৫১৮. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। এক সময়ে ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত কোশলদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে মনসাকট নামক কোশলের ব্রাহ্মণ গ্রামে উপস্থিত হইলেন। তথায় ভগবান মনসাকটের উত্তর দিকে অচিরবতী নদীর তীরস্থ আম্রবনে অবস্থান করিলেন।
৫১৯. ওই সময়ে বহু বিখ্যাত ব্রাহ্মণ মহাশাল মনসাকটে বাস করিতেন। তাঁহাদের নাম : চঙ্কী, তারুখ্য, পোক্ষরসাতি, জাণুস্সোণি, তোদেয়্য এবং অপরাপর প্রসিদ্ধ মহাশাল।
৫২০. অনন্তর চক্রমণ নিরত হইয়া পাদচারণাকালীন বাসেট্ঠ ও ভারদ্বাজের মধ্যে মার্গামার্গ সম্বন্ধে কথোপকথন হইল।
তরুণ বাসেট্ঠ বলিলেন, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন। ব্রাহ্মণ পোক্ষরসাতি স্বয়ং ইহা বলিয়াছেন।
যুবক ভারদ্বাজ বলিলেন, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন। ব্রাহ্মণ তারুখ্য স্বয়ং ইহা বলিয়াছেন।
কিন্তু বাসেট্ঠ ভারদ্বাজকে স্বমতে আনয়ন করিতে সমর্থ হইলেন না, এবং ভারদ্বাজও ওইরূপ বাসেট্ঠকে স্বমতে স্থাপনে অসমর্থ হইলেন।
৫২১. তদনন্তর বাসেট্ঠ ভারদ্বাজকে বলিলেন, “ভারদ্বাজ, সেই শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম, যিনি শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত হইয়াছেন : এক্ষণে মনসাকটের উত্তরে স্থিত অচিরবতী নদীর তীরে আম্রবনে অবস্থান করিতেছেন। সেই ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে; ইনিই সেই ভগবান… ভগবন্ত।” এস ভারদ্বাজ, শ্রমণ গৌতমের নিকট গমন করি। তথায় আমরা শ্রমণ গৌতমকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করিব। শ্রমণ গৌতম যেরূপ ব্যাখ্যা করিলেন, আমরা সেইরূপই গ্রহণ করিব।”
ব্রহ্ম জ্ঞান
৫২২. তৎপরে বাসেট্ঠ ও ভারদ্বাজ ভগবানের নিকট গমন করিলেন। তথায় ভগবানের সহিত প্রীত্যালাপব্যঞ্জক বাক্যের বিনিময়ান্তে তাঁহারা এক প্রান্তে উপবেশন করিলেন। পরে বাসেট্ঠ ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, চঙ্ক্রমণনিরত হইয়া পাদচারণাকালীন আমাদের মধ্যে মার্গামার্গ সম্বন্ধে কথোপকথন হইতেছিল। আমি বলিয়াছি, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন। ব্রাহ্মণ পোক্ষরসাতি স্বয়ং ইহা বলিয়াছেন।” ভারদ্বাজ বলিয়াছেন, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন। ব্রাহ্মণ তারুখ্য স্বয়ং ইহা বলিয়াছেন।” গৌতম, এই বিষয়ে বিগ্রহ, বিবাদ ও নানাবাদের উৎপত্তি হইয়াছে।”
৫২৩. “তাহা হইলে, বাসেট্ঠ, তুমি এইরূপ বলিয়াছ, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন। ব্রাহ্মণ পোক্ষরসাতি স্বয়ং ইহা বলিয়াছেন।” যুবক ভারদ্বাজ বলিয়াছেন, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন। ব্রাহ্মণ তারুখ্য স্বয়ং ইহা বলিয়াছেন।” অতঃপর, বাসেট্ঠ কোনস্থানে তোমাদের বিগ্রহ, বিবাদ ও নানাবাদের উৎপত্তি হইয়াছে?”
৫২৪. “হে গৌতম, মার্গামার্গ সম্বন্ধে। ভিন্ন ভিন্ন ব্রাহ্মণ ভিন্ন ভিন্ন মার্গ শিক্ষা দিয়া থাকেন, অধ্বর্য্যু ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ, ছন্দোগ ব্রাহ্মণ, ছন্দাবা ব্রাহ্মণ, ব্রহ্মচর্য্য ব্রাহ্মণ, ওই সকলগুলিই কি মুক্তিমার্গ, ওই সকল মার্গই কি এরূপ, যাহাতে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন?
