লোহিচ্চ সূত্র
৫০১. আমি এইরূপ শরণ করিয়াছি। এক সময়ে ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত কোশল দেশে ভ্রমণ করিতে করিতে সালবতিকায় উপস্থিত হইলেন। ওই সময় লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ সালবতিকায় বাস করিতেছিলেন। এ জনাকীর্ণ তৃণকাষ্ঠ-উদক-ধান্যসম্পন্ন স্থান রাজদায় ব্রহ্মদেয়রূপে কোশলরাজ প্রসেনজিৎ কর্তৃক ব্রাহ্মণকে প্রদত্ত হইয়াছিল।
৫০২. ওই সময়ে লোহিচ্চ ব্রাহ্মণের এইরূপ পাপদৃষ্টি উৎপন্ন হইয়াছিল, “কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ কুশলধর্ম প্রাপ্ত হইলেও উহা অপরের নিকট প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ একে অন্যের কী করিতে পারে? অপরের নিকট প্রকাশ করিলে পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করিয়া নতুন বন্ধন সৃষ্টি করার ন্যায় হইবে। সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ লোভধর্ম কহি। একে অন্যের কী করিতে পারে?”
৫০৩. লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ শুনিলেন, “শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত হইয়া কোশল দেশে ভ্রমণ করিতে করিতে পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত সালবতিকায় উপস্থিত হইয়াছেন। সেই ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, “ইনিই ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ অতুলনীয়, দম্য-পুরুষ-সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবন্ত; ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যগণকে সাক্ষাৎ দর্শনোদ্ভূত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হইয়া তিনি উপদিষ্ট করেন; তিনি ধর্মের উপদেশ দান করেন-যে ধর্মের প্রারম্ভ কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যাহা অর্থ ও শব্দসম্পদপূর্ণ সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত; তিনি বিশুদ্ধ, ব্রহ্মচর্য্য প্রকাশ করেন, তাদৃশ অর্হতের দর্শন শুভজনক।”
৫০৪. তৎপরে লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ ক্ষৌরকার ভেসিককে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “মিত্র ভেসিক, এস, শ্রমণ গৌতমের নিকট গমন করো এবং তথায় আমার নাম করিয়া তাঁহার কুশল ও ক্ষেম জিজ্ঞাসাপূর্বক আগামীকল্য ভিক্ষুসংঘের সহিত আমার অন্নগ্রহণের জন্য তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিও।”
৫০৫. ক্ষৌরকার ভেসিক “উত্তম” বলিয়া সম্মতি জ্ঞাপনপূর্বক ভগবানের নিকট গমন করিলেন এবং তথায় ভগবানকে অভিবাদনান্তে একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন। পরে তিনি ভগবানকে লোহিচ্চ ব্রাহ্মণের বার্তা জ্ঞাপন করিলেন। ভগবান মৌন রহিয়া লোহিচ্চের নিমন্ত্রণ স্বীকার করিলেন।
লোহিচ্চের ভগবানকে নিমন্ত্রণ
৫০৬. তদনন্তর ক্ষৌরকার ভেষিক ভগবানের সম্মতি জ্ঞাত হইয়া আসন হইতে উত্থানপূর্বক ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া লোহিচ্চ ব্রাহ্মণের সমীপে আগত হইয়া তাঁহাকে বলিলেন, তাঁহার বার্তা ভগবানের নিকট জ্ঞাপন করা হইয়াছে এবং ভগবান নিমন্ত্রণ গ্রহণ করিয়াছেন।
