লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২২]

লক্ষণ সূত্রান্ত

১৯৮. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। এক সময় ভগবান জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় ভগবান ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করিলেন, “ভিক্ষুগণ,” ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে বলিলেন, “ভন্তে”।

১৯৯. তখন ভগবান বলিলেন, “ভিক্ষুগণ, যিনি মহাপুরুষ তিনি দ্বাত্রিংশৎ লক্ষণযুক্ত, ওই লক্ষণযুক্ত মহাপুরুষের মাত্র দুই প্রকার গতি, অন্য নাই। গৃহবাসী হইলে তিনি রাজচক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন, তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন তিনি পৃথিবীতে আবরণমুক্ত সম্যকসম্বুদ্ধ অর্হৎ পদ প্রাপ্ত হন।

২০০. “ভিক্ষুগণ, ওই সকল মহাপুরুষ-লক্ষণ কী কী যা দ্বারা যুক্ত মহাপুরুষের মাত্র দুই প্রকার গতি, অন্য নাই? গৃহবাসী হইলে তিনি রাজচক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন, তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরণমুক্ত সম্যকসম্বুদ্ধ অর্হৎ পদপ্রাপ্ত হন।

“ভিক্ষুগণ, মহাপুরুষ সুপ্রতিষ্ঠিত-পাদ। ইহা মহাপুরুষের লক্ষণ

“পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, মহাপুরুষের পদতলের নিম্নে চক্র দৃষ্ট হয়, উহা সহস্র অর, নেমি ও নাভিযুক্ত, সর্বাকার-পরিপূর্ণ এবং সুবিভক্ত। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, মহাপুরুষ আয়ত পাষ্ণিসম্পন্ন ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“দীর্ঘ অঙ্গুলিসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“মৃদু-তরুণ হস্ত-পাদসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“জাল হস্ত-পাদসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“পাদতলের মধ্যস্থলে স্থিত গুল্‌ফ-সন্ধিবিশিষ্ট। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“এণী-জঙ্ঘাবিশিষ্ট। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“দণ্ডায়মান অবস্থায়ই অবনত না হইয়া উভয় হস্ততল দ্বারা জানুদেশ স্পর্শ ও মর্দনে সক্ষম। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“কোষরক্ষিত গুপ্তেন্দ্রিয়সম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“সুবর্ণবর্ণ ও কাঞ্চনসন্নিভ ত্বকবিশিষ্ট। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাহার চর্ম এতই সূক্ষ্ম যে ধূলি ও মল উহাতে লিপ্ত হয় না। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার প্রত্যেক লোমকূপে মাত্র একটি লোম উৎপন্ন হয়। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার লোমসমূহ ঊর্ধ্বাগ্র, নীলাঞ্জনবর্ণ, দক্ষিণাবর্তসম্পন্ন কুণ্ডলবিশিষ্ট। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার অঙ্গণ্ডপ্রত্যঙ্গ দিব্য ঋজুতাসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি সপ্ত-উৎসেধসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার দেহের পূর্বার্ধ সিংহের ন্যায়। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি উন্নত-বক্ষ। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি ন্যগ্রোধ বৃক্ষের ন্যায় অঙ্গণ্ডসৌষ্ঠবসম্পন্ন, তাঁহার কায়ানুযায়ী ব্যাম এবং ব্যামানুযায়ী কায়। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি সমবর্ত-স্কন্ধ। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি শ্রেষ্ঠরুচিসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি সিংহ-হনু। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি চত্বারিংশৎ দন্তবিশিষ্ট। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি সমদন্তবিশিষ্ট। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি অবিবর-দন্ত। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার শুভ্রোজ্জ্বল শ্বাদন্ত। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি দীর্ঘ-জিহ্বা। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তিনি দিব্যস্বরসম্পন্ন। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“করবীক পক্ষীর স্বরের ন্যায় মধুর তাঁহার স্বর। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার নেত্র গাঢ় নীলবর্ণ। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার গো-সদৃশ অক্ষি-পক্ষ্ম। ইহাও মহাপুরুষের লক্ষণ”

“তাঁহার ভ্রূযুগমধ্যস্থ ঊর্ণ শুভ্র মৃদু তূলসন্নিভ, ভিক্ষুগণ, মহাপুরুষের ভ্রূযুগমধ্যস্থ ঊর্ণ শুভ্র মৃদু তূলসন্নিভ হয়। ইহাও মহাপুরুষ-লক্ষণ”

“পুনশ্চ, ভিক্ষুগণ, মহাপুরুষ উষ্ণীষ-শীর্য হন। ইহাও মহাপুরুষ-লক্ষণ”

“ভিক্ষুগণ, এই সকলই দ্বাত্রিংশৎ মহাপুরুষ-লক্ষণ যাহাতে যুক্ত মহাপুরুষের মাত্র দুইপ্রকার গতি, অন্য নাই। গৃহবাসী হইলে তিনি রাজচক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্নসমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন, তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন তিনি পৃথিবীতে আবরণমুক্ত সম্যকসম্বুদ্ধ অর্হৎ পদপ্রাপ্ত হন। ভিক্ষুগণ, এই সকল মহাপুরুষ-লক্ষণ ভিন্নধর্মীয় ঋষিগণও অবগত আছেন, কিন্তু কোন কর্মের ফলে কোন লক্ষণ লাভ হয় তাহা তাঁহাদের জ্ঞাত নহে।

২০১. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্ম, পূর্বভব ও পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া কুশলধর্মাচরণে দৃঢ়-সংকল্প হইয়াছিলেন, কায়িক, বাচনিক ও মানসিক সদাচারে, দান বিতরণে, শীল গ্রহণে, উপোসথ পালনে, মাতৃসেবায়, পিতৃসেবায়, শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণের সেবায়, কুল-জ্যেষ্ঠের সৎকারে এবং অপরাপর মহৎ কুশলকর্মে অবিচলিত-সংকল্প হইয়াছিলেন, সেই হেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। তিনি ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া ইহলোকে আগমন করিয়া এই সকল মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, সুপ্রতিষ্ঠিত পাদ হইয়া তিনি সমভাবে ভূমিতে পদক্ষেপ করেন, সমভাবে পদ উত্তোলন করেন, সমভাবে সম্পূর্ণ পদতলের দ্বারা ভূমি স্পর্শ করেন।

২০২. “ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া গৃহবাসী হইলে তিনি রাজচক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত অকণ্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীকে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া তিনি কী লাভ করেন? কোনো মনুষ্য শত্রু অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া তাঁহার প্রতিরোধে অক্ষম হয়। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ হন। তিনি বুদ্ধ হইয়া কী লাভ করেন? রাগ, দ্বেষ ও মোহরূপ অভ্যন্তর শত্রু এবং বহিঃশত্রুস্বরূপ শ্রমণ, ব্রাহ্মণ, দেব, মার, ব্রহ্মা অথবা জগতে অপর কেহ তাঁহার প্রতিরোধে অক্ষম। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।”

ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২০৩. ওই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