৫২৫. “বাসেট্ঠ কি বলিতেছেন “মিলিত হন”?”
“তাহাই বলিতেছি।”
“বাসেট্ঠ কি বলিতেছেন “মিলিত হন”?”
“তাহাই বলিতেছি।”
“বাসেট্ঠ কি বলিতেছেন “মিলিত হন?”
“তাহাই বলিতেছি।”
“বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণের মধ্যে কি একজনও এমন আছেন যিনি স্বচক্ষে ব্রহ্মাকে দেখিয়াছেন?”
“না, গৌতম।”
“তবে কি তাঁহাদের আচার্যদিগের মধ্যে এমন একজনও আছেন যিনি স্বচক্ষে ব্রহ্মাকে দেখিয়াছেন?”
“না, গৌতম।”
“তবে কি তাঁহাদের আচার্য-প্রাচার্যদিগের মধ্যে এমন কেহ আছেন যিনি স্বচক্ষে ব্রহ্মাকে দেখিয়াছেন?”
“না, গৌতম।”
“তবে কি ওই সকল ব্রাহ্মণদিগের ঊর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত এমন কেহ আছেন যিনি স্বচক্ষে ব্রহ্মাকে দেখিয়াছেন?”
“না, গৌতম।”
৫২৬. “তবে কি যাঁহারা ওই সকল ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের পূর্বজ ঋষি, মন্ত্রকর্তা, মন্ত্র-প্রবক্তা ছিলেন, যাঁহাদিগের গীত, প্রোক্ত, সমীহিত, পুরাতন মন্ত্র এক্ষণে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক অনুগীত, অনুভাষিত, পুনঃপুন আবৃত্ত হয়; যথা : অষ্টম, বামক, বামদেব, বিশ্বমিত্র, যমদগ্নি, অঙ্গিরা, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ, কাশ্যপ, ভৃগু, তাঁহারা কি এরূপ বলিয়াছেন, “ব্রহ্মা কোথায়, তিনি কোথা হইতে আসিয়াছেন, তাঁহার গতি কোথায়, আমরা জানি এবং প্রত্যক্ষ করিয়াছি?”
“না, গৌতম।”
৫২৭. “এইরূপে বাসেট্ঠ ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে এমন কেহই নাই যিনি স্বচক্ষে ব্রহ্মাকে দেখিয়াছেন, তাঁহাদের আচার্যদিগের মধ্যে এমন কেহই নাই যিনি ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, তাঁহাদের আচার্য-প্রাচার্যদিগের মধ্যে এমন কেহই নাই যিনি ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখিয়াছেন, তাঁহাদের ঊর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত এমন কেহই নাই যিনি ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখিয়াছেন। যাহারা ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের পূর্বজ ঋষি, মন্ত্রকর্তা, মন্ত্র-প্রবক্তা ছিলেন, যাঁহাদিগের গীত, প্রোক্ত, সমীহিত, পুরাতন মন্ত্র এক্ষণে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক অনুগীত, অনুভাষিত, পুনঃপুন আবৃত্ত হয়; যথা : অষ্টক, বামদেব, বিশ্বমিত্র, যমদগ্নি, অঙ্গিরা, ভারদ্বাজ, বশিষ্ঠ, কাশ্যপ, ভৃগু-তাঁহারাও এরূপ বলেন নাই; ব্রহ্মা কোথায়, তিনি কোথা হইতে আসিয়াছেন, তাঁহার গতি কোথায়, তাহা আমরা জানি এবং প্রত্যক্ষ করিয়াছি।” সুতরাং ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ এইরূপ বলিয়াছেন, “যাহা আমরা জানি না এবং দেখি নাই তাহার সহিত মিলিত হইবার মার্গ উপদেশ দিতেছ-ইহাই ঋজুমার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এ মার্গে ভ্রমণকারী ব্রহ্মের সহিত মিলিত হন।”
৫২৮. “বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য কি অর্থহীন নহে?”
