লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩২]

শ্রামণ্যফল সূত্র

১৫০. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। একসময় ভগবান রাজগৃহে জীবক কৌমারভৃত্যের আম্রবনে অবস্থান করিতেছিলেন। সঙ্গে সার্ধদ্বাদশশত ভিক্ষু-সমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘ ছিল। ওই সময় মগধের রাজা বৈদেহীপুত্র অজাতশত্রু পঞ্চদশীর উপোসথ দিবসে, চাতুর্মাসী কৌমুদীপূর্ণ পূর্ণিমার রাত্রিতে, রাজামাত্য পরিবৃত হইয়া শ্রেষ্ঠ প্রাসাদোপরি উপবিষ্ট ছিলেন। অনন্তর সেই উপোসথ দিনে মগধরাজের মুখ হইতে আনন্দোক্তি নির্গত হইল :

“কী রমণীয় জ্যোৎস্না রাত্রি!

“কী সুন্দর জ্যোৎস্না রাত্রি!

“কী দর্শনীয় জ্যোৎস্না রাত্রি!

“কী নির্মল জ্যোৎস্না রাত্রি!

“কী লক্ষণসম্পন্ন জ্যোৎস্না রাত্রি!

“আজ কোন শ্রমণ বা ব্রাহ্মণের সঙ্গে অভিলাষ করিব, যাঁহার সংসর্গে আমাদিগের চিত্ত প্রসন্ন হইবে?”

১৫১. এইরূপ উক্ত হইলে জনৈক রাজামাত্য মগধরাজকে এইরূপ বলিলেন, “দেব, পূরণকাশ্যপ আছেন, তিনি সংঘনায়ক, গণনায়ক, গণাচার্য, জ্ঞানী, যশস্বী, তীর্থঙ্কর, বহুজনসম্মানিত, অভিজ্ঞ, দীর্ঘ প্রব্রজিত এবং বয়োবৃদ্ধ। দেব, ওই পূরণকাশ্যপের নিকট গমন করুন। তাঁহার নিকট গমনে মহারাজের চিত্ত প্রসন্ন হইতে পারে।” এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।

১৫২. অন্য এক মন্ত্রী রাজাকে বলিলেন, “দেব, মক্ষলি গোসাল আছেন, তিনি সংঘনায়ক,… এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।

১৫৩. অন্য এক মন্ত্রী রাজাকে বলিলেন, “দেব, অজিত কেশকম্বল আছেন, তিনি সংঘনায়ক,… এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।

১৫৪. অন্য এক মন্ত্রী বলিলেন, “দেব, পকুধ কাচ্চায়ন আছেন, তিনি সংঘনায়ক,… এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।

১৫৫. অন্য এক মন্ত্রী রাজাকে বলিলেন, “দেব, সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত আছেন, তিনি সংঘনায়ক,… এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।

১৫৬. অন্য এক মন্ত্রী রাজাকে বলিলেন, “দেব, নিগণ্ঠ নাতপুত্ত আছেন, তিনি সংঘনায়ক,… এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করিলেন।

১৫৭. ওই সময় জীবক কৌমারভৃত্য মগধরাজের অনতিদূরে মৌনাবলম্বনপূর্বক উপবিষ্ট ছিলেন। মগধরাজ তাঁহাকে বলিলেন, “মিত্র জীবক, তুমি কী কারণে মৌন রহিয়াছ?

“দেব, ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ সার্ধদ্বাদশশত ভিক্ষু-সমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত আমাদের আম্রকুঞ্জে অবস্থান করিতেছেন। সেই পূজ্য গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, “ইনিই ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয়, দম্য-পুরুষ-সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবন্ত।” মহারাজ ওই ভগবন্তের নিকট গমন করুন। তাঁহার নিকট গমনে মহারাজের চিত্ত প্রসন্ন হইতে পারে।”

গৌতমের নিকট গমন

১৫৮. “মিত্র জীবক, তাহা হইলে হস্তীযানসমূহ প্রস্তুত করো।”

জীবক কৌমারভৃত্য “যে আজ্ঞা, মহারাজ” বলিয়া মগধরাজকে প্রতিশ্রুতি দানপূর্বক পঞ্চশত হস্তিনী এবং রাজার আরোহণীয় হস্তী সজ্জিত করিয়া মগধরাজের নিকট বার্তা প্রেরণ করিলেন, “দেব, হস্তীযান প্রস্তুত। এক্ষণে যেরূপ ইচ্ছা হয় করুন।”

১৫৯.তৎপরে মগধরাজ বৈদেহীপুত্র পাঁচশত হস্তিনীর প্রত্যেকের উপর তাঁহার নারীবর্গের এক একজনকে আরোহণ করাইয়া স্বয়ং রাজহস্তীর পৃষ্ঠে আরোহণ করিলেন এবং উল্কাধারী অনুচরবর্গ সমভিব্যাহারে মহা আড়ম্বরের সহিত রাজগৃহ হইতে জীবক কৌমারভৃত্যের আম্রবনে গমন করিলেন।

আম্রবনের অদূরে উপস্থিত হইয়া মগধরাজ অজাতশত্রু ভীত, স্তম্ভিত ও রোমাঞ্চ কলেবর হইলেন। এইরূপে উদ্বিগ্ন ও রোমাঞ্চিত হইয়া তিনি জীবককে বলিলেন :

“মিত্র জীবক, তুমি আমাকে প্রতারিত করো নাই তো? তুমি আমার সহিত প্রবঞ্চনা করো নাই তো? তুমি আমাকে শত্রুকরে অর্পণ করো নাই তো? ইহা কীরূপ যে এই বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের মধ্যে, সার্ধদ্বাদশশত ভিক্ষুর মধ্যে কোনো প্রকার শব্দই নাই-না একটি হাঁচির শব্দ, না একটি কাশির শব্দ?”

“মহারাজ ভীত হইবেন না। আমি আপনাকে প্রতারিত করিতেছি না, আপনার সহিত প্রবঞ্চনা করিতেছি না, আপনাকে শত্রুহস্তে সমর্পণ করিতেছি না। মহারাজ, অগ্রসর হউন, অগ্রসর হউন। ওই মণ্ডপে দীপসমূহ জ্বলিতেছে।”

১৬০. তৎপরে মগধরাজ হস্তীযানে যতদূর যাওয়া সম্ভব ততদূর হস্তীপৃষ্ঠে গমন করিয়া, পরে হস্তী হইতে অবতরণপূর্বক পদব্রজে মণ্ডপদ্বারে উপনীত হইলেন। পরে তিনি জীবককে বলিলেন :

“মিত্র জীবক, ভগবান কোথায়?”

“মহারাজ, ওই ভগবান, ওই তিনি ভিক্ষুসংঘ পরিবৃত হইয়া মধ্যে স্থিত স্তম্ভ আশ্রয় করিয়া পূর্বমুখ হইয়া উপবিষ্ট।”

১৬১. তৎপরে মগধরাজ ভগবানের সন্নিধানে গমনপূর্বক একান্তে দণ্ডায়মান হইয়া নির্মল সরোবরের ন্যায় শান্ত ভিক্ষুসংঘকে অবলোকন করিয়া বলিয়া উঠিলেন, “মদীয় পুত্র উদায়ীভদ্রও এই শান্তিযুক্ত হউক, যে শান্তি এই ভিক্ষুসংঘে বিরাজমান।”

“মহারাজ, আপনার স্নেহধারা যথাস্থানে প্রবাহিত হইয়াছে।”

“ভন্তে, পুত্র উদায়ীভদ্র আমার প্রিয়। যে শান্তি এই ভিক্ষুসংঘে বিরাজ করিতেছে, কুমারও ওই শান্তিযুক্ত হউক।”

১৬২. তদনন্তর মগধরাজ অজাতশত্রু ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক ভিক্ষুসংঘের প্রতি অঞ্জলি প্রণমিত করিয়া একান্তে উপবেশন করিলেন। আসন গ্রহণান্তে তিনি ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, আপনার অনুমতি পাইলে আমি আপনাকে এক বিষয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে ইচ্ছা করি।”

“মহারাজ, আপনার যাহা ইচ্ছা জিজ্ঞাসা করুন।”

১৬৩. “ভন্তে, জনসাধারণের জন্য বহুবিধ শিল্পবিদ্যা আছে; যথা : হস্তী আরোহণ, অশ্বারোহণ, রথিক, ধনুগ্রাহি, চেলক , চলক , পিণ্ডদায়ক , উগ্ররাজপুত্র , প্রস্কন্দিক , মহানাগ-শূর, চর্ম-যোধী, দাসপুত্র, সূপকার, ক্ষৌরকার, স্নাপক, মোদক, মালাকার, রজক, পেশকার, নলকার, কুম্ভকার, গণকমুদ্রিক এবং এই প্রকারের অন্য যেকোনো শিল্প-ওই সকল শিল্পাবলম্বী সকলেই এই জগতেই সাংদৃষ্টিক শিল্পফল প্রাপ্ত হইয়া থাকেন। উহা দ্বারা তাঁহারা স্বয়ং সুখী ও তৃপ্ত হন, মাতাপিতাকে সুখী ও তৃপ্ত করেন, স্ত্রী-পুত্রকে সুখী ও তৃপ্ত করেন, মিত্রামাত্যকে সুখী ও তৃপ্ত করেন। তাঁহারা শ্রমণ ও ব্রাহ্মণের নিমিত্ত ঔর্ধাগ্রিক, স্বার্গিক ও সুখবিপাকযুক্ত, স্বর্গণ্ডসংবর্তনিক দক্ষিণার প্রতিষ্ঠা করেন। ভন্তে, ওইরূপ ইহজীবনেই লভ্য কোনো সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্য ফলের উল্লেখ করিতে পারেন কি?”

১৬৪. “মহারাজ, আপনি স্বীকার করেন যে এই প্রশ্ন অন্য শ্রমণ ব্রাহ্মণকেও জিজ্ঞাসা করা হইয়াছে?”

“ভন্তে, আমি স্বীকার করি।”

পূরণকশ্যপ

“মহারাজ, ওই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যেরূপ উত্তর দিয়াছেন, যদি বাধা না থাকে, তাহা ব্যক্ত করুন।”

“ভন্তে, কোনো বাধাই নাই, যখন ভগবান অথবা ভগবান তুল্যগণ উপবিষ্ট।”

“মহারাজ, তাহা হইলে ব্যক্ত করুন।”

১৬৫. “ভন্তে, একসময় আমি পূরণকশ্যপের নিকট গমন করিয়াছিলাম। তথায় গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে তাঁহার সহিত মধুর চিত্তরঞ্জক বাক্যালাপপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলাম। আসন গ্রহণান্তে, এই ক্ষণে আপনাকে যে প্রশ্ন করিয়াছি, তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রশ্নই করিলাম।

