২৯৬. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। এক সময় ভগবান মল্লদিগের দেশে ভ্রমণ করিতে করিতে পাঁচশত ভিক্ষুসমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত মল্লদিগের পাবা নামক নগরে উপনীত হইয়া ওইস্থানে চুন্দ নামক কর্মকারের আম্রবনে অবস্থান করিতেছিলেন।
২৯৭. ওই সময় পাবাবাসী মল্লগণের “উব্ভটক” নামক অচিরনির্মিত নতুন মন্ত্রণাগারে শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ অথবা অপর কোনো মনুষ্য বাস করে নাই। পাবার মল্লগণ শুনিল, “ভগবান মল্লদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে পঞ্চশত ভিক্ষুসমন্বিত বৃহৎ ভিক্ষুসংঘের সহিত পাবায় উপনীত হইয়া তথায় কর্মকার চুন্দের আম্রবনে অবস্থান করিতেছেন। অনন্তর পাবার মল্লগণ ভগবানের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে উপবেশন করিল। তৎপরে তাহারা ভগবানকে বলিল, “ভন্তে, এইস্থানে পাবাবাসী মল্লদিগের “উব্ভটক” নামক অচিরনির্মিত মন্ত্রণাগৃহে শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ অথবা অপর কোনো মনুষ্য বাস করে নাই। ভগবান ওইস্থান সর্বপ্রথম উপভোগ করুন। প্রথমেই ভগবান কর্তৃক অধিকৃত হইলে উহা পরে মল্লদিগের স্থায়ী সুখ ও মঙ্গল বিধায়ক হইবে।”
ভগবান মৌন দ্বারা সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন।
২৯৮. অতঃপর মল্লগণ ভগবানের সম্মতি জ্ঞাত হইয়া আসন হইতে উত্থানপূর্বক ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া মন্ত্রণাগৃহে গমনপূর্বক উহা সম্পূর্ণরূপে আস্তরণাচ্ছাদিত করিয়া আসনাদি নির্দিষ্ট করণান্তর তৈল প্রদীপ স্থাপনপূর্বক ভগবানের নিকট গমন করিল। তাঁহারা ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইল। পরে তাঁহারা ভগবানকে বলিল, “ভন্তে, মন্ত্রণাগৃহ সম্পূর্ণরূপে আস্তরণাচ্ছাদিত, আসনাদি নির্দিষ্ট, তৈলপ্রদীপ স্থাপিত, এক্ষণে ভগবানের যেইরূপ ইচ্ছা।”
২৯৯. তখন ভগবান পরিচ্ছদ পরিহিত হইয়া পাত্র ও চীবর হস্তে ভিক্ষুসংঘের সহিত মন্ত্রণাগৃহে গমন করিলেন। পাদ প্রক্ষালনান্তে কক্ষে প্রবেশপূর্বক মধ্যস্থ স্তম্ভ আশ্রয় করিয়া পূর্বমুখী হইয়া উপবেশন করিলেন। ভিক্ষুসংঘও পাদ ধৌত করিয়া কক্ষে প্রবেশপূর্বক পশ্চিমদিকস্থ ভিত্তি আশ্রয় করিয়া ভগবানকে সম্মুখে রাখিয়া পূর্বমুখী হইয়া উপবেশন করিলেন। পাবার মল্লগণও পাদ প্রক্ষালনপূর্বক কক্ষে প্রবেশ করিয়া পূর্বকদিকস্থ ভিত্তি আশ্রয় করিয়া ভগবানকে সম্মুখে রাখিয়া পশ্চিমমুখী হইয়া উপবেশন করিলেন। অতঃপর ভগবান পাবার মল্লগণকে বহুরাত্রি পর্যন্ত ধর্মকথা দ্বারা উপদিষ্ট, সমুদ্দীপ্ত, সমুত্তেজিত সম্প্রহৃষ্ট করিলেন। পরে তিনি তাহাদিগকে “বাসেট্ঠগণ, রাত্রি অবসান, এক্ষণে তোমাদের যাহা ইচ্ছা”, এই কথা বলিয়া বিদায় দিলেন।
প্রত্যুত্তরে মল্লগণ “তথাস্তু” বলিয়া আসন হইতে উত্থানপূর্বক ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণপূর্বক প্রস্থান করিলেন।
৩০০. মল্লগণের প্রস্থানের অল্পকাল পরে ভগবান নীরব ভিক্ষুসংঘের প্রতি দৃষ্টিপাত পূর্বক সারিপুত্রকে সম্বোধন করিয়া বলিলেন, “সারিপুত্র, ভিক্ষুসংঘ স্ত্যান-মিদ্ধ রহিত, তুমি ধর্মালোচনায় প্রবৃত্ত হও, আমি পৃষ্ঠদেশে বেদনা অনুভব করিতেছি, আমি উহা প্রসারিত করিব।”
উত্তরে সারিপুত্র ভগবানকে বলিলেন, “উত্তম, ভন্তে”।
তৎপরে ভগবান সংঘাটি চতুর্গুণ করিয়া বিছাইয়া পাদোপরি পাদ রক্ষাপূর্বক স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞান-সমন্বিত হইয়া মনে উত্থান-সংজ্ঞা রক্ষা করিয়া দক্ষিণ পার্শ্বে সিংহশয্যা আশ্রয় করিলেন।
৩০১. ওই সময় নিগণ্ঠ নাথপুত্র সম্প্রতি পাবায় দেহত্যাগ করিয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যুতে নিগণ্ঠগণ দ্বিধাবিভক্ত ও দ্বন্দ্ব, কলহ বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পরকে মুখাস্ত্র দ্বারা আহত করিতেছিল, “তুমি এই ধর্ম ও বিনয় অবগত নও, আমি অবগত আছি, তুমি কী প্রকারে এই ধর্ম ও বিনয় জানিবে? তুমি মিথ্যাদৃষ্টির অনুবর্তী হইয়াছ, আমি সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন, আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলিতেছি, তুমি অপ্রাসঙ্গিক কথা বলিতেছ, পূর্বে কথনীয় তুমি পশ্চাতে বলিয়াছ, পশ্চাতে কথনীয় পূর্বে বলিয়াছ, তোমার বিচার ব্যর্থ হইয়াছে, তোমার আহ্বান গৃহীত হইয়াছে, তুমি নিগৃহীত হইয়াছ, স্বকীয় দৃষ্টি পরিশুদ্ধ করো, যদি সক্ষম হও আপনাকে পাশমুক্ত করো। নাথপুত্রের অনুচর নিগণ্ঠগণ যেন পরস্পরের বিনাশে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। তাঁহার শ্বেতাম্বরধারী গৃহী শ্রাবকগণও নিগণ্ঠগণের প্রতি উদাসীন হইয়াছিল, বিরক্ত হইয়াছিল, তাহাদের বিরোধী হইয়াছিল, তাহাদের ধর্মবিনয়ের ব্যাখ্যান এতই অপটু হইয়াছিল, উহার প্রচার এতই অফলপ্রদ হইয়াছিল, লক্ষ্যে চালিত করিতে এবং শান্তি প্রদানে উহা এতই অক্ষম হইয়াছিল, যেহেতু উহা সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ঘোষিত হয় নাই এবং ভিন্নস্তূপ ও অপ্রতিশরণে পরিণত হইয়াছিল।
৩০২. অতঃপর আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভিক্ষুগণকে সম্বোধন করিলেন, বন্ধুগণ, নিগণ্ঠ নাথপুত্র সম্প্রতি পাবায় দেহত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার মৃত্যুতে নিগণ্ঠগণ দ্বিধাবিভক্ত ও দ্বন্দ্ব, কলহ, বিবাদে প্রবৃত্ত হইয়া পরস্পরকে মুখাস্ত্র দ্বারা আহত করিতেছিল, “তুমি এই ধর্ম ও বিনয় অবগত নও, আমি অবগত আছি, তুমি কী প্রকারে এই ধর্ম ও বিনয় জানিবে? তুমি মিথ্যাদৃষ্টির অনুবর্তী হইয়াছ, আমি সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন, আমি প্রাসঙ্গিক কথা বলিতেছি, তুমি অপ্রাসঙ্গিক বলিতেছ, পূর্বে কথনীয় তুমি পশ্চাতে বলিয়াছ, পশ্চাতে কথনীয় পূর্বে বলিয়াছ, তোমার বিচার ব্যর্থ হইয়াছে, তোমার আহ্বান গৃহীত হইয়াছে, তুমি নিগৃহীত হইয়াছ, স্বকীয় দৃষ্টি পরিশুদ্ধ করো, যদি সক্ষম হও আপনাকে পাশমুক্ত করো। নাথপুত্রের অনুচর নিগণ্ঠগণ যেন পরস্পরের বিনাশে প্রবৃত্ত হইয়াছিল। তাঁহার শ্বেতাম্বরধারী গৃহী শ্রাবকগণও নিগণ্ঠগণের প্রতি উদাসীন হইয়াছিল, বিরক্ত হইয়াছিল, তাহাদের বিরোধী হইয়াছিল, তাহাদের ধর্মবিনয়ের ব্যাখ্যান এতই অপটু হইয়াছিল, উহার প্রচার এতই অফলপ্রদ হইয়াছিল, লক্ষ্যে চালিত করিতে এবং শান্তি প্রদানে উহা এতই অক্ষম হইয়াছিল, যেহেতু উহা সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ঘোষিত হয় নাই এবং ভিন্নস্তূপ ও অপ্রতিশরণে পরিণত হইয়াছে। ধর্ম ও বিনয়ের সুব্যাখ্যার অভাব, উহার নিষ্ফল প্রচার, লক্ষ্যে চালিত করিতে এবং শান্তি প্রদানে উহার অক্ষমতা এবং সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ঘোষিত না হওয়া, এই সকলই ইহার কারণ। কিন্তু, বন্ধুগণ, আমাদিগের ভগবান কর্তৃক ধর্ম স্বাখ্যাত, সুপ্রচারিত, উহা লক্ষ্যে উপনীত করিতে এবং শান্তি প্রদানে সক্ষম এবং সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ঘোষিত। বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিত সাধক হয়।
ওই ধর্ম কী?
৩০৩. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এক ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে, বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিত সাধক হয়।
এক ধর্ম কী?
সর্বপ্রাণী আহারোপরি স্থিত, সংস্কারোপরি স্থিত। বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান কর্তৃক এই “এক ধর্ম” সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিত সাধক হয়।
৩০৪. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন অর্হৎ ভগবান সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক দুই ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে, বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিত সাধক হয়।
কোন কোন দুই ধর্ম?
(১) নাম ও রূপ।
(২) অবিদ্যা ও ভব-তৃষ্ণা।
(৩) ভব-দৃষ্টি ও বিভব-দৃষ্টি।
(৪) অবিবেকিতা ও অবিমৃষ্যকারিতা।
(৫) বিবেকিতা ও বিমৃষ্যকারিতা।
(৬) স্বৈরচারিতা ও পাপ-সাহচর্য।
(৭) কোমলতা ও সাধু সাহচর্য।
(৮) আপত্তি কুশলতা ও উহার প্রতিরোধ কুশলতা।
(৯) সমাপত্তি কুশলতা ও উহা হইতে পুনরুত্থান কুশলতা।
(১০) ধাতুসমূহের সম্যক জ্ঞান এবং উহাতে অভিনিবেশ।
(১১) আয়তনসমূহ এবং প্রতীত্য সমুৎপাদের সম্যক জ্ঞান।
(১২) স্থান-অস্থান কুশলতা।
(১৩) ঋজুতা ও মৃদুতা।
(১৪) ক্ষান্তি ও কোমলতা।
(১৫) মধুর বাক্য ও হৃদয়গ্রাহী আচরণ।
(১৬) করুণা ও অন্তরের পবিত্রতা।
(১৭) বিস্মৃতিশীলতা ও অনবধানতা।
(১৮) স্মৃতি ও অবহিত দৃষ্টি।
(১৯) অরক্ষিত-ইন্দ্রিয় ও মাত্রাহীন ভোজন।
(২০) রক্ষিত-ইন্দ্রিয় ও মিতাহার।
(২১) বিচারবুদ্ধি-বল ও ভাবনা-বল।
(২২) স্মৃতিবল ও সমাধি-বল।
(২৩) শমথ ও বিপশ্যনা।
(২৪) শমথ-নিমিত্ত ও প্রগ্রহ-নিমিত্ত।
(২৫) প্রগ্রহ ও অবিক্ষেপ।
(২৬) শীল-সম্পদা ও দৃষ্টি-সম্পদা।
(২৭) শীল-বিপত্তি ও দৃষ্টি-বিপত্তি।
(২৮) শীল-বিশুদ্ধি ও দৃষ্টি-বিশুদ্ধি।
(২৯) দৃষ্টি-বিশুদ্ধি ও যথাদৃষ্টি অনুযায়ী প্রয়াস।
(৩০) সংবেগ এবং সংবেগজনীয় স্থানে সংবিগ্নের আন্তরিক প্রয়াস।
(৩১) কুশলধর্মে অসন্তুষ্টিতা ও প্রয়াসের প্রয়োগে অধ্যবসায়।
(৩২) বিদ্যা ও বিমুক্তি।
(৩৩) ক্ষয়ের জ্ঞান ও পুনরাবির্ভাব নিবারণের জ্ঞান।
বন্ধুগণ, এই সকল দুই ধর্ম জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন অর্হৎ ভগবান সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে, বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে… সাধক হয়।
৩০৫. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন অর্হৎ ভগবান সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ত্রয়াত্মক ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে, বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে… সাধক হয়। ওই সকল কী কী?
