লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৪]

মহাপদান সূত্রান্ত

১. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। একসময় ভগবান শ্রাবস্তী নগরস্থ জেতবন নামক অনাথপিণ্ডিকের আরামে করেরি-কুটিরে অবস্থান করিতেছিলেন। ওই সময়ে একদিন বহুসংখ্যক ভিক্ষু ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর আহারান্তে করেরি-মণ্ডলমালে একত্রিত ও উপবিষ্ট হইলে তাঁহাদের মধ্যে পূর্বজন্ম সম্বন্ধীয় ধর্মালোচনা আরম্ভ হইল, “ইহাই পূর্বজন্ম, ইহাই পূর্বজন্ম” ইত্যাদি।

২. ভগবান স্বীয় দিব্য, বিশুদ্ধ ও অলৌকিক শ্রুতি দ্বারা ভিক্ষুদিগের বাক্যালাপ শ্রবণ করিলেন। অনন্তর ভগবান আসন হইতে উত্থান করিয়া করেরি-মণ্ডলমালে গমন করিলেন এবং তথায় নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। তদনন্তর ভগবান ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করিলেন :

“ভিক্ষুগণ, এইস্থানে উপবিষ্ট হইয়া তোমরা কী কথায় নিযুক্ত, তোমাদের কী আলোচনাই বা বাধাপ্রাপ্ত হইল?”

এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া ভিক্ষুগণ ভগবানকে এইরূপ বলিলেন, “ভন্তে, আমরা ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবর্তনের পর আহারান্তে মণ্ডলমালে একত্রিত হইয়া উপবিষ্ট হইলে আমাদের মধ্যে পূর্বজন্ম সম্বন্ধীয় ধর্মালোচনা উঠিয়াছিল, “ইহাই পূর্বজন্ম, ইহাই পূর্বজন্ম।” আমরা এই কথায় নিযুক্ত ছিলাম, এমন সময় ভগবান উপস্থিত হইলেন।”

৩. “ভিক্ষুগণ, তোমরা পূর্বজন্ম সম্বন্ধীয় ধর্মকথা শুনিতে ইচ্ছা করো?”

“হে ভগবান, হে সুগত, ভগবান পূর্বজন্ম সম্বন্ধীয় ধর্মকথা কহিবার ইহা উপযুক্ত সময়, ভগবানের নিকট শ্রবণ করিয়া ভিক্ষুগণ উহা হৃদয়ে ধারণ করিবে।”

“তাহা হইলে, ভিক্ষুগণ শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো, আমি বলিব।”

প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বলিলেন, “ভন্তে, উত্তম।” ভগবান বলিলেন :

৪. “ভিক্ষুগণ, এখন হইতে একনবতি কল্পে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান বিপস্সী জগতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। এখন হইতে একত্রিংশ কল্পে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান শিখী জগতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। ওই একত্রিংশ কল্পেই অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান বেস্সভূ জগতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। হে ভিক্ষুগণ, বর্তমান কল্পে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান ককুসন্ধ জগতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। বর্তমান কল্পে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান কোণাগমন জগতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। বর্তমান কল্পে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান কস্সপ জগতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। বর্তমান কল্পে এক্ষণে আমি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধরূপে জগতে আবির্ভূত হইয়াছি।

৫. ভিক্ষুগণ, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান বিপস্সী জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং ক্ষত্রিয়কুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান শিখী জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান বেস্সভূ জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং ক্ষত্রিয় কুলোৎপন্ন ছিলেন। অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান ককুসন্ধ জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং ব্রাহ্মণকুলে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান কোণাগমন জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান কস্সপ জাতিতে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ভিক্ষুগণ, এক্ষণে আমি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধরূপে জাতিতে ক্ষত্রিয় হইয়া ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন হইয়াছি।

৬. “ভিক্ষুগণ, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান বিপস্সী কোণ্ডঞ্ঞ কৌণ্ডিণ্য গোত্রীয় ছিলেন। ভগবান শিখী এবং ভগবান বেস্সভূ কোণ্ডঞ্ঞ গোত্রীয় ছিলেন। ভগবান ককুসন্ধ কস্সপ গোত্রীয় ছিলেন। ভগবান কোণাগমন এবং ভগবান কস্সপ কস্সপ গোত্রীয় ছিলেন। ভিক্ষুগণ, এক্ষণে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধরূপে আমি গৌতম গোত্রীয়।”

৭. ভগবান বিপস্সীর আয়ুষ্কাল অশীতি সহস্র বৎসর ছিল। ভগবান শিখীর আয়ুষ্কাল সপ্ততি সহস্র বৎসর ছিল। ভগবান বেস্সভূর আয়ুষ্কাল ষষ্টি সহস্র বৎসর ছিল। ভগবান ককুসন্ধের আয়ুষ্কাল চত্বারিংশ সহস্র বৎসর ছিল। ভগবান কোণাগমনের আয়ুষ্কাল ত্রিশ সহস্র বৎসর ছিল। ভগবান কস্সপের আয়ুষ্কাল বিংশতি সহস্র বৎসর ছিল। ভিক্ষুগণ, এক্ষণে আমার আয়ু নগণ্য এবং অল্পকাল স্থায়ী, এক্ষণে যে দীর্ঘকাল জীবিত থাকে তাহার আয়ুপরিমাণ অল্পাধিক একশত বৎসর।

৮. “ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী পাটলীবৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। ভগবান শিখী পুণ্ডরীকের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। ভগবান বেস্সভূ শালবৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। ভগবান ককুসন্ধ শিরীষবৃক্ষমূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। ভগবান কোণাগমন উডুম্বরবৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। ভগবান কস্সপ নিগ্রোধবৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। ভিক্ষুগণ, বর্তমান সময়ে অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ আমি অশ্বত্থবৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছি।”

৯. “ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সীর খণ্ড এবং তিস্স নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। ভগবান শিখীর অভিভূ এবং সম্ভব নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। ভগবান বেস্সভূর সোণ এবং উত্তর নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। ভগবান ককুসন্ধের বিধূর এবং সঞ্জীব নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। ভগবান কোণাগমনের ভিয্যোস এবং উত্তর নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। ভগবান কস্সপের তিস্স এবং ভরদ্বাজ নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। ভিক্ষুগণ, বর্তমানে আমার সারিপুত্র এবং মোগ্গল্লায়ন নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক আছেন।”

১০. “ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সীর শ্রাবকগণের তিনটি সম্মিলন হইয়াছিল। একটিতে অষ্ট-ষষ্টিলক্ষ ভিক্ষুর সমাগম হইয়াছিল। একটিতে এক লক্ষ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। একটিতে অশীতি সহস্র ভিক্ষু মিলিত হইয়াছিলেন। ভগবান বিপস্সীর শ্রাবকগণের ওইরূপ তিন সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

“ভগবান শিখীর শ্রাবকগণের তিন সম্মিলন হইয়াছিল। একটিতে এক লক্ষ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। একটিতে অশীতি সহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। একটিকে সপ্ততি সহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবান শিখীর শ্রাবকগণের ওইরূপ তিন সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

“ভগবান বেস্সভূর শ্রাবকগণের তিন সম্মিলন হইয়াছিল। একটিতে অশীতি সহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন, একটিতে সপ্ততি সহস্র ভিক্ষু এবং একটিতে ষষ্টিসহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবান বেস্সভূর শ্রাবকগণের ওইরূপ তিন সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

“ভগবান ককুসন্ধের শ্রাবকগণের একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে চত্বারিংশ সহস্র ভিক্ষুর সমাগম হইয়াছিল। ভগবান ককুসন্ধের শ্রাবকগণের ওই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

“ভগবান কোণাগমনের শ্রাবকগণের একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে ত্রিংশ সহস্র ভিক্ষুর সমাগম হইয়াছিল। ভগবান কোণাগমনের শ্রাবকগণের ওই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

“ভগবান কস্সপের শ্রাবকগণের একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে বিংশতি সহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। তাঁহার শ্রাবকদিগের ওই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

“বর্তমানে আমার শ্রাবকগণের একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে একসহস্র দুইশত পঞ্চাশৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভিক্ষুগণ, আমার শ্রাবকগণের ওই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, মিলিত ভিক্ষুগণ সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন।”

১১. “ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সীর অশোক নামক একজন ভিক্ষু প্রধান পরিচারক ছিলেন। ভগবান শিখীর ক্ষেমঙ্কর নামক ভিক্ষু, ভগবান বেস্সভূর উপসন্নক নামক ভিক্ষু, ভগবান ককুসন্ধের বুদ্ধিজ নামক ভিক্ষু, ভগবান কোণাগমনের সোত্থিজ নামক ভিক্ষু, ভগবান কস্সপের সব্বমিত্ত নামক ভিক্ষু প্রধান পরিচারক ছিলেন। বর্তমানে আমার আনন্দ নামক ভিক্ষু প্রধান পরিচারক।”

১২. “ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সীর পিতার নাম রাজা বন্ধুমা, মাতার নাম বন্ধুমতী। বন্ধুমতী নামক নগর রাজা বন্ধুমার রাজধানী ছিল।”

“ভগবান শিখীর পিতার নাম রাজা অরুণ, মাতার নাম প্রভাবতী। অরুণবতী নামক নগর রাজা অরুণের রাজধানী ছিল।”

“ভগবান বেস্সভূর পিতার নাম রাজা সুপ্রতীত, মাতার নাম যশবতী। অনোপম নামক নগর রাজা সুপ্রতীতের রাজধানী ছিল।”

“অগ্নিদত্ত নামে ব্রাহ্মণ ভগবান ককুসন্ধের পিতা ছিলেন, বিশাখা নাম্নী ব্রাহ্মণী তাঁহার মাতা। ওই সময়ে ক্ষেম নামে এক রাজা ছিলেন, ক্ষেমবতী নামক নগর তাঁহার রাজধানী ছিল।”

“যজ্ঞদত্ত নামে ব্রাহ্মণ ভগবান কোণাগমনের পিতা ছিলেন, উত্তরা নাম্নী ব্রাহ্মণী তাঁহার মাতা। ওই সময়ে সোভ নামে এক রাজা ছিলেন। সোভবতী নামক নগর তাঁহার রাজধানী ছিল।”

“ব্রহ্মদত্ত নামে ব্রাহ্মণ ভগবান কস্সপের পিতা ছিলেন, ধনবতী নাম্নী ব্রাহ্মণী তাঁহার মাতা। ওই সময়ে কিকী নামে এক রাজা ছিলেন। বারাণসী নামক নগর তাঁহার রাজধানী ছিল।”

“বর্তমানে আমার পিতার নাম রাজা শুদ্ধোদন, মাতার নাম মায়াদেবী। কপিলবাস্তু নগর রাজধানী।”

ভগবান এইরূপ বলিলেন। তৎপরে সুগত আসন হইতে উত্থান করিয়া বিহারে প্রবেশ করিলেন।

১৩. অতঃপর ভগবানের প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গেই ভিক্ষুগণের মধ্যে এইরূপ কথোপকথন আরম্ভ হইল :

“বন্ধুগণ, তথাগতের কী আশ্চর্য মহিমা, কী আশ্চর্য মহানুভবতা! যেহেতু তথাগত অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ুপ্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন, “ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত।” বন্ধুগণ, ইহা কি তথাগতেরই স্বাভাবিক তীক্ষ্ণদৃষ্টি যাহার দ্বারা তিনি অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ু-প্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন, “ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত?” অথবা দেবতাগণ তথাগতকে এই বিষয় জ্ঞাপন করিয়াছেন যাহার দ্বারা তিনি অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ু-প্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন, “ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত?”

ভিক্ষুগণের এই আলোচনার মীমাংসা হইল না।

১৪. অনন্তর ভগবান সায়াহ্নে ধ্যান হইতে উত্থান করিয়া করেরি-মণ্ডলমালে উপস্থিত হইয়া নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। তদনন্তর ভগবান ভিক্ষুদিগকে সম্বোধন করিলেন :

“ভিক্ষুগণ, তোমরা এক্ষণে এইস্থানে কি কথায় নিযুক্ত ছিলে, তোমাদের কোনো কথাই বা বাধাপ্রাপ্ত হইল?”

এইরূপ কথিত হইলে ওই ভিক্ষুগণ ভগবানকে বলিলেন :

ভগবান এইস্থান হইতে প্রস্থান করিবার অব্যবহিত পরেই আমাদের মধ্যে এইরূপ কথোপকথন আরম্ভ হইল, “বন্ধুগণ, তথাগতের কী আশ্চর্য মহিমা, কী আশ্চর্য মহানুভবতা! যেহেতু তথাগত অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ুপ্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন-“ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত।” বন্ধুগণ, ইহা কি তথাগতেরই স্বাভাবিক তীক্ষ্ণদৃষ্টি যাহার দ্বারা তিনি অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ু-প্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন-“ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত?” অথবা দেবতাগণ তথাগতকে এই বিষয় জ্ঞাপন করিয়াছেন যাহার দ্বারা তিনি অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ুপ্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন-“ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত”?

“আমাদের এইরূপ কথোপকথনের মধ্যে ভগবান আসিলেন।”

১৫. “ভিক্ষুগণ, ইহা তথাগতেরই স্বাভাবিক তীক্ষ্ণদৃষ্টি যাহার দ্বারা তিনি অতীত বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ুপ্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন-“ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত।” দেবতাগণও তথাগতকে এই বিষয় জ্ঞাপন করিয়াছেন যাহার দ্বারা তিনি অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণপ্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ, সম্পন্ন-ভ্রমণ, যাঁহারা কর্মবর্ত, ক্লেশবর্ত, বিপাকবর্তরূপ ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন করিয়াছেন এবং সর্বদুঃখ হইতে মুক্ত হইয়াছেন, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ু-প্রমাণ, শ্রাবক-যুগ এবং শ্রাবক-সম্মিলন, এই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন-“ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞা-সমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত।”

“ভিক্ষুগণ, তোমরা কি পূর্বজন্ম সম্বন্ধীয় ধর্মকথা অধিকতররূপে শ্রবণ করিতে ইচ্ছা কর?”