“অবশ্যই, গৌতম, এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য অর্থহীন।”
৫২৯. “বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যাহা জানেন না ও দেখেন নাই, তাহার সহিত মিলিত হইবার যে পন্থা নির্দেশ করিতে পারিবেন, তাহা কখনো হইতে পারে না। বাসেট্ঠ যেরূপ পরস্পর সংসৃষ্ট শ্রেণিবদ্ধ অন্ধগণ সম্মুখে, মধ্যে কিংবা পশ্চাতে দেখিতে পায় না, সেইরূপেই ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য শ্রেণিবদ্ধ অঙ্কের বাক্যের ন্যায়, যে প্রথমে স্থিত সেও দেখিতে পায় না, যে মধ্যে স্থিত সেও দেখিতে পায় না, যে সর্বপশ্চাতে সেও দেখিতে পায় না। ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের এইরূপ বাক্য হাস্যকর, অর্থহীন, রিক্ত ও তুচ্ছ।”
৫৩০. বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ কি, যখন তাঁহারা চন্দ্রসূর্যের উদয় ও অস্তগমনের স্থানাভিমুখে অঞ্জলিবদ্ধ ও প্রদক্ষিণ নিরত হইয়া উহাদিগের নিকট প্রার্থনা করেন, উহাদিগের স্তুতি ও পূজা করেন, তখন অন্যান্য মনুষ্যের ন্যায় উহাদিগকে দেখিতে পান?”
“অবশ্যই, গৌতম, দেখিতে পান।”
৫৩১. “বাসেট্ঠ তুমি কীরূপ মনে করো? ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যে চন্দ্র-সূর্যের উদয় ও অস্তগমনের স্থানাভিমুখে অঞ্জলিবদ্ধ ও প্রদক্ষিণ নিরত হইয়া উহাদিগের নিকট প্রার্থনা করিবার কালে, উহাদিগের স্তুতি ও পূজা করিবার কালে, অন্যান্য মনুষ্যের ন্যায় উহাদিগকে দেখিতে পান, সেই চন্দ্র-সূর্যের সহিত মিলিত হইবার মার্গ তাঁহারা কি এইরূপ বলিয়া উপদেশ দিতে পারেন, “ইহাই ঋজু মার্গ, ইহা সরল ও মুক্তিসংবর্তনিক, এই মার্গে ভ্রমণকারী চন্দ্র-সূর্যের সহিত মিলিত হন?”
“না, গৌতম।”
৫৩২. “তাহা হইলে, বাসেট্ঠ ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ, যাহা তাঁহারা দেখিয়াছেন, তাহার সহিত মিলিত হইবার পন্থা নির্দেশ করিতে পারেন না। তাঁহারা ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখেন নাই, তাঁহাদের আচার্যগণ ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখেন নাই, তাঁহাদের আচার্য-প্রাচার্যগণও ব্রহ্মাকে স্বচক্ষে দেখেন নাই, তাঁহাদের ঊর্ধ্বতন সপ্তম পুরুষ পর্যন্ত কেহই স্বচক্ষে ব্রহ্মাকে দেখেন নাই। ওই সকল ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের পূর্বজ ঋষিগণও ব্রহ্মার স্থিতি, আগতি এবং গতি অবগত নহেন। তথাপি তাঁহারা যাহাকে জানেন না ও দেখেন নাই তাহার সহিত মিলিত হইবার পন্থা নির্দেশ করেন।
৫৩৩. তুমি কীরূপ মনে করো, বাসেট্ঠ? এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য কি অর্থশূন্য নহে?”
“অবশ্যই, গৌতম, এস্থলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণের বাক্য অর্থশূন্য।”
সাধু, বাসেট্ঠ। ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যাহা জানেন না ও দেখেন নাই, তাহার সহিত মিলিত হইবার যে পন্থা নির্দেশ করিতে পারিবেন, তাহার সম্ভাবনা নাই।
৫৩৪. “যেরূপ কোনো পুরুষ বলিল, “আমি এই জনপদের জনপদকল্যাণীকে অভিলাষ করি, কামনা করি।” জনগণ তাহাকে বলিল, “হে পুরুষ, যে জনপদকল্যাণীকে তুমি অভিলাষ করো, কামনা করো, সেই জনপদকল্যাণী ক্ষত্রিয়া, কিম্বা ব্রাহ্মণী, কিম্বা বৈশ্যা, কিম্বা শূদ্রাণী, তাহা কি তুমি জান?” এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পুরুষটি বলিল, “না”। জনগণ তাহাকে বলিল, “হে পুরুষ, যে জনপদকল্যাণীকে তুমি অভিলাষ করো, কামনা করো, সেই জনপদকল্যাণী এই নাম অথবা এই গোত্রবিশিষ্ট, দীর্ঘ, হ্রস্ব অথবা মধ্যমাকৃতি, কৃষ্ণবর্ণা, শ্যামবর্ণা অথবা মদ্গুর বর্ণা, অমুক গ্রাম, নিগম অথবা নগরবাসিনী, তাহা কি তুমি জান?” এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পুরুষটি বলিল, “না”। জনগণ তাহাকে বলিল, “হে পুরুষ, যাহাকে তুমি জান না এবং দেখ নাই তাহাকে তুমি অভিলাষ করো, কামনা করো?” পুরুষটি বলিল, “হ্যাঁ”। বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? এরূপ হইলে সেই পুরুষের বাক্য কি অর্থহীন নহে?”