১৬৬. “এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পূরণকশ্যপ আমাকে বলিলেন, “মহারাজ, যে করে এবং যে করায়, যে ছেদন করে এবং যে ছেদন করায়, যে অঙ্গহীন করে এবং যে অঙ্গহীন করায়, যে শোক ও নির্যাতনের কারণ হয়, যে কম্পিত হয় এবং যে কম্পিত করায়, যে প্রাণনাশ করে, যে অদত্ত গ্রহণ করে, যে সন্ধি ছিন্ন করে , যে লুণ্ঠন করে, যে চৌর্যে প্রবৃত্ত হয়, গুপ্তস্থান হইতে যে হঠাৎ পথচারীকে আক্রমণে প্রবৃত্ত হয়, যে পরদার গমন করে, মিথ্যাভাষণ করে, তাহারা এই সকল কর্ম করিয়া পাপ করে না। যদি কেহ ক্ষুরধার চক্রের দ্বারা পৃথিবীর প্রাণীগণকে এক মাংস-খলে, এক মাংস পুঞ্জে, পরিণত করে, তজ্জন্য কোনো পাপ হয় না, পাপের আগমন হয় না। যদি ওই ব্যক্তি আঘাত করিতে করিতে, হত্যা করিতে করিতে, ছেদন করিতে করিতে, ছেদন করাইতে করাইতে, অঙ্গহীন করিতে করিতে, অঙ্গহীন করাইতে করাইতে গঙ্গার দক্ষিণ তীরবর্তী হইয়া গমন করে, তজ্জন্য কোনো পাপ হইবে না, পাপের আগম হইবে না। যদি ওই ব্যক্তি দান করিতে করিতে, দান করাইতে করাইতে, যজ্ঞ করিতে করিতে, যজ্ঞ করাইতে করাইতে, গঙ্গার উত্তর তীরবর্তী হইয়া গমন করে, তজ্জন্য কোনো পুণ্য হইবে না, পুণ্যের আগম হইবে না। দান হইতে, দম হইতে, সংযম হইতে, সত্যবাক্য হইতে পুণ্যের উদ্ভব হয় না, পুণ্যের আগমন হয় না।” ভন্তে, এইরূপে পূরণকশ্যপ সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া, আমার নিকট অক্রিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ভন্তে, আম্র কি এই প্রশ্নের উত্তরে লবুজের বর্ণনা যেরূপ হয়, সেইরূপ পূরণকশ্যপ সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া অক্রিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল “আমার ন্যায় ব্যক্তি স্বীয় রাজ্যবাসী শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণকে অপ্রসন্ন করিবার চিন্তা কী প্রকারে করিবে?” এইরূপে আমি পূরণকশ্যপের বাক্যের অভিনন্দনও করিলাম না, নিন্দাও করিলাম না; অভিনন্দন ও নিন্দা উভয়ই পরিহার করিয়া, স্বয়ং ক্ষুব্ধ হইয়াও ক্ষোভসূচক বাক্যের উচ্চারণ না করিয়া, আমি ওই বাক্য গ্রহণও করিলাম না, বর্জনও করিলাম না, আসন হইতে উঠিয়া চলিয়া আসিলাম।

মক্ষলি গোসাল

১৬৭. “ভন্তে, একসময় আমি মক্ষলি গোসালের নিকট গমন করিয়াছিলাম। তথায় গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে তাঁহার সহিত মধুর চিত্তরঞ্জক বাক্যালাপপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলাম। আসন গ্রহণান্তে এই ক্ষণে আপনাকে যে প্রশ্ন করিয়াছি তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রশ্ন করিলাম।

১৬৮. “এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া মক্ষলি গোসাল আমাকে বলিলেন, “মহারাজ, সত্ত্বগণের সংক্লেশের হেতুও নাই, প্রত্যয়ও নাই; হেতু ও প্রত্যয় বিনা সত্ত্বগণ সংক্লিষ্ট হয়। সত্ত্বগণের শুদ্ধির হেতুও নাই, প্রত্যয়ও নাই; হেতু ও প্রত্যয় বিনা তাহাদের শুদ্ধি হয়। আত্ম-কার নাই, পর-কার নাই, পুরুষ-কার নাই, বল নাই, বীর্য নাই, পুরুষ-স্থাম নাই, পুরুষ-পরাক্রম নাই। সর্বসত্ত্ব, সর্বপ্রাণী, সর্বভূত, সর্বজীব, অবশ, অবল, নিবীর্য; তাহারা নিয়তি ও সংযোগ পরিচালিত এবং ষড়বিধ জাতিভুক্ত হইয়া স্বীয় স্বীয় জাত্যানুসারে সুখ দুঃখ অনুভব করে। প্রধান প্রধান যোনির সংখ্যা চৌদ্দ লক্ষ ছয় সহস্র এবং ছয়শত। কর্ম পাঁচশত প্রকার, তদুপরি পাঁচ প্রকার (পঞ্চেন্দ্রিয় সম্বন্ধীয়), তদুপরি তিন প্রকার (কায়িক, বাচনিক এবং মানসিক); কর্ম এবং অর্ধ কর্মও আছে। দ্বি-ষষ্ঠী অন্তরকল্প, ছয় অভিজাতি, অষ্ট পুরুষ-ভূমি, ঊনপঞ্চাশ শত জীবিকা, ঊনপঞ্চাশ শত পরিব্রাজক, ঊনপঞ্চাশ শত নাগাবাস, দুই সহস্র ইন্দ্রিয়, তিন সহস্র নিরয়, ছত্রিশ রাজোধাতু, সাত সংজ্ঞী-গর্ভ, সাত অসংজ্ঞী-গর্ভ, সাত নির্গ্রণ্ঠ-গর্ভ, সাত দেব, সাত মনুষ্য, সাত পিশাচ, সাত সর, সাত শত সাত গ্রন্থি, সাত শত সাত প্রপাত, সাত শত সাত স্বপ্ন, চতুরশীতি লক্ষ মহাকল্প যাহাতে মূর্খ ও পণ্ডিত সকলেই পুনঃপুন জন্মগ্রহণ করিয়া দুঃখের অন্ত করিবে। কেহ কেহ মনে করিতে পারেন, আমি এই শীল, এই ব্রত, এই তপ, অথবা এই ব্রহ্মচর্যের দ্বারা অপরিপক্ব কর্মের পক্বতা-সাধন করিব, অথবা পরিপক্ব কর্মকে ভোগ করিয়া উহার অন্ত করিব,” কিন্তু তাঁহারা কৃতকার্য হইবেন না। সংসারে দ্রোণ তুলিত সুখ-দুঃখের পরিবর্তন হয় না; উহার হ্রাসও নাই, বৃদ্ধিও নাই, উৎকর্ষও নাই, অপকর্ষও নাই। যেরূপ সূত্রগুল ক্ষিপ্ত হইলে তাহার গতি বেষ্টনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, সেইরূপ মূর্খ ও পণ্ডিত সকলেই পুনঃপুন জন্মগ্রহণ করিয়া দুঃখের অন্ত করিবে।”

১৬৯. “ভন্তে, এইরূপে মক্ষলি গোসাল সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া সংসারশুদ্ধি ব্যাখ্যা করিলেন। ভন্তে, আম্র কী এ প্রশ্নের উত্তরে লবুজের বর্ণনা যেরূপ হয়, সেইরূপ মক্ষলি গোসাল সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া সংসারশুদ্ধি ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল, “আমার ন্যায় ব্যক্তি… করিবে?” এইরূপে আমি মক্ষলি গোসালের বাক্যের… চলিয়া আসিলাম।

অজিত কেশকম্বলী

১৭০. “ভন্তে, আমি একদিন অজিত কেশকম্বলীর নিকট গমন করিয়াছিলাম। তথায় গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে তাঁহার সহিত চিত্তরঞ্জক বাক্যালাপপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলাম। আসন গ্রহণান্তে এইক্ষণে আপনাকে যে প্রশ্ন করিয়াছি তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রশ্ন করিলাম।

১৭১. “ভন্তে, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া অজিত কেশকম্বলী বলিলেন, “মহারাজ, দান নাই, যজ্ঞ নাই, হোম নাই, সুকৃত-দৃষ্কৃত কর্মের ফল-বিপাক নাই, ইহলোক-পরলোক নাই, মাতাপিতা নাই, ঔপপাতিক জীব নাই, পূর্ণজ্ঞানলব্ধ সর্বোচ্চ মার্গস্থ এমন শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ নাই যাঁহারা ইহলোক ও পরলোক স্বয়ং জানিয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া ওই জ্ঞান প্রচার করেন। মনুষ্য চতুর্মহাভূত হইতে উৎপন্ন। যখন তাহার মৃত্যু হয় তখন তাহার দেহস্থ পৃথিবী ধাতু মহাপৃথিবীতে গমনপূর্বক উহাতেই লীন হয়, আপধাতু জলে, তেজধাতু অগ্নিতে এবং বায়ুধাতু বায়ুতে লীন হয়, এবং তাহার ইন্দ্রিয়সমূহ আকাশে লীন হয়। মৃতদেহ শবযানে বাহিত হয়; দাহস্থান পর্যন্ত প্রশংসা কীর্তিত হয়; অস্থিসমূহ কপোতবর্ণ প্রাপ্ত হয়, এবং সমস্তই ভস্মে পরিণত হয়। এই যে দান ইহা নির্বোধের ঘোষণা। যাহারা বলে দানের ফল আছে, তাহাদের বাক্য তুচ্ছ, মিথ্যা, প্রলাপমাত্র। মূর্খ ও পণ্ডিত উভয়েই দেহাবসানে উচ্ছেদ প্রাপ্ত হয়, বিনষ্ট হয়, মরণান্তে তাহাদের অস্তিত্ব থাকে না।

১৭২. “ভন্তে, এইরূপে অজিত কেশকম্বলী সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া উচ্ছেদবাদ প্রকাশ করিলেন। ভন্তে, আম্র জিজ্ঞাসিত হইয়া লবুজের বর্ণনা অথবা লবুজ জিজ্ঞাসিত হইয়া আম্রের বর্ণনা যেরূপ হয়, সেইরূপ অজিত কেশকম্বলী সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া উচ্ছেদবাদ প্রকাশ করিয়াছেন। ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল, “আমার ন্যায় ব্যক্তি… করিবে?” এইরূপে আমি অজিত কেশকম্বলীর বাক্যের… চলিয়া আসিলাম।

পকুধ কচ্চায়ন

১৭৩. “ভন্তে, আমি একদিন পকুধ কচ্চায়নের নিকট গমন করিয়াছিলাম। তথায় গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে তাঁহার সহিত চিত্তরঞ্জক বাক্যালাপপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলাম। আসন গ্রহণান্তে এই ক্ষণে আপনাকে যে প্রশ্ন করিয়াছি তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রশ্নই করিলাম।

১৭৪. “ভন্তে, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া পকুধ কচ্চায়ন বলিলেন, “মহারাজ, এই সাত বস্তু অকৃত, অকৃত-বিধ , অনির্মিত, নির্মাতাহীন, উৎপাদিকা শক্তিহীন, কূটস্থ, অচল স্তম্ভসদৃশ। তাহারা গতিহীন, বিকারহীন; তাহারা পরস্পর পরস্পরের বিরোধী নহে, পরস্পর পরস্পরের সুখ অথবা দুঃখ অথবা সুখ-দুঃখ বিধানে পর্যাপ্ত নহে। এই সাত বস্তু কী কী? ক্ষিতি, অপ, তেজ, বায়ু, সুখ, দুঃখ এবং সপ্তম বস্তু জীব। এই সাত বস্তু অকৃত, অকৃতবিধ, অনির্মিত, নির্মাতাহীন, অনুৎপাদক, কূটস্থ, অচল স্তম্ভসদৃশ। তাহারা গতিহীন, বিকারহীন… পর্যাপ্ত নহে। এইরূপে, হন্তা নাই, ঘাতয়িতা নাই; শ্রাবক নাই, শ্রাবয়িতা নাই; বিজ্ঞাতা নাই, বিজ্ঞাপয়িতা নাই। যে তীক্ষ্ণ শস্ত্র দ্বারা শীর্ষচ্ছেদ করে, সে তদ্বারা কাহারও জীবন নাশ করে না, কেবল সপ্ত বস্তুর মধ্যস্থ বিবরে অস্ত্র নিপতিত হইয়াছে।”