“হে ভগবান, হে সুগত, ভগবান পূর্বজন্ম সম্বন্ধীয় ধর্মকথা বলিবার ইহা উপযুক্ত সময়, ভগবানের নিকট শ্রবণ করিয়া ভিক্ষুগণ উহা হৃদয়ে ধারণ করিবে।”

“তাহা হইলে ভিক্ষুগণ শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো, আমি বলিব।”

প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বলিলেন, “ভন্তে, উত্তম।” ভগবান বলিলেন :

১৬. ভিক্ষুগণ, আজ হইতে একনবতি কল্প পূর্বে ভগবান বিপস্সী অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। তিনি জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি কৌণ্ডিণ্য গোত্রীয় ছিলেন। তাঁহার আয়ুষ্কাল অশীতি সহস্র বৎসর ছিল। তিনি পাটলী বৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। তাঁহার খণ্ড এবং তিস্স নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। তাঁহার শ্রাবকগণের তিনটি সম্মিলন হইয়াছিল। একটিতে অষ্ট-ষষ্টি লক্ষ ভিক্ষুর সমাগম হইয়াছিল। একটিতে এক লক্ষ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। একটিতে অশীতি সহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবান বিপস্সীর শ্রাবকগণের এই তিনটি সম্মিলন হইয়াছিল। মিলিত ভিক্ষুগণের সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন। ভগবান বিপস্সীর অশোক নামক একজন ভিক্ষু প্রধান পরিচারক ছিলেন। বন্ধুমা নামে রাজা তাঁহার পিতা ছিলেন। রাজ্ঞী বন্ধুমতী তাঁহার মাতা ছিলেন। রাজা বন্ধুমার বন্ধুমতী নামক নগর রাজধানী ছিল।

১৭. ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী তুষিত দেবলোক হইতে চ্যুত হইয়া স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া মাতৃগর্ভে প্রবেশ করিলেন।

১৮. বোধিসত্ত্বের প্রতিসন্ধি গ্রহণকালে এইরূপ অদ্ভুত ঘটনার আবির্ভাব হয় :

যখন বোধিসত্ত্ব তুষিত দেবলোক হইতে চ্যুত হইয়া মাতৃকুক্ষিতে প্রবেশ করেন, তখন দেবলোক, মারভুবন, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ, ব্রাহ্মণ ও দেব-মনুষ্য সহিত এই পৃথিবীতে দেবতাগণের দেবানুভাব অতিক্রম করিয়া অপরিমিত মহান আলোকের প্রকাশ হয়। অনন্ত ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন লোকান্তরিক নিরয়-যে-স্থানে মহাবলশালী চন্দ্র ও সূর্যের কিরণও প্রবেশ করিতে অক্ষম, সেই স্থানেও দেবতাগণের দেবানুভাব অতিক্রম করিয়া অপরিমিত মহান আলোকের প্রকাশ হয়। যে সকল প্রাণী ওইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছে তাহারাও ওই আলোকে পরস্পরকে জানিতে সক্ষম হয়, “ওহে, অন্যান্য প্রাণীও এইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছে।” দশ সহস্র জগৎসম্পন্ন এই ব্রহ্মাণ্ড কম্পিত হয়, প্রকম্পিত হয়, সঞ্চালিত হয়। দেবতাগণের দেবানুভাব অতিক্রম করিয়া অপরিমেয় বিপুল দীপ্তি বিশ্বে প্রাদুর্ভূত হয়। এইরূপ অদ্ভুত ঘটনার আবির্ভাব হয়।

১৯. ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষিতে প্রবিষ্ট হন তখন তাঁহার রক্ষার জন্য চারি দেবপুত্র চারিদিকে গমন করেন, “মনুষ্য অথবা অমনুষ্য কেহই যেন বোধিসত্ত্ব অথবা তদীয় মাতার অনিষ্ট-সাধন করিতে না পারে।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২০. ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষিতে প্রবিষ্ট হন, তখন তাঁহার মাতা স্বভাবতই শীলবতী হন; প্রাণাতিপাত, অদত্তের গ্রহণ, ব্যভিচার, মৃষাবাদ, সুরামেরয়াদি মদ্যপানরূপ স্খলন হইতে বিরত হন।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২১. ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষিতে প্রবিষ্ট হন, তখন তাঁহার মাতা পুরুষের প্রতি রাগোপসংহিত চিত্ত উৎপাদন করেন না, তিনি রক্তচিত্ত পুরুষের প্রভাবের অতীত হন।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২২. ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষিতে প্রবিষ্ট হন, তখন তাঁহার মাতা পঞ্চেন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তিরূপ সুখের অধিকারিণী হন, ওই সুখের উপকরণরূপ ভোগ্যবস্তুসমূহের দ্বারা পরিবেষ্টিত ও সেবিত হইয়া বিহার করেন।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২৩. ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষিতে প্রবিষ্ট হন, তখন তাঁহার মাতা কোনো প্রকার রোগাক্রান্ত হন না, তিনি অক্লান্তদেহে সুখ অনুভব করেন, কুক্ষিনিষ্ক্রান্ত বোধিসত্ত্বকে তিনি সর্বাঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং সর্বেন্দ্রিয়সম্পন্ন দেখেন।

ভিক্ষুগণ, মনে করো একখণ্ড শুভ্র উচ্চ শ্রেণিভুক্ত, অষ্টমুখ, সুকর্তিত, স্বচ্ছ, সুনির্মল, সর্বাবয়বসম্পন্ন বৈদূর্যমণি নীল, পীত, লোহিত, শুভ্র অথবা পাণ্ডুবর্ণ সূত্রে গ্রথিত হইয়াছে। কোনো চক্ষুষ্মান পুরুষ উহা হস্তে লইয়া প্রত্যবেক্ষণ করিলেন, “এই শুভ্র, উচ্চশ্রেণিভুক্ত, অষ্টমুখ সুকর্তিত স্বচ্ছ, সুনির্মল, সর্বায়বসম্পন্ন বৈদূর্যমণি নীল, পীত, লোহিত, শুভ্র অথবা পাণ্ডুবর্ণ সূত্রে গ্রথিত হইয়াছে।” ভিক্ষুগণ, এইরূপেই যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষিতে প্রবিষ্ট হন, তখন তাঁহার মাতা কোনো রোগাক্রান্ত হন না, তিনি অক্লান্তদেহে সুখ অনুভব করেন, কুক্ষিনিষ্ক্রান্ত বোধিসত্ত্বকে তিনি সর্বাঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং সর্বেন্দ্রিয়সম্পন্ন দেখেন। ইহা বিশ্বধর্ম।

২৪. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, বোধিসত্ত্বের জন্মের পর সপ্তাহকাল অতীত হইলে তাঁহার মাতা দেহত্যাগ করেন, এবং তুষিত দেবলোকে উৎপন্ন হন।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২৫. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যেরূপ অন্যান্য স্ত্রীগণ নয় অথবা দশ মাস গর্ভধারণ করিয়া প্রসব করে, বোধিসত্ত্বের মাতা এইরূপে তাঁহাকে প্রসব করেন না, পূর্ণ দশ মাস বোধিসত্ত্ব-মাতা বোধিসত্ত্বকে গর্ভে ধারণ করিয়া প্রসব করেন।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২৬. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যেরূপ অন্যান্য স্ত্রীগণ উপবিষ্ট অথবা শায়িত অবস্থায় প্রসব করে, বোধিসত্ত্বের মাতা এইরূপে বোধিসত্ত্বকে প্রসব করেন না, তিনি দণ্ডায়মান অবস্থায় বোধিসত্ত্বকে প্রসব করেন।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২৭. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রান্ত হন, তখন দেবগণ তাঁহাকে প্রথমে গ্রহণ করেন, পরে মনুষ্যগণ।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২৮. ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রান্ত হন, তখন তিনি ভূমির স্পর্শে আনীত হন না, চারিজন দেবপুত্র তাঁহাকে গ্রহণ করিয়া মাতার সম্মুখে স্থাপিত করেন :

“দেবী, প্রসন্ন হও, তোমার মহাশক্তিসম্পন্ন পুত্র জন্মিয়াছে।” ইহা বিশ্বধর্ম।

২৯. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রান্ত হন, তখন তিনি সুনির্মল, জল, শ্লেষ্মা, রুধির অথবা অপর কোনো প্রকার অশুচি দ্বারা লিপ্ত নহেন। তখন তিনি শুদ্ধ নিষ্কলঙ্ক।” ইহা বিশ্বধর্ম।

“ভিক্ষুগণ, যেরূপ মণি-রত্ন কৌশিক বস্ত্রে নিক্ষিপ্ত হইলে উভয়ে উভয়কে কলুষিত করে না কী হেতু? উভয়েরই শুদ্ধতার নিমিত্ত-এইরূপেই যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রান্ত হন তখন তিনি সুনির্মল; জল, শ্লেষ্মা রুধির অথবা অপর কোনো প্রকার অশুচির দ্বারা লিপ্ত নহেন, তখন তিনি শুদ্ধ নিষ্কলঙ্ক।” ইহা বিশ্বধর্ম।

৩০. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রান্ত হন, তখন অন্তরীক্ষ হইতে দুইটি জলধারা নির্গত হয়; একটি শীত অপরটি উষ্ণ, যাহার দ্বারা বোধিসত্ত্ব এবং তাঁহার মাতার প্রক্ষালন কার্য সম্পন্ন হয়।” ইহা বিশ্বধর্ম।

৩১. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, সদ্যোজাত বোধিসত্ত্ব সমপাদোপরিস্থিত এবং উত্তরাভিমুখী হইয়া সপ্তপদ গমন করেন, মস্তকোপরি শ্বেতছত্র ধৃত হইলে তিনি সর্বদিকে দৃষ্টিপাতপূর্বক এই মহত্ত্বব্যঞ্জক বাক্য ঘোষণা করেন, “এই পৃথিবীতে আমি অগ্র, আমি জ্যেষ্ঠ এবং আমি শ্রেষ্ঠ, ইহাই আমার সর্বশেষ জন্ম, আর আমার পুনর্জন্ম নাই।” ইহা বিশ্বধর্ম।

৩২. “ভিক্ষুগণ, ইহা বিশ্বধর্ম যে, যখন বোধিসত্ত্ব মাতৃকুক্ষি হইতে নিষ্ক্রান্ত হন, তখন দেবলোক মারভুবন, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ, ব্রাহ্মণ ও দেব-মনুষ্য সহিত এই পৃথিবীতে দেবগণের দেবানুভাব অতিক্রম করিয়া অপরিমেয় বিপুল দীপ্তি বিশ্বে প্রাদুর্ভূত হয়। অনন্ত ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন লোকান্তরিক নিরয়, যে-স্থানে মহাবলশালী চন্দ্র ও সূর্যের কিরণও প্রবেশ করিতে অক্ষম, সেই স্থানেও দেবগণের দেবানুভাব অতিক্রম করিয়া অপরিমেয় বিপুল দীপ্তি বিশ্বে প্রাদুর্ভূত হয়। যে সকল প্রাণী ওইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছে তাহারাও ওই আলোকে পরস্পরকে জানিতে সক্ষম হয়, “ওহে, অন্যান্য প্রাণীও এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছে।” দশসহস্র জগৎসম্পন্ন এই ব্রহ্মাণ্ড কম্পিত হয়, প্রকম্পিত হয়, সঞ্চালিত হয়। দেবতাগণের দেবানুভাব অতিক্রম করিয়া অপরিমেয় বিপুল দীপ্তি বিশ্বে প্রাদুর্ভূত হয়।” ইহা বিশ্বধর্ম।

৩৩. ভিক্ষুগণ, কুমার বিপস্সীর জন্ম হইলে রাজা বন্ধুমার নিকট সংবাদ জ্ঞাপন করা হইল, “দেব, আপনার পুত্র জন্মিয়াছে, তাহাকে দর্শন করুন।” ভিক্ষুগণ, রাজা বন্ধুমা বিপস্সী কুমারকে দর্শন করিলেন এবং পরে নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণগণকে আমন্ত্রণ করিয়া বলিলেন, “আপনারা নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণ, কুমারকে দর্শন করুন।” ভিক্ষুগণ, নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণগণ কুমারকে দেখিয়া রাজাকে বলিলেন, “দেব, হৃষ্টমনা হউন, আপনার মহাপরাক্রমশালী পুত্র জন্মিয়াছে। মহারাজ, ইহা আপনার পরমলাভ যে আপনার কুলে এরূপ পুত্রের জন্ম হইয়াছে। দেব, এই কুমার দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ-সমন্বিত, ওইরূপ লক্ষণ-সমন্বিত মহাপুরুষের মাত্র দুইগতি, অন্য গতি নাই। যদি তিনি গৃহবাসী হন তাহা হইলে তিনি চক্রবর্তী রাজা হন, ধার্মিক ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা হন, তাঁহার রাজ্য শান্তিতে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হয়, তিনি সপ্তরত্নের অধিকারী হন। সপ্তরত্ন এই : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন, মন্ত্রীরত্ন। তিনি সূর, বীর শত্রুসেনামর্দনক্ষম সহস্রাধিক পুত্র লাভ করেন। তিনি এই সসাগরা পৃথিবীকে দণ্ড ও শস্ত্রবিনা ধর্মানুসারে জয় করিয়া বাস করেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া প্রব্রজ্যা আশ্রয় গ্রহণ করেন তাহা হইলে জগতে মায়াবরণমুক্ত অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন।