(১) তিন অকুশল-মূল : লোভ, দ্বেষ ও মোহ।
(২) তিন কুশল-মূল : লোভহীনতা, দ্বেষহীনতা, ও মোহহীনতা।
(৩) তিন দুশ্চরিত : কায়-দুশ্চরিত, বাক্-দুশ্চরিত, মন-দুশ্চরিত।
(৪) তিন সুচরিত : কায়-সুচরিত, বাক্-সুচরিত, মন-সুচরিত।
(৫) তিন অকুশল বিতর্ক : কাম-বিতর্ক, ব্যাপাদ-বিতর্ক, বিহিংসা-বিতর্ক।
(৬) তিন কুশল : বিতর্ক-নৈষ্কাম্য-বিতর্ক, অব্যাপাদ-বিতর্ক, অবিহিংসা-বিতর্ক।
(৭) তিন অকুশল সংকল্প : কামসংকল্প, ব্যাপাদ-সংকল্প, বিহিংসা-সংকল্প।
(৮) তিন কুশল সংকল্প : নৈষ্কাম্য-সংকল্প, অব্যাপাদ-সংকল্প, অবিহিংসা-সংকল্প।
(৯) তিন অকুশল সংজ্ঞা : কাম-সংজ্ঞা, ব্যাপাদ-সংজ্ঞা, বিহিংসা-সংজ্ঞা।
(১০) তিন কুশল সংজ্ঞা : নৈষ্কাম্য সংজ্ঞা, অব্যাপাদ সংজ্ঞা, অবিহিংসা সংজ্ঞা।
(১১) তিন অকুশল ধাতু : কামধাতু, ব্যাপাদধাতু, বিহিংসাধাতু।
(১২) তিন কুশল ধাতু : নৈষ্কাম্য ধাতু, অব্যাপাদ ধাতু, অবিহিংসা ধাতু।
(১৩) অপর তিন ধাতু : কামধাতু, রূপধাতু, অরূপধাতু।
(১৪) অপর তিন ধাতু : রূপধাতু, অরূপধাতু, নিরোধধাতু।
(১৫) অপর তিন ধাতু : হীনধাতু, মধ্যমধাতু, প্রণীতধাতু।
(১৬) তিন তৃষ্ণা : কাম-তৃষ্ণা, ভব-তৃষ্ণা, বিভব-তৃষ্ণা।
(১৭) অপর তিন তৃষ্ণা : কাম-তৃষ্ণা, রূপ-তৃষ্ণা, অরূপ-তৃষ্ণা।
(১৮) অপর তিন তৃষ্ণা : রূপ-তৃষ্ণা, অরূপ-তৃষ্ণা, নিরোধ-তৃষ্ণা।
(১৯) তিন সংযোজন : সৎকায়দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, শীলব্রত পরামর্শ।
(২০) তিন আসব : কামাসব, ভবাসব, অবিদ্যাসব।
(২১) তিন ভব : কাম-ভব, রূপ-ভব, অরূপ-ভব।
(২২) তিন এষণা : কামেষণা, ভবেষণা, ব্রহ্মচর্যেষণা।
(২৩) তিন অহমিকা : “আমি শ্রেষ্ঠ”, “আমি সদৃশ”, “আমি হীন”।
(২৪) তিন কাল : অতীত, অনাগত, বর্তমান।
(২৫) তিন অন্ত : সৎকায় , উহার উৎপত্তি, উহার নিরোধ।
(২৬) তিন বেদনা : সুখ-বেদনা, দুঃখ-বেদনা, অদুঃখ-অসুখ বেদনা।
(২৭) তিন দুঃখতা (দুঃখময় অবস্থা) : দুঃখ (দুঃখ বেদনা), সংস্কার (জন্ম, বার্ধক্য ও মৃত্যুর জ্ঞান), বিপরিণাম।
(২৮) তিন রাশি : কুকর্ম রাশি যাহার অপরিবর্তনীয় ফল অমঙ্গল; সুকর্ম রাশি যাহার অপরিবর্তনীয় ফল মঙ্গল; অনিয়ত রাশি।
(২৯) তিন সংশয় : অতীত, অনাগত এবং বর্তমান সম্বন্ধে সংশয়, বিচিকিৎসা (বিহ্বলতা, কর্তব্যাবধারণে অসামর্থ), অসন্তুষ্টি।
(৩০) তথাগতের তিন অরক্ষ্য : বন্ধুগণ, তথাগত পরিশুদ্ধ কায়সমাচারসম্পন্ন, বাক্সমাচারসম্পন্ন, মনোসমাচারসম্পন্ন; তাঁহার এমন কোনো কায়-দুশ্চরিত, বাক্-দুশ্চরিত, মনো-দুশ্চরিত নাই যাহা অপরের নিকট গোপন করা প্রয়োজন।
(৩১) তিন কিঞ্চন (মল) : রাগ, দ্বেষ ও মোহ।
(৩২) তিন অগ্নি : রাগাগ্নি, দ্বেষাগ্নি, মোহাগ্নি।
(৩৩) অপর তিন অগ্নি : আহ্বানীয় অগ্নি, গার্হপত্য অগ্নি, দক্ষিণেয়্য অগ্নি।
(৩৪) ত্রিবিধ রূপ-সংগ্রহ : সনিদর্শন-সপ্রতিঘ রূপ, অনিদর্শন-সপ্রতিঘ রূপ, অনিদর্শন-অপ্রতিঘ রূপ।
(৩৫) তিন সংস্কার : পুণ্য-অভিসংস্কার, অপুণ্য-অভিসংস্কার, অবিক্ষোভ-অভিসংস্কার।
(৩৬) তিন পুদ্গল (পুরুষ) : শিক্ষার্থী, যাঁহার শিক্ষা সমাপ্ত হইয়াছে, যিনি উভয় শ্রেণির কোনোটিরই অন্তর্ভুক্ত নহেন।
(৩৭) তিন থের : জাতি-থের , ধর্ম-থের , সম্মতি-থের ।
(৩৮) তিন পুণ্য-ক্রিয়াবস্তু : দানময়, শীলময়, ভাবনাময়।
(৩৯) তিন প্রবর্তনা-বস্তু : যাহা দৃষ্ট, যাহা শ্রুত, যাহা শঙ্কার বিষয়ীভূত।
(৪০) কামলোকে ত্রিবিধ উৎপত্তি : বন্ধুগণ, সত্ত্বগণ আছে যাহাদের কামনা উপস্থিত ভোগ্যবস্তুতে বদ্ধ; যথা : কোনো কোনো মনুষ্য, কোনো কোনো দেব, কোনো কোনো বিনিপাতিক। ইহাই কামলোকে প্রথম উৎপত্তি। বন্ধুগণ, সত্ত্বগণ আছে যাহারা ভোগ্যের সৃষ্টি করিয়া উহার বশবর্তী হয়; যথা : নির্মাণরতি দেবগণ। ইহাই কামলোকে দ্বিতীয় উৎপত্তি। বন্ধুগণ, সত্ত্বগণ আছে যাহারা পরসৃষ্ট ভোগ্যের বশবর্তী হয়; যথা : পরনির্মিত বশবর্তী দেবগণ। ইহাই কামলোকে তৃতীয় উৎপত্তি।
(৪১) ত্রিবিধ সুখময় উৎপত্তি : বন্ধুগণ, সত্ত্বগণ আছেন যাঁহারা (পূর্বজন্মে) পুনঃপুন, সুখ উৎপাদন করিয়া এক্ষণে সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হইয়াছেন; যথা : ব্রহ্মকায়িক দেবগণ। ইহাই প্রথম সুখময় উৎপত্তি। সত্ত্বগণ আছেন যাঁহারা সুখসিক্ত, সুখানুপ্রবিষ্ট, সুখপূর্ণ, সুখ-পরিব্যাপ্ত, তাঁহারা সময়ে সময়ে উদান উচ্চারণ করেন “অহো সুখ, অহো সুখ!”; যথা : আভাস্বর দেবগণ। ইহাই দ্বিতীয় সুখময় উৎপত্তি। সত্ত্বগণ আছেন যাঁহারা সুখসিক্ত, সুখানুপ্রবিষ্ট, সুখপূর্ণ, সুখ-পরিব্যাপ্ত, তাঁহারা পরম সন্তুষ্টিসহ প্রণীত সুখ অনুভব করেন; যথা : শুভ-কৃৎস্ন দেবগণ। ইহাই তৃতীয় সুখময় উৎপত্তি।
(৪২) তিন প্রজ্ঞা : শৈক্ষ্য প্রজ্ঞা, অশৈক্ষ্য প্রজ্ঞা, নৈব শৈক্ষ্য-না অশৈক্ষ্য প্রজ্ঞা।
(৪৩) অপর তিন প্রজ্ঞা : চিন্তাময় প্রজ্ঞা, শ্রুতময় প্রজ্ঞা, ভাবনাময় প্রজ্ঞা।
(৪৪) তিন আয়ুধ : শ্রুত-আয়ুধ, প্রবিবেক-আয়ুধ, প্রজ্ঞা-আয়ুধ।
(৪৫) তিন ইন্দ্রিয় : অজ্ঞাতের জ্ঞানলাভ-ইন্দ্রিয়, জ্ঞান-ইন্দ্রিয়, পূর্ণজ্ঞান-ইন্দ্রিয়।
(৪৬) তিন চক্ষু : মাংসচক্ষু, দিব্যচক্ষু, প্রজ্ঞাচক্ষু।
(৪৭) তিন শিক্ষা : অধিশীল-শিক্ষা, অধিচিত্ত-শিক্ষা, অধিপ্রজ্ঞা-শিক্ষা।
(৪৮) তিন ভাবনা : কায়ভাবনা, চিত্তভাবনা, প্রজ্ঞাভাবনা।
(৪৯) তিন অনুত্তর : দর্শন-অনুত্তর, প্রতিপদা-অনুত্তর, বিমুক্তি-অনুত্তর।
(৫০) তিন সমাধি : সবিতর্ক সবিচার-সমাধি, অবিতর্ক বিচার মাত্র- সমাধি, অবিতর্ক-অবিচার সমাধি।
(৫১) অপর তিন সমাধি : শূন্যতা সমাধি, অনিমিত্ত সমাধি, অপ্রণিহিত সমাধি।
(৫২) ত্রিবিধ শৌচ : কায়-শৌচ, বাক্-শৌচ, মন-শৌচ।
(৫৩) ত্রিবিধ মৌনেয় : কায়-মৌনেয়, বাক্-মৌনেয়, মন-মৌনেয়।
(৫৪) ত্রিবিধ কৌশল্য : আয়-কৌশল্য, অপায়-কৌশল্য, উপায়-কৌশল্য।
(৫৫) ত্রিবিধ মদ : আরোগ্য-মদ, যৌবন-মদ, জীবন-মদ।
(৫৬) তিন আধিপত্য : আত্মাধিপত্য , লোকাধিপত্য , ধর্মাধিপত্য ।
(৫৭) তিন কথাবস্তু : অতীত সম্বন্ধে কথা “অতীতে এইরূপ হইয়াছিল”, অনাগত সম্বন্ধে কথা “ভবিষ্যতে এইরূপ হইবে”, বর্তমান সম্বন্ধে কথা “বর্তমানে এইরূপ হইয়াছে।”
(৫৮) তিন বিদ্যা : পূর্বজন্মের স্মৃতির জ্ঞানরূপ বিদ্যা, সত্ত্বগণের চ্যুতি ও উৎপত্তির জ্ঞানরূপ বিদ্যা, আসবসমূহের ক্ষয়ের জ্ঞানরূপ বিদ্যা।
(৫৯) তিন বিহার : দিব্যবিহার , ব্রহ্মবিহার , আর্যবিহার ।
(৬০) তিন প্রাতিহার্য : ঋদ্ধি প্রাতিহার্য, আদেশনা -প্রাতিহার্য, অনুশাসনী-প্রাতিহার্য।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই সকল ত্রয়াত্মক ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে, বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়।
৩০৬. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক চারি ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্র হইয়া উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিত সাধক হয়। কোন চারি ধর্ম?
(১) চারি স্মৃতি-প্রস্থান : বন্ধুগণ, ভিক্ষু উৎসাহপূর্ণ, সম্প্রজ্ঞাত, স্মৃতিমান হইয়া, জগতে অভিধ্যা-দৌর্মনস্য দমন করিয়া, কায়ে কায়ানুদর্শী হইয়া বিহার করেন; বেদনায় বেদনানুদর্র্শী হইয়া বিহার করেন; চিত্তে চিত্তানুদর্শী হইয়া বিহার করেন; ধর্মে ধর্মানুদর্শী হইয়া বিহার করেন।
(২) চারি সম্যক প্রধান : বন্ধুগণ, ভিক্ষু যাহাতে অনুৎপন্ন পাপ-অকুশলধর্ম উৎপন্ন না হয় তজ্জন্য ইচ্ছাশক্তির উৎপাদন করেন, প্রয়াস ও বীর্য প্রয়োগ করেন, সংকল্পবদ্ধ প্রযত্নের সহিত চিত্তকে দৃঢ় করেন। যাহাতে উৎপন্ন পাপ-অকুশলধর্ম প্রহীন হয়, তজ্জন্য ইচ্ছাশক্তির উৎপাদন করেন, প্রয়াস ও বীর্য প্রয়োগ করেন, সংকল্পবদ্ধ প্রযত্নের সহিত চিত্তকে দৃঢ় করেন। যাহাতে অনুৎপন্ন কুশলধর্মসমূহ উৎপন্ন হয় তজ্জন্য ইচ্ছাশক্তির উৎপাদন করেন, প্রয়াস ও বীর্য প্রয়োগ করেন, সংকল্পবদ্ধ প্রযত্নের সহিত চিত্তকে দৃঢ় করেন। যাহাতে উৎপন্ন কুশলধর্মসমূহ স্থায়ী হয়, বিশৃঙ্খল না হয়, বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, বিস্তৃত হয়, বিকশিত হয়, পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়, তজ্জন্য ইচ্ছাশক্তির উৎপাদন করেন, প্রয়াস ও বীর্য প্রয়োগ করেন, সংকল্পবদ্ধ প্রযত্নের সহিত চিত্তকে দৃঢ় করেন।
(৩) চারি ঋদ্ধিপাদ : বন্ধুগণ, ভিক্ষু ছন্দ-সমাধি প্রধান-সংস্কার সমন্নাগত ঋদ্ধি-পাদ ভাবনা করেন। চিত্ত-সমাধি-প্রধান-সংস্কার সমন্নাগত ঋদ্ধি-পাদ ভাবনা করেন। বীর্যসমাধি-প্রধান-সংস্কার সমন্নাগত ঋদ্ধি-পাদ ভাবনা করেন। মীমাংসা-সমাধি-প্রধান-সংস্কার সমন্নাগত ঋদ্ধি-পাদ ভাবনা করেন।
(৪) চারি ধ্যান : বন্ধুগণ, ভিক্ষু কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া অকুশলধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া, সবিতর্ক সবিচার বিবেকজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। বিতর্ক বিচারের উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, অবিতর্ক অবিচার সমাধিজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। প্রীতিতেও বৈরাগ্য উৎপাদন করিয়া উপেক্ষাসম্পন্ন, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া বিহার করেন; তিনি কায়ে সুখ অনুভব করেন, যে সুখ সম্বন্ধে আর্যগণ বলিয়া থাকেন “উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী” এবং এইরূপে তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। সুখ ও দুঃখ উভয়ই বর্জন করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্যের তিরোভাব সাধন করিয়া অদুঃখ অসুখ রূপ উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন।
৩০৭. (৫) চারি সমাধি-ভাবনা : বন্ধুগণ, সমাধি-ভাবনা আছে যাহা অনুশীলিত হইয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে এই জগতেই সুখ বিধায়ক হয়। সমাধি-ভাবনা আছে যাহা অনুশীলিত হইয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে জ্ঞান-দর্শন লাভ হয়। সমাধি-ভাবনা আছে যাহা অনুশীলিত হইয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান লাভ হয়। সমাধি-ভাবনা আছে যাহা অনুশীলিত হইয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে আসবের ক্ষয় হয়।
বন্ধুগণ, কী প্রকার সমাধি-ভাবনা অনুশীলিত ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে এই জগতেই সুখবিধায়ক হয়? ভিক্ষু কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া, অকুশলধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া সবিতর্ক সবিচার বিবেকজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। বিতর্ক বিচারের উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, অবিতর্ক অবিচার সমাধিজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। প্রীতিতেও বৈরাগ্য উৎপাদন করিয়া উপেক্ষাসম্পন্ন, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া বিহার করেন; তিনি কায়ে সুখ অনুভব করেন-যে সুখ সম্বন্ধে আর্যগণ বলিয়া থাকেন “উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী” এবং এইরূপে তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। সুখ ও দুঃখ উভয়ই বর্জন করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্যের তিরোভাব সাধন করিয়া অদুঃখ অসুখ রূপ অপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। ইহাই সমাধি-ভাবনা যাহা অনুশীলিত ও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইয়া এই জগতেই সুখবিধায়ক হয়। কী প্রকার সমাধি-ভাবনা অনুশীলিত হইয়া বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে জ্ঞান-দর্শন লাভ হয়? ভিক্ষু আলোক-সংজ্ঞা মনে ধারণ করেন, দিবা-সংজ্ঞাতে চিত্তকে প্রতিষ্ঠিত করেন, “যেইরূপ দিবা সেইরূপই রাত্রি, যেইরূপ রাত্রি সেইরূপই দিবা”, এই প্রকারে উন্মুক্ত অবাধ মনে সপ্রভাস চিত্ত উৎপাদন করেন। এই প্রকার সমাধি ভাবনা অনুশীলিত ও বর্ধিত হইলে জ্ঞান দর্শন লাভ হয়। কী প্রকার সমাধি-ভাবনা অনুশীলিত ও বর্ধিত হইয়া স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান লাভের সহায়ক হয়? বেদনাসমূহ, সংজ্ঞা ও বিতর্কসমূহ যথাক্রমে উৎপন্ন, স্থিত ও অস্তগত হইলে ওই সকল ভিক্ষুর বিদিত। ইহাই সমাধি-ভাবনা যাহা অনুশীলিত ও বর্ধিত হইলে স্মৃতি-সম্প্রজ্ঞান লাভ হয়। কী প্রকার সমাধি-ভাবনা অনুশীলিত ও বর্ধিত হইলে আসবসমূহের ক্ষয় সাধন হয়? ভিক্ষু পঞ্চ উপাদান স্কন্ধে উৎপত্তি-বিলয় দশা হইয়া বিহার করেন-“ইহা রূপ, ইহা রূপের উদয়, ইহা রূপের বিলয়; ইহা বেদনা, ইহা বেদনার উদয়, ইহা বেদনার বিলয়; ইহা সংজ্ঞা, ইহা সংজ্ঞার উদয়, ইহা সংজ্ঞার বিলয়, ইহা সংস্কার, ইহা সংস্কারের উদয়, ইহা সংস্কারের বিলয়; ইহা বিজ্ঞান, ইহা বিজ্ঞানের উদয়, ইহা বিজ্ঞানের বিলয়।” ইহাই সমাধি-ভাবনা যাহা অনুশীলিত ও বর্ধিত হইলে আসবসমূহের ক্ষয় সাধন হয়।
৩০৮. (৬) চারি অপ্রমাণ্য : ভিক্ষু মৈত্রী-সহগত চিত্তে এক দুই তিন, এইরূপে চতুর্দিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি ঊর্ধ্বে, অধোদিকে, তির্যকদিকে সর্বত্র সর্বলোক মৈত্রীযুক্ত এবং বিপুল, মহান, অপ্রমেয়, বৈরহীন, দ্রোহহীন, চিত্ত দ্বারা পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। করুণাসহগত চিত্তে এক দুই তিন, এইরূপে চতুর্দিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি ঊর্ধ্বে, অধোদিকে, তির্যকদিকে সর্বত্র সর্বলোক করুণাসহগত চিত্তে এবং বিপুল, মহান, অপ্রমেয়, বৈরহীন, দ্রোহহীন, চিত্ত দ্বারা পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। মুদিতা সহগত চিত্তে এক দুই তিন, এইরূপে চতুর্দিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি ঊর্ধ্বে, অধোদিকে, তির্যকদিকে সর্বত্র সর্বলোক মুদিতা সহগত চিত্তে এবং বিপুল, মহান, অপ্রমেয়, বৈরহীন, দ্রোহহীন, চিত্ত দ্বারা পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। উপেক্ষা সহগত চিত্তে এক দুই তিন, এইরূপে চতুর্দিক স্ফুরিত করিয়া বিহার করেন। এইরূপে তিনি ঊর্ধ্বে, অধোদিকে, তির্যকদিকে সর্বত্র সর্বলোক উপেক্ষাসহগত চিত্তে এবং বিপুল, মহান, অপ্রমেয়, বৈরহীন, দ্রোহহীন, চিত্ত দ্বারা পরিস্ফুরিত করিয়া বিহার করেন।
(৭) চারি অরূপ : ভিক্ষু সর্বতোভাবে রূপসংজ্ঞা অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ সংজ্ঞার অস্তগমনান্তে নানাত্ব সংজ্ঞার চিন্তা পরিহার করিয়া, “আকাশ অনন্ত” এইরূপ চিন্তা করিয়া আকাশ-অনন্ত-আয়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করেন। সর্বতোভাবে আকাশ-অনন্ত-আয়তন অতিক্রম করিয়া, “বিজ্ঞান অনন্ত” এইরূপ চিন্তা করিয়া বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করেন। বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সর্বাংশে অতিক্রম করিয়া “কিছুই নাই” এইরূপ আকিঞ্চনায়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করেন। আকিঞ্চনায়তন সর্বাংশে অতিক্রম করিয়া নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন প্রাপ্ত হইয়া বিহার করেন।
(৮) ভিক্ষু সম্যক বিচারান্তে বস্তুবিশেষের সেবা করেন, ওইরূপে বস্তুবিশেষ স্বীকার করিয়া লন, বস্তুবিশেষ বর্জন করেন, বস্তু বিশেষ দমন করেন।