১৭৫. “ভন্তে, এইরূপে পকুধ কচ্চায়ন সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া উত্তরে অন্য বিষয়ের ব্যাখ্যা করিলেন। ভন্তে, আম্র জিজ্ঞাসিত হইয়া লবুজের বর্ণনা অথবা লবুজ জিজ্ঞাসিত হইয়া আম্রের বর্ণনা যেরূপ হয়, সেইরূপ পকুধ কচ্চায়ন সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া উত্তরে অন্য বিষয়ের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল, “আমার ন্যায় ব্যক্তি… করিবে?” এইরূপে আমি পকুধ কচ্চায়নের বাক্যের… চলিয়া আসিলাম।

নিগণ্ঠ নাতপুত্ত

১৭৬. “ভন্তে, আমি একদিন নিগণ্ঠ নাতপুত্তের নিকট গমন করিয়াছিলাম। তথায় গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে তাঁহার সহিত চিত্তরঞ্জক বাক্যালাপপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলাম। আসন গ্রহণান্তে এই ক্ষণে আপনাকে যে প্রশ্ন করিয়াছি তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রশ্ন করিলাম।

১৭৭. “ভন্তে, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া নিগণ্ঠ নাতপুত্ত বলিলেন, “মহারাজ, নিগণ্ঠ চতুর্বিধ সংবর দ্বারা সংবৃত। কীরূপে? মহারাজ, নিগণ্ঠ সর্ব জলের ব্যবহারে সংযত, সর্ব পাপে সংযত, সর্ব পাপবিধৌত, সর্বপাপ দূরীকরণে লগ্নচিত্ত। মহারাজ, নিগণ্ঠ এই চতুর্বিধ সংবর দ্বারা সংবৃত। মহারাজ, যেহেতু নিগণ্ঠ এই চতুর্বিধ সংবর দ্বারা সংবৃত, সেই হেতু তিনি গতাত্মা , যতাত্মা এবং হিতাত্মা কথিত হন।”

১৭৮. “ভন্তে, এইরূপে নিগণ্ঠ নাতপুত্ত সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া উত্তরে চতুর্বিধ সংযম বর্ণনা করিলেন। ভন্তে, আম্র জিজ্ঞাসিত হইয়া লবুজের অথবা লবুজ জিজ্ঞাসিত হইয়া আম্রের বর্ণনা যেরূপ হয়, সেইরূপ নিগণ্ঠ নাতপুত্ত সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া চতুর্বিধ সংযম বর্ণনা করিয়াছেন। ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল, “আমার ন্যায় ব্যক্তি… করিবে?” এইরূপে আমি নিগণ্ঠ নাতপুত্তের বাক্যের… চলিয়া আসিলাম।

সঞ্জয় বেলট্ঠি-পুত্ত

১৭৯. “ভন্তে, আমি একদিন সঞ্জয় বেলট্ঠি-পুত্তের নিকট গিয়াছিলাম। তথায় গমন করিয়া তাঁহাকে অভিবাদনান্তে তাঁহার সহিত চিত্তরঞ্জক বাক্যালাপপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলাম। আসন গ্রহণান্তে এইক্ষণে আপনাকে যে প্রশ্ন করিয়াছি তাঁহাকেও ঠিক সেই প্রশ্নই করিলাম।

১৮০. “ভন্তে, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া সঞ্জয় বেলট্ঠি-পুত্ত বলিলেন, যদি তুমি জিজ্ঞাসা করো “পরলোক আছে কি?” তাহা হইলে যদি আমি মনে করি উহা আছে, তাহা হইলে “পরলোক আছে” আমি এইরূপই প্রকাশ করিব। কিন্তু আমি তাহা কহি না। উহা যে ওই প্রকার আমি তাহাও কহি না। উহা যে ওই প্রকার নয় আমি তাহাও কহি না। আমি ইহা অস্বীকার করি না। উহা আছে আমি তাহাও কহি না, নাই তাহাও কহি না। “পরলোক নাই কি?” যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করি, … (পূর্বের ন্যায়)। “পরলোক কি একাধারে আছে এবং নাই? পরলোক নাই এবং উহা যে নাই তাহাও নয়, এইরূপ কি? ঔপপাতিক সত্ত্ব আছে কি? উহা কি নাই? উহা কি একাধারে আছে এবং নাই? উহা নাই এবং উহা যে নাই তাহাও নয়, এইরূপ কি? সুকৃতি ও দুষ্কৃতির ফল আছে কি? উহাদের ফল নাই কি? উহাদের ফল কি একাধারে আছে এবং নাই? উহাদের ফল নাই এবং ফল যে নাই তাহাও নয়, এইরূপ কি? মরণের পর তথাগতের অস্তিত্ব থাকে কিম্বা থাকে না? মরণের পর কি একাধারে তাঁহার অস্তিত্ব থাকে এবং থাকে না? মরণের পর তাঁহার অস্তিত্ব থাকে না এবং উহা যে থাকে না তাহাও নয়, এইরূপ কি?” আমাকে এইরূপ জিজ্ঞাসা করিলে, মরণান্তে তথাগতের অস্তিত্ব থাকে না এবং উহা যে থাকে না তাহাও নয়, যদি আমি এইরূপ মনে করি, আমি ওইরূপই ব্যক্ত করিব। কিন্তু আমি ওইরূপ বলিতেছি না। উহা এই প্রকার তাহা আমি মনে করি না, উহা যে অন্য প্রকার তাহাও মনে করি না। আমি ইহা অস্বীকার করি না। ইহাও নয়, উহাও নয়, আমি এইরূপও কহি না।”

১৮১. “ভন্তে, এইরূপে সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া বিক্ষেপের অভিনয় করিলেন। ভন্তে, আম্র জিজ্ঞাসিত হইয়া… সেইরূপ সঞ্জয় বেলট্ঠিপুত্ত সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসিত হইয়া বিক্ষেপ প্রকাশ করিলেন। ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল, “এই সকল শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ সকলেই নির্বোধ ও মূঢ়। সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল জিজ্ঞাসার উত্তরে বিক্ষেপের প্রকাশ কেন?” ভন্তে, তৎপরে আমার মনে হইল, “আমার ন্যায় ব্যক্তি… করিবে?” এইরূপে আমি সঞ্জয় বেলট্ঠি-পুত্তের বাক্যের… চলিয়া আসিলাম।

১৮২. “ভন্তে, এক্ষণে আমি ভগবানকেও ওই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতেছি, “ভন্তে, জনসাধারণের জন্য বহুবিধ শিল্পবিদ্যা আছে; যথা : হস্তী আরোহণ… পারেন কি?”

১৮৩. “মহারাজ, পারি। এক্ষণে আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব। আপনি যথাযথ উত্তর দিন।

“মহারাজ, আপনি কীরূপ মনে করেন? মনে করুন আপনার এক আজ্ঞাবহ দাস আছে যে আপনি শয্যাত্যাগ করিবার পূর্বেই গাত্রোত্থান করে, আপনি শয্যা আশ্রয় করিবার পর শয়ন করে, যে আপনার আদেশ গ্রহণ করিবার জন্য সতত তৎপর, শিষ্টাচারযুক্ত, প্রিয়বাদী এবং সম্মতি বদন। তাহার মনে এইরূপ হইল, “আশ্চর্য, অদ্ভুত পুণ্যের এই গতি ও বিপাক! এই মগধরাজ বৈদেহিপুত্র অজাতশত্রুও মনুষ্য, আমিও মনুষ্য। কিন্তু মগধরাজ পঞ্চকামগুণযুক্ত হইয়া উহাদের উপভোগ করিতেছেন-যেন সত্যই দেবতা-আর আমি তাঁহার আজ্ঞাবহ ভৃত্য, তিনি শয্যাত্যাগ করিবার পূর্বেই গাত্রোত্থান করি, তিনি শয্যা আশ্রয় করিবার পর শয়ন করি, তাঁহার আদেশ শ্রবণ করিবার জন্য আমি সতত তৎপর, আমি শিষ্টাচারী, প্রিয়বাদী এবং সম্মতি বদন। অতএব আমিও পুণ্যকর্ম করিব, শির ও শ্মশ্রু মুণ্ডনপূর্বক কাষায়বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিব।” অতঃপর সে শির ও শ্মশ্রু মুণ্ডনপূর্বক কাষায়বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিল। সে এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া কায়সংযম, বাকসংযম ও চিত্তসংযম সমন্বিত হইয়া, মাত্র গ্রাসাচ্ছাদনে সন্তুষ্ট হইয়া নির্জনবাসে রত হইল। যদি জনগণ ওই বিষয়ে আপনাকে এইরূপ বলে, “দেব, আপনি কি অবগত আছেন যে আপনার পূর্বের দাস মস্তক ও শ্মশ্রু মুণ্ডনপূর্বক কাষায় বস্ত্রাচ্ছাদিত হইয়া গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যার আশ্রয় করিয়াছে? সে এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া কায়সংযম, বাকসংযম ও চিত্তসংযম সমন্বিত হইয়া, মাত্র গ্রাসাচ্ছাদনে সন্তুষ্ট হইয়া নির্জনবাসে রত হইয়াছে” তাহা হইলে আপনি কি বলিবেন, “আমার সেই দাস ফিরিয়া আসিয়া পুনর্বার আমার দাসত্বে নিযুক্ত হউক?”

১৮৪. “না, ভন্তে। উপরন্তু আমরা তাঁহাকে অতিবাদিত করিব, আসন হইতে উঠিয়া তাহাকে সম্মান প্রদর্শন করিব, তাঁহাকে আসন গ্রহণ করিতে পুনঃপুন অনুরোধ করিব চীবর, পিণ্ডপাত , শয়ন-আসন, ওষুধ ও পথ্য ইত্যাদি ভিক্ষুর আবশ্যকীয় দ্রব্যাদি গ্রহণের জন্য তাঁহাকে নিমন্ত্রণ করিব এবং তাঁহার আশ্রয় স্থান ও রক্ষার জন্য যথাধর্ম বিধান করিব।”

১৮৫. “তাহা হইলে, মহারাজ, আপনি কীরূপ মনে করেন? এ ক্ষেত্রে শ্রামণ্যের ফল সাংদৃষ্টিক কি না?”

“ভন্তে, এ ক্ষেত্রে শ্রামণ্যের ফল অবশ্যই সাংদৃষ্টিক।

“মহারাজ, ইহাই আমার প্রদর্শিত প্রথম সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল।”

১৮৬. “ভন্তে, ইহা জগতেই প্রত্যক্ষ ফলপ্রদ অন্য কোনো শ্রামণ্যফল আপনি প্রদর্শন করিতে পারেন কি?”

“মহারাজ, পারি। এক্ষণে আমি আপনাকে একটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিব। আপনি যথাযথ উত্তর দিন। মহারাজ, আপনি কীরূপ মনে করেন? মনে করুন আপনার রাজ্যে কোনো স্বাধীন প্রজা আছেন, তিনি কৃষক, গৃহপতি, ধনবর্ধক। তাহার মনে এইরূপ হইল, “আশ্চর্য, অদ্ভুত… আর আমি তাঁহার প্রজা, কৃষক, গৃহপতি, ধন-বর্ধক। আমিও পুণ্য কর্ম করিব, শির ও… আশ্রয় করিব।” তৎপরে তিনি স্বীয় অল্প কিম্বা মহৎ ভোগ পরিত্যাগ করিয়া, স্বল্প অথবা বহুসংখ্যক জ্ঞাতিবর্গ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া শির ও শ্মশ্রু মুণ্ডনপূর্বক কাষায়বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিলেন। তিনি এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া কায়সংযম… .রত হইলেন। যদি জনগণ ওই বিষয়ে আপনাকে এইরূপ বলে, “দেব, আপনি জানেন কি যে আপনার পূর্বের প্রজা-কৃষক, গৃহপতি, ধনবর্ধক পুরুষ-মস্তক ও শ্মশ্রু মুণ্ডনপূর্বক কাষায় বস্ত্রাচ্ছাদিত হইয়া… করিয়াছেন? তিনি এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া… রত হইয়াছেন”, তাহা হইলে আপনি কি বলিবেন, “সেই পুরুষ ফিরিয়া আসিয়া পুনর্বার কৃষক, গৃহপতি ও ধনবর্ধকরূপে অবস্থান করুন?”