৩৪. “দেব, কুমার কোন কোন দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ-লক্ষণযুক্ত, যে সকল লক্ষণযুক্ত মহাপুরুষের মাত্র দুই গতি, অন্য গতি নাই? যদি তিনি গৃহবাসী হন তাহা হইলে তিনি চক্রবর্তী রাজা হইবেন, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা হইবেন, তাঁহার রাজ্য শান্তিতে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইবে, তিনি সপ্তরত্নের অধিকারী হইবেন। তাঁহার সপ্তরত্ন এই : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন, মন্ত্রীরত্ন। তিনি সূর, বীর শত্রুসেনামর্দন সহস্রাধিক পুত্র লাভ করিবেন। তিনি এই সসাগরা পৃথিবীকে বিনা দণ্ডে ও শস্ত্রে ধর্মানুসারে জয় করিয়া বাস করিবেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া অনাগারিত্ব আশ্রয় করেন, তাহা হইলে তিনি জগতে মায়াবরণমুক্ত অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হইবেন।”

৩৫. “দেব, কুমার সুপ্রতিষ্ঠিত-পাদ। ইহা কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমারের পাদতলের নিম্নদেশে সর্বাকার-পরিপূর্ণ নেমি ও নাভিসহ সহস্র অরযুক্ত চক্র বিদ্যমান। ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার আয়ত-পাষ্ণি, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার দীর্ঘাঙ্গুলিবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার মৃদু-তরুণ-হস্ত-পাদবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার জাল-হস্ত-পাদবিশিষ্ট , ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার পাদ-মধ্যবর্তী-গুল্ফযুক্ত , ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার এণি-মৃগ-সদৃশ ক্ষিপ্র-পাদবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার দণ্ডায়মান হইয়া অবনত না হইয়া উভয় হস্ততল দ্বারা জানুদেশ স্পর্শ এবং পরিমর্দন করণে সক্ষম, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমারের গুহ্যেন্দ্রিয় কোষরক্ষিত, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সুবর্ণবর্ণ কাঞ্চন সদৃশ ত্বকবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সূক্ষ্মছবিবিশিষ্ট, তজ্জন্য রজ এবং ক্লেদ তাঁহার দেহে লিপ্ত হয় না, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার একৈক লোম, তাঁহার প্রত্যেক লোমকূপে এক একটি লোম, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার নীলাঞ্জনবর্ণ, কু-লীভূত, দক্ষিণাবর্ত, ঊর্ধ্বাগ্র কেশ-বিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার দিব্য-ঋজু অঙ্গণ্ডপ্রত্যঙ্গবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সপ্ত উৎসেধাঙ্কবিশিষ্ট , ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সিংহ-পূর্বার্ধ-কায়, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমারের স্কন্ধ-গহ্বর পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার নিগ্রোধবৃক্ষের পরিধিবিশিষ্ট, বয়ঃপ্রমাণ ব্যাম, ব্যাম প্রমাণ বয়ঃ, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সমবর্তস্কন্ধ, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার শ্রেষ্ঠতম রুচিসম্পন্ন, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সিংহহনু, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার চত্বারিংশ দন্তবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সমদন্ত, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার অবিবর-দন্ত, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার সুশুভ্র দংষ্ট্রাবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার দীর্ঘ জিহ্বাবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার দিব্য কণ্ঠস্বরসম্পন্ন, করবীকভাষী, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার গাঢ়নীল নেত্রসম্পন্ন, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার গো-পক্ষ্মবিশিষ্ট, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমারের ভ্রূ-যুগমধ্যস্থ রোমরাজি অবদাত মৃদুতুলসন্নিভ, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

“দেব, কুমার উষ্ণীষ-শীর্ষ, ইহাও কুমারের মহাপুরুষ-লক্ষণসমূহের এক লক্ষণ”

৩৬. “দেব, কুমার এই দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ-লক্ষণ সমন্বিত, ওইরূপ লক্ষণ সমন্বিত মহাপুরুষের মাত্র দুই গতি, অন্য গতি নাই। যদি তিনি গৃহবাসী হন তাহা হইলে তিনি চক্রবর্তী রাজা হইবেন, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা হইবেন, তাঁহার রাজ্য শান্তিতে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত হইবে, তিনি সপ্তরত্নের অধিকারী হইবেন। তাঁহার সপ্তরত্ন এই : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন, মন্ত্রীরত্ন। তিনি সূর, বীর শত্রুসেনামর্দন সহস্রাধিক পুত্র লাভ করিবেন। তিনি এই সসাগরা পৃথিবীকে বিনা দণ্ডে ও শস্ত্রে ধর্মানুসারে জয় করিয়া বাস করিবেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া অনাগারিত্ব আশ্রয় করেন, তাহা হইলে তিনি জগতে মায়াবরণমুক্ত অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন।”

“তৎপরে, ভিক্ষুগণ, রাজা বন্ধুমা লক্ষণজ্ঞ ব্রাহ্মণগণকে নববস্ত্র পরিধান করাইয়া তাহাদিগের সর্ব বাসনা পূর্ণ করিলেন।”

৩৭. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, রাজা বন্ধুমা বিপস্সী কুমারের নিমিত্ত ধাত্রী নিযুক্ত করিলেন। কোনো ধাত্রী স্তন পান করাইতে লাগিল। কেহ রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত হইল, কেহ ক্রোড়ে লইয়া ভ্রমণ করিতে লাগিল। জন্মাবধি কুমারের উপর দিবা-রাত্রি শ্বেতছত্র ধৃত হইত, “শৈত্য, উষ্ণতা, তৃণ, রজ অথবা তুষার যেন কুমারের পীড়াদায়ক না হয়।” জন্মকাল হইতেই বিপস্সী কুমার বহুজনের প্রিয় এবং প্রীতিকর হইলেন। ভিক্ষুগণ, যেরূপ উৎপল অথবা পদ্ম, অথবা পুণ্ডরীক বহুজনের প্রিয় ও প্রীতিপ্রদ হয়, সেইরূপই বিপস্সী কুমার বহুজনের প্রিয় ও প্রীতিকর হইলেন। তিনি অঙ্ক হইতে অঙ্কান্তরে ধৃত হইতে লাগিলেন।

৩৮. “ভিক্ষুগণ, জন্ম হইতেই বিপস্সী কুমার হিমবন্ত-চারিণী কোকিলার ন্যায় মঞ্জুকণ্ঠ, চারুকণ্ঠ, মধুরকণ্ঠ এবং স্নিগ্ধকণ্ঠ হইয়াছিলেন।”

৩৯. “ভিক্ষুগণ, জন্ম হইতেই বিপস্সী কুমারের পূর্বজন্ম প্রসূত দিব্যচক্ষু উৎপন্ন হইয়াছিল, যাহা দ্বারা তিনি দিবা-রাত্রি যোজন পরিমিত স্থান সম্পূর্ণরূপে দর্শন করিতেন।”

৪০. “ভিক্ষুগণ, জন্ম হইতেই বিপস্সী কুমার ত্রয়স্ত্রিংশ দেবগণের ন্যায় অনিমেষ দৃষ্টিসম্পন্ন হইয়াছিলেন। “কুমার অনিমেষ নয়নে নিরীক্ষণ করেন,” এই হেতু, ভিক্ষুগণ, কুমারের “বিপস্সী, বিপস্সী” এইরূপ নাম উৎপন্ন হইয়াছিল।

৪১. ভিক্ষুগণ, রাজা বন্ধুমা ধর্মাধিকরণে উপবিষ্ট হইয়া বিপস্সী কুমারকে অঙ্কে স্থাপন করিয়া বিচারকার্য করিতেন। বিপস্সী কুমারও পিতার অঙ্কে উপবিষ্ট হইয়া ন্যায়ের সহিত সূক্ষ্ম বিচার করিতেন। “কুমার ন্যায়ের সহিত সূক্ষ্ম বিচার করেন” এই হেতু, ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমারের “বিপস্সী, বিপস্সী”, নাম অধিকতররূপে উৎপন্ন হইয়াছিল।

৪২. তদনন্তর, ভিক্ষুগণ, রাজা বন্ধুমা বিপস্সী কুমারের নিমিত্ত তিনটি প্রাসাদ নির্মাণ করাইলেন : একটি বর্ষাকালের নিমিত্ত, একটি হেমন্তকালের নিমিত্ত, একটি গ্রীষ্মকালের নিমিত্ত এবং সর্ববিধ ভোগ বিলাসের আয়োজন করাইলেন। ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার বর্ষাকালের প্রাসাদে বর্ষার চারিমাস দিব্যসঙ্গীত-ধ্বনির মধ্যে অতিবাহিত করিতেন, প্রাসাদের নিম্নতলে অবতরণ করিতেন না।

জাতি খণ্ড সমাপ্ত।

৪৩. তৎপরে, ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার বহু শত সহস্র বৎসর অতীত হইলে সারথিকে বলিলেন, “মিত্র সারথি, উত্তম উত্তম যান প্রস্তুত করো, উদ্যানভূমি দর্শনার্থ গমন করিব।”

“দেব, তথাস্তু” এই বলিয়া, ভিক্ষুগণ, সারথি বিপস্সী-কুমারকে প্রত্যুত্তর দিয়া উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট যানসমূহ যোজনাপূর্বক বিপস্সী কুমারের নিকট জ্ঞাপন করিল, “দেব, আপনার নিমিত্ত যান প্রস্তুত, এখন আপনার যেরূপ অভিরুচি।”

“ভিক্ষুগণ, তৎপরে বিপস্সী কুমার উৎকৃষ্ট যানে আরোহণ করিয়া অনুরূপ যানসমূহের সহিত বহির্গত হইলেন।”

৪৪. ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার উদ্যানভূমিতে গমনকালে একটি পুরুষকে যাইতে দেখিলেন। পুরুষটি জীর্ণ, গোপানসী বক্র, নত, দণ্ডপরায়ণ, প্রকম্পমান, আতুর, বিগত-যৌবন। ইহা দেখিয়া তিনি সারথিকে বলিলেন, “হে সারথি, ইহা কীদৃশ পুরুষ? ইহার কেশ অন্যের ন্যায় নহে, দেহও অন্যের ন্যায় নহে।”

“দেব, ইহা বৃদ্ধপুরুষ।”

“সারথি, বৃদ্ধপুরুষ কী প্রকার?”

“দেব, ইহাই বৃদ্ধপুরুষ, পুরুষটি আর অধিককাল জীবিত থাকিবে না।”

“সারথি, আমিও কি জরাধর্মবিশিষ্ট? ইহা কি আমারও অনিবার্য নিয়তি?”

“দেব, আপনি, আমি এবং সর্বলোক জরাধর্মবিশিষ্ট, ইহা আমাদের অনিবার্য নিয়তি।”

“সারথি, তাহা হইলে আজ আর উদ্যানে যাইবার প্রয়োজন নাই, এইস্থান হইতেই অন্তঃপুরাভিমুখে প্রত্যাবর্তন করো।”

“ভিক্ষুগণ, সারথি বিপস্সী-কুমারকে “দেব, তথাস্তু” এই কথা বলিয়া তাঁহাকে অন্তঃপুরে লইয়া গেলেন। ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার অন্তঃপুরে গমন করিয়া দুঃখী ও দুর্মনা হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, “জন্মকে ধিক্‌, যেহেতু যে জাত সে জরাগ্রস্ত হইবে।”

৪৫. ভিক্ষুগণ, অনন্তর রাজা বন্ধুমা সারথিকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “সারথি, কুমার উদ্যানভ্রমণ উপভোগ করিয়াছেন তো? উদ্যানভূমি কুমারের প্রীতিকর হইয়াছে তো?”

“দেব, কুমার উদ্যান ভ্রমণ উপভোগ করেন নাই, উদ্যানভূমি তাঁহার প্রীতিকর হয় নাই।”

“সারথি, কুমার উদ্যান গমনের পথে কি দেখিয়াছিলেন?”

দেব, কুমার উদ্যানে গমনকালে একটি জীর্ণ, গোপানসী-বক্র, নত, দণ্ডপরায়ণ, প্রকম্পমান, আতুর, বিগত-যৌবন পুরুষ দেখিয়াছিলেন।” উহা দেখিয়া তিনি আমাকে এইরূপ বলিয়াছিলেন, “সারথি, ইহা কীদৃশ পুরুষ? ইহার কেশ অন্যের ন্যায় নহে, দেহও অন্যের ন্যায় নহে।” “দেব, ইহা বৃদ্ধপুরুষ।” “সারথি, বৃদ্ধপুরুষ কী প্রকার? “দেব, ইহাই বৃদ্ধপুরুষ, পুরুষটি আর অধিককাল জীবিত থাকিবে না।” “সারথি, আমিও কি জরাধর্ম-বিশিষ্ট? ইহা কি আমার অনিবার্য নিয়তি?” “দেব আপনি, আমি এবং সর্বলোক জরাধর্মবিশিষ্ট, ইহা আমাদের অনিবার্য নিয়তি।” “সারথি, তাহা হইলে আজ আর উদ্যানে যাইবার প্রয়োজন নাই, এইস্থান হইতেই অন্তঃপুরাভিমুখে প্রত্যাবর্তন করো।” “দেব, তথাস্তু” এই কথা বলিয়া আমি কুমারকে অন্তঃপুরে লইয়া গেলাম। কুমার অন্তঃপুরে গমন করিয়া দুঃখী ও দুর্মনা হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, “জন্মকে ধিক, যেহেতু যে জাত সে জরাগ্রস্ত হইবে।”

৪৬. ভিক্ষুগণ, তখন রাজা বন্ধুমা এইরূপ চিন্তা করিলেন, “বিপস্সী-কুমার রাজত্ব করিবেন না এরূপ যেন না হয়, তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা-আশ্রয় করিবেন এরূপ যেন না হয়, নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণগণের বচন যেন সত্য না হয়।”

ভিক্ষুগণ, অতঃপর রাজা বন্ধুমা বিপস্সী কুমারকে অধিকতর রূপে সর্ববিধ ভোগপরিবেষ্টিত করিলেন, যাহাতে কুমার রাজ্য ভোগ করেন, গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় না করেন, যাহাতে নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণগণের বচন মিথ্যা হয়। ভিক্ষুগণ, এইরূপে বিপস্সী কুমার সর্ববিধ ভোগানন্দে ব্যাপৃত রহিলেন।

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার বহুশত সহস্র বৎসর অতীত হইলে সারথিকে বলিলেন, “মিত্র সারথি, উত্তম উত্তম যান প্রস্তুত করো, উদ্যানভূমি দর্শনার্থ গমন করিব।

“দেব, তথাস্তু” এই বলিয়া, ভিক্ষুগণ, সারথি বিপস্সী-কুমারকে প্রত্যুত্তর দিয়া উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট যানসমূহ যোজনাপূর্বক বিপস্সী-কুমারের নিকট জ্ঞাপন করিল, “দেব, আপনার নিমিত্ত যান প্রস্তুত, এখন আপনার যেরূপ অভিরুচি।”

“ভিক্ষুগণ, তৎপরে বিপস্সী কুমার উৎকৃষ্ট যানে আরোহণ করিয়া অনুরূপ যানসমূহের সহিত বহির্গত হইলেন।”

৪৭. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার উদ্যান-ভূমিতে গমনকালে একটি পুরুষকে দেখিলেন, পুরুষটি পীড়িত, আর্ত, কঠিন রোগগ্রস্ত, স্বকীয় মূত্রকরীষের মধ্যে শায়িত, উত্থানে ও শয়নে অপরের সাহায্যপেক্ষী। এই দৃশ্য দেখিয়া কুমার সারথিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “মিত্র সারথি, এই পুরুষটি কি করিয়াছে? ইহার চক্ষুও অন্যের চক্ষুর ন্যায় নহে, স্বরও অন্যের স্বরের ন্যায় নহে।”

“দেব, পুরুষটি ব্যাধিগ্রস্ত।”

“সারথি, ব্যাধিগ্রস্ত কাহাকে বলে?”