৩০৯. (৯) চারি আর্যবংশ : ভিক্ষু যেকোনো প্রকার চীবরে সন্তুষ্ট হন, ওই প্রকার চীবরে সন্তুষ্টির প্রশংসা করেন, চীবর হেতু অনুপযুক্ত অসঙ্গত উপায় অবলম্বন করেন না, চীবর লাভ না হইলে বিক্ষুব্ধ হন না, হইলে উহাতে গ্রথিত হন না, মূর্ছিত হন না, অভিভূত হন না; অমঙ্গল ও পরিণামদর্শী হইয়া উহা উপভোগ করেন। উক্তরূপ সন্তুষ্টির নিমিত্ত তিনি আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন না। এইরূপে যিনি দক্ষ, অনলস, সম্প্রজ্ঞান ও স্মৃতিসমন্বিত, তিনি পুরাতন সর্বশ্রেষ্ঠ আর্যবংশে স্থিত কথিত হন। পুনশ্চ, বন্ধুগণ, ভিক্ষু যেকোনো প্রকার পিণ্ডপাতে সন্তুষ্ট হন, ওই প্রকার পিণ্ডপাতে সন্তুষ্টির প্রশংসা করেন, পিণ্ডপাত-হেতু অনুপযুক্ত অসঙ্গত উপায় অবলম্বন করেন না, পিণ্ডপাত লাভ না হইলে বিক্ষুব্ধ হন না, হইলে উহাতে গ্রথিত হন না, মূর্ছিত হন না, অভিভূত হন না; অমঙ্গল ও পরিণামদর্শী হইয়া উহা উপভোগ করেন। উক্তরূপ সন্তুষ্টির নিমিত্ত তিনি আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন না। এইরূপে যিনি দক্ষ, অনলস, সম্প্রজ্ঞান ও স্মৃতিসমন্বিত, তিনি পুরাতন সর্বশ্রেষ্ঠ আর্যবংশে স্থিত কথিত হন। পুনশ্চ, ভিক্ষু যেকোনো প্রকার বাসস্থান হেতু সন্তুষ্ট হন, ওই প্রকার বাসস্থানে সন্তুষ্টির প্রশংসা করেন, বাসস্থান হেতু অনুপযুক্ত অসঙ্গত উপায় অবলম্বন করেন না, বাসস্থান লাভ না হইলে বিক্ষুব্ধ হন না, হইলে উহাতে গ্রথিত হন না, মূর্ছিত হন না, অভিভূত হন না; অমঙ্গল ও পরিণামদর্শী হইয়া উহা উপভোগ করেন। উক্তরূপ সন্তুষ্টির নিমিত্ত তিনি আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন না। এইরূপে যিনি দক্ষ, অনলস, সম্প্রজ্ঞান ও স্মৃতিসমন্বিত, তিনি পুরাতন সর্বশ্রেষ্ঠ আর্যবংশে স্থিত কথিত হন। পুনশ্চ, ভিক্ষু প্রহানে আনন্দ লাভ করেন, প্রহাণরত হন, উহার বৃদ্ধিতে আনন্দ লাভ করে, উহার বৃদ্ধিতে রত হন, এবং উক্ত প্রহানে আনন্দ লাভ প্রহানে রতি হেতু, উহার বৃদ্ধিতে আনন্দ লাভ ও রতি হেতু আত্মপ্রশংসা ও পরগ্লানিতে রত হন না। এইরূপে যিনি দক্ষ অনলস, সম্প্রজ্ঞান ও স্মৃতিসমন্বিত, তিনি পুরাতন সর্বশ্রেষ্ঠ আর্যবংশে স্থিত কথিত হন।
৩১০. (১০) চারি প্রধান : সংবর-প্রধান, প্রহাণ-প্রধান, ভাবনা-প্রধান, অনুরক্ষণা প্রধান।
সংবর-প্রধান কী? ভিক্ষু চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া নিমিত্তগ্রাহী হন না, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না, চক্ষু ইন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে অভিধ্যা-দৌর্মনস্য রূপ যে-সকল পাপ-অকুশলধর্মসমূহের উৎপত্তি হয়, ওই সকলের সংযমে প্রবৃত্ত হন, চক্ষু-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করেন, উহাকে বশীভূত করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া নিমিত্তগ্রাহী হন না, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না, শ্রোত্র ইন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে অভিধ্যা-দৌর্মনস্য রূপ যে-সকল পাপ-অকুশলধর্মসমূহের উৎপত্তি হয়, ওই সকলের সংযমে প্রবৃত্ত হন, শ্রোত্র-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করেন, উহাকে বশীভূত করেন। নাসিকা দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া নিমিত্তগ্রাহী হন না, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না, নাসিকা ইন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে অভিধ্যা-দৌর্মনস্য রূপ যে-সকল পাপ-অকুশলধর্মসমূহের উৎপত্তি হয়, ওই সকলের সংযমে প্রবৃত্ত হন, নাসিকা-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করেন, উহাকে বশীভূত করেন। জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া নিমিত্তগ্রাহী হন না, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না, জিহ্বা ইন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে অভিধ্যা-দৌর্মনস্য রূপ যে-সকল পাপ-অকুশলধর্মসমূহের উৎপত্তি হয়, ওই সকলের সংযমে প্রবৃত্ত হন, জিহ্বা-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করেন, উহাকে বশীভূত করেন। ত্বক্ দ্বারা স্পর্শানুভব করিয়া নিমিত্তগ্রাহী হন না, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না, ত্বক-ইন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে অভিধ্যা-দৌর্মনস্য রূপ যে-সকল পাপ-অকুশলধর্মসমূহের উৎপত্তি হয়, ওই সকলের সংযমে প্রবৃত্ত হন, ত্বক-ইন্দ্রিয়কে রক্ষা করেন, উহাকে বশীভূত করেন। মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া নিমিত্তগ্রাহী হন না, অনুব্যঞ্জনগ্রাহী হন না, মনেন্দ্রিয়কে সংযত না করিলে অভিধ্যা-দৌর্মনস্যরূপ যে-সকল পাপ-অকুশলধর্মসমূহের উৎপত্তি হয় ওই সকলের সংযমে প্রবৃত্ত হন, মনেন্দ্রিয়কে রক্ষা করেন, উহাকে বশীভূত করেন। বন্ধুগণ, ইহাই সংবর-প্রধান।
প্রহাণ-প্রধান কী? ভিক্ষু উৎপন্ন কাম-বিতর্কের প্রশ্রয় দেন না, উহা বর্জন করেন, দমন করেন, উহার অন্তসাধন করেন, উহার অস্তিত্বের লোপ সাধন করেন। উৎপন্ন ব্যাপাদ-বিতর্কের প্রশ্রয় দেন না, উহা বর্জন করেন, দমন করেন, উহার অন্তসাধন করেন, উহার অস্তিত্বের লোপ সাধন করেন। উৎপন্ন বিহিংসা-বিতর্কের প্রশ্রয় দেন না, উহা বর্জন করেন, দমন করেন, উহার অন্তসাধন করেন, উহার অস্তিত্বের লোপ সাধন করেন। উৎপন্ন বিভিন্ন পাপ-অকুশল ধর্মের প্রশ্রয় দেন না, উহা বর্জন ও দমন করেন, উহার অন্তসাধন ও উহার অস্তিত্বের লোপ-সাধন করেন। বন্ধুগণ, ইহাই প্রহাণ-প্রধান।
ভাবনা-প্রধান কী? ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ, নিরোধ-নিশ্রিত ত্যাগ-পরিণামী স্মৃতি-সম্বোজ্ঝাঙ্গের ভাবনা করেন। ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ, নিরোধ-নিশ্রিত ত্যাগ-পরিণামী বীর্য-সম্বোজ্ঝাঙ্গের ভাবনা করেন। ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ, নিরোধ-নিশ্রিত ত্যাগ-পরিণামী প্রীতি-সম্বোজ্ঝাঙ্গের ভাবনা করেন। ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ, নিরোধ-নিশ্রিত ত্যাগ-পরিণামী প্রশ্রব্ধি-সম্বোজ্ঝাঙ্গের ভাবনা করেন। ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ, নিরোধ-নিশ্রিত ত্যাগ-পরিণামী সমাধি-সম্বোজ্ঝাঙ্গের ভাবনা করেন। ভিক্ষু বিবেক, বিরাগ, নিরোধ-নিশ্রিত ত্যাগ-পরিণামী উপেক্ষা-সম্বোজ্ঝাঙ্গের ভাবনা করেন। বন্ধুগণ, ইহাই ভাবনা প্রধান।
অনুরক্ষণা প্রধান কী? ভিক্ষু উৎপন্ন উত্তম সমাধি-নিমিত্ত সযত্নে রক্ষা করেন; যথা : অস্থি-সংজ্ঞা, পূয-সংজ্ঞা, বিনীল-সংজ্ঞা, বিচ্ছিদ্র-সংজ্ঞা, স্ফীত-সংজ্ঞা। বন্ধুগণ, ইহাই অনুরক্ষণা প্রধান।
(১১) চারি জ্ঞান : ধর্ম-জ্ঞান, অন্বয়-জ্ঞান, পরিচ্ছেদ-জ্ঞান, সম্মতি-জ্ঞান।
(১২) অপর চারি জ্ঞান : দুঃখ জ্ঞান, সমুদয জ্ঞান, নিরোধ জ্ঞান, মার্গ-জ্ঞান।
(১৩) চারি স্রোতাপত্তি : অঙ্গণ্ডসৎপুরুষের সাহচর্য, সদ্ধর্মশ্রবণ, প্রণালিবদ্ধ চিন্তাধারা, ধর্মের সর্বাঙ্গীন অনুশীলন।
৩১১. (১৪) চারি স্রোতাপন্নের অঙ্গ : আর্যশ্রাবক বুদ্ধে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হন, “ইনিই সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অনুত্তর দম্য-পুরুষ-সারথি, দেব ও মনুষ্যের শাস্তা, ভগবান বুদ্ধ।” ধর্মে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হন, “ধর্ম ভগবান কর্তৃক সুপ্রচারিত, উহা সাংদৃষ্টিক, অবিলম্বে ফলপ্রসূ, আসিয়া দেখিবার নিমিত্ত সাদরে আহ্বানকারী, নির্বাণের পথ প্রদর্শনকারী, উহা বিজ্ঞগণ কর্তৃক স্ব স্ব অন্তরে অনুভূতি-সাপেক্ষ, সংঘে অবিচলিত শ্রদ্ধাসম্পন্ন হন, “ভগবানের শ্রাবকসংঘ সুপ্রতিপন্ন, ঋজু-প্রতিপন্ন, ন্যায়-প্রতিপন্ন, সামীচি-প্রতিপন্ন, উহা চারি পুরুষ-যুগল এবং অষ্ট পুরুষ-পুদ্গল সমন্নিত, তাঁহারা আহুতির যোগ্য, সৎকারের যোগ্য, দক্ষিণার যোগ্য, অঞ্জলি-করণীয়, জগতের অনুত্তর পুণ্যক্ষেত্র।” তাঁহারা আর্য, কান্ত, অখণ্ড, অচ্ছিদ্র, অশবল, অকল্মাষ, মুক্তিদায়ী, বিজ্ঞ-প্রশংসিত, নিষ্কলঙ্ক, সমাধি-সংবর্তনিক শীলসমন্বিত।
(১৫) চারি শ্রামণ্য-ফল : স্রোতাপত্তি-ফল, সকৃদাগামী-ফল, অনাগামী-ফল, অর্হত্ত্ব-ফল।
(১৬) চারি ধাতু : পৃথিবী-ধাতু, আপ-ধাতু, তেজ-ধাতু, বায়ু-ধাতু।
(১৭) চারি আহার : কবলিঙ্কার (কবলী-করণীয়) আহার, স্থূল অথবা সূক্ষ্ম; দ্বিতীয় আহার স্পর্শ; তৃতীয় আহার মনোসঞ্চেতনা; চতুর্থ আহার বিজ্ঞান।
(১৮) চারি বিজ্ঞান-স্থিতি : বন্ধুগণ, যখন বিজ্ঞান আশ্রয়স্থান লাভ করিয়া স্থিত হয়, তখন রূপলগ্ন, রূপাবলম্বন, রূপ-প্রতিষ্ঠিত, সুখান্বেষী হইয়া উহা বিকাশ, বৃদ্ধি ও বিপুলতা প্রাপ্ত হয়। বেদনা-লগ্ন বেদনাবলম্বন, বেদনা-প্রতিষ্ঠিত, সুখান্বেষী হইয়া উহা বিকাশ, বৃদ্ধি ও বিপুলতা প্রাপ্ত হয়। সংজ্ঞা-লগ্ন সংজ্ঞাবলম্বন, সংজ্ঞা-প্রতিষ্ঠিত, সুখান্বেষী হইয়া উহা বিকাশ, বৃদ্ধি ও বিপুলতা প্রাপ্ত হয়। সংস্কার-লগ্ন, সংস্কারাবলম্বন, সংস্কার-প্রতিষ্ঠিত, সুখান্বেষী হইয়া উহা বিকাশ, বৃদ্ধি ও বিপুলতা প্রাপ্ত হয়।
(১৯) চারি অগতি-গমন : ছন্দ-অগতি, দ্বেষ-অগতি, মোহ-অগতি, ভয়-অগতি।
(২০) চারি তৃষ্ণোৎপাদ ; চীবর হেতু-ভিক্ষুর তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। পিণ্ডপাত হেতু ভিক্ষুর তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। শয়নাসন-হেতু ভিক্ষুর তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়। ভবিষ্যৎ জন্ম অথবা উচ্ছেদ-হেতু ভিক্ষুর তৃষ্ণা উৎপন্ন হয়।
(২১) চারি প্রতিপদ (অগ্রগতির পরিমাণ)-যখন প্রতিপদ আয়াস-সাধ্য এবং অভিজ্ঞা মন্দ, প্রতিপদ আয়াসসাধ্য এবং অভিজ্ঞা ক্ষিপ্র, প্রতিপদ সহজ-সাধ্য এবং অভিজ্ঞা মন্দ, প্রতিপদ সহজসাধ্য এবং অভিজ্ঞা ক্ষিপ্র।
(২২) অপর চারি প্রতিপদ : অক্ষম প্রতিপদ, ক্ষম প্রতিপদ, দম প্রতিপদ, শম প্রতিপদ।
(২৩) চারি ধর্মপদ : অনভিধ্যা ধর্মপদ, অব্যাপাদ ধর্মপদ, সম্যক স্মৃতি ধর্মপদ, সম্যক সমাধি ধর্মপদ।
(২৪) চারি ধর্ম সমাদান : এক প্রকার যাহা বর্তমানে দুঃখদায়ী এবং ভবিষ্যতে দুঃখবিপাকসম্পন্ন। এক প্রকার যাহা বর্তমানে দুঃখময় এবং ভবিষ্যতে সুখবিপাকসম্পন্ন। এক প্রকার যাহা বর্তমানে সুখময় এবং ভবিষ্যতে দুঃখবিপাকসম্পন্ন। এক প্রকার যাহা বর্তমানে সুখময় এবং ভবিষ্যতে সুখবিপাকসম্পন্ন।
(২৫) চারি ধর্মস্কন্ধ : শীলস্কন্ধ, সমাধি-স্কন্ধ, প্রজ্ঞা-স্কন্ধ, বিমুক্তি-স্কন্ধ।
(২৬) চারি বল : বীর্যবল, স্মৃতি-বল, সমাধি-বল, প্রজ্ঞা-বল।
(২৭) চারি অধিষ্ঠান (সংকল্প) : প্রজ্ঞা-অধিষ্ঠান, সত্য-অধিষ্ঠান, ত্যাগ-অধিষ্ঠান, উপশম-অধিষ্ঠান।
৩১২. (২৮) চারি প্রশ্ন-ব্যাকরণ : একাংশ ব্যাকরণ, প্রতিপ্রশ্নের দ্বারা ব্যাকরণ, বিশ্লেষণ দ্বারা ব্যাকরণ, উত্তরদানের অনুপযুক্তরূপে ব্যাকরণ।
(২৯) চারি কর্ম : এক প্রকার কর্ম কৃষ্ণ, কৃষ্ণ-বিপাক, এক প্রকার শুক্ল, শুক্লবিপাক; এক প্রকার কৃষ্ণ-শুক্ল, কৃষ্ণ-শুক্লবিপাক; এক প্রকার অকৃষ্ণ-অশুক্ল, অকৃষ্ণ-অশুক্ল-বিপাক যাহা কর্মক্ষয়কারক।
(৩০) চারি সাক্ষাৎ করণীয় ধর্ম : স্মৃতি দ্বারা সাক্ষাৎ করণীয় পূর্বনিবাস (পূর্ব জন্ম); চক্ষু দ্বারা সাক্ষাৎ করণীয় চ্যুতি ও উৎপত্তি; কায় দ্বারা সাক্ষাৎ করণীয় অষ্টবিমোক্ষ, প্রজ্ঞা দ্বারা সাক্ষাৎ করণীয় আসব ক্ষয়।
(৩১) চারি ওঘ : কাম-ওঘ, ভব-ওঘ, দৃষ্টি-ওঘ, অবিদ্যা-ওঘ।
(৩২) চারি যোগ : কাম-যোগ, ভব-যোগ, দৃষ্টি-যোগ, অবিদ্যা-যোগ।
(৩৩) চারি বিসংযোগ : কর্মযোগ-বিসংযোগ, ভবযোগ-বিসংযোগ, দৃষ্টি-যোগ-বিসংযোগ, অবিদ্যাযোগ-বিসংযোগ।
(৩৪) চারি গ্রন্থি : অভিধ্যা কায়-গ্রন্থি, ব্যাপাদ কায়-গ্রন্থি, শীলব্রত-পরামর্শ কায়-গ্রন্থি, (“ইহাই সত্য” রূপ) নিবিশ্যবাদ কায়-গ্রন্থি।
(৩৫) চারি উপাদান : কাম-উপাদান, দৃষ্টি-উপাদান, শীলব্রত-উপাদান, আত্মবাদ-উপাদান।
(৩৬) চারি যোনি : অণ্ডজ-যোনি, জরায়ুজ-যোনি, সংস্বেদজ-যোনি, ঔপপাতিক যোনি।
(৩৭) চারি গর্ভ-অবক্রান্তি (গর্ভপ্রবেশ) : কেহ অজ্ঞাতসারে মাতৃকুক্ষিতে প্রবেশ করে, অজ্ঞাতসারে তথায় অবস্থান করে, অজ্ঞাতসারে তথা হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়। ইহাই প্রথম গর্ভ-অবক্রান্তি। পুনশ্চ, কেহ জ্ঞাতসারে মাতৃকুক্ষিতে প্রবেশ করে, অজ্ঞাতসারে তথায় অবস্থান করে, অজ্ঞাতসারে উহা হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়। ইহাই দ্বিতীয় গর্ভ-অবক্রান্তি। পুনশ্চ, কেহ জ্ঞাতসারে মাতৃকুক্ষিতে প্রবেশ করে, জ্ঞাতসারে তথায় অবস্থান করে, অজ্ঞাতসারে উহা হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়। ইহাই তৃতীয় গর্ভ-অবক্রান্তি। পুনশ্চ, কেহ জ্ঞাতসারে মাতৃকুক্ষিতে প্রবেশ করে, জ্ঞাতসারে তথায় অবস্থান করে, জ্ঞাতসারে উহা হইতে নিষ্ক্রান্ত হয়। ইহাই চতুর্থ গর্ভ-অবক্রান্তি।
(৩৮) চারি আত্মভাব (ব্যক্তিত্ব) প্রতিলাভ : এক প্রকার যাহাতে আত্ম-সঞ্চেতনা ক্রিয়াশীল হয়, পর-সঞ্চেতনা নহে; এক প্রকার যাহাতে পর-সঞ্চেতনাই ক্রিয়াশীল হয়, আত্ম-সঞ্চেতনা নহে; এক প্রকার যাহাতে আত্ম-সঞ্চেতনা ও পর-সঞ্চেতনা উভয়ই ক্রিয়াশীল হয়; এক প্রকার যাহাতে উভয় সঞ্চেতনার কোনোটিই ক্রিয়াশীল হয় না।
৩১৩. (৩৯) চারি দক্ষিণা-বিশুদ্ধি : দক্ষিণা যাহা দায়ক দ্বারা শুদ্ধান্তঃকরণে দত্ত কিন্তু প্রতিগ্রাহক দ্বারা শুদ্ধান্তঃকরণে গৃহীত নহে; দক্ষিণা যাহা প্রতিগ্রাহক দ্বারা শুদ্ধীকৃত কিন্তু দায়ক দ্বারা নহে; দক্ষিণা যাহা দায়ক ও প্রতিগ্রাহক কাহারও কর্তৃক শুদ্ধীকৃত নহে; দক্ষিণা যাহা দায়ক ও প্রতিগ্রাহক উভয় কর্তৃক শুদ্ধীকৃত।
(৪০) চারি সংগ্রহ-বস্তু : দান, প্রিয়বাক্য, অর্থচর্যা, সমামাত্মতা।
(৪১) চারি অনার্য বাক্-সমাচার : মৃষা-বাদ, পিশুন-বাক্য, কর্কশ-বাক্য, তুচ্ছ প্রলাপ।
(৪২) চারি আর্য বাক্-সমাচার : মৃষাবাদ হইতে বিরতি, পিশুন বাক্য হইতে বিরতি, কর্কশ বাক্য হইতে বিরতি, তুচ্ছ প্রলাপ হইতে বিরতি।
(৪৩) অপর চারি অনার্য বাক্-সমাচার : অদৃষ্টের দৃষ্টরূপে ঘোষণা, অশ্রুতের শ্রুতরূপে ঘোষণা, অননুভূতের অনুভূতরূপে ঘোষণা, অবিজ্ঞাতের বিজ্ঞাতরূপে ঘোষণা।
(৪৪) অপর চারি আর্য বাক্-সমাচার : অদৃষ্টের অদৃষ্টরূপে ঘোষণা, অশ্রুতের অশ্রুতরূপে ঘোষণা, অননুভূতের অননুভূতরূপে ঘোষণা, অবিজ্ঞাতের অবিজ্ঞাতরূপে ঘোষণা।
(৪৫) অপর চারি অনার্য বাক্-সমাচার : দৃষ্টের অদৃষ্টরূপে ঘোষণা; শ্রুতের অশ্রুতরূপে ঘোষণা, অনুভূতের অননুভূতরূপে ঘোষণা, বিজ্ঞাতের অবিজ্ঞাতরূপে ঘোষণা।
(৪৬) অপর চারি আর্য বাক্-সমাচার : দৃষ্টের দৃষ্টরূপে ঘোষণা, শ্রুতের শ্রুতরূপে ঘোষণা, অনুভূতের অনুভূতরূপে ঘোষণা, বিজ্ঞাতের বিজ্ঞাতরূপে ঘোষণা।
৩১৪. (৪৭) চারি পুদ্গল : কেহ আত্মপীড়ক ও আত্মপীড়নানুযুক্ত হন। কেহ পরপীড়ক ও পরপীড়নানুযুক্ত হন। কেহ আত্মপীড়ক, আত্মপীড়নানুযুক্ত এবং পরপীড়ক, পরপীড়নানুযুক্ত হন। কেহ আত্মপীড়কও হন না, আত্মপীড়নানুযুক্তও হন না; পরপীড়কও হন না, পরপীড়নানুযুক্তও হন না। ওইরূপ পুরুষ আত্মপীড়ক ও পরপীড়ক না হইয়া এই জগতেই তৃষ্ণাহীন, নির্বৃত, শীতিভূত, সুখ-প্রতিসংবেদী হইয়া ব্রহ্মার ন্যায় অবস্থান করেন।
(৪৮) অপর চারি পুদ্গল : কেহ আত্মহিতে রত থাকেন, পরহিতে নহে। কেহ পরহিতে রত থাকেন, আত্মহিতে নহে। কেহ আত্মহিতেও রত নহেন, পরহিতেও নহে। কেহ আত্মহিতেও রত, পরহিতেও রত।
(৪৯) অপর চারি পুদ্গল : তমোগুণাচ্ছন্ন তমণ্ডপরায়ণ; তমোগুণাচ্ছন্ন জ্যোতি-পরায়ণ; জ্যোতি-সমাপন্ন, তমো-পরায়ণ; জ্যোতি-সমাপন্ন-জ্যোতি-পরায়ণ।
(৫০) অপর চারি পুদ্গল : অচল শ্রমণ, পদ্ম-শ্রমণ, পুণ্ডরীক-শ্রমণ, সুকুমার-শ্রমণ।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই চারি ধর্ম সম্যকরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়।
প্রথম ভাণবার সমাপ্ত।
৩১৫. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক পঞ্চ ধর্ম সম্যকরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়। কোন কোন পঞ্চ ধর্ম?