১৮৭-১৮৮. “না, ভন্তে। উপরন্তু আমরা… যথাধর্ম বিধান করিব।” “তাহা হইলে, মহারাজ,… কি না?”

“ভন্তে, এ ক্ষেত্রে… সাংদৃষ্টিক।”

“মহারাজ, ইহাই আমার প্রদর্শিত দ্বিতীয় সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল।

১৮৯. “ভন্তে, উক্ত দুই ফল অপেক্ষা উচ্চতর ও মধুরতর অপর কোনো ফল আপনি প্রদর্শন করিতে পারেন কি?”

“মহারাজ, পারি। তাহা হইলে শ্রবণ করুন, সম্যকরূপে মনঃসংযোগ করুন, আমি বলিতেছি।”

মগধরাজ উত্তর করিলেন, “যে আজ্ঞা”।

১৯০. অতঃপর ভগবান বলিলেন, “মহারাজ, মনে করুন জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয়, দম্য-পুরুষ-সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবন্ত; যিনি ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যগণকে সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভুত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হইয়া উপদিষ্ট করেন, যিনি ধর্মের উপদেশ দান করেন-যে ধর্মের প্রারম্ভ কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যাহা অর্থ ও শব্দসম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত; যিনি বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য্য প্রকাশ করেন।

১৯১. “ওই ধর্ম কোনো গৃহপতি অথবা গৃহপতি-পুত্র অথবা অপর কোনো কুলে জাত কোনো ব্যক্তি শ্রবণ করিল। সে ওই ধর্ম শ্রবণ করিয়া তথাগতের প্রতি শ্রদ্ধাবান হইল। সে এইরূপে শ্রদ্ধাসমন্বিত হইয়া চিন্তা করিল, “গৃহবাস বাধাসংকুল ও রাগাভিমুখে প্রবর্তনকারী, প্রব্রজ্যা উন্মুক্ত আকাশতুল্য। গৃহে বাস করিয়া একান্ত পরিপূর্ণ, একান্ত পরিশুদ্ধ শঙ্খলিখিত এই ব্রহ্মচর্যের পালন সুকর নহে, অতএব আমি কেশ ও শ্মশ্রু মোচনপূর্বক কাষায় বস্ত্রাচ্ছাদিত হইয়া গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিব।”

১৯২. তৎপরে ওই ব্যক্তি স্বীয় অল্প অথবা মহৎ ভোগ পরিত্যাগ করিয়া, স্বল্প অথবা বহুসংখ্যক জ্ঞাতিবর্গ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া, কেশ ও শ্মশ্রু মোচনপূর্বক কাষায়বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহত্যাগান্তে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিল।

১৯৩. “এইরূপে প্রব্রজিত হইয়া সেই মনুষ্য প্রাতিমোক্ষ সংবরে সংবৃত হইয়া আচার-গোচরসম্পন্ন হইয়া, অণুমাত্র পাপে ভয়দর্শী হইয়া, শিক্ষাপদসমূহ গ্রহণপূর্বক উহাতে শিক্ষিত হইতে লাগিল। সে কায় ও বাক্য দ্বারা কুশলকর্ম-সমন্বিত হইয়া, শুদ্ধ জীবিকাসম্পন্ন হইয়া, শীলসম্পন্ন হইয়া, রক্ষিতেন্দ্রিয় হইয়া, স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত ও সন্তুষ্ট হইয়া অবস্থান করিতে লাগিল।

১৯৪. “মহারাজ, ভিক্ষু কীরূপে শীলসম্পন্ন হইয়া থাকেন? ভিক্ষু প্রাণাতিপাত পরিহারপূর্বক উহা হইতে বিরত হন, তিনি নিহিত-দণ্ড ও নিহিত-শস্ত্র হইয়া, বিনয়ী ও দয়াপন্ন হইয়া, সর্বপ্রাণীর প্রতি হিতেচ্ছা ও অনুকম্পাপরবশ হইয়া বিরাজ করেন। ইহা শীলের অন্তর্গত।

শীল

“তিনি অদত্তের গ্রহণ পরিহারপূর্বক অদত্তের গ্রহণ হইতে বিরত থাকেন; যাহা দত্ত তাহা গ্রহণ করিয়া, দানের প্রতীক্ষা করিয়া, সতত ও শুদ্ধচিত্তের সহিত বিরাজ করেন। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

“তিনি অব্রহ্মচর্র্যের পরিহারপূর্বক ব্রহ্মচারী হইয়া পাপ হইতে দূরে অবস্থান করেন, ইতরসুলভ মৈথুন হইতে বিরত থাকেন। ইহাও শীলের অন্তর্গত।”

“মৃষাবাদ পরিহারপূর্বক তিনি মিথ্যা ভাষণ হইতে বিরত; তিনি সত্যবাদী, তিনি সত্য হইতে কখনো ভ্রষ্ট হন না; তিনি দৃঢ়চিত্ত ও বিশ্বাসযোগ্য; তিনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।”

“তিনি পিশুনবাক্য পরিহারপূর্বক উহা হইতে বিরত। তিনি এই স্থানে যাহা শ্রবণ করেন, এই স্থানের লোকের বিরুদ্ধে কলহ উৎপাদনের অভিসন্ধিতে তাহা অন্যত্র প্রকাশ করেন না; অন্যত্র যাহা শ্রবণ করেন, ওই স্থানের লোকের বিরুদ্ধে কলহ উৎপাদনের অভিসন্ধিতে তাহা এই স্থানে প্রকাশ করেন না। এইরূপে তিনি যাহারা ভিন্ন তাহাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠাতা, যাহারা মিত্র তাহাদের মধ্যে মৈত্রীর উৎসাহদাতা, ঐক্যকারক, ঐক্যপ্রিয়, ঐক্যানন্দ, ঐক্যোৎপাদক বাক্যের কথনকারী। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

“পুরুষবাক্য পরিহারপূর্বক তিনি উহা হইতে প্রতিবিরত। যে বাক্য অনিন্দ্য, যাহা শ্রুতিসুখকর, মনোজ্ঞ, হৃদয়গ্রাহী, মিষ্ট, মানুষের প্রীতিপ্রদ ও মনোহর তিনি ওইরূপ বাক্য বলিয়া থাকেন। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

“বৃথা প্রলাপ পরিহারপূর্বক তিনি উহা হইতে বিরত। তিনি কালবাদী, ভূতবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী; তিনি যথাকালে যুক্তিপূর্ণ, সুবিভক্ত, অর্থ-সংহতি মূল্যবান বাক্য বলিয়া থাকেন। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

“তিনি বীজ ও উদ্ভিদের বিনাশ হইতে প্রতিবিরত। তিনি একাহারী, রাত্রি ও বিকাল ভোজনে বিরত। তিনি নৃত্য-গীত-বাদ্য-সম্বলিত প্রদর্শনী গমনে বিরত। তিনি মাল্য, গন্ধ ও বিলেপনের ধারণ, মণ্ডন ও বিভূষণ হইতে বিরত। তিনি উচ্চ ও বৃহৎ শয্যার ব্যবহারে বিরত। তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্যের গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি অপক্ব শস্যের গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি অপক্ব মাংসের গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি স্ত্রীলোক ও কুমারীর গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি দাস ও দাসীর গ্রহণে বিরত। তিনি মেষ ও ছাগের গ্রহণ হইতে বিরত, কুক্কুট ও শূকরের গ্রহণে বিরত। হস্তী, গো, অশ্ব ও অশ্বীর গ্রহণে বিরত। তিনি কর্ষিত ও অকর্ষিত ভূমির গ্রহণ হইতে বিরত। তিনি দূত ও সংবাদবাহকের কর্ম হইতে বিরত। তিনি ক্রয় ও বিক্রয় হইতে বিরত। তিনি তুলা, কংস ও মান-সম্বন্ধিত প্রবঞ্চনা হইতে বিরত। তিনি উৎকোচ, বঞ্চনা ও শাঠ্যরূপ বক্রগতি হইতে বিরত। তিনি ছেদন, বধ, বন্ধন, দস্যুতা, লুণ্ঠন ও আক্রমণ হইতে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

১৯৫. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও পঞ্চবীজ শ্রেণির ও তদুদ্ভূত উদ্ভিদসমূহের; যথা : মূলবীজ, খণ্ডবীজ, গ্রন্থিবীজ, অগ্রবীজ এবং বীজ-বীজ এই সমুদয়ের বিনাশে রত থাকেন; কিন্তু ভিক্ষু এইরূপ বীজ ও উদ্ভিদের বিনাশে প্রতিবিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

১৯৬. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ সঞ্চিত দ্রব্যের উপভোগে রত থাকেন; যথা : সঞ্চিত অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, শয্যা, গন্ধ এবং ব্যঞ্জন-পাকোপকরণ; কিন্তু ভিক্ষু এই প্রকার সঞ্চিত দ্রব্যের উপভোগে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

১৯৭. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ প্রদর্শনী গমনে রত থাকেন; যথা : নৃত্য, গীত, বাদ্য, প্রেক্ষা, আখ্যান পাণিস্বর, কবির গান, দামামা বাদ্য, রঙ্গমঞ্চে প্রদর্শিত দৃশ্যপট, চণ্ডাল বাজীকরের কৌশল, হস্তীযুদ্ধ, অশ্বযুদ্ধ, মহিষযুদ্ধ, বৃষভযুদ্ধ, অজযুদ্ধ, মেষযুদ্ধ, কক্কুট যুদ্ধ, বর্তকযুদ্ধ, দণ্ডযুদ্ধ, মুষ্টিযুদ্ধ, মল্লযুদ্ধ, কৃত্রিমযুদ্ধ, সেনাবিন্যাস, সৈন্যব্যূহ বাহিনী পরিদর্শন-ভিক্ষু এইরূপ প্রদর্শনী গমন হইতে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

১৯৮. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ দ্যুত ও অলস ক্রীড়ারূপ প্রমাদে আসক্ত হইয়া থাকেন; যথা : অষ্টপদ, দশপদ, আকাশ, পরিহার-পথ, সন্তিকা, খলিকা, ঘটিকা, শলাকহস্ত, অক্ষ পঙ্গচীর, বঙ্কক, মোক্ষচিকা, চিঙ্গুলিক, পত্রাঢ়ক, ক্রীড়ার্থ রথ ও ধনু, অক্ষরিকা মনেষিকা, অঙ্গবিকৃতির অনুকরণ; ভিক্ষু এইরূপ দ্যুত ও অলস ক্রীড়ারূপ প্রমাদে অনাসক্ত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

