার মালুবালতা আক্রান্ত এবং আবৃত করা হইলে দুঃখের কারণ হয়, ধ্বংসের কারণ হয়, দুঃখপূর্ণ পরিণতি হয়, তদ্রূপ ভিক্ষুগণ, এইরূপে লোভজ-দ্বেষজ-মোহজ পাপ-অকুশল দ্বারা অসংযত চিত্ত ব্যক্তি ইহজীবনে ঘাতপূর্ণ, উপায়াস, পরিদাহপূর্ণ দুঃখ ভোগ করে এবং মৃত্যুর পর তাহার দুর্গতি অবধারিত।
হে ভিক্ষুগণ, কুশলের মূল এই তিন প্রকার। তিন কী কী? অলোভ কুশলের মূল. অদ্বেষ কুশলের মূল, অমোহ কুশলের মূল।
হে ভিক্ষুগণ, লোভশূন্য ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক যে-কোনো কর্ম সম্পাদন করুক না কেন তাহা দোষাবহ নহে। অলুব্ধ, সংযত চিত্ত, লোভে অনভিভূত হইয়া অপরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দ্বারা, বন্দী করিয়া, সম্পদের ক্ষতি করিয়া, নিন্দা, নির্বাসন দ্বারা দুঃখ প্রদান করে না যেন “জোর যাহার বাক্য তাহার” হয় না, ইহা কুশল। এইভাবে এই কুশল অলোভজাত, অলোভযুক্ত, অলোভ হইতে উৎপন্ন, অলোভের ফল তাহার মধ্যে বিদ্যমান।
হে ভিক্ষুগণ, অদ্বেষ কুশলের মূল। বিদ্বেষহীন ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক যে-কোনো কর্ম সম্পাদন করুক না কেন তাহা দোষাবহ নহে। অদ্বেষ, সংযত চিত্ত, দ্বেষে অনভিভূত হইয়া অপরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দ্বারা, বন্দী করিয়া, সম্পদের ক্ষতি করিয়া, নিন্দা, নির্বাসন দ্বারা দুঃখ প্রদান করে না যেন “জোর যাহার বাক্য তাহার” হয় না, ইহা কুশল। এইভাবে এই কুশল অদ্বেষজাত, অদ্বেষযুক্ত, অদ্বেষ হইতে উৎপন্ন, অদ্বেষের ফল তাহার মধ্যে বিদ্যমান।
হে ভিক্ষুগণ, অমোহ কুশলের মূল। মোহশূন্য ব্যক্তি কায়িক, বাচনিক, মানসিক যে-কোনো কর্ম সম্পাদন করুক না কেন তাহা দোষাবহ নহে। অমোহ, সংযত চিত্ত, মোহে অনভিভূত হইয়া অপরকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দ্বারা, বন্দী করিয়া, সম্পদের ক্ষতি করিয়া, নিন্দা, নির্বাসন দ্বারা দুঃখ প্রদান করে না যেন “জোর যাহার বাক্য তাহার” হয় না, ইহা কুশল। এইভাবে এই কুশল অমোহজাত, অমোযুক্ত, অমোহ হইতে উৎপন্ন, অমোহের ফল তাহার মধ্যে বিদ্যমান।
অধিকন্তু ভিক্ষুগণ, এইরূপ ব্যক্তি কালবাদী, সত্যবাদী, অর্থবাদী, বিনয়বাদী হিসেবে কথিত। কেন সে এইভাবে কথিত হয়? কারণ সে অন্যায়ভাবে অপরকে শাস্তি দ্বারা, বন্দী করিয়া সম্পত্তির ক্ষতি করিয়া, তিরস্কার, নির্বাসন দ্বারা দুঃখ প্রদান করে না, “জোর যাহার বাক্য তাহার” হয় না। যখন সে সত্যের সাথে সম্মুখীন হয় সে ইহা উপলব্ধি করে এবং ইহা অস্বীকার করে না। যখন মিথ্যার সাথে মুখোমুখি হয় সে ইহা বলিয়া বিজড়িত হইতে চেষ্টা করে, “ইহা ভিত্তিহীন, ইহা মিথ্যা।” এই কারণে এইরূপ ব্যক্তি যথাবাদী, সত্যবাদী, অর্থবাদী, বিনয়বাদী হিসেবে অভিহিত।