(১) পঞ্চস্কন্ধ : রূপ-স্কন্ধ, বেদনা-স্কন্ধ, সংজ্ঞা-স্কন্ধ, সংস্কার-স্কন্ধ, বিজ্ঞান-স্কন্ধ।
(২) পঞ্চ উপাদান-স্কন্ধ : রূপ-উপাদান-স্কন্ধ, বেদনা-উপাদান-স্কন্ধ, সংজ্ঞা-উপাদান-স্কন্ধ, সংস্কার-উপাদান-স্কন্ধ, বিজ্ঞান-উপাদান-স্কন্ধ।
(৩) পঞ্চ কামগুণ : চক্ষুবিজ্ঞেয় রূপ যাহা ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয়, কাম-জড়িত, রঞ্জনীয়; শ্রোত্রবিজ্ঞেয় শব্দ যাহা ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয়, কাম-জড়িত, রঞ্জনীয়; ঘ্রাণবিজ্ঞেয় গন্ধ, যাহা ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয়, কাম-জড়িত, রঞ্জনীয়; জিহ্বাবিজ্ঞেয় রস, যাহা ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয়, কাম-জড়িত, রঞ্জনীয়; কায়বিজ্ঞেয় স্পর্শ যাহা ইষ্ট, কান্ত, মনাপ, প্রিয় কামজড়িত, রঞ্জনীয়।
(৪) পঞ্চগতি : নিরয়, তির্যকযোনি, প্রেতযোনি, মনুষ্য, দেব।
(৫) পঞ্চ মাৎসর্য : আবাস-মাৎসর্য, কুল-মাৎসর্য, লাভ-মাৎসর্য, বর্ণ-মাৎসর্য, ধর্ম-মাৎসর্য।
(৬) পঞ্চ নীবরণ : কামচ্ছন্দ, ব্যাপাদ, স্ত্যান-মিদ্ধ, ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য, বিচিকিৎসা।
(৭) পঞ্চ অবরভাগীয় সংযোজন : সৎকায়দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, শীলব্রত-পরামর্শ, কামচ্ছন্দ, ব্যাপাদ।
(৮) পঞ্চ ঊর্ধ্বভাগীয় সংযোজন : রূপ-রাগ, অরূপ-রাগ, মান, ঔদ্ধত্য, অবিদ্যা।
(৯) পঞ্চ শিক্ষাপদ : প্রাণাতিপাত হইতে বিরতি, অদত্তের গ্রহণ হইতে বিরতি, ব্যভিচার হইতে বিরতি, মৃষাবাদ হইতে বিরতি, সুরাদি পানরূপ প্রমাদ হইতে বিরতি।
৩১৬. (১০) চারি অসম্ভাব্য : ক্ষীণাসব ভিক্ষু যে ইচ্ছা করিয়া প্রাণিহত্যা করিবেন তাহা অসম্ভব। অদত্তের গ্রহণরূপ চৌর্য তাঁহার পক্ষে অসম্ভব। মৈথুন ধর্মের সেবা তাঁহার পক্ষে অসম্ভব। সংকল্পপূর্বক মিথ্যা-ভাষণ তাঁহার পক্ষে অসম্ভব। পূর্বে গৃহস্থ জীবনে তিনি যেইরূপ করিয়াছিলেন সেইরূপ সঞ্চিত পার্থিব সম্পত্তির পরিভোগ তাঁহার পক্ষে অসম্ভব।
(১১) পঞ্চ ব্যসন : জ্ঞাতি-ব্যসন, ভোগ-ব্যসন, রোগ-ব্যসন, শীল-ব্যসন, দৃষ্টি-ব্যসন। সত্ত্বগণ জ্ঞাতি-ব্যসন হেতু অথবা ভোগ-ব্যসন হেতু অথবা রোগ-ব্যসন হেতু মরণান্তে দেহের বিনাশে দুর্গতিসম্পন্ন বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হয় না। শীল-ব্যসন হেতু অথবা দৃষ্টি-ব্যসন হেতু তাহারা মরণান্তে দেহের বিনাশে দুর্গতিসম্পন্ন বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হয়।
(১২) পঞ্চ সম্পদ : জ্ঞাতি-সম্পদ, ভোগ-সম্পদ, আরোগ্য-সম্পদ, শীল-সম্পদ, দৃষ্টি-সম্পদ। সত্ত্বগণ জ্ঞাতি সম্পদ হেতু অথবা ভোগ-সম্পদ হেতু অথবা আরোগ্য-সম্পদ হেতু মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয় না। শীল-সম্পদ হেতু অথবা দৃষ্টি-সম্পদ হেতু তাহারা মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়।
(১৩) দুঃশীলের শীলচ্যুতির পঞ্চ দুর্বিপাক। দুঃশীল শীলভ্রষ্ট প্রমাদ হেতু মহৎ ভোগহানিতে উপনীত হয়। ইহাই দুঃশীলের শীলবিপত্তির প্রথম দুর্বিপাক। পুনশ্চ, তাহার পাপাচরণ জনসমাজে ঘোষিত হয়। ইহাই দ্বিতীয় দুর্বিপাক। পুনশ্চ, সে যেকোনো পরিষদেই গমন করুক-ক্ষত্রিয় পরিষদ, ব্রাহ্মণ-পরিষদ, গৃহপতি-পরিষদ, অথবা শ্রমণ-পরিষদ, তথায় সে আত্মপ্রত্যয়হীন ও হতবুদ্ধি হইয়া অবস্থান করে। ইহাই তৃতীয় দুর্বিপাক। পুনশ্চ, সে প্রমত্ত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ইহাই চতুর্থ দুর্বিপাক। পুনশ্চ, সে মরণান্তে দেহের বিনাশে দুর্গতিসম্পন্ন বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়। ইহাই পঞ্চম দুর্বিপাক।
(১৪) শীলবানের শীলসম্পদের পঞ্চবিধ উপকারিতা। শীলবান শীলসম্পন্ন অপ্রমাদ-হেতু মহান ভোগের অধিকারী হন। ইহাই প্রথম উপকারিতা। পুনশ্চ, তাঁহার যশ জনসমাজে ঘোষিত হয়। ইহা দ্বিতীয় উপকারিতা। পুনশ্চ, তিনি যেকোনো পরিষদেই গমন করুন, ক্ষত্রিয়-পরিষদ, ব্রাহ্মণ-পরিষদ, গৃহপতি-পরিষদ, অথবা শ্রমণ-পরিষদ, তথায় তিনি আত্মপ্রত্যয়সম্পন্ন ও অবিচলিত হইয়া অবস্থান করেন। ইহা তৃতীয় উপকারিতা। পুনশ্চ, তিনি অপ্রমত্ত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হন। ইহা চতুর্থ উপকারিতা। পুনশ্চ, তিনি মরণান্তে দেহের বিনাশে সুগতিসম্পন্ন স্বর্গলোকে উৎপন্ন হন। ইহা পঞ্চম উপকারিতা।
(১৫) অপরের সংশোধনেচ্ছু সংশোধক ভিক্ষু পাঁচটি ধর্ম আপনার মধ্যে রক্ষা করিয়া অপরের সংশোধনে প্রবৃত্ত হইবেন, “যথাসময়ে বলিব, অসময়ে নহে; যাহা সত্য তাহাই বলিব, যাহা কল্পিত তাহা নহে; মৃদুভাবে বলিব, পরুষভাবে নহে; অর্থ-সংহিত বাক্য বলিব, অনর্থ-সংহিত নহে; মৈত্রীচিত্ত-যুক্ত হইয়া বলিব, দ্বেষ-যুক্ত চিত্তে নহে।” অপরের সংশোধনেচ্ছু সংশোধক ভিক্ষু এই পাঁচটি ধর্ম আপনার মধ্যে রক্ষা করিয়া অপরের সংশোধনে প্রবৃত্ত হইবেন।
৩১৭. (১৬) পঞ্চ প্রধানীয় অঙ্গ। ভিক্ষু শ্রদ্ধাবান হন, তথাগতের বুদ্ধত্বে শ্রদ্ধা রক্ষা করেন, “ইনিই সেই ভগবান অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয় দম্য-পুরুষ-সারথি দেব ও মনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবান।” তিনি স্বাস্থ্যসম্পন্ন, ব্যাধিমুক্ত, নাতিশীতোষ্ণ মধ্যবর্তী পরিপাক-শক্তিসম্পন্ন যাহা প্রধানের উপযোগী। তিনি অশঠ অমায়াবী তিনি শাস্তার নিকট, অথবা পণ্ডিতগণের নিকট অথবা স-ব্রহ্মচারীগণের নিকট আপনাকে যথারূপে প্রকাশ করেন। তিনি অকুশলধর্মসমূহের দূরীকরণের জন্য, কুশলধর্মসমূহের উদ্বোধনের জন্য আরব্ধবীর্য হইয়া বিহার করেন, তিনি উদ্যমসম্পন্ন, দৃঢ়-পরাক্রম এবং কুশলধর্মসমূহে স্বীয় কর্তব্যে ঔদাসীন্যহীন। তিনি বস্তুসমূহের উৎপত্তি ও ক্ষয়ের জ্ঞান এবং সর্বদুঃখনাশী আর্য তীক্ষ্ণ অন্তদৃষ্টিজনক প্রজ্ঞাসমন্বিত হন।
৩১৮. (১৭) পঞ্চ শুদ্ধাবাস। অবিহ, অতপ্প, সুদতস্স, সুদস্সী, অকনিট্ঠ।
(১৮) পঞ্চ অনাগামী। যিনি আয়ুষ্কাল পূর্ণ হইবার পূর্বে পরিনির্বাণ লাভ করেন, যিনি আয়ুষ্কাল পূর্ণ হইলে পরিনির্বাণ লাভ করেন, যিনি অনায়াসে পরিনির্বাণ লাভ করেন, যিনি আয়াসান্তে পরিনির্বাণ লাভ করেন, যিনি “ঊর্ধ্বস্রোত” হইয়া অকনিট্ঠ দেবলোকগামী হন।
৩১৯. (১৯) চিত্তের পঞ্চ অন্তরায়। ভিক্ষু শাস্তার প্রতি সংশয় ও দ্বিধাসম্পন্ন হন, শাস্তার প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাহীন হন। যেই ভিক্ষু শাস্তার প্রতি ওইরূপভাব পোষণ করেন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য এবং প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের প্রথম অন্তরায়। পুনশ্চ, ভিক্ষু ধর্মে সংশয় ও দ্বিধাযুক্ত হন, ধর্মের প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাহীন হন। যেই ভিক্ষু ধর্মের প্রতি ওইরূপভাব পোষণ করেন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য এবং প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের দ্বিতীয় অন্তরায়। ভিক্ষুসংঘের প্রতি সংশয় ও দ্বিধাযুক্ত হন, সংঘের প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাহীন হন। যেই ভিক্ষুসংঘের প্রতি ওইরূপভাব পোষণ করেন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য এবং প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের তৃতীয় অন্তরায়। ভিক্ষু শিক্ষায় সংশয় ও দ্বিধাযুক্ত হন, শিক্ষার প্রতি অনুরাগ ও শ্রদ্ধাহীন হন। যেই ভিক্ষু শিক্ষার প্রতি ওইরূপভাব পোষণ করেন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য এবং প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের চতুর্থ অন্তরায়। ভিক্ষু স-ব্রহ্মচারীগণের প্রতি কুপিত হন, বিরক্ত হন, ক্ষুব্ধ হন, নির্মম হন। যেই ভিক্ষু এইরূপভাবাপন্ন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য এবং প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের পঞ্চম অন্তরায়।
৩২০. (২০) চিত্তের পঞ্চ বন্ধন। ভিক্ষু কামে রাগহীন হন না, ছন্দহীন হন না, প্রেমহীন হন না, পিপাসাহীন হন না, প্রদাহহীন হন না, তৃষ্ণাহীন হন না। যেই ভিক্ষু এইরূপ ভাবাপন্ন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য, প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের প্রথম বন্ধন। পুনশ্চ, ভিক্ষু কায়ে রাগহীন হন না, ছন্দহীন হন না, প্রেমহীন হন না, পিপাসাহীন হন না, প্রদাহহীন হন না, তৃষ্ণাহীন হন না। যেই ভিক্ষু এইরূপ ভাবাপন্ন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য, প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহা চিত্তের দ্বিতীয় বন্ধন। ভিক্ষু রূপে রাগহীন হন না, ছন্দহীন হন না, প্রেমহীন হন না, পিপাসাহীন হন না, প্রদাহহীন হন না, তৃষ্ণাহীন হন না। যেই ভিক্ষু এইরূপভাবাপন্ন তাঁহার চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য, প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহা চিত্তের তৃতীয় বন্ধন। ভিক্ষু যথেচ্ছা উদরপূর্তি করিয়া ভোজনপূর্বক শয্যা আশ্রয় করিয়া পার্শ্ব হইতে পার্শ্বান্তরে আবর্তন সুখ, এবং তন্দ্রাসুখে অনুযুক্ত হইয়া অবস্থান করেন। এইরূপ ভিক্ষুর চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য, প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহা চিত্তের চতুর্থ বন্ধন। পুনশ্চ, ভিক্ষু কোনো দেবকুলভুক্ত হইবার অভিপ্রায় করিয়া ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন, “এই ব্রত, শীল, তপ অথবা ব্রহ্মচর্য্য দ্বারা আমি মহাশক্তিশালী অথবা অপেক্ষাকৃত অল্পশক্তিসম্পন্ন দেবতা হইব।” এইরূপ ভিক্ষুর চিত্ত আতপ্য, অনুযোগ, সাতত্য, প্রধানের দিকে নমিত হয় না। ইহাই চিত্তের পঞ্চম বন্ধন।
(২১) পঞ্চ ইন্দ্রিয় : চক্ষু-ইন্দ্রিয়, শ্রোত্র-ইন্দ্রিয়, ঘ্রাণ-ইন্দ্রিয়, জিহ্বা-ইন্দ্রিয়, কায়-ইন্দ্রিয়।
(২২) অপর পঞ্চ ইন্দ্রিয় : সুখ-ইন্দ্রিয়, দুঃখ-ইন্দ্রিয়, সৌমনস্য-ইন্দ্রিয়, দৌর্মনস্য-ইন্দ্রিয়, উপেক্ষা-ইন্দ্রিয়।
(২৩) অপর পঞ্চ ইন্দ্রিয় : শ্রদ্ধা-ইন্দ্রিয়, বীর্যইন্দ্রিয়, স্মৃতি-ইন্দ্রিয়, সমাধি-ইন্দ্রিয়, প্রজ্ঞা-ইন্দ্রিয়।
৩২১. (২৪) পঞ্চ নিঃসরণীয়ধাতু। ভিক্ষু যখন অভিনিবেশসহকারে পার্থিব ভোগসমূহকে নিরীক্ষণ করেন, তখন তাঁহার চিত্ত ওই সকলের দিকে ধাবিত হয় না, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে না, উহাতে স্থিত হয় না, উহাতে লগ্ন হয় না; কিন্তু যখন তিনি নৈষ্কাম্যে অভিনিবিষ্ট হন, তখন তাঁহার চিত্ত নৈষ্কাম্যের দিকে ধাবিত হয়, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে, উহাতে স্থিত হয়, উহাতে লগ্ন হয়; তাঁহার অনলীন, সুভাবিত, উদ্দীপিত, কাম হইতে বিসংযুক্ত চিত্ত কামহেতু উৎপন্ন আসব, বিঘাত, প্রদাহ হইতে মুক্ত হয়, তিনি ওইরূপ বেদনা অনুভব করেন না। ইহাই কাম হইতে নিঃসরণ কথিত হয়। পুনশ্চ, ভিক্ষু যখন অভিনিবেশ সহকারে ব্যাপাদকে নিরীক্ষণ করেন, তখন তাঁহার চিত্ত উহার দিকে ধাবিত হয় না, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে না, উহাতে স্থিত হয় না, উহাতে লগ্ন হয় না; কিন্তু যখন তিনি অব্যাপাদে অভিনিবিষ্ট হন, তখন তাঁহার চিত্ত অব্যাপাদের দিকে ধাবিত হয়, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে, উহাতে স্থিত হয়, উহাতে লগ্ন হয়; তাঁহার অনলীন, সুভাবিত, উদ্দীপিত, ব্যাপাদ হইতে বিসংযুক্ত চিত্ত ব্যাপাদ হেতু উৎপন্ন আসব, বিঘাত, প্রদাহ হইতে মুক্ত হয়, তিনি ওইরূপ বেদনা অনুভব করেন না। ইহা ব্যাপাদ হইতে নিঃসরণ কথিত হয়। পুনশ্চ, ভিক্ষু যখন অভিনিবেশ সহকারে বিহিংসাকে নিরীক্ষণ করেন, তখন তাঁহার চিত্ত উহার দিকে ধাবিত হয় না, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে না, উহাতে স্থিত হয় না, উহাতে লগ্ন হয় না; কিন্তু যখন তিনি অবিহিংসাতে অভিনিবিষ্ট হন, তখন তাঁহার চিত্ত অবিহিংসার দিকে ধাবিত হয়, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে, উহাতে স্থিত হয়, উহাতে লগ্ন হয়; তাঁহার অনলীন, সুভাবিত, উদ্দীপিত, বিহিংসা হইতে বিসংযুক্ত চিত্ত বিহিংসা হেতু উৎপন্ন আসব, বিঘাত, প্রদাহ হইতে মুক্ত হয়, তিনি ওইরূপ বেদনা অনুভব করেন না। ইহা বিহিংসা হইতে নিঃসরণ কথিত হয়। পুনশ্চ, ভিক্ষু যখন অভিনিবেশসহকারে রূপকে নিরীক্ষণ করেন, তখন তাঁহার চিত্ত উহার দিকে ধাবিত হয় না, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে না, উহাতে স্থিত হয় না, উহাতে লগ্ন হয় না; কিন্তু যখন তিনি অরূপে অভিনিবিষ্ট হন, তখন তাঁহার চিত্ত অরূপের দিকে ধাবিত হয়, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে, উহাতে স্থিত হয়, উহাতে লগ্ন হয়; তাঁহার অনলীন, সুভাবিত, উদ্দীপিত, রূপ হইতে বিসংযুক্ত চিত্ত রূপ হেতু উৎপন্ন আসব, বিঘাত, প্রদাহ হইতে মুক্ত হয়, তিনি ওইরূপ বেদনা অনুভব করেন না। ইহা রূপ হইতে নিঃসরণ কথিত হয়। পুনশ্চ, ভিক্ষু যখন অভিনিবেশসহকারে আত্ম-বাদকে (সৎকায়) নিরীক্ষণ করেন, তখন তাঁহার চিত্ত উহার দিকে ধাবিত হয় না, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে না, উহাতে স্থিত হয় না, উহাতে লগ্ন হয় না; কিন্তু যখন তিনি আত্ম-বাদের নিরোধে অভিনিবিষ্ট হন, তখন তাঁহার চিত্ত আত্মবাদ-নিরোধের দিকে ধাবিত হয়, উহাতে প্রসন্নতা লাভ করে, উহাতে স্থিত হয়, উহাতে লগ্ন হয়; তাঁহার অনলীন, সুভাবিত, উদ্দীপিত, আত্মবাদ হইতে বিসংযুক্ত চিত্ত আত্মবাদ হইতে উৎপন্ন আসব, বিঘাত, প্রদাহ হইতে মুক্ত হয়, তিনি ওইরূপ বেদনা অনুভব করেন না। ইহা আত্মবাদ হইতে নিঃসরণ কথিত হয়।