১৯৯. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ উচ্চ ও মহাশয়ন ব্যবহারে রত থাকেন; যথা : আসণ্ডি, পর্যাঙ্ক, গোণক, চিত্রকা, পটিকা, পটলিকা, তুলিকা, বিকতিকা, উদ্দলোমী, একান্তলোমী, কট্ঠিষ্য, কৌষেয়, কুত্তক, হস্তী, অশ্ব ও রথাস্তরণ, অজিনাস্তরণ, কদলী-মৃগ-চর্ম-আস্তরণ, সচন্দ্রাতপ আস্তরণ, শির ও পাদদেশ রক্ষার নিমিত্ত লোহিত উপাধান যুক্ত পর্যাঙ্ক; ভিক্ষু এই প্রকার উচ্চ ও মহাশয়ন ব্যবহারে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০০. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ মণ্ডন ও বিভূষণাদিতে রত থাকেন; যথা : উৎসাদন, পরিমর্দন, স্নান সংবাহন, দর্পণ, অঞ্জন, মাল্য, বিলেপন, মুখচূর্ণ, মুখবিলেপন, কঙ্কণ, শিখাবন্ধ, দণ্ড, নাড়িক, খড়গ, ছত্র, চিত্রিত পাদুকা, উষ্ণীব, মণি, বালজীবনী, দীর্ঘ দশাবিশিষ্ট শুভ্র বস্ত্র; ভিক্ষু এবম্বিধ মণ্ডন ও বিভূষণাদি হইতে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০১. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ হীন আলাপে রত থাকেন; যথা : রাজকথা, চোরকথা, মহামাত্য কথা, সেনাসম্বন্ধীয় কথা, ভয়কথা, যুদ্ধকথা, খাদ্য ও পানীয় কথা, বস্ত্রকথা, শয়নকথা, মাল্যকথা, গন্ধকথা, জ্ঞাতিকথা, যানকথা, গ্রামকথা, নিগমকথা, জনপদকথা, নারীকথা, বীরকথা, পথকথা, কুম্ভস্থান কথা, পূর্বপুরুষ কথা, নিরর্থক কথা, পৃথিবী ও সমুদ্রের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় মন্তব্য; ভিক্ষু এইরূপ হীন আলাপে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০২. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এইরূপ বিগ্রাহিক কথায় নিযুক্ত হন; যথা : “তুমি এই ধর্ম ও বিনয় অবগত নও, আমি অবগত আছি, তুমি কী প্রকারে এই ধর্ম ও বিনয় জানিবে? তুমি মিথ্যাদৃষ্টির অনুবর্তী হইয়াছ, আমি সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন-আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলিতেছি, তুমি অপ্রাসঙ্গিক বলিতেছ, পূর্বে কথনীয় তুমি পশ্চাতে বলিয়াছ, পশ্চাতে কথনীয় পূর্বে বলিয়াছ, তোমার বিচার ব্যর্থ হইয়াছে-তোমার আহ্বান গৃহীত হইয়াছে, তুমি নিগৃহীত হইয়াছ, স্বকময় দৃষ্টি পরিশুদ্ধ করো, যদি সক্ষম হও আপনাকে পাশ মুক্ত করো।” ভিক্ষু এবম্বিধ বিগ্রাহিক কথায় বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০৩. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও রাজগণ, মহামাত্যগণ, ক্ষত্রিয়গণ, ব্রাহ্মণগণ এবং গৃহপতি কুমারগণ তাঁহাদিগকে- এই স্থানে যাও, সেই স্থানে যাও, ইহা লইয়া আইস, ইহা ওইস্থানে লইয়া যাও” এইরূপ দৌত্যকর্মে নিযুক্ত করিলে তাঁহারা উহাতে নিযুক্ত হন। ভিক্ষু এইরূপ দৌত্যকর্মে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।”

২০৪. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও কূহক হইয়া থাকেন, লপক হইয়া থাকেন, নৈমিত্তিক হইয়া থাকেন, নিষ্পেষিক হইয়া থাকেন, লাভোপরি লাভগৃধ্ন হইয়া থাকেন, ভিক্ষু এইরূপ কূহন ও লপন হইতে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০৫. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : সামুদ্রিক বিদ্যা, নিমিত্ত, উৎপাত, স্বপ্ন, লক্ষণ, মুষিক ছিন্নবস্ত্র, অগ্নিহোম, দর্বি হোম, তুষ হোম, কণ হোম, তণ্ডল হোম, ঘৃত হোম, তৈল হোম, মুখ হোম, রক্ত হোম, অঙ্গ বিদ্যা, বস্তু বিদ্যা, ক্ষত্র বিদ্যা, শিববিদ্যা, ভূতবিদ্যা, ভূরিবিদ্যা, অহিবিদ্যা, বিষবিদ্যা, বৃশ্চিক বিদ্যা, মূষিক বিদ্যা, পক্ষী বিদ্যা, বায়স বিদ্যা, পক্বধ্যান, শরপরিত্রাণ, মৃগচক্র-ভিক্ষু এই প্রকার হীনবিদ্যায় বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০৬. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : মণি-লক্ষণ, দণ্ড-লক্ষণ, বস্ত্র-লক্ষণ, অসি-লক্ষণ, শর-লক্ষণ, ধনু-লক্ষণ, আয়ুধ-লক্ষণ, স্ত্রী-লক্ষণ, পুরুষ-লক্ষণ, কুমার-লক্ষণ, কুমারী-লক্ষণ, দাস-লক্ষণ, দাসী-লক্ষণ, হস্তী-লক্ষণ, অশ্ব-লক্ষণ, মহিষ-লক্ষণ, বৃষ-লক্ষণ, গো-লক্ষণ, অজ-লক্ষণ, মেষ-লক্ষণ, কুক্কুট-লক্ষণ, বর্তক-লক্ষণ, গোধা-লক্ষণ, কর্ণিকা-লক্ষণ, কচ্ছপ-লক্ষণ, মৃগ-লক্ষণ ভিক্ষু এইরূপ হীনবিদ্যায় বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত?

২০৭. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “রাজগণ যুদ্ধযাত্রা করিবেন, তাঁহারা পুনঃ প্রত্যাবর্তন করিবেন; অভ্যন্তর রাজগণ আক্রমণ করিবেন, বাহির রাজগণ পলায়ন করিবেন; বাহির রাজগণ আক্রমণ করিবেন, অভ্যন্তর রাজগণ পলায়ন করিবেন; অভ্যন্তর রাজগণের জয় হইবে, বাহির রাজগণের পরাজয় হইবে; বাহির রাজগণের জয় হইবে, অভ্যন্তর রাজগণের পরাজয় হইবে; এইরূপ এই পক্ষের জয় হইবে, অপর পক্ষের পরাজয় হইবে।” ভিক্ষু এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় হইতে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০৮. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “চন্দ্রগ্রহণ হইবে, সূর্যগ্রহণ হইবে, নক্ষত্র গ্রহণ হইবে। চন্দ্র-সূর্যের যথা নির্দিষ্ট পথে গমন হইবে, চন্দ্র-সূর্যের বিপথে গমন হইবে, নক্ষত্রদিগের যথানিদিষ্ট পথে গমন হইবে, উহাদের বিপথে গমন হইবে। উল্কাপাত হইবে, দাবাগ্নি হইবে, ভূমিকম্প হইবে, বজ্রপাত হইবে। চন্দ্র-সূর্য নক্ষত্রের উদয়, অস্ত, মালিন্য অথবা ঔজ্জ্বল্য হইবে। চন্দ্রগ্রহণের এই ফল হইবে, সূর্যগ্রহণের এই ফল হইবে, নক্ষত্রগ্রহণের এই ফল হইবে, চন্দ্র-সূর্যের নির্দিষ্ট পথে গতি হইলে এই ফল হইবে, চন্দ্র-সূর্যের বিপথে গমন হইলে এই ফল হইবে, নক্ষত্রগণের নির্দিষ্ট পথে গতি হইলে এই ফল হইবে, উহারা বিপথে গমন করিলে এই ফল হইবে, উল্কাপাতের এই ফল হইবে, দাবাগ্নির এই ফল হইবে, ভূমিকম্পের এই ফল হইবে, বজ্রপাতের এই ফল হইবে, চন্দ্র-সূর্য-নক্ষত্রগণের উদয়, অস্ত, মালিন্য অথবা ঔজ্জ্বল্যের এই ফল হইবে।” ভিক্ষু এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২০৯. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “সুবৃষ্টি হইবে, দুর্বৃষ্টি হইবে, সুভিক্ষ হইবে, দুর্ভিক্ষ হইবে, শান্তি হইবে, অশান্তি হইবে, রোগ হইবে, আরোগ্য হইবে, মুদ্রা, গণনা, সংখ্যান, কবিতা রচনা, লোকায়ত।” ভিক্ষু এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।”

২১০. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “আবাহন, বিবাহন, সংবদন, বিবদন, সংকিরণ, বিকিরণ, সৌভাগ্যকরণ, দুর্ভাগ্যকরণ, গর্ভপাতকরণ, জিহ্বার জড়তা সাধন, হনুর জড়তা সাধন, হস্তের ঊর্ধ্বক্ষেপ, বধিরতা সাধন, আদর্শ প্রশ্ন, কুমারী প্রশ্ন, দেব প্রশ্ন, সূর্যোপাসনা, মহাব্রহ্মোপাসনা, অণ্ড্যজ্জ্বলন, শ্রী-আহ্বান।” ভিক্ষু এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২১১. “কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ শ্রদ্ধাদত্ত ভোজনাদি উপভোগ করিয়াও এই প্রকার হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায় দ্বারা জীবিকা অর্জন করেন; যথা : “শান্তিকর্ম, প্রণিধি কর্ম, ভূরিকর্ম, বর্ষকর্ম, বর্ষবর কর্ম, বস্তুকর্ম, বস্তু-পরিকিরণ, আচমন, স্নান, যজ্ঞ, বমন, বিরেচন, ঊর্ধ্ব বিরেচন, অধো বিরেচন, শীর্ষ বিরেচন, কর্ণ তৈল, নেত্র-তর্পণ, নাসিকা কর্ম, অঞ্জন, অভিলেপন, শালাক্য, শল্য কর্ম, শিশু-চিকিৎসা, মূল ও ভৈষজ্যের প্রয়োগ, ওষধের প্রতিমোক্ষ।” ভিক্ষু এইরূপ হীনবিদ্যা ও মিথ্যা জীবনোপায়ে বিরত। ইহাও শীলের অন্তর্গত।

২১২. “মহারাজ, ভিক্ষু এইরূপ শীলসম্পন্ন হইয়া এই শীলসংবরের কারণ কুত্রাপি ভয় দর্শন করেন না। যেরূপ, মহারাজ, মুর্ধাভিষিক্ত, ক্ষত্রিয় শত্রুকুল পরাজিত করিয়া কুত্রাপি শত্রুভয়ে ভীত হন না, এইরূপেই ভিক্ষু শীলসম্পন্ন হইয়া শীলসংবরের কারণ কুত্রাপি ভয় দর্শন করেন না। তিনি আর্য শীলস্কন্ধ-সমন্বিত হইয়া আধ্যাত্মিক অনবদ্য সুখ অনুভব করেন। মহারাজ, ভিক্ষু এইরূপেই শীলসম্পন্ন হইয়া থাকেন।

২১৩. “মহারাজ, ভিক্ষু কী প্রকারে রক্ষিতেন্দ্রিয় হইয়া থাকেন? মহারাজ, ভিক্ষু চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া নিমিত্ত ও অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না। যে কারণে চক্ষেন্দ্রিয়কে সংযত করিয়া বিচরণ না করিলে লোভ, দৌর্মনস্য আদি পাপ অকুশল ধর্ম অনুস্রবিত হয়, তিনি তাহার সংযমের জন্য যত্নবান হন, এবং এই প্রকারে চক্ষুরিন্দ্রিয়কে রক্ষা করিয়া চক্ষুরিন্দ্রিয় সংযত করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া, ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া, জিহ্বা দ্বারা রসাস্বাদন করিয়া, কায় দ্বারা স্পর্শানুভূতি করিয়া, মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া তিনি নিমিত্ত ও অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না। যে কারণে মনেন্দ্রিয় সম্বন্ধে অসংযত হইয়া বিচরণ করিলে লোভ, দৌর্মনস্য আদি পাপ অকুশল ধর্ম অনুস্রবিত হয়, তিনি তাহার সংযমে যত্নবান হন, এবং এই প্রকারে মনেন্দ্রিয়কে রক্ষা করিয়া মনেন্দ্রিয় সংযত করেন। তিনি এই আর্য ইন্দ্রিয়সংবর-সমন্বিত হইয়া অধ্যাত্মে অবিমিশ্র সুখ অনুভব করেন। মহারাজ, ভিক্ষু এই প্রকারে রক্ষিতেন্দ্রিয় হইয়া থাকেন।

