একসময় ভগবান বৈশালীতে অবস্থান করছিলেন মহাবনস্থ কূটাগারশালায়। সে সময় ভদ্রিয় লিচ্ছবি ভগবানের নিকট উপস্থিত হয়ে ভগবানকে অভিবাদন করে একপাশে উপবেশন করলেন। একপাশে উপবিষ্ট ভদ্রিয় লিচ্ছবি ভগবানকে এরূপ বললেন, “ভন্তে, আমি এরূপ শ্রবণ করেছি যে, ‘শ্রমণ গৌতম নাকি কুহকী মায়া জানেন, যা দ্বারা অন্য তীর্থিয় শ্রাবকদেরও আবর্তনী মায়ায় আবর্তিত করেন।’ ভন্তে, যারা এরূপ বলেন যে, ‘শ্রমণ গৌতম নাকি কুহকী মায়া জানেন, যা দ্বারা অন্য তীর্থিয় শ্রাবকদেরও আবর্তিত করেন’ তারা কি ভগবানের প্রতি অভূত (অসত্য) বিষয়ে দুর্নাম (অপবাদ) করল, নাকি ধর্মানুধর্ম ব্যাখ্যা করল অথবা কি তাদের সহধার্মিক বাদানুবাদের দরুন নিন্দার্হ হয়? ভন্তে, আমরা ভগবানকে অপবাদ বা নিন্দা করতে অনিচ্ছুক।”
হে ভদ্রিয়, তোমরা এরূপে জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। পুরুষ পরম্পরায়, অন্ধবিশ্বাসে, শাস্ত্রে ব্যক্ত হয়েছে বলে, তর্কপ্রসূত মতে, অনুমানবশত, নিজের মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ও ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। কিন্তু, ভদ্রিয়, যখন তোমরা নিজে নিজেই জানতে পারবে যে, ‘এ ধর্মসমূহ অকুশল, দোষজনক, বিজ্ঞজনের নিন্দিত এবং এ ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে অহিত ও দুঃখের জন্য সংবর্তিত হয়;’ কেবল তখনিই তা তোমরা ত্যাগ করবে।
ভদ্রিয়, তা তোমরা কি মনে কর, পুরুষের আধ্যাত্মিকভাবে যে লোভ, দোষ (দ্বেষ), মোহ ও ক্রোধ উৎপন্ন হয় তা কি তার হিতের জন্য উৎপন্ন হয়, নাকি অহিতের জন্য? “ভন্তে, অহিতের জন্য।” “ভদ্রিয়, লোভী, দোষযুক্ত, মোহযুক্ত ও ক্রোধী পুরুষ পুদ্গল লোভ, দ্বেষ, মোহ ও ক্রোধের দ্বারা অভিভূত হয়ে (লোভ, দোষ, মোহ ও ক্রোধ চিত্তে) প্রাণিহত্যা করে, অদত্তবস্তু গ্রহণ করে, পরদারে গমন করে, মিথ্যা ভাষণ করে এবং অপরকেও সেই কার্যে প্রবৃত্ত বা উৎসাহিত করে, যা দীর্ঘকাল ধরে অহিত ও দুঃখের কারণ হয়।” “হ্যাঁ, ভন্তে, এরূপ।”
“ভদ্রিয়, তা তোমরা কি মনে কর, এই ধর্মসমূহ কুশল নাকি অকুশল?” “ভন্তে, অকুশল।” “দোষযুক্ত নাকি দোষমুক্ত?” “ভন্তে, দোষযুক্ত।” “বিজ্ঞজনের গর্হিত (নিন্দিত) নাকি প্রশংসিত?” “ভন্তে, গর্হিত।” “সেই ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে অহিত ও দুঃখের জন্য সংবর্তিত হয়, নাকি হয় না? এ বিষয়ে তোমাদের কী মত?” “ভন্তে, সেই ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে অহিত ও দুঃখের জন্য সংবর্তিত হয়। এ বিষয়ে আমাদের এই মত।”
ভদ্রিয়, সেই বিষয়ে তাদের আমরা পূর্ব হতে এরূপ বলে আসছি যে, তোমরা এরূপে জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। পুরুষ পরম্পরায়, অন্ধবিশ্বাসে, শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে বলে, তর্কপ্রসূত মতে, অনুমানবশত, নিজের মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ও ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। কিন্তু, যখন তোমরা নিজে নিজেই জানতে পারবে যে, ‘এ ধর্মসমূহ অকুশল, দোষজনক, বিজ্ঞজনের নিন্দিত এবং এ ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে অহিত ও দুঃখের জন্য সংবর্তিত হয়’; কেবল তখনিই তা তোমরা ত্যাগ করবে। এরূপে যা ব্যক্ত হয়েছে; তা এই হেতুতেই ব্যক্ত হয়েছে।
