লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৫]

প্রেম সূত্র

“হে ভিক্ষুগণ, চার প্রকারে প্রেম উৎপন্ন হয়। সেই চার প্রকার কী কী? যথা : প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয়, প্রেম হতে দ্বেষ বা হিংসা উৎপন্ন হয়, দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন এবং দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয়? এ জগতে কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ইষ্ট, কান্ত ও মনঃপূত হয়। অন্যরাও সেই ব্যক্তির সাথে ইষ্ট, কান্ত, মনঃপূত আচরণ করে। তখন প্রথম ব্যক্তির এমন চিন্তা হয় : ‘যে আমার ইষ্ট, কান্ত ও মনঃপূত; অন্যরাও তার সাথে ইষ্ট, কান্ত ও মনঃপূত আচরণ করছে’। তাই সে তাদের প্রতি প্রীতিভাব উৎপাদন করে। ভিক্ষুগণ, এরূপেই প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয়।

কিরূপে প্রেম হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয়? এ জগতে কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির ইষ্ট, কান্ত ও মনঃপূত হয়। কিন্ত অন্যরা সেই ব্যক্তির সাথে অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত আচরণ করে। তখন প্রথম ব্যক্তির এমন চিন্তা হয়- ‘যে আমার ইষ্ট কান্ত ও মনঃপূত; অন্যরা তার সাথে অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত আচরণ করছে’। তাই সে তাদের প্রতি দ্বেষ বা হিংসাভাব উৎপাদন করে। ভিক্ষুগণ, এরূপেই প্রেম হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয়।

কিরূপে দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন হয়? এ জগতে কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত হয়। অন্যরাও সেই ব্যক্তির সাথে অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত আচরণ করে। তখন প্রথম ব্যক্তির এমন চিন্তা হয় : ‘যে আমার অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত; অন্যরাও তার সাথে অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত আচরণ করছে’। তাই সে তাদের প্রতি প্রীতিভাব উৎপন্ন করে। ভিক্ষুগণ, এরূপেই দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয়? এ জগতে কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তির অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত হয়। কিন্তু অন্যরা সেই ব্যক্তির সাথে ইষ্ট, কান্ত ও মনঃপূত আচরণ করে। তখন প্রথম ব্যক্তির এমন চিন্তা হয় : ‘যে আমার অনিষ্ট, অকান্ত ও অমনঃপূত; অন্যরা তার সাথে ইষ্ট, কান্ত ও মনঃপূত আচরণ করছে’। তাই সে তাদের প্রতি দ্বেষভাব উৎপন্ন করে। ভিক্ষুগণ, এরূপেই দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয়। ভিক্ষুগণ, এই চার প্রকারেই প্রেম উৎপন্ন হয়।”

“ভিক্ষুগণ, যেই সময়ে ভিক্ষু কামসম্পর্ক হতে বিবিক্ত হয়ে, অকুশল-চিন্তা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে সবিতর্ক, সবিচার ও বিবেকজ প্রীতি সুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে; সেই সময়ে তার নিকট পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না; পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না এবং পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না।”

যেই সময়ে ভিক্ষু বিতর্ক-বিচারের উপশমে আধ্যাত্মিক সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, বিতর্ক-বিচারাতীত সমাধিজ প্রীতি সুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে; সেই সময়ে তার নিকট পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না ও পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না।

যেই সময়ে ভিক্ষু প্রীতির প্রতিও বিরাগী হয়ে উপেক্ষাভাবে অবস্থান করে, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানী হয়ে স্বচিত্তে (প্রীতি নিরপেক্ষ) সুখ অনুভব করে; যেই অবস্থাকে আর্যগণ ‘উপেক্ষাসম্পন্ন, স্মৃতিমান ও সুখ বিহারী’ আখ্যা দেন সেই তৃতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে; সেই সময় তার পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না এবং পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না।

যে-সময়ে ভিক্ষু দৈহিক সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করে, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য (মনের হর্ষ-বিষাদ) অস্তমিত করে, সুখ-দুঃখহীন বা উপেক্ষাভাবে ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করে, সেই সময়ে তার পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় প্রেম হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না, পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে প্রেম উৎপন্ন হয় না ও পূর্বের ন্যায় দ্বেষ হতে দ্বেষ উৎপন্ন হয় না।