“অবশ্যই, গৌতম, এরূপ হইলে সেই পুরুষের বাক্য অর্থহীন।”
৫৩৫. “এইরূপে, বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে… মিলিত হন।” (উপরোক্ত অনুচ্ছেদ নং ৫২৭ দ্রষ্টব্য)। বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য কি অর্থহীন নহে?”
“অবশ্যই, গৌতম এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য অর্থহীন।”
“সাধু, বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যাহা জানেন না ও দেখেন নাই, তাহার সহিত মিলিত হইবার যে পন্থা নির্দেশ করিতে পারিবেন, তাহার সম্ভাবনা নাই।”
৫৩৮. “বাসেট্ঠ, কোনো পুরুষ প্রাসাদে আরোহণার্থ চতুর্মহাপথে সোপান শ্রেণি নির্মাণ করিল। জনগণ তাহাকে বলিল, “হে পুরুষ, যে প্রাসাদে আরোহণার্থ তুমি সোপান নির্মাণ করিতেছ, উহা পশ্চিমদিকে কিম্বা পূর্বদিকে কিম্বা উত্তরদিকে কিম্বা দক্ষিণদিকে, উহা উচ্চ, নীচ কিম্বা মধ্যমাকৃতিবিশিষ্ট, তাহা তুমি জান কি?” এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া সে বলিল, “না”।” জনগণ তাহাকে বলিল, “হে পুরুষ, যাহা তুমি জান না এবং দেখ নাই সেই প্রাসাদে আরোহণার্থ তুমি সোপান নির্মাণ করিতেছ?” এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া সে বলিল, “হ্যাঁ”।
৫৩৯. বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? এরূপ হইলে সেই পুরুষের বাক্য কি অর্থহীন নহে?”
“অবশ্যই, গৌতম, এরূপ হইলে সেই পুরুষের বাক্য অর্থহীন।”
৫৪০. “এইরূপে, বাসেট্ঠ ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে… মিলিত হন।” (উপরোক্ত অনুচ্ছেদ ৫২৭ দ্রষ্টব্য)।
৫৪১. বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য কি অর্থহীন নহে?”
“অবশ্যই, গৌতম, এরূপ হইলে ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের বাক্য অর্থহীন।”
“সাধু, বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যাহা জানেন না ও দেখেন নাই, তাহার সহিত মিলিত হইবার যে পন্থা নির্দেশ করিতে পারিবেন, তাহার সম্ভাবনা নাই।”
৫৪২. “বাসেট্ঠ, মনে করো অচিরবতী নদী কূলে কূলে পূর্ণ। কোনো পুরুষ পারার্থী হইয়া আসিল। সে এই তীরে স্থিত হইয়া পরপারকে আহ্বান করিয়া বলিল, “হে পরপার, এই তীরে আইস।”
৫৪৩. বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? সেই পুরুষের আহ্বান-হেতু, আযাচন-হেতু, প্রার্থনা-হেতু অথবা অভিনন্দন হেতু অচিরবতী নদীর অপর পার কি এই তীরে আসিবে?”
