লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৫]

আত্মন্তপ সূত্র

“হে ভিক্ষুগণ, পৃথিবীতে চার প্রকার পুদ্গল বিদ্যমান। সেই চার প্রকার কী কী? এ জগতে কোনো কোনো পুদ্গল আত্মন্তপ (আত্মপীড়ক) ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত হয়। কোনো কোনো পুদ্গল পরন্তপ (পরপীড়ক) ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয়। কোনো কোনো পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত এবং পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয়। আর কোনো কোনো পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত এবং পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয় না। যেই পুদ্গল আত্মন্তপ ও পরন্তপ নয়, সে ইহজন্মে অনাসক্ত, নির্বৃত, শীতিভূত ও সুখানুভবকারী হয়ে ব্রহ্মার ন্যায় অবস্থান করে।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে একজন পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত হয়? এ জগতে কোনো কোনো পুদ্গল অচেলক (জৈন বা নগ্ন সম্প্রদায়) হয়, মুক্তাচার বা অসংযতচারী ও হস্তাবলেহনকারী হয়। ‘ভদন্ত, আসুন বা স্থিত হোন’ বলে সে কাউকেও অভিবাদন বা অভ্যর্থনা করে না। তার উদ্দেশে আনীত খাদ্য গ্রহণ করে না, সংকল্পিত (বা বিশেষ কারণে আনীত) খাদ্য আর নিমন্ত্রণও গ্রহণ করে না। সে কুম্ভ হতে খাদ্য গ্রহণ করে না; বন্ধনপাত্র হতে, প্রবেশদ্বারে, লাঠির মধ্যে ও মুষলের (মুদ্‌গরের) মধ্যে খাদ্য গ্রহণ করে না। দুইজনে খাদ্য গ্রহণ করলে সে আহার করে না, গর্ভিনীর খাদ্য, স্তন্যদায়িনীর খাদ্য, এমনকি পুরুষের সাথে যৌন সংসর্গকারীর খাদ্যও গ্রহণ করে না। সে মিশ্র সংগৃহীত খাদ্য গ্রহণ করে না; উপনীত স্থানে, মক্ষিকা বিচরণ স্থানে খাদ্য গ্রহণ করে না। মাছ ও মাংস ভক্ষণ করে না; মদ, মাদকদ্রব্য এবং সির্কা (টকজাতীয় রসবিশেষ), যাগুও পান করে না। সে মাত্র এক গৃহ হতে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে, এক গ্রাস মাত্র আহার করে অথবা দুই গৃহ হতে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে দুই গ্রাস আহার করে। তিনটি গৃহ হতে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ করে তিন গ্রাস, চারটি গৃহ হতে সংগ্রহ করে চার গ্রাস, পাঁচটি গৃহ হতে সংগ্রহ করে পাঁচ গ্রাস, ছয়টি গৃহ হতে সংগ্রহ করে ছয় গ্রাস এবং সাতটি গৃহ হতে সংগ্রহ করে সাত গ্রাস ভোজন করে। সে একদিনে একবার আহার করে জীবন ধারণ করে, দুই দিনে, তিন দিনে, চার দিনে, পাঁচ দিনে, ছয় দিনে এমনকি সাত দিনে একবার মাত্র আহার করে জীবন ধারণ করে। এইভাবে পর্যায়ক্রমে প্রদত্ত খাদ্য এমনকি মাসান্তর প্রদত্ত খাদ্য ভোজন করেই অবস্থান করে।

সে শাকসবজি, জোয়ার (গমজাতীয় শস্য), নীবার (উড়িধান্য), দদ্দুল (এক প্রকার চাউল), শৈবাল বা জলজ উদ্ভিদ, চাউলের গুঁড়া, ভাতের মাড়, তৈলবীজের ময়দা, তৃণ ও গোবর আহার করে এবং বনে পতিত ফল-মূল আহার করে জীবন ধারণ করে।