প্রীতি ও বৈরাগ্য

২১৪. “মহারাজ, ভিক্ষু কীরূপে স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত হইয়া থাকেন? মহারাজ, ভিক্ষু পুরোগমনে ও প্রত্যাগমনে সম্প্রজ্ঞানযুক্ত হন, অবলোকনে বিলোকনে, সংকোচনে ও প্রসারণে, সংঘাটি-পাত্র-চীবর ধারণে, ভুক্তি, পান, ভোজন ও আস্বাদনে, শৌচকর্মে, গতিতে, স্থিতিতে, উপবেশনে, সুপ্তি ও জাগরণে, ভাষণে, তূষ্ণীম্ভাবে, সম্প্রজ্ঞানযুক্ত হন। মহারাজ, ভিক্ষু এইরূপে স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত হইয়া থাকেন।

২১৫. “মহারাজ, ভিক্ষু কীরূপে সন্তুষ্ট হন? মহারাজ, তিনি দেহাচ্ছাদক চীবর ও ভিক্ষালব্ধ উদরান্নে সন্তুষ্ট হন, তিনি যেখানেই গমন করেন, সেখানেই ওই সকল তাঁহার সহিত গমন করে। মহারাজ, যেরূপ পক্ষী যেখানেই উড্ডয়ন করে সেখানেই তাহার পক্ষ তাহার সহগামী হয়, সেইরূপই তিনি দেহাচ্ছাদক চীবর ও ভিক্ষালব্ধ উদরান্নে সন্তুষ্ট হন, তিনি সেখানেই গমন করেন, সেখানেই ওই সকল তাঁহার সহিত গমন করে।

২১৬. “তিনি এই আর্য শীলস্কন্ধ সমন্বিত হইয়া, এই আর্য ইন্দ্রিয়-সংবর সমন্বিত হইয়া, এই আর্য স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান সমন্বিত হইয়া, এই আর্য সন্তুষ্টি সমন্বিত হইয়া, বিবিক্ত শয়নাসনের ভজনা করেন, অরণ্য, বৃক্ষমূল, পর্বত-কন্দর, গিরি-গুহা, শ্মশান, বনপ্রস্থ, উন্মুক্ত স্থান এবং পলাল স্তূপের ভজনা করেন। ভিক্ষা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া আহারান্তে তিনি পর্যঙ্কাবদ্ধ হইয়া, দেহকে ঋজুভাবে রক্ষা করিয়া, পরিমুখে স্মৃতি উপস্থাপিত করিয়া, উপবিষ্ট হন।

২১৭. “তিনি লোকে অভিধ্যার পরিহার করিয়া অভিধ্যাহীন চিত্তে বিহার করেন, অভিধ্যা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ব্যাপাদপ্রদোষ পরিহার করিয়া অব্যাপন্নচিত্তে বিহার করেন, সর্বপ্রাণীর হিতাকাঙ্ক্ষী হইয়া, সর্বপ্রাণীর প্রতি অনুকম্পাপরবশ হইয়া, ব্যাপাদ-প্রদোষ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি স্ত্যানমিদ্ধ পরিহার করিয়া বিগত-স্ত্যানমিদ্ধ হইয়া বিহার করেন, আলোক-সংজ্ঞী, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া স্ত্যানমিদ্ধ হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য পরিহার করিয়া অনুদ্ধত হইয়া বিহার করেন, আধ্যাত্মিক শান্তিলব্ধ হইয়া ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন। তিনি বিচিকিৎসা পরিহার করিয়া বিচিকিৎসাহীন হইয়া বিহার করেন, কুশলধর্মে সংশয়হীন হইয়া বিচিকিৎসা হইতে চিত্তকে পরিশুদ্ধ করেন।

২১৮. “মহারাজ, কেহ হয়তো ঋণ গ্রহণ করিয়া ব্যবসায়ে প্রবৃত হইল, ব্যবসায়ে তাহার সাফল্য হইল, সে পূর্বের ঋণ পরিশোধ করিল, এবং এই সমস্ত করিয়াও ভার্যা প্রতিপালনের জন্য তাহার কিছু অবশিষ্ট রহিল। তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “আমি পূর্বে ঋণ গ্রহণ করিয়া ব্যবসায়ে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম, ব্যবসায়ে আমার সাফল্য লাভ হইয়াছে, পুরাতন ঋণ পরিশোধ করিয়াও ভার্যা প্রতিপালনের জন্যে আমার অর্থ অবশিষ্ট আছে।” উহাতে সে প্রামোদ্য লাভ করিল, সৌমনস্য প্রাপ্ত হইল।

স্বাধীনতা

২১৯. “মহারাজ, কেহ হয়তো স্বাস্থ্যহীন, দুঃখিত, অতিশয় রোগগ্রস্ত, অন্ন তাহার পুষ্টিসাধন করে না; তাহার দেহ বলহীন। পরবর্তীকালে সে ওই অস্বাস্থ্যকর অবস্থা হইতে মুক্ত হইল, অন্ন হইতে সে পুষ্টিলাভ করিল, তাহার দেহে বলেরও সঞ্চার হইল। তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “পূর্বে আমি স্বাস্থ্যহীন, দুঃখিত, অতিশয় রোগগ্রস্ত ছিলাম, অন্ন আমার পুষ্টিসাধন করিত না, আমার দেহ বলহীন ছিল, এক্ষণে আমি সেই অস্বাস্থ্যকর অবস্থা হইতে মুক্ত হইয়াছি, অন্ন আমার পুষ্টিসাধন করিতেছে, শরীরেও বলের সঞ্চার হইয়াছে।” উহাতে সে প্রামোদ্য লাভ করিল, সৌমনস্য প্রাপ্ত হইল।

২২০. “মহারাজ, কেহ হয়তো কারাগারে বদ্ধ। পরবর্তীকালে সে স্বস্তির সহিত নিরাপদে কারামুক্ত হইল, তাহার কোনো ধনহানিও হইল না। তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “আমি পূর্বে কারাবদ্ধ ছিলাম, এক্ষণে আমি স্বস্তির সহিত নিরাপদে কারামুক্ত হইয়াছি, আমার কোনো ধনহানিও হয় নাই।” উহাতে সে প্রামোদ্য লাভ করিল, সৌমনস্য প্রাপ্ত হইল।

২২১. “মহারাজ, কেহ হয়তো দাস, সে স্বাধীন নহে, পরাধীন, স্বেচ্ছায় কোনো স্থানে গমনে অক্ষম। পরবর্তীকালে সে ওই দাস্য হইতে মুক্ত হইল, স্বাধীন হইল, তাহার পরাধীনত্ব রহিল না, সে ভুজিষ্য হইল, যথেচ্ছা গমনে সক্ষম হইল। তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “আমি পূর্বে দাস ছিলাম, আমার স্বাধীনতা ছিল না, আমি পরাধীন ছিলাম, স্বেচ্ছায় গমনে অক্ষম ছিলাম; এক্ষণে আমি সেই দাস্য হইতে মুক্ত, স্বাধীন, পরাধীনতা-হীন, ভুজিষ্য, যথেচ্ছা গমনক্ষম।” উহাতে সে প্রামোদ্য লাভ করিল, সৌমনস্য প্রাপ্ত হইল।

২২২. “মহারাজ, কোনো ধনবান ও ভোগবান ব্যক্তি অন্নহীন ভয়সংকুল কান্তারপথে উপনীত হইল। পরে সে ওই কান্তার উত্তীর্ণ হইয়া স্বস্তির সহিত নিরাপদ ভয়হীন গ্রামান্ত প্রাপ্ত হইল। তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “আমি অন্নহীন, ভয়সংকুল কান্তারে উপনীত হইয়াছিলাম, এক্ষণে আমি ওই কান্তার উত্তীর্ণ হইয়া স্বস্তির সহিত নিরাপদ ভয়হীন গ্রামান্ত প্রাপ্ত হইয়াছি।” উহাতে সে প্রামোদ্য লাভ করিল, সৌমনস্য প্রাপ্ত হইল।

২২৩-২২৪. “মহারাজ সেইরূপই ভিক্ষু, যতদিন পঞ্চনীবরণ প্রহীন না হয়, ততদিন আপনাকে ঋণাবদ্ধ, রোগগ্রস্ত, কারাবদ্ধ, কান্তারপথে উপনীতরূপে মনে করেন। কিন্তু পঞ্চ নীবরণ প্রহীন হইলে তিনি আপনাকে অঋণী, অরোগী, বন্ধনমুক্ত, ভুজিষ্য, বিপদমুক্ত স্থানে উপনীতরূপে মনে করেন।

ধ্যান

২২৫. “আপনাতে এই পঞ্চনীবরণ প্রহীন দেখিয়া তিনি প্রামোদ্য লাভ করেন, প্রামোদ্য হইতে প্রীতির উৎপত্তি হয়, প্রীতির উৎপত্তিতে দেহ শান্ত হয়, শান্ত দেহ সুখানুভব করে, সুখীর চিত্ত সমাহিত হয়।

২২৬. তিনি কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া, অকুশল ধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া, সবিতর্ক, সবিচার বিবেকজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। তিনি এই দেহকে বিবেকজ প্রীতিসুখ দ্বারা প্লাবিত করেন, সিক্ত করেন, পরিপূর্ণ করেন, পরিস্ফূরিত করেন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই বিবেকজ প্রীতিসুখ দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

২২৭. “মহারাজ, যেরূপ কোনো দক্ষ স্নাপক অথবা স্নাপকের অন্তেবাসী কংসথালে স্নাচূর্ণ বিকীর্ণ করিয়া উহা জল দ্বারা অল্পে অল্পে সিক্ত করিলে ওই স্নানপিণ্ড স্নেহানুগত, স্নেহাভিভূত, স্নেহময় হয়, কিন্তু উহা হইতে স্নেহের নিঃস্রাব হয় না; সেইরূপই ভিক্ষু এই দেহকে বিবেকজ প্রীতিসুখ দ্বারা প্লাবিত করেন, সিক্ত করেন, পরিপূর্ণ করেন, পরিস্ফুরিত করেন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই বিবেকজ প্রীতিসুখ দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, এই ফল পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২২৮. “পুনশ্চ, মহারাজ, ভিক্ষু বিতর্ক-বিচারের উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, অবিতর্ক, অবিচার, সমাধিজ, প্রীতিসুখ-মণ্ডিত, দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। তিনি এই দেহকে সমাধিজ প্রীতিসুখ দ্বারা প্লাবিত করেন, সিক্ত করেন, পরিপূর্ণ করেন, পরিস্ফুরিত করেন, তাঁহার দেহের কোনো অংশ সমাধিজ প্রীতিসুখ দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

