লোড হচ্ছে

দীর্ঘ উপদেশাবলী

DN25. উদুম্বরিক-সিংহনাদ সূত্রান্ত

অনুবাদসমূহ [২২]

উদুম্বরিক-সিংহনাদ সূত্রান্ত

৪৯. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। এক সময় ভগবান রাজগৃহে গৃধ্রকূট পর্বতে অবস্থান করিতেছিলেন। ওই সময় পরিব্রাজক নিগ্রোধ তিন সহস্র পরিব্রাজক-সমন্বিত বৃহৎ পরিষদের সহিত উদুম্বরিকার পরিব্রাজকারামে বাস করিতেছিলেন। অনন্তর সন্ধান নামক গৃহপতি ভগবানের দর্শনের নিমিত্ত সূর্যোদয়ে রাজগৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়াছিলেন। তিনি চিন্তা করিলেন, “ভগবানের দর্শনের নিমিত্ত এখনো সময় হয় নাই, তিনি ধ্যানস্থ, মনোভাবনায় নিযুক্ত ভিক্ষুদিগেরও দর্শনের সময় এখন নয়, তাঁহারা নির্জনে ধ্যানস্থ; অতএব আমি উদুম্বরিকার পরিব্রাজকারামে পরিব্রাজক নিগ্রোধের নিকট গমন করিব।” অতঃপর তিনি উক্ত পরিব্রাজকের নিকট গমন করিলেন।

৫০. ওই সময় নিগ্রোধ পরিব্রাজক বৃহৎ পরিষদের সহিত উপবিষ্ট ছিলেন; পরিষদ উচ্চশব্দ মহাশব্দের সহিত তুমুল কোলাহলে নানা প্রকার হীন আলাপে রত ছিলেন; যথা : রাজ-কথা, চোর-কথা, মহামাত্র কথা, সেনা-সম্বন্ধীয় কথা, ভয়-কথা, যুদ্ধ কথা, খাদ্য ও পানীয়-কথা, বস্ত্র-কথা, শয়ন-কথা, মাল্য-কথা, গন্ধ-কথা, জ্ঞাতি-কথা, যান-কথা, গ্রাম-কথা, নিগম-কথা, নগর-কথা, জনপদ-কথা, নারী-কথা, পুরুষ-কথা, বীর-কথা, পথ-কথা, কুম্ভস্থান-কথা, পূর্বপুরুষ-কথা, নিরর্থক-কথা, পৃথিবী ও সমুদ্রের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় মন্তব্য, অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব সম্বন্ধীয় কথা।

৫১. পরিব্রাজক নিগ্রোধ দূর হইতে গৃহপতি সন্ধানকে আসিতে দেখিয়া স্বীয় পরিষদকে শৃঙ্খলা রক্ষা করিতে বলিলেন, “মাননীয়গণ, আপনারা নীরব হউন, শব্দ করিবেন না। শ্রমণ গৌতমের শ্রাবক গৃহপতি সন্ধান আসিতেছেন। শ্রমণ গৌতমের যে-সকল শুভ্রবস্ত্র পরিহিত গৃহী শ্রাবক রাজগৃহে বাস করেন, ইনি তাঁহাদের অন্যতর গৃহপতি সন্ধান। এই সকল আয়ুষ্মান নীরবতা প্রিয়, নীরবতায় শিক্ষিত, নীরবতার প্রশংসাবাদী। পরিষদকে শব্দহীন জ্ঞাত হইয়া তিনি যেন এই স্থানকে আগমনের যোগ্য মনে করেন।”

এইরূপ উক্ত হইলে পরিব্রাজকগণ নীরব হইলেন।

৫২. অনন্তর গৃহপতি সন্ধান নিগ্রোধ পরিব্রাজকের নিকট গমন করিয়া তাঁহার সহিত প্রীত্যালাপ ব্যঞ্জক বাক্যের বিনিময়ান্তে একপ্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন। পরে তিনি নিগ্রোধকে বলিলেন, “এই সকল অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকগণ একত্রে মিলিত হইয়া উচ্চশব্দ মহাশব্দের সহিত তুমুল কোলাহলে নানা প্রকার হীন আলাপে রত হন; যথা : রাজ-কথা, চোর-কথা, মহামাত্র কথা, সেনা-সম্বন্ধীয় কথা, ভয়-কথা, যুদ্ধ কথা, খাদ্য ও পানীয়-কথা, বস্ত্র-কথা, শয়ন-কথা, মাল্য-কথা, গন্ধ-কথা, জ্ঞাতি-কথা, যান-কথা, গ্রাম-কথা, নিগম-কথা, নগর-কথা, জনপদ-কথা, নারী-কথা, পুরুষ-কথা, বীর-কথা, পথ-কথা, কুম্ভস্থান-কথা, পূর্বপুরুষ-কথা, নিরর্থক-কথা, পৃথিবী ও সমুদ্রের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় মন্তব্য, অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব সম্বন্ধীয় কথা। এই সকল পরিব্রাজকগণ এক প্রকারের, কিন্তু ভগবান অন্য প্রকারের, তিনি অরণ্যে দূর বনপ্রস্থে বাস করেন, যে স্থানে শব্দ নাই, নির্ঘোষ নাই, যে স্থানে বিজনবাত প্রবাহিত, যে স্থান মনুষ্য-সমাগম রহিত, যাহা ধ্যানানুশীলনের উপযুক্ত।”

৫৩. এইরূপ উক্ত হইলে পরিব্রাজক নিগ্রোধ গৃহপতি সন্ধানকে বলিলেন, “দেখ, গৃহপতি, তুমি জান কি, কাহার সহিত শ্রমণ গৌতম কথা বলেন? কাহার সহিত কথোপকথনে নিযুক্ত হন? কাহার সহিত আলোচনায় তাঁহার প্রজ্ঞা বিকাশ প্রাপ্ত হয়? নির্জনবাস হেতু শ্রমণ গৌতমের প্রজ্ঞা নষ্ট হইয়াছে, তিনি পরিষদ হইতে দূরে অবস্থান করেন, কথোপকথনে নিপুণ নহেন, তিনি বিবেকের সেবা করেন। যেইরূপ সীমাবদ্ধ স্থানে বিচরণশীল দৃষ্টিহীন গাভী নিভৃতের ভজনা করে, সেইরূপই নির্জনবাস হেতু শ্রমণ গৌতমের প্রজ্ঞা প্রণষ্ট, তিনি পরিষদ হইতে দূরে অবস্থান করেন, কথোপকথনে নিপুণ নহেন, তিনি বিবেকের সেবা করেন। দেখো, গৃহপতি, যদি শ্রমণ গৌতম এই পরিষদে আগমন করেন, তাহা হইলে মাত্র এক প্রশ্ন দ্বারা তাঁহাকে নির্বাক করিব, শূন্য কুম্ভের ন্যায় তাঁহাকে আবর্তিত করিব।”

