লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৩]

উদায়ী সূত্র

অতঃপর ভগবান আয়ুষ্মান উদায়ীকে ডেকে বললেন :

“হে উদায়ী, অনুস্মৃতির (বা ভাবনার) কয়টি বিষয় আছে?”

এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে আয়ুষ্মান উদায়ী চুপ রইলেন। দ্বিতীয়বারও ভগবান আয়ুষ্মান উদায়ীকে ডেকে বললেন :

“হে উদায়ী, অনুস্মৃতির (বা ভাবনার) কয়টি বিষয় আছে?”

দ্বিতীয়বারও আয়ুষ্মান উদায়ী নিরব থাকলেন। তৃতীয়বারও ভগবান আয়ুষ্মান উদায়ীকে ডেকে বললেন :

“হে উদায়ী, অনুস্মৃতির (বা ভাবনার) কয়টি বিষয় আছে?”
তৃতীয়বারও আয়ুষ্মান উদায়ী নিরব রইলেন।

অতঃপর আয়ুষ্মান আনন্দ আয়ুষ্মান উদায়ীকে এরূপ বললেন :

“আয়ুষ্মান উদায়ী, ভগবান আপনাকে কিছু বলছেন।”

“আয়ুষ্মান আনন্দ, আমি ভগবানের কথা শুনেছি। ভন্তে, এক্ষেত্রে, ভিক্ষু নানা প্রকারে পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করেন; যেমন : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, শত-সহস্র (লক্ষ) জন্ম, এমনকি বহু সংবর্ত কল্প, বহু বিবর্ত কল্প এবং বহু সংবর্ত-বিবর্ত কল্পে অমুক জন্মে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এইরূপ আহার, এইরূপ ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ ছিল আয়ু। সেখান হতে চ্যুত হয়ে ওই স্থানে জন্মগ্রহণ করেছি। সেখানেও এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এইরূপ আহার, এইরূপ ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ ছিল আয়ু। আবার সেই স্থান হতে চ্যুত হয়ে এখানে জন্ম হয়েছি।’ এই প্রকারে তিনি আকার ও গতিসহ বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করতে পারেন। ভন্তে, এটাই অনুস্মৃতির বিষয়।”

অতঃপর ভগবান আয়ুষ্মান আনন্দকে ডেকে বললেন, “হে আনন্দ, আমি জানতাম যে এই মূর্খ উদায়ী অধিচিত্তে অনুযুক্ত হয়ে অবস্থান করে না। আনন্দ, তুমিই বল, অনুস্মৃতির বিষয় কয়টি?”

“ভন্তে, অনুস্মৃতির বিষয় পাঁচটি। সেই পাঁচটি কী কী? যথা :

এক্ষেত্রে, ভন্তে, ভিক্ষু যাবতীয় কামসম্পর্ক হতে বিবিক্ত হয়ে এবং অকুশল-চিন্তা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে সবিতর্ক, সবিচার এবং বিবেকজনিত প্রীতি-সুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করে অবস্থান করেন। বিতর্ক-বিচারের উপশমে অধ্যাত্মিক সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী বিতর্ক-বিচারাতীত সমাধিজনিত প্রীতি-সুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করে অবস্থান করেন। প্রীতির প্রতিও বিরাগী হয়ে উপেক্ষার ভাবে অবস্থান করে, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হয়ে স্বচিত্তে (প্রীতি-নিরপেক্ষ) সুখ অনুভব করেন; যেই অবস্থাকে আর্যগণ ‘উপেক্ষাসম্পন্ন, স্মৃতিমান ও সুখবিহারী’ বলে আখ্যা দেন, সেই তৃতীয় ধ্যান অধিগত করে বিচরণ করেন। ভন্তে, এই অনুস্মৃতির বিষয় এরূপে ভাবিত, বহুলীকৃত হলে তা ইহজীবনেই সুখবিহারের জন্য চালিত হয়।

পুনশ্চ, ভন্তে, ভিক্ষু আলোক-সংজ্ঞায় মনোনিবেশ করেন, দিবা-সংজ্ঞায় দৃঢ়রূপে মনোযোগ স্থাপন করেন। যেমন দিন তেমনই রাত্রি, যেমন রাত্রি তেমনই দিন। এরূপে উন্মুক্ত, অনাবৃত চিত্তের দ্বারা তিনি প্রভাস্বর চিত্ত ভাবিত করেন। ভন্তে, এই অনুস্মৃতির বিষয় এরূপে ভাবিত, বহুলীকৃত হলে তা জ্ঞানদর্শন লাভের জন্য সংবর্তিত বা চালিত হয়।