২২৯. “মহারাজ, কোনো গভীর জলাশয় আছে, উহার নিম্নস্থ উৎস হইতে জল উদ্গত হয়, উহার পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে কিম্বা দক্ষিণে জলের প্রবেশদ্বার নাই, সময়ে সময়ে বর্ষার ধারাও উহার উপরে বর্ষিত হয় না। তথাপি সেই জলাশয় হইতে শীতল বারিধারা ঊর্ধ্বে উত্থিত হইয়া ওই জলাশয়কে প্লাবিত করে, সিক্ত করে, পরিপূর্ণ করে, পরিস্ফুরিত করে, উহার কোনো অংশই শীতল বারি দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না। মহারাজ, এইরূপেই ভিক্ষু এই দেহকে সমাধিজ প্রীতিসুখ দ্বারা প্লাবিত করেন, সিক্ত করেন, পরিপূর্ণ করেন, পরিস্ফুরিত করেন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই সমাধিজ প্রীতিসুখ দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৩০. “পুনশ্চ, মহারাজ, ভিক্ষু প্রীতিতেও বৈরাগ্য উৎপাদন করিয়া উপেক্ষা সম্পন্ন, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া বিহার করেন; তিনি কায়ে সুখ অনুভব করেন-যে সুখ সম্বন্ধে আর্যগণ বলিয়া থাকেন “উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী, এবং এইরূপে তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করেন। তিনি এই দেহকে প্রতিরহিত সুখ দ্বারা প্লাবিত করেন, সিক্ত করেন, পরিপূর্ণ করেন, পরিস্ফুরিত করেন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই প্রতিরহিত সুখ দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

২৩১. “মহারাজ, যেরূপ উৎপল সরোবর, পদ্ম সরোবর, পুণ্ডরীক সরোবরে জাত সমুদয় উৎপল অথবা পদ্ম অথবা পুণ্ডরীক জলে জাত, জলে বর্ধিত হইয়া জল হইতে ঊর্ধ্বে উত্থান করে না, জল হইতে পুষ্টি গ্রহণ করে এবং যেরূপ উহাদের শীর্ষ হইতে মূল পর্যন্ত শীতল বারি দ্বারা প্লাবিত হয়, সিক্ত হয়, পরিপূর্ণ হয়, পরিস্ফুরিত হয়, উহাদের কোনো অংশই শীতল বারি দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না; সেইরূপেই, মহারাজ, ভিক্ষু এই দেহকে প্রতিরহিত সুখ দ্বারা প্লাবিত করেন, সিক্ত করেন, পরিপূর্ণ করেন, পরিস্ফুরিত করেন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই প্রতিরহিত সুখ দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৩২. “পুনশ্চ, মহারাজ, ভিক্ষু সুখ ও দুঃখ উভয়ই বর্জন করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্যের তিরোভাব সাধন করিয়া, না-দুঃখ না-সুখ রূপ উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করেন। তিনি ওই পরিশুদ্ধ পর্যবদাত চিত্তের দ্বারা দেহকে স্ফুরিত করিয়া উপবিষ্ট হন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই পর্যবদাত চিত্তের দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

২৩৩. “মহারাজ, যেরূপ কোনো পুরুষ নির্মল শুভ্র বস্ত্র দ্বারা সশীর্ষাবৃত হইয়া উপবিষ্ট হইলে তাহার দেহের কোনো অংশই নির্মল শুভ্র বস্ত্র দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না, সেইরূপই ভিক্ষু পরিশুদ্ধ পর্যবদাত চিত্তের দ্বারা দেহকে স্ফুরিত করিয়া উপবিষ্ট হন, তাঁহার দেহের কোনো অংশই পরিশুদ্ধ পর্যবদাত চিত্তের দ্বারা অব্যাপ্ত থাকে না।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৩৪. “এইরূপে চিত্তের সেই সমাহিত, পরিশুদ্ধ, পর্যবদাত, অনঙ্গন, উপক্লেশ-বিগত, মৃদুভূত, কমনীয়, স্থিত, আনেঞ্জাপ্রাপ্ত অবস্থায় তিনি জ্ঞানদর্শনের অভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি এই জ্ঞান লাভ করেন, “আমার এই কায় রূপী, চতুর্মহাভূতিক, মাতাপিতা হইতে উদ্ভূত, দধিমিশ্রিত পক্ব অন্নের স্তূপ, উৎসাদন ও পরিমর্দন দ্বারা রক্ষিত, অনিত্য, বিপ্রয়োগ এবং বিপর্যস্ত; আমার যে এই বিজ্ঞান, ইহাও তাহাতেই শায়িত, তাহাতেই প্রতিবদ্ধ।”

২৩৫. “মহারাজ, মনে করুন একখণ্ড শুভ্র, উচ্চশ্রেণিভুক্ত, অষ্টমুখ, সুকর্তিত, স্বচ্ছ, সুনির্মল, অনাবিল, সর্বায়বসম্পন্ন বৈদূর্যমণি নীল, পীত, লোহিত, শুভ্র অথবা পাণ্ডুবর্ণ সূত্রে গ্রথিত হইয়াছে। কোনো চক্ষুষ্মান পুরুষ, উহা হস্তে লইয়া প্রত্যবেক্ষণ করিলেন, “এই শুভ্র, উচ্চশ্রেণিভুক্ত, অষ্টমুখ, সুকর্তিত, স্বচ্ছ, সুনির্মল, অনাবিল, সর্বায়বসম্পন্ন বৈদূর্যমণি নীল, পীত, লোহিত, শুভ্র অথবা পাণ্ডুবর্ণ সূত্রে গ্রথিত হইয়াছে। মহারাজ, এইরূপেই ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত, পরিশুদ্ধ, পর্যবদাত, অনঙ্গন, উপক্লেশ-বিগত, মৃদুভূত, কমনীয়, স্থিত, আনেঞ্জাপ্রাপ্ত অবস্থায় জ্ঞানদর্শনের অভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি এই জ্ঞান লাভ করেন, “আমার এই কায়… প্রতিবদ্ধ।”

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৩৬. “এইরূপে চিত্তের সেই সমাহিত, পরিশুদ্ধ, পর্যবদাত অনঙ্গন, উপক্লেশ-বিগত, মৃদুভূত, কমনীয়, স্থিত, আনেঞ্জাপ্রাপ্ত অবস্থায় তিনি মনোময় কায়ের নির্মাণাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন, তিনি এই কায় হইতে ভিন্ন অপর এক রূপী, মনোময় সর্বাঙ্গণ্ডপ্রত্যঙ্গসম্পন্ন, সর্বেন্দ্রিয়যুক্ত কায় নির্মাণ করেন।

২৩৭. “মহারাজ, কোনো পুরুষ মুঞ্জ হইতে শর নিষ্কাশিত করিলে তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “ইহা মুঞ্জ, ইহা ইষীকা; মুঞ্জ এক প্রকার দ্রব্য, ইষীকা অন্য প্রকার, কিন্তু মুঞ্জ হইতে ইষীকা বহির্গত হইয়াছে।” মহারাজ, কোনো পুরুষ কোষ হইতে অসি নিষ্কাশিত করিলে তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “ইহা অসি, ইহা কোষ; অসি এক প্রকার দ্রব্য, কোষ অন্য প্রকার, কিন্তু কোষ হইতে অসি নির্গত হইয়াছে।” মহারাজ, কোনো পুরুষ পিটক হইতে সর্প বহিষ্কৃত করিলে তাহার মনে এইরূপ হইতে পারে, “ইহা সর্প, ইহা পিটক; সর্প এক দ্রব্য, পিটক অন্য প্রকার, কিন্তু পিটক হইতে সর্প নির্গত হইয়াছে।” মহারাজ, এইরূপেই ভিক্ষু চিত্তের সমাহিত, পরিশুদ্ধ… কায় নির্মাণ করেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৩৮. “মহারাজ, চিত্তের সেই সমাহিত, পরিশুদ্ধ, পর্যবদাত, অনঙ্গন, উপক্লেশ-বিগত, মৃদুভূত, কমনীয়, স্থিত, আনেঞ্জাপ্রাপ্ত অবস্থায় তিনি ঋদ্ধি বর্ধনের অভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি বহুবিধ ঋধিপ্রাপ্ত হন-এক হইয়াও বহু হইতে সক্ষম হন, বহু হইয়াও পুনরায় এক হইতে সক্ষম হন; তাঁহার আবির্ভাব ও তিরোভাব হয়; আকাশে গমনের ন্যায় তিনি ভিত্তি, প্রাকার ও পর্বতের গাত্র ভেদ করিয়া অপর পারে অবাধে গমন করেন; জলে উন্মুজ্জন-নিমজ্জনের ন্যায় ভূমিতেও উন্মুজ্জন-নিমজ্জন করেন; তিনি ভূমিতে গমনের ন্যায় জলতল ভেদ না করিয়া জলের উপর গমন করেন, তিনি পর্যঙ্কবদ্ধ হইয়া পক্ষীর ন্যায় আকাশে ভ্রমণ করেন; মহাপরাক্রমশালী মহাবল চন্দ্র-সূর্যকে তিনি হস্ত দ্বারা স্পর্শ করেন, পরিমর্দন করেন, সশরীরে ব্রহ্মলোক পর্যন্ত গমন করেন।

ঋদ্ধি

২৩৯. “মহারাজ, যেরূপ দক্ষ কুম্ভকার অথবা তাহার অন্তেবাসী সুপ্রস্তুত মৃত্তিকা হইতে ইচ্ছামতো পাত্রাদি নির্মাণ করে; যেরূপ কোনো দক্ষ গজদন্ত-শিল্পী অথবা তাহার অন্তেবাসী সুপ্রস্তুত গজদন্ত হইতে ইচ্ছামতো দ্রব্যাদি নির্মাণ করে; যেরূপ কোনো দক্ষ স্বর্ণকার অথবা তাহার অন্তেবাসী সুপ্রস্তুত স্বর্ণ হইতে ইচ্ছামতো অলংকারাদি নির্মাণ করে; এইরূপই মহারাজ, ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত,… অবস্থায় ঋদ্ধি বর্ধনের অভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি বহুবিধ ঋদ্ধিপ্রাপ্ত হন-এক হইয়াও… গমন করেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৪০. “চিত্তের সেই সমাহিত, পর্যবদাত, অনক্ষণ, উপক্লেশ বিগত,… অবস্থায় তিনি দিব্যশ্রোত্রের দিকে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি দিব্য, বিশুদ্ধ, অলৌকিক শ্রোত্র দ্বারা দূরস্থ ও নিকটস্থ দৈব ও মনুষ্য উভয় শব্দই শ্রবণ করেন।

২৪১. “মহারাজ, যেরূপ কোনো পথচারী পুরুষ ভেরীশব্দ, মৃদঙ্গশব্দ, কিম্বা শঙ্খপ্রণব-দেণ্ডিতম শব্দ শ্রবণ করিলে মনে করে, “ইহা ভেরীশব্দ, ইহা মৃদঙ্গ শব্দ, ইহা শঙ্খণ্ডপ্রণব-দেণ্ডিম শব্দ”, সেইরূপই ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় দিব্যশ্রোত্রের দিকে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি দিব্য, বিশুদ্ধ… শ্রবণ করেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৪২. “চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় তিনি চেতপর্যায় জ্ঞানের দিকে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি স্বচিত্ত দ্বারা অপর সত্ত্বগণের অপর মনুষ্যগণের চিত্ত জানিতে পারেন :

সরাগচিত্তকে সরাগচিত্তরূপে জানিতে পারেন, বীতরাগ চিত্তকে বীতরাগ চিত্তরূপে জানিতে পারে।

সদোষচিত্তকে সদোষচিত্তরূপে জানিতে পারেন, বীতদোষ চিত্তকে বীতদোষ চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

সমোহ-চিত্তকে সমোহ-চিত্তরূপে জানিতে পারেন, বীতমোহ চিত্তকে বীতমোহ চিত্তরূপে জানাতি পারেন।

সংক্ষিপ্ত চিত্তকে সংক্ষিপ্ত চিত্তরূপে জানিতে পারেন, বিক্ষিপ্ত চিত্তকে বিক্ষিপ্ত চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