৫০৭. অনন্তর লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ সেই রাত্রির অবসানে স্বীয় আবাসে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও ভোজ্য প্রস্তুত করিয়া ক্ষৌরকার ভেসিককে বলিলেন :
“শ্রমণ গৌতমের নিকট গিয়া “অন্ন প্রস্তুত” বলিয়া তাঁহাকে ভোজনের কাল নিবেদন করো।”
ক্ষৌরকার ভেষক সম্মতিসূচক “উত্তম” বলিয়া ভগবানের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইলেন এবং পরে ভগবানকে ভোজনের কাল নিবেদন করিলেন। তৎপরে ভগবান পূর্বাহ্নের বস্ত্র পরিহিত হইয়া পাত্র ও চীবর গ্রহণপূর্বক ভিক্ষুসংঘের সহিত সালবতিকায় গমন করিলেন।
৫০৮. গমন সময়ে ক্ষৌরকার ভেষিক ভগবানের পশ্চাৎ অনুসরণ করিতেছিলেন। তিনি ভগবানকে বলিলেন :
লোহিচ্চ ব্রাহ্মণের এইরূপ পাপদৃষ্টি উৎপন্ন হইয়াছে, “কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ কুশলধর্ম প্রাপ্ত হইলেও উহা অপরের নিকট প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ একে অন্যের কী করিতে পারে? অপরের নিকট প্রকাশ করিলে পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করিয়া নতুন বন্ধন সৃষ্টি করার ন্যায় হইবে। সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ-লোভধর্ম কহি। একে অন্যের কী করিতে পারে?” ভগবান ব্রাহ্মণকে অনুগ্রহপূর্বক এই পাপদৃষ্টি হইতে মুক্ত করুন।
“হইতে পারে, ভেসিক, তাহা হইতে পারে।”
৫০৯. তৎপরে ভগবান লোহিচ্চ ব্রাহ্মণের আবাসে উপনীত হইয়া নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। লোহিচ্চ উত্তম উত্তম খাদ্য ও ভোজ্য স্বহস্তে পরিবেশনপূর্বক বুদ্ধপ্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে তৃপ্ত করিলেন। তদনন্তর লোহিচ্চ ভগবান আহারান্তে পাত্র হইতে হস্ত উপনীত করিলে এক নিম্ন আসন গ্রহণপূর্বক একান্তে উপবেশন করিলেন। ভগবান তাঁহাকে বলিলেন :
লোহিচ্চকে বুদ্ধের উপদেশ দান
“লোহিচ্চ, সত্যই কি তোমার এইরূপ পাপদৃষ্টি উৎপন্ন হইয়াছে : [এই স্থলে ভেসিক কর্তৃক কথিত দৃষ্টি পুনর্বক্ত হইয়াছে]?
“সত্য, গৌতম।”
লোহিচ্চ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি কি সালবতিকার অধিবাসী নহ?”
“গৌতম, আমি তাহাই বটে।”
“লোহিচ্চ, যদি কেহ এরূপ কহে, “লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ সালবতিকার প্রতিষ্ঠিত, সালবতিকায় উৎপন্ন দ্রব্য লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ একাকী ভোগ করিবে, অন্য কাহাকেও দিবে না,” তাহা হইলে যে ওইরূপ বলিবে সে যাহারা তোমার পোষ্য তাহাদের অনিষ্টকারী হইবে, অথবা না?
“হে গৌতম, সে অনিষ্টকারী হইবে।”
“অনিষ্টকারী হইলে সে তাহাদের হিতানুকম্পী হইবে অথবা অহিতানুকম্পী?”
“অহিতানুকম্পী হইবে।”
“অহিতানুকম্পী চিত্ত তাহাদের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন হইবে, অথবা শত্রুভাবাপন্ন?”
“শত্রুভাবাপন্ন হইবে।”
“শত্রুভাবাপন্ন চিত্তে মিথ্যাদৃষ্টি উৎপত্তি হয়, অথবা সম্যক দৃষ্টি?”
“মিথ্যাদৃষ্টির উৎপত্তি হয়।”
৫১০. “লোহিচ্চ, তুমি কীরূপ মনে করো? কাশী ও কোশল কি কোশলরাজ প্রসেনজিতের অধিকৃত নহে?
