৪৮১. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। একসময় ভগবান নালন্দায় পাবারিকের আম্রবনে অবস্থান করিতেছিলেন। ওই সময় গৃহপতি পুত্র কেবদ্ধ ভগবানের সমীপে উপগত হইয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন। পরে কেবদ্ধ ভগবানকে বলিলেন :
“ভন্তে, এই নালন্দা সমৃদ্ধিশালী, ঐশ্বর্য এবং ভগবানে অনুরক্ত জনবহুল। ভগবান কৃপাপূর্বক অলৌকিক ঋদ্ধি প্রদর্শনের জন্য কোনো ভিক্ষুকে আদেশ করুন। এইরূপ করিলে নালন্দা অধিকতররূপে ভগবানের প্রতি অনুরক্ত হইবে।”
এইরূপ উক্ত হইলে ভগবান গৃহপতিপুত্র কেবদ্ধকে বলিলেন, “কেবদ্ধ আমি ভিক্ষুদিগকে এরূপ ধর্মোপদেশ দিই না- “ভিক্ষুগণ, তোমরা শুভ্র বসন পরিহিত গৃহীদিগের নিকট ঋদ্ধি প্রদর্শন করো।”
৪৮২. দ্বিতীয়বার কেবদ্ধ ভগবানকে বলিলেন :
“ভগবানের বিরক্তির উৎপাদন আমার ইচ্ছা নহে, কিন্তু আমি বলিতেছি, “এই নালন্দা সমৃদ্ধিশালী… অনুরক্ত হইবে।”
দ্বিতীয়বারও ভগবান কেবদ্ধকে পূর্বের ন্যায় উত্তর দিলেন।
তৃতীয়বার কেবদ্ধ ভগবানকে পূর্বের ন্যায় অনুরোধ করিলেন।
৪৮৩. কেবদ্ধ, ত্রিবিধ প্রাতিহার্য আছে যাহা স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া আমি প্রকাশ করিয়াছি। ওই তিন প্রাতিহার্য কী কী? ঋদ্ধি প্রাতিহার্য, আদেশনা প্রাতিহার্য, অনুশাসনী প্রাতিহার্য।
৪৮৪. কেবদ্ধ, ঋদ্ধি প্রাতিহার্য কী? ভিক্ষু অনেকবিধ ঋদ্ধিসম্পন্ন হন-এক হইয়াও বহুতে পরিণত হন, বহু হইয়াও একে পরিণত হন। তাঁহার আবির্ভাব ও তিরোভাব হয়, আকাশে গমনের ন্যায় তিনি ভিত্তি, প্রাকার ও পর্বতের অপর পারে অবাধে গমন করেন; জলে উন্মুজ্জন নিমজ্জনের ন্যায় ভূমিতেও উন্মুজ্জন-নিমজ্জন করেন; ভূমিতে গমনের ন্যায় জলতল ভেদ না করিয়া জলের উপর গমন করেন, পর্যঙ্কাবদ্ধ হইয়া পক্ষীর ন্যায় আকাশে ভ্রমণ করেন, মহাপরাক্রমশালী মহাবল চন্দ্র-সূর্যকে হস্ত দ্বারা স্পর্শ করেন, পরিমর্দন করেন, সশরীরে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত গমন করেন। কোনো শ্রদ্ধাবান প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি ভিক্ষুকে ওই সকল ঋদ্ধি প্রদর্শন করিতে দেখিলেন।
সেই শ্রদ্ধাবান প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি ঘটনাটি কোনো এক শ্রদ্ধাহীন প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির নিকট প্রকাশ করিলেন :
“আশ্চর্য, অদ্ভুত, শ্রমণের এই মহাঋদ্ধি, মহাবল। আমি সত্যই সেই ভিক্ষুকে বহুবিধ ঋদ্ধিসম্পাদন করিতে দেখিলাম; যথা : এক হওয়া ও বহুতে পরিণত হওয়া,… সশরীরে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত গমন।” শ্রদ্ধাহীন অপ্রসন্নচিত্ত ব্যক্তিটি তাহাকে বলিল, “গান্ধারী নামে এক বিদ্যা আছে। উহারই সাহায্যে ভিক্ষু বহুবিধ ঋদ্ধি সম্পাদন করেন। এক হইয়াও বহুতে পরিণত হন… সশরীরে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত গমন করেন।” কেবদ্ধ, তুমি কীরূপ মনে করো? সেই শ্রদ্ধাহীন অপ্রসন্নচিত্ত ব্যক্তিটি শ্রদ্ধাবান প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তিকে কি এইরূপ বলিতে পারে না?”