৩২২. (২৫) পঞ্চ বিমুক্তি-আয়তন। ভিক্ষুকে শাস্তা অথবা কোনো গুরুস্থানীয় সব্রহ্মচারী ধর্মোপদেশ দান করেন। শাস্তা অথবা উক্তরূপ সব্রহ্মচারী যেইরূপ ভাবে ভিক্ষুকে উপদেশ দেন, ভিক্ষু সেইরূপভাবেই উহা হইতে অর্থ ও ধর্ম সংগ্রহ করেন। এইরূপে অর্থ ও ধর্ম সংগ্রহের ফলে তাঁহার প্রামোদ্যের উৎপত্তি হয়, প্রমুদিতের প্রীতি উৎপত্তি হয়, প্রীতিসংযুক্তের চিত্ত শান্ত হয়, শান্তচিত্ত সুখ-বেদনা অনুভব করে, সুখীর চিত্ত সমাধি লাভ করে। ইহাই প্রথম বিমুক্তি-আয়তন। পুনশ্চ, শাস্তা অথবা উক্তরূপ কোনো সব্রহ্মচারী ভিক্ষুকে ধর্মদেশনা না করিলেও ভিক্ষু ধর্ম যেইরূপ শ্রবণ করিয়াছেন এবং উহা হৃদয়ে ধারণ করিয়াছেন সেইরূপই বিস্তৃতভাবে অপরকে উপদেশ দেন। উহা হইতে পূর্বোক্তরূপে তিনি অর্থ ও ধর্ম সংগ্রহ করেন। ফলে তাঁহার প্রামোদ্যের উৎপত্তি হয়, প্রমুদিতের প্রীতি উৎপন্ন হয়, প্রীতি-সংযুক্তের চিত্ত শান্ত হয়, শান্তচিত্ত সুখানুভব করে, সুখীর চিত্ত সমাধিস্থ হয়। ইহা দ্বিতীয় বিমুক্তি-আয়তন। পুনশ্চ, শাস্তা অথবা উক্তরূপ কোনো সব্রহ্মচারী ভিক্ষুকে ধর্মদেশনা না করিলেও, এবং ভিক্ষু স্বয়ং পূর্বোক্তরূপে অপরকে ধর্মদেশনা না করিলেও তৎকর্তৃক যথাশ্রুত এবং যথাধৃত ধর্ম তিনি আবৃত্তি করেন, উহা হইতে পূর্বোক্তরূপে তিনি অর্থ ও ধর্ম সংগ্রহ করেন। ফলে তাঁহার প্রামোদ্যের উৎপত্তি হয়, প্রমুদিতের প্রীতি উৎপন্ন হয়, প্রীতিসংযুক্তের চিত্ত শান্ত হয়, শান্তচিত্ত সুখানুভব করে, সুখীর চিত্ত সমাধিস্থ হয়। ইহা তৃতীয় বিমুক্তি-আয়তন। পুনশ্চ, ভিক্ষুকে শাস্তা অথবা কোনো সব্রহ্মচারী ধর্মদেশনা না করিলেও এবং ভিক্ষু পূর্বোক্তরূপে অপরকে ধর্মদেশনা না করিলেও, এবং তৎকর্তৃক যথাশ্রুত এবং যথাধৃত ধর্ম তিনি আবৃত্তি না করিলেও, তিনি উহাকে চিন্তার বিষয়ীভূত করেন, ধ্যানের বিষয়ীভূত করেন, উহাতে একাগ্রচিত্ত হন। এইরূপ করিয়া উহা হইতে অর্থ ও ধর্ম সংগ্রহ করেন। ফলে তাঁহার প্রামোদ্যের উৎপত্তি হয়, প্রমুদিতের প্রীতি উৎপন্ন হয়, প্রীতি-সংযুক্তের চিত্ত শান্ত হয়, শান্তচিত্ত সুখানুভব করে, সুখীর চিত্ত সমাধিস্থ হয়। ইহা চতুর্থ বিমুক্তি-আয়তন। পুনশ্চ, ভিক্ষুকে শাস্তা অথবা কোনো সব্রহ্মচারী ধর্মদেশনা না করিলেও, এবং ভিক্ষু পূর্বোক্তরূপে অপরকে ধর্মদেশনা না করিলেও, এবং তৎকর্তৃক যথাশ্রুত এবং যথাধৃত ধর্ম তিনি আবৃত্তি না করিলেও, তিনি উহাকে চিন্তা ও ধ্যানের বিষয়ীভূত না করিলেও এবং উহাতে একাগ্রচিত্ত না হইলেও, কোনো এক সমাধি নিমিত্ত তৎকর্তৃক সুগৃহীত, সুমনসীকৃত, সুপ্রচারিত হয় এবং প্রজ্ঞা দ্বারা সুপ্রতিবিদ্ধ হয়। এইরূপে তিনি উহা হইতে অর্থ ও ধর্ম সংগ্রহ করেন। ফলে তাঁহার প্রামোদ্যের উৎপত্তি হয়, প্রমুদিতের প্রীতি উৎপন্ন হয়, প্রীতি-সংযুক্তের চিত্ত শান্ত হয়, শান্তচিত্ত সুখানুভব করে, সুখীর চিত্ত সমাধিস্থ হয়। ইহা পঞ্চম বিমুক্তি আয়তন।
(২৬) পঞ্চ বিমুক্তি-পরিপাচনীয়-সংজ্ঞা। অনিত্য-সংজ্ঞা, অনিত্যে দুঃখ-সংজ্ঞা, দুঃখে অনাত্ম-সংজ্ঞা, প্রহাণ-সংজ্ঞা, বিরাগ-সংজ্ঞা।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই পঞ্চ ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। বিবাদে প্রবৃত্ত না হইয়া সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিত সাধক হয়।
৩২৩. জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ছয় ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যগণের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়। কোন কোন ছয় ধর্ম?
(১) ছয় আধ্যাত্মিক আয়তন। চক্ষু-আয়তন, শ্রোত্র-আয়তন, ঘ্রাণ-আয়তন, জিহ্বা-আয়তন, কায়-আয়তন, মন-আয়তন।
(২) ছয় বাহির-আয়তন। রূপ-আয়তন, শব্দ-আয়তন, গন্ধ-আয়তন, রস-আয়তন, স্পর্শ-আয়তন, ধর্ম-আয়তন।
(৩) ছয় বিজ্ঞান-কায়। চক্ষু-বিজ্ঞান, শ্রোত্র-বিজ্ঞান, ঘ্রাণ-বিজ্ঞান, জিহ্বা-বিজ্ঞান, কায়-বিজ্ঞান, মনো-বিজ্ঞান।
(৪) ছয় স্পর্শ-কায়। চক্ষু-সংস্পর্শ, শ্রোত্র-সংস্পর্শ, ঘ্রাণ-সংস্পর্শ, জিহ্বা-সংস্পর্শ, কায়-সংস্পর্শ, মনো-সংস্পর্শ।
(৫) ছয় বেদনা-কায়। চক্ষু সংস্পর্শজ বেদনা, শ্রোত্র সংস্পর্শজ বেদনা, ঘ্রাণ সংস্পর্শজ বেদনা, জিহ্বা সংস্পর্শজ বেদনা, কায় সংস্পর্শজ বেদনা, মনো সংস্পর্শজ বেদনা।
(৬) ছয় সংজ্ঞা-কায়। রূপ-সংজ্ঞা, শব্দ-সংজ্ঞা, গন্ধ-সংজ্ঞা, রস-সংজ্ঞা, স্পর্শ-সংজ্ঞা, ধর্ম-সংজ্ঞা।
(৭) ছয় সঞ্চেতনা-কায়। রূপ-সঞ্চেতনা, শব্দ-সঞ্চেতনা, গন্ধ-সঞ্চেতনা, রস-সঞ্চেতনা, স্পর্শ-সঞ্চেতনা, ধর্ম-সঞ্চেতনা।
(৮) ছয় তৃষ্ণা-কায়। রূপ-তৃষ্ণা, শব্দ-তৃষ্ণা, গন্ধ-তৃষ্ণা, রস-তৃষ্ণা, স্পর্শ-তৃষ্ণা, ধর্ম-তৃষ্ণা।
৩২৪. (৯) ছয় অগৌরব। ভিক্ষু শাস্তার প্রতি ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন। ধর্মে, সংঘে, শিক্ষায়, অপ্রমাদে, স্বাগত সম্ভাষণে ওইরূপ ভাবাপন্ন হইয়া বিহার করেন।
(১০) ছয় গৌরব। ভিক্ষু শাস্তার প্রতি ভক্তিসহকারে ঔদ্ধত্য হীন হইয়া বিহার করেন। ধর্মে, সংঘে, শিক্ষায়, অপ্রমাদে, স্বাগত সম্ভাষণে ওইরূপ ভাবাপন্ন হইয়া বিহার করেন।
(১১) ছয় সৌমনস্য-উপবিচার। ভিক্ষু চক্ষুর দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া সৌমনস্য-স্থানীয় রূপ বিচার করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া সৌমনস্য-স্থানীয় শব্দ বিচার করেন। ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া সৌমনস্য-স্থানীয় গন্ধ বিচার করেন। জিহ্বার দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া সৌমনস্য-স্থানীয় রস বিচার করেন। কায় দ্বারা স্প্রষ্টব্য স্পর্শ করিয়া সৌমনস্য-স্থানীয় স্পর্শ বিচার করেন। মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া সৌমনস্য-স্থানীয় ধর্ম বিচার করেন।
(১২) ছয় দৌর্মনস্য-উপবিচার। ভিক্ষু চক্ষুর দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া দৌর্মনস্য-স্থানীয় রূপ বিচার করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া দৌর্মনস্য-স্থানীয় শব্দ বিচার করেন। ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া দৌর্মনস্য-স্থানীয় গন্ধ বিচার করেন। জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া দৌর্মনস্য-স্থানীয় রস বিচার করেন। কায় দ্বারা স্প্রষ্টব্য স্পর্শ করিয়া দৌর্মনস্য-স্থানীয় স্পর্শ বিচার করেন। মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া দৌর্মনস্য-স্থানীয় ধর্ম বিচার করেন।
(১৩) ছয় উপেক্ষা-উপবিচার। চক্ষুর দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া উপেক্ষা স্থানীয় রূপ বিচার করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া উপেক্ষা স্থানীয় শব্দ বিচার করেন। ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া উপেক্ষা স্থানীয় গন্ধ বিচার করেন। জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া উপেক্ষা স্থানীয় রস বিচার করেন। কায় দ্বারা স্প্রষ্টব্য স্পর্শ করিয়া উপেক্ষা স্থানীয় স্পর্শ বিচার করেন। মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া উপেক্ষা-স্থানীয় ধর্ম বিচার করেন।
(১৪) ছয় প্রকার ভ্রাত্রীয় জীবন যাপন। সব্রহ্মচারীগণের প্রতি ভিক্ষুর প্রকাশ্যে অথবা গোপনে কৃত মৈত্রী-সহগত কায়িক কর্ম নিঃসংশয়িতরূপে প্রতিপন্ন হয়। ইহা ভ্রাত্রীয় জীবনযাপন যাহা প্রীতি, শ্রদ্ধা, মিলন, শান্তি, সমন্বয় ও ঐক্যের প্রবর্তক। পুনশ্চ, ভিক্ষুর উক্তপ্রকার মৈত্রী-সহগত বাচনিক কর্ম নিঃসংশয়িতরূপে প্রতিপন্ন হয়। ইহা ভ্রাত্রীয় জীবনযাপন যাহা প্রীতি, শ্রদ্ধা, মিলন, শান্তি, সমন্বয় ও ঐক্যের প্রবর্তক। পুনশ্চ, ভিক্ষুর মৈত্রী-সহগত মানসিক কর্ম নিঃসংশয়িতরূপে প্রতিপন্ন হয়। ইহাও ভ্রাত্রীয় জীবনযাপন যাহা প্রীতি, শ্রদ্ধা, মিলন, শান্তি, সমন্বয় ও ঐক্যের প্রবর্তক। পুনশ্চ, ভিক্ষু ধর্মানুসারে ধর্মণ্ডব্ধ সর্ব প্রকারে লাভ, এমনকি ভিক্ষাপাত্রে পতিত অন্ন পর্যন্ত নিরপেক্ষভাবে শীলবান, সব্রহ্মচারীগণের সহিত সমভাবে ভোগ করেন। ইহাও ভ্রাত্রীয় জীবনযাপন যাহা প্রীতি, শ্রদ্ধা, মিলন, শান্তি, সমন্বয় ও ঐক্যের প্রবর্তক। পুনশ্চ, ভিক্ষু সব্রহ্মচারীগণের প্রতি প্রকাশ্যে অথবা গোপনে আর্য, কান্ত, অখণ্ড, অচ্ছিদ্র, অশবল, অকল্মাষ, মুক্তি-দায়ী, বিজ্ঞ-প্রশংসিত, নিষ্কলঙ্ক, সমাধি-সংবর্তনিক শীলসমন্বিত হন। ইহাও ভ্রাত্রীয় জীবন যাপন যাহা প্রীতি, শ্রদ্ধা, মিলন, শান্তি, সমন্বয় ও ঐক্যের প্রবর্তক। পুনশ্চ, ভিক্ষু যে আর্যদৃষ্টি উহার অনুগামীকে সম্যক দুঃখ-ক্ষয়ের দিকে চালিত করে, সব্রহ্মচারীগণের প্রতি প্রকাশ্যে অথবা গোপনে সেইরূপ দৃষ্টি-সমন্বিত হইয়া বিহার করেন। ইহাও ভ্রাত্রীয় জীবন যাপন যাহা প্রীতি, শ্রদ্ধা, মিলন, শান্তি, সমন্বয় ও ঐক্যের প্রবর্তক।
৩২৫. (১৫) ছয় বিবাদ-মূল। ভিক্ষু ক্রোধস্বভাবসম্পন্ন ও বিদ্বেষের বশবর্তী হন। এইরূপে তিনি শাস্তার প্রতি, ধর্মের প্রতি, সংঘের প্রতি, ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন, তাঁহার শিক্ষাও সম্পূর্ণ হয় না। এইরূপে তিনি সংঘে বিবাদেরজনক হন, এবং ওই বিবাদ বহুজনের অসুখ, অহিত এবং অনর্থকর হয়, দেবমনুষ্যের অহিতকর ও দুঃখকর হয়। বন্ধুগণ, যদি আপনারা আপনাদিগের মধ্যে অথবা বাহিরে এইরূপ বিবাদের মূল দর্শন করেন, তাহা হইলে আপনারা উহার দূরীকরণের নিমিত্ত যত্নবান হইবেন। যদি আপনারা ওইরূপ বিবাদের মূল দর্শন না করেন, তাহা হইলে যাহাতে ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইবেন। এইরূপে উক্ত প্রকার বিবাদের মূল দূরীভূত হয় এবং ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি হয় না। পুনশ্চ, ভিক্ষু কাপট্যের প্রশ্রয় দেন এবং বিদ্বেষপরায়ণ হন। এইরূপে তিনি শাস্তার প্রতি, ধর্মের প্রতি, সংঘের প্রতি, ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন, তাঁহার শিক্ষাও সম্পূর্ণ হয় না। এইরূপে তিনি সংঘে বিবাদেরজনক হন, এবং ওই বিবাদ বহুজনের অসুখ, অহিত এবং অনর্থকর হয়, দেবমনুষ্যের অহিতকর ও দুঃখকর হয়। বন্ধুগণ, যদি আপনারা আপনাদিগের মধ্যে অথবা বাহিরে এইরূপ বিবাদের মূল দর্শন করেন, তাহা হইলে আপনারা উহার দূরীকরণের নিমিত্ত যত্নবান হইবেন। যদি আপনারা ওইরূপ বিবাদের মূল দর্শন না করেন, তাহা হইলে যাহাতে ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইবেন। এইরূপে উক্ত প্রকার বিবাদের মূল দূরীভূত হয় এবং ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি হয় না। ভিক্ষু ঈর্ষা ও মাৎসর্যপরায়ণ হন। এইরূপে তিনি শাস্তার প্রতি, ধর্মের প্রতি, সংঘের প্রতি, ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন, তাঁহার শিক্ষাও সম্পূর্ণ হয় না। এইরূপে তিনি সংঘে বিবাদেরজনক হন, এবং ওই বিবাদ বহুজনের অসুখ, অহিত এবং অনর্থকর হয়, দেবমনুষ্যের অহিতকর ও দুঃখকর হয়। বন্ধুগণ, যদি আপনারা আপনাদিগের মধ্যে অথবা বাহিরে এইরূপ বিবাদের মূল দর্শন করেন, তাহা হইলে আপনারা উহার দূরীকরণের নিমিত্ত যত্নবান হইবেন। যদি আপনারা ওইরূপ বিবাদের মূল দর্শন না করেন, তাহা হইলে যাহাতে ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইবেন। এইরূপে উক্ত প্রকার বিবাদের মূল দূরীভূত হয় এবং ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি হয় না। ভিক্ষু শঠ ও মায়াবী হন। এইরূপে তিনি শাস্তার প্রতি, ধর্মের প্রতি, সংঘের প্রতি, ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন, তাহার শিক্ষাও সম্পূর্ণ হয় না। এইরূপে তিনি সংঘে বিবাদের জনক হন, এবং ওই বিবাদ বহুজনের অসুখ, অহিত এবং অনর্থকর হয়, দেবমনুষ্যের অহিতকর ও দুঃখকর হয়। বন্ধুগণ, যদি আপনারা আপনাদিগের মধ্যে অথবা বাহিরে এইরূপ বিবাদের মূল দর্শন করেন, তাহা হইলে আপনারা উহার দূরীকরণের নিমিত্ত যত্নবান হইবেন। যদি আপনারা ওইরূপ বিবাদের মূল দর্শন না করেন, তাহা হইলে যাহাতে ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইবেন। এইরূপে উক্ত প্রকার বিবাদের মূল দূরীভূত হয় এবং ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি হয় না। ভিক্ষু পাপেচ্ছা ও মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হন। এইরূপে তিনি শাস্তার প্রতি, ধর্মের প্রতি, সংঘের প্রতি, ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন, তাঁহার শিক্ষাও সম্পূর্ণ হয় না। এইরূপে তিনি সংঘে বিবাদেরজনক হন, এবং ওই বিবাদ বহুজনের অসুখ, অহিত এবং অনর্থকর হয়, দেবমনুষ্যের অহিতকর ও দুঃখকর হয়। বন্ধুগণ, যদি আপনারা আপনাদিগের মধ্যে অথবা বাহিরে এইরূপ বিবাদের মূল দর্শন করেন, তাহা হইলে আপনারা উহার দূরীকরণের নিমিত্ত যত্নবান হইবেন। যদি আপনারা ওইরূপ বিবাদের মূল দর্শন না করেন, তাহা হইলে যাহাতে ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইবেন। এইরূপে উক্ত প্রকার বিবাদের মূল দূরীভূত হয় এবং ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি হয় না। ভিক্ষু বিষয়াসক্ত হন, ওই আসক্তিতে দৃঢ়রূপে লগ্ন হন, উহা হইতে নিঃসরণে অসমর্থ হন। যে ভিক্ষু ওইরূপ ভাবাপন্ন, তিনি শাস্তা, ধর্ম ও সংঘের প্রতি ভক্তিহীন হইয়া ঔদ্ধত্যসহকারে বিহার করেন, তাঁহার শিক্ষাও পরিপূর্ণতা লাভ করে না। তিনি সংঘে বিবাদের জনক হন, এবং ওই বিবাদ বহুজনের অসুখ, অহিত ও অনর্থকর হয়, দেবমনুষ্যের অহিতকর ও দুঃখকর হয়। যদি আপনারা আপনাদিগের মধ্যে অথবা বাহিরে এইরূপ বিবাদের মূল দর্শন করেন তাহা হইলে আপনারা উহার দূরীকরণের নিমিত্ত যত্নবান হইবেন। যদি আপনারা ওইরূপ বিবাদের মূল দর্শন না করেন, তাহা হইলে যাহাতে ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি না হয় তজ্জন্য যত্নবান হইবেন। এইরূপে উক্ত প্রকার বিবাদের মূল দূরীভূত হয় এবং ভবিষ্যতে উহার উৎপত্তি হয় না।