পরচিত্ত জ্ঞান

মহদ্গত চিত্তকে মহদ্গত চিত্তরূপে জানিতে পারেন, অমহদ্গত চিত্তকে অমহদ্গত চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

সাংসারিক চিত্তকে সাংসারিক চিত্তরূপে জানিতে পারেন, অনুত্তর চিত্তকে অনুত্তর চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

সমাহিত চিত্তকে সমাহিত চিত্তরূপে জানিতে পারেন, অসমাহিত চিত্তকে অসমাহিত চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

বিমুক্ত চিত্তকে বিমুক্ত চিত্তরূপে জানিতে পারেন, অবিমুক্ত চিত্তকে অবিমুক্ত চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৪৩. “মহারাজ, যেরূপ কোনো বিলাসপ্রিয় স্ত্রী বা পুরুষ, তরুণ অথবা যুবা, দর্পণে কিম্বা পরিশুদ্ধ, পর্যাবদাত স্বচ্ছ জলপাত্রে স্বীয় মুখ প্রতিবিম্ব নিরীক্ষণ করিয়া উহা তিলযুক্ত হইলে তিলযুক্তরূপে জানিতে পারে, তিল রহিত হইলে তিল রহিতরূপে জানিতে পারে, সেইরূপই ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় চেতপর্যায় জ্ঞানের দিকে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি স্বচিত্ত দ্বারা… অবিমুক্ত চিত্তরূপে জানিতে পারেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৪৪. “চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় তিনি পূর্বজন্মের জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন, চারি, পাঁচ, দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ, একশত, এক সহস্র, এক লক্ষ জন্ম, অনেক সংবর্তকল্প, অনেক বিবর্তকল্প, অনেক সংবর্ত-বিবর্ত কল্প, “অমুক স্থানে আমার এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, আমি এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আমার আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সেস্থান হইতে চ্যুত হইয়া অমুক স্থানে উৎপন্ন হইয়াছিলাম। সেইস্থানে এই নাম, এই গোত্র, এই বর্ণ, এই আহার ছিল, এই প্রকার সুখ-দুঃখ অনুভব করিয়াছিলাম এবং আয়ু এই পর্যন্ত ছিল। সেস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই স্থানে উৎপন্ন হইয়াছি।” এইরূপে বহু পূর্বজন্ম এবং ওই সকলের পূর্ণ বিবরণ স্মরণ করেন।

২৪৫. “মহারাজ, কোনো পুরুষ স্বকীয় গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে গমন করিল, ওই গ্রাম হইতে অন্য গ্রামে গমন করিল, ওই গ্রাম হইতে স্বীয় গ্রামে প্রত্যাগমন করিল। তাহার মনে এইরূপ হইবে, “আমি স্বকীয় গ্রাম হইতে অমুক গ্রামে আসিয়াছিলাম, ঐস্থানে এইরূপ ভাবে দণ্ডায়মান ছিলাম, এইরূপভাবে উপবিষ্ট ছিলাম, এইরূপ কথা বলিয়াছিলাম, এইরূপ মৌনাবলম্বন করিয়াছিলাম। ওই গ্রাম হইতে অমুক গ্রামে আসিয়াছিলাম; সেখানে এইরূপ ভাবে দণ্ডায়মান ছিলাম, এইরূপ ভাবে উপবিষ্ট ছিলাম, এইরূপ কথা বলিয়াছিলাম, এইরূপ মৌনাবলম্বন করিয়াছিলাম। সেই গ্রাম হইতে আমি স্বীয় গ্রামে প্রত্যাবর্তন করিয়াছি।” মহারাজ, এইরূপেই ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় পূর্বজন্মের জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি অনেকবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করেন; যথা :… স্মরণ করেন।

পূর্বজন্মের স্মৃতি

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৪৬. “চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় তিনি সত্ত্বগণের চ্যুতি ও উৎপত্তির জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি বিশুদ্ধ, লোকাতীত, দিব্যচক্ষু দ্বারা সত্ত্বগণের চ্যুতি ও উৎপত্তি দর্শন করেন; কর্মানুযায়ী গতিপ্রাপ্ত সত্ত্বগণের মধ্যে হীন ও উত্তমকে, সুবর্ণ ও দুর্বর্ণবিশিষ্টকে, সুগত ও দুর্গতকে জানিতে পারেন, “ভদ্রগণ, এই এই সত্ত্ব কায়িক, বাচনিক ও মানসিক দুরাচরণসম্পন্ন, আর্যগণের অপবাদক, মিথ্যাদৃষ্টি সমন্বিত, মিথ্যাদৃষ্টি হইতে উদ্ভূত কর্মপ্রাপ্ত; মরণান্তে দেহের বিনাশে উহারা অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হইয়াছে। কিন্তু এই এই সত্ত্ব কায়িক, বাচনিক ও মানসিক সদাচরণসম্পন্ন, তাঁহারা আর্যগণের অপবাদ হইতে বিরত, সম্যক দৃষ্টি সমন্বিত, সম্যক দৃষ্টি হইতে উদ্ভূত কর্মপ্রাপ্ত; মরণান্তে দেহের বিনাশে উহারা সুগতিপ্রাপ্ত হইয়া স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছেন।” এইরূপে তিনি বিশুদ্ধ, লোকাতীত দিব্যচক্ষু দ্বারা… জানিতে পারেন।

২৪৭. “মহারাজ, শৃঙ্গাটকে মধ্যস্থলে প্রাসাদ। ঐস্থানে দণ্ডায়মান হইয়া চক্ষুষ্মান পুরুষ দেখিতে পাইল মনুষ্যগণ গৃহে প্রবেশ করিতেছে, গৃহ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইতেছে, পথে পাদচারণা করিতেছে, শৃঙ্গাটকের মধ্যস্থলে উপবিষ্ট রহিয়াছে। তাহার মনে এইরূপ হইবে, “এই সকল মনুষ্য গৃহে প্রবেশ করিতেছে, এই সকল শৃঙ্গাটকের মধ্যস্থলে উপবিষ্ট রহিয়াছে।” মহারাজ, এইরূপেই ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় সত্ত্বগণের চ্যুতি ও উৎপত্তির জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি বিশুদ্ধ… জানিতে পারেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর।

২৪৮. তিনি চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় আসবক্ষয় জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি “ইহা দুঃখ” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা দুঃখ সমুদয়” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা দুঃখ নিরোধ” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা দুঃখ নিরোধাভিমুখী মার্গ” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা আসব” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা আসব সমুদয়” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা আসব নিরোধ” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন, “ইহা আসব নিরোধাভিমুখী মার্গ” ইহা যথাযথরূপে জানিতে পারেন। এইরূপ জানিয়া ও দর্শন করিয়া তাঁহার চিত্ত কামাসব হইতে বিমুক্ত হয়, ভবাসব হইতে বিমুক্ত হয়, অবিদ্যাসব হইতে মুক্ত হয়, বিমুক্ত চিত্তে “বিমুক্ত হইয়াছি” এই জ্ঞানের উদয় হয়, “জন্ম ক্ষয় হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য্য উদ্‌যাপিত হইয়াছে, যাহা করণীয় তাহা সম্পন্ন হইয়াছে, পুনর্জন্ম আর নাই” তিনি ইহা জানিতে পারেন।

২৪৯. “মহারাজ, পর্বতের উপত্যকায় স্বচ্ছ, নির্মল, অনাবিল জলাশয়ের তীরে চক্ষুষ্মান পুরুষ দণ্ডায়মান হইয়া দেখিল শুক্তি, শম্বুক, শর্কার, কঠর, মৎস্যগুল্মাদি উহাতে সঞ্চরণ কিম্বা স্থিতিশীল হইয়া রহিয়াছে। তাহার মনে এইরূপ হইল, “এই জলাশয় স্বচ্ছ, নির্মল, অনাবিল, ইহাতে শক্তি, শম্বুক, শর্করা, কঠর, মৎস্যগুল্মাদি সঞ্চরণ নিরত কিম্বা স্থিতিশীল।” এইরূপেই মহারাজ, ভিক্ষু চিত্তের সেই সমাহিত… অবস্থায় আসবক্ষয় জ্ঞানাভিমুখে চিত্তকে নমিত করেন। তিনি “ইহা দুঃখ”… তিনি ইহা জানিতে পারেন।

“মহারাজ, ইহাও সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল, ইহা পূর্বোক্ত সাংদৃষ্টিক ফল হইতে উন্নততর, মধুরতর। মহারাজ, ইহা হইতে উন্নততর, মধুরতর সাংদৃষ্টিক শ্রামণ্যফল নাই।”

২৫০. এইরূপ উক্ত হইলে মগধরাজ বৈদেহিপুত্র অজাতশত্রু ভগবানকে বলিলেন, “উত্তম, ভন্তে! উত্তম! যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথ প্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈল দীপ ধৃত হয়, সেইরূপেই ভগবান অনেক পর্যায়ে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমি ভগবানের শরণ লইতেছি, ধর্মের শরণ লইতেছি, ভিক্ষুসংঘের শরণ লইতেছি। আজ হইতে জীবনের অন্তকাল পর্যন্ত শরণাগত উপাসকরূপে ভগবান আমাকে গ্রহণ করুন। ভন্তে, আমি মূর্খতা, মূঢ়তা ও পাপবশত অপরাধী হইয়াছি, আমি রাজ্যলোভে ধার্মিক, ধর্মরাজ পিতাকে হত্যা করিয়াছি। ভগবান আমার অপরাধ ক্ষমা করুন, যাহাতে আমি ভবিষ্যতে সংযত হইতে পারি।”

২৫১. “মহারাজ, যথার্থই আপনি মূর্খতা, মূঢ়তা ও পাপবশত অপরাধী হইয়াছেন, যেহেতু আপনি ধার্মিক ধর্মরাজ পিতার হত্যাসাধন করিয়াছেন। কিন্তু মহারাজ, যেহেতু আপনি অপরাধকে অপরাধরূপে দর্শন করিয়া যথাধর্ম তাহার প্রতিকার করিতেছেন, সেই হেতু আপনার স্বীকারোক্তি গৃহীত হইল। মহারাজ, যে অপরাধকে অপরাধরূপে দর্শন করিয়া যথাধর্ম তাহার প্রতিকার করে সে ভবিষ্যতে সংযত হয়, ইহাই আর্যদিগের বিনয়ের রীতি।”

২৫২. এইরূপ কথিত হইলে মগধরাজ বৈদেহিপুত্র অজাতশত্রু ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, এক্ষণে আমি গমন করিব, আমার অনেক কৃত্য অনেক করণীয় আছে।”

“মহারাজের যেরূপ অভিরুচি।”

তৎপরে মগধরাজ বৈদেহিপুত্র অজাতশত্রু ভগবদ্বাক্য অভিনন্দন ও অনুমোদনপূর্বক আসন হইতে উত্থান করিয়া ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণপূর্বক প্রস্থান করিলেন।

২৫৩. তদনন্তর, মগধরাজের প্রস্থানের অত্যল্পকাল পরেই ভগবান ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করিলেন, “ভিক্ষুগণ, রাজা ছিন্নমূল, অর্ধমৃত; ভিক্ষুগণ, যদি তিনি ধার্মিক ধর্মরাজ পিতার প্রাণনাশ না করিতেন, তাহা হইলে এই আসনেই তাঁহার বিরজ বীতমল ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হইত।”

ভগবান এইরূপ বলিলেন। ভিক্ষুগণ হৃষ্ট মনে ভগবদ্বাক্যের অভিনন্দন করিলেন।

শ্রামণ্যফল সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৩]