লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [১৪]

দ্বিতীয় অগ্নি সূত্র

একসময় ভগবান শ্রাবস্তীর জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের বিহারে অবস্থান করতেছিলেন। সে সময় উগ্গতসরীর ব্রাহ্মণের উদ্দেশ্যে এক মহাযজ্ঞ প্রস্তুত হচ্ছিল। যজ্ঞের জন্য পঞ্চশত ষাঁড়, পঞ্চশত এঁড়ে বাছুর, পঞ্চশত বাক্‌না বাছুর, পঞ্চশত ছাগল, পঞ্চশত মেষ যজ্ঞ স্তম্ভের নিকট আনিত হলো। অতঃপর উগ্গতসরীর ব্রাহ্মণ ভগবান যেখানে ছিলেন তথায় উপস্থিত হন, উপস্থিত হয়ে ভগবানের সাথে প্রাথমিক কুশল বিনিময় করেন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্ভাষণ সমাপ্ত করে তিনি এক প্রান্তে উপবেশন করেন। এক প্রান্তে উপবিষ্ট উগ্গতসরীর ব্রাহ্মণ ভগবানকে এরূপ বললেন, “ভবৎ গৌতম, আমি এরূপ শুনেছি, অগ্নি স্থাপন এবং যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলন মহাফল মহাপুণ্য প্রদায়ক।” “হে ব্রাহ্মণ, আমাকর্তৃকও এরূপ শ্রুত হয়েছে, অগ্নি স্থাপন এবং যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলন মহাফল ও মহাপুণ্য দায়ক।” দ্বিতীয়বার ও তৃতীয়বারও উগ্গতসরীর ব্রাহ্মণ ভগবানকে বললেন, ভবৎ গৌতম, আমা দ্বারা শ্রুত হয়েছে, অগ্নি স্থাপন ও যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলন মহাফল, মহাপুণ্য প্রদায়ক।” “ব্রাহ্মণ, আমা দ্বারাও এরূপ শ্রুত, অগ্নি স্থাপন ও যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলন মহাফল, মহাপুণ্যদায়ক।” “ভবৎ গৌতম, এটা আমাদিগকে একত্রিত করেছে, এমনকি ভবৎ গৌতম ও আমাদিগকেও; হ্যাঁ, সবার সাথে সবাইকে।”

এরূপ উক্ত হলে শ্রদ্ধেয় আনন্দ উগ্গতসরীর ব্রাহ্মণকে এরূপ বললেন, “বাস্তবিকই হে ব্রাহ্মণ, ভগবানকে এরূপ জিজ্ঞাসা করা অনুচিত-ভবৎ গৌতম, আমাকর্তৃক এরূপ শ্রুত, “অগ্নি স্থাপন ও যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলন মহাফল, মহাপুণ্যদায়ক।” হে ব্রাহ্মণ, তথাগতগণ এরূপ জিজ্ঞাসিতব্য : “ভন্তে, আমি অগ্নি স্থাপনে উৎসুক, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনে উৎসুক, ভন্তে ভগবন, আমাকে উপদেশ প্রদান করুন, ভন্তে ভগবন, আমাকে অনুশাসন করুন যদ্বারা আমার দীর্ঘকালের হিত ও সুখের কারণ হয়!”

তৎপর উগ্গতসরীর ব্রাহ্মণ ভগবানকে বলেন, “ভবৎ গৌতম, আমি অগ্নি স্থাপনে, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনে উৎসুক, ভবৎ গৌতম, অনুগ্রহপূর্বক আমাকে উপদেশ প্রদান করুন, ভবৎ গৌতম, আমাকে অনুশাসন করুন যদ্বারা আমার দীর্ঘকাল হিত ও সুখের কারণ হয়।” “হে ব্রাহ্মণ, অগ্নি স্থাপনের পূর্বেই অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারী তিনটি অস্ত্র স্থাপন করে যা অকুশল, দুঃখ উদ্রেককারী, দুঃখবিপাকী। তিন কী কী?