৫৪. ভগবান তাঁহার বিশুদ্ধ, অমানুষিক দিব্য শ্রবণ শক্তির দ্বারা নিগ্রোধ পরিব্রাজকের সহিত গৃহপতি সন্ধানের এই কথোপকথন শ্রবণ করিলেন। তখন ভগবান গৃধ্রকূট পর্বত হইতে অবতরণপূর্বক সুমাগধা পুষ্করিণীর তীরে ময়ূর-নিবাপে গমন করিয়া তথায় উন্মুক্ত স্থানে বিচরণ করিতে লাগিলেন। ভগবানকে এইরূপে বিচরণ করিতে দেখিয়া পরিব্রাজক নিগ্রোধ তাঁহার পরিষদকে শৃঙ্খলা রক্ষা করিতে বলিলেন, “আয়ুষ্মানগণ নীরব হউন, শব্দ করিবেন না। শ্রমণ গৌতম সুমাগধার তীরে ময়ূর-নিবাপে উন্মুক্ত স্থানে বিচরণ করিতেছেন। সেই আয়ুষ্মান নীরবতা প্রিয়, নীরবতার প্রশংসাবাদী, পরিষদকে শব্দহীন জ্ঞাত হইয়া তিনি যেন এইস্থান আগমনের যোগ্য মনে করেন। যদি তিনি এইস্থানে আগমন করেন, তাঁহাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব, যে ধর্মে ভগবান শ্রাবকগণকে শিক্ষিত করেন, সেই ধর্ম কী? কী সেই ধর্ম যাহাতে শিক্ষিত হইয়া শ্রাবকগণ বিশ্বস্তচিত্তে আদি-ব্রহ্মচর্যের মূলতত্ত্ব স্বীকার করেন?” এইরূপ কথিত হইলে পরিব্রাজকগণ নীরব হইলেন।

৫৫. তদনন্তর ভগবান নিগ্রোধ পরিব্রাজকের নিকট গমন করিলে নিগ্রোধ ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, ভগবানের আগমন হউক! স্বাগত ভগবান, বহুদিন পরে ভগবান কৃপা করিয়া এইস্থানে আসিয়াছেন, ভগবান উপবেশন করুন, এই আসন প্রস্তুত।”

ভগবান নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। পরিব্রাজক নিগ্রোধও এক নিচ আসন গ্রহণপূর্বক এক প্রান্তে উপবেশন করিলেন। অতঃপর ভগবান নিগ্রোধকে বলিলেন, “নিগ্রোধ, এইস্থানে কী কথায় নিযুক্ত ছিলে? তোমাদের কি আলোচনাই বা বাধা প্রাপ্ত হইল?”

ভগবান এইরূপ কহিলে পরিব্রাজক নিগ্রোধ ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, আমরা দেখিলাম ভগবান সুমাগধার তীরে ময়ূরনিবাপে উন্মুক্ত স্থানে বিচরণ করিতেছেন, উহা দেখিয়া আমরা বলিলাম, যদি শ্রমণ গৌতম এই পরিষদে আগমন করেন, তাঁহাকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব, “যে ধর্মে ভগবান শ্রাবকগণকে শিক্ষিত করেন, সেই ধর্ম কী? কী সেই ধর্ম যাহাতে শিক্ষিত হইয়া শ্রাবকগণ বিশ্বস্তচিত্তে আদি ব্রহ্মচর্যের মূলতত্ত্ব স্বীকার করেন?” আমাদের এই আলোচনার অসমাপ্ত অবস্থায় ভগবানের আগমন হইল।”

৫৬. “নিগ্রোধ, যে ধর্মে আমি শ্রাবকগণকে শিক্ষিত করি, যে ধর্মে শিক্ষিত হইয়া শ্রাবকগণ বিশ্বস্তচিত্তে আদি ব্রহ্মচর্যের মূলতত্ত্ব স্বীকার করেন, তাহা বুঝিতে পারা তোমার পক্ষে কঠিন, কারণ তুমি ভিন্নদৃষ্টিসম্পন্ন, ভিন্ন মতাবলম্বী, ভিন্ন রুচিসম্পন্ন, ভিন্ন আযোগানুসারী, ভিন্ন আচার্যের শিক্ষা গ্রহণকারী। নিগ্রোধ, তুমি বরং আমাকে কৃচ্ছ্রসাধন সম্পর্কে তোমার নিজের মতবিষয়ক প্রশ্ন করো, কী করিলে কৃচ্ছ্রসাধন সফল হয়, কী করিলে হয় না?

এইরূপ উক্ত হইলে পরিব্রাজকগণ তুমুল কোলাহলের সহিত উচ্চশব্দ মহাশব্দ করিল, “আশ্চর্য! অদ্ভূত! শ্রমণ গৌতমের মহাশক্তি ও মহানুভাবতা, তিনি স্বীয় মত দূরে রাখিয়া পরবাদের আলোচনায় আহ্বান করিতেছেন।”

৫৭. তখন নিগ্রোধ অন্যান্য পরিব্রাজকগণকে নীরব হইতে আদেশ করিয়া ভগবানকে বলিলেন, “আমরা কৃচ্ছ্রসাধন রূপ তপের সমর্থনকারী, উহাকেই সারবস্তু বলিয়া মনে করি, আমরা উহাতেই লীন হইয়া বিহার করি। কী করিলে কৃচ্ছ্রসাধন সফল হয়, কী করিলে হয় না?”

নিগ্রোধ, তপস্বী নগ্ন হইয়া বিহার করে, মুক্তাচার ও হস্তাবলেহক হয়, ভিক্ষা গ্রহণার্থ আহ্বানের কিংবা অপেক্ষা করিবার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে, আপনার জন্য আনীত অথবা প্রস্তুতিকৃত খাদ্য এবং নিমন্ত্রণ অস্বীকার করে, কুম্ভী অথবা কলোপী মুখ হইতে প্রদত্ত ভিক্ষা গ্রহণ করে না, প্রবেশ দ্বারে, উদুখল, ইন্ধন অথবা মুসলাভ্যন্তরে স্থাপিত ভিক্ষা ত্যাগ করে, ভোজন নিরত দুই জনের কিংবা গর্ভিণীর, কিংবা স্তন্যদানরতা স্ত্রীর, কিংবা পুরুষসহবাস-রতা স্ত্রীর ভিক্ষা ত্যাগ করে, অভিক্ষালব্ধ সংগৃহীত ভোজ্য অস্বীকার করে, দলবদ্ধ মক্ষিকাসংকুল স্থান হইতে ভিক্ষা গ্রহণে বিরত হয়, মৎস্য, মাংস, সুরা মেরয়, তুষোদকের গ্রহণে বিরত হয়; মাত্র এক গৃহ হইতে এক গ্রাস, দুই গৃহ হইতে দুই গ্রাস, সাত গৃহ হইতে সাত গ্রাস খাদ্য গ্রহণ করে; মাত্র এক অথবা দুই অথবা শত ভিক্ষান্নে জীবন যাপন করে; দিনান্তে একবার, অথবা দুই দিবসে একবার, অথবা সাত দিবসে একবার ভোজন করে, এইরূপে নিয়মবদ্ধ হইয়া ক্রমে অর্ধমাসান্তে একবার ভোজন করে; মাত্র শাক অথবা শ্যামাক, অপক্ব তণ্ডল, চর্মখণ্ড, শৈবাল, কণ, আচাম, পিণ্যাক, তৃণ, গোময়, বনমূল-ফল, অথবা বৃক্ষ হইতে স্বয়ং পতিত ফল ভোজন করে; শাণবস্ত্র, মশাণবস্ত্র, শবদেহের পরিত্যক্ত আবরণ বস্ত্র, পাংশুকূল, তিরিতক বল্কল, মৃগচর্ম মৃগচর্মনির্মিত পরিচ্ছদ, কুশচীর, বল্কল-চীর, ফলক-চীর, কেশ-কম্বল, বাল-কম্বল, উলুক-পক্ষ নির্মিত বস্ত্র পরিধান করে; সে কেশ ও শ্মশ্রূর উৎপাটন করে এবং উহাতে আসক্ত হয়, আসন পরিত্যাগ করিয়া দণ্ডায়মানভাবে অবস্থান করে, উৎকুটিক হইয়া অবস্থান করে এবং ওই অবস্থায় বীর্যারম্ভের অনুশীলন করে, কণ্টকধারী হয় এবং কণ্টক-শয্যা রচনা করে, ফলক-শয্যা ও ভূমি-শয্যা আশ্রয় করে, এক পার্শ্বে শায়িত হইয়া নিদ্রা যায়, দেহকে ধূলি ও মলাচ্ছাদিত করে, উন্মুক্ত স্থানে শয়ন করে, সকল প্রকার আসনই নির্বিচারে গ্রহণ করে, বিকট আহার গ্রহণ করে, এবং ওই প্রকার আহারে আসক্ত হয়, শীতল জল পান বর্জন করে এবং ওই অভ্যাসে আসক্ত হয়, প্রাতঃকাল হইতে সন্ধ্যা এই সময়ের মধ্যে তিনবার জলে অবতরণ করে। নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো, এইরূপ কৃচ্ছ্রসাধন সফল হয় অথবা বিফল হয়?”