“ভন্তে, তাহা সম্ভব।”
“কেবদ্ধ, ঋদ্ধি প্রাতিহার্যের এই দোষ দেখিয়া আমি উহাতে বিরক্ত, উহা আমার নিকট লজ্জা ও ঘৃণার বস্তু।
৪৮৫. “কেবদ্ধ, আদেশনা প্রাতিহার্য কী? ভিক্ষু সত্ত্বগণের, মনুষ্যগণের, চিত্ত, চেতসিক, বিতর্ক এবং বিচার উদ্ঘাটন করেন, “এইরূপ তোমার মন, এই এই বিষয়ে তোমার মন মগ্ন, তোমার চিত্ত এই প্রকার।” কোনো শ্রদ্ধাবান প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি ভিক্ষুকে ওই ঋদ্ধি প্রদর্শন করিতে দেখিলেন।
“সেই শ্রদ্ধাবান প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তি ঘটনাটি কোনো এক শ্রদ্ধাহীন অপ্রসন্নচিত্ত ব্যক্তির নিকট প্রকাশ করিলেন, “আশ্চর্য, অদ্ভুত, শ্রমণের এই মহাঋদ্ধি, মহাবল! আমি সত্যই সেই ভিক্ষুকে সত্ত্বগণের মনুষ্যগণের চিত্ত, চেতসিক, বিতর্ক এবং বিচার উদ্ঘাটন করিতে দেখিলাম, “এইরূপ তোমার মন, এই এই বিষয়ে তোমার মন মগ্ন, তোমার চিত্ত এই প্রকার।” শ্রদ্ধাহীন অপ্রসন্নচিত্ত ব্যক্তিটি তাঁহাকে বলিল, “মণিক নামে এক বিদ্যা আছে। উহারই সাহায্যে ভিক্ষু সত্ত্বগণের মনুষ্যগণের চিত্ত, চেতসিক… এইরূপ তোমার মন, এই এই বিষয়ে তোমার মন মগ্ন, তোমার চিত্ত এই প্রকার।” কেবদ্ধ, তুমি কীরূপ মনে করো? সেই শ্রদ্ধাহীন অপ্রসন্নচিত্ত ব্যক্তিটি শ্রদ্ধাবান প্রসন্নচিত্ত ব্যক্তিকে কি এইরূপ বলিতে পারে না?
“ভন্তে, তাহা সম্ভব।”
“কেবদ্ধ, আদেশনা প্রাতিহার্যের এই দোষ দেখিয়া আমি উহাতে বিরক্ত, উহা আমার নিকট লজ্জা ও ঘৃণার বস্তু।
৪৮৬. “কেবদ্ধ, অনুশাসনী প্রাতিহার্য কী? ভিক্ষু এইরূপ অনুশাসন করেন, “এইরূপ বিতর্ক করিবে, এইরূপ বিতর্ক করিবে না; এইরূপ নমস্কার করিবে, এরূপ নমস্কার করিবে না, ইহা পরিহার করিবে, ইহা স্বীকার করিবে।” কেবদ্ধ, ইহাই অনুশাসনী প্রাতিহার্য।
“পুনশ্চ, কেবদ্ধ, জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ… ইত্যাদি… [শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে]।
“আপনাতে এই পঞ্চ নীবরণ প্রহীন… দেখিয়া অব্যাপ্ত থাকে না। [শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।]।
১১. “কেবদ্ধ, যেরূপ কোনো দক্ষ স্নাপক… অব্যাপ্ত থাকে না। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।) কেবদ্ধ ইহাও অনুশাসনী প্রাতিহার্য কথিত হয়।
১২…. চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করেন… । (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।) কেবদ্ধ, ইহাও অনুশাসনী প্রাতিহার্য কথিত হয়।
১৩. “এইরূপে চিত্তের সেই সমাহিত, পরিশুদ্ধ… চিত্তকে নমিত করেন… (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।) কেবদ্ধ, ইহাও অনুশাসনী প্রাতিহার্য কথিত হয়।
১৪. “… পুনর্জন্ম আর নাই, ইহা তিনি জানিতে পারেন। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।) ইহাও অনুশাসনী প্রাতিহার্য কথিত হয়।
কেবদ্ধ, এই তিন প্রাতিহার্য আমি স্বয়ং জানিয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া প্রকাশ করিয়াছি।
৪৮৭. কেবদ্ধ, পূর্বে এই ভিক্ষুসংঘেই জনৈক ভিক্ষুর চিত্তে এইরূপ পরিবিতর্কের উদয় হইয়াছিল; “চারি মহাভূত : পৃথিবীধাতু, আপধাতু, তেজধাতু, বায়ধাতু, কোথাও নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয়?” অনন্তর কেবদ্ধ, সেই ভিক্ষু এরূপ সমাধি প্রাপ্ত হইলেন যে চিত্তের ওই সমাহিত অবস্থায় দেবলোকে গমনের মার্গ তাঁহার নিকট প্রকট হইল।
৪৮৮. “তৎপরে, কেবদ্ধ, ভিক্ষু চাতুর্মহারাজিক দেবগণের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাদিগকে বলিলেন, “আবুসো, চারি মহাভূত : পৃথিবীধাতু, আপধাতু, তেজধাতু, বায়ুধাতু, কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয়?”