যেই সময়ে ভিক্ষু আসবসমূহ ক্ষয় করে অনাসব হয়ে এ জীবনে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা চিত্ত-বিমুক্তি, প্রজ্ঞা-বিমুক্তি লাভ করে অবস্থান করে। যার কারণে প্রেম হতে উৎপন্ন প্রেম প্রহীন হয়; তা উচ্ছিন্নমূল তালবৃক্ষের ন্যায় ভবিষ্যতে আর পুনরুৎপত্তি হয় না। প্রেম হতে উৎপন্ন দ্বেষ প্রহীন হয়; তা উচ্ছিন্নমূল তালবৃক্ষের ন্যায় ভবিষ্যতে আর পুনরুৎপত্তি হয় না। দ্বেষ হতে উৎপন্ন প্রেম প্রহীন হয়; তা উচ্ছিন্নমূল তালবৃক্ষের ন্যায় ভবিষ্যতে আর পুনরুৎপত্তি হয় না। দ্বেষ হতে উৎপন্ন দ্বেষ প্রহীন হয়; তা উচ্ছিন্নমূল তালবৃক্ষের ন্যায় ভবিষ্যতে আর পুনরুৎপত্তি হয় না। ভিক্ষুগণ, একেই বলা হয় ভিক্ষুর নিজেকে আকর্ষণ না করা, নিজেকে বৈরীভাবাপন্ন্‌ না করা, নিজেকে ধূমায়িত না করা, নিজেকে প্রজ্বলিত না করা, নিজেকে হতবুদ্ধি না করা।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে ভিক্ষু নিজেকে আকর্ষণ করে? এ জগতে ভিক্ষু রূপকে আত্মা মনে করে; আত্মাকে রূপ, আত্মার মধ্যে রূপ, রূপের মধ্যে আত্মা মনে করে, বেদনাকে আত্মা মনে করে, আত্মাকে বেদনা, আত্মার মধ্যে বেদনা, ও বেদনার মধ্যে আত্মা মনে করে; সংজ্ঞাকে আত্মা মনে করে, আত্মাকে সংজ্ঞা, আত্মার মধ্যে সংজ্ঞা ও সংজ্ঞার মধ্যে আত্মা মনে করে; সংস্কারকে আত্মা মনে করে, আত্মাকে সংস্কার, আত্মার মধ্যে সংস্কার এবং সংস্কারের মধ্যে আত্মা মনে করে ও বিজ্ঞানকে আত্মা মনে করে, আত্মাকে বিজ্ঞান, আত্মার মধ্যে বিজ্ঞান, বিজ্ঞানের মধ্যে আত্মা মনে করে। ভিক্ষুগণ, এরূপে নিজেকে আকর্ষণ করে।

কিরূপে ভিক্ষু নিজেকে আকর্ষণ করে না (ন উস্‌সোনতি)? এ জগতে ভিক্ষু রূপকে আত্মা মনে করে না, আত্মাকে রূপ মনে করে না, রূপকে আত্মার মধ্যে মনে করে না, আত্মাকে রূপের মধ্যে মনে করে না; বেদনাকে আত্মা মনে করে না, আত্মাকে বেদনা মনে করে না, বেদনাকে আত্মার মধ্যে মনে করে না, আত্মাকে বেদনার মধ্যে মনে করে না; সংজ্ঞাকে আত্মা মনে করে না, আত্মাকে সংজ্ঞা মনে করে না, সংজ্ঞাকে আত্মার মধ্যে মনে করে না, ওই আত্মাকে সংজ্ঞার মধ্যে মনে করে না; সংস্কারকে আত্মা মনে করে না, আত্মাকে সংস্কার মনে করে না, সংস্কারকে আত্মার মধ্যে মনে করে না, আত্মাকে সংস্কারের মধ্যে মনে করে না; বিজ্ঞানকে আত্মা মনে করে না, আত্মাকে বিজ্ঞান মনে করে না, বিজ্ঞানকে আত্মার মধ্যে মনে করে না, আত্মাকে বিজ্ঞানের মধ্যে মনে করে না। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু নিজেকে আকর্ষণ করে না (ন উস্‌সেনেতি)

কিরূপে ভিক্ষু বৈরীভাবাপন্ন হয়? (পটিসেনেতি)। এ জগতে ভিক্ষু আক্রোশকারীকে প্রতিআক্রোশ করে, রোষকারীকে প্রতিরোষ করে এবং কলহকারীকে প্রতিকলহ করে। ভিক্ষুগণ, এরূপেই ভিক্ষু বৈরীভাবাপন্ন হয়।

কিরূপে ভিক্ষু বৈরীভাবাপন্ন হয় না? (ন পটিসেনেতি) এ জগতে ভিক্ষু আক্রোশকারীকে প্রতিআক্রোশ করে না, রোষকারীকে প্রতিরোষ করে না এবং কলহকারীকে প্রতিকলহ করে না। ভিক্ষুগণ, এরূপেই ভিক্ষু বৈরীভাবাপন্ন হয় না।