“দেব, যে রোগে সে আক্রান্ত, ওই রোগ হইতে তাহার অব্যাহতির সম্ভাবনা অত্যল্প।”

“সারথি, আমিও কি ব্যাধির অধীন? আমিও কি ব্যাধির অতীত নহি?”

“দেব, আপনি, আমি এবং আমরা সকলেই ব্যাধির অধীন, আমরা ব্যাধির অতীত নহি।”

“তাহা হইলে, মিত্র সারথি, আজ আর উদ্যানে যাইবার প্রয়োজন নাই, এইস্থান হইতেই প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করো।”

“দেব, তথাস্তু” এই কথা বলিয়া সারথি প্রত্যাবর্তন করিল। ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া দুঃখিত ও দুর্মনা হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, “এই জন্মকে ধিক্‌! যেহেতু যে জাত সে জরা ও ব্যাধিগ্রস্ত হইবে।”

৪৮. ভিক্ষুগণ, অনন্তর রাজা বন্ধুমা সারথিকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “সারথি, কুমার উদ্যান ভ্রমণ উপভোগ করিয়াছেন তো? উদ্যানভূমি কুমারের প্রীতিকর হইয়াছে তো?”

“দেব, কুমার উদ্যান ভ্রমণ উপভোগ করেন নাই, উদ্যানভূমি তাহার প্রীতিকর হয় নাই।”

“সারথি, কুমার উদ্যান গমনের পথে কি দেখিয়াছিলেন?”

“দেব, কুমার উদ্যানে গমনকালে একটি পুরুষকে দেখিয়াছিলেন, পুরুষটি পীড়িত, আর্ত, কঠিন রোগগ্রস্ত, স্বকীয় মূত্রকরীষের মধ্যে শায়িত, উত্থানে ও শয়নে অপরের সাহায্যপেক্ষী। এই দৃশ্য দেখিয়া কুমার আমাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “সারথি, এই পুরুষটি কি করিয়াছে? ইহার চক্ষুও অন্যের চক্ষুর ন্যায় নহে।” “দেব, পুরুষটি ব্যাধিগ্রস্ত।” “সারথি, ব্যাধিগ্রস্ত কাহাকে বলে? “দেব, যে রোগে সে আক্রান্ত, ওই রোগ হইতে তাহার অব্যাহতির সম্ভাবনা অত্যল্প।” “সারথি, আমিও কি ব্যাধির অধীন? আমিও কি ব্যাধির অতীত নহি?” “দেব, আপনি, আমি এবং আমরা সকলেই ব্যাধির অধীন, আমরা ব্যাধির অতীত নহি।” “তাহা হইলে, মিত্র সারথি, আজ আর উদ্যানে যাইবার প্রয়োজন নাই। এইস্থান হইতেই প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করো।” আমি সম্মত হইয়া প্রত্যাবর্তন করিলাম। কুমার অন্তঃপুরে প্রবেশ করিয়া দুঃখিত ও দুর্মনা হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, এই জন্মকে ধিক্‌, যেহেতু যে জাত সে জরা ও ব্যাধিগ্রস্ত হইবে।”

৪৯. ভিক্ষুগণ, তখন রাজা বন্ধুমা এইরূপ চিন্তা করিলেন, “বিপস্সী-কুমার রাজত্ব করিবেন না এরূপ যেন না হয়, তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিবেন এরূপ যেন না হয়, নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণগণের বচন যেন সত্য না হয়।”

ভিক্ষুগণ, অতঃপর রাজা বন্ধুমা বিপস্সী কুমারকে অধিকতররূপে সর্ববিধ ভোগপরিবেষ্টিত করিলেন, যাহাতে কুমার রাজ্য ভোগ করেন, গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় না করেন, যাহাতে নৈমিত্তিক ব্রাহ্মণগণের বচন মিথ্যা হয়। ভিক্ষুগণ, এইরূপে বিপস্সী কুমার সর্ববিধ ভোগানন্দে ব্যাপৃত রহিলেন।

অতঃপর ভিক্ষুগণ, বিপস্সী-কুমার বহুশত সহস্র বৎসর অতীত হইলে সারথিকে বলিলেন, “মিত্র সারথি, উত্তম উত্তম যান প্রস্তুত করো, উদ্যানভূমি দর্শনার্থ গমন করিব।”

“দেব, তথাস্তু” এই বলিয়া, ভিক্ষুগণ, সারথি বিপস্সী-কুমারকে প্রত্যুত্তর দিয়া উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট যানসমূহ যোজনাপূর্বক বিপস্সী কুমারের নিকট জ্ঞাপন করিল, “দেব, আপনার নিমিত্ত যান প্রস্তুত, এখন আপনার যেরূপ অভিরুচি।”

“ভিক্ষুগণ, তৎপরে বিপস্সী কুমার উৎকৃষ্ট যানে আরোহণ করিয়া অনুরূপ যানসমূহের সহিত বহির্গত হইলেন।”

৫০. ভিক্ষুগণ, বিপস্সী-কুমার উদ্যান-ভূমিতে গমনকালে দেখিলেন সম্মিলিত বৃহৎ জনসংঘ নানাবর্ণরঞ্জিত বস্ত্রের দ্বারা চিতা নির্মাণে রত। উহা দেখিয়া তিনি সারথিকে জিজ্ঞাসা করিলেন :

“সারথি, সম্মিলিত এই বৃহৎ জনসংঘ নানাবর্ণরঞ্জিত বস্ত্রে কি নিমিত্ত চিতা নির্মাণে রত?”

“দেব, যেহেতু এক ব্যক্তির মৃত্যু হইয়াছে।”

“তাহা হইলে, সারথি, ওই মৃতের সন্নিধানে রথ চালনা করো।”

“তথাস্তু” এই কথা বলিয়া সারথি মৃতের সন্নিধানে রথ চালনা করিল। ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার মৃতদেহ দেখিলেন এবং সারথিকে জিজ্ঞাসা করিলেন :

“সারথি, মৃত কাহাকে বলে?”

“দেব, মৃতের মাতা, পিতা অথবা অন্যান্য জ্ঞাতিবর্গ কেহই আর তাহাকে দেখিতে পাইবে না। সেও মাতা, পিতা অথবা অন্যান্য জ্ঞাতিবর্গকে আর দেখিতে পাইবে না।”

“সারথি, আমিও কি মরণধর্ম-বিশিষ্ট? আমিও কি মরণের অতীত নহি? আমাকেও কি রাজা, রাণী অথবা অপরাপর জ্ঞাতিবর্গ আর দেখিতে পাইবে না? আমিও কি তাঁহাদিগকে আর দেখিতে পাইব না?”

“দেব, আপনি ও আমি এবং আমরা সকলেই মরণধর্মযুক্ত, মরণের অতীত নহি। আপনাকেও রাজা, রাণী অথবা অপরাপর জ্ঞাতিবর্গ দেখিতে পাইবেন না, আপনিও তাঁহাদের দেখিতে পাইবেন না।”

“তাহা হইলে, সারথি, আজ আর উদ্যানে যাইবার প্রয়োজন নাই, এই স্থান হইতেই প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করো।”

“তথাস্তু” বলিয়া, ভিক্ষুগণ, সারথি সেই স্থান হইতেই প্রত্যাবর্তন করিল। বিপস্সী কুমার অন্তঃপুরে প্রবিষ্ট হইয়া দুঃখিত ও দুর্মনা হইয়া চিন্তা করিতে লাগিলেন, “জন্মকে ধিক্‌, যেহেতু যাহার জন্ম হইয়াছে সে জরা, ব্যাধি ও মরণগ্রস্ত হইবে।”

৫১-৫২. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, রাজা বন্ধুমা সারথিকে পূর্বের ন্যায় প্রশ্ন করিলেন এবং পূর্বের ন্যায় বিপস্সী-কুমারকে অধিকতররূপে সর্ববিধ ভোগ পরিবেষ্টিত করিলেন। এইরূপে বিপস্সী কুমার সর্ববিধ ভোগানন্দে ব্যাপৃত রহিলেন।

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার বহুশত সহস্র বৎসর অতীত হইলে সারথিকে বলিলেন :

“মিত্র সারথি, উত্তম উত্তম যান প্রস্তুত করো, উদ্যানভূমি দর্শনার্থ গমন করিব।”

“দেব, তথাস্তু” এই বলিয়া, ভিক্ষুগণ, সারথি বিপস্সী কুমারকে প্রত্যুত্তর দিয়া উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট যানসমূহ যোজনাপূর্বক বিপস্সী কুমারের নিকট জ্ঞাপন করিল, “দেব, আপনার নিমিত্ত যান প্রস্তুত, এখন আপনার যেরূপ অভিরুচি।”

ভিক্ষুগণ, তৎপরে বিপস্সী কুমার উৎকৃষ্ট যানে আরোহণ করিয়া অনুরূপ যানসমূহের সহিত বহির্গত হইলেন।

৫৩. ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার উদ্যানভূমিতে গমনকালে এক মুণ্ডিতমস্তক, কাষায়বস্ত্র পরিহিত প্রব্রজিত পুরুষকে দেখিয়া সারথিকে জিজ্ঞাসা করিলেন :

“সারথি, এই পুরুষটি কি করিয়াছে, যাহার জন্য তাহার মস্তক অন্যের মস্তকের ন্যায় নহে, বস্ত্রও অন্যের ন্যায় নহে?”

“দেব, পুরুষটি প্রব্রজিত।”

“সারথি, প্রব্রজিত কাহাকে বলে?”

“দেব, যিনি প্রব্রজিত তিনি ধর্মচর্যা, শমচর্যা কুশলক্রিয়া পুণ্যকর্ম অহিংসা এবং সর্ব প্রাণীর প্রতি অনুকম্পায় পূর্ণতা প্রাপ্ত।”

“সারথি, যিনি প্রব্রজিত তিনি সাধু, সাধু ধর্মচর্যা, সাধু শমচর্যা, সাধু কুশলধর্ম, সাধু পুণ্যকর্ম, সাধু অহিংসা, সাধু সর্ব প্রাণীর প্রতি অনুকম্পা। সারথি, এইবার ওই প্রব্রজিতের নিকট রথ চালনা করো।

“তথাস্তু” বলিয়া সারথি প্রব্রজিতের নিকট রথ চালনা করিল। ভিক্ষুগণ, তৎপরে বিপস্সী কুমার সেই প্রব্রজিতকে এইরূপে বলিলেন, “সৌম্য, কী নিমিত্ত আপনার মস্তক অন্যের মস্তকের ন্যায় নহে, বস্ত্রও অন্যের ন্যায় নহে?”

“দেব, আমি প্রব্রজিত।”

“সৌম্য, উহার অর্থ কী?”