“কেবদ্ধ, এইরূপ কথিত হইলে চাতুর্মহারাজিক দেবগণ সেই ভিক্ষুকে বলিলেন, “হে ভিক্ষু ওই চারি মহাভূত কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয় তাহা আমরাও জানি না। কিন্তু আমাদিগের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উন্নত চারি মহারাজা আছেন। তাঁহারা উক্ত চারি মহাভূতের নিঃশেষ নিরোধের স্থান অবগত হইবেন।”
৪৮৯. “তৎপরে, কেবদ্ধ, ভিক্ষু সেই চারি মহারাজার নিকট গমনপূর্বক তাঁহাদিগকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন।
“কেবদ্ধ, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া সেই চারি মহারাজা ভিক্ষুকে বলিলেন, “হে ভিক্ষু ওই চারি মহাভূত কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয় তাহা আমরাও জানি না। কিন্তু, ভিক্ষু, ত্রয়ত্রিংশ দেবগণ আমাদিগের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। তাঁহারা উক্ত চারি মহাভূতের নিঃশেষ নিরোধের স্থান অবগত হইবেন।
৪৯০. “অনন্তর, কেবদ্ধ, ভিক্ষু ত্রয়ত্রিংশ দেবগণের নিকট গমন করিয়া তাঁহাদিগকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন :
“তাঁহারা ভিক্ষুকে বলিলেন, “হে ভিক্ষু, ওই চারি মহাভূত কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয় তাহা আমরাও জানি না। কিন্তু দেবরাজ শক্র আমাদিগের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। তিনি উক্ত চারি মহাভূতের নিঃশেষ নিরোধের স্থান অবগত হইবেন।”
৪৯১. কেবদ্ধ, তৎপরে ভিক্ষু দেবরাজ শক্রের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাকে পূর্ববিধ প্রশ্ন করিলেন। শক্রও প্রশ্নের উত্তর দানে স্বীয় অসামর্থ্য জ্ঞাপন করিয়া ভিক্ষুকে যাম দেবতাদিগের নিকট প্রেরণ করিলেন।
ভিক্ষু যাম দেবতাদিগের নিকট গমন করিয়া তাঁহাদিগকে উক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন। তাঁহারাও উত্তর দানে অসমর্থ হইয়া ভিক্ষুকে সুযাম দেবপুত্রের নিকট প্রেরণ করিলেন।
ভিক্ষু সুযামের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন করিলে তিনিও উত্তর দানে অক্ষম হইয়া ভিক্ষুকে তুষিত দেবগণের নিকট প্রেরণ করিলেন।
তদনন্তর, কেবদ্ধ, ভিক্ষু তুষিত দেবগণের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাদিগকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন করিলেন।
দেবগণ
তুষিত দেবগণও জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের উত্তর দানে অক্ষম হইয়া ভিক্ষুকে সন্তুসিত নামক দেবপুত্রের নিকট প্রেরণ করিলেন।
তৎপরে, কেবদ্ধ, ভিক্ষু সন্তুসিত দেবপুত্রের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন করিলেন। তিনি স্বীয় অক্ষমতা জ্ঞাপন করিয়া ভিক্ষুকে নির্মাণরতি দেবগণের নিকট প্রেরণ করিলেন।