সত্য, ধর্ম, দম, সংযম, শৌচ, শীল,
উপোসথ, দান, অহিংসায় রত হইয়া,
বলপ্রয়োগে বিরত হইয়া, দৃঢ় সংকল্পের
সহিত তিনি সমতার আচরণ করিয়া-
ছিলেন। সেই কর্মের ফলে তিনি স্বর্গে
গমন করিয়া সুখ ও ক্রীড়া-রতি অনুভব
করিয়াছিলেন।
ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া তিনি পৃথিবীতে
পুনরাগমন করিয়া সমণ্ডপদবিক্ষেপে ভূমি স্পর্শ
করিয়াছিলেন। লক্ষণজ্ঞগণ একত্রিত
হইয়া ঘোষণা করিলেন, “যিনি
সুপ্রতিষ্ঠিতপাদ, তাঁহার অন্তরায় নাই,
গৃহীই হউক অথবা প্রব্রজিতই হউক,
ওই লক্ষণের ওই অর্থ
গৃহবাসী হইলে তিনি বিজয়ী-শত্রুমর্দন
হন, কোনো শত্রু তাঁহার প্রতিরোধ
করিতে পারে না, ওই ধর্মের ফলে কোনো
মনুষ্য তাঁহার পথে অন্তরায় হইতে পারে না।
ওইরূপ পুরুষ যদি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন,
তাহা হইলে তিনি নৈষ্কাম্যরত ও
বিচক্ষণ হইয়া শ্রেষ্ঠ নরোত্তমে পরিণত
হন, ইহা নিশ্চিত যে তিনি আর গর্ভে
প্রবেশ করেন না; ইহাই তাঁহার স্বাভাবিক নিয়তি।”

২০৪. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্ম, পূর্বভব ও পূর্বনিবাসে মনুষ্যজন্মগ্রহণ করিয়া বহুজনের সুখবিধান করিয়াছিলেন, তাহাদের উদ্বেগ, উত্রাস, ভয় অপনোদন করিয়াছিলেন, তাহাদের ধর্মানুযায়ী আশ্রয় ও রক্ষার বিধান করিয়াছিলেন, সর্বপ্রয়োজনীয় বস্তু দান করিয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। তিনি ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া ইহলোকে আগমন করিয়া এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তাঁহার পাদতলে সহস্র অর, নেমি ও নাভিযুক্ত, সর্বাকার-পরিপূর্ণ সুবিভক্ত চক্র প্রকাশিত হয়।

“তিনি ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্নসমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্নস্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকন্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি বহু অনুচরবেষ্টিত হইয়া থাকেন, ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ, নগর ও জনপদবাসীগণ, কোষাধ্যক্ষ, প্রহরী, দৌবারিক, অমাত্য, পারিষদ, ক্ষুদ্র রাজগণ, ধনী অভিজাত বংশীয়গণ এবং তরুণ রাজকুমারগণ কর্তৃক তিনি বেষ্টিত হইয়া থাকেন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। তিনি বুদ্ধ হইয়া কী লাভ করেন। তিনি বহু অনুচরবেষ্টিত হন, ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীগণ, উপাসক ও উপাসিকাগণ, দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্বগণ কর্তৃক তিনি বেষ্টিত হইয়া থাকেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।”

ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২০৫. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

অতীতে পূর্ব পূর্ব জন্মে মনুষ্যরূপে তিনি
বহু জনের সুখবিধান করিয়াছিলেন,
উদ্বেগ, উত্রাস ও ভয় অপনোদন করিয়াছিলেন,
সাগ্রহে তাহাদের আশ্রয় ও রক্ষার বিধান করিয়াছিলেন।
সেই কর্মের ফলে স্বর্গে গমন করিয়া
তিনি সুখ ও ক্রীড়া-রতি অনুভব
করিয়াছিলেন। ওই স্থান হইতে চ্যুত
হইয়া এই পৃথিবীতে পুনরাগমন করিলে
তাঁহার পাদদ্বয়ে সনেমি সহস্র অরযুক্ত চক্র দৃষ্ট হইয়াছিল।
লক্ষণজ্ঞগণ একত্রিত হইয়া শত পুণ্যলক্ষণসম্পন্ন
কুমারকে দেখিয়া বলিলেন :
“তিনি বহু অনুচরবেষ্টিত ও শত্রুমর্দনক্ষম
হইবেন, যেহেতু সম্পূর্ণ নেমিযুক্ত চক্র দৃষ্ট হইয়াছে।
ঈদৃশ পুরুষ যদি প্রব্রজ্যা গ্রহণ না করেন,
তাহা হইলে তিনি চক্রের প্রবর্তন করিয়া
পৃথিবী শাসন করেন, ক্ষত্রিয়গণ তাঁহার
অনুগামী হন, তিনি বিপুল যশের অধিকারী হন।
ঈদৃশ পুরুষ যদি নৈষ্কাম্যরত ও বিচক্ষণ হইয়া
প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন, তাহা হইলে দেবমনুষ্য-
অসুর-শত্রু-রাক্ষসগণ, গন্ধর্ব-নাগ-বিহঙ্গগণ,
চতুষ্পদগণ সেই অনুত্তর দেবমনুষ্য-পূজিত,
মহা যশশ্বী পুরুষের সেবা করেন।”

২০৬. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্মে পূর্বভবে পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া প্রাণাতিপাত বর্জনপূর্বক উহাতে বিরত হইয়াছিলেন, দণ্ড ও শস্ত্র পরিহার করিয়া, পাপে-ভয়দর্শী, দয়াপন্ন এবং সর্ব প্রাণীর হিতানুকম্পী হইয়া বিহার করিয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া তিনি এই তিন মহাপুরুষ লক্ষণের অধিকারী হন, তিনি আয়তপাষ্ণিসম্পন্ন, দীর্ঘাঙ্গুলিবিশিষ্ট এবং তাঁহার অঙ্গণ্ডপ্রত্যঙ্গ দিব্য ঋজুতাসম্পন্ন।

“তিনি ওই ত্রিবিধ লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্নসমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকণ্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি দীর্ঘায়ু হন, বহুকাল স্থায়ী হন, বহুদিন জীবন ধারণ করেন, এই সময়ের মধ্যে কোনো মনুষ্য প্রতিদ্বন্দ্বী অথবা শত্রু তাঁহার জীবন নাশ করিতে পারে না। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি দীর্ঘায়ু ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হন, বহুকাল জীবনধারণ করেন, এই সময়ের মধ্যে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী অথবা শত্রু শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ, দেব, মার, ব্রহ্মা অথবা জগতে অপর কেহ তাঁহার জীবন নাশ করিতে পারে না। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২০৭. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

আপনার মরণ-বধ-ভয় বিদিত হইয়া
তিনি অপরের প্রাণবধে বিরত ছিলেন।
সেই সুকর্মের ফলে তিনি স্বর্গে গমন
করিয়াছিলেন এবং তথায় সুকৃতির
ফল-বিপাক অনুভব করিয়াছিলেন।
ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া পুনরায় এই
পৃথিবীতে আগমন করিয়া তিনি তিনটি
লক্ষণযুক্ত হন, দীর্ঘ বিপুল পাণি লাভ
করেন, ব্রহ্মার ন্যায় ঋজু, সুদর্শন এবং
অঙ্গণ্ডসৌষ্ঠবসম্পন্ন হন, সুভুজ, তরুণকান্তিবিশিষ্ট,
শান্তমূর্তি ও সৌভাগ্যযুক্ত হন।
তিনি মৃদু-তরুণ দীর্ঘ অঙ্গুলিবিশিষ্ট হন,
এই ত্রিবিধ মহাপুরুষ-লক্ষণসমন্বিত কুমার
দীর্ঘজীবীরূপে ঘোষিত হন।
যদি গৃহী হন, তিনি বহুকাল জীবনধারণ
করিবেন, যদি প্রব্রজিত হন, তাহা হইলে
আরও অধিককাল জীবিত থাকিবেন;
তিনি আত্মজয়ী হইয়া ঋদ্ধি-ভাবনায়
কালাতিপাত করেন, ইহা দীর্ঘায়ুতার লক্ষণ।