ভদ্রিয়, তোমরা এরূপে জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। পুরুষ পরম্পরায়, অন্ধবিশ্বাসে, শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে বলে, তর্কপ্রসূত মতে, অনুমানবশত, নিজের মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ও ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। কিন্তু, যখন তোমরা নিজে নিজেই জানতে পারবে যে, ‘এ ধর্মসমূহ কুশল, দোষমুক্ত, বিজ্ঞজনের প্রশংসিত এবং এ ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে হিত ও সুখের জন্য সংবর্তিত হয়’; কেবল তখনিই তা তোমরা লাভ করে অবস্থান করবে।
“ভদ্রিয়, তা তোমরা কি মনে কর, পুরুষের আধ্যাত্মিকভাবে যে অলোভ, অদোষ (অদ্বেষ), অমোহ ও অক্রোধ উৎপন্ন হয় তা কি তার হিতের জন্য উৎপন্ন হয়, নাকি অহিতের জন্য?” “ভন্তে, হিতের জন্য।” “ভদ্রিয়, অলোভী, দোষমুক্ত, মোহমুক্ত ও অক্রোধী পুরুষ পুদ্গল লোভ, দোষ, মোহ ও ক্রোধের দ্বারা অভিভূত না হয়ে (অলোভ, অদোষ, অমোহ ও অক্রোধ চিত্তে) প্রাণিহত্যা করে না, অদত্তবস্তু গ্রহণ করে না, পরদারে গমন করে না, মিথ্যা ভাষণ করে না এবং অপরকেও সেই কার্যে প্রবৃত্ত বা উৎসাহিত করায় না, যা দীর্ঘকাল ধরে হিত ও সুখের কারণ হয়।” “হ্যাঁ, ভন্তে, এরূপ।”
“ভদ্রিয়, তা তোমরা কি মনে কর, এই ধর্মসমূহ কুশল নাকি অকুশল?” “ভন্তে, কুশল।” “দোষযুক্ত নাকি দোষমুক্ত?” “ভন্তে, দোষমুক্ত।” “বিজ্ঞজনের গর্হিত নাকি প্রশংসিত?” “ভন্তে, প্রশংসিত।” “সেই ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে অহিত ও দুঃখের জন্য সংবর্তিত হয়, নাকি হয় না? আর যদি তা হয় কীরূপেই বা এরূপ হয়?” “ভন্তে, সেই ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে হিত ও সুখের জন্য সংবর্তিত হয়-ঠিক এপ্রকারেই এরূপ হয়।”
“ভদ্রিয়, সে বিষয়ে তাদের আমরা পূর্ব হতে এরূপ বলে আসছি যে, তোমরা এরূপে জনশ্রুতিতে কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। পুরুষ পরম্পরায়, অন্ধবিশ্বাসে, শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে বলে, তর্কপ্রসূত মতে, অনুমানবশত, নিজের মতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বলে ও ধর্মগুরুর প্রতি শ্রদ্ধাবশত কোনো মতবাদ গ্রহণ করবে না। কিন্তু, যখন তোমরা নিজে নিজেই জানতে পারবে যে, ‘এ ধর্মসমূহ কুশল, দোষমুক্ত, বিজ্ঞজনের প্রশংসিত এবং এ ধর্মসমূহ সম্পাদিত হলে হিত ও সুখের জন্য সংবর্তিত হয়’; কেবল তখনিই তা তোমরা লাভ করে অবস্থান করবে। এরূপে যা ব্যক্ত হয়েছে, তা এই হেতুতেই ব্যক্ত হয়েছে।