“অবশ্যই নহে, গৌতম।”
৫৪৪. “এইরূপেই বাসেট্ঠ, যে ধর্মের পালনে মনুষ্য ব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্ম অবহেলা করিয়া, যাহার পালনে মনুষ্য অব্রাহ্মণে পরিণত করে সেই ধর্মের সেবা করিয়া ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ বলিয়া থাকেন, “আমরা ইন্দ্রকে আহ্বান করিতেছি, সোমকে আহ্বান করিতেছি, বর্বণকে আহ্বান করিতেছি, ঈশানকে আহ্বান করিতেছি, প্রজাপতিকে আহ্বান করিতেছি, ব্রহ্মাকে আহ্বান করিতেছি, মহর্ধিকে আহ্বান করিতেছি, যমকে আহ্বান করিতেছি।” যে ধর্মের পালনে মনুষ্য ব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্ম অবহেলা করিয়া, যাহার পালনে মনুষ্য অব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্মের সেবা করিয়া ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যে আহ্বান দ্বারা, আযাচন দ্বারা, প্রার্থনা দ্বারা অথবা অভিনন্দন দ্বারা মৃত্যুর পর দেহের ধ্বংস হইলে ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন, তাহা অসম্ভব।
৫৪৫. “কূলে কূলে পূর্ণ অচিরবতী নদীর তীরে কোনো পুরুষ পারার্থী হইয়া আসিল। এই তীরে স্থিত সেই পুরুষের বাহুদ্বয় পশ্চাতে দৃঢ়রূপে শৃঙ্খলাবদ্ধ। বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? সেই পুরুষ কি অচিরবতীর এই তীর হইতে অপর পারে গমনে সক্ষম হইবে?”
“অবশ্যই নহে, গৌতম।”
৫৪৬. “সেইরূপই, বাসেট্ঠ, আর্যবিনয়ে পঞ্চকামগুণ শৃঙ্খলও উক্ত হয়, বন্ধনও উক্ত হয়। কোন কোন পঞ্চগুণ? চক্ষুবিজ্ঞেয় রূপ-ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয়রূপ; উহা কামোপসংহিত এবং রাগোৎপাদক। শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় শব্দ… ঘ্রাণ-বিজ্ঞেয় গন্ধ… জিহ্বা-বিজ্ঞেয় রস… কায়-বিজ্ঞেয় স্পর্শ… উহারা ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয়রূপ এবং কামোপসংহিত ও রাগোৎপাদক। বাসেট্ঠ, এই পঞ্চকামগুণ আর্যবিনয়ে শৃঙ্খলও উক্ত হয়, বন্ধনও উক্ত হয়। বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ ওই পঞ্চকামগুণে গ্রথিত, মুগ্ধ, লিপ্ত হইয়া, উহাদের পরিণাম দর্শন না করিয়া উহা হইতে নিঃসরণের জ্ঞান লাভ না করিয়া ওই সকল উপভোগ করেন।
“বাসেট্ঠ, ওই সকল ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যে ধর্মের পালনে মনুষ্য ব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্ম অবহেলা করিয়া, যাহার পালনে মনুষ্য অব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্মের সেবা করিয়া, পঞ্চকামগুণে গ্রথিত, মুগ্ধ, লিপ্ত হইয়া, উহাদের পরিণাম দর্শন না করিয়া, উহা হইতে নিঃসরণের জ্ঞান লাভ না করিয়া, ওই সকল উপভোগ করিয়া, কামানুবন্ধনে বদ্ধ হইয়া যে মরণান্তে দেহের বিলয়ে ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন তাহা অসম্ভব।
৫৪৭. “বাসেট্ঠ, কূলে কূলে পূর্ণ অচিরবতী নদীর তীরে কোনো পুরুষ পারার্থী হইয়া আসিল। সে সশীর্ষাবৃত হইয়া এই তীরে গমন করিল। বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? সেই পুরুষ কি অচিরবতীর এই তীর হইতে অপর পারে গমনে সক্ষম হইবে?”
“অবশ্যই নহে, গৌতম।”
৫৪৮. এইরূপই, বাসেট্ঠ, এই পঞ্চ নীবরণ আর্যবিনয়ে আবরণও উক্ত হয়, নীবরণও উক্ত হয়, অবনাহও উক্ত হয়, পর্যবনাহও উক্ত হয়। ওই পাঁচটি কী কী? কামচ্ছন্দ নীবরণ, ব্যাপাদ নীবরণ, স্ত্যানমিদ্ধ নীবরণ, ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য নীবরণ, বিচিকিৎসা নীবরণ। এই পঞ্চ নীবরণই আর্যবিনয়ে আবরণও উক্ত হয়, নীবরণও উক্ত হয়, অবনাহও উক্ত হয়, পর্যবনাহও উক্ত হয়।
৫৪৯. বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ এই পঞ্চ নীবরণ দ্বারা আবৃত, পরিবেষ্টিত, অবনন্ধ, পর্যবনদ্ধ। ওই সকল ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যে ধর্মের পালনে মনুষ্য ব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্ম অবহেলা করিয়া, যে ধর্মের পালনে মনুষ্য অব্রাহ্মণে পরিণত হয় সেই ধর্মের সেবা করিয়া, পঞ্চনীবরণ দ্বারা আবৃত, পরিবেষ্টিত, অবনদ্ধ, পর্যবনদ্ধ হইয়া, মরণান্তে দেহের বিলয়ে যে ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন, সে সম্ভাবনা নাই।
৫৫০. “বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আচার্য প্রাচার্যগণকে কীরূপ বলিতে শুনিয়াছ? ব্রহ্মা কি কৃতদার অথবা অকৃতদার?”