কায়-অস্ত্র, বাক্‌-অস্ত্র, মন-অস্ত্র। হে ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের পূর্বেও অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারীর এরূপ চিত্ত উৎপন্ন হয়, “যজ্ঞে এত সংখ্যক ষাঁড়, এত সংখ্যক এঁড়ে বাছুর, এত সংখ্যক বাক্‌না বাছুর, এত সংখ্যক ছাগল, এত সংখ্যক মেষ হত্যা করা হোক।” সে “পুণ্য করছি” ভেবে অপুণ্যই করে, “কুশল করছি” এ ভেবে অকুশলই সম্পাদন করে, “সুগতি মার্গ পর্যবেক্ষণ (অনুসন্ধান) করছি” ভেবে দুর্গতি মার্গেরই পর্যবেক্ষণ করে। হে ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের পূর্বেই অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারী এই প্রথম মনো অস্ত্র স্থাপন করে যা অকুশল, দুঃখ উদ্রেককর, দুঃখ বিপাকী।

পুনঃ হে ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের পূর্বেই অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারী এরূপ বাক্য ভাষণ করে : “যজ্ঞে এত সংখ্যক ষাঁড়, এত সংখ্যক এঁড়ে বাছুর, এত সংখ্যক বাক্‌না বাছুর, এত সংখ্যক ছাগল, এত সংখ্যক মেষ হত্যা করুন।” সে “পুণ্য করছি” ভেবে অপুণ্যই করে, “কুশল করছি” ভেবে অকুশলই সম্পাদন করে, “সুগতি মার্গ অনুসন্ধান করছি” ভেবে দুর্গতি মার্গেরই অনুসন্ধান করে। হে ব্রাহ্মণ, যজ্ঞের পূর্বেই অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারী এই দ্বিতীয় বাক্‌ অস্ত্র স্থাপন করে যা অকুশল, দুঃখ সৃষ্টিকারী, দুঃখবিপাকী।

পুনঃ হে ব্রাহ্মণ, অগ্নি স্থাপন, যজ্ঞস্তম্ভ স্থাপনের মাধ্যমে যজ্ঞ সম্পাদনের পূর্বে যজ্ঞকারী নিজে প্রথমে এ বলে কাজটি আরম্ভ করে : “যজ্ঞের জন্য এত সংখ্যক ষাঁড়, এত সংখ্যক এঁড়ে বাছুর, এত সংখ্যক বাক্‌না বাছুর, এত সংখ্যক ছাগল, এত সংখ্যক মেষ হত্যা করুন।” সে “পুণ্য করছি” ভেবে অপুণ্যই করে, “কুশল করছি” ভেবে অকুশলই সম্পাদন করে” “সুগতিমার্গ অনুসন্ধান করছি” ভেবে দুর্গতি মার্গই অনুসন্ধান করে। হে ব্রাহ্মণ, যজ্ঞ সম্পাদনের পূর্বেই অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারী এই তৃতীয় কায়-অস্ত্র স্থাপন করে যা অকুশল, দুঃখ উদ্রেককারী, দুঃখবিপাকী।

হে ব্রাহ্মণ, যজ্ঞ সম্পাদনের পূর্বে অগ্নি স্থাপনকারী, যজ্ঞস্তম্ভ উত্তোলনকারী এই তিনটি অস্ত্র স্থাপন করে যা অকুশল, দুঃখ সৃষ্টিকারী, দুঃখবিপাকী।

হে ব্রাহ্মণ, এই ত্রি-অগ্নি পরিত্যাগ যোগ্য, বর্জনযোগ্য, সেবন অনুচিত। ত্রি কী কী?

রাগাগ্নি, দ্বেষাগ্নি, মোহাগ্নি। হে ব্রাহ্মণ, রাগাগ্নি, দ্বেষাগ্নি, মোহাগ্নি কেন পরিত্যাগ যোগ্য, বর্জনযোগ্য, সেবন অনুচিত?

হে ব্রাহ্মণ, মোহিত, কামাসক্ত, কামাবিষ্ট চিত্ত কায়ে দুরাচরণ করে, বাক্যদ্বারে দুরাচরণ করে, মনোদ্বারে দুরাচরণ করে। সে কায়িক দুরাচরণ, বাচনিক দুরাচরণ, মনোদ্বারে দুরাচরণ করে” কায়ভেদে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নরকে পুনর্জন্ম লাভ করে। সে কারণে রাগাগ্নি (কামাগ্নি) পরিত্যাগ, বর্জন করা, সেবন না করা উচিত। হে ব্রাহ্মণ, দোষাগ্নি কেন ত্যাগ করা, বর্জন করা, সেবন না করা উচিত?

হে ব্রাহ্মণ, দুষ্ট, দোষাভিভূত, দোষাবিষ্ট চিত্ত কায়ে দুরাচরণ করে, বাক্যদ্বারে দুরাচরণ করে, মনোদ্বারে দুরাচরণ করে। সে কায়িক, বাচনিক, মনো দ্বারে দুরাচরণ করার পর কায়ভেদে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নরকে পুনর্জন্ম লাভ করে। সে কারণে দোষাগ্নি পরিত্যাগ, বর্জন, সেবন না করা উচিত। হে ব্রাহ্মণ, মোহাগ্নি কেন পরিত্যাগ, বর্জন করা, সেবন না করা উচিত?