“দেব, যিনি প্রব্রজিত তিনি ধর্মচর্যা, শমচর্যা, কুশলকর্ম, পুণ্যকর্ম, অহিংসা এবং সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পায় পূর্ণতা প্রাপ্ত।”

“সৌম্য, সাধু আপনার ন্যায় প্রব্রজিত, সাধু ধর্মচর্যা, সাধু শমচর্যা, সাধু কুশলকর্ম, সাধু পুণ্যকর্ম, সাধু অহিংসা, সাধু সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পা।”

৫৪. তৎপরে, ভিক্ষুগণ, বিপস্সী কুমার সারথিকে বলিলেন :

“সারথি, রথ লইয়া এই স্থান হইতেই প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করো। আমি এই স্থানেই কেশ ও শ্মশ্রূ মোচনপূর্বক কাষায় বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিব।”

“তথাস্তু, দেব” বলিয়া সারথি সেইস্থান হইতে রথ লইয়া প্রাসাদে প্রত্যাবর্তন করিল। বিপস্সী কুমারও সেই স্থানেই কেশ ও শ্মশ্রূ মোচনপূর্বক কাষায় বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিলেন।”

৫৫. “ভিক্ষুগণ, রাজধানী বন্ধুমতী নগরের চতুরশীতি সহস্র মনুষ্য শুনিল, “বিপস্সী কুমার কেশ ও শ্মশ্রূ মোচন করিয়া কাষায় বস্ত্র পরিধান করিয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিয়াছেন।” ইহা শুনিয়া তাহারা চিন্তা করিল, “যে ধর্ম-বিনয়ে বিপস্সী কুমার কেশ-শ্মশ্রূ মোচনপূর্বক কাষায় পরিহিত হইয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিয়াছেন ওই ধর্ম-বিনয় কখনোই হীন নহে, ওই প্রব্রজ্যা কখনোই হীন নহে। যখন রাজকুমার বিপস্সী এইপথ আশ্রয় করিয়াছেন, তখন আমরাই বা কেন তাহা না করি?” অনন্তর ভিক্ষুগণ, সেই চতুরশীতি সহস্র মানব বিপস্সী বোধিসত্ত্বের অনুকরণে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিল। ভিক্ষুগণ, এইরূপে সেই জনসংঘ পরিবেষ্টিত হইয়া বিপস্সী বোধিসত্ত্ব গ্রাম নগর রাজধানীসমূহে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন।

৫৬. ভিক্ষুগণ, তদনন্তর বোধিসত্ত্ব বিপস্সী যখন নির্জনে ধ্যানরত ছিলেন, তখন তাঁহার মনে এই চিন্তার উদয় হইল :

“বহুজন পরিবেষ্টিত হইয়া অবস্থান করা আমার অনুপযুক্ত। আমি জনসংঘ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া অবস্থান করিব।”

তৎপরে, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া একাকী বিহার করিতে লাগিলেন। সেই চতুরশীতি সহস্র প্রব্রজিত এক পথ ধরিয়া প্রস্থান করিল, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী অন্যপথ ধরিলেন।

৫৭. তৎপরে, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী একদিন যখন স্বকীয় বাসস্থানে ধ্যানরত ছিলেন, তখন তাঁহার মনে এইরূপ চিন্তার উদয় হইল :

“এই জগৎ দুঃখাপন্ন, এইস্থানে জন্ম, জরা ও মৃত্যু, চ্যুতি এবং পুনরুৎপত্তি; অথচ এই জরামরণরূপ দুঃখ হইতে মুক্তির উপায় কেহই অবগত নয়। এই জরামরণরূপ দুঃখ হইতে মুক্তির উপায় কোন দিনে উদ্ঘাটিত হইবে?”

তৎপরে, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে জরা-মরণ হয়? কোন হেতু হইতে উহা উদ্ভূত?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “জাতি বর্তমানে জরা-মরণ, জাতিরূপ হেতু হইতে জরা-মরণের উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে জাতির জন্ম হয়? কোন হেতু হইতে জাতির উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “ভব বর্তমানে জাতি, ভবরূপ হেতু হইতে জাতির উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে ভব হয়? কোন হেতু হইতে ভবের উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “উপাদান বর্তমানে ভব, উপাদানরূপ হেতু হইতে ভবের উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে উপাদান হয়? কোন হেতু হইতে উপাদানের উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “তৃষ্ণা বর্তমানে উপাদান, তৃষ্ণারূপ হেতু হইতে উপাদানের উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে তৃষ্ণা হয়? কোন হেতু হইতে তৃষ্ণার উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “বেদনা বর্তমানে তৃষ্ণা, বেদনারূপ হেতু হইতে তৃষ্ণার উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে বেদনা হয়? কোন হেতু হইতে বেদনার উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “স্পর্শ বর্তমানে বেদনা, স্পর্শরূপ হেতু হইতে বেদনার উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে স্পর্শ হয়? কোন হেতু হইতে স্পর্শের উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “ষড়ায়তন বর্তমানে স্পর্শ, ষড়ায়তনরূপ হেতু হইতে স্পর্শের উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে ষড়ায়তন হয়? কোনো হেতু হইতে ষড়ায়তনের উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “নামরূপ বর্তমানে ষড়ায়তন, নামরূপ রূপ হেতু হইতে ষড়ায়তনের উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে নামরূপ হয়? কোন হেতু হইতে নামরূপের উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “বিজ্ঞান বর্তমানে নামরূপ, বিজ্ঞানরূপ হেতু হইতে নামরূপের উৎপত্তি।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের বর্তমানে বিজ্ঞান হয়? কোন হেতু হইতে বিজ্ঞানের উৎপত্তি?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “নামরূপ বর্তমানে বিজ্ঞান, নামরূপ রূপ হেতু হইতে বিজ্ঞানের উৎপত্তি।”

৫৮. ভিক্ষুগণ, অতঃপর বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “নামরূপ হইতে বিজ্ঞানের পুনরাবর্তন হয়, উহা নামরূপকে অতিক্রম করে না। এইরূপেই জন্ম হয়, বার্ধক্য হয়, মৃত্যু হয় এবং চ্যুতি ও পুনরুৎপত্তি হয়; যথা : নামরূপ হইতে বিজ্ঞানের উৎপত্তি, বিজ্ঞান হইতে নামরূপের উৎপত্তি, নামরূপ হইতে ষড়ায়তনের উৎপত্তি, ষড়ায়তন হইতে স্পর্শ, স্পর্শ হইতে বেদনা, বেদনা হইতে তৃষ্ণা, তৃষ্ণা হইতে উপাদান, উপাদান হইবে ভব, ভব হইতে জাতি, জাতি হইতে জরা-মরণ, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দৌর্মনস্য এবং নৈরাশ্যের উৎপত্তি। এইরূপেই সমগ্র দুঃখস্কন্ধের উদয় হয়।

৫৯. ভিক্ষুগণ, “উদয়, উদয়” এই চিন্তা করিতে করিতে বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর অশ্রুতপূর্ব ধর্মসমূহে চক্ষু উৎপন্ন হইল, জ্ঞান উৎপন্ন হইল, প্রজ্ঞা উৎপন্ন হইল, বিদ্যা উৎপন্ন হইল, আলোক উৎপন্ন হইল।

৬০. ভিক্ষুগণ, অতঃপর বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে জরা-মরণ থাকে না? কীসের নিরোধে জরা-মরণের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “জাতির অবর্তমানে জরা-মরণ হয় না, জাতির নিরোধে জরা-মরণের নিরোধ হয়।”

ভিক্ষুগণ, অতঃপর বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে জাতি থাকে না? কীসের নিরোধে জাতির নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “ভবের অবর্তমানে জাতি থাকে না, ভবের নিরোধে জাতির নিরোধ হয়।

ভিক্ষুগণ, অতঃপর বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে ভব হয় না? কীসের নিরোধে ভবের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনোসযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “উপাদানের অবর্তমানে ভব হয় না, উপাদানের নিরোধে ভবের নিরোধ হয়।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে উপাদান হয় না? কীসের নিরোধে উপাদানের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “তৃষ্ণার অবর্তমানে উপাদান হয় না, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ হয়।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে তৃষ্ণা হয় না? কীসের নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ হয়? ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “বেদনার অবর্তমানে তৃষ্ণা হয় না, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ হয়।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে বেদনা হয় না? কীসের নিরোধে বেদনার নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “স্পর্শের অবর্তমানে বেদনা হয় না, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ হয়।”

অতঃপর ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে স্পর্শ হয় না? কীসের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “ষড়ায়তনের অবর্তমানে স্পর্শ হয় না, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ হয়।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে ষড়ায়তন হয় না? কীসের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “নামরূপের অবর্তমানে ষড়ায়তন হয় না, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ হয়।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে নামরূপ হয় না? কীসের নিরোধে নামরূপের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “বিজ্ঞানের অবর্তমানে নামরূপ হয় না; বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ হয়।”

অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “কীসের অবর্তমানে বিজ্ঞান হয় না? কীসের অবর্তমানে বিজ্ঞানের নিরোধ হয়?” ভিক্ষুগণ, তখন বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর, গাঢ় মনঃসংযোগের ফলে প্রজ্ঞা হইতে উদ্ভূত উপলব্ধি জন্মিল, “নামরূপের অবর্তমানে বিজ্ঞান হয় না; নামরূপের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ হয়।”

৬১. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “জ্ঞানালোক প্রাপ্তির নিমিত্ত এই বিপশ্যনা মার্গ আমার অধিগত, উহা এই, নামরূপের নিরোধে বিজ্ঞানের নিরোধ, বিজ্ঞানের নিরোধে নামরূপের নিরোধ, নামরূপের নিরোধে ষড়ায়তনের নিরোধ, ষড়ায়তনের নিরোধে স্পর্শের নিরোধ, স্পর্শের নিরোধে বেদনার নিরোধ, বেদনার নিরোধে তৃষ্ণার নিরোধ, তৃষ্ণার নিরোধে উপাদানের নিরোধ, উপাদানের নিরোধে ভব-নিরোধ, ভব-নিরোধ হইতে জাতি-নিরোধ, জাতি-নিরোধ হইতে জরা-মরণ, শোক, বিলাপ, দুঃখ, দৌর্মনস্য, নৈরাশ্য নিরুদ্ধ হয়; এইরূপেই সমগ্র দুঃখস্কন্ধের নিরোধ হয়।

ভিক্ষুগণ, “নিরোধ, নিরোধ” এই চিন্তা করিতে করিতে বোধিসত্ত্ব বিপস্সীর অশ্রুতপূর্ব ধর্মসমূহে চক্ষু উৎপন্ন হইল, জ্ঞান উৎপন্ন হইল, প্রজ্ঞা উৎপন্ন হইল, বিদ্যা উৎপন্ন হইল, আলোক উৎপন্ন হইল।

৬৩. তৎপরে, ভিক্ষুগণ, বোধিসত্ত্ব বিপস্সী পঞ্চ উপাদানস্কন্ধে উদয়-ব্যয়দর্শী হইয়া বিহার করিতে লাগিলেন, “ইহা রূপ; ইহা রূপের উদয়, ইহা রূপের অস্ত; ইহা বেদনা, ইহা বেদনার উদয়, ইহা বেদনার অস্ত; ইহা সংজ্ঞা, ইহা সংজ্ঞার উদয়, ইহা সংজ্ঞার অস্ত, ইহা সংস্কার, ইহা সংস্কারের উদয়, ইহা সংস্কারের অস্ত; ইহা বিজ্ঞান, ইহা বিজ্ঞানের উদয়, ইহা বিজ্ঞানের অস্ত।”

পঞ্চ উপাদান স্কন্ধের উৎপত্তি ও বিনাশ দেখিয়া বিহার করিতে করিতে অচিরে তাঁহার চিত্ত আসবহীন হইয়া বিমুক্ত হইল।

দ্বিতীয় ভাণবার সমাপ্ত।

৬৪. ভিক্ষুগণ, অতঃপর ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন, “আমি ধর্ম প্রচার করিব।”

তখন, ভিক্ষুগণ, তাঁহার মনে এইরূপ হইল, “আমার অধিগত ধর্ম গম্ভীর, দুর্দর্শ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত বেদনীয়। কিন্তু মানুষগণ আসক্তি-প্রিয়, আসক্তিরত, আসক্তি-প্রমোদী। যাহারা আসক্তি-প্রিয়, আসক্তিরত, আসক্তি-প্রমোদী তাহাদের পক্ষে “ইহা হইতে ইহার উৎপত্তি হয়” রূপ প্রতীত্যসমুৎপাদ অবধারণ করা কঠিন। ইহাও তাহাদের পক্ষে অবধারণ করা কঠিন যে, সর্ব সংস্কারের শান্তি, সর্ব উপাধির পরিহার, তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ এবং নিরোধই নির্বাণ। আমি ধর্ম প্রচার করিলে অপরে যদি তাহা গ্রহণ করিতে অক্ষম হয়, তাহা হইলে উহা আমার পক্ষে শ্রান্তিজনক ও বিরক্তিকর হইব।”

৬৫. ভিক্ষুগণ, সত্যই তৎমুহূর্তে ভগবান অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ বিপস্সীর মনে অশ্রুতপূর্ব এই গাথাগুলি প্রতিভাত হইল :

“আমি বহু কষ্টে অর্জিয়াছি যাহা,
কাজ নাই প্রকাশ করিয়া তাহা,
রাগ-দোষে লিপ্ত নর যারা,
এই ধর্ম বুঝিবে না তাহা!
প্রতিস্রোতগামী ইহা নিপুণ গম্ভীর,
দুর্দর্শ সুসূক্ষ্ম ইহা রাগরক্ত যারা
অবিদ্যার অন্ধকারে ঢাকা বুঝিবে না ইহা তারা।”

ভিক্ষুগণ, এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ বিপস্সী নিরুৎসাহ হইলেন, ধর্মদেশনায় তাঁহার প্রবৃত্তি হইল না। ভিক্ষুগণ, তখন মহাব্রহ্মা স্বচিত্তে ভগবান বিপস্সীর চিত্ত-বিতর্ক জ্ঞাত হইয়া এইরূপ চিন্তা করিলেন, “হায়! এই জগৎ নষ্ট হইবে, বিনষ্ট হইবে, যেহেতু ভগবান বিপস্সীর চিত্ত উৎসাহহীন হইয়া ধর্মদেশনায় প্রবৃত্ত হইতেছে না।”

৬৬. অনন্তর, ভিক্ষুগণ, সেই মহাব্রহ্মা, যেরূপ বলবান পুরুষ সংকুচিত বাহু প্রসারিত করে, অথবা প্রসারিত বাহু সংকুচিত করে, সেইরূপই ব্রহ্মলোক হইতে অন্তর্হিত হইয়া ভগবান বিপস্সীর সম্মুখে অবির্ভূত হইলেন। তৎপরে, ভিক্ষুগণ, মহাব্রহ্মা একাংশ উত্তরাসঙ্গে আবৃত করিয়া দক্ষিণজানুমণ্ড ভূমিতে স্থাপন করিয়া ভগবান বিপস্সীর দিকে অঞ্জলি প্রণত করিয়া তাঁহাকে এইরূপ বলিলেন, “হে ভগবান, ধর্মপ্রচার করুন, হে সুগত ধর্মপ্রচার করুন, সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণীও আছে। ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে।

