“হে ভিক্ষুগণ, ছয়টি ধর্মে সমৃদ্ধ হলে ভিক্ষু আহ্বানযোগ্য, আতিথেয়তা লাভের যোগ্য, দক্ষিণার যোগ্য, শ্রদ্ধাঞ্জলি লাভের যোগ্য বা পূজার যোগ্য এবং জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র হয়। সেই ছয় প্রকার বিষয় কী কী? যথা :
এক্ষেত্রে, ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু নানাবিধ ঋদ্ধি লাভ করে; যথা : এক হয়েও বহুসংখ্যক হয়, বহু হয়ে পুনঃ একজন হয়, আবির্ভাব, তিরোভাব (অন্তর্ধান) করে; দেয়াল, প্রাকার বা প্রাচীর এবং পর্বতে আকাশের ন্যায় অসংলগ্নভাবে গমন করে; মাটিতেও জলের ন্যায় ভাসে ও ডুবে, মাটির ন্যায় জলে অনার্দ্রভাবে গমন করে; পক্ষীর ন্যায় আকাশে পর্যাঙ্কাবদ্ধ (বীরাসন) হয়ে ভ্রমণ করে, এরূপ মহাঋদ্ধিসম্পন্ন ও মহানুভবসম্পন্ন চন্দ্র-সূর্যকে হস্ত দ্বারা স্পর্শ ও পরিমর্দন করে এবং যতদূর ব্রহ্মলোক রয়েছে ততদূর আপন কায়ে বশীভূত করে। সে বিশুদ্ধ, অমানুষিক, দিব্যকর্ণ দ্বারা দূরবর্তী ও সমীপস্থ দিব্য ও মনুষ্য উভয় শব্দ শ্রবণ করে। সে নিজ চিত্ত দ্বারা অপরসত্ত্ব ও ব্যক্তিদের চিত্ত স্বচিত্তে পরীক্ষা করে জানে, সরাগ-চিত্তকে (কামলালসাপূর্ণ চিত্ত) সরাগ-চিত্ত হিসেবে জানে, বীতরাগ (কামলালসাহীন) চিত্তকে বীতরাগ-চিত্ত হিসেবে জানে, সদ্বেষ-চিত্তকে সদ্বেষ-চিত্ত হিসেবে জানে, বীতদ্বেষ (দ্বেষহীন) চিত্তকে বীতদ্বেষ-চিত্ত হিসেবে জানে, সমোহ (মোহাচ্ছন্ন) চিত্তকে সমোহ-চিত্ত হিসেবে জানে, বীতমোহ (মোহহীন) চিত্তকে বীতমোহ-চিত্ত হিসেবে জানে, বিক্ষিপ্ত-চিত্তকে বিক্ষিপ্ত-চিত্ত হিসেবে জানে, সংক্ষিপ্ত (একাগ্রচিত্ত) চিত্তকে সংক্ষিপ্ত-চিত্ত হিসেবে জানে, মহদ্গত বা অত্যুচ্চ চিত্তকে মহদ্গত-চিত্ত হিসেবে জানে, অমহদ্গত-চিত্তকে অমহদ্গত-চিত্ত হিসেবে জানে, সউত্তর (উচ্চতর) চিত্তকে সউত্তর-চিত্ত হিসেবে জানে, অনুত্তর (অতুল্য) চিত্তকে অনুত্তর-চিত্ত হিসেবে জানে, সমাহিত-চিত্তকে সমাহিত-চিত্তরূপে জানে এবং অসমাহিত-চিত্তকে অসমাহিত-চিত্তরূপে জানে, বিমুক্তচিত্তকে বিমুক্তচিত্তরূপে জানে এবং অবিমুক্তচিত্তকে অবিমুক্তচিত্তরূপে জানে। সে অনেক পূর্বনিবাস অনুস্মরণ করে; যেমন : ‘এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম, চার জন্ম, পাঁচ জন্ম, দশ জন্ম, বিশ জন্ম, ত্রিশ জন্ম, চল্লিশ জন্ম, পঞ্চাশ জন্ম, শত জন্ম, সহস্র জন্ম, শত-সহস্র (লক্ষ) জন্ম, এমনকি বহু সংবর্ত কল্প, বহু বিবর্ত কল্প, ও বহু সংবর্ত-বিবর্ত কল্পে অমুক জন্মে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এইরূপ আহার, এইরূপ ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ ছিল আয়ু। সেখান হতে চ্যুত হয়ে ওই স্থানে জন্মগ্রহণ করেছি। সেখানেও এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এইরূপ আহার, এইরূপ ছিল সুখ-দুঃখ ভোগ, এই পরিমাণ ছিল আয়ু। আবার সেই স্থান হতে চ্যুত হয়ে এখানে জন্ম হয়েছি।’ এই প্রকারে আকার ও গতিসহ বহুবিধ পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করে। সে বিশুদ্ধ, লোকাতীত দিব্যচক্ষুর দ্বারা হীন-প্রণীত, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগত-দুর্গত সত্ত্বদের চ্যুতির সময় ও উৎপত্তির সময় দেখতে পায়। সে তাদের এরূপে জানতে পারে যে, ‘এই সকল সত্ত্বগণ কায়, বাক্য ও মনোদুশ্চরিত্র-সমন্বিত, আর্যগণের নিন্দুক, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন, মিথ্যাদৃষ্টিসম্ভূত কর্ম করার দরুন দেহান্তে বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়েছেন। পক্ষান্তরে, এই সকল সত্ত্বগণ কায়, বাক্য ও মনোসুচরিত-সমন্বিত, আর্যগণের প্রশংসাকারী, সম্যক দৃষ্টিপরায়ণ, সম্যক দৃষ্টিজাত কর্ম সম্পাদন করার ফলে কায়ভেদে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়েছেন। স্ব স্ব কর্মানুসারে গতিপ্রাপ্ত, হীনোৎকৃষ্ট, সুবর্ণ-দুর্বর্ণ, সুগত-দুর্গত সত্ত্বদের চ্যুতি ও উৎপত্তির সময় বিশুদ্ধ, লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা সে প্রকৃষ্টরূপে জানে। সে আসবসমূহের ক্ষয়ে অনাসব এবং ইহজীবনেই স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা চিত্তবিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তি প্রত্যক্ষ করে, প্রাপ্ত হয়ে অবস্থান করে।
ভিক্ষুগণ, এই ছয়টি ধর্মে সমৃদ্ধ হলে ভিক্ষু আহ্বানযোগ্য, আতিথেয়তা লাভের যোগ্য, দক্ষিণার যোগ্য, অঞ্জলিকরণীয় বা পূজার যোগ্য এবং জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পুণ্যক্ষেত্র হয়।”
দ্বিতীয় আহ্বানীয় সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [০]