হে ভিক্ষুগণ, এইরূপ ব্যক্তির লোভজ পাপ-অকুশল প্রহীন হইয়াছে, মূল ছিন্ন হইয়াছে, ছিন্ন তালবৃক্ষ সদৃশ হইয়াছে। পুনর্জন্মের অতীত হইয়াছে, ভবিষ্যতে পুনরুৎপত্তির হেতু বিনষ্ট হইয়াছে। ইহজীবনে সে সুখে অতিবাহিত করে, ঘাতবিহীন, উপায়াসহীন, পরিদাহহীন হয়। ইহজীবনেই সে পরিনির্বাণ লাভ করে। দ্বেষজ পাপ-অকুশল প্রহীন হইয়াছে, মূল ছিন্ন হইয়াছে, ছিন্ন তালবৃক্ষ সদৃশ হইয়াছে। পুনর্জন্মের অতীত হইয়াছে, ভবিষ্যতে পুনরুৎপত্তির হেতু বিনষ্ট হইয়াছে। ইহজীবনে সে সুখে অতিবাহিত করে, ঘাতবিহীন, উপায়াসহীন, পরিদাহহীন হয়। ইহজীবনেই সে পরিনির্বাণ লাভ করে। মোহজ পাপ-অকুশল প্রহীন হইয়াছে, মূল ছিন্ন হইয়াছে, ছিন্ন তালবৃক্ষ সদৃশ হইয়াছে। পুনর্জন্মের অতীত হইয়াছে, ভবিষ্যতে পুনরুৎপত্তির হেতু বিনষ্ট হইয়াছে। ইহজীবন সে সুখে অতিবাহিত করে, ঘাতবিহীন, উপায়াসহীন, পরিদাহহীন হয়। ইহজীবনেই সে পরিনির্বাণ লাভ করে।
যেমন ভিক্ষুগণ, শালবৃক্ষ বা ধব বা ফন্দন বৃক্ষ তিন প্রকার মালুবালতা (পরগাছা) দ্বারা আক্রান্ত হয়। অতঃপর কোনো পুরুষ কুদালসহ আসে এবং সেই মালুবালতার মূল ছেদন করিয়া ফেলে। সমূলে কাটিয়া সে চতুর্দিকে একটি পরিখা খনন করে। এইরূপ করিয়া সে শিকড়টি উপড়াইয়া ফেলে যদিও সেইগুলি উষীড় আঁশ সদৃশ। তৎপর সে মালুবলতাটি কাটিয়া টুকরা করিয়া ফেলে। সেই টুকরাগুলি পুনঃ টুকরা টুকরা করে। সেই টুকরাগুলিকে সে বাতাসে ও রৌদ্রে শুকায়। তৎপর সেইগুলিকে আগুন দিয়া জ্বালাইয়া ফেলে এবং ছাই দ্বারা স্তূপ তৈরি করে! এইরূপ করিয়া সে প্রচণ্ড বাতাসে ছাই হইতে তুষ উড়াইয়া দেয় অথবা সেইগুলিকে খরস্রোতা নদীতে ভাসাইয়া দেয়। হে ভিক্ষুগণ, সেই মালুবালতা এইভাবে সমূলে কাটিয়া ছিন্নতালবৃক্ষ সদৃশ করা হইলে পুনঃ উৎপন্ন হইতে পারে না, ভবিষ্যতে গজাইতে পারে না।
তদ্রূপ হে ভিক্ষুগণ, এই ব্যক্তির লোভজ পাপ-অকুশল, দ্বেষজ পাপ-অকুশল, মোহজ পাপ-অকুশল পরিত্যক্ত হইয়াছে, সমূলে বিনষ্ট হইয়াছে। ছিন্নতালবৃক্ষ সদৃশ হইয়াছে, পুনরায় জন্ম লাভ করিতে পারে না। ইহজীবনে সে সুখে বাস করে। ঘাতবিহীন, উপায়াসবিহীন, পরিদাহবিহীন হইয়া ইহজীবনেই সে মুক্ত হয়। হে ভিক্ষুগণ, এইগুলিই ত্রিবিধ কুশল মূল।”
ব্যাখ্যা [০]