“হে গৌতম, তিনি অকৃতদার।”
“তাঁহার চিত্ত কি স-বৈর অথবা বৈরহীন?”
“তাঁহার চিত্ত বৈরহীন।”
“তিনি কি ব্যাপন্ন-চিত্ত অথবা অব্যাপন্ন-চিত্ত?”
“তিনি অব্যাপন্ন-চিত্ত।”
“তিনি কি সংক্লিষ্ট-চিত্ত, অথবা অসংক্লিষ্ট-চিত্ত?”
“তিনি অসংক্লিষ্ট-চিত্ত।”
“তিনি কি চিত্তজয়ী অথবা নহে?”
“তিনি চিত্তজয়ী।”
“বাসেট্ঠ তুমি কীরূপ মনে করো? ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ কি কৃতদার অথবা অকৃতদার?”
“তাঁহারা কৃতদার।”
“তাঁহাদের চিত্ত কি স-বৈর অথবা বৈরহীন।”
“তাঁহাদের চিত্ত স-বৈর।”
“তাঁহারা কি ব্যাপন্ন-চিত্ত অথবা অব্যাপন্ন-চিত্ত?”
“তাঁহারা ব্যাপন্ন-চিত্ত।”
“তাঁহারা কি সংক্লিষ্ট-চিত্ত অথবা অসংক্লিষ্ট-চিত্ত?”
“তাঁহারা সংক্লিষ্ট-চিত্ত।”
“তাঁহারা কি চিত্তজয়ী অথবা নহে?”
“তাঁহারা চিত্তজয়ী নহেন।”
৫৫১. “তাহা হইলে, বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ কৃতদার, ব্রহ্মা অকৃতদার। কৃতদার ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণের সহিত কি অকৃতদার ব্রহ্মার ঐক্য এবং সাম্য হইতে পারে?”
“অবশ্যই নহে, গৌতম।”
“সাধু, বাসেট্ঠ। ওই সকল কৃতদার ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ যে মরণান্তে দেহের বিলয়ে অকৃতদার ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন তাহার সম্ভাবনা নাই।
“এইরূপে, বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণের চিত্ত স-বৈর, ব্রহ্মা বৈরহীন… ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ ব্যাপন্ন-চিত্ত, ব্রহ্মা অব্যাপন্ন-চিত্ত… ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ সংক্লিষ্ট-চিত্ত, ব্রহ্মা অসংক্লিষ্ট-চিত্ত… ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ চিত্তজয়ী নহেন, ব্রহ্মা চিত্তজয়ী। ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ, যাঁহারা চিত্তজয়ী নহেন, তাঁহাদের সহিত কি চিত্তজয়ী ব্রহ্মার ঐক্য এবং সাম্য হইতে পারে?”
“অবশ্যই নহে, গৌতম।”
৫৫২. সাধু, বাসেট্ঠ। ওই সকল ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ, যাঁহারা চিত্তজয়ী নহেন, তাঁহারা যে মরণান্তে দেহের বিলয়ে চিত্তজয়ী ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন, তাহার সম্ভাবনা নাই। এইরূপে, বাসেট্ঠ, ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণগণ তাঁহাদের নিশ্চিন্ততার মধ্যে অধঃপতিত হইতেছেন, ওই অধঃপতন তাঁহাদিগকে বিষাদগ্রস্ত করিতেছে, তাঁহারা অপেক্ষাকৃত সুখময় স্থানে উত্তরণের স্বপ্ন দেখিতেছেন। অতএব ত্রৈবিদ্য ব্রাহ্মণদিগের ত্রিবিদ্যা ত্রিবিদ্যা-মরুও কথিত হয়, ত্রিবিদ্যা-বিপিনও কথিত হয়, ত্রিবিদ্যা ব্যসনও কথিত হয়।”
৫৫৩. এইরূপে কথিত হইলে তরুণ বাসেট্ঠ ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, আমি শুনিয়াছি শ্রমণ গৌতম ব্রহ্মের সহিত মিলিত হইবার মার্গ অবগত আছেন।”
“বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? মনসাকট এই স্থানের নিকটে, এই স্থান হইতে দূরে নহে; কেমন, নয়?”