৬৭. ভিক্ষুগণ, এইরূপ উক্ত হইলে ভগবান বিপস্সী মহাব্রহ্মাকে বলিলেন,

“ব্রহ্মা, আমারও মনে এইরূপ হইয়াছিল, “আমি ধর্মপ্রচার করিব।” কিন্তু আমি চিন্তা করিলাম, “আমার অধিগম ধর্ম গম্ভীর, দুর্দর্শ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত বেদনীয়। কিন্তু মানুষগণ আসক্তি-প্রিয়, আসক্তিরত, আসক্তি-প্রমোদী। যাহারা আসক্তি-প্রিয়, আসক্তিরত, আসক্তি-প্রমোদী তাহাদের পক্ষে “ইহা হইতে ইহার উৎপত্তি হয়” রূপ প্রতীত্যসমুৎপাদ অবধারণ করা কঠিন। ইহাও তাহাদের পক্ষে অবধারণ করা কঠিন যে, সর্ব সংস্কারের শান্তি, সর্ব উপাধির পরিহার, তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ এবং নিরোধই নির্বাণ। আমি ধর্ম প্রচার করিলে অপরে যদি তাহা গ্রহণ করিতে অক্ষম হয়, তাহা হইলে উহা আমার পক্ষে শ্রান্তিজনক ও বিরক্তিকর হইবে।” তন্মুহূর্তে আমার মনে অশ্রুতপূর্ব এই গাথাগুলি প্রতিভাত হইল :

“আমি বহু কষ্টে অর্জিয়াছি যাহা,
কাজ নাই প্রকাশ করিয়া তাহা,
রাগ-দোষে লিপ্ত নর যারা,
এই ধর্ম বুঝিবে না তাহা!
প্রতিস্রোতগামী ইহা নিপুণ গম্ভীর,
দুর্দর্শ সুসূক্ষ্ম ইহা রাগরক্ত যারা
অবিদ্যার অন্ধকারে ঢাকা বুঝিবে না ইহা তারা।”

“ব্রহ্মা, এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে আমি নিরুৎসাহ হইলাম, ধর্মদেশনায় আমার প্রবৃত্তি হইল না।”

৬৮. ভিক্ষুগণ, দ্বিতীয়বার মহাব্রহ্মা বিপস্সীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন :

“হে ভগবান, ধর্মপ্রচার করুন, হে সুগত ধর্মপ্রচার করুন, সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণীও আছে। ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে।”

“ব্রহ্মা, আমারও মনে এইরূপ হইয়াছিল, “আমি ধর্মপ্রচার করিব।” কিন্তু আমি চিন্তা করিলাম, “আমার অধিগম ধর্ম গম্ভীর, দুর্দর্শ, দুরানুবোধ, শান্ত, প্রণীত, অতর্কাবচর, নিপুণ, পণ্ডিত বেদনীয়। কিন্তু মানুষগণ আসক্তি-প্রিয়, আসক্তিরত, আসক্তি-প্রমোদী। যাহারা আসক্তি-প্রিয়, আসক্তিরত, আসক্তি-প্রমোদী তাহাদের পক্ষে “ইহা হইতে ইহার উৎপত্তি হয়” রূপ প্রত্যতীসমুৎপাদ অবধারণ করা কঠিন। ইহাও তাহাদের পক্ষে অবধারণ করা কঠিন যে, সর্ব সংস্কারের শান্তি, সর্ব উপাধির পরিহার, তৃষ্ণাক্ষয়, বিরাগ এবং নিরোধই নির্বাণ। আমি ধর্ম প্রচার করিলে অপরে যদি তাহা গ্রহণ করিতে অক্ষম হয়, তাহা হইলে উহা আমার পক্ষে শ্রান্তিজনক ও বিরক্তিকর হইবে।” তন্মুহূর্তে আমার মনে অশ্রুতপূর্ব এই গাথাগুলি প্রতিভাত হইল :

“আমি বহু কষ্টে অর্জিয়াছি যাহা,
কাজ নাই প্রকাশ করিয়া তাহা,
রাগ-দোষে লিপ্ত নর যারা,
এই ধর্ম বুঝিবে না তাহা!
প্রতিস্রোতগামী ইহা নিপুণ গম্ভীর,
দুর্দর্শ সুসূক্ষ্ম ইহা রাগরক্ত যারা
অবিদ্যার অন্ধকারে ঢাকা বুঝিবে না ইহা তারা।”

“ব্রহ্মা, এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে আমি নিরুৎসাহ হইলাম, ধর্মদেশনায় আমার প্রবৃত্তি হইল না।”

“ভিক্ষুগণ, তৃতীয়বার মহাব্রহ্মা ভগবান বিপস্সীকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “হে ভগবান, ধর্মপ্রচার করুন, হে সুগত ধর্মপ্রচার করুন, সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণীও আছে। ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে।

৬৯. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী ব্রহ্মার অনুরোধ জ্ঞাত হইয়া এবং প্রাণীগণের প্রতি করুণাপরবশ হইয়া বুদ্ধ-চক্ষু দ্বারা জগতের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন। তিনি দেখিলেন কাহারও কাহারও চক্ষু ধূলি-মল বিরহিত, কাহারও বা চক্ষু ধূলির তমসায় আবৃত, কেহ তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয়বিশিষ্ট, কেহ মৃদু ইন্দ্রিয়, কেহ সুপ্রবৃত্তিসম্পন্ন, কেহ দুষ্প্রবৃত্তি, কেহ বশানুগ, কেহ নহে, কেহ বা পরলোকে কেহ বা গর্হিত আচরণে ভয়দর্শী। যেরূপ উৎপল অথবা পদ্ম অথবা পুণ্ডরীক সরোবরে কোনো কোনো উৎপল অথবা পদ্ম অথবা পুণ্ডরীক জলে জন্মিয়া, জলে বর্ধিত হইয়া, জলানুগত হইয়া জলে নিমগ্ন হইয়া পুষ্টিলাভ করে; কোনো কোনো উৎপল অথবা পদ্ম অথবা পুণ্ডরীক জলে জন্মিয়া জলে বর্ধিত হইয়া সমোদক হইয়া জলতলে অবস্থান করে; কোনো কোনো উৎপল অথবা পদ্ম অথবা পুণ্ডরীক জলে জন্মিয়া জলে বর্ধিত হইয়া জল হইতে ঊর্ধ্বে অবস্থান করে এবং জলে লিপ্ত হয় না; এইরূপেই ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী বুদ্ধচক্ষু দ্বারা জগৎকে অবলোকন করিয়া দেখিলেন কোনো কোনো প্রাণীর চক্ষু ধূলি-মল বিরহিত, কাহারও বা চক্ষু ধূলির তমসায় আবৃত, কেহ তীক্ষ্ণ ইন্দ্রিয়বিশিষ্ট কেহ মৃদু ইন্দ্রিয়, কেহ সুপ্রবৃত্তিসম্পন্ন, কেহ দুষ্প্রবৃত্তি, কেহ বশানুগ, কেহ নহে, কেহ বা পরলোকে, কেহ বা গর্হিত আচরণে ভয়দর্শী।

৭০. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, মহাব্রহ্মা স্বচিত্তে ভগবান বিপস্সীর চিত্ত-বিতর্ক জ্ঞাত হইয়া তাঁহাকে গাথায় সম্বোধন করিলেন :

“যেরূপ পর্বতচূড়াস্থ শৈলখণ্ডে স্থিত মনুষ্য
চতুর্দিকস্থ জনগণকে নিরীক্ষণ করে, সেইরূপ,
হে সুমেধ! সর্বদর্শী! তুমি ধর্মময় প্রাসাদে
আরোহণপূর্বক, হে শোক-রহিত, শোকাবতীর্ণ
জাতিজরাভিভূত মনুষ্যগণকে নিরীক্ষণ কর;
হে সংগ্রাম-বিজয়ী, সার্থবাহ, অঋণী বীর,
উঠো, জগতে বিচরণ করো, হে ভগবান, ধর্ম
প্রচার করো, বোধশক্তিসম্পন্নগণ দৃষ্ট হইবে।”

৭১. তদনন্তর, ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী মহাব্রহ্মাকে গাথায় সম্বোধন করিলেন :

“যাহাদের কর্ণ আছে, তাহারা শ্রদ্ধাযুক্ত হউক,
অমৃতের দ্বার তাহাদের জন্য উন্মুক্ত!
হে ব্রহ্মা ব্যর্থ প্রয়াসের আশঙ্কায় আমি
এই মধুর, উত্তমধর্ম মনুষ্যগণকে কহি নাই।”

“ভিক্ষুগণ, তখন মহাব্রহ্মা “ভগবান বিপস্সীর নিকট ধর্ম প্রচারের প্রতিশ্রুতি লাভ করিয়াছি” এইরূপ চিন্তা করিয়া তাঁহাকে অভিবাদন এবং প্রদক্ষিণপূর্বক ওই স্থানেই অন্তর্ধান করিলেন।

৭২. অতঃপর, ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী এইরূপ চিন্তা করিলেন :

“কাহার নিকট প্রথম ধর্মপ্রচার করিব? কে এই ধর্ম ক্ষিপ্রতার সহিত বুঝিতে সক্ষম হইবে?”

তৎপরে, ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী চিন্তা করিলেন :

“রাজপুত্র খণ্ড এবং পুরোহিত পুত্র তিস্স বন্ধুমতী রাজধানীতে বাস করেন, তাঁহারা পণ্ডিত, প্রাজ্ঞ, মেধাবী, বহুদিন হইতে তাঁহাদের চক্ষু ধূলি-মল বিরহিত। অতএব সর্বপ্রথম আমি তাঁহাদের নিকটই ধর্মপ্রচার করিব, তাঁহারা এই ধর্ম ক্ষিপ্রতার সহিত বুঝিতে সক্ষম হইবেন।”

৭৩. তদনন্তর, ভিক্ষুগণ, যেরূপ বলবান পুরুষ সংকুচিত বাহু প্রসারিত করেন, প্রসারিত বাহু সংকুচিত করেন, সেইরূপ ভগবান বিপস্সী বোধিবৃক্ষমূলে অন্তর্হিত হইয়া বন্ধুমতী রাজধানীর খেম-মৃগদাবে আবির্ভূত হইলেন।

৭৪. ভিক্ষুগণ, তৎপরে ভগবান বিপস্সী উদ্যানপালকে বলিলেন :

“সৌম্য উদ্যানপাল, তুমি বন্ধুমতী রাজধানীতে প্রবেশ করিয়া রাজপুত্র খণ্ড এবং পুরোহিত পুত্র তিস্সকে এইরূপ বল :

“ভন্তে, ভগবান অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিপস্সী বন্ধুমতী রাজধানীতে উপস্থিত হইয়া খেম মৃগদাবে অবস্থান করিতেছেন, তিনি আপনাদিগের দর্শনাভিলাষী।”

“ভিক্ষুগণ, উদ্যানপাল “তথাস্তু” বলিয়া রাজধানী বন্ধুমতীতে প্রবেশপূর্বক রাজপুত্র খণ্ড এবং পুরোহিত পুত্র তিস্সের নিকট ওই সংবাদ বহন করিল।

“ভিক্ষুগণ, তখন তাঁহারা উত্তম উত্তম রথ প্রস্তুতের আদেশ দিয়া উহাতে আরোহণপূর্বক বন্ধুমতী রাজধানী হইতে বহির্গত হইয়া খেম মৃগদাবে গমন করিলেন। যতদূর যান-পথ ততদূর যানারোহণে গিয়া পরে অবতরণপূর্বক পদব্রজে ভগবান বিপস্সীর নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন। তথায় ভগবান বিপস্সীকে অভিবাদনপূর্বক এক প্রান্তে উপবেশন করিলেন।

৭৫. ভগবান বিপস্সী তাঁহাদের নিকট আনুপূর্বী কথা বলিলেন; যথা : দানকথা, শীলকথা, স্বর্গকথা, কামের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নৈষ্কাম্যের পুণ্য। যখন ভগবান জানিলেন যে তাহারা শুদ্ধ-চিত্ত, মৃদু-চিত্ত, নীবরণমুক্ত-চিত্ত, উদগ্র-চিত্ত, প্রসন্নচিত্ত, তখন তিনি যাহা বুদ্ধগণের সামুৎকর্ষিক ধর্মদেশনা তাহা প্রকাশ করিলেন, দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, দুঃখের নিরোধ, দুঃখনিরোধের মার্গ। যেরূপ শুদ্ধ অকলঙ্ক বস্ত্র উত্তমরূপে রঞ্জন গ্রহণ করে, সেই রূপেই রাজপুত্র খণ্ড এবং পুরোহিতপুত্র তিস্সের সেই আসনেই বিরজ, বীতমল ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হইল, “যাহা উৎপত্তিশীল, তাহা ধ্বংসশীল।”

৭৬. “যখন তাঁহারা ধর্মের দর্শন লাভ করিলেন, উহা অধিগত করিলেন, উহাতে দৃঢ়রূপে স্থিত হইলেন, বিচিকিৎসা এবং সংশয়োত্তীর্ণ হইয়া বৈশারদ্য লাভপূর্বক শাস্তার শাসনে অপর-প্রত্যয় হইলেন, তখন তাঁহারা ভগবান বিপস্সীকে বলিলেন, “অতি উত্তম, ভন্তে! অতি উত্তম! যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথপ্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবা নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলদীপ ধৃত হয়, সেইরূপেই ভগবান অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমরা ভগবানের এবং ধর্মের শরণ লইতেছি। ভন্তে, আমরা ভগবানের নিকট প্রব্রজ্যা এবং উপসম্পদা লাভের অভিলাষী।”

৭৭. “ভিক্ষুগণ, রাজপুত্র খণ্ড এবং পুরোহিতপুত্র তিস্স ভগবান বিপস্সীর নিকট প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা লাভ করিলেন। তিনি তাঁহাদিগের নিকট সংস্কারসমূহের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নির্বাণের শ্রেষ্ঠতা প্রকাশপূর্বক ধর্মালোচনা দ্বারা তাঁহাদিগকে উপদিষ্ট, উদ্দীপিত, উত্তেজিত ও প্রহৃষ্ট করিলেন। এইরূপে উপদিষ্ট, উদ্দীপিত, উত্তেজিত ও প্রহৃষ্ট হইয়া তাঁহাদের চিত্ত আসব রহিত হইয়া অচিরে বিমুক্ত হইল।

৭৮. ভিক্ষুগণ, রাজধানী বন্ধুমতীর চতুরশীতিসংখ্যক নাগরিক শুনিতে পাইল যে, ভগবান বিপস্সী রাজধানী বন্ধুমতী নগরে আগমনপূর্বক ক্ষেম নামক মৃগদাবে অবস্থান করিতেছেন। তাহারা আরও শুনিল যে, রাজপুত্র খণ্ড ও পুরোহিতপুত্র তিস্স কেশ ও শ্মশ্রূ মোচনপূর্বক কাষায় বস্ত্র পরিধান করিয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিয়াছেন। ইহা শ্রবণ করিয়া তাহারা চিন্তা করিল, “যে ধর্ম-বিনয় অবলম্বনে রাজপুত্র খণ্ড ও পুরোহিতপুত্র তিস্স কেশ ও শ্মশ্রূ মোচনপূর্বক কাষায় বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিয়াছেন, ওই ধর্ম-বিনয়, ওই প্রব্রজ্যা কখনোই হীন নহে। খণ্ড ও তিস্স যখন এইরূপ করিয়াছেন, তখন আমরাই বা কেন উহা না করি?”