সে পাট দ্বারা প্রস্তুতকৃত মোটা বা নিকৃষ্ট বস্ত্র পরিধান করে, মসাণ বস্ত্র (বিবিধ উপকরণে প্রস্তুত নিকৃষ্ট বস্ত্র), শববস্ত্র (মৃতদেহের বস্ত্র), আবর্জনা স্তূপের বস্ত্র, তিরীট বস্ত্র (লোধ্রবৃক্ষের বাকল দ্বারা তৈরী বস্ত্র), মৃগচর্মের বস্ত্র, চিতাবাঘচর্মের বস্ত্র, কুশতৃণের বস্ত্র, বল্কবস্ত্র, কাষ্ঠফলকের বস্ত্র, কেশ কম্বল, অশ্বকেশের তৈরী কম্বল এবং পেঁচা পক্ষীর পালক দ্বারা প্রস্তুতকৃত পোশাক পরিধান করে। সে কেশ-শ্মশ্রু (গোঁফদাড়ি) উৎপাটনকারী হয় ও কেশ-শ্মশ্রু উৎপাটনেও অনুযুক্ত হয়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এবং আসন প্রত্যাখ্যান বা বসতে আপত্তি করে। সে উৎকুটিক হয়ে বসার চেষ্টা বা উদ্যোগ গ্রহণ করে ও উৎকুটিক হয়ে বসে কণ্টকময় শয্যায় শয়নকারী হয়, কণ্টকময় শয্যায় শয়ন করে এবং সন্ধ্যাবেলায় তৃতীয়বার জলে নিমজ্জিত হয়ে অবস্থান করে। এভাবে সে বিভিন্ন উপায়ে দেহকে যন্ত্রণা ও পীড়ন করে অবস্থান করে। এরূপেই একজন পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে একজন পুদ্গল পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয়? এ জগতে কোনো কোনো পুদ্গল ভেড়াঘাতক, শূকর হত্যাকারী, পাখিমারক, ব্যাধ, শিকারি, মৎস্যঘাতক (জেলে), চোর, চোরঘাতক, গোঘাতক (কসাই) ও জেলদারোগা হয় এবং কোনো কোনো জন নিষ্ঠুর চরিত্রের বা নিষ্ঠুরকর্মী হয়। এরূপেই একজন পুদ্গল পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে একজন পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত এবং পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয়? এ জগতে কোনো কোনো পুদ্গল মূর্ধাভিষিক্ত (রাজমুকুট পরিহিত) ক্ষত্রিয় রাজা হয় অথবা ব্রাহ্মণ মহাশাল (মহাধনী) হয়। তিনি পূর্বদিকের নগরে নূতন সন্থাগার (সভাগৃহ) তৈরি করায়ে কেশ-শ্মশ্রু মুণ্ডন করে অমসৃণ চর্মের পরিধেয় বস্ত্র পরিধানপূর্বক দেহে ঘৃত ও তেল মেখে মেঠোপথ দিয়ে পৃষ্ঠদেশ চুলকাতে চুলকাতে সেই নতুন সন্থাগারে মহর্ষি, ব্রাহ্মণ ও পুরোহিতদের সাথে একত্রে প্রবেশ করে। অনন্তর তথায় তিনি সুবিধার্থে ভূমি হরিতচূর্ণ দ্বারা লেপন করে শয্যা প্রস্তুত বা উপযুক্ত করায়। একটি গাভী হতে বাছুরের জন্য একটি স্তনে যেই ক্ষীর (দুধ) উৎপন্ন হয় তা দ্বারা রাজা জীবন ধারণ করেন; দ্বিতীয় স্তনে উৎপন্ন ক্ষীর দিয়ে মহিষী, তৃতীয় স্তনের ক্ষীর দ্বারা ব্রাহ্মণ-পুরোহিত, চতুর্থ স্তনের ক্ষীর দিয়ে অগ্নিপূজা করে এবং অবশিষ্টাংশ বা উদ্বৃত ক্ষীর দ্বারা বৎসটি জীবন ধারণ করে। তিনি এরূপ আদেশ করেন : ‘এত সংখ্যক বৃষভ (ষাঁড়), এত সংখ্যক বলদ, এত সংখ্যক গাভী, এত সংখ্যক ছাগল, এত সংখ্যক ভেড়া ও অশ্ব এত সংখ্যক যজ্ঞ বা বলীদানের জন্য হত্যা কর, এত সংখ্যক বৃক্ষ যূপকাষ্ঠের (ষজ্ঞস্তম্ভ) জন্য ছেদন কর এবং এত পরিমাণ যজ্ঞের জন্য তৃণ কর্তন কর।’ যারা দাস, দূত ও কর্মচারী তারা দণ্ডের ভয়ে ভীত, ত্রাসিত ও অশ্রুমুখ হয়ে রোদন করতে করতে পরিকর্মাদি করে। এরূপেই একজন পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত হয় এবং পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে একজন পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুযুক্ত এবং পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয় না, আর সেই পুদ্গল আত্মন্তপ ও পরন্তপ না হয়ে ইহজন্মে অনাসক্ত, নির্বৃত, শান্ত ও সুখানুভবকারী হয়ে ব্রহ্মার ন্যায় অবস্থান করে? এ জগতে তথাগত পৃথিবীতে উৎপন্ন হয় অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যা ও সুআচরণ সম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অনুত্তর পুরুষ দমনকারী সারথি, দেব-মানবের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবানরূপে তিনি এই পৃথিবী, দেবলোক, মারভুবনসহ ব্রহ্মলোকে শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, দেব-মনুষ্যগণকে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা প্রত্যক্ষ করে প্রকাশ করেন। তিনি যা ধর্মদেশনা করেন তা আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ, পর্যাবসানে কল্যাণ এবং শুধুমাত্র পরিপূর্ণ, পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশ করেন। গৃহপতি, গৃহপতিপুত্র ও অন্যতর কুলে পুনর্জন্ম-প্রাপ্তজন সেই ধর্ম শ্রবণ করে। সেই ধর্ম শ্রবণ করে তথাগতের প্রতি শ্রদ্ধান্বিত হয়ে সে এরূপ চিন্তা করে : ‘গৃহীজীবন বাধাপূর্ণ ও রজঃপূর্ণ পথ আর প্রব্রজ্যা জীবন উন্মুক্ত; আগারে বসবাস করে একান্ত পরিপূর্ণ, একান্ত পরিশুদ্ধ ও মসৃণ শঙ্খের ন্যায় ব্রহ্মচর্য আচরণ করা অসম্ভব; তাহলে আমি কেশ-শ্মশ্রু মুণ্ডন করে কাষায় বস্ত্র পরিধান করে আগার হতে অনাগারে প্রব্রজিত হবো।’ সে ভবিষ্যতে বা অন্য কোনো সময়ে অল্প ভোগস্কন্ধ (অল্পধন), বৃহৎ ভোগস্কন্ধ (বিপুল ধনভাণ্ডার), অল্প সংখ্যক জ্ঞাতি ও বহুসংখ্যক জ্ঞাতিমণ্ডল পরিত্যাগ করে কেশ-শ্মশ্রু মুণ্ডন করে কাষায় বস্ত্র পরিধান করে আগার হতে অনাগারে প্রব্রজিত হয়।