২০৮. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্ম, পূর্বভব এবং পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে প্রণীত, সুমিষ্ট খাদ্য, ভোজ্য, লেহ্য ও পেয় দান করিয়াছিলেন, সেই হেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া তিনি এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া সপ্ত উৎসেধরূপ মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তাঁহার উভয় হস্তে, উভয় পদে, উভয় অংসদেশে এবং স্কন্ধে উৎসেধ লক্ষিত হয়।

“তিনি ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্নস্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকন্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি প্রণীত, সুমিষ্ট খাদ্য, ভোজ্য, লেহ্য, পেয় প্রাপ্ত হন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি প্রণীত, সুমিষ্ট, খাদ্য, ভোজ্য, লেহ্য, পেয় লাভ করেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২০৯. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি সুমিষ্ট খাদ্য, ভোজ্য, লেহ্য ও পেয়
দান করিয়াছিলেন। ওই সুকর্মের ফলে
তিনি বহুকাল নন্দন কাননে আনন্দে
অতিবাহিত করিয়াছিলেন।
তিনি সপ্ত উৎসেধ ও মৃদু হস্ত ও পাদযুক্ত
হইয়া এই জগতে আগমন করেন।
লক্ষণজ্ঞগণ তাঁহাকে উত্তম খাদ্য-ভোজ্য
লাভীরূপে ব্যক্ত করেন।
তিনি গৃহী-জীবনের জন্যই ওই লক্ষণযুক্ত
হন নাই, প্রব্রজিত হইয়াও তিনি ওই
লক্ষণ লাভ করেন; সর্ব গৃহীবন্ধন
ছিন্ন করিয়াও তিনি উত্তম খাদ্য-ভোজ্য
লাভীরূপে উক্ত হন।

২১০. যেহেতু ভিক্ষুগণ, তিনি পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া দান, প্রিয় বাক্য, অর্থচর্যা ও সমানাত্মতারূপ চতুর্বিধ সংগ্রহবস্তু দ্বারা জনপ্রিয় হইয়াছিলেন, সেই হেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া তিনি এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, মৃদু-তরুণ হস্ত-পাদ এবং জালহস্ত-পাদ।

“তিনি ওই সকল লক্ষণযুক্ত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্নস্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকণ্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি পরিজনবর্গ, ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ, নগর ও জনপদবাসীগণ, কোষাধ্যক্ষগণ, প্রহরী ও দৌবারিকগণ, অমাত্য ও পারিষদগণ, ক্ষুদ্র রাজগণ, ধনী-অভিজাতবংশীয়গণ এবং তরুণ রাজকুমারগণের প্রিয় হন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি পরিজনগণ, ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীগণ, উপাসক ও উপাসিকাগণ, দেবমনুষ্য অসুর নাগ গন্ধর্বগণের প্রিয় হন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২১১. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

দান, অর্থচর্যা, প্রিয় বাক্য, সমামাত্মতা
দ্বারা বহুজনের চিত্ত জয় করিয়া, উক্ত
গুণসমূহে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া তিনি স্বর্গে
গমন করেন।
ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া পুনরায় ইহলোকে
আগমনপূর্বক তিনি কান্তি ও সৌকুমার্য
সমন্বিত হইয়া পরম সুন্দর দর্শনীয় মৃদু
এবং জালহস্তপদ লাভ করেন।
পারিজনবর্গ তাঁহার আদেশানুবর্তী হয়,
তিনি সহানুভূতিসম্পন্ন হইয়া পৃথিবীতে
বাস করেন, প্রিয়বাদী ও হিত-সুখান্বেষী
হইয়া তিনি প্রীতিপ্রদ গুণসমূহের আচরণ করেন।
যদি তিনি সর্বপার্থিবসুখ ভোগ পরিহার
করেন, তাহা হইলে আত্মজয়ী হইয়া
তিনি জনগণের নিকট ধর্মপ্রকাশ করেন,
তাহারা উপদেষ্টার বাক্য শ্রবণে প্রসন্ন
হইয়া ধর্মের সর্বাঙ্গীন পালনে রত হয়।

২১২. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া বহুজনকে অর্থোপসংহিত, ধর্মোপসংহিত হিতবাক্য বলিয়াছিলেন, বহুজনকে উপদেশ দিয়াছিলেন, ধর্ম-যজ্ঞের দ্বারা প্রাণীগণের হিত ও সুখবিধান করিয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া তিনি এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, পাদ-মধ্যস্থ গুল্‌ফ-সন্ধি এবং ঊর্ধ্বাগ্রলোম।

“তিনি ওই লক্ষণসমূহ প্রাপ্ত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকন্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি কাম-ভোগীগণের মধ্যে অগ্র, শ্রেষ্ঠ, প্রমুখ, উত্তম, প্রবর হন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? সর্ব সত্ত্বের মধ্যে তিনি অগ্র, শ্রেষ্ঠ, প্রমুখ, উত্তম, প্রবর, হন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২১৩. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি পূর্বে অর্থ ও ধর্মোপসংহিত বাক্য বলিয়া
বহুজনকে উপদেশ দিয়াছিলেন, প্রাণীগণের হিত
ও সুখের বিধান করিয়াছিলেন, মাৎসর্যরহিত
হইয়া ধর্মযজ্ঞ করিয়াছিলেন।
ওই সুকর্মের ফলে তিনি স্বর্গে গমন করিয়া তথায়
আনন্দ লাভ করিয়াছিলেন, এই পৃথিবীতে
আগমন করিয়া দুইটি লক্ষণবিশিষ্ট হইয়া উত্তম
সুখ অনুভব করিয়াছিলেন।
তাঁহার রোমরাজী ঊর্ধ্বাগ্র এবং পাদগ্রন্থি সুব্যবস্থিত
ছিল, তদুপরি মাংস ও রক্তসহ বিস্তৃত ত্বক শোভন
হইয়াছিল।
ওইরূপ পুরুষ গৃহবাসী হইলে কাম-ভোগীদিগের মধ্যে
শ্রেষ্ঠত্ব প্রাপ্ত হন, তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর নাই,
তিনি জম্বুদ্বীপ জয়ী হইয়া বিহার করেন।
তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিলেও উহা অসাধারণ হয়,
তিনি সর্বপ্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেন,
তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ আর নাই, তিনি সর্বজয়ী
হইয়া বিহার করেন।

২১৪. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া “কিরূপে শীঘ্র জানিতে পারা যায়, শীঘ্র শিক্ষা করিতে পারা যায়, শীঘ্র শিক্ষার সম্যক অনুসরণ হয়, দীর্ঘকাল ক্লিষ্ট হইতে না হয়?” ইহা চিন্তা করিয়া সযত্নে শিল্প, বিদ্যা, আচরণ এবং কর্ম শিক্ষা দিয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এণী-জঙ্ঘারূপ মহাপুরুষলক্ষণ প্রাপ্ত হন।

ওই লক্ষণ সমন্বিত হইয়া যদি তিনি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজা-চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া তিনি কী লাভ করেন? যাহা রাজার্হ, রাজচিহ্ন, রাজভোগ্য, রাজোচিত, তাহা তিনি শীঘ্র লাভ করেন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? যাহা শ্রমণার্হ, শ্রমণ-লক্ষণ, শ্রমণোপভোগ্য, শ্রমণোচিত, তাহা তিনি শীঘ্র লাভ করেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২১৫. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