“অবশ্যই, ভন্তে, এইরূপ কৃচ্ছ্রসাধন সফল হয়, বিফল হয় না।”

“নিগ্রোধ, আমি কহি এ প্রকার পরিপূর্ণ কৃচ্ছ্রসাধনেও অনেক প্রকার উপক্লেশ বর্তমান।”

৫৮. “ভন্তে, ভগবান কিরূপে বলিতেছেন যে, এই প্রকার পরিপূর্ণ কৃচ্ছ্রসাধনেও অনেক প্রকার উপক্লেশ বর্তমান?”

“নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন, তিনি উহাতেই সন্তুষ্ট ও পরিপূর্ণ-সংকল্প হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।”

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। তিনি ওই তপহেতু আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন। ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।”

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। তিনি ওই তপ হেতু স্ফীত হন, জ্ঞানশূন্য হন, প্রমাদে পতিত হন। ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।”

৫৯. পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। ওই তপ হেতু তিনি লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করেন। ওই লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করিয়া তিনি সন্তুষ্ট ও পরিপূর্ণ-সংকল্প হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। ওই তপ হেতু তিনি লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করেন। ওই লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করিয়া তিনি আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। ওই তপ হেতু তিনি লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করেন। ওই লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করিয়া তিনি স্ফীত হন, জ্ঞানহীন হন, প্রমাদে পতিত হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

৬০. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। আহার্য দ্রব্য তৎকর্তৃক দ্বিধাকৃত হয়- “ইহা আমার উপযোগী, ইহা নহে।” যে ভোজ্যবস্তু তাঁহার অনুপযোগী তাহার প্রতি আকাঙ্ক্ষা রাখিয়া তিনি উহা বর্জন করেন, যাহা তাঁহার উপযোগী তাহাতে গ্রথিত, মূর্ছিত ও লগ্ন হইয়া, উহাতে যে বিপদ নিহিত তাহা না দেখিয়া, উহার কুফল চিন্তা না করিয়া, উহা আহার করেন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী লাভ, সৎকার এবং যশতৃষ্ণা হেতু তপ করেন, “রাজাগণ, রাজমহামাত্রগণ, ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, গৃহপতি এবং তীর্থিয়গণ আমার সৎকার করিবেন।” নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

৬১. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণের নিন্দা করেন, “কেন এই পুরুষ প্রাচুর্যভোগী হইয়া বজ্রকঠিন দন্তের সাহায্যে সর্ববিধ বস্তু ভক্ষণ করে; যথা : মূলবীজ, স্কন্ধ-বীজ, গ্রন্থি-বীজ এবং পঞ্চমত, বীজ-বীজ? তথাপি সে শ্রমণ কথিত হয়।” নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী দেখেন কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ গৃহস্থকুলে সৎকার, শ্রদ্ধা, সম্মান এবং পূজা পাইতেছেন। উহা দেখিয়া তাঁহার মনে হয়-“গৃহস্থগণ এই প্রাচুর্যভোগীকে, শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা করে, তাহার সৎকার করে, কিন্তু আমি কৃচ্ছ্র-জীবী তপস্বী হইলেও গৃহস্থকুলে সৎকার, শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা পাই না।” এইরূপে তিনি গৃহস্থগণের প্রতি ঈর্ষা ও মাৎসর্যপরায়ণ হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী সাধারণের গমনাগমন স্থানে আসন গ্রহণ করেন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী ভিক্ষার্থ গৃহস্থকুলে গমন করিবার সময় এইরূপভাবে প্রচ্ছন্ন হইয়া ভ্রমণ করেন যাহাতে ব্যক্ত হয়- “ইহা আমার তপ, ইহা আমার তপ।” নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

৬২. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী গোপনে কোনো কর্ম করেন। তাঁহাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় “আপনি কি ইহার অনুমোদন করেন?” তাহা হইলে অনুমোদন না করিয়াও তিনি বলেন “অনুমোদন করি,” অনুমোদন করিয়াও বলেন “অনুমোদন করি না।” এইরূপে জ্ঞানত মিথ্যা কথিত হয়। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তথাগত অথবা তদীয় শ্রাবকের ধর্মদেশনা বিশুদ্ধ এবং আদরণীয় হইলেও উহার গুণ গ্রহণ করেন না। ইহাও, নিগ্রোধ, তপস্বীর উপক্লেশ।

৬৩. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী ক্রোধ ও দ্বেষের বশবর্তী হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী কপটাচারী, অসূয়াপরবশ, ঈর্ষা ও মাৎসর্যপরায়ণ, শঠ, মায়াবী, নির্মম, অহঙ্কারী, পাপেচ্ছাসম্পন্ন ও পাপেচ্ছার বশীভূত, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন, উচ্ছেদ-দৃষ্টিসম্পন্ন, সংসারাসক্ত, স্বৈরী, ত্যাগে অনিচ্ছ হন। নিগ্রোধ, ইহাও তপস্বীর উপক্লেশ।

নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো, এই সকল কৃচ্ছ্রসাধন উপক্লেশ অথবা নহে?