সে এরূপে প্রব্রজিত হয়ে ভিক্ষুগণের অভিন্ন শিক্ষানীতিতে সমাপন্ন হয়ে প্রাণিহত্যা পরিত্যাগ করে প্রাণিহত্যা হতে প্রতিবিরত হয় এবং দণ্ড, শস্ত্র নিক্ষেপ না করে লজ্জাশীল, দয়ালু ও সকল প্রাণীর প্রতি হিতানুকম্পী (হিতৈষী) হয়ে অবস্থান করে। অদত্তবস্তু পরিত্যাগ করে অদত্তবস্তু গ্রহণ হতে প্রতিবিরত হয়, আর বদান্য বা প্রদত্তবস্তু গ্রহণে ইচ্ছুক হয়ে পরিশুদ্ধ হয়ে অবস্থান করে। অব্রহ্মচর্য পরিত্যাগ করে ব্রহ্মচর্য প্রতিপালন করে, ধর্মত জীবনযাপন করে অধর্ম ও গ্রাম্যধর্ম (মৈথুন সেবন) হতে বিরত হয়। মিথ্যা ভাষণ হতে প্রতিবিরত হয় এবং সত্যবাদী, সত্যসন্ধ (সত্য প্রতিজ্ঞ), বিশ্বস্ত, বিশ্বাসী ও জগতে অবিসংবাদী হয়ে অবস্থান করে। পিশুন বাক্য বলা হতে প্রতিবিরত হয় এবং একজন হতে শ্রবণ করে বিভেদ সৃষ্টির লৰ্যে তা অন্যের কাছে প্রকাশ করে না ও অন্যের কাছ হতে শ্রবণ করে তার কাছে প্রকাশ করে না। পরস্পর ভিন্ন (অনৈক্য) জনকে একত্রিত করে, সঙ্গীদের সাথে মিলিত করে দেয়; সন্ধিতে আনন্দিত, ঐক্যবদ্ধতায় রত ও মিত্রতায় সন্তুষ্ট হয় এবং মিত্রতাকরণ বাক্য ভাষণ করে। কর্কশ বাক্য বলা হতে প্রতিবিরত হয়; এবং যে বাক্য নির্দোষ, কর্ণসুখকর, প্রীতিপূর্ণ, মনোহর, শিষ্ট, বহুজনের আনন্দদায়ক ও বহুজনের মনোজ্ঞ সেরূপ বাক্যই ভাষণ করে। সম্প্রলাপ বাক্য বলা হতে প্রতিবিরত হয়; আর সে কালবাদী, ভূতবাদী, অর্থবাদী, ধর্মবাদী ও বিনয়বাদী হয় এবং উপযুক্ত সময়ে কারণ সম্বন্ধীয়, মঙ্গলজনক বাক্য বিবেচনা সহকারে প্রয়োজনানুরূপ ভাষণ করে।