ভিক্ষু নির্মাণরতি দেবগণের নিকট গমন করিয়া তাঁহাদিগকে পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন করিলেন। তাঁহারাও অপর দেবগণের ন্যায় উত্তর দানে অসমর্থ হইয়া ভিক্ষুকে সুনির্মিত নামক দেবপুত্রের নিকট প্রেরণ করিলেন।
তৎপরে ভিক্ষু সুনির্মিত দেবপুত্রের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন করিলেন। তিনিও প্রশ্নের উত্তর দানে অসমর্থ হইয়া ভিক্ষুকে পরনির্মিত বশবর্তী দেবগণের নিকট প্রেরণ করিলেন।
৪৯২. ভিক্ষু পরনির্মিত বশবর্তী দেবগণের নিকট গমনপূর্বক তথায় পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন করিলেন। তাঁহারা উত্তর দানে অক্ষম হইয়া ভিক্ষুকে বশবর্তী দেবপুত্রের নিকট প্রেরণ করিলেন।
ভিক্ষু বশবর্তী দেবপুত্রের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলেন।
বশবর্তী দেবপুত্রও স্বীয় অক্ষমতা জানাইয়া ভিক্ষুকে ব্রহ্মকায়িক দেবগণের নিকট প্রেরণ করিলেন।
৪৯৩. “অতঃপর কেবদ্ধ, সেই ভিক্ষু এরূপ সমাধি প্রাপ্ত হইলেন যে চিত্তের ওই সমাহিত অবস্থায় ব্রহ্মলোকে গমনের মার্গ তাঁহার নিকট প্রকট হইল। তৎপরে ভিক্ষু ব্রহ্মকায়িক দেবগণের নিকট গমন করিয়া তাঁহার নিকট পূর্বোক্ত প্রশ্ন করিলেন।
“সেই দেবগণ প্রশ্নের উত্তর দানে অসমর্থ হইয়া ভিক্ষুকে বলিলেন, “হে ভিক্ষু, ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, যিনি বিজয়ী, অপরাজিত, সর্বদর্শী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা, শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভক্ষ্যের শক্তিমান পিতা আছেন। তিনি আমাদের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও উন্নত। তিনি এই প্রশ্নের উত্তর দানে সক্ষম হইবেন।
“আবুসো, সেই মহাব্রহ্মা এক্ষণে কোথায়?
“হে ভিক্ষু, সেই ব্রহ্মা যে কোথায় আছেন, কেন আছেন, কোথা হইতে আসিয়াছেন, তাহা আমরাও অবগত নহি। কিন্তু, ভিক্ষু, যখন নিমিত্ত দৃষ্ট হয়, আলোকের উদ্ভব হয়, আভার বিকাশ হয়, তখন ব্রহ্মা প্রকট হইবেন। জ্ঞানলোকের উদ্ভব এবং আভার বিকাশ ব্রহ্মার প্রকাশের পূর্বলক্ষণ”
৪৯৪. তদনন্তর, কেবদ্ধ, অচিরে মহাব্রহ্মার আবির্ভাব হইল। ভিক্ষু মহাব্রহ্মার সমীপে গমনপূর্বক তাঁহাকে পূর্বোক্ত প্রশ্ন করিলেন।
৪৯৫. মহাব্রহ্মা ভিক্ষুকে বলিলেন, “হে ভিক্ষু, আমি ব্রহ্মা, মহাব্রহ্মা, বিজয়ী, অপরাজিত, সর্বদর্শী, সর্বশক্তিমান, ঈশ্বর, কর্তা, নির্মাতা শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা, ভূত ও ভক্ষ্যের শক্তিমান পিতা।”
৪৯৬. ভিক্ষু উত্তর বলিলেন, “আবুসো, আপনি যেরূপভাবে নিজের বর্ণনা করিলেন, ওই বর্ণনা আপনার প্রতি যথার্থই প্রযোজ্য কি না তাহা আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করি নাই। আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করিতেছি চারি মহাভূত কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয়?”