“ভন্তে, অবশ্যই এই সকল কৃচ্ছ্র-উপক্লেশ। ভন্তে, ইহা সম্ভব যে তপস্বীর মধ্যে উক্ত সর্বপ্রকার উপক্লেশ বিদ্যমান, একটি দুইটির ত কথাই নাই।

৬৪. “নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। তিনি উহাতে সন্তুষ্ট হন না, পরিপূর্ণ-সংকল্প হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। তিনি ওই তপ হেতু আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। তিনি ওই তপ হেতু স্ফীত হন না, জ্ঞানশূন্য হন না, প্রমাদে পতিত হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

৬৫. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। ওই তপ হেতু তিনি লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করেন। ওই লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করিয়া তিনি সন্তুষ্ট হন না, পরিপূর্ণ-সংকল্প হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। ওই তপ হেতু তিনি লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করেন। ওই লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করিয়া তিনি আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। ওই তপ হেতু তিনি লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করেন। ওই লাভ, সৎকার ও যশ অর্জন করিয়া তিনি স্ফীত হন না, জ্ঞানশূন্য হন না, প্রমাদে পতিত হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

৬৬. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। আহার্য দ্রব্য “ইহা আমার উপযোগী, ইহা নহে” এইরূপে তৎকর্তৃক দ্বিধাকৃত হয় না। যে ভোজ্যবস্তু তাঁহার অনুপযোগী তাহার প্রতি আকাঙ্ক্ষাহীন হইয়া তিনি উহা বর্জন করেন, যাহা তাঁহার উপযোগী তাহাতে গ্রথিত, মূর্ছিত ও লগ্ন না হইয়া, উহাতে যে বিপদ নিহিত তাহা দেখিয়া, উহার কুফল চিন্তা করিয়া উহা আহার করেন। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তপ করেন। তিনি “রাজগণ, মহামাত্রগণ, ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণ-গৃহপতি এবং তীর্থিয়গণ আমার সৎকার করিবেন” এইরূপ লাভ, সৎকার ও যশতৃষ্ণা হেতু তপ করেন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

৬৭. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণকে এইরূপ বলিয়া নিন্দা করেন না, “কেন এই পুরুষ প্রাচুর্যভোগী হইয়া বজ্রকঠিন দন্তের সাহায্যে সর্ববিধ বস্তু ভক্ষণ করে; যথা : মূলবীজ, স্কন্ধবীজ, গ্রন্থিবীজ এবং পঞ্চমত, বীজ-বীজ? তথাপি সে শ্রমণ কথিত হয়।” এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী দেখেন কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ গৃহস্থকুলে সৎকার, শ্রদ্ধা, সম্মান এবং পূজা পাইতেছেন। উহা দেখিয়া তাঁহার এইরূপ মনে হয় না, “গৃহস্থগণ এই প্রাচুর্যভোগীকে শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা করে, তাঁহার সৎকার করে, কিন্তু আমি কৃচ্ছ্রজীবী তপস্বী হইলেও গৃহস্থকুলে সৎকার, শ্রদ্ধা, সম্মান ও পূজা পাই না।” এইরূপে তিনি গৃহস্থগণের প্রতি ঈর্ষা ও মাৎসর্যপরায়ণ হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।”

৬৮. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী সাধারণের গমনাগমন স্থানে আসন গ্রহণ করেন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।”

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী ভিক্ষার্থ গৃহস্থকুলে গমন করিবার সময় এইরূপভাবে প্রচ্ছন্ন হইয়া গমন করেন না যাহাতে ব্যক্ত হয়, “ইহা আমার তপ, ইহা আমার তপ।” এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী গোপনে কোনো কর্ম করেন না। তাঁহাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় “আপনি কি ইহার অনুমোদন করেন?” তাহা হইলে অনুমোদন না করিলে তিনি বলেন “অনুমোদন করি না,” অনুমোদন করিলে বলেন, “অনুমোদন করি।” এইরূপে জ্ঞানত মিথ্যা কথিত হয় না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী তথাগত অথবা তদীয় শ্রাবকের বিশুদ্ধ এবং আদরণীয় ধর্মদেশনার গুণ গ্রহণ করেন। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

৬৯. “পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী ক্রোধ ও দ্বেষের বশবর্তী হন না। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।”

“পুনশ্চ, নিগ্রোধ, তপস্বী কপটাচারী, অসূয়াপরবশ, ঈর্ষা ও মাৎসর্যপরায়ণ, শঠ, মায়াবী, নির্মম, অহঙ্কারী, পাপেচ্ছাসম্পন্ন ও পাপেচ্ছার বশীভূত, মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন, উচ্ছেদদৃষ্টিসম্পন্ন, সংসারাসক্ত, স্বৈরী হন না, তিনি ত্যাগশীল হন। এইরূপে ওই অবস্থায় তিনি পরিশুদ্ধ হন।

“নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো, এইরূপ কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ অথবা অপরিশুদ্ধ হয়?”

“ভন্তে, অবশ্যই এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ হয়, অপরিশুদ্ধ হয় না, উহা শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়।”

“নিগ্রোধ, মাত্র ইহাতেই কৃচ্ছ্রসাধন শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয় না; ইহা বহিরাবরণ মাত্র।”

৭০. “ভন্তে, কিরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়? ভগবান আমার কৃচ্ছ্র শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত করিলে আমি অনুগৃহীত হইব।”

“নিগ্রোধ, তপস্বী চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন। কী প্রকারে তিনি এইরূপ সুরক্ষিত হন? নিগ্রোধ, তপস্বী প্রাণনাশ করেন না, প্রাণনাশের কারণ হন না, উহার অনুমোদন করেন না; অদত্তের গ্রহণ করেন না, অদত্ত গ্রহণের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না; মিথ্যা বলেন না, মিথ্যা কথনের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না; তিনি ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তিজনিত সুখের অন্বেষণ করেন না; ওই অন্বেষণের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না। নিগ্রোধ, তপস্বী এইরূপে চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন। নিগ্রোধ, যেহেতু তপস্বী চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন এবং উহাই তাঁহার তপস্যা হয়, সেইহেতু তিনি ক্রমোন্নতির দিকে অগ্রসর হন, তিনি নিম্নগামী হন না। তিনি বিবিক্ত শয়নাসনের ভজনা করেন; অরণ্য, বৃক্ষমূল, পর্বত, কন্দর, গিরিগুহা শ্মশান, বনপ্রস্থ, উন্মুক্ত স্থান এবং পলাল স্তূপের ভজনা করেন। ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আহারান্তে তিনি পর্যঙ্কাবদ্ধ হইয়া, দেহকে ঋজুভাবে রক্ষা করিয়া, পরিমুখে স্মৃতি উপস্থাপিত করিয়া উপবিষ্ট হন। তিনি লোকে অভিধ্যার পরিহার করিয়া অভিধ্যাহীন চিত্তে বিহার করেন, অভিধ্যা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ব্যাপাদ-প্রদোষ পরিত্যাগ করিয়া অব্যাপন্ন চিত্তে বিহার করেন; সর্বপ্রাণীর হিতাকাঙ্ক্ষী হইয়া, সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পা পরবশ হইয়া; ব্যাপাদ-প্রদোষ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি স্ত্যানমিদ্ধ পরিহার করিয়া বিগত-স্ত্যানমিদ্ধ হইয়া বিহার করেন; আলোক-সংজ্ঞী, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া স্ত্যানমিদ্ধ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য পরিহার করিয়া অনুদ্ধত হইয়া বিহার করেন, আধ্যাত্মিক শান্তিলব্ধ হইয়া ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি বিচিকিৎসার পরিহার করিয়া বিচিকিৎসাহীন হইয়া বিহার করেন, কুশলধর্মে সংশয়হীন হইয়া বিচিকিৎসা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন।