সে বীজগ্রাম (বীজ দ্বারা সৃষ্ট বস্তু) ও ভূতগ্রাম নষ্ট করা হতে প্রতিবিরত হয়। একাহারী হয়ে রাত্রে বা বিকালে ভোজন হতে প্রতিবিরত হয়। নৃত্য-গীত-বাদ্য-বাজনা দর্শন, মালা-সুগন্ধিদ্রব্য বিলেপন, ধারণ, মণ্ডন ও বিভূষণ হতে প্রতিবিরত হয়। উচ্চশয্যা, মহাশয্যা এবং সোনা, রুপা প্রতিগ্রহণ হতে বিরত হয়। অপক্বশষ্য, অপক্ব মাংস, স্ত্রীলোক ও কুমারী, দাস-দাসী, ছাগল, ভেড়া, মোরগ, শূকর, হস্তি, ষাঁড়, অশ্ব এবং ঘোটকী গ্রহণ হতে প্রতিবিরত হয়। সে ক্ষেত্র বা জমি গ্রহণ করে না, দূতকার্যে নিযুক্ত হয় না, ক্রয়-বিক্রয়ও করে না, তুলাকূট (ওজনে কম দেয়া), কংসকূট (টাকা পয়সা আদান প্রদানে প্রবঞ্চনা), মানকূট (পরিমাপে প্রবঞ্চনা) আর উৎকোচও (ঘুষ) গ্রহণ করে না, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা ও কপটতাকরণ হতে প্রতিবিরত হয়। আর ছেদন, বধ, বন্ধন, ডাকাতি এবং দিনের বেলায় গ্রাম আক্রমণ করে ডাকাতি, লুণ্ঠন করে না।