“তাঁহারই অধিকৃত।”
“যদি কেহ এরূপ কহে, কাশী ও কোশল কোশলরাজ প্রসেনজিতের অধিকৃত; ওই দুই দেশের সমগ্র উৎপন্ন দ্রব্য প্রসেনজিৎ একাকী ভোগ করিবেন, অন্য কাহাকেও দিবেন না”, তাহা হইলে যে ওইরূপ বলিবে সে যাহারা কোশল রাজ্যের পোষ্য-তুমি এবং অপরে-তাহাদের অনিষ্টকারী হইবে, অথবা না?
“অনিষ্টকারী হইবে।”
“অনিষ্টকারী হইলে সে তাহাদের হিতানুকম্পী হইবে অথবা অহিতানুকম্পী?”
“অহিতানুকম্পী হইবে।”
“অহিতানুকম্পী চিত্ত তাহাদের প্রতি মিত্রভাবাপন্ন হইবে, অথবা শত্রুভাবাপন্ন?”
“শত্রুভাবাপন্ন হইবে।”
“শত্রুভাবাপন্ন চিত্তে মিথ্যাদৃষ্টির উৎপত্তি হয়, অথবা সম্যক দৃষ্টি?”
“মিথ্যাদৃষ্টির উৎপত্তি হয়।”
“লোহিচ্চ, আমি কহি যে মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন, দ্বিবিধ গতির-নিরয় এবং পশুযোনি-এক তাহার নিয়তি।
৫১১. এইরূপে, লোহিচ্চ, যদি কেহ কহে, “লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ সালবতিকায় প্রতিষ্ঠিত, সালবতিকায় উৎপন্ন দ্রব্য লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ একাকী ভোগ করিবে, অন্য কাহাকেও দিবে না,” তাহা হইলে যে ওইরূপ বলিবে সে যাহারা তোমার পোষ্য তাহাদের অনিষ্টকারী হইবে, অনিষ্টকারী হইলে তাহাদের অহিতানুকম্পী হইবে, অহিতানুকম্পী চিত্ত শত্রুভাবাপন্ন হইবে, শত্রুভাবাপন্নের চিত্তে মিথ্যাদৃষ্টির উৎপত্তি হয়।”
এইরূপে, লোহিচ্চ, যদি কেহ এরূপ কহে, “কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ কুশলধর্ম প্রাপ্ত হইলেও উহা অপরের নিকট প্রকাশ করা উচিত নয়, কারণ একে অন্যের কী করিতে পারে? অপরের নিকট প্রকাশ করিলে পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করিয়া নতুন বন্ধন সৃষ্টি করার ন্যায় হইবে। সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ-লোভধর্ম কহি, একে অন্যের কী করিতে পারে?” তাহা হইলে যে ওইরূপ বলিবে সে যে-সকল কূলপুত্র তথাগত কর্তৃক প্রকাশিত ধর্মবিনয় লব্ধ হইয়া স্রোতাপত্তিফল, সকৃদাগামীফল, অনাগামীফল এবং অর্হত্ত্বরূপ বৈশারদ্য প্রাপ্ত হন-যাঁহারা দিব্য পুনর্জন্ম লাভের জন্য অনুকূল কর্মানুষ্ঠানে প্রবৃত্ত হন, তাঁহাদের অনিষ্টকারী হইবে, অনিষ্টকারী হইলে তাঁহাদের অহিতানুকম্পী হইবে, অহিতানুকম্পীর চিত্ত শত্রুভাবাপন্ন হইবে, শত্রুভাবাপন্নের চিত্তে মিথ্যাদৃষ্টির উৎপত্তি হয়। লোহিচ্চ, আমি কহি যে মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন, নিরয় এবং পশুযোনিরূপ দ্বিবিধ গতির এক তাহার নিয়তি।