পুনশ্চ, ভন্তে, ভিক্ষু পদতল হতে ঊর্ধ্বে এবং কেশাগ্র হতে নিম্নে ত্বক পরিবেষ্টিত নানা প্রকার অশুচিপূর্ণ এই দেহকে প্রত্যবেক্ষণ করেন, ‘এই দেহে কেশ, লোম, নখ, দন্ত, ত্বক, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, অস্থিমজ্জা, মূত্রাশয়, হৃৎপিণ্ড, যকৃত, ক্লোম (পিত্তকোষ), পৱীহা, ফুসফুস, অন্ত্র, ক্ষুদ্রান্ত্র, উদর, পুরীষ (বা মল), মগজ, পিত্ত, শ্লেষ্মা, পূয, রক্ত, স্বেদ, মেদ, অশ্রু, লালা, নাসামল, লসিকা ও মূত্র আছে। ভন্তে, এই অনুস্মৃতির বিষয় এরূপে ভাবিত, বহুলীকৃত হলে তা কামরাগ প্রহাণের জন্য চালিত হয়।

পুনশ্চ, ভন্তে, ভিক্ষু শ্মশানে পরিত্যক্ত এক দিনের মৃত, দুই দিনের মৃত, তিন দিনের মৃত, স্ফীত, নীল, পূযপূর্ণদেহ দেখেন। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য।

যেমন তিনি আরও দেখতে পান, শ্মশানে পরিত্যক্ত দেহকে কাক, কুলাল বা শ্যেন পাখি, গৃধ্র, কুকুর, শৃগাল প্রভৃতি প্রাণী ভক্ষণ করছে। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য।

যেমন, তিনি আরও দেখতে পান, শ্মশানে পরিত্যক্ত দেহ অস্থিশৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত, রক্ত-মাংসে যুক্ত এবং স্নায়ু দ্বারা আবদ্ধ। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য।

যেমন, তিনি আরও দেখতে পান, শ্মশানে পরিত্যক্ত দেহ অস্থিশৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত, মাংসহীন শুধু রক্তমাখা ও স্নায়ুতে বদ্ধ। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য।

যেমন, তিনি আরও দেখতে পান, শ্মশানে পরিত্যক্ত দেহ অস্থিশৃঙ্খল, রক্ত-মাংসহীন শুধু স্নায়ু বদ্ধ। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য।

যেমন, তিনি আরও দেখতে পান, শ্মশানে পরিত্যক্ত দেহ চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন অস্থিপুঞ্জ, এক স্থানে হস্তাস্থি, অন্য স্থানে কটি-অস্থি, অন্য স্থানে পঞ্জরাস্থি, এক স্থানে মেরুদণ্ড অস্থি, অন্য স্থানে স্কন্ধ-অস্থি, এক স্থানে গ্রীবাস্থি, অন্য স্থানে চোয়াল-অস্থি, এক স্থানে দন্ত-অস্থি, অন্য স্থানে মাথার খুলি। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য।

যেমন, তিনি আরও শ্মশানে পরিত্যক্ত দেহ দেখতে পান, তা শ্বেত, শঙ্খবর্ণ সদৃশ, বর্ষাধিকের পুঞ্জীভূত, গলিত, চূর্ণীকৃত অস্থিপুঞ্জ। তখন তিনি ওই দেহকে স্বীয় দেহের সাথে তুলনা করে চিন্তা করেন : ‘এই দেহও ওইরূপ ধর্মবিশিষ্ট, ওইরূপ পরিণামী, ইহাও ওই নিয়মের অনতিক্রম্য। ভন্তে, তা আমিত্বরূপ মানের মূলোৎপাটনের জন্য চালিত হয়।

পুনশ্চ, ভন্তে, ভিক্ষু সর্ববিধ দৈহিক সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করে, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য (মনের হর্ষ-বিষাদ) অস্তমিত করে, না দুঃখ-না সুখ, উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করে অবস্থান করেন। ভন্তে, এই অনুস্মৃতির বিষয় এরূপে ভাবিত, বহুলীকৃত হলে তা নানাধাতু উপলব্ধির জন্য সংবর্তিত হয়। ভন্তে, এই পাঁচ প্রকার হচ্ছে অনুস্মৃতির বিষয়।”

“সাধু, আনন্দ, সাধু, তাহলে আনন্দ, এই ষষ্ঠ অনুস্মৃতির বিষয়টিও ধারণ কর। এক্ষেত্রে আনন্দ, ভিক্ষু স্মৃতিমান হয়ে অগ্রসর হয়, স্মৃতিমান হয়েই পশ্চাদ্ধাবন করে। সে স্মৃতিমান হয়েই দাঁড়ায়, উপবেশন করে, শয্যা প্রস্তুত করে এবং স্মৃতিমান হয়েই কর্মাদিতে মনোযোগ স্থাপন করে। আনন্দ, এই অনুস্মৃতির বিষয় এরূপে ভাবিত, বহুলীকৃত হলে তা স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞানতার জন্য চালিত হয়।”

উদায়ী সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [০]