৭১. “তিনি চিত্তের এই পঞ্চ নীবরণ পরিহার করিয়া প্রজ্ঞার দ্বারা চিত্তের উপক্লেশের বলক্ষয় করিবার নিমিত্ত মৈত্রীসহগত চিত্তে যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ মৈত্রীসহগত চিত্তে বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। করুণাসহগত চিত্তে যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ করুণাসহগত চিত্তে বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। মুদিতাসহগত চিত্তে যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ মুদিতাসহগত চিত্তে বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। উপেক্ষা-সহগত চিত্তে যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ উপেক্ষা-সহগত চিত্তে বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো, এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ হয় অথবা অপরিশুদ্ধ হয়?”

“ভন্তে, অবশ্যই এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্র-সাধন পরিশুদ্ধ হয়, অপরিশুদ্ধ হয় না, উহা শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়।”

“নিগ্রোধ, মাত্র ইহাতেই কৃচ্ছ্র-সাধন শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয় না, ইহা ত্বক্‌ মাত্র স্পর্শ করে।”

৭২. “ভন্তে, কিরূপ হইলে কৃচ্ছ্র-সাধন শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়? ভগবান আমার কৃচ্ছ্র শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত করিলে আমি অনুগৃহীত হইব।”

“নিগ্রোধ, তপস্বী-চতুর্বিধ সংবর দ্বারা সুরক্ষিত হন। কী প্রকারে তিনি ওইরূপে সুরক্ষিত হন? নিগ্রোধ, তপস্বী প্রাণনাশ করেন না, প্রাণনাশের কারণ হন না, উহার অনুমোদন করেন না; অদত্তের গ্রহণ করেন না, অদত্ত গ্রহণের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না; মিথ্যা বলেন না, মিথ্যা কথনের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না; তিনি ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তিজনিত সুখের অন্বেষণ করেন না; ওই অন্বেষণের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না। নিগ্রোধ, তপস্বী এইরূপে চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন। যেহেতু তপস্বী চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন এবং উহাই তাঁহার তপস্যা হয়, সেই হেতু তিনি ক্রমোন্নতির দিকে অগ্রসর হন, তিনি নিম্নগামী হন না। তিনি বিবিক্ত শয়নাসনের ভজনা করেন; অরণ্য, বৃক্ষমূল, পর্বত, কন্দর, গিরিগুহা, শ্মশান, বনপ্রস্থ, উন্মুক্ত স্থান এবং পলালস্তূপের ভজনা করেন। ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আহারান্তে তিনি পর্যঙ্কাবদ্ধ হইয়া, দেহকে ঋজুভাবে রক্ষা করিয়া, পরিমুখে স্মৃতি উপস্থাপিত করিয়া উপবিষ্ট হন। তিনি লোকে অভিধ্যার পরিহার করিয়া অভিধ্যাহীন চিত্তে বিহার করেন, অভিধ্যা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ব্যাপাদ-প্রদোষ পরিত্যাগ করিয়া অব্যাপন্ন চিত্তে বিহার করেন; সর্বপ্রাণীর হিতাকাঙ্ক্ষী হইয়া, সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া; ব্যাপাদ-প্রদোষ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি স্ত্যানমিদ্ধ পরিহার করিয়া বিগত-স্ত্যানমিদ্ধ হইয়া বিহার করেন; আলোক-সংজ্ঞী, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া স্ত্যানমিদ্ধ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য পরিহার করিয়া অনুদ্ধত হইয়া বিহার করেন, আধ্যাত্মিক শান্তিলব্ধ হইয়া ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি বিচিকিৎসার পরিহার করিয়া বিচিকিৎসাহীন হইয়া বিহার করেন, কুশলধর্মে সংশয়হীন হইয়া বিচিকিৎসা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি চিত্তের এই পঞ্চ নীবরণ পরিহার করিয়া প্রজ্ঞার দ্বারা চিত্তের উপক্লেশের বলক্ষয় করিবার নিমিত্ত মৈত্রীসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ মৈত্রীসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প- “অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” করুণাসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ করুণাসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প-“অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” মুদিতাসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ মুদিতাসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প- “অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” উপেক্ষাসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ উপেক্ষাসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প-“অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।”

“নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো, এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ অথবা অপরিশুদ্ধ হয়?

“ভন্তে, অবশ্যই এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ হয়, অপরিশুদ্ধ হয় না, উহা শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়।”

“নিগ্রোধ, মাত্র ইহাতেই কৃচ্ছ্রসাধন শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয় না। ইহা ফল্গু মাত্র স্পর্শ করে।

৭৩. “ভন্তে, কিরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়? ভগবান আমার কৃচ্ছ্র শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত করিলে আমি অনুগৃহীত হইব।”