“অতঃপর, ভিক্ষুগণ, চতুরশীতি সহস্র মনুষ্য সমন্বিত সেই বিপুল জনসংঘ রাজধানী বন্ধুমতী হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া ক্ষেম মৃগদাবে ভগবান বিপস্সীর সন্নিধানে উপস্থিত হইল এবং তাঁহাকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে উপবেশন করিল।

৭৯. “ভগবান বিপস্সী তাহাদের নিকট আনুপূর্বিক কথা বলিলেন; যথা : দানকথা, শীলকথা, স্বর্গকথা, কামের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নৈষ্কাম্যের পুণ্য। যখন ভগবান জানিলেন যে, তাহারা শুদ্ধ-চিত্ত, মৃদু-চিত্ত, নীবরণমুক্ত-চিত্ত, উদগ্র-চিত্ত, প্রসন্ন-চিত্ত তখন তিনি যাহা বুদ্ধগণের সামুৎকর্ষিক ধর্মদেশনা তাহা প্রকাশ করিলেন, দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, দুঃখের নিরোধ, দুঃখনিরোধের মার্গ। যেরূপ শুদ্ধ অকলঙ্ক বস্ত্র উত্তমরূপে রঞ্জন গ্রহণ করে, সেইরূপেই সেই চতুরশীতি সহস্র মনুষ্যগণের সেই আসনেই বিরজ, বীতমল ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হইল, “যাহা উৎপত্তিশীল, তাহা ধ্বংসশীল।”

৮০. যখন তাহারা ধর্মের দর্শন লাভ করিল, উহা অধিগত করিল, উহাতে দৃঢ়রূপে স্থিত হইল, বিচিকিৎসা এবং সংশয়োত্তীর্ণ হইয়া বৈশারদ্য লাভপূর্বক শাস্তার শাসনে অপর-প্রত্যয় হইল, তখন তাহারা ভগবান বিপস্সীকে বলিল :

“অতি উত্তম, ভন্তে! অতি উত্তম! যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথপ্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলদীপ ধৃত হয়, সেইরূপেই ভগবান অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমরা ভগবানের এবং ধর্মের শরণ লইতেছি। ভন্তে, আমরা ভগবানের নিকট প্রব্রজ্যা এবং উপসম্পদা লাভের অভিলাষী।”

৮১. ভিক্ষুগণ, সেই চতুরশীতি সহস্র মনুষ্য ভগবান বিপস্সীর নিকট প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা লাভ করিলেন। তিনি তাহাদিগের নিকট সংস্কারসমূহের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নির্বাণের শ্রেষ্ঠতা প্রকাশপূর্বক ধর্মালোচনা দ্বারা তাহাদিগকে উপদিষ্ট, উদ্দীপিত, উত্তেজিত ও প্রহৃষ্ট করিলেন। এইরূপে উপদিষ্ট, উদ্দীপিত, উত্তেজিত ও প্রহৃষ্ট হইয়া তাহাদের চিত্ত আসব রহিত হইয়া অচিরে বিমুক্ত হইল।

৮২. ভিক্ষুগণ, তৎপরে পূর্বের চতুরশীতি সহস্র প্রব্রজিত (যাহারা বিপস্সী কুমারের সহিত প্রব্রজিত হইয়াছিল) শুনিল যে ভগবান বিপস্সী রাজধানী বন্ধুমতী নগরে আগমনপূর্বক তথায় ক্ষেম মৃগদাবে অবস্থান করিতেছেন এবং ধর্মের উপদেশ দিতেছেন। অতঃপর, ভিক্ষুগণ, ওই প্রব্রজিতগণ বন্ধুমতী নগরে ক্ষেম মৃগদাবে ভগবান বিপস্সীর নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে উপবেশন করিল।

৮৩. ভগবান বিপস্সী তাহাদের নিকট আনুপূর্বিক কথা বলিলেন; যথা : দান কথা, শীলকথা, স্বর্গকথা, কামের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নৈষ্কাম্যের পুণ্য। যখন ভগবান জানিলেন যে, তাহারা শুদ্ধ-চিত্ত, মৃদু-চিত্ত, নীবরণমুক্ত-চিত্ত, উদগ্র-চিত্ত, প্রসন্ন চিত্ত, তখন তিনি যাহা বুদ্ধগণের সামুৎকর্ষিক ধর্মদেশনা তাহা প্রকাশ করিলেন, দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, দুঃখের নিরোধ, দুঃখনিরোধের মার্গ। যেরূপ শুদ্ধ অকলঙ্ক বস্ত্র উত্তমরূপে রঞ্জন গ্রহণ করে, সেইরূপেই সেই চতুরশীতি সহস্র মনুষ্যগণের সেই আসনেই বিরজ, বীতমল ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হইল, “যাহা উৎপত্তিশীল, তাহা ধ্বংসশীল।”

৮৪. যখন তাহারা ধর্মের দর্শন লাভ করিল, উহা অধিগত করিল, উহাতে দৃঢ়রূপে স্থিত হইল, বিচিকিৎসা এবং সংশয়োত্তীর্ণ হইয়া বৈশারদ্য লাভপূর্বক শাস্তার শাসনে অপর-প্রত্যয় হইল, তখন তাহারা ভগবান বিপস্সীকে বলিল :

“অতি উত্তম, ভন্তে! অতি উত্তম! যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথপ্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলদীপ ধৃত হয়, সেইরূপেই ভগবান অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমরা ভগবানের এবং ধর্মের শরণ লইতেছি। ভন্তে, আমরা ভগবানের নিকট প্রব্রজ্যা এবং উপসম্পদা লাভের অভিলাষী।”

৮৫. ভিক্ষুগণ, সেই চতুরশীতি সহস্র মনুষ্য ভগবান বিপস্সীর নিকট প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা লাভ করিলেন। তিনি তাহাদিগের নিকট সংস্কারসমূহের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নির্বাণের শ্রেষ্ঠতা প্রকাশপূর্বক ধর্মালোচনা দ্বারা তাহাদিগকে উপদিষ্ট, উদ্দীপিত, উত্তেজিত ও প্রহৃষ্ট করিলেন। এইরূপে উপদিষ্ট, উদ্দীপিত, উত্তেজিত ও প্রহৃষ্ট হইয়া তাহাদের চিত্ত আসব রহিত হইয়া অচিরে বিমুক্ত হইল।

৮৬. ভিক্ষুগণ, ওই সময়ে রাজধানী বন্ধুমতী নগরে অষ্টষষ্টিশত সহস্র ভিক্ষু সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘ বাস করিতেছিল। তখন একদিন যখন ভগবান বিপস্সী নির্জনে ধ্যানরত ছিলেন, তখন তাঁহার মনে এই চিন্তার উদয় হইল :

“এক্ষণে বন্ধুমতী রাজধানীতে মহাভিক্ষুসংঘ বাস করিতেছে। অতএব আমি ভিক্ষুদিগকে নির্দেশ দিব : “ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতার্থ, বহুজনের সুখার্থ, জগতের প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া দেবমনুষ্যের লাভের জন্য, হিতের জন্য, সুখের জন্য তোমরা বিচরণ করো। একই মার্গ দুইজন অবলম্বন করিও না। ভিক্ষুগণ, যে ধর্মের আদিকল্যাণময়, মধ্যকল্যাণময়, অন্তকল্যাণময়, অর্থ ও ব্যঞ্জনসহ ওই ধর্মের উপদেশ দাও; সর্বাঙ্গ পূর্ণতাবিশিষ্ট পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্যের প্রকাশ করো। সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণী বিদ্যমান, ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে। পরন্তু, প্রতি ছয় বৎসর অন্তর প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে বন্ধুমতী রাজধানীতে আগমন করিবে।”

৮৭. “অতঃপর, ভিক্ষুগণ, মহাব্রহ্মা স্বচিত্তে ভগবান বিপস্সীর চিত্তবিতর্ক জ্ঞাত হইয়া, যেরূপ বলবান পুরুষ সংকুচিত বাহু প্রসারিত করে, অথবা প্রসারিত বাহু সংকুচিত করে, সেইরূপই ব্রহ্মলোক হইতে অন্তর্হিত হইয়া ভগবান বিপস্সীর সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। তৎপরে, ভিক্ষুগণ, মহাব্রহ্মা একাংস উত্তরাসঙ্গে আবৃত করিয়া ভগবান বিপস্সীর দিকে অঞ্জলি প্রণত করিয়া তাঁহাকে এইরূপ বলিলেন :

“হে ভগবান, হে সুগত, আপনার সংকল্প যথার্থ। এক্ষণে বন্ধুমতী রাজধানীতে মহাভিক্ষুসংঘ বাস করিতেছেন; আপনি তাঁহাদিগকে নির্দেশ দিন, “ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতার্থ, বহুজনের সুখার্থ, জগতের প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া দেবমনুষ্যের লাভের জন্য, হিতের জন্য, সুখের জন্য তোমরা বিচরণ করো। একই মার্গ দুইজন অবলম্বন করিও না। ভিক্ষুগণ, যে ধর্মের আদিকল্যাণময়, মধ্যকল্যাণময়, অন্তকল্যাণময়, অর্থ ও ব্যঞ্জনসহ ওই ধর্মের উপদেশ দাও; সর্বাঙ্গ পূর্ণতাবিশিষ্ট পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্যের প্রকাশ করো। সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণী বিদ্যমান, ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে।” আমরাও ভিক্ষুদিগের ন্যায় প্রতি ছয় বৎসর অন্তর প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে বন্ধুমতী রাজধানীতে আগমন করিব।”

ভিক্ষুগণ, মহাব্রহ্মা এইরূপ বলিলেন। ইহা কহিয়া তিনি ভগবান বিপস্সীকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া ওই স্থানেই অন্তর্ধান করিলেন।

৮৮. “অতঃপর, ভিক্ষুগণ, ভগবান বিপস্সী সায়াহ্ন সময়ে ধ্যান হইতে উত্থিত হইয়া ভিক্ষুগণকে বলিলেন, “ভিক্ষুগণ, আমি যখন নির্জনে ধ্যানরত ছিলাম, তখন আমার মনে এই চিন্তার উদয় হইল, “এক্ষণে বন্ধুমতী রাজধানীতে মহাভিক্ষুসংঘ বাস করিতেছেন। অতএব আমি ভিক্ষুদিগকে নির্দেশ দিব, “ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতার্থ, বহুজনের সুখার্থ, জগতের প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া দেবমনুষ্যের লাভের জন্য, হিতের জন্য, সুখের জন্য তোমরা বিচরণ করো। একই মার্গ দুইজন অবলম্বন করিও না। ভিক্ষুগণ, যে ধর্মের আদিকল্যাণময়, মধ্যকল্যাণময়, অন্তকল্যাণময়, অর্থ ও ব্যঞ্জনসহ ওই ধর্মের উপদেশ দাও; সর্বাঙ্গ পূর্ণতাবিশিষ্ট পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্যের প্রকাশ করো। সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণী বিদ্যমান, ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে। পরন্তু, প্রতি ছয় বৎসর অন্তর প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে বন্ধুমতী রাজধানীতে আগমন করিবে।”

ভিক্ষুগণ, অতঃপর মহাব্রহ্মা স্বচিত্তে আমার চিত্ত-বিতর্ক জ্ঞাত হইয়া যেরূপ বলবান পুরুষ সংকুচিত বাহু প্রসারিত করে, অথবা প্রসারিত বাহু সংকুচিত করে, সেইরূপেই ব্রহ্মলোক হইতে অন্তর্হিত হইয়া আমার সম্মুখে আবির্ভূত হইলেন। তৎপরে তিনি একাংস উত্তরাসঙ্গে আবৃত করিয়া আমার দিকে অঞ্জলি প্রণত করিয়া বলিলেন, “হে ভগবান, হে সুগত, আপনার সংকল্প যথার্থ। এক্ষণে বন্ধুমতী রাজধানীতে মহাভিক্ষুসংঘ বাস করিতেছেন; আপনি তাঁহাদিগকে নির্দেশ দিন :

“ভিক্ষুগণ, বহুজনের হিতার্থ, বহুজনের সুখার্থ, জগতের প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া দেব-মনুষ্যের লাভের জন্য, হিতের জন্য, সুখের জন্য তোমরা বিচরণ করো। একই মার্গ দুইজন অবলম্বন করিও না। ভিক্ষুগণ, যে ধর্মের আদিকল্যাণময়, মধ্যকল্যাণময়, অন্তকল্যাণময়, অর্থ ও ব্যঞ্জনসহ ওই ধর্মের উপদেশ দাও; সর্বাঙ্গ পূর্ণতাবিশিষ্ট পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্যের প্রকাশ করো। সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণী বিদ্যমান, ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে।” আমরাও ভিক্ষুদিগের ন্যায় প্রতি ছয় বৎসর অন্তর প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে বন্ধুমতী রাজধানীতে আগমন করিব।” ভিক্ষুগণ, মহাব্রহ্মা এরূপ বলিলেন। এইরূপ কহিয়া তিনি আমাকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণপূর্বক সেই স্থানেই অন্তর্ধান করিলেন।