(১৬) ছয় ধাতু। পৃথিবী-ধাতু, আপ-ধাতু, তেজ-ধাতু, বায়ু-ধাতু, আকাশ-ধাতু, বিজ্ঞান-ধাতু।
৩২৬. (১৭) ছয় নিঃসরণীয়ধাতু। ভিক্ষু এইরূপ বলিতে পারেন, “মৈত্রী হইতে উৎপন্ন আমার চিত্তবিমুক্তি, বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত। অথচ ব্যাপাদ আমার চিত্তকে অভিভূত করিয়া রহিয়াছে।” তাঁহাকে বলিতে হইবে, “এইরূপ নহে, আয়ুষ্মান এইরূপ বলিবেন না, ভগবানের অপবাদ করিবেন না, ভগবানের অপবাদ করা উচিত নয়, ভগবান কখনোই এইরূপ বাক্যের সমর্থন করিবেন না, ইহা ভিত্তিহীন এবং অনর্থিত।” মৈত্রী-উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি, বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত; অথচ ব্যাপাদ চিত্তকে অভিভূত করিয়া অবস্থান করিবে, ইহা অসম্ভব। মৈত্রী হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি, ইহাই ব্যাপাদের নির্গমন। ভিক্ষু এইরূপ বলিতে পারেন, “করুণা হইতে উৎপন্ন আমার চিত্তবিমুক্তি বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত। অথচ বিহিংসা আমার চিত্তকে অভিভূত করিয়া রহিয়াছে।” তাঁহাকে বলিতে হইবে, “এইরূপ নহে, আয়ুষ্মান এইরূপ বলিবেন না, ভগবানের অপবাদ করিবেন না, ভগবানের অপবাদ করা উচিত নয়, ভগবান কখনোই এইরূপ বাক্যের সমর্থন করিবেন না, ইহা ভিত্তিহীন এবং অনর্থিত।” করুণা হইতে উদ্ভূত চিত্ত বিমুক্তি, বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত; অথচ বিহিংসা চিত্তকে অভিভূত করিয়া অবস্থান করিবে, ইহা অসম্ভব। করুণা হইতে উদ্ভূত চিত্ত বিমুক্তি, ইহাই বিহিংসার নির্গমন। ভিক্ষু এইরূপ বলিতে পারেন, “মুদিতা হইতে উৎপন্ন আমার চিত্তবিমুক্তি বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত। অথচ অরতি আমার চিত্তকে অভিভূত করিয়া রহিয়াছে।” তাঁহাকে বলিতে হইবে, “এইরূপ নহে, আয়ুষ্মান এইরূপ বলিবেন না, ভগবানের অপবাদ করিবেন না, ভগবানের অপবাদ করা উচিত নয়, ভগবান কখনোই এইরূপ বাক্যের সমর্থন করিবেন না, ইহা ভিত্তিহীন এবং অনর্থিত।” মুদিতা হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত; অথচ অরতি চিত্তকে অভিভূত করিয়া অবস্থান করিবে, ইহা অসম্ভব। মুদিতা হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি, ইহাই অরতির নির্গমন। ভিক্ষু এইরূপ বলিতে পারেন, “উপেক্ষা হইতে উদ্ভূত আমার চিত্তবিমুক্তি, বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত। অথচ রাগ আমার চিত্তকে অভিভূত করিয়া রহিয়াছে।” তাঁহাকে বলিতে হইবে, “এইরূপ নহে, আয়ুষ্মান এইরূপ বলিবেন না, ভগবানের অপবাদ করিবেন না, ভগবানের অপবাদ করা উচিত নয়, ভগবান কখনোই এইরূপ বাক্যের সমর্থন করিবেন না, ইহা ভিত্তিহীন এবং অনর্থিত।” উপেক্ষা হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি, বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত। অথচ রাগ চিত্তকে অভিভূত করিয়া অবস্থান করিবে, ইহা অসম্ভব। উপেক্ষা হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি, ইহাই রাগের নির্গমন। ভিক্ষু এইরূপ বলিতে পারেন, “অনিমিত্ত হইতে উদ্ভূত আমার চিত্তবিমুক্তি, বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত। অথচ নিমিত্তানুসারী বিজ্ঞান আমার চিত্তকে অধিকার করিয়া রহিয়াছে।” তাঁহাকে এইরূপ বলিতে হইবে, “এইরূপ নহে, আয়ুষ্মান এইরূপ বলিবেন না, ভগবানের অপবাদ করিবেন না, ভগবানের অপবাদ করা উচিত নয়, ভগবান কখনোই এইরূপ বাক্যের সমর্থন করিবেন না, ইহা ভিত্তিহীন এবং অনর্থিত। অনিমিত্ত হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি বিকশিত, অনুশীলিত, আয়ত্তীকৃত, প্রতিষ্ঠিত, অনুষ্ঠিত, বর্ধিত, সুপরিচালিত, অথচ নিমিত্তানুসারী বিজ্ঞান চিত্তকে অধিকার করিয়া থাকিবে, ইহা অসম্ভব। অনিমিত্ত হইতে উদ্ভূত চিত্তবিমুক্তি, ইহাই সর্বনিমিত্তের নির্গমন। ভিক্ষু এইরূপ বলিতে পারেন, “আমি আছি” এই সংজ্ঞা আমার নিকট বিরক্তিকর। “আমি বিদ্যমান” এইরূপ সংজ্ঞাতে আমি গুরুত্বের আরোপ করি না। তথাপি বিচিকিৎসা, এবং সংশয়রূপ শল্য আমার চিত্তকে অভিভূত করিয়া রহিয়াছে।” তাঁহাকে বলিতে হইবে, “এইরূপ নহে, আয়ুষ্মান এইরূপ বলিবেন না, ভগবানের অপবাদ করিবেন না, ভগবানের অপবাদ করা উচিত নয়, ভগবান কখনোই এইরূপ বাক্যের সমর্থন করিবেন না, ইহা ভিত্তিহীন এবং অনর্থিত। “আমি আছি” এই সংজ্ঞা বিরক্তিকর, “আমি বিদ্যমান” এইরূপ সংজ্ঞাতে গুরুত্বের অনারোপ, অথচ বিচিকিৎসা এবং সংশয়রূপ শল্য যে চিত্তকে অভিভূত করিয়া থাকিবে ইহা অসম্ভব। “আছি” এই সংজ্ঞার উচ্ছেদ বিচিকিৎসা এবং সংশয়রূপ শল্যের নিঃসরণ।
৩২৭. (১৮) ছয় অনুত্তরীয় : দর্শন-অনুত্তরীয়, শ্রবণ-অনুত্তরীয়, লাভ-অনুত্তরীয়, শিক্ষা-অনুত্তরীয়, পরিচর্যা-অনুত্তরীয়, অনুস্মৃতি-অনুত্তরীয়।
(১৯) ছয় অনুস্মৃতি-স্থান, বুদ্ধানুস্মৃতি, ধর্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি, দেবতানুস্মৃতি।
৩২৮. (২০) ছয় সতত বিহার : ভিক্ষু চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন। নাসিকা দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন। জিহ্বা দ্বারা রসাস্বাদন করিয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন। কায় দ্বারা স্প্রষ্টব্য স্পর্শ করিয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন। মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না; তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন।
৩২৯. (২১) ছয় অভিজাতি : কেহ নিচকুলে উৎপন্ন হইয়া অনুরূপ ধর্মের আচরণ করে। কেহ নিচকুলে উৎপন্ন হইয়া শুদ্ধাচরণ সম্পন্ন হয়। কেহ নিচকুলে উৎপন্ন হইয়া পাপ ও পুণ্যের অতীত নির্বাণ ধর্মের অনুভূতিসম্পন্ন হয়। কেহ উচ্চকুলোদ্ভূত হইয়া অনুরূপ ধর্মের আচরণ করে। কেহ ওইরূপ কুলে জাত হইয়া অশুদ্ধাচরণসম্পন্ন হয়। কেহ ওইরূপ কুলে উৎপন্ন হইয়া পাপ ও পুণ্য উভয়েরই অতীত নির্বাণ ধর্মের অনুভূতিসম্পন্ন হয়।
(২২) ছয় নির্বেধ-ভাগীয় সংজ্ঞা : অনিত্য-সংজ্ঞা, অনিত্যে-দুঃখ সংজ্ঞা, দুঃখে অনাত্ম-সংজ্ঞা, প্রহাণ-সংজ্ঞা, বিরাগ-সংজ্ঞা, নিরোধ- সংজ্ঞা।
জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই ছয় ধর্ম সম্যকরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে, সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়।
৩৩০. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক সাত ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে, সকলে একত্র হইয়া উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়। ওই সাত ধর্ম কী কী?
(১) সাত ধন : শ্রদ্ধা-ধন, শীল-ধন, হ্রী-ধন, ঔত্তপ্য-ধন, শ্রুত-ধন, ত্যাগ-ধন, প্রজ্ঞা-ধন।
(২) সপ্ত সম্বোজ্ঝাঙ্গ : স্মৃতি, ধর্মবিচয়, বীর্য, প্রীতি, প্রশ্রব্ধি, সমাধি, উপেক্ষা।
(৩) সপ্ত সমাধি-পরিষ্কার : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্মান্ত, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি।
(৪) সপ্ত অসদ্ধর্ম : ভিক্ষু শ্রদ্ধাহীন, হ্রীহীন, ঔত্তপ্যহীন হন, অল্পশ্রুত, অলস, মূঢ়-স্মৃতি এবং দুষ্প্রাজ্ঞ হন।
(৫) সপ্ত সদ্ধর্ম : ভিক্ষু শ্রদ্ধা, হ্রী, ঔত্তপ্য, সমন্বিত হন, বহুশ্রুত আরব্ধ-বীর্য হন, উপস্থিত-স্মৃতিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান হন।
(৬) সপ্ত সৎপুরুষ ধর্ম : ভিক্ষু ধর্মজ্ঞ, অর্থজ্ঞ, আত্মজ্ঞ, মাত্রাজ্ঞ, কালজ্ঞ, পরিষদজ্ঞ এবং পুদ্গলজ্ঞ হন।
৩৩১. (৭) সাত নির্দেশ-বস্তু : ভিক্ষু শিক্ষা গ্রহণে তীব্র অনুরাগবিশিষ্ট হন, ভবিষ্যতে ও উহার গ্রহণে ওইরূপ মনোবিশিষ্টই হন। ধর্মে অন্তর্দৃষ্টি লাভে, তৃষ্ণার দমনে, নির্জন বাসে, বীর্যারম্ভে, স্মৃতি-কুশলতায়, দৃষ্টি-প্রতিবেধে ওইরূপই মনোভাববিশিষ্ট হন।
(৮) সাত সংজ্ঞা : অনিত্যসংজ্ঞা, অনাত্মসংজ্ঞা, অশুভসংজ্ঞা, অমঙ্গলসংজ্ঞা, প্রহাণসংজ্ঞা, বিরাগসংজ্ঞা, নিরোধসংজ্ঞা।
(৯) সাত বল : শ্রদ্ধাবল, বীর্যবল, হ্রীবল, ঔত্তপ্যবল, স্মৃতিবল, সমাধিবল, প্রজ্ঞাবল।
৩৩২. (১০) সাত বিজ্ঞান-স্থিতি : সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা নানারূপ দেহসম্পন্ন এবং নানারূপ সংজ্ঞাসম্পন্ন; যথা : কোনো কোনো মনুষ্য, দেবতা এবং বিনিপাতিক নিরয়বাসী। ইহাই প্রথম বিজ্ঞান-স্থিতি। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা নানারূপ দেহসম্পন্ন কিন্তু একই রূপ সংজ্ঞাবিশিষ্ট; যথা : ব্রহ্মলোকবাসী দেবগণ যাঁহারা প্রথম ধ্যানের অনুশীলনে ওইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছেন। ইহাই দ্বিতীয় বিজ্ঞান-স্থিতি। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা একইরূপ দেহবিশিষ্ট কিন্তু নানারূপ সংজ্ঞাসম্পন্ন; যথা : আভাস্বর দেবগণ। ইহাই তৃতীয় বিজ্ঞান-স্থিতি। সত্ত্বগণ, বিদ্যমান যাঁহারা একইরূপ দেহ ও সংজ্ঞাবিশিষ্ট; যথা : শুভকৃৎস্ন দেবগণ। ইহাই চতুর্থ বিজ্ঞান-স্থিতি। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা রূপ-সংজ্ঞাকে সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ-সংজ্ঞা বিনাশ করিয়া, নানাত্ব-সংজ্ঞায় উদাসীন হইয়া “আকাশ অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত “আকাশ-অনন্ত-আয়তন” স্তরে গমন করিয়াছেন। ইহাই পঞ্চম বিজ্ঞান-স্থিতি। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা “আকাশ-অনন্ত-আয়তন” সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “বিজ্ঞান অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত “বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন” স্তরে গমন করিয়াছেন। ইহাই ষষ্ঠ বিজ্ঞান-স্থিতি। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা “বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন” সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “কিছুই নাই” এই অনুভূতির সহিত “আকিঞ্চন আয়তন” স্তরে গমন করিয়াছেন। ইহাই সপ্তম বিজ্ঞান-স্থিতি।
(১১) সাত পুদ্গল যাঁহারা দক্ষিণেয়্য : উভয়ভাগ-বিমুক্ত, প্রজ্ঞাবিমুক্ত, কায়ানুদর্শী, দৃষ্টিপ্রাপ্ত, শ্রদ্ধাবিমুক্ত, ধর্মানুসারী, শ্রদ্ধানুসারী।
(১২) সাত অনুশয় : কামরাগ, প্রতিঘ, মিথ্যাদৃষ্টি, বিচিকিৎসা, মান, ভবরাগ, অবিদ্যা।
(১৩) সাত সংযোজন : অনুনয়, প্রতিঘ, মিথ্যাদৃষ্টি, বিচিকিৎসা, মান, ভবরাগ, অবিদ্যা।
(১৪) যথাক্রমে উৎপন্ন বিবাদসমূহের সমাধান ও শান্তির নিমিত্ত সাত অধিকরণ-শমথ : সম্মুখ-বিনয় দাতব্য, স্মৃতি-বিনয় দাতব্য, অমূঢ়-বিনয় দাতব্য, অপরাধ স্বীকৃতির উপর প্রতিষ্ঠিত অধিকরণ কার্য্যে পরিণত করিতে হইবে, সংঘের বহুজন কর্তৃক উপস্থাপিত অধিকরণ, অবাধ্যের নিমিত্ত অধিকরণ, তৃণাচ্ছাদিত করণের ন্যায় অধিকরণ।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই সাত ধর্ম সম্যকরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়।
দ্বিতীয় ভাণবার সমাপ্ত।
৩৩৩. জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান, অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক আট ধর্ম সম্যকরূপে ব্যাখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের মঙ্গল ও হিতসাধক হয়। ওই আট ধর্ম কী কী?