মূঢ়, হে ব্রাহ্মণ, মোহাভিভূত, মোহাবিষ্ট চিত্ত কায়িক, বাচনিক, মানসিক দুরাচরণ করে। সে কায়িক, বাচনিক, মানসিক দুরাচরণ করে অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে পুনর্জন্ম লাভ করে। সে কারণে মোহাগ্নি বর্জন, পরিহার, সেবন না করা উচিত।

হে ব্রাহ্মণ, এই ত্রি-অগ্নি পরিহার, বর্জন, সেবন না করা উচিত।

হে ব্রাহ্মণ, এই ত্রি-অগ্নি সৎকার, গৌরবকৃত, মানিত, পূজিত হলে সম্যক সুখ আনয়ন করে। ত্রি কী কী?

আহুনেয়্য (আহ্বানযোগ্য) অগ্নি, গৃহপতি অগ্নি, দক্ষিণাযোগ্য অগ্নি।

হে ব্রাহ্মণ, আহুনেয়্য (আহ্বানযোগ্য শ্রদ্ধেয়) অগ্নি কিরূপ?

এক্ষেত্রে, হে ব্রাহ্মণ, একজন লোকের কথা ভাবুন যে তার মাতা বা পিতাকে সম্মান করে। হে ব্রাহ্মণ, এটাকে বলা হয় শ্রদ্ধাযোগ্য অগ্নি। তার কারণ কী? এটা হতে এই শ্রদ্ধা এসেছে। সে কারণে হে ব্রাহ্মণ, আহ্বান যোগ্য অগ্নি সৎকার, গৌরব, মানিত, পূজিত হলে সম্যক সুখ আনয়ন করে। এবং গৃহপতি অগ্নি কী হে ব্রাহ্মণ?

এক্ষেত্রে, হে ব্রাহ্মণ, একজন লোক তার পুত্র, দার, দাস, দূত কর্মকার (কাজের লোক) কে মান্য করে। এটাকে বলা হয় গৃহপতি অগ্নি। সে কারণে গৃহপতি অগ্নি সৎকার, গৌরব, মানিত, পূজিত হলে যথার্থ সুখ আনয়ন করে। হে ব্রাহ্মণ, দক্ষিণাযোগ্য অগ্নি কী?

এক্ষেত্রে, হে ব্রাহ্মণ, যে সমস্ত শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মান, প্রমাদ-বিরত, যারা ক্ষান্তিপরায়ণ, বিনীত, যারা নিজকে দমন করে, শান্ত করে, নিবৃত্ত কর্তেএকেই বলা হয় দক্ষিণাযোগ্য অগ্নি। সে কারণে দান যোগ্য অগ্নি সৎকার, গৌরব, মানিত, পূজিত হলে নিশ্চিত সুখ আনয়ন করে।

হে ব্রাহ্মণ, এই ত্রিবিধ অগ্নি সৎকার, গৌরব, মানিত, পূজিত হলে সম্যক সুখ আনয়ন করে।

হে ব্রাহ্মণ, এই কাষ্ঠাগ্নি মাঝে মাঝে প্রজ্বলিত করা উচিত। মাঝে মাঝে যত্ন নেওয়া উচিত, মাঝে মাঝে নির্বাপন করা উচিত, মাঝে মাঝে নিক্ষেপ করা উচিত।”

এরূপ উক্ত হলে ব্রাহ্মণ উগ্গতসরীর ভগবানকে এরূপ বলেন, “আশ্চর্য, ভবৎ গৌতম অদ্ভুত! ভবৎ গৌতম, আজ হতে আমাকে আপনার শরণাগত উপাসক হিসাবে গ্রহণ করুন। আমি এই পঞ্চশত ষাঁড় মুক্ত করে দিচ্ছি। ভবৎ গৌতম, আমি তাদিগকে জীবন দান দিচ্ছি। আমি এসব এঁড়ে বাছুর, বাক্‌না বাছুর, ছাগ, মেষকে মুক্ত করে দিচ্ছি। আমি তাদেরকে জীবন দান করছি। তারা সবুজ ঘাস গ্রহণ করুক, তারা শীতল জল পান করুক, তাদের উপর মুক্ত বাতাস বয়ে যাক!”

ব্যাখ্যা [০]