শিল্প, বিদ্যা, আচরণ এবং কর্ম “কীরূপে শীঘ্র শিক্ষা
করা যায়” ইহা ইচ্ছা করিয়া যাহাতে কাহারও
কষ্ট না হয় এবং দীর্ঘকাল কাহাকেও ক্লেশ স্বীকার
করিতে না হয়, সেইরূপে তিনি শীঘ্র শিক্ষা দেন।
সেই কুশল সুখবিধায়ক কর্ম করিয়া তিনি মনোজ্ঞ,
সুসংস্থিত, সুগোল, সুজাত, ক্রমোন্নত জঙ্ঘা লাভ
করেন, সূক্ষ্ম ত্বকোপরি তাঁহার রোমরাজী ঊর্ধ্বাগ্রবিশিষ্ট হয়।
সেইপুরুষ এণী-জঙ্ঘ কথিত হন, এবং উহা
অবিলম্বিত সমৃদ্ধিলাভের লক্ষণ কথিত হয়, তাঁহার
প্রত্যেক লোমকূপ হইতে মাত্র একটি লোম
উদ্গত হয়, প্রব্রজ্যা গ্রহণ না করিলে যাহা ঈপ্সিত
তাহা তিনি অবিলম্বে লাভ করেন।
তাদৃশ পুরুষ নৈষ্কাম্য-চিত্ত ও বিচক্ষণ হইয়া প্রব্রজ্যা
গ্রহণ করিলে সেই মহান গৃহত্যাগী অবিলম্বে
যোগ্যতানুরূপ প্রাপ্তিতে মণ্ডিত হন।

২১৬. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণদিগের নিকট গমন করিয়া তাঁহাদিগকে প্রশ্ন করিতেন, “ভন্তে, কুশল কী? অকুশল কী? কী নিন্দনীয়, কী অনিন্দ্য? কি সেবিতব্য, কি সেবিতব্য নহে? কোন কর্ম করিলে উহা দীর্ঘকাল আমার অহিত ও দুঃখের কারণ হইবে? কোন কর্মই বা করিলে উহা দীর্ঘকাল আমার হিত ও সুখের কারণ হইবে?” সেই হেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, সুমসৃণ ত্বকবিশিষ্ট হন, ত্বকের সূক্ষ্মতার জন্য ধূলি ও মল দেহে লিপ্ত হয় না।

“তিনি ওই লক্ষণ সমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে চক্রবর্তী রাজা হন। ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকন্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি মহাপ্রাজ্ঞ হন, কামভোগীদিগের মধ্যে কেহই তাঁহার সদৃশ অথবা তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয় না। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি মহাপ্রাজ্ঞ হন, পৃথুপ্রাজ্ঞ, নির্মল জ্ঞানসম্পন্ন, ক্ষিপ্রবুদ্ধি, তীক্ষ্ণপ্রাজ্ঞ, নির্বেধিক-প্রাজ্ঞ হন, সর্ব সত্ত্বগণের মধ্যে কেহই প্রজ্ঞায় তাঁহার সদৃশ অথবা তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হয় না। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২১৭. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

অতীতে পূর্ব পূর্ব জন্মে তিনি জ্ঞানার্থী হইয়া প্রশ্ন
করিয়াছিলেন, উপদেশ শ্রবণেচ্ছায় প্রব্রজিতগণের
সেবা করিয়াছিলেন, জ্ঞাতার্থ হইয়া মঙ্গলোপদেশে
কর্ণপাত করিয়াছিলেন। তিনি প্রজ্ঞালাভরূপ
কর্মহেতু মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া সূক্ষ্মত্বকবিশিষ্ট
হইয়া থাকেন। জন্ম-লক্ষণজ্ঞগণ ঘোষণা করিয়াছিলেন,
“তিনি সূক্ষ্মার্থসমূহের সম্যক-দর্শী হইবেন।” তাদৃশ
জন প্রব্রজ্যা গ্রহণ না করিলে চক্রবর্তী রাজা হইয়া
পৃথিবী শাসন করেন। অর্থানুশাসনে এবং উহার
পরিগ্রহে তাঁহার অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ অথবা তাঁহার সমান
কেহই থাকে না। যদি তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন,
তাহা হইলে নৈষ্কাম্যরত ও বিচক্ষণ হন, অনুত্তর
বিশিষ্ট প্রজ্ঞার অধিকারী হন, মহাপ্রাজ্ঞ হইয়া বোধি
প্রাপ্ত হন।

২১৮. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া ক্রোধহীন ও শান্তচিত্ত ছিলেন, বহু বাক্যের বিষয়ীভূত হইলেও ক্ষোভ, কোপ, দ্বেষ অথবা বিরোধের বশবর্তী হইতেন না; কোপ, দ্বেষ ও দৌর্মনস্য প্রকাশ করিতেন না, সূক্ষ্ম, সুচিক্কণ ও মৃদু ক্ষৌম, কার্পাস, কৌষেয়, ঔর্ণ আস্তরণ ও আচ্ছাদন দান করিতেন, সেইহেতু তিনি সেই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, সুবর্ণ বর্ণ ও কাঞ্চন সন্নিভ ত্বকবিশিষ্ট হন।

“তিনি ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে চক্রবর্তী রাজা হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি সূক্ষ্ম সুচিক্কণ ও মৃদু কার্পাস, কৌষেয় ও ঔর্ণ আস্তরণ ও আচ্ছাদন লাভ করেন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া কী লাভ করেন? তিনি সূক্ষ্ম সুচিক্কণ ও মৃদু কার্পাস, কৌষেয় ও ঔর্ণ আস্তরণ ও আচ্ছাদন লাভ করেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২১৯. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি ক্রোধহীন হইয়া বিরাজ করিতেন এবং সূক্ষ্ম
সুচিক্কণ বস্ত্রাদি দান করিতেন। পৃথিবীতে দেবের
বর্ষণের ন্যায় পূর্ব জন্মে তিনি দান করিয়াছিলেন,
ওই কর্ম করিয়া এইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া সুকৃতির
ফল স্বরূপ স্বর্গে উৎপন্ন হইয়াছিলেন, এইস্থানে তিনি
কনকতুল্য দেহবিশিষ্ট হইয়া সুরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রের ন্যায়
অবস্থান করেন। যদি তিনি প্রব্রজ্যা ইচ্ছা না করিয়া
গৃহবাসী হন, তাহা হইলে বিশাল পৃথিবী সবিক্রমে
শাসন করেন, বিপুল, সূক্ষ্ম, সুচিক্কণ মহার্ঘ বসনাদি
লাভ করেন। যদি তিনি গৃহহীন জীবন আশ্রয়
করেন, তাহা হইলে শ্রেষ্ঠ আচ্ছাদন-আবরণ
বস্ত্রাদি প্রাপ্ত হন,
বিজয়ী হইয়া পূর্বকৃত কর্মের ফল প্রাপ্ত
হন, কৃতের নাশ নাই।

২২০. “ভিক্ষুগণ, যেহেতু তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া বহুকাল পূর্বে হৃত, চির-প্রবাসী জ্ঞাতি-মিত্র-সুহৃৎ-সখাগণকে পুনর্মিলিত করিয়াছিলেন, মাতাকে পুত্রের সহিত, পুত্রকে মাতার সহিত, পিতাকে পুত্রের সহিত, পুত্রকে পিতার সহিত, ভ্রাতাকে ভ্রাতার সহিত, ভ্রাতাকে ভগ্নীর সহিত, ভগ্নীকে ভ্রাতার সহিত সম্মিলিত করিয়াছিলেন, তাহাদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করিয়া আনন্দ লাভ করিয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের ফলে মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, কোষরক্ষিত গুপ্তেন্দ্রিয়সম্পন্ন হন।