“সত্য, গৌতম। মনসাকট এই স্থানের নিকটে, এই স্থান হইতে দূরে নহে।”
৫৫৪. “বাসেট্ঠ, তুকি কীরূপ মনে করো? মনে করো কোনো পুরুষ, মনসাকটে জন্মগ্রহণ করিয়া এই স্থানেই বর্ধিত হইয়াছে। সে কখনই মনসাকটের বাহিরে যায় নাই। যদি কেহ তাহাকে মনসাকটে যাইবার পথ জিজ্ঞাসা করে, তাহা হইলে ওই সম্বন্ধে কি তাহার চিত্ত সংশয়াপন্ন অথবা দ্বিধাযুক্ত হইবে?”
“অবশ্যই নহে, গৌতম। কী কারণে? সেই পুরুষ মনসাকটে জাত ও বর্ধিত হওয়ায় ওই স্থানে যাইবার সমস্ত পথই তাহার সুবিদিত।”
“বাসেট্ঠ, মনসাকটে জাত ও বর্ধিত পুরুষ মনসাকটে যাইবার মার্গ জিজ্ঞাসিত হইলে তাহার চিত্ত সংশয়াপন্ন অথবা দ্বিধাযুক্ত হইতে পারে, কিন্তু ব্রহ্মলোক অথবা ব্রহ্মলোকে গমনের মার্গ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসিত হইলে তথাগতের চিত্ত সংশয়াপন্ন কিম্বা দ্বিধাযুক্ত হইবে না। বাসেট্ঠ, আমি ব্রহ্মাকে জানি, ব্রহ্মলোক এবং ওই স্থানে গমনের মার্গও জানি এবং যে মার্গে আরূঢ় হইলে ব্রহ্মলোকে উৎপত্তি হয় তাহাও জানি।”
৫৫৫. এইরূপ উক্ত হইলে যুবক বাসেট্ঠ ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, আমি শুনিয়াছি শ্রমণ গৌতম ব্রহ্মের সহিত মিলিত হইবার মার্গ উপদেশ দিতেছেন।” সাধু! পূজ্য গৌতম ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবার মার্গ আমাদিগকে শিক্ষা দিন, ব্রাহ্মণ জাতিকে রক্ষা করুন!
“তাহা হইলে বাসেট্ঠ শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো, আমি বলিতেছি।”
“উত্তম” বলিয়া বাসেট্ঠ সম্মুতি প্রকাশ করিলেন। ভগবান বলিলেন :
৫৫৬. “মহারাজ, মনে করুন জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয়,… বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য্য প্রকাশ করেন (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
“ওই ধর্ম কোনো গৃহপতি অথবা… আশ্রয় করিল। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
“এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া… সন্তুষ্ট হইয়া অবস্থান করিতে লাগিল। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
“মহারাজ, ভিক্ষু কীরূপে শীলসম্পন্ন হইয়া থাকেন?”