৫১২. “এইরূপে, লোহিচ্চ, যদি কেহ এরূপ কহে, “কোশলের রাজা প্রসেনজিৎ কাশী ও কোশলের অধিপতি। কাশী ও কোশলের সমুদয় উৎপন্ন দ্রব্য তিনিই একাকী ভোগ করিবেন, অপর কাহাকেও দিবেন না,” তাহা হইলে সে যাহারা কোশল রাজ্যের পোষ্য, তুমি এবং অপরে, তাহাদের অনিষ্টকারী হইবে, অনিষ্টকারী হইলে তাহাদের অহিতানুকম্পী হইবে, অহিতানুকম্পীর চিত্ত শত্রুভাবাপন্ন হইবে, শত্রুভাবাপন্ন চিত্তে মিথ্যাদৃষ্টির উৎপত্তি হয়।
এইরূপে, লোহিচ্চ, যদি কেহ এরূপ কহে, “কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ কুশলধর্ম প্রাপ্ত হইলেও উহা অপরের নিকট প্রকাশ করা উচিত নয়, কারণ একে অপরের কী করিতে পারে? অপরের নিকট প্রকাশ করিলে পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করিয়া নতুন বন্ধন সৃষ্টি করার ন্যায় হইবে। সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ-লোভধর্ম কহি। একে অন্যের কী করিতে পারে? তাহা হইলে যে এইরূপ বলিবে সে যে-সকল কূলপুত্র… নিয়তি (৫১১ অনুচ্ছেদের অনুরূপ)।
ত্রিবিধ শিক্ষক
৫১৩. “লোহিচ্চ, জগতে ত্রিবিধ শিক্ষক নিন্দার পাত্র। যে এরূপ শিক্ষকের নিন্দা করে, তাহার নিন্দা ভূত, তথ্য, ধর্মসঙ্গত এবং অনবদ্য। কীরূপ ত্রিবিধ শিক্ষক? লোহিচ্চ, কোনো শাস্তা যাহা লাভ করিবার জন্য আগার হইতে অনাগারিতা অবলম্বন করেন, ওই শ্রামণ্যার্থ লাভে অসমর্থ হন। ওই শ্রামণ্যার্থ লাভ না করিয়া তিনি শ্রোতাগণকে ধর্মোপদেশ দেন, “ইহা তোমাদের হিতার্থ, তোমাদের সুখার্থ।” তাঁহার ওই সকল শ্রাবক শ্রবণেচ্ছু হন না, কর্ণপাত করেন না, অর্হত্ত্ব লাভের চিত্ত উৎপাদন করেন না, শাস্তার শিক্ষা পরিত্যাগ করিয়া অন্য পথে অবস্থান করেন। ওই প্রকার শিক্ষক এইরূপে তিরস্কৃত হইতে পারেন; আয়ুষ্মান যাহা লাভ করিবার জন্য প্রব্রজ্যা অবলম্বন করিয়াছেন ওই শ্রামণ্যার্থ প্রাপ্ত হন নাই, তথাপি আপনি শ্রাবকদিগকে ধর্মোপদেশ দিয়াছেন, “ইহা তোমাদের হিতার্থ, তোমাদের সুখার্থ।” শ্রাবকগণ শ্রবণে অনিচ্ছুক, তাঁহারা কর্ণপাত করেন না অর্হত্ত্ব লাভের চিত্ত উৎপাদন করেন না, শাস্তার শিক্ষা পরিত্যাগ করিয়া অন্য পথে অবস্থান করেন। আপনি যে বিরূপ তাহাকে আকর্ষণ করিতেছেন, যে মুখ ফিরাইয়া লইয়াছে তাহাকে অলিঙ্গন করিতেছেন; সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ লোভ ধর্ম কহি, কারণ একে অন্যের কী করিতে পারে?”