“তিনি ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে চক্রবর্তী রাজা হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি বহু-পুত্রবান হন, তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র হয়-সকলেই সুর, বীর পরসেনা মর্দনক্ষম। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি পুত্র লাভ করেন, তাঁহার সুর, বীর, পরসেনা মর্দনক্ষম সহস্রাধিক পুত্র হয়। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২২১. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

অতীতে পূর্ব পূর্ব জন্মে তিনি চিরহৃত
চির প্রবাসী জ্ঞাতি-সুহৃদ-সখাগণকে
পুনর্মিলিত করিয়াছিলেন, তাহাদের
মধ্যে ঐক্য স্থাপন করিয়া আনন্দ লাভ
করিয়াছিলেন। তিনি ওই কর্মের ফলে
স্বর্গে গমনপূর্বক সুখ ও ক্রীড়া-রতি
অনুভব করিয়াছিলেন। ওই স্থান
হইতে চ্যুত হইয়া পুনরায় এই পৃথিবীতে
জন্মগ্রহণ করিয়া তিনি কোষরক্ষিত
গুহ্যেন্দ্রিয়সম্পন্ন হইয়া থাকেন। তিনি
সুর, বীর, শত্রু-জয়ী, গৃহীর প্রীতিজনক,
প্রিয়ম্বদ সহস্রাধিক পুত্র লাভ করেন।
তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিলে তাঁহার
আজ্ঞানুবর্তী বহু পুত্র হয়। এইরূপে
গৃহীই হউন অথবা প্রব্রজিতই হউন,
ওই লক্ষণ উক্ত মঙ্গলের দ্যোতক।

প্রথম ভাণবার সমাপ্ত।

২২২. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া জনসাধারণের হিতকামী ছিলেন, তাহাদের মধ্যে সাম্য ও বৈষম্য জানিতেন, মানুষ বুঝিতেন, তাঁহাদের মধ্যে বৈশিষ্ট্য কোথায় তাহা বুঝিতেন, “এই পুরুষ ইহার যোগ্য, এই পুরুষ উহার যোগ্য,” এবং এইরূপে মানুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্য দর্শন করিতেন। সেইহেতু ওই কর্মের ফলে মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি ওই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, ন্যগ্রোধবৃক্ষের ন্যায় অঙ্গসৌষ্ঠবসম্পন্ন হন এবং দণ্ডায়মান অবস্থায়ই অবনত না হইয়া উভয় হস্ততল দ্বারা জানুদেশ স্পর্শ ও মর্দনে সক্ষম হন।

“ওই সকল লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি তিনি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে চক্রবর্তী রাজা হন। ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্ন স্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা, উর্বরা, অনিমিত্ত, অকন্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, সুশান্ত, শিব, শুদ্ধ এই পৃথিবীতে বিনাদণ্ডে ও বিনাঅস্ত্রে মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি আঢ্য, মহাধনশালী, মহাভোগী, প্রভূত স্বর্ণ রৌপ্যর অধিকারী, প্রভূত ধনধান্যসম্পন্ন হন, তাঁহার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ থাকে। রাজা হইয়া তিনি এই লাভ করেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া কী লাভ করেন? আঢ্য, প্রভূত ধনসম্পন্ন মহাভোগী হন। তিনি এই সকল ধন লাভ করেন; যথা : শ্রদ্ধাধন, শীলধন, হ্রীধন, শ্রুতিধন, ওত্তপ্যধন, ত্যাগধন, প্রজ্ঞাধন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২২৩. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি পূর্বে জনসাধারণের হিতকামী
হইয়া, তুলনা বিচার ও চিন্তা করিয়া
“এই পুরুষ ইহার যোগ্য” ইহা বুঝিয়া
সর্বস্থানে মানুষের মধ্যে বৈশিষ্ট্য দর্শন
করিতেন।
এক্ষণে তিনি দণ্ডায়মান অবস্থায়
অবনত না হইয়া হস্ত দ্বারা উভয় জানু
স্পর্শ করেন, এবং অপরাপর সুকর্মের
ফলস্বরূপ মহীরূহের ন্যায় অঙ্গসৌষ্ঠবসম্পন্ন হইয়াছেন।
বহুবিধ নিমিত্ত লক্ষণজ্ঞ নিপুণ ব্যক্তিগণ
ঘোষণা করিয়াছিলেন “অতি তরুণ
কুমার সর্বশ্রেণির গৃহস্থের যোগ্য
ভোগ্য-বস্তু লাভ করেন। তিনি রাজো
উপযুক্ত এবং গৃহীগণের ভোগ্য বহুবিধ
বস্তু লাভ করেন।”

২২৪. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া বহুজনের অর্থাকাঙ্ক্ষী, হিতাকাঙ্ক্ষী, সুখাকাঙ্ক্ষী, নিরাপত্তাকাঙ্ক্ষী হইয়াছিলেন এবং কিরূপে তাহাদের শ্রদ্ধা বর্ধিত হয়, শীল বর্ধিত হয়, শ্রুত বর্ধিত হয়, ত্যাগ-ধর্ম-প্রজ্ঞা-ধনধান্য-ক্ষেত্রবস্তু-দ্বিপদ-চতুষ্পদ-পুত্র-দার-দাসকর্মকার-পুরুষ-জ্ঞাতি-মিত্র-বান্ধব বর্ধিত হয় তাহা চিন্তা করিয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি সেই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া তিনি এই তিন মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, সিংহ-পূর্বার্ধ-কায়, উন্নত বক্ষ এবং সমবর্ত স্কন্ধ।

তিনি ওই লক্ষণসমূহসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে চক্রবর্তী রাজা হন। রাজা হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তাঁহার কোনো বস্তুরই হ্রাস হয় না; ধন-ধান্য, ক্ষেত্র-বস্তু, দ্বিপদ-চতুষ্পদ, পুত্র-দার, দাস-কর্মকার-পুরুষ, জ্ঞাতি-মিত্র-বান্ধব প্রভৃতির হ্রাস হয় না, কোনো সম্পত্তির হ্রাস হয় না। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তাঁহার কোনো বস্তুরই হ্রাস হয় না; শ্রদ্ধা, শীল, শ্রুত, ত্যাগ, প্রজ্ঞা, ইত্যাদির হ্রাস হয় না, কোনো সম্পত্তির হ্রাস হয় না। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২২৫. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

শ্রদ্ধা, শীল, শ্রুত, বুদ্ধি, ত্যাগ ইত্যাদি বহু কুশলধর্ম;
ধন-ধান্য-ক্ষেত্র-বস্তু, পুত্র-দার, চতুষ্পদ;
জ্ঞাতি মিত্র-বান্ধব, বল, বর্ণ ও সুখ, এই সমুদয়ে
কীরূপে অপরের হ্রাস না হয় তিনি ইহাই ইচ্ছা
করিয়াছিলেন এবং তাহাদের অর্থসমৃদ্ধি আকাঙ্ক্ষা
করিয়াছিলেন। তিনি পূর্ব জন্মের সুকৃতি হেতু
সুসংস্থিত সিংহ-পূর্বার্র্ধকায়, সমবর্ত-স্কন্ধ এবং
উন্নতবক্ষ হইয়াছেন এবং লক্ষণানুসারে কোনো
প্রকার হ্রাস তাঁহাকে স্পর্শ করে না।
গৃহী হইলে তাঁহার ধন-ধান্য, পুত্র-দার,
চতুষ্পদগণ বর্ধিত হয়, আকিঞ্চন হইয়া
প্রব্রজ্যা গ্রহণ করিলে তিনি অনুত্তর
অক্ষয় বোধিপ্রাপ্ত হন।