“নিগ্রোধ, তপস্বী চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন। কী প্রকারে তিনি ওইরূপে সুরক্ষিত হন? নিগ্রোধ, তপস্বী প্রাণনাশ করেন না, প্রাণনাশের কারণ হন না, উহার অনুমোদন করেন না; অদত্তের গ্রহণ করেন না, অদত্ত গ্রহণের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না; মিথ্যা বলেন না, মিথ্যা কথনের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না; তিনি ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তিজনিত সুখের অন্বেষণ করেন না; ওই অন্বেষণের কারণ হন না, উহার অনুমোদনও করেন না। নিগ্রোধ, তপস্বী এইরূপে চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন। যেহেতু তপস্বী চতুর্বিধ সংযম দ্বারা সুরক্ষিত হন এবং উহাই তাঁহার তপস্যা হয়, সেই হেতু তিনি ক্রমোন্নতির দিকে অগ্রসর হন, তিনি নিম্নগামী হন না। তিনি বিবিক্ত শয়নাসনের ভজনা করেন; অরণ্য, বৃক্ষমূল, পর্বত, কন্দর, গিরিগুহা শ্মশান, বনপ্রস্থ, উন্মুক্ত স্থান এবং পলাল স্তূপের ভজনা করেন। ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আহারান্তে তিনি পর্যঙ্কাবদ্ধ হইয়া, দেহকে ঋজুভাবে রক্ষা করিয়া, পরিমুখে স্মৃতি উপস্থাপিত করিয়া উপবিষ্ট হন। তিনি লোকে অভিধ্যার পরিহার করিয়া অভিধ্যাহীন চিত্তে বিহার করেন, অভিধ্যা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ব্যাপাদ-প্রদোষ পরিত্যাগ করিয়া অব্যাপন্ন চিত্তে বিহার করেন; সর্বপ্রাণীর হিতাকাঙ্ক্ষী হইয়া, সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পা পরবশ হইয়া; ব্যাপাদ-প্রদোষ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি স্ত্যানমিদ্ধ পরিহার করিয়া বিগত স্ত্যানমিদ্ধ হইয়া বিহার করেন; আলোক-সংজ্ঞী, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া স্ত্যানমিদ্ধ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য পরিহার করিয়া অনুদ্ধত হইয়া বিহার করেন, আধ্যাত্মিক শান্তিলব্ধ হইয়া ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি বিচিকিৎসার পরিহার করিয়া বিচিকিৎসাহীন হইয়া বিহার করেন, কুশলধর্মে সংশয়হীন হইয়া বিচিকিৎসা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি চিত্তের এই পঞ্চ নীবরণ পরিহার করিয়া প্রজ্ঞার দ্বারা চিত্তের উপক্লেশের বলক্ষয় করিবার নিমিত্ত মৈত্রীসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ মৈত্রীসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প-“অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” করুণাসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ করুণাসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প-“অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” মুদিতাসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ মুদিতাসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প- “অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” উপেক্ষাসহগত চিত্তে, যথাক্রমে এক, দুই, তিন, চারিদিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক এবং সর্বতোভাবে সমস্ত জগৎ উপেক্ষাসহগত চিত্তে, বিপুল, মহান, অপ্রমেয় অবৈর এবং অব্যাপাদ দ্বারা স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প-“অমুক স্থানে আমার এই নাম এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেই স্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপ বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।” তিনি বিশুদ্ধ, লোকাতীত, দিব্যচক্ষু দ্বারা সত্ত্বগণের চ্যুতি ও উৎপত্তি দর্শন করেন; কর্মানুযায়ী, গতিপ্রাপ্ত সত্ত্বগণের মধ্যে হীন ও উত্তমকে, সুবর্ণ ও দুর্বর্ণবিশিষ্টকে, সুগত ও দুর্গতকে জানিতে পারেন :

“ভদ্রগণ, এই এই সত্ত্ব কায়িক, বাচনিক ও মানসিক দুরাচারসম্পন্ন, আর্যগণের অপবাদক, মিথ্যাদৃষ্টিসমন্বিত, মিথ্যাদৃষ্টি হইতে উদ্ভূত কর্মপ্রাপ্ত। মরণান্তে দেহের বিনাশে উহারা অপায়-দুর্গতি-বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হইয়াছে। কিন্তু এই এই সত্ত্ব কায়িক, বাচনিক ও মানসিক সদাচারণসম্পন্ন, তাঁহারা আর্যগণের অপবাদ হইতে বিরত, সম্যক দৃষ্টিসমন্বিত, সম্যক দৃষ্টি হইতে উদ্ভূত কর্মপ্রাপ্ত; মরণান্তে দেহের বিনাশে উহারা সুগতি প্রাপ্ত হইয়া স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছেন।” এইরূপে তিনি বিশুদ্ধ, লোকাতীত, দিব্য চক্ষু দ্বারা সত্ত্বগণের চ্যুতি ও উৎপত্তি দর্শন করেন; কর্মানুযায়ী, গতিপ্রাপ্ত সত্ত্বগণের মধ্যে হীনও উত্তমকে, সুবর্ণ ও দুর্বর্ণবিশিষ্টকে, সুগত ও দুর্গতকে জানিতে পারেন।”

“নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো, এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ অথবা অপরিশুদ্ধ হয়?”

“ভন্তে, অবশ্যই এইরূপ হইলে কৃচ্ছ্রসাধন পরিশুদ্ধ হয়, অপরিশুদ্ধ হয় না, উহা শ্রেষ্ঠত্ব ও সারত্বে উপনীত হয়।”

৭৪. “নিগ্রোধ, এইরূপে কৃচ্ছ্রসাধন শ্রেষ্ঠত্বে ও সারত্বে উপনীত হয়। এবং তুমি যে আমাকে বলিয়াছিলে “যে ধর্মে ভগবান শ্রাবকগণকে শিক্ষিত করেন, সেই ধর্ম কী? কী সেই ধর্ম যাহাতে শিক্ষিত হইয়া শ্রাবকগণ বিশ্বস্ত চিত্তে আদি ব্রহ্মচর্যের মূলতত্ত্ব স্বীকার করেন?” তদুত্তরে আমি কহি ইহাই সেই মহত্তর ও শ্রেষ্ঠতর ধর্ম যাহাতে আমি আমার শ্রাবকগণকে শিক্ষিত করি, যাহাতে শিক্ষিত হইয়া আমার শ্রাবকগণ বিশ্বস্ত চিত্তে আদি ব্রহ্মচর্যের মূলতত্ত্ব স্বীকার করেন।”

এইরূপ উক্ত হইলে সেই পরিব্রাজকগণ তুমুল কোলাহলে উচ্চশব্দ মহাশব্দ করিল, “এ ক্ষেত্রে আমরা আচার্যসহ পরাজিত, আমরা ইহাপেক্ষা মহত্তর ও শ্রেষ্ঠতর কিছুই জানি না।”

৭৫. যখন গৃহপতি সন্ধান জানিলেন, “নিশ্চয়ই এক্ষণে এই সকল অন্যতীর্থিয় পরিব্রাজকগণ ভগবানের বাক্য শুনিতে আগ্রহান্বিত হইয়াছে, উহাতে কর্ণপাত করিতেছে, অর্হত্ত্বাকাঙ্ক্ষী হইয়াছে,” তখন তিনি পরিব্রাজক নিগ্রোধকে এইরূপ বলিলেন, “ভন্তে নিগ্রোধ, আপনি আমাকে বলিয়াছিলেন, “দেখ গৃহপতি, তুমি জান কি কাহার সহিত শ্রমণ গৌতম কথা বলেন? কাহার সহিত কথোপকথনে নিযুক্ত হন? কাহার সহিত আলোচনায় তাঁহার প্রজ্ঞা বিকাশ প্রাপ্ত হয়? নির্জনবাস হেতু শ্রমণ গৌতমের প্রজ্ঞা নষ্ট হইয়াছে, তিনি পরিষদ হইতে দূরে অবস্থান করেন, কথোপকথনে নিপুণ নহেন, তিনি বিবেকের সেবা করেন। যেইরূপ সীমাবদ্ধস্থানে বিচরণশীল দৃষ্টিহীন গাভী নিভৃতের ভজনা করে, সেইরূপই নির্জনবাস হেতু শ্রমণ গৌতমের প্রজ্ঞা প্রণষ্ট, তিনি পরিষদ হইতে দূরে অবস্থান করেন, কথোপকথনে নিপুণ নহেন, তিনি বিবেকের সেবা করেন। দেখো, গৃহপতি, যদি শ্রমণ গৌতম এই পরিষদে আগমন করেন, তাহা হইলে মাত্র এক প্রশ্ন দ্বারা তাঁহাকে নির্বাক করিব, শূন্য কুম্ভের ন্যায় তাঁহাকে আবর্তিত করিব।” ভন্তে, ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ এইস্থানে উপস্থিত, তিনি যে পরিষদ হইতে দূরে অবস্থান করেন তাহা প্রমাণ করুন, তাঁহাকে সীমাবদ্ধ স্থানে বিচরণশীল গাভীরূপে প্রতিপন্ন করুন, মাত্র এক প্রশ্ন দ্বারা তাঁহাকে নির্বাক করুন, তুচ্ছ কুম্ভের ন্যায় তাঁহাকে আবর্তিত করুন।”

এইরূপ উক্ত হইলে পরিব্রাজক নিগ্রোধ তূষ্ণীভূত, বিমূঢ়, বিষণ্ণ, অধোমুখ, শোচনানুতপ্ত, অপ্রতিভ হইয়া উপবিষ্ট রহিলেন।

৭৬. অনন্তর ভগবান নিগ্রোধের ওইরূপ অবস্থা অনুভব করিয়া তাঁহাকে বলিলেন, “নিগ্রোধ, সত্যই তুমি এইরূপ বাক্য বলিয়াছিলে?”