সে দেহরক্ষাকারী চীবরে ও জীবন রক্ষাকরণ পিণ্ডপাতে সন্তুষ্ট হয়। যেভাবে প্রস্থান করা উচিত তদনুরূপে প্রস্থান করে। শকুনপক্ষী যেমন যেইভাবে উড্ডয়ন করে, পাখাদ্বয়ের ভারের দ্বারাই উড্ডয়ন করে; তদ্রূপভাবেই ভিক্ষুও দেহরক্ষাকারী চীবরে ও জীবন রক্ষাকারী পিণ্ডপাতে সন্তুষ্ট হয়। যেভাবে প্রস্থান করা উচিত তদনুরূপে প্রস্থান করে। সে এই আর্যশীলস্কন্ধ দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে অধ্যাত্মভাবে অনবদ্য সুখ অনুভব করে।

সে চক্ষু দিয়ে রূপ দেখে নিমিত্তগ্রাহী, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। এ হেতুতে সামান্য অসংযতভাবে বিচরণকারী চক্ষু-ইন্দ্রিয়কে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যাদি অকুশল পাপধর্ম আক্রমণ করলেও আচ্ছন্ন করতে পারে না। যেহেতু ভিক্ষু চক্ষু সংবরণে অভিনিবিষ্ট থাকে, চক্ষু-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে, চক্ষু-ইন্দ্রিয়ে সংবরণ উৎপন্ন করে। কর্ণ দিয়ে শব্দ শুনে নিমিত্তগ্রাহী, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। এ হেতুতে সামান্য অসংযতভাবে বিচরণকারী কর্ণ-ইন্দ্রিয়কে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যাদি অকুশল পাপধর্ম আক্রমণ করলেও আচ্ছন্ন করতে পারে না। যেহেতু ভিক্ষু কর্ণ সংবরণে অভিনিবিষ্ট থাকে, কর্ণ-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে, কর্ণ-ইন্দ্রিয়ে সংবরণ উৎপন্ন করে। নাসিকা দিয়ে ঘ্রাণ নিয়ে নিমিত্তগ্রাহী, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। এ হেতুতে সামান্য অসংযতভাবে বিচরণকারী নাসিকা-ইন্দ্রিয়কে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যাদি অকুশল পাপধর্ম আক্রমণ করলেও আচ্ছন্ন করতে পারে না। যেহেতু ভিক্ষু নাসিকা সংবরণে অভিনিবিষ্ট থাকে, নাসিকা-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে, নাসিকা-ইন্দ্রিয়ে সংবরণ উৎপন্ন করে। জিহ্বা দিয়ে রস আস্বাদন করে নিমিত্তগ্রাহী, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। এ হেতুতে সামান্য অসংযতভাবে বিচরণকারী জিহ্বা-ইন্দ্রিয়কে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যাদি অকুশল পাপধর্ম আক্রমণ করলেও আচ্ছন্ন করতে পারে না। যেহেতু ভিক্ষু জিহ্বা সংবরণে অভিনিবিষ্ট থাকে, জিহ্বা-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে, জিহ্বা-ইন্দ্রিয়ে সংবরণ উৎপন্ন করে। কায় দিয়ে স্পর্শ অনুভব করে নিমিত্তগ্রাহী, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। এ হেতুতে সামান্য অসংযতভাবে বিচরণকারী কায়-ইন্দ্রিয়কে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যাদি অকুশল পাপধর্ম আক্রমণ করলেও আচ্ছন্ন করতে পারে না। যেহেতু ভিক্ষু কায় সংবরণে অভিনিবিষ্ট থাকে, কায়-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে, কায়-ইন্দ্রিয়ে সংবরণ উৎপন্ন করে। মন দিয়ে ধর্ম জেনে নিমিত্তগ্রাহী, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হয় না। এ হেতুতে সামান্য অসংযতভাবে বিচরণকারী মন-ইন্দ্রিয়কে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যাদি অকুশল পাপধর্ম আক্রমণ করলেও আচ্ছন্ন করতে পারে না। যেহেতু ভিক্ষু মন সংবরণে অভিনিবিষ্ট থাকে, মন-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করে, মন-ইন্দ্রিয়ে সংবরণ উৎপন্ন করে। সে এই আর্য ইন্দ্রিয়সংবর দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে অধ্যাত্মভাবে বিশুদ্ধ সুখ অনুভব করে। সে গমনাগমন করার সময় সম্প্রজ্ঞানী হয়। অবলোকন, নিরীক্ষণ ও হস্তপদ সংকোচন-প্রসারণকালেও সম্প্রজ্ঞানী হয়। সঙ্ঘাটি, পাত্র ও চীবর ধারণকালে, ভোজনে, পানাহারে ও আস্বাদনকালে সম্প্রজ্ঞানী হয়। বাহ্য-প্রস্রাব ত্যাগে, গমনে, দাঁড়ানে, উপবেশনে, শয়নে, জাগরণে, ভাষণে এবং মৌনাবলম্বনেও সম্প্রজ্ঞানী হয়।