(১) আট মিথ্যাত্ব : মিথ্যাদৃষ্টি, মিথ্যা সংকল্প, মিথ্যা বাক্য, মিথ্যা কর্মান্ত, মিথ্যা আজীব, মিথ্যা ব্যায়াম, মিথ্যা স্মৃতি, মিথ্যা সমাধি।
(২) আট সম্যকত্ব : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্মান্ত, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি।
(৩) আট দক্ষিণেয় পুদ্গল : স্রোতাপন্ন, স্রোতাপত্তি-ফল-প্রাপ্ত; সকৃদাগামী, সকৃদাগামী-ফল-প্রাপ্ত; অনাগামী, অনাগামী-ফল-প্রাপ্ত, অর্হৎ, অর্হত্ত্বফল-প্রাপ্ত।
৩৩৪. (৪) আট আলস্যের ভিত্তি : ভিক্ষুর করণীয় কর্তব্য আছে। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমাকে কর্তব্য করিতে হইবে, কর্তব্য কর্ম করিতে হইলে আমার দেহ ক্লান্ত হইবে, তবে এইবার শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহাই প্রথম আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষুর করণীয় কর্তব্য আছে। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি কর্ম করিয়াছি” কর্ম করিতে গিয়া আমার দেহ ক্লান্ত হইয়াছে, এইবার আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহাই দ্বিতীয় আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষুকে পথ ভ্রমণ করিতে হইবে। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমাকে পথ ভ্রমণ করিতে হইবে, উহা করিতে হইলে আমার দেহ ক্লান্ত হইবে, এইবার আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহা তৃতীয় আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু পথ ভ্রমণরত হইয়াছেন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি পথ ভ্রমণ করিয়াছি, এইরূপে আমার দেহ ক্লান্ত হইয়াছে, এইবার আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহা চতুর্থ আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা প্রণীত ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে লাভ করেন না। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে প্রাপ্ত হই নাই, আমার দেহ ক্লান্ত ও অকর্মণ্য হইয়াছে, এইবার আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহা পঞ্চম আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু পূর্বোক্তরূপে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে প্রাপ্ত হন, তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্ত পরিমাণে লাভ করিয়াছি, এইরূপে আমার দেহ গুরুভার এবং অকর্মণ্য হইয়াছে, এইবার আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহাই ষষ্ঠ আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু অল্পমাত্র অসুস্থতা অনুভব করেন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, আমি অল্পমাত্র অসুস্থতা অনুভব করিতেছি, এই অবস্থায় আমার শয়ন করা উচিত, এইবার আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহা সপ্তম আলস্যের ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু রোগমুক্ত হন, তিনি অনতিকাল পূর্বে নিরাময় হইয়াছেন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি রোগমুক্ত হইয়াছি, অনতিকাল পূর্বে নিরাময় হইয়াছি, আমার দেহ দুর্বল ও অকর্মণ্য, আমি শয়ন করি।” তিনি শয়ন করেন, অকৃতের করণার্থ, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ তিনি প্রয়াস করেন না। ইহা অষ্টম আলস্যের ভিত্তি।
৩৩৫. (৫) কোনো বিশিষ্ট কর্ম সম্পাদনের আট ভিত্তি : ভিক্ষুর কর্তব্য কর্ম আছে। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমাকে কর্তব্য কর্ম করিতে হইবে, কিন্তু উহা করিতে হইলে বুদ্ধদিগের উপদেশে মনঃসংযোগ করা আমার পক্ষে সুকর হইবে না, আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহাই প্রথম ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষুর কর্তব্য কর্ম আছে। তাঁহার এইরূপ মনে হয়, “আমি কর্ম করিয়াছি, কিন্তু উহা করিতে গিয়া আমি বুদ্ধগণের উপদেশে মনঃসংযোগ করিতে পারি নাই, আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা দ্বিতীয় ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষুকে পথ ভ্রমণ করিতে হইবে। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমাকে পথ ভ্রমণ করিতে হইবে, উহা করিতে হইলে বুদ্ধগণের উপদেশে মনঃসংযোগ করা আমার পক্ষে সুকর হইবে না, আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা তৃতীয় ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু পথ ভ্রমণে রত হন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি ভ্রমণ করিয়াছি, উহা করিতে গিয়া আমি বুদ্ধগণের উপদেশে মনঃসংযোগ করিতে পারি নাই। আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা চতুর্থ ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে প্রাপ্ত হন না। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে প্রাপ্ত হই নাই, এইরূপে আমার দেহ লঘু এবং কর্মণ্য হইয়াছে, আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা পঞ্চম ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে প্রাপ্ত হন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি গ্রাম অথবা নিগমে পিণ্ডার্থ ভ্রমণ করিয়া হীন অথবা উৎকৃষ্ট ভোজ্য পর্যাপ্তরূপে প্রাপ্ত হইয়াছি, এইরূপে আমার দেহ বলসম্পন্ন এবং কর্মণ্য হইয়াছে, এইবার আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা ষষ্ঠ ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু অল্পমাত্র অসুস্থতা অনুভব করেন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি অল্পমাত্র অসুস্থতা অনুভব করিতেছি, কিন্তু আমার অসুস্থতা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইবার সম্ভাবনা আছে, অতএব আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা সপ্তম ভিত্তি। পুনশ্চ, ভিক্ষু রোগমুক্ত হন, তিনি অনতিকাল পূর্বে নিরাময় হইয়াছেন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “আমি রোগমুক্ত হইয়াছি, অনতিকাল পূর্বে নিরাময় হইয়াছি, কিন্তু রোগের পুনরাবির্ভাবের সম্ভাবনা আছে, অতএব আমি অপ্রাপ্তের প্রাপ্তির নিমিত্ত, অসম্পাদিতের সম্পাদনার্থ, অলব্ধের লাভার্থ বীর্য প্রয়োগ করিব।” ওই উদ্দেশ্যে তিনি বীর্য প্রয়োগ করেন। ইহা অষ্টম ভিত্তি।
৩৩৬. (৬) আট দানের ভিত্তি। স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া দান করা হয়। ভয় হেতু দান করা হয়। “আমাকে দান করা হইয়াছে” এই হেতু দান করা হয়। “আমাকে দান করিবে” এই হেতু দান করা হয়। “দান করিলে মঙ্গল হয়” এই হেতু দান করা হয়। “আমি পাক করিতেছি, ইহারা করিতেছে না। পাকনিরত আমার পক্ষে যাহারা পাক করিতেছে না তাহাদিগকে না দেওয়া অনুপযুক্ত,” এই হেতু দান করা হয়। “এই দান করিবার নিমিত্ত আমার কল্যাণ কীর্তিশব্দ উত্থিত হইবে” এই হেতু দান করা হয়। চিত্তের অলংকাররূপে চিত্তের নির্মলতার জন্য দান করা হয়।
৩৩৭. (৭) দান হেতু আট প্রকার পুনরুৎপত্তি। কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি দেখেন ক্ষত্রিয় অথবা ব্রাহ্মণ অথবা গৃহপতি মহাশাল পঞ্চকামগুণে সমর্পিত ও সমঙ্গীভূত হইয়া, উহাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া অবস্থান করিতেছেন। তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে ক্ষত্রিয় অথবা ব্রাহ্মণ অথবা গৃহপতি মহাশালরূপে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত পূর্বোক্ত প্রার্থিতরূপ জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগের প্রতিই প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইরূপ শ্রবণ করেন, “চাতুর্মহারাজিক দেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে চাতুর্মহারাজিক দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগের প্রতিই প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইবার শ্রবণ করেন, “ত্রায়স্ত্রিংশ দেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে ত্রায়স্ত্রিংশ দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগের প্রতিই প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইরূপ শ্রবণ করেন, যামদেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে যাম দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগের প্রতিই প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইরূপ শ্রবণ করেন, তুষিত দেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে তুষিত দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগের প্রতিই প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইরূপ শ্রবণ করেন, নির্মাণরতি দেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে নির্মাণরতি দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগের প্রতিই প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধি লাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইরূপ শ্রবণ করেন, পরনির্মিত-বশবর্তী-দেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে পরনির্মিত-বশবর্তী-দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগেরই প্রতি প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প শুদ্ধতার নিমিত্ত সমৃদ্ধিলাভ করে। পুনশ্চ, কেহ শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণগণকে অন্ন, পান, বস্ত্র, যান, মালা-গন্ধ-বিলেপন, শয্যা, আবাস, প্রদীপোপকরণসমূহ দান করেন। তিনি যাহা দান করেন তাহা পুনঃপ্রাপ্তির আশা পোষণ করেন। তিনি এইরূপ শ্রবণ করেন, “ব্রহ্মকায়িক দেবগণ দীর্ঘায়ু বর্ণবান ও পরম সুখময় অবস্থা প্রাপ্ত হন।” তাঁহার মনে এইরূপ হয়, “অহো! আমি যদি মরণান্তে দেহের বিনাশে ব্রহ্মকায়িক দেবগণের মধ্যে জন্মলাভ করিতে পারি!” তিনি ওই চিন্তায় লগ্ন হন, উহাতে প্রতিষ্ঠিত হন, উহারই অনুশীলন করেন। হীনার্থে চালিত উত্তমার্থে অভাবিত তাঁহার সেই চিত্ত ওইরূপ প্রার্থিত জন্মেরই অনুকূল হয়। যাহা কথিত হইল তাহা কেবল শীলবানদিগেরই প্রতি প্রযোজ্য, দুঃশীলগণের প্রতি নহে, যাঁহারা বীতরাগ তাঁহাদের প্রতি প্রযোজ্য, যাঁহারা সরাগ তাঁহাদের প্রতি নহে। শীলবানদিগেরই চিত্ত-সংকল্প রাগহীনতার নিমিত্ত সমৃদ্ধিলাভ করে।
(৮) আট পরিষদ : ক্ষত্রিয়-পরিষদ, ব্রাহ্মণ-পরিষদ, গৃহপতি-পরিষদ, শ্রমণ-পরিষদ, চাতুর্মহারাজিক-পরিষদ, ত্রয়স্ত্রিংশ-পরিষদ, মার-পরিষদ, ব্রহ্ম-পরিষদ।
(৯) আট লোক ধর্ম : লাভ, অলাভ, যশ, অযশ, নিন্দা, প্রশংসা, সুখ, দুঃখ।
৩৩৮. (১০) আট অভিভূ-আয়তন : কেহ অধ্যাত্মে রূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে সুবর্ণ অথবা দুর্বর্ণরূপ ক্ষুদ্ররূপে দর্শন করেন, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি” এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা প্রথম অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে রূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে সুবর্ণ অথবা দুর্বর্ণ অপ্রমেয় রূপ দর্শন করেন, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি” এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা দ্বিতীয় অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে সুবর্ণ অথবা দুর্বর্ণ রূপ ক্ষুদ্ররূপে দর্শন করেন, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি” এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা তৃতীয় অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে-অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে সুবর্ণ অথবা দুর্বর্ণ অপ্রমেয় রূপ দর্শন করেন, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি”, এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা চতুর্থ অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-নীল, নীলবর্ণ, নীল-নিদর্শন, নীলোভাস; যথা : নীল, নীলবর্ণ, নীল-নিদর্শন, নীলোভাসসম্পন্ন উমা পুষ্প, অথবা উভয় দিক সুমার্জিত নীল, নীলবর্ণ, নীল-নিদর্শন, নীলোভাস বারাণসীর বস্ত্র; এইরূপ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-নীল, নীলবর্ণ, নীল-নিদর্শন, নীলোভাস, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি” এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা পঞ্চম অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-পীত, পীতবর্ণ, পীত-নিদর্শন, পীতোভাস; যথা : পীত, পীতবর্ণ, পীত-নিদর্শন, পীতোভাস কর্ণিকার পুষ্প, অথবা উভয় দিক সুমার্জিত পীত, পীতবর্ণ, পীত-নিদর্শন, পীতোভাস বারাণসীর বস্ত্র; এইরূপ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-পীত, পীত-বর্ণ, পীত-নিদর্শন, পীতোভাস, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি”, এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা ষষ্ঠ অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-লোহিত, লোহিত-বর্ণ, লোহিত-নিদর্শন, লোহিতোভাস; যথা : লোহিত, লোহিত-বর্ণ, লোহিত-নিদর্শন লোহিতোভাস বন্ধুজীবক পুষ্প অথবা উভয়দিক সুমার্জিত লোহিত, লোহিত-বর্ণ, লোহিত-নিদর্শন, লোহিতোভাস বারাণসীর বস্ত্র; এইরূপ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-লোহিত, লোহিত-বর্ণ, লোহিত-নিদর্শন, লোহিতোভাস, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি”, এইরূপ সংজ্ঞা, উৎপাদন করেন। ইহা সপ্তম অভিভূ-আয়তন। কেহ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-শুভ্র, শুভ্র-বর্ণ, শুভ্র-নিদর্শন, শুভ্রোভাস; যথা : শুভ্র, শুভ্র-বর্ণ, শুভ্র-নিদর্শন, শুভ্রোভাস ঔষধি-তারকা, অথবা উভয়দিক সুমার্জিত শুভ্র, শুভ্র-বর্ণ, শুভ্র-নিদর্শন, শুভ্রোভাস বারাণসীর বস্ত্র; এইরূপ অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী হইয়া বাহিরে রূপ দর্শন করেন-শুভ্র, শুভ্র-বর্ণ, শুভ্র-নিদর্শন, শুভ্রোভাস, তিনি উহা অভিভূত করিয়া “জানিতেছি, দেখিতেছি” এইরূপ সংজ্ঞা উৎপাদন করেন। ইহা অষ্টম অভিভূ-আয়তন।
৩৩৯. (১১) আট বিমোক্ষ : রূপী রূপ দর্শন করে। ইহা প্রথম বিমোক্ষ। অধ্যাত্মে অরূপ-সংজ্ঞী বাহিরে রূপ দর্শন করে। ইহা দ্বিতীয় বিমোক্ষ। “সুন্দর”! এই চিন্তায় অভিনিবিষ্ট হয়। ইহা তৃতীয় বিমোক্ষ। রূপ-সংজ্ঞাকে সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ সংজ্ঞা বিনাশ করিয়া, নানাত্ব সংজ্ঞায় উদাসীন হইয়া “আকাশ- অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত আকাশ-অনন্ত-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করে। ইহা চতুর্থ বিমোক্ষ। আকাশ-অনন্ত-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “বিজ্ঞান অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করে। ইহা পঞ্চম বিমোক্ষ। বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “কিছুই নাই” এই অনুভূতির সহিত আকিঞ্চন-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করে। ইহা ষষ্ঠ বিমোক্ষ। আকিঞ্চন-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করে। ইহা সপ্তম বিমোক্ষ। নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া সংজ্ঞা-বেদয়িত-নিরোধ উপলব্ধি করিয়া বিহার করে। ইহা অষ্টম বিমোক্ষ।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই আট ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের হিতসাধক হয়।
৩৪০. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক নয় ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের হিতসাধক হয়। ওই নয় ধর্ম কী কী?