“ভন্তে, সত্যই আমি ওইরূপ বলিয়াছিলাম, আমি এতই নির্বোধ, এতই মূঢ়, এতই অজ্ঞান।”

“নিগ্রোধ, তুমি কী মনে করো? পরিব্রাজকদিগের মধ্যে সম্মানার্হ বৃদ্ধ আচার্যপ্রাচার্যগণকে তুমি কি ইহা বলিতে শুনিয়াছ, “অতীতে যে-সকল অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ ছিলেন, ওই সকল ভগবান পরস্পরের সহিত সাক্ষাৎ এবং একত্র মিলনের কালে তুমুল কোলাহলে উচ্চশব্দ মহাশব্দ করিয়া নানা প্রকার হীন আলাপে রত হইতেন; যথা : রাজকথা, চোর-কথা, মহামাত্র কথা, সেনা-সম্বন্ধীয় কথা, ভয়-কথা, যুদ্ধ কথা, খাদ্য ও পানীয়-কথা, বস্ত্র-কথা, শয়ন-কথা, মাল্য-কথা, গন্ধ-কথা, জ্ঞাতি-কথা, যান-কথা, গ্রাম-কথা, নিগম-কথা, নগর-কথা, জনপদ-কথা, নারী-কথা, পুরুষ-কথা, বীর-কথা, পথ-কথা, কুম্ভস্থান-কথা, পূর্বপুরুষ-কথা, নিরর্থক-কথা, পৃথিবী ও সমুদ্রের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় মন্তব্য, অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব সম্বন্ধীয় কথা, যেইরূপ তুমি এক্ষণে আচার্যসহ হইতেছ?” অথবা তাঁহারা কি এইরূপ বলিয়াছেন, “ওই সকল ভগবান অরণ্যে দূর বনপ্রস্থে বাস করিতেন, যে স্থানে শব্দ নাই, নির্ঘোষ নাই, যে স্থানে বিজনবাত প্রবাহিত, যে স্থান মনুষ্যসমাগম রহিত, যাহা ধ্যানানুশীলনের উপযুক্ত”, যেইরূপ আমি এক্ষণে করিতেছি?”

“ভন্তে, পরিব্রাজকদিগের মধ্যে সম্মানার্হ বৃদ্ধ আচার্যপ্রাচার্যগণকে আমি এইরূপ বলিতে শুনিয়াছি, “অতীতে যে-সকল অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ ছিলেন, ওই সকল ভগবান পরস্পরের সহিত সাক্ষাৎ এবং একত্র মিলনের কালে তুমুল কোলাহলে উচ্চশব্দ মহাশব্দ করিয়া নানা প্রকার হীন আলাপে রত হইতেন না; যথা : রাজকথা, চোর-কথা, মহামাত্র কথা, সেনা-সম্বন্ধীয় কথা, ভয়-কথা, যুদ্ধ কথা, খাদ্য ও পানীয়-কথা, বস্ত্র-কথা, শয়ন-কথা, মাল্য-কথা, গন্ধ-কথা, জ্ঞাতি-কথা, যান-কথা, গ্রাম-কথা, নিগম-কথা, নগর-কথা, জনপদ-কথা, নারী-কথা, পুরুষ-কথা, বীর-কথা, পথ-কথা, কুম্ভস্থান-কথা, পূর্বপুরুষ-কথা, নিরর্থক-কথা, পৃথিবী ও সমুদ্রের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় মন্তব্য, অস্তিত্ব ও নাস্তিত্ব সম্বন্ধীয় কথা, যেইরূপ আমি এক্ষণে আচার্যসহ হইতেছি। ওই সকল ভগবান অরণ্যে দূর বনপ্রস্থে বাস করিতেন। যে স্থানে শব্দ নাই, নির্ঘোষ নাই, যে স্থানে বিজনবাত প্রবাহিত, যে স্থান মনুষ্যসমাগম রহিত, যাহা ধ্যানানুশীলনের উপযুক্ত”, যেইরূপ ভগবান এক্ষণে করিতেছেন।”

“নিগ্রোধ, তুমি বিজ্ঞ, স্মৃতিমান ও বৃদ্ধ, তোমার কী মনে হয় নাই যে “বুদ্ধ ভগবান বোধের নিমিত্ত ধর্মের উপদেশ দিতেছেন, দান্ত ভগবান দমনার্থ ধর্মোপদেশ দিতেছেন, শান্ত ভগবান শান্তির নিমিত্ত ধর্মোপদেশ দিতেছেন, তীর্ণ ভগবান তরণের নিমিত্ত ধর্মোপদেশ দিতেছেন, পরিনির্বৃত ভগবান পরিনির্বাণের জন্য ধর্মোপদেশ দিতেছেন?”

৭৭. এইরূপ উক্ত হইলে পরিব্রাজক নিগ্রোধ ভগবানকে বলিলেন :

“আমি বিষম ভ্রমে পতিত হইয়াছিলাম, আমি নির্বোধ, মূঢ়, অজ্ঞান, তজ্জন্যই ভগবানকে ওইরূপ বলিয়াছিলাম। ভন্তে, ভগবান আমার অপরাধ ক্ষমা করুন, যাহাতে আমি ভবিষ্যতে আপনাকে সংযত করিতে পারি।”