“লোহিচ্চ, ইনিই জগতে নিন্দার্হ প্রথম শ্রেণির শাস্তা। এবং যে এরূপ শিক্ষকের নিন্দা করে, তাহার নিন্দা ভূত, তথ্য ধর্মসঙ্গত এবং অনবদ্য।
৫১৪. “পুনশ্চ, লোহিচ্চ, কোনো শাস্তা যাহা লাভ করিবার জন্য আগার হইতে অনাগারিতা অবলম্বন করেন, ওই শ্রামণ্যার্থ লাভে অসমর্থ হন। ওই শ্রামণ্যার্থ লাভ না করিয়া তিনি শ্রোতাগণকে ধর্মোপদেশ দেন, “ইহা তোমাদের হিতার্থ, তোমাদের সুখার্থ।” তাঁহার ওই সকল শ্রাবক শ্রবণেচ্ছু হইয়া কর্ণপাত করেন, অর্হত্ত্ব লাভের চিত্ত উৎপাদন করেন, শাস্তার শিক্ষা পরিত্যাগ করিয়া অন্য পথে অবস্থান করেন না। ওই প্রকার শিক্ষক এইরূপে তিরস্কৃত হইতে পারেন, “আয়ুষ্মান যাহা লাভ করিবার জন্য প্রব্রজ্যা অবলম্বন করিয়াছেন ওই শ্রামণ্যার্থ প্রাপ্ত হন নাই, তথাপি আপনি শ্রাবকদিগের ধর্মোপদেশ দিয়াছেন, “ইহা তোমাদের হিতার্থ, তোমাদের সুখার্থ। শ্রাবকগণ শ্রবণেচ্ছু হইয়া কর্ণপাত করেন, অর্হত্ত্ব লাভের চিত্ত উৎপাদন করেন, শাস্তার শিক্ষা পরিত্যাগ করিয়া অন্য পথে অবস্থান করেন না। আপনি নিজ ক্ষেত্র অবহেলা করিয়া অন্যের ক্ষেত্রের তৃণোৎপাটনে নিযুক্ত। সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ-লোভধর্ম কহি। কারণ একে অন্যের কী করিতে পারে।
“লোহিচ্চ, ইনিই জগতে নিন্দার্হ দ্বিতীয় শ্রেণির শাস্তা, এবং যে এরূপ শিক্ষকের নিন্দা করে, তাহার নিন্দা ভূত, তথ্য, ধর্মসঙ্গত এবং অনবদ্য।
৫১৫. “পুনশ্চ, লোহিচ্চ, কোনো শাস্তা যাহা লাভ করিবার জন্য আগার হইতে অনাগারিতা অবলম্বন করেন, ওই শ্রামণ্যার্থ লাভ করেন। উহা লাভ করিয়া তিনি শ্রোতাগণকে ধর্মোপদেশ দেন, “ইহা তোমাদের হিতার্থ, তোমাদের সুখার্থ।” শ্রাবকগণ শ্রবণেচ্ছু হন না, কর্ণপাত করেন না, অর্হত্ত্ব লাভের চিত্ত উৎপাদন করেন না, শাস্তার শিক্ষা অবহেলা করিয়া অন্য পথে অবস্থান করেন। ওই শিক্ষক এইরূপে তিরস্কৃত হইতে পারেন, আয়ুষ্মান যাহা লাভ করিবার নিমিত্ত আগার হইতে অনাগারীতা অবলম্বন করিয়াছেন, ওই শ্রামণ্যার্থ লাভে সমর্থ হইয়াছেন। উহা লাভ করিয়া আপনি শ্রাবকদিগকে ধর্মোপদেশ দিয়াছেন, “ইহা তোমাদের হিতার্থ, তোমাদের সুখার্থ।” শ্রাবকগণ শ্রবণেচ্ছু হন না, কর্ণপাত করেন না, অর্হত্ত্ব লাভের চিত্ত উৎপাদন করেন না। শাস্তার শিক্ষা অবহেলা করিয়া অন্য পথে অবস্থান করেন। আপনার কার্য পুরাতন বন্ধন ছিন্ন করিয়া নতুন বন্ধন সৃষ্টি করার ন্যায় হইতেছে। সেইরূপ আমি ইহাকে পাপ-লোভধর্ম কহি। কারণ একে অন্যের কী করিতে পারে?”