ভদ্রিয়, জগতে কোনো সৎপুরুষ থাকলে তার শ্রাবককে এরূপে প্ররোচিত করে : ‘হে পুরুষ, এসো লোভকে ত্যাগ করে অবস্থান করো। লোভকে ত্যাগ করে অবস্থান করার সময় কায়িক, বাচনিক ও মানসিকভাবে লোভজনক কর্ম করো না। দোষকে (দ্বেষকে) ত্যাগ করে অবস্থান করো। দোষকে ত্যাগ করে অবস্থান করার সময় কায়িক, বাচনিক ও মানসিকভাবে দোষজনক কর্ম করো না। মোহকে ত্যাগ করে অবস্থান করো। মোহকে ত্যাগ করে অবস্থান করার সময় কায়িক, বাচনিক ও মানসিকভাবে মোহজনক কর্ম করো না। এবং ক্রোধকে ত্যাগ করে অবস্থান করো। ক্রোধকে ত্যাগ করে অবস্থান করার সময় কায়িক, বাচনিক ও মানসিকভাবে ক্রোধজনক কর্ম করো না।”
এরূপ ব্যক্ত হলে ভদ্রিয় লিচ্ছবি ভগবানকে এরূপ বললেন, “অতি সুন্দর, অতি মনোরম! ভন্তে, যেমন, কেউ অধোমুখী পাত্রকে ঊর্ধ্বমুখী করে, আবৃতকে অনাবৃত করে, পথভ্রষ্টকে পথ বলে দেয় এবং অন্ধকারে তৈল প্রদীপ ধারণ করে, যাতে চক্ষুষ্মান ব্যক্তি রূপাদি দেখতে পায়; ঠিক সেরূপেই ভগবানের দ্বারা অনেক পর্যায়ে ধর্ম প্রকাশিত হলো। এখন হতে আমি ভগবানের শরণ গ্রহণ করছি, ধর্ম এবং ভিক্ষুসংঘের শরণও গ্রহণ করছি। ভন্তে, আজ হতে আমাকে আপনার আমরণ শরণাগত উপাসকরূপে ধারণ করুন।”
“হে ভদ্রিয়, তাহলে কি আমি তোমাকে এরূপ বলেছি যে, ‘ভদ্রিয়, এসো, আমার শিষ্যত্ব গ্রহণ কর, আমি তোমার শাস্তা হব?” “ভন্তে, না।” “এরূপবাদী ও এরূপ প্রকাশকারী কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ আমাকে অসৎ, তুচ্ছ, মিথ্যা ও অভূতভাবে অপবাদ করে, যথা : ‘শ্রমণ গৌতম নাকি কুহকী মায়া জানেন, যা দ্বারা অন্য তীর্থিয় শ্রাবকদেরও আবর্তনী মায়ায় আবর্তিত করেন।” “ভন্তে, আবর্তনীয় মায়া সত্যি মঙ্গলপ্রদ ও কল্যাণকর। আমার প্রিয় আত্মীয়স্বজনকে এই আবর্তনী মায়ায় আবর্তিত করতে পারলেই মঙ্গল।” “এটা আমার আত্মীয়-স্বজনদের দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে। যদি সব ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শূদ্রদের এই আবর্তনী মায়া দ্বারা আবর্তিত করতে পারি, তবে তা সবার দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে।”
“এরূপ ভদ্রিয়, তা এরূপই যে, অকুশলধর্মসমূহ পরিত্যাগ ও কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য যদি সব ক্ষত্রিয়দের এই আবর্তনী মায়া দ্বারা আবর্তিত করতে পারি, তবে তা তাদের সবার দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে। অকুশলধর্মসমূহ পরিত্যাগ ও কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য যদি সকল ব্রাহ্মণ, বৈশ্য ও শূদ্রদের আবর্তনী মায়া দ্বারা আবর্তিত করতে পারি, তবে তা তাদের সবার দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে। অকুশলধর্মসমূহ পরিত্যাগের জন্য ও কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য যদি সদেবলোক, সমারলোক, সব্রহ্মলোক, সশ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ এবং সদেব মনুষ্যগণদেরও এই আবর্তনী মায়া দ্বারা আবর্তিত করতে পারি, তবে তা তাদের সবার দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে। আর ভদ্রিয়, অকুশলধর্মসমূহ পরিত্যাগ ও কুশলধর্মসমূহ লাভের জন্য যদি মহাশাল বৃক্ষরাজিকেও এই আবর্তনী মায়ায় আবর্তিত করতে পারি তবে, তা তাদের সবার দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হবে। আর মনুষ্যদের কথাই বা কী!” (তৃতীয় সূত্র)
ব্যাখ্যা [০]