কিরূপে ভিক্ষু নিজেকে ধূমায়িত (ধুপাযতি) করে? এ জগতে ভিক্ষুর ‘আমি’ এরূপ ধারণাহেতু এমন চিন্তা জাগে যে, ‘আমিই এই জগতে;’ ‘আমি এরূপ;’ ‘আমি অন্যরূপ;’ ‘আমি অনিত্য নই;’ ‘আমি নিত্য;’ ‘আমি আছি;’ ‘আমি এ জগতের মাঝে আছি;’ ‘আমি এরূপ আছি;’ ‘আমি অন্যরূপ আছি;’ ‘আমি হই;’ ‘আমি এ জগতের মাঝে হই;’ ‘আমি এরূপ হই;’ ‘আমি অন্যথা হই;’ ‘আমি হবো;’ ‘আমি এ জগতে হবো;’ ‘আমি এরূপ হবো;’ ‘এবং ‘আমি অন্যরূপ হবো’। ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু নিজেকে ধূমায়িত করে।

কিরূপে ভিক্ষু নিজেকে ধুমায়িত করে না? (ন ধূপাযতি ) এ জগতে ভিক্ষুর ‘আমি এরূপ’ ধারণাহেতু এমন চিন্তা জাগে যে, ‘আমিই এই জগতে নই;’ ‘আমি এরূপ নই;’ ‘আমি অন্যরূপ নই;’ ‘আমি অনিত্য;’ ‘আমি নিত্য নই;’ ‘আমি নই;’ ‘আমি এ জগতের মাঝে নই;’ ‘আমি এরূপ নই;’ ‘আমি অন্যরূপ নই;’ ‘ আমি হই না;’ ‘আমি এ জগতের মাঝে হই না;’ ‘আমি এরূপ হই না;’ ‘আমি অন্যথা হই না;’ ‘আমি হবো না;’ ‘আমি এ জগতে হবো না;’ ‘আমি এরূপ হবো না;’ এবং আমি অন্যরূপ হবো না।’ ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু নিজেকে ধূমায়িত করে না।

কিরূপে নিজেকে প্রজ্বলিত করে (পজ্জলতি)? এ জগতে ভিক্ষুর ‘এটির দ্বারা আমি’ এরূপ ধারণাহেতু এমন চিন্তা জাগে যে, ‘এটির দ্বারা আমি এই জগতে;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ;’ ‘এটির দ্বারা অন্যরূপ;’ ‘এটির দ্বারা আমি অনিত্য নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি নিত্য;’ ‘এটির দ্বারা আছি;’ ‘এটির দ্বারা এ জগতের মাঝে আছি;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ আছি;’ ‘এটির দ্বারা আমি অন্যরূপ আছি;’ ‘এটির দ্বারা আমি হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এ জগতে হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি অন্যথা হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি হবো;’ ‘এটির দ্বারা আমি এ জগতে হবো;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ হবো;’ এবং ‘এটির দ্বারা আমি অন্যরূপ হবো।’ ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু নিজেকে প্রজ্বলিত করে।

কিরূপে ভিক্ষু নিজেকে প্রজ্বলিত করে না (ন পজ্জলতি)? এ জগতে ভিক্ষুর ‘এটির দ্বারা আমি নই’ এরূপ ধারণা হেতু এমন চিন্তা জাগে যে, ‘এটির দ্বারা আমি এ জগতে নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি অন্যরূপ নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি অনিত্য;’ ‘এটির দ্বারা আমি নিত্য নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এ জগতে নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি অন্যরূপ নই;’ ‘এটির দ্বারা আমি না হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এ জগতে না হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ না হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি অন্যথা না হই;’ ‘এটির দ্বারা আমি হবো না;’ ‘এটির দ্বারা আমি এ জগতে হবো না;’ ‘এটির দ্বারা আমি এরূপ হবো না;’ এবং ‘এটির দ্বারা আমি অন্যরূপ হবো না।’ ভিক্ষুগণ, এরূপে ভিক্ষু নিজেকে প্রজ্বলিত করে না।

কিরূপে ভিক্ষু হতবুদ্ধি হয় (সম্পজ্ঝাযতি)? ভবিষ্যতে অনুৎপত্তি ধর্ম উচ্ছিন্নমূল তালবৃক্ষের ন্যায় ভিক্ষুর আমিত্ববোধ প্রহীন হয় না। এরূপে ভিক্ষু হতবুদ্ধি হয়।

ভিক্ষুগণ, কিরূপে হতবুদ্ধি হয় না (ন সম্পজ্ঝাযতি)? ভবিষ্যতে অনুৎপত্তি ধর্ম উচ্ছিন্নমূল তালবৃক্ষের ন্যায় ভিক্ষুর আমিত্ববোধ প্রহীন হয়। এরূপে ভিক্ষু হতবুদ্ধি হয় না। (দশম সূত্র)

মহাবর্গ সমাপ্ত।

স্মারক-গাথা :

শ্রোতানুগত, বিষয়, ভদ্রিয়, সামুগিয়, বপ্প ও সাল্‌হ,
মল্লিকাদেবী, আত্মন্তপ, তৃষ্ণা ও প্রেম সূত্র দশ।

চতুর্থ পঞ্চাশক সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [০]