“লোহিচ্চ, ইনিই জগতে নিন্দার্হ তৃতীয় শ্রেণির শাস্তা, এবং যে এরূপ শিক্ষকের নিন্দা করে তাহার নিন্দা ভূত, তথ্য, ধর্মসঙ্গত এবং অনবদ্য।
“লোহিচ্চ, ইহারাই জগতে নিন্দার্হ ত্রিবিধ শিক্ষক। যে এরূপ শাস্তাদিগের নিন্দা করে তাহার নিন্দা ভূত, তথ্য, ধর্মসঙ্গত এবং অনবদ্য।”
৫১৬. এইরূপ উক্ত হইলে লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, এমন কোনো শাস্তা আছেন কি যিনি জগতে নিন্দার্হ নন?”
অনিন্দনীয় শাস্তা
“লোহিচ্চ, এমন শাস্তা আছেন যিনি জগতে নিন্দার্হ নহেন।”
“তিনি কীরূপ?”
লোহিচ্চ, জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে : যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, দম্য-পুরুষ-সারথী, দেব-মনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবান… (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
আপনাতে এই পঞ্চ নীবরণ প্রহীন দেখিয়া তিনি প্রমোদ্য লাভ করেন… অব্যাপ্ত থাকে না। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
লোহিচ্চ, যেরূপ কোনো দক্ষ স্নাপক… অব্যাপ্ত থাকে না। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
লোহিচ্চ, যে শিক্ষকের ধর্মে শ্রাবক এবম্বিধ বৈশারদ্য প্রাপ্ত হন, সেই শিক্ষকও জগতে নিন্দার্হ হন না। যে এরূপ শাস্তার নিন্দা করে, তাহার নিন্দা অভূত, অতথ্য, অধর্মসঙ্গত, অনবদ্য।
পুনশ্চ, লোহিচ্চ, ভিক্ষু বিতর্ক বিচারের উপশমে… দ্বিতীয় ধ্যান… তৃতীয় ধ্যান… চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। (শ্রামণ্যফল সূত্র)।
লোহিচ্চ, যে শিক্ষকের ধর্মে শ্রাবক এবম্বিধ বৈশারদ্য প্রাপ্ত হন, সেই শিক্ষকও জগতে নিন্দার্হ হন না। যে এরূপ শাস্তার নিন্দা করে, তাহার নিন্দা, অভূত, অতথ্য, অধর্মসঙ্গত, অনবদ্য।
এইরূপে চিত্তের সেই সমাহিত, পরিশুদ্ধ… জ্ঞানদর্শনের অভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)…
লোহিচ্চ, যে শিক্ষকের ধর্মে শ্রাবক… অনবদ্য।”
তিনি চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় আসবক্ষয় জ্ঞানাভিমুখে… ইহা জানিতে পারেন। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)
“লোহিচ্চ, যে শিক্ষকের ধর্মে শ্রাবক… অনবদ্য।”
৫১৭. এইরূপ উক্ত হইলে লোহিচ্চ ব্রাহ্মণ ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, যেরূপ কোনো পুরুষ নরকপ্রপাতে পতনশীল মনুষ্যকে কেশে গ্রহণপূর্বক তাহাকে উদ্ধার করিয়া স্থলে প্রতিষ্ঠাপিত করে, সেইরূপ নরকপ্রপাতে পতনশীল আমাকে পূজ্য গৌতম উদ্ধার করিয়া প্রতিষ্ঠাপিত করিয়াছেন। উত্তম, গৌতম! গৌতম। যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত… গ্রহণ করুন।”
লোহিচ্চ সূত্র সমাপ্ত।
লোহিচ্চ সূত্র