“মহাব্রহ্মা পুনরায় ভিক্ষুকে পূর্বেরই ন্যায় উত্তর দিলেন।
“তৃতীয়বার ভিক্ষু মহাব্রহ্মাকে পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন করিলেন।
“তদনন্তর মহাব্রহ্মা ভিক্ষুর বাহু গ্রহণপূর্বক তাঁহাকে একপ্রান্তে লইয়া গিয়া বলিলেন, “হে ভিক্ষু, ব্রহ্মকায়িক দেবগণের ধারণা যে এমন কিছুই নাই যাহা ব্রহ্মার অদৃষ্ট, অবিদিত, অসাক্ষাৎকৃত। সেই হেতু তাহাদিগের সম্মুখে আমি কিছুই কহি নাই। চারি মহাভূতের নিঃশেষ নিরোধের স্থান আমিও অবগত নহি। অতএব হে ভিক্ষু, ইহা তোমারই দোষ, তোমারই অপরাধ, যে তুমি ভগবানের নিকট না গিয়া এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপরের নিকট গমন করিয়াছ। যাও, ভগবানের নিকট গমন করিয়া এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করো, তিনি যেরূপ বলিবেন সেইরূপই গ্রহণ করিবে।”
৪৯৭. “তৎপরে, কেবদ্ধ, সেই ভিক্ষু বলবান পুরুষ যেরূপ সঙ্কুচিত বাহু প্রসারিত করেন, অথবা প্রসারিত বাহু সঙ্কুচিত করেন, সেইরূপ ব্রহ্মলোক হইতে অন্তর্হিত হইয়া আমার নিকট আবির্ভূত হইলেন এবং আমাকে অভিবাদনান্তে এক প্রান্তে উপবেশন করিলেন। পরে তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ভন্তে, এই চারি মহাভূত : পৃথিবীধাতু, আপধাতু, তেজধাতু, বায়ুধাতু, কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয়?”
কেবদ্ধ, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া আমি সেই ভিক্ষুকে বলিলাম, “হে ভিক্ষু পূর্বকালে সামুদ্রিক বণিকগণ তীরদর্শী পক্ষী সঙ্গে লইয়া পোতারোহণে সমুদ্রযাত্রা করিতেন। পোত হইতে তীরভূমি অদৃশ্য হইলে তাঁহারা তীরদর্শী পক্ষী মুক্ত করিতেন। পক্ষী পূর্বদিকে যাইতে, পশ্চিম দিকে যাইত, দক্ষিণ ও উত্তর দিকে যাইত, ঊর্ধ্ব ও অনুদিকে যাইত। যদি কোনো দিকে সে তীর দর্শন করিত, সেই দিকেই যাইত। যদি তীর দর্শন না করিত, পোতে প্রত্যাগমন করিত। এইরূপেই, ভিক্ষু, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত তুমি এই প্রশ্নের উত্তরের অনুসন্ধান করিয়া অকৃতকার্য হইয়া আমারই সমীপে আগমন করিয়াছ। প্রশ্নটি তুমি যেরূপভাবে করিয়াছ সেরূপভাবে করিতে নাই।
৪৯৮. চারি মহাভূত কোথায় নিঃশেষে নিরুদ্ধ হয় তাহা জিজ্ঞাসা না করিয়া তোমার জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল, “আপধাতু, পৃথিবীধাতু, তেজ ও বায়ুধাতু, দীর্ঘ ও হ্রস্ব, অণু ও স্থূল শুভ ও অশুভ কোথায় স্থিত হয় না? নাম ও রূপ কোথায় নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়?”
৪৯৯. উহার উত্তর এই : “যে বিজ্ঞান অনিদর্শন, অনন্ত, যাহা সর্বদিক হইতে সুগম : আপধাতু, পৃথিবীধাতু, তেজ ও বায়ুধাতু, দীর্ঘ ও হ্রস্ব, অণু ও স্থূল, শুভ অশুভ তাহাতে স্থিত হয় না; এই স্থানেই নাম ও রূপ নিঃশেষে বিলুপ্ত হয়, বিজ্ঞানের নিরোধে ইহারাও বিলুপ্ত হয়।”
ভগবান এইরূপ বলিলেন। গৃহপতিপুত্র কেবদ্ধ হৃষ্টমনা হইয়া কথিত বাক্যের অভিনন্দন করিলেন।
কেবদ্ধ সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৩]
English
Deutsch
Việt Ngữ