সে এই আর্যশীলস্কন্ধ, আর্য সন্তুষ্ট, আর্য ইন্দ্রিয়সংবর ও আর্য স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়ে অরণ্যে, বৃক্ষমূলে, পর্বতে, কন্দরে, গিরিগুহায়, শ্মশানে, বনপ্রান্তে, উন্মুক্ত স্থানে, তৃণস্তূপে ও নির্জন স্থানে গমন করে। সে ভিক্ষান্ন সংগ্রহ হতে প্রত্যাবর্তন করে ভোজনের পর দেহকে সোজা করে লক্ষ্যাভিমুখে স্মৃতি উপস্থাপিত করে পদ্মাসনে উপবেশন করে। সে লোকে (দেহে) অভিধ্যা পরিত্যাগ করে অভিধ্যাবিগত চিত্তে অবস্থান করে এবং অভিধ্যা হতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে।

ব্যাপাদ-প্রদোষ ত্যাগ করে দ্বেষমুক্ত চিত্তে সব প্রাণীর প্রতি হিতানুকম্পী হয়ে অবস্থান করে ব্যাপাদ-প্রদোষ চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে। সে আলস্য-তন্দ্রা পরিত্যাগ করে বিগত আলস্য-তন্দ্রা, আলোকসংজ্ঞী, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হয়ে অবস্থান করে আলস্য-তন্দ্রা হতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে। ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য পরিত্যাগ করে অনুদ্ধত ও অধ্যাত্ম্য প্রশান্ত চিত্ত হয়ে অবস্থান করে ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য হতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে। সে বিচিকিৎসা ত্যাগ করে সন্দেহোত্তীর্ণ ও কুশলধর্মসমূহে সন্দেহমুক্ত হয়ে অবস্থান করে বিচিকিৎসা হতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করে। সে চিত্তে উপক্লেশ ও প্রজ্ঞা দুর্বলকারী এই পঞ্চনীবরণ পরিহার করে কাম (কামনা) ও অকুশলধর্মসমূহ হতে বিবিক্ত হয়ে সবিতর্ক, সবিচার ও বিবেকজনিত প্রীতি-সুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে। বিতর্ক ও বিচারের উপশমে আধ্যাত্মিক সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, অবিতর্ক, অবিচার সমাধিজনিত প্রীতি-সুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে। সে প্রীতির প্রতিও বিরাগী হয়ে উপেক্ষাশীল হয়ে অবস্থান করে এবং স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হয়ে কায়িক সুখ অনুভব করে; যে অবস্থায় থাকলে আর্যগণ ‘উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী’ বলে অভিহিত করেন সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে। সর্ববিধ সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করে পূর্বেই মানসিক সৌমনস্য ও দৌর্মনস্যের বিনাশ সাধন করে সুখ-দুঃখহীন ‘উপেক্ষা স্মৃতি পরিশুদ্ধি’ নামক চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে।