“সত্যই, নিগ্রোধ, তুমি বিষম ভ্রমে পতিত হইয়াছিলে, তুমি নির্বোধ, মূঢ়, অজ্ঞান, তজ্জন্যই ভগবানের সম্বন্ধে ওইরূপ বলিয়াছিলে; যেহেতু, নিগ্রোধ, তুমি চ্যুতিকে চ্যুতিরূপে দেখিয়া উহার যথোপযুক্ত প্রতিকার করিয়াছ, সেই হেতু তোমাকে ক্ষমা করিতেছি। নিগ্রোধ, যে চ্যুতিকে চ্যুতিরূপে দেখিয়া উহার যথোপযুক্ত প্রতিবিধান করে, সে ভবিষ্যতে সংযত হয়, এই উৎকর্ষ আর্যবিনয়-সুলভ। নিগ্রোধ, আমার বক্তব্য এই, “কোনো বিজ্ঞ, অশঠ, অমায়াবী, সরল প্রকৃতিসম্পন্ন পুরুষ আমার নিকট আসিলে আমি তাহাকে শিক্ষা দিব, ধর্মের উপদেশ দিব। যদি তিনি শিক্ষানুসারে আচরণ করেন, তাহা হইলে যথার্থ পথাবলম্বী কুলপুত্রগণ যে সম্পদ লাভের জন্য গৃহ পরিত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যার আশ্রয় করেন সেই অনুত্তর ব্রহ্মচর্য্য স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও উপলব্ধি করিয়া এই জীবনেই সাত বৎসরের মধ্যে উহার পূর্ণতাসাধন করিবেন। নিগ্রোধ, সাত বৎসরের প্রয়োজন নাই। ওইরূপ পুরুষ শিক্ষানুসারে আচরণ করিলে এই জীবনেই ছয় বৎসরের মধ্যে পূর্ণতাসাধন করিবেন। পাঁচ বৎসরের মধ্যে পূর্ণতাসাধন করিবেন। চারি বৎসর, তিন বৎসর, দুই বৎসর, এক বৎসর, সাত মাস, ছয় মাস, পাঁচ মাস, চারি মাস, তিন মাস, দুই মাস, এক মাস, অথবা অর্ধ মাসের মধ্যে উক্ত প্রকার ব্রহ্মচর্যের পূর্ণতাসাধন করিবেন। নিগ্রোধ, অর্ধ মাসেরও প্রয়োজন নাই। শিক্ষানুসারে আচরণ করিলে ওইরূপ পুরুষ এক সপ্তাহের মধ্যে উক্ত প্রকার ব্রহ্মচর্যের পূর্ণতাসাধন করিবেন।

৭৮. “নিগ্রোধ, তোমার মনে এইরূপ হইতে পারে, “শিষ্য সংগ্রহের জন্য শ্রমণ গৌতম এইরূপ বলিতেছেন,” কিন্তু, নিগ্রোধ, এইরূপ মনে করিও না, যিনি তোমার আচার্য তিনিই তোমার আচার্য হইয়া থাকুন। নিগ্রোধ, তোমার মনে এইরূপ হইতে পারে, “আমার অনুসৃত বিধি হইতে আমাকে চ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে শ্রমণ গৌতম এইরূপ বলিতেছেন,” কিন্তু, নিগ্রোধ, এইরূপ মনে করিও না, তোমার যে বিধি সেই বিধিই রক্ষিত হউক। তোমার মনে এইরূপ হইতে পারে, “আমার জীবিকা হইতে আমাকে চ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে শ্রমণ গৌতম এইরূপ বলিতেছেন”, কিন্তু, নিগ্রোধ, এইরূপ মনে করিও না, তোমার যে জীবিকা তুমি তাহাই অবলম্বন করিয়া থাক, নিগ্রোধ, তোমার মনে এইরূপ হইতে পারে, “যাহা আমাদিগের পক্ষে অকুশলধর্ম এবং যাহা আমরা আচার্যসহ অকুশলরূপে গ্রহণ করি, ওই সকলে আমাদিগকে প্রতিষ্ঠিত করিবার অভিপ্রায়ে শ্রমণ গৌতম এইরূপ বলিতেছেন,” কিন্তু, নিগ্রোধ, এইরূপ মনে করিও না, যাহা তোমাদের পক্ষে অকুশলধর্ম এবং যাহা তোমরা আচার্যসহ অকুশলরূপে গ্রহণ করো, ওই সকল ওইরূপেই গৃহীত হউক। নিগ্রোধ, তোমার মনে হইতে পারে “যাহা আমাদিগের পক্ষে কুশলধর্ম এবং যাহা আমরা আচার্যসহ কুশলরূপে গ্রহণ করি, ওই সকল হইতে আমাদিগকে চ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে শ্রমণ গৌতম, এইরূপ বলিতেছেন,” কিন্তু, নিগ্রোধ, এইরূপ মনে করিও না, যাহা তোমাদের পক্ষে কুশলধর্ম এবং যাহা তোমরা আচার্যসহ কুশলরূপে গ্রহণ করো, ওই সকলই ওইরূপেই গৃহীত হউক। এইরূপে, নিগ্রোধ, আমি শিষ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে, অথবা বিধিচ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে, অথবা জীবিকা হইতে চ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে, অথবা যাহা তোমাদের পক্ষে অকুশলধর্ম এবং যাহা তোমরা আচার্যসহ অকুশলরূপে গ্রহণ করো ওই সকলে তোমাদিগকে প্রতিষ্ঠিত করিবার অভিপ্রায়ে, অথবা যাহা তোমাদের পক্ষে কুশলধর্ম এবং যাহা তোমরা আচার্যসহ কুশলরূপে গ্রহণ করো, ওই সকল হইতে তোমাদিগকে চ্যুত করিবার অভিপ্রায়ে এইরূপ কহি নাই। নিগ্রোধ, অকুশল ধর্মের অস্তিত্ব আছে যাহা নষ্ট না হইলে সংক্লেশের কারণ হয়, পুনর্জন্মের কারণ হয়, যাহা দুঃখমিশ্রিত, দুঃখপ্রসূ হয় এবং যাহা ভবিষ্যতে জাতি জরা-মরণে পর্য্যবসিত হয়, যাহার দূরীকরণার্থে আমি ধর্মোপদেশ দিই, যে উপদেশ পালনে তোমাদের ক্লেশোৎপাদশ-ধর্মসমূহ-ক্ষয় প্রাপ্ত হইবে, শুদ্ধি-প্রদায়ী ধর্মসমূহ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইবে, তোমরা প্রজ্ঞার পূর্ণতা ও বিপুলতা এই জীবনেই স্বয়ং জ্ঞাত হইয়া ও উপলব্ধি করিয়া উহার পূর্ণতাসাধন করিবে।”

৭৯. এইরূপ উক্ত হইলে পরিব্রাজকগণ তূষ্ণীভূত, বিমূঢ়, বিষণ্ণ অধোমুখ, শোচনানুতপ্ত, অপ্রতিভ হইয়া মারাভিভূত চিত্তের ন্যায় উপবিষ্ট রহিলেন।

তখন ভগবান চিন্তা করিলেন, “এই সকল মূঢ়দিগের সকলেই মার কর্তৃক অধিকৃত, তাহাদের এক জনেরও মনে হইতেছে না, “চলো, আমরা উচ্চজ্ঞান লাভার্থে শ্রমণ গৌতমের শাসনে ব্রহ্মচর্য্য পালন করিব, এক সপ্তাহকাল ত কিছুই নয়?”

অনন্তর ভগবান উদুম্বরিকার পরিব্রাজকারামে সিংহনাদ করিয়া আকাশে উত্থিত হইয়া গৃধ্রকূট পর্বতে আবির্ভূত হইলেন। সেইক্ষণেই গৃহপতি সন্ধান রাজগৃহে প্রবেশ করিলেন।

উদুম্বরিক-সিংহনাদ সূত্রান্ত সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [২]