২২৬. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া হস্ত, প্রস্তর-খণ্ড, দণ্ড অথবা শস্ত্রের প্রয়োগে প্রাণীগণের প্রতি হিংসাচরণ করেন নাই, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া তিনি এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তিনি সর্বোৎকৃষ্ট রুচিসম্পন্ন হন, তাঁহার রস-বাহিনী স্নায়ুগুলি ঊর্ধ্বাগ্র হইয়া গ্রীবাদেশে জাত এবং সমভাবে বিক্ষিপ্ত।

তিনি ওই লক্ষণমণ্ডিত হইয়া গৃহবাসী হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি নীরোগ ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন হন, পূর্ণাঙ্গ নাতিশীতোষ্ণ গ্রহণীসম্পন্ন হন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া কী লাভ করেন? তিনি নীরোগ ও স্বাস্থ্যসম্পন্ন হন, পূর্ণাঙ্গ নাতিশীতোষ্ণ গ্রহণীসম্পন্ন হন, উদ্যোগ ও ধৈর্যে সমভাবাপন্ন হন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২২৭. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি হস্ত, দণ্ড, প্রস্তর-খণ্ড শস্ত্র, হত্যা-সাধন,
উৎপীড়ন অথবা তর্জন দ্বারা প্রাণীগণের প্রতি
হিংসাচরণ করেন নাই, তিনি অহিংস ছিলেন।
ওই কারণে তিনি সুগতি প্রাপ্ত হইয়া
সুকর্মপ্রসূত ফলোপভোগে আনন্দ লাভ
করেন।
এই পৃথিবীতে আগমন করিয়া তিনি
সুসংস্থিত রসবাহিনীস্নায়ু এবং সর্বোৎকৃষ্ট
রুচিসম্পন্ন হন।
তন্নিমিত্ত নিপুণ বিচক্ষণ ব্যক্তিগণ বলিয়াছিলেন :
“এই মনুষ্য বহু সুখের অধিকারী
হইবেন, তিনি গৃহীই হউন অথবা
প্রব্রজিতই হউন, এই লক্ষণ ওই সুখময়
অবস্থাসূচক।”

২২৮. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, পূর্বকালে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া বক্র, তির্যক অথবা প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিপাত করিতেন না, তিনি ঋজু ও অকপট দৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, উদারচিত্তে প্রিয় চক্ষুর দ্বারা বহুজনের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেন, সেইহেতু ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য তিনি মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিপ্রাপ্ত হইয়া স্বর্গে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। তিনি ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তিনি গাঢ় নীল নেত্র ও গো-পক্ষ্মবিশিষ্ট হন।

“তিনি ওই লক্ষণদ্বয়সমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন তাহা হইলে চক্রবর্তী রাজা হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি বহুজনের প্রিয়দর্শন হন; ব্রাহ্মণ গৃহপতিগণের, নিগম-জনপদবাসীগণের, গণক-মহামাত্রগণের, রক্ষী ও দৌবারিকগণের, অমাত্য ও পারিষদগণের, ভোজরাজগণের এবং অভিজাতবংশীয় কুমারগণের প্রিয় ও আনন্দদায়ক হন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? বহুজনের প্রিয়দর্শন হন; ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীগণের, উপাসক ও উপাসিকাগণের, দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্বগণের প্রিয় ও আনন্দ দায়ক হন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২২৯. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি বক্র, তির্যক অথবা প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিপাত করিতেন
না, তিনি ঋজু ও অকপট দৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন,
উদারচিত্তে প্রিয় চক্ষুর দ্বারা বহুজনের প্রতি দৃষ্টিপাত
করিতেন। ওই কর্মের ফলে তিনি স্বর্গে গমন
করিয়া তথায় আনন্দ অনুভব করিয়াছিলেন,
এই জগতে আসিয়া তিনি গোপক্ষ্ম ও গাঢ়নীল
নেত্রসমন্বিত ও সুদর্শন হন। দক্ষ, নিপুণ, সূক্ষ্ম
দৃষ্টিসম্পন্ন বহু লক্ষণজ্ঞ পণ্ডিতগণ তাঁহাকে “প্রিয়দর্শন”
-রূপে অভিহিত করেন। গৃহী হইয়া তিনি প্রিয়দর্শন
ও বহুজনের প্রিয় হন, যদি গৃহী না হইয়া তিনি
শ্রমণ হন, তাহা হইলে বহুজনের শোকাপনোদন
করেন।

২৩০. “যেহেতু” ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, পূর্বে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া কুশলধর্মসমূহে বহুজনপ্রমুখ হইয়াছিলেন, কায়, বাক্য ও মানসিক সদাচরণে, দান বিতরণে, শীল গ্রহণে, উপোসথ পালনে, মাতৃভক্তিতে, পিতৃভক্তিতে, শ্রমণ-ব্রাহ্মণদিগের প্রতি ভক্তিতে, কুলজ্যেষ্ঠগণের প্রতি সম্মানে, অপরাপর কুশলধর্মের বহুজনের অগ্রণী হইয়াছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিরূপ স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। তিনি ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তিনি উষ্ণীষ-শীর্ষ হন।

তিনি ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া তিনি কী লাভ করেন? বহুজন তাঁহার অনুসরণ করে, ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ, নিগম-জনপদবাসীগণ, গণক-মহামাত্রগণ, রক্ষী ও দৌবারিকগণ, অমাত্য ও পারিষদগণ, ভোজরাজগণ এবং অভিজাতবংশীয় কুমারগণ তাঁহার অনুসরণ করে। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? বহুজন তাঁহার অনুসরণ করে, ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীগণ, উপাসক-উপাসিকাগণ-দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্বগণ তাঁহার অনুসরণ করে। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২৩১. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

ধর্মচর্যাভিরত হইয়া তিনি সদাচরণে শ্রেষ্ঠ ছিলেন,
তিনি বহুজনের সহচর ছিলেন, স্বর্গে গমন করিয়া তিনি
পুণ্যফল প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। সদাচরণের
ফলভোগ করিয়া এই জগতে আসিয়া তিনি
উষ্ণীষ-শীর্ষ হইয়াছেন, লক্ষণজ্ঞগণ বলিয়াছিলেন,
“এই পুরুষ বহুজনের অগ্রগামী হইবেন। ইহলোকে
মনুষ্যের ভোগ্য বস্তুসমূহ পূর্বের ন্যায় তাঁহার নিকট
আহৃত হইবে, যদি তিনি ভূমিপতি ক্ষত্রিয় হন,
তাহা হইলে বহুজনের সেবা লাভ করিবেন। যদি
তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন, তাহা হইলে ধর্মের
জ্ঞানসম্পন্ন ও পারদর্শী হন। বহুজন তাঁহার শিক্ষায়
অনুরক্ত হইয়া তাঁহার অনুগামী হয়।”

২৩২. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, পূর্বে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া মৃষাবাদ পরিহারপূর্বক উহা হইতে বিরত ছিলেন, সত্যবাদী, সত্যাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য, প্রত্যয়যোগ্য, অবিসংবাদী ছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিরূপ স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তিনি এক-এক লোমবিশিষ্ট হন, তাঁহার ভ্রূযুগ মধ্যস্থ উর্ণ শুভ্র মৃদু তুলসন্নিভ হয়।