ভিক্ষুগণ, আমি নির্দেশ দিতেছি বহুজনের হিতার্থ, বহুজনের সুখার্থ, জগতের প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া দেব-মনুষ্যের লাভের জন্য, হিতের জন্য, সুখের জন্য তোমরা বিচরণ করো। একই মার্গ দুইজন অবলম্বন করিও না। ভিক্ষুগণ, যে ধর্মের আদিকল্যাণময়, মধ্যকল্যাণময়, অন্তকল্যাণময়, অর্থ ও ব্যঞ্জনসহ ওই ধর্মের উপদেশ দাও; সর্বাঙ্গ পূর্ণতাবিশিষ্ট পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্যের প্রকাশ করো। সাংসারিকতার মলিনতায় যাহাদের চক্ষু নিষ্প্রভ হয় নাই, এমন প্রাণী বিদ্যমান, ধর্মশ্রবণের অভাবে তাহারা বিনষ্ট হইতেছে, তাহারা ধর্মের জ্ঞান লাভ করিবে। পরন্তু, প্রতি ছয় বৎসর অন্তর প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে বন্ধুমতী রাজধানীতে আগমন করিবে।”

“তৎপরে, ভিক্ষুগণ, অধিকাংশ ভিক্ষুই ওই দিনই জনপদ পরিভ্রমণে বহির্গত হইলেন।

৮৯. “ভিক্ষুগণ, ওই সময়ে জম্বুদ্বীপে চতুরশীতি সহস্র ভিক্ষু নিবাস ছিল। এক বৎসর অতীত হইলে দেবতাগণ ঘোষণা করিলেন, “বন্ধুগণ, এক বৎসর অতীত হইয়াছে, পাঁচ বৎসর অবশিষ্ট আছে। পাঁচ বৎসর অতীত হইলে রাজধানী বন্ধুমতী নগরে প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার নিমিত্ত যাইতে হইবে।”

“প্রতিবৎসরের শেষে এইরূপই করিয়া দেবতাগণ ষষ্ঠ বৎসরের শেষভাগে ঘোষণা করিলেন, “বন্ধুগণ, ছয় বৎসর অতিক্রান্ত হইয়াছে, প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিবার উদ্দেশ্যে রাজধানী বন্ধুমতী নগরে যাইবার সময় উপস্থিত।”

“ভিক্ষুগণ, তখন ওই সকল ভিক্ষুদিগের কেহ কেহ স্বকীয় ঋদ্ধিবলে কেহ কেহ দেবতাগণের ঋদ্ধিবলে এক দিবসেই রাজধানী বন্ধুমতী নগরে প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তির জন্য উপস্থিত হইলেন।

৯০. “তখন ভগবান বিপস্সী ভিক্ষুসংঘের নিকট প্রাতিমোক্ষের আবৃত্তি করিলেন :

“ক্ষান্তি এবং তিতিক্ষা পরম তপঃ।
নির্বাণ বুদ্ধগণ কর্তৃক সর্বশ্রেষ্ঠ
কথিত হয়। যে পরোপঘাতী সে
প্রব্রজিত নহে, যে পরোৎপীড়ক সে শ্রমণ নহে।
“সর্বপাপ হইতে বিরতি, কুশলের
সম্পাদন, স্বচিত্তের শুদ্ধি, ইহাই
বুদ্ধদিগের উপদেশ।
“উপবাদ ও উপঘাত রহিত্য, প্রাতিমোক্ষের
নিয়মাবলীর পালন, ভোজনে মাত্রাজ্ঞতা,
শয়নাসনের নির্জনতা, উচ্চচিন্তার
অনুশীলন, ইহাই বুদ্ধদিগের উপদেশ।”

৯১. “ভিক্ষুগণ, একসময় আমি উক্কট্ঠার সুভগবনে শালরাজ বৃক্ষমূলে অবস্থান করিতেছিলাম। ওই সময় নির্জনে ধ্যান করিতে করিতে আমার চিত্তে এই বিতর্কের উদয় হইল, “শুদ্ধাবাস দেবযোনি ব্যতীত অপর কোনো যোনি নাই যাহাতে এই দীর্ঘকালের মধ্যে আমি জন্মগ্রহণ করি নাই। অতএব আমি শুদ্ধাবাস দেবলোকে গমন করিব।”

“তৎপরে, ভিক্ষুগণ, যেরূপ বলবান পুরুষ সংকুচিত বাহু প্রসারিত করে, অথবা প্রসারিত বাহু সংকুচিত করে, সেইরূপেই আমি উক্কট্ঠার সুভগবানস্থ শালরাজ বৃক্ষমূলে অন্তর্হিত হইয়া অবিহ দেবলোকে আবির্ভূত হইলাম। ভিক্ষুগণ, ওই স্থানের দেবতাদিগের মধ্যে অনেক সহস্র দেবতা আমার নিকট উপস্থিত হইলেন এবং আমাকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইলেন। তৎপরে সেই দেবগণ আমাকে বলিলেন :

“আয়ুষ্মান! আজ হইতে একনবতি কল্প পূর্বে ভগবান বিপস্সী অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। তিনি জাতিতে ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি কৌণ্ডিণ্য গোত্রীয় ছিলেন। তাঁহার আয়ুষ্কাল অশীতি সহস্র বৎসর ছিল। তিনি পাটলীবৃক্ষের মূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছিলেন। তাঁহার খণ্ড এবং তিস্স নামক দুইজন মহানুভাব অগ্রশ্রাবক ছিলেন। তাঁহার শ্রাবকগণের তিনটি সম্মিলন হইয়াছিল। একটিতে অষ্টষষ্টি লক্ষ ভিক্ষুর সমাগম হইয়াছিল। একটিতে এক লক্ষ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। একটিতে অশীতি সহস্র ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবান বিপস্সীর শ্রাবকগণের এই তিনটি সম্মিলন হইয়াছিল। মিলিত ভিক্ষুগণের সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন। ভগবান বিপস্সীর অশোক নামক একজন ভিক্ষু প্রধান পরিচারক ছিলেন। বন্ধুমা নামে রাজা তাঁহার পিতা ছিলেন। রাজ্ঞী বন্ধুমতী তাঁহার মাতা ছিলেন। রাজা বন্ধুমার বন্ধুমতী নামক নগর রাজধানী ছিল। এইরূপে ভগবান বিপস্সীর অভিনিষ্ক্রমণ হইয়াছিল, এইরূপে প্রব্রজ্যা, এইরূপে প্রধান , এইরূপে অভিসম্বোধি, এইরূপে ধর্মচক্র প্রবর্তন হইয়াছিল। আমরা ভগবান বিপস্সীর নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করিয়া পার্থিব ভোগে বীতস্পৃহ হইয়া এইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।”

ভিক্ষুগণ, ওই দেব লোকেরই বহুশত, বহুসহস্র দেবতা আমার নিকট উপস্থিত হইয়া আমাকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইয়া এইরূপ বলিলেন, “আয়ুষ্মান! বর্তমান ভদ্রকল্পে ভগবান স্বয়ং অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছেন। ভগবান জাতিতে ক্ষত্রিয়, ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন। ভগবান গৌতম গোত্রীয়। ভগবানের যুগে আয়ুষ্কাল অল্প, সংক্ষিপ্ত, উহা অচিরে অতীত হয়; যে দীর্ঘকাল জীবিত থাকে তাহার আয়ু পরিমাণ অল্পাধিক একশত বৎসর। ভগবান অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছেন। ভগবানের সারিপুত্র এবং মৌদ্গল্লায়ন নামক দুই মহানুভাব অগ্রশ্রাবক। ভগবানের শ্রাবকগণের এক সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে এক সহস্র দুইশত পঞ্চাশৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবানের শ্রাবকগণের এই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে উপস্থিত সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন। ভিক্ষু আনন্দ ভগবানের প্রধান পরিচারক। ভগবানের পিতা রাজা শুদ্ধোদন, মাতা মায়াদেবী, রাজধানী কপিলবাস্তু। এইরূপে ভগবানের অভিনিষ্ক্রমণ হইয়াছিল, এইরূপে প্রব্রজ্যা, এইরূপে প্রধান, এইরূপে অভিসম্বোধি, এইরূপে ধর্মচক্র প্রবর্তন হইয়াছিল। আমরা ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করিয়া পার্থিব ভোগে বীতস্পৃহ হইয়া এইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।”

৯২. “অতঃপর, ভিক্ষুগণ, আমি অবিহ দেবগণের সহিত অতপ্প দেবগণের নিকট উপস্থিত হইলাম। পরে, ভিক্ষুগণ, আমি অবিহ এবং অতপ্প দেবগণের সহিত সুদস্স দেবগণের নিকট উপস্থিত হইলাম। তৎপরে ওই ত্রিবিধ দেবগণের সহিত আমি সুদস্‌সী দেবগণের নিকট উপস্থিত হইলাম। তৎপরে ওই সকল দেবগণের সহিত আমি অকনিট্ঠ দেবগণের নিকট গমন করিলাম। ওই স্থানের দেবগণের অনেক সহস্র আমার নিকট উপস্থিত হইয়া আমাকে অভিবাদনপূর্বক একপার্শ্বে দণ্ডায়মান হইয়া আমাকে বলিলেন, “আয়ুষ্মান! আজ হইতে একনবতি কল্পপূর্বে ভগবান বিপস্সী অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। ভগবান জাতিতে ক্ষত্রিয়, ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন। ভগবান গৌতম গোত্রীয়। ভগবানের যুগে আয়ুষ্কাল অল্প, সংক্ষিপ্ত, উহা অচিরে অতীত হয়; যে দীর্ঘকাল জীবিত থাকে তাহার আয়ু পরিমাণ অল্পাধিক একশত বৎসর। ভগবান অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছেন। ভগবানের সারিপুত্র এবং মৌদ্গল্লায়ন নামক দুই মহানুভাব অগ্রশ্রাবক। ভগবানের শ্রাবকগণের এক সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে এক সহস্র দুইশত পঞ্চাশৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবানের শ্রাবকগণের এই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে উপস্থিত সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন। ভিক্ষু আনন্দ ভগবানের প্রধান পরিচারক। ভগবানের পিতা রাজা শুদ্ধোদন, মাতা মায়াদেবী, রাজধানী কপিলবাস্তু। এইরূপে ভগবানের অভিনিষ্ক্রমণ হইয়াছিল, এইরূপে প্রব্রজ্যা, এইরূপে প্রধান, এইরূপে অভিসম্বোধি, এইরূপে ধর্মচক্র প্রবর্তন হইয়াছিল। আমরা ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করিয়া পার্থিব ভোগে বীতস্পৃহ হইয়া এইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।”

৯৩. “ভিক্ষুগণ, ওই দেবলোকেরই অনেক শতসহস্র দেবতা আমার নিকট উপস্থিত হইয়া আমাকে অভিবাদনপূর্বক একপার্শ্বে দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন, “আয়ুষ্মান! বর্তমান ভদ্রকল্পে ভগবান স্বয়ং অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধরূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। ভগবান জাতিতে ক্ষত্রিয়, ক্ষত্রিয়কুলে উৎপন্ন। ভগবান গৌতম গোত্রীয়। ভগবানের যুগে আয়ুষ্কাল অল্প, সংক্ষিপ্ত, উহা অচিরে অতীত হয়; যে দীর্ঘকাল জীবিত থাকে তাহার আয়ু পরিমাণ অল্পাধিক একশত বৎসর। ভগবান অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছেন। ভগবানের সারিপুত্র এবং মৌদ্গল্লায়ন নামক দুই মহানুভাব অগ্রশ্রাবক। ভগবানের শ্রাবকগণের এক সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে এক সহস্র দুইশত পঞ্চাশৎ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন। ভগবানের শ্রাবকগণের এই একটি সম্মিলন হইয়াছিল, উহাতে উপস্থিত সকলেই ক্ষীণাসব ছিলেন। ভিক্ষু আনন্দ ভগবানের প্রধান পরিচারক। ভগবানের পিতা রাজা শুদ্ধোদন, মাতা মায়াদেবী, রাজধানী কপিলবাস্তু। এইরূপে ভগবানের অভিনিষ্ক্রমণ হইয়াছিল, এইরূপে প্রব্রজ্যা, এইরূপে প্রধান, এইরূপে অভিসম্বোধি, এইরূপে ধর্মচক্র প্রবর্তন হইয়াছিল। আমরা ভগবানের নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করিয়া পার্থিব ভোগে বীতস্পৃহ হইয়া এইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।”

৯৪. “ভিক্ষুগণ, এইরূপে যাহা বিশ্বধর্ম তাহা তথাগতের এরূপ সুপরিজ্ঞাত যে, তিনি অতীতের বুদ্ধগণ যাঁহারা পরিনির্বাণ প্রাপ্ত, ছিন্নপ্রপঞ্চ সম্পন্ন-ভ্রমণ, ত্রিবর্তের ক্ষয়-সাধন সম্পন্ন এবং সর্বদুঃখমুক্ত, ওই সকলের জাতি, নাম, গোত্র, আয়ুপরিমাণ, শ্রাবকযুগ এবং শ্রাবক সম্মিলন, ওই সমস্তই স্মরণ করিতে পারেন :

“ওই সকল ভগবান এই এই জাতি হইতে উদ্ভূত, এই এই নাম এবং গোত্রবিশিষ্ট, এইরূপ শীল ও ধর্মসম্পন্ন, এইরূপ প্রজ্ঞাসমন্বিত, এইরূপ তাঁহাদের জীবনযাত্রার প্রণালি, এইরূপে তাঁহারা বিমুক্ত।”

ভগবান এইরূপ বলিলেন। আনন্দিত হইয়া ভিক্ষুগণ ভগবদ্বাক্যের অভিনন্দন করিল।

মহাপদান সুত্রান্ত সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৩]