“ভিক্ষু প্রাণাতিপাত পরিহারপূর্বক… সুখীর চিত্ত সমাহিত হয়। (শ্রামণ্যফল সূত্রের মতো পাঠ করিতে হইবে।)।
“তিনি মৈত্রীসহগত চিত্তে এক-দুই-তিন, এইরূপে চতুর্দিক পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি ঊর্ধ্বে, অধোদিকে, তির্যক দিকে সর্বত্র সর্বলোক মৈত্রীযুক্ত এবং বিপুল, মহান, অপ্রমেয়, বৈরহীন, দ্রোহহীন, চিত্ত দ্বারা পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন।
বাসেট্ঠ, যেরূপ বলবান শঙ্খধ্বনি কারক অল্পায়াসেই চতুর্দিক বিজ্ঞাপিত করে, সেই রূপেই, বাসেট্ঠ, ওই মৈত্রী-ভাবনা ও চেত-বিমুক্তি সর্বভূতে নিরবশেষে নিযুক্ত হয়, কেহই উপেক্ষিত হয় না। বাসেট্ঠ ইহাই ব্রহ্মের সহিত মিলিত হইবার মার্গ।
“পুনশ্চ, বাসেট্ঠ, ভিক্ষু করুণা-সহগত চিত্তে,… মুদিতা-সহগত চিত্তে… উপেক্ষা-সহগত চিত্তে এক, দুই, তিন-এইরূপে চতুর্দিক পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি ঊর্ধ্বে, অধোদিকে, তির্যক দিকে সর্বত্র সর্বলোক মৈত্রীযুক্ত এবং বিপুল, মহান, অপ্রমেয়, বৈরহীন, দ্রোহহীন চিত্ত দ্বারা পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন।
“বাসেট্ঠ, যেরূপ বলবান শঙ্খধ্বনিকারক অল্পায়াসেই চতুর্দিক বিজ্ঞাপিত করে, সেই রূপেই ওই উপেক্ষা-ভাবিত চেতবিমুক্তি সর্বভূতে নিরবশেষে নিযুক্ত হয়, কেহই উপেক্ষিত হয় না। বাসেট্ঠ, ইহাই ব্রহ্মের সহিত মিলিত হইবার মার্গ।
৫৫৭. “বাসেট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? এবম্বিধ ভিক্ষু, কি বিত্ত-দারসম্পন্ন হইবেন অথবা নহে?”
“তিনি বিত্ত-দারহীন হইবেন।”
“তাহার চিত্ত কি স-বৈর হইবে অথবা বৈরহীন হইবে?”
“বৈরহীন হইবে।”
“তিনি কি ব্যাপন্ন-চিত্ত হইবেন অথবা অব্যাপন্ন-চিত্ত?”
“তিনি অব্যাপন্ন-চিত্ত হইবেন।”
“তিনি সংক্লিষ্ট-চিত্ত অথবা অসংক্লিষ্ট-চিত্ত হইবেন?”
“তিনি অসংক্লিষ্ট-চিত্ত হইবেন।”
“তিনি কি চিত্তজয়ী হইবেন অথবা নহে?”
“তিনি চিত্তজয়ী হইবেন।”
“তাহা হইলে বাসেট্ঠ ভিক্ষু বিত্ত-দারহীন, ব্রহ্মাও চিত্ত-দারহীন। বিত্ত-দারহীন ভিক্ষুর সহিত বিত্ত-দারহীন ব্রহ্মার ঐক্য এবং সাম্য হইতে পারে?”
“হইতে পারে?”
“সাধু, বাসেট্ঠ। অপরিগ্রহ ভিক্ষু মরণান্তে দেহের বিলয়ে যে অপরিগ্রহ ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন, তাহার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে।
৫৫৮. “তাহা হইলে, বাসেট্ঠ ভিক্ষু বৈরহীন, ব্রহ্মা বৈরহীন… ভিক্ষু অব্যাপন্নচিত্ত, ব্রহ্মাও তাহাই… ভিক্ষু অসংক্লিষ্ট-চিত্ত, ব্রহ্মাও তাহাই; ভিক্ষু চিত্তজয়ী, ব্রহ্মাও তাহাই। চিত্তজয়ী ভিক্ষুর সহিত চিত্তজয়ী ব্রহ্মার ঐক্য ও সাম্য হইতে পারে?”
“হইতে পারে।”
“সাধু, বাসেট্ঠ। চিত্তজয়ী ভিক্ষু মরণান্তে দেহের বিলয়ে যে চিত্তজয়ী ব্রহ্মার সহিত মিলিত হইবেন, তাহার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে।”
৫৫৯. এইরূপ উক্ত হইলে বাসেট্ঠ ও ভারদ্বাজ তরুণদ্বয় ভগবানকে বলিলেন, “অতি উত্তম, গৌতম, অতি উত্তম। যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথ প্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলপ্রদীপ ধৃত হয়, সেইরূপ পূজনীয় গৌতম অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমরা ভগবান গৌতমের, ধর্মের এবং ভিক্ষুসংঘের শরণ লইতেছি। পূজ্য গৌতম আজ হইতে জীবনের অন্তকাল পর্যন্ত আমাদিগকে শরণাগত উপাসকরূপে গ্রহণ করুন।”
তেবিজ্জ সূত্র সমাপ্ত।
শীলস্কন্ধ-বর্গ সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৩]
English
Deutsch
Việt Ngữ