“তিনি ওই লক্ষণদ্বয়সমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি ব্রাহ্মণ-গৃহপতি, নিগম-জনপদবাসী, গণক-মহামাত্র, রক্ষীবর্গ, দৌবারিক, অমাত্য, পারিষদ, ভোজরাজগণ এবং সম্ভ্রান্তবংশীয় কুমারগণ ইত্যাদি বহু অনুচর লাভ করেন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ, উপাসক-উপাসিকাগণ, দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্ব ইত্যাদি বহু অনুচর লাভ করেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২৩৩. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

পূর্বজন্মে তিনি সত্যপ্রতিজ্ঞ ছিলেন, সর্বান্তঃকরণে
সরল বাক্য বলিতেন, অলীক বর্জন করিতেন,
কখনও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিতেন না, যাহা প্রকৃত,
যাহা সত্য তাহাই বলিয়া সকলকে তুষ্ট করিতেন।
তিনি ভ্রূযুগ মধ্য-জাত শ্বেত সুশুভ্র মৃদু তূলসন্নিভ
ঊর্ণবিশিষ্ট হইয়াছেন, তাঁহার এক লোমকূপ হইতে
দুইটি লোম উদ্গত হয় নাই, তাঁহার অঙ্গের প্রতি
লোমকূপ হইতে মাত্র একটি লোম উদ্গত। বহু
জন্মলক্ষণজ্ঞগণ আসিয়া বলিয়াছিলেন : বহুজন,
সুসংস্থিত লোম ও ঊর্ণবিশিষ্ট ঈদৃশ পুরুষের
সেবানিরত হইবে। গৃহী হইলেও পূর্বকৃত কর্মের
জন্য বহুজন তাঁহার অনুবর্তী হইবে, যদি তিনি
আকিঞ্চন, প্রব্রজিত, অনুত্তর বুদ্ধ হন তাহা হইলেও
বহুজন তাঁহার অনুবর্তী হয়।

২৩৪. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, পূর্বকালে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া পিশুন বাক্য পরিহার করিয়া উহা হইতে বিরত ছিলেন, এক স্থানে যাহা শ্রুত ভেদোৎপাদনের অভিপ্রায়ে তাহা অপর স্থানে প্রকাশ করিতেন না, যাহারা ভিন্ন তাহাদের মধ্যে ঐক্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, যাহারা মিত্র তাহাদের মধ্যে মৈত্রীর উৎসাহদাতা, ঐক্যকারক, ঐক্যপ্রিয়, ঐক্যানন্দ, ঐক্যোৎপাদক বাক্যের কথনকারী ছিলেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিরূপ স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তিনি চত্বারিংশৎ দন্ত ও অবিবর দন্তবিশিষ্ট হন।

“তিনি ওই লক্ষণদ্বয়সমন্বিত হইয়া যদি গৃহে বাস করেন, তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? “তাঁহার পারিষদবর্গণ্ডব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ, নিগম-জনপদবাসীগণ, গণক-মহামাত্রগণ, রক্ষীগণ, দৌবারিকগণ, সভাসদবর্গ, ভোজরাজগণ এবং অভিজাতবংশীয় কুমারগণ অভেদ্য হইয়া থাকেন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তাঁহার অনুবর্তী ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ, উপাসক-উপাসিকাগণ, দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্বগণ অভেদ্য হইয়া থাকেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২৩৫. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি মিত্রভেদকারী, ভেদপ্রবর্ধক, বিবাদোৎপাদক,
কলহ-প্রবর্ধক, অকৃত্যকারী, মিত্রতানাশক দুর্বাক্য
বলেন নাই। তিনি সর্বদা অবিবাদবর্ধক, ভিন্নের
মধ্যে ঐক্যোৎপাদক বাক্য বলিতেন। মৈত্রীসহগত
চিত্তে তিনি জনগণের কলহ অপনোদন করিয়া
আনন্দলাভ করিতেন। ওই কর্মের ফলে স্বর্গে
গমন করিয়া তিনি তথায় আনন্দলাভ করিয়াছিলেন।
এই জগতে পুনরাগমন করিয়া তিনি সুসংস্থিত
চত্বারিংশৎ সম ও অবিবর দন্তবিশিষ্ট হন। তিনি
যদি ক্ষত্রিয় হন, তাহা হইলে ভূমিপতি হন এবং
তাঁহার অনুচরবর্গ অবিরোধী হয়। যদি তিনি
শ্রমণ হন, তাহা হইলে বিরজ ও বীতমল হন
এবং তাঁহার অনুচরবর্গ অনুগত ও অচল হইয়া থাকে।

২৩৬. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, পূর্বে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া কর্কশবাক্য পরিহারপূর্বক উহা হইতে বিরত হইয়াছিলেন, যে বাক্য সদয়, শ্রুতিসুখকর, প্রেমনীয়, হৃদয়গ্রাহী, বিনীত, বহুজনের প্রীতিজনক ও মনোজ্ঞ সেইরূপ বাক্য বলিতেন, সেইহেতু ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য তিনি মরণান্তে দেহের বিনাশে স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই পৃথিবীতে আগমনপূর্বক তিনি এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হন, তিনি দীর্ঘ জিহ্বা এবং করবীকের মধুর স্বরবিশিষ্ট হন।

“ঐ লক্ষণদ্বয়-সমন্বিত হইয়া যদি তিনি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তাঁহার বাক্য সর্বজনের নিকট অভিনন্দনীয় হয়, ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ, নগর-জনপদবাসীগণ, গণক-মহামাত্রগণ, রক্ষী ও দৌবারিকগণ, অমাত্য-পারিষদগণ, ভোজরাজগণ এবং অভিজাতবংশীয় কুমারগণ তাঁহার বাক্য গ্রহণ করেন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তাঁহার বাক্য অভিনন্দনীয় হয়, ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ, উপাসক-উপাসিকাগণ, দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্বগণ তাঁহার বাক্য গ্রহণ করেন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২৩৭. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি তিরস্কার-সূচক, কলহ-জনক, অনিষ্টকর,
পীড়াদায়ক, বহুজনের ক্লেশোৎপাদক, কঠোর,
পরুষ বাক্য বলিতেন না। তিনি মধুর, সুসংহিত,
মৃদু, চিত্তরঞ্জক, হৃদয়গ্রাহী, শ্রুতিসুখকর বাক্য
বলিতেন। তিনি সুবাক্য কথনের ফল অনুভব
করিয়াছিলেন, স্বর্গে গমনপূর্বক পুণ্যফল প্রাপ্ত
হইয়াছিলেন। পরে তিনি এই জগতে আগমন
করিয়া ব্রহ্মস্বর এবং বিপুল স্থূল জিহ্বাসম্পন্ন
হইয়াছেন, তাঁহার বাক্য সর্বজনের অভিনন্দনীয়।
গৃহী হইলে তাঁহার বাক্য সুফলপ্রদ হয়, যদি
তিনি প্রব্রজিত হন তাহা হইলে বহুজনের নিকট
কথিত তাঁহার বহু বাক্য, জনগণের নিকট
আদরণীয় হয়।

২৩৮. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে, পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া তুচ্ছ প্রলাপ পরিহারপূর্বক উহা হইতে বিরত ছিলেন, তিনি কালবাদী, ভূতবাদী, ধর্মবাদী, বিনয়বাদী হইয়া যথাকালে যুক্তিপূর্ণ, সুবিভক্ত, অর্থসংহিত, মূল্যবান বাক্য বলিতেন, সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয়, বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতি লাভ করিয়া স্বর্গে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তথায় তিনি দশ বিষয়ে অন্য দেবগণকে অতিক্রম করিয়াছিলেন, দিব্য-আয়ুতে, দিব্যবর্ণে, দিব্যসুখে, দিব্যযশে, দিব্যআধিপত্যে, দিব্যরূপে, দিব্যশব্দে, দিব্যগন্ধে, দিব্যরসে, দিব্যস্পর্শে। ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমন করিয়া তিনি এই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হইয়াছেন-তিনি সিংহহনুবিশিষ্ট হইয়াছেন।