(১) নয় শত্রুতার ভিত্তি। “আমার অনিষ্ট করিয়াছে” এইরূপে শত্রুতা পোষণ করে। “আমার অনিষ্ট করিতেছে” এইরূপে শত্রুতা পোষণ করে। “আমার অনিষ্ট করিবে” এইরূপে শত্রুতা পোষণ করে। “আমার প্রিয় ও প্রীতির পাত্রের অনিষ্ট করিয়াছে অথবা করিতেছে অথবা করিবে” এইরূপে শত্রুতা পোষণ করে।
(২) শত্রুতার ভিত্তির নয় প্রকার দমন। “আমার অনিষ্ট করিয়াছে” কিন্তু এইরূপ চিন্তা পোষণ করিয়া কী ফল লাভ হইবে?” এইরূপে শত্রুতা দমন করে। “আমার অনিষ্ট করিতেছে, কিন্তু এইরূপ চিন্তা করিয়া কি ফল লাভ হইবে?” এইরূপে শত্রুতা দমন করে। “আমার অনিষ্ট করিবে, কিন্তু এইরূপ চিন্তায় কী ফল লাভ হইবে? এইরূপে শত্রুতা দমন করে। “আমার প্রিয় ও প্রীতির পাত্রের অনিষ্ট করিয়াছে অথবা করিতেছে অথবা করিবে, কিন্তু এইরূপ চিন্তায় কি ফল লাভ হইবে? এইরূপে শত্রুতা দমন করে।
৩৪১. (৩) নয় সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা নানারূপ দেহসম্পন্ন এবং নানারূপ সংজ্ঞাসম্পন্ন; যথা : কোনো কোনো মনুষ্য, দেবতা এবং বিনিপাতিক (নিরয়বাসী)। ইহা প্রথম সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা নানারূপ দেহসম্পন্ন কিন্তু একইরূপ সংজ্ঞাবিশিষ্ট; যথা : ব্রহ্মলোকবাসী দেবগণ যাঁহারা প্রথম ধ্যানের অনুশীলনে ওইস্থানে উৎপন্ন হইয়াছেন। ইহা দ্বিতীয় সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা একইরূপ দেহবিশিষ্ট কিন্তু নানারূপ সংজ্ঞাসম্পন্ন; যথা : আভাস্বর দেবগণ। ইহা তৃতীয় সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা একইরূপ দেহ ও সংজ্ঞাবিশিষ্ট; যথা : শুভ-কৃৎস্ন দেবগণ। ইহা চতুর্থ সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহাদের সংজ্ঞা নাই, বেদনা নাই; যথা : অসংজ্ঞ-সত্ত্ব দেবগণ। ইহা পঞ্চম সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা রূপ-সংজ্ঞাকে সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ-সংজ্ঞা বিনাশ করিয়া, নানাত্ব সংজ্ঞায় উদাসীন হইয়া “অনন্ত আকাশ” এই অনুভূতির সহিত আকাশ-অনন্ত-আয়তন স্তরে উপনীত হন। ইহা ষষ্ঠ সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ, বিদ্যমান যাঁহারা আকাশ-অনন্ত-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “বিজ্ঞান অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন স্তরে উপনীত হন। ইহা সপ্তম সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা বিজ্ঞান অনন্ত-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “কিছুই নাই” এই অনুভূতির সহিত আকিঞ্চণ্য-আয়তন স্তরে উপনীত হন। ইহা অষ্টম সত্ত্বাবাস। সত্ত্বগণ বিদ্যমান যাঁহারা আকিঞ্চন্য-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা” আয়তন স্তরে উপনীত হন। ইহা নবম সত্ত্বাবাস।
৩৪২. (৪) ব্রহ্মচর্য্য বাসের নয় অক্ষণ অসময় : জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় নিরয়ে উৎপন্ন হইয়াছে। ব্রহ্মচর্য্য বাসের এই প্রথম অক্ষণ অসময়। পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় পশুযোনিতে উৎপন্ন হইয়াছে; ব্রহ্মচর্য্য বাসের এই দ্বিতীয় অক্ষণ অসময়! পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় প্রেতলোকে উৎপন্ন হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য্য বাসের এই তৃতীয় অক্ষণ অসময়।
পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় অসুর দেহপ্রাপ্ত হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য্য বাসের এই চতুর্থ অক্ষণ অসময়। পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় দীর্ঘায়ু হইয়া কোনো দেবলোকে উৎপন্ন হইয়াছে, ব্রহ্মচর্য্য বাসের এই পঞ্চম অক্ষণ অসময়। পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় প্রত্যন্ত জনপদে জ্ঞানহীন ম্লেচ্ছদিগের মধ্যে পুনর্জন্ম লাভ করিয়াছে, যেখানে ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকাদিগের গতি নাই। ব্রহ্মচর্য্য বাসের ইহা ষষ্ঠ অক্ষণ অসময়। পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় মধ্যদেশে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, কিন্তু মিথ্যাদৃষ্টি ও বিপরীত দর্শনসম্পন্ন-দান নাই, যজ্ঞ নাই, হবন নাই, সুকৃতি দুষ্কৃতির ফল নাই, ইহলোক নাই, পরলোক নাই, মাতা-পিতা নাই, ঔপপাতিক সত্ত্ব নাই, পূর্ণতাপ্রাপ্ত সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন শ্রমণ-ব্রাহ্মণ নাই যাঁহারা ইহলোক ও পরলোক স্বয়ং জানিয়া ও সাক্ষাৎ করিয়া উহার প্রকাশ করেন।” ইহা ব্রহ্মচর্য্য বাসের সপ্তম অক্ষণ অসময়। পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হইয়াছে, উপশম ও পরিনির্বাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত-প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হইয়াছে; কিন্তু এই পুরুষ ওই সময় মধ্যদেশে পুনর্জন্ম লাভ করিয়া দুষ্প্রাজ্ঞ, জড়, বধির ও মূক হইয়াছে, সুভাষিত অথবা দুর্ভাষিতের অর্থ গ্রহণ করিতে অক্ষম। ইহা ব্রহ্মচর্য্য বাসের অষ্টম অক্ষণ অসময়। পুনশ্চ, জগতে তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের আবির্ভাব হয় নাই, উপশম ও পরিনির্মাণদায়ী, সম্বোধগামী সুগত প্রজ্ঞাপিত ধর্ম উপদিষ্ট হয় নাই; কিন্তু এই পুরুষ মধ্যদেশে পুনর্জন্ম গ্রহণ করিয়াছে, সে প্রজ্ঞাসম্পন্ন, জড়তাহীন, সে বধির ও মূক নহে, সে সুভাষিত অথবা দুর্ভাষিতের অর্থ গ্রহণে সক্ষম। ইহা ব্রহ্মচর্য্য বাসের নবম অক্ষণ অসময়।
৩৪৩. (৫) নয় অনুপূর্ব-বিহার : ভিক্ষু কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া, অকুশলধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া, সবিতর্ক সবিচার বিবেকজ প্রীতিসুখ মণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। বিতর্ক-বিচারের উপশমে অধ্যাত্ম-সমপ্রসাদী, চিত্তের একীভাব আনয়নকারী, অবিতর্ক অবিচার সমাধিজ প্রীতিসুখ-মণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। প্রীতিতেও বৈরাগ্য উৎপাদন করিয়া উপেক্ষাসম্পন্ন, স্মৃতিমান ও সমপ্রজ্ঞাত হইয়া বিহার করেন; তিনি কায়ে সুখ অনুভব করেন-যে সুখ সম্বন্ধে আর্যগণ বলিয়া থাকেন “উপেক্ষক, স্মৃতিমান, সুখবিহারী” এবং এইরূপে তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন; সুখ ও দুঃখ উভয়ই বর্জন করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্যের তিরোভাব সাধন করিয়া অদুঃখ অসুখ রূপ উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিহার করেন। রূপ-সংজ্ঞাকে সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ-সংজ্ঞা বিনাশ করিয়া, নানাত্ব-সংজ্ঞায় উদাসীন হইয়া “আকাশ-অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত আকাশ অনন্ত-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করেন। আকাশ-অনন্ত-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “বিজ্ঞান অনন্ত” এই অনুভূতির সহিত বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করেন। বিজ্ঞান অনন্ত-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া “কিছুই নাই” এই অনুভূতির সহিত আকিঞ্চন-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করেন। আকিঞ্চন-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন উপলব্ধি করিয়া বিহার করেন। নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন সর্বতোভাবে অতিক্রম করিয়া সংজ্ঞা-বেদয়িত নিরোধ উপলব্ধি করিয়া বিহার করেন।
৩৪৪. (৬) নয় অনুপূর্ব-নিরোধ : যাঁহারা প্রথম ধ্যানে উপনীত তাঁহাদের কাম সংজ্ঞা নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা দ্বিতীয় ধ্যানে উপনীত তাঁহাদের বিতর্ক-বিচার নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা তৃতীয় ধ্যানে উপনীত তাঁহাদের প্রীতি নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা চতুর্থ ধ্যানে উপনীত তাঁহাদের আশ্বাস প্রশ্বাস নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা আকাশ-অনন্ত-আয়তন স্তরে উপনীত তাঁহাদের রূপ-সংজ্ঞা নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন স্তরে উপনীত তাঁহাদের আকাশ-অনন্ত-আয়তন সংজ্ঞা নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা আকিঞ্চন-আয়তন স্তরে উপনীত তাঁহাদের বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন সংজ্ঞা নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন স্তরে উপনীত তাঁহাদের আকিঞ্চন আয়তন সংজ্ঞা নিরুদ্ধ হয়। যাঁহারা সংজ্ঞা-বেদয়িত-নিরোধ স্তরে উপনীত তাঁহাদের সংজ্ঞা ও বেদনা উভয়ই নিরুদ্ধ হয়।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই নয় ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের হিতসাধক হয়।
৩৪৫. বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক দশ ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের হিতসাধক হয়। ওই দশ ধর্ম কী কী?
(১) দশ নাথ-করণ ধর্ম : ভিক্ষু শীলবান এবং প্রাতিমোক্ষ-সংবর সংবৃত হইয়া বিহার করেন, আচার-গোচরসম্পন্ন এবং অনুমাত্র পাপে ভয়দর্শী হইয়া শিক্ষাপদসমূহ গ্রহণপূর্বক উহাদের পালন শিক্ষা করেন। ইহা নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু বহুশ্রুত, শ্রুতধর এবং শ্রুত-সঞ্চয়সম্পন্ন হন। যে-সকল ধর্মের প্রারম্ভ কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যাহা অর্থ ও শব্দ সম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্যের প্রকাশক, ওই সকল ধর্মে তিনি বহুশ্রুত হন, উহাদিগকে ধারণ করেন, আবৃত্তি দ্বারা অনুক্ষণ উহাদের অনুশীলন করেন, উহাতে একাগ্রচিত্ত হন এবং সূক্ষ্ম দৃষ্টি দ্বারা উহাদের অন্তরে প্রবেশ করেন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু চরিত্রবানের মিত্র সহায় এবং ঘনিষ্ট বন্ধু হন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু সুবচ, বিনয়ানুকূল ধর্মসমন্বিত, সহিষ্ণু অনুশাসনী গ্রহণে নিপুণ হন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু সব্রহ্মচারীগণের বিবিধ কর্তব্যে দক্ষ ও অনলস হন, ওই সকলের পালন প্রণালির মীমাংসা করণে সক্ষম হন, কর্ম সম্পাদনে এবং সুব্যবস্থাকরণে সক্ষম হন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, তিনি ধর্ম ও ধর্মালাপে অনুরক্ত হন এবং অভিধর্ম ও অভিবিনয়ে বিপুল প্রীতিলাভ করেন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু যেকোনো প্রকার চীবর, পিণ্ডপাত, বাসস্থান এবং পীড়াকালের ওষুধ ও পথ্যে সন্তুষ্ট হন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু অকুশল ধর্মের পরিহারের নিমিত্ত, কুশলধর্ম লাভের নিমিত্ত বীর্যসম্পন্ন হন, তিনি কুশলধর্মসমূহে স্থামবান ও দৃঢ়পরাক্রম হন, কখনোই ভারনিক্ষেপ করেন না। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু স্মৃতিসম্পন্ন হন, তিনি শ্রেষ্ঠ স্মৃতি-প্রাখর্যসমন্বিত হইয়া বহু পূর্বে কথিত অথবা কৃতের স্মরণ করেন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম। পুনশ্চ, ভিক্ষু প্রজ্ঞাবান হন, বস্তুসমূহের উৎপত্তি ও বিনাশের জ্ঞানসমন্বিত হন, আর্য, তীক্ষ্ম, সম্যক দুঃখ-ক্ষয়-প্রদায়িণী প্রজ্ঞাসমন্বিত হন। ইহাও নাথ-করণ ধর্ম।
৩৪৬. (২) দশ কৃৎস্ন আয়তন। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় পৃথিবী-কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় আপ-কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় তেজ-কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় বায়ু-কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় নীল-কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় পীত কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় লোহিত কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় শুভ্র কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় আকাশ কৃৎস্নরূপে অনুভব করে। কেহ ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক দিক অদ্বিতীয়, অপ্রমেয় বিজ্ঞান কৃৎস্নরূপে অনুভব করে।
৩৪৭. (৩) দশ অকুশল কর্মপথ : প্রাণাতিপাত, অদত্তের গ্রহণ, ব্যভিচার, মৃষাবাদ, পিশুনবাক্য, কর্কশবাক্য, তুচ্ছপ্রলাপ, অভিধ্যা, ব্যাপাদ, মিথ্যাদৃষ্টি।
(৪) দশ কুশল কর্মপথ : প্রাণাতিপাত হইতে বিরতি, অদত্তের গ্রহণ হইতে বিরতি, ব্যভিচার হইতে বিরতি, মৃষাবাদ হইতে বিরতি, পিশুন বাক্য হইতে বিরতি, কর্কশ বাক্য হইতে বিরতি, তুচ্ছ প্রলাপ হইতে বিরতি, অনভিধ্যা, অব্যাপাদ, সম্যক দৃষ্টি।
৩৪৮. (৫) দশ আর্য বাস : ভিক্ষু পঞ্চাঙ্গ-বিপ্রহীন হন, ষড়াঙ্গযুক্ত হন, একারক্ষ হন, চতুর্বিধ আশ্রয় সমন্বিত হন, সাম্প্রদায়িক মতামত ত্যাগী হন, সম্পূর্ণরূপে বাসনামুক্ত হন, অনাবিল-সংকল্প হন, প্রশ্রদ্ধ-কায়-সংস্কার হন, সুবিমুক্ত-চিত্ত ও সুবিমুক্ত-প্রজ্ঞ হন। ভিক্ষু কিরূপে পঞ্চাঙ্গ-বিপ্রহীন হন? তিনি কামছন্দ, ব্যাপাদ, স্ত্যানমিদ্ধ, ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য এবং বিচিকিৎসা পরিহার করেন। এইরূপে তিনি পঞ্চাঙ্গ-বিপ্রহীন হন। ভিক্ষু কিরূপে ষড়াঙ্গযুক্ত হন? তিনি চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞান সমন্বিত হইয়া বিহার করেন। শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া… ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া… জিহ্বার দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া… কায় দ্বারা স্প্রষ্টব্য স্পর্শ করিয়া… মন দ্বারা ধর্ম বিজ্ঞাত হইয়া সুমনা অথবা দুর্মনা হন না, তিনি উপেক্ষা, স্মৃতি ও সম্প্রজ্ঞানসমন্বিত হইয়া বিহার করেন। এইরূপে ভিক্ষু ষড়াঙ্গযুক্ত হন।
কিরূপে ভিক্ষু একারক্ষ হন? ভিক্ষু স্মৃতি-রক্ষিত চিত্তসমন্বিত হন। এইরূপে তিনি একারক্ষ হন। কিরূপে ভিক্ষু চতুর্বিধ আশ্রয়সমন্বিত হন? ভিক্ষু সম্যক বিচারান্তে বস্তুবিশেষের সেবা করেন, ওইরূপে বস্তুবিশেষ স্বীকার করিয়া লন, বস্তুবিশেষ বর্জন করেন, বস্তুবিশেষ দমন করেন। এইরূপে ভিক্ষু চতুর্বিধ আশ্রয় সমন্বিত হন। কিরূপে ভিক্ষু সাম্প্রদায়িক মতামত ত্যাগী হন? শ্রমণ ও ব্রাহ্মণগণের সর্ব প্রকার সাম্প্রদায়িক মতামত ভিক্ষু কর্তৃক দূরীভূত হয়, উদ্গীর্ণ হয়, মুক্ত হয়, লুপ্ত হয়, পরিবর্জিত হয়। এইরূপে ভিক্ষু সাম্প্রদায়িক মতামত ত্যাগী হন। কিরূপে ভিক্ষু সর্ব বাসনা হইতে মুক্ত হন? ভিক্ষুর কামেষণা ও ভবেষণা পরিত্যক্ত হয়, ব্রহ্মচর্যেষণা শান্ত হয়। এইরূপে ভিক্ষু সর্ববাসনা হইতে মুক্ত হন। কিরূপে ভিক্ষু অনাবিল-সংকল্প হন? ভিক্ষুর কাম-সংকল্প পরিত্যক্ত হয়, ব্যাপাদ ও বিহিংসা-সংকল্প পরিত্যক্ত হয়। এইরূপে ভিক্ষু অনাবিল-সংকল্প হন। ভিক্ষু কিরূপে প্রশ্রব্ধ-কায় সংস্কার হন? ভিক্ষু সুখ ও দুঃখ উভয়ই বর্জন করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্যের তিরোভাব সাধন করিয়া, না-দুঃখ না-সুখ রূপ উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া বিরাজ করেন। এইরূপে ভিক্ষু প্রশ্রব্ধ-কায়-সংস্কার হন। কিরূপে ভিক্ষু সুবিমুক্ত-চিত্ত হন? ভিক্ষুর চিত্ত রাগ হইতে বিমুক্ত হয়, দ্বেষ হইতে বিমুক্ত হয়, মোহ হইতে বিমুক্ত হয়। ভিক্ষু এইরূপে সুবিমুক্ত-চিত্ত হন। কিরূপে ভিক্ষু সুবিমুক্ত-প্রজ্ঞ হন? ভিক্ষু অবগত হন যে, তাঁহার রাগ, দ্বেষ, ও মোহ পরিত্যক্ত, উচ্ছিন্ন-মূল, ভিত্তিচ্যুত তালবৃক্ষ-সম, অস্তিত্বহীন এবং পুনরায় উৎপত্তির অযোগ্য হইয়াছে। এইরূপে ভিক্ষু সুবিমুক্ত-প্রজ্ঞ হন।
(৬) দশ অশৈক্ষ্য ধর্ম : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্মান্ত, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি, সম্যক জ্ঞান (অন্তর্দৃষ্টি), সম্যক বিমুক্তি।
বন্ধুগণ, জ্ঞান ও দর্শনসম্পন্ন ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক এই দশ ধর্ম সম্যকরূপে আখ্যাত হইয়াছে। সকলে একত্রে উহার সঙ্গায়ন করিতে হইবে, যাহাতে এই ব্রহ্মচর্য্য ব্যাপক ও দীর্ঘকাল স্থায়ী হয়, বহুজনের হিত ও সুখবিধায়ক হয়, জগতের প্রতি অনুকম্পাকারক হয়, দেব ও মনুষ্যের হিত সাধক হয়।
৩৪৯. অনন্তর ভগবান আসন হইতে উত্থান করিয়া আয়ুষ্মান সারিপুত্রকে সম্বোধন করিলেন, “সারিপুত্র, সাধু, সাধু! তুমি উত্তমরূপে ভিক্ষুগণকে সংগীতি পর্যায় বলিয়াছ।”
সারিপুত্র এইরূপ বলিয়াছিলেন। ভগবান উহার অনুমোদন করিয়াছিলেন। আনন্দিত চিত্তে ভিক্ষুগণ সারিপুত্রের বাক্যের অভিনন্দন করিলেন।
সংগীতি সূত্রান্ত সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [২]
English
Việt Ngữ