সে এইরূপ সমাহিত চিত্তে, পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, বিগত উপক্লেশ, মৃদুভূত, কর্মক্ষম, স্থিত ও আনেঞ্জা (শূন্যতা) প্রাপ্ত হয়ে পূর্বনিবাস স্মৃতিজ্ঞান অর্জনের নিমিত্তে চিত্তকে নিয়োজিত করে। বিভিন্ন উপায়ে সে পূর্ব পূর্ব জন্মের অনুস্মরণ করে, যেমন : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, শত সহস্র (লক্ষ) জন্ম, এমনকি বহু সংবর্তকল্প, বহু বিবর্তকল্প ও বহু সংবর্তিত কল্পে ‘অমুকজন্মে আমার এ নাম, এ গোত্র, এ বর্ণ, এরূপ আহার, এরূপ সুখ-দুঃখ ভোগ এবং এ পরিমাণ আয়ু ছিল। সেখান হতে চ্যুত হয়ে এ স্থানে জন্মগ্রহণ করেছি।’ এরূপে সে অপরজন সম্বন্ধেও জানতে পারে যে, ‘অমুক জন্মে তার এ নাম, এ গোত্র, এ বর্ণ, এরূপ আহার, এরূপ সুখ-দুঃখ ভোগ এবং এই পরিমাণ আয়ু ছিল। সেখান হতে চ্যুত হয়ে এ স্থানে জন্মগ্রহণ করেছে। এরূপে সে আকার ও গতিসহ বহু প্রকার পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করে। এবং সে এরূপ সমাহিত চিত্তে, পরিশুদ্ধ, পরিষ্কৃত, নিষ্কলঙ্ক, বিগত উপক্লেশ, মৃদুভূত, কর্মক্ষম, স্থিত ও আনেঞ্জা (শূন্যতা) প্রাপ্ত হয়ে আসবক্ষয় জ্ঞানের জন্য চিত্তকে নিয়োজিত করে। সে ‘এটি দুঃখ’, ‘এটি দুঃখ সমুদয়’, ‘এটি দুঃখ নিরোধ’, ও ‘এটি দুঃখ নিরোধের উপায়’ বলে যথার্থরূপে জানে। ‘এটি আসব’, ‘এটি আসব সমুদয়’, ‘এটি আসব নিরোধ’, ‘এটি আসব নিরোধের উপায়’ বলেও যথার্থরূপে জানে। এরূপে অবগত ও দর্শনের দরুন কামাসব হতে তার চিত্ত বিমুক্ত হয়, ভবাসব ও অবিদ্যাসব হতেও তার চিত্ত বিমুক্ত হয় এবং ‘বিমুক্তিতে বিমুক্ত’ এরূপ জ্ঞান উৎপন্ন হয়। ‘জন্মক্ষীণ হয়েছে, ব্রহ্মচর্য উদ্‌যাপিত হয়েছে, করণীয় কৃত হয়েছে এবং দুঃখমুক্তির জন্য আর অন্য কোনো কর্তব্য নেই’ এরূপে প্রকৃষ্টরূপে জানে। ভিক্ষুগণ, এরূপেই কোনো কোনো পুদ্গল আত্মন্তপ ও আত্মপরিতাপনানুুযুক্ত এবং পরন্তপ ও পরপরিতাপনানুযুক্ত হয় না। আর সেই পুদ্গল আত্মন্তপ ও পরন্তপ না হয়ে এ জন্মে অনাসক্ত, নির্বৃত, শীতিভূত ও সুখানুভবকারী হয়ে ব্রহ্মার ন্যায় অবস্থান করে।

ভিক্ষুগণ, এই চার প্রকার পুদ্গল পৃথিবীতে বিদ্যমান।” (অষ্টম সূত্র)

ব্যাখ্যা [০]