“তিনি ওই লক্ষণসমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজা চক্রবর্তী হন। রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তিনি বিরুদ্ধ ও শত্রুভাবাপন্ন মনুষ্য কর্তৃক অজেয় হন। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়। “যদি তিনি গৃহত্যাগপূর্বক প্রব্রজ্যা-অবলম্বন করেন, তাহা হইলে পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তিনি অভ্যন্তর অথবা বাহির বিরোধী শত্রুগণ কর্তৃক-রাগ, দ্বেষ অথবা মোহ কর্তৃক কিংবা শ্রমণ, ব্রাহ্মণ, দেব, মার, ব্রহ্মা অথবা জগতের অপর কাহারও কর্তৃক অজেয় হন। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২৩৯. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

তিনি তুচ্ছ প্রলাপে রত হইতেন না, মূঢ়তা প্রকাশ
করিতেন না, তিনি বাক্‌-সংযত ছিলেন, অহিতের
অপনোদন করিতেন এবং বহুজনের হিত ও
সুখকর বাক্য বলিতেন। ওইরূপ কর্ম করিয়া
এই স্থান হইতে চ্যুত হইয়া স্বর্গে গমনপূর্বক
তিনি সুকর্মের ফল লাভ করিয়াছিলেন। ওইস্থান
হইতে চ্যুত হইয়া পুনরায় এই জগতে আগমন
করিয়া সিংহ-হনুত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন। তিনি রাজা
হইয়া অপরাজেয় মনুজেন্দ্র নরাধিপ মহানুভব
হইয়া থাকেন এবং ত্রিদিবপুরে দেবরাজ ইন্দ্রের ন্যায়
বিরাজ করেন। গন্ধর্ব-অসুর-শক্র-রাক্ষস-সুরগণ
কর্তৃক তিনি পরাজিত হন না। উক্তরূপ পুরুষ
গৃহী হইলে পৃথিবীর দিক প্রতিদিক এবং বিদিকে
ওইরূপই হইয়া থাকেন।

২৪০. “যেহেতু, ভিক্ষুগণ, তথাগত পূর্বজন্মে পূর্বভবে, পূর্বনিবাসে, পূর্বকালে মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করিয়া মিথ্যা জীবনোপায় পরিহারপূর্বক সম্যক আজীব দ্বারা জীবিকার্জন করিতেন, তুলা, কংস ও মানসমন্বিত প্রবঞ্চনা, উৎকোচণ্ডবঞ্চনা-শাঠ্যরূপ বক্রগতি, এবং ছেদনবধ-বন্ধন-দস্যুতা, লুণ্ঠন ও আক্রমণ হইতে বিরত ছিলেন সেইহেতু তিনি ওই কর্মের সম্পাদন, সঞ্চয় বাহুল্য ও বিপুলতার জন্য মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হইয়াছিলেন। তিনি ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া এই জগতে আগমনপূর্বক এই দুই মহাপুরুষ-লক্ষণ প্রাপ্ত হইয়াছেন, তিনি সমদন্ত ও শভ্রোজ্জ্বল শ্বাদন্তবিশিষ্ট হইয়াছেন।

“তিনি ওই লক্ষণদ্বয়সমন্বিত হইয়া যদি গৃহবাসী হন, তাহা হইলে রাজচক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তা-প্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত হন। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মণিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতিরত্ন এবং সপ্তম রত্নস্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র-সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন। তিনি সসাগরা, উর্বর, নিষ্কলুষ, নিষ্কণ্টক, সমৃদ্ধ, স্ফীত, শান্তিপূর্ণ, মঙ্গলময় নিষ্কলঙ্ক বিশাল পৃথিবীকে বিনাদণ্ডে বিনাশস্ত্রে ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। তিনি রাজা হইয়া কী লাভ করেন? তাঁহার পরিবারবর্গ শুদ্ধচিত্ত হয়, তাঁহার পরিবারভুক্ত ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ, নগর-গ্রামবাসীগণ, গণক-মহামাত্রগণ, রক্ষীবর্গ ও দৌবারিকগণ, অমাত্য-পারিষদগণ, ভোজরাজগণ, অভিজাতবংশীয় কুমারগণ শুদ্ধচিত্ত হয়। রাজা হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।

“যদি তিনি গৃহত্যাগপূর্বক প্রব্রজ্যা-অবলম্বন করেন, তাহা হইলে পৃথিবীতে আবরন্মুক্ত অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ হন। বুদ্ধ হইয়া তিনি কী লাভ করেন? তাঁহার পরিবারবর্গ শুদ্ধ-চিত্ত হয়, তাঁহার পরিবারভুক্ত ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ, উপাসক-উপাসিকাগণ, দেবমনুষ্য-অসুর-নাগ-গন্ধর্বগণ শুদ্ধচিত্ত হয়। বুদ্ধ হইয়া তাঁহার এই লাভ হয়।” ভগবান এইরূপ বলিলেন।

২৪১. এই সম্পর্কে উক্ত হইয়াছে :

মিথ্যা জীবনোপায় পরিহারপূর্বক তিনি ন্যায়, আচার
ও ধর্মসঙ্গত বৃত্তি অবলম্বন করিতেন। অহিতের
অপনোদন করিয়া তিনি বহুজনের হিত ও সুখ
সম্পাদনে নিরত ছিলেন। নিপুণ, বিজ্ঞ, সৎপুরুষগণ
কর্তৃক প্রশংসিত কর্ম করিয়া ওই পুরুষ স্বর্গে সুখময়
ফল অনুভব করিয়াছিলেন, স্বর্গাধিপতির ন্যায়
রতি-ক্রীড়ানুযুক্ত হইয়া আনন্দিত হইয়াছিলেন।
ওইস্থান হইতে চ্যুত হইয়া মনুষ্যজন্ম লাভ করিয়া
সুকর্মের ফলস্বরূপ তিনি সমান, সুবিশুদ্ধ, সুশুভ্র
দন্ত লাভ করিয়াছেন। বহুসংখ্যক সমাগত দৈবজ্ঞ
শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগণ বলিয়াছিলেন, “এই পুরুষের
পরিবারবর্গ শুদ্ধচিত্ত হইবে তিনি বিহগপক্ষসন্নিভ
সৌম্য-শুভ্র-শুদ্ধ-উজ্জ্বল দন্তবিশিষ্ট। বিশাল পৃথিবীর
শাসনকর্তা রাজারূপে তাঁহার বহুসংখ্যক পরিবারবর্গ
শুদ্ধাচার সম্পন্ন হয়। তাহারা বলপ্রয়োগে জনপদের
পীড়নে বিরত হইয়া সকলের হিত ও সুখবিধায়ক
হয়। যদি তিনি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেন তাহা
হইলে নিষ্পাপ, বিরজ ও আবরণ মুক্ত হন, বেদনা
ও শ্রান্তিহীন হইয়া তিনি ইহলোক ও পরলোকের
প্রতি দৃষ্টিপাত করেন। তাঁহার উপদেশানুবর্তী
বহু গৃহী ও প্রব্রজিত অশুদ্ধ, বিগর্হিত, পাপের
বর্জন করেন। তিনি শুদ্ধিবেষ্টিত হইয়া থাকেন,
মালিন্য, বিঘ্ন, অমঙ্গলরূপ ক্লেশ বিনষ্ট করেন।

লক্ষণ সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [২]