লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৫]

অম্বট্ঠ সূত্র

২৫৪. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। একদা ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘের সহিত কোশল দেশে ভ্রমণ করিতে করিতে ইচ্ছানঙ্কল নামক কোশলদিগের ব্রাহ্মণ গ্রামে উপনীত হইলেন। ওই স্থানে অবস্থিতিকালে তিনি ইচ্ছানঙ্কল অরণ্যে বাস করিতে লাগিলেন। ওই সময়ে ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি রাজভোগ্য, রাজদায় ব্রহ্মদেয়রূপে কোশলরাজ প্রসেনজিৎ কর্তৃক প্রদত্ত, জনাকীর্ণ, তৃণকাষ্ঠ-উদক-ধান্যসম্পন্ন উক্কট্ঠায় বাস করিতেছিলেন।

২৫৫. ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি শুনিলেন, “শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘের সহিত কোশল দেশে ভ্রমণ করিতে করিতে ইচ্ছানঙ্কলে উপনীত হইয়া তত্রস্থ ইচ্ছানঙ্কল অরণ্যে অবস্থিতি করিতেছেন। সেই পূজ্য গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, “ইনিই ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয়, দম্য-পুরুষ-সারথি, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবন্ত; ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যগণকে সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভূত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হইয়া তিনি উপদিষ্ট করেন; তিনি ধর্মের উপদেশ দান করেন-যে ধর্মের প্রারম্ভ কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যাহা অর্থ ও শব্দ সম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন পূর্ণতাপ্রাপ্ত; তিনি বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য্য প্রকাশ করেন, তাদৃশ অর্হতের দর্শন শুভজনক।”

২৫৬. ওই সময়ে ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির অম্বট্ঠ নামে একজন তরুণ শিষ্য ছিল। তিনি অধ্যায়ক ও মন্ত্রধর ছিলেন, ত্রিবেদ, নির্ঘণ্ট এবং বেদনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পদ্ধতিসমূহ, শব্দতত্ত্ব এবং ইতিহাসরূপ পঞ্চম বেদে পূর্ণ পারদর্শী ছিলেন। তিনি পদ-পাঠজ্ঞ, বৈয়াকরণিক, কূটতর্কবিদ্যানিপুণ ও মহাপুরুষ লক্ষণ জ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন। আচার্যের ত্রিবিদ্যা-বিষয়ক প্রবচনে তাঁহার পাণ্ডিত্য এতই স্বীকৃত হইত যে তিনি বলিতে পারিতেন, “যাহা আমি জানি তাহা তুমি জান, যাহা তুমি জান, তাহা আমি জানি।”

২৫৭. অনন্তর ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি অম্বট্ঠকে সম্বোধন করিলেন, “তাত অম্বট্ঠ, শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত হইয়া পঞ্চশত… করিতেছেন। সেই পূজ্য গৌতমের সম্বন্ধে… শুভজনক। তাত অম্বট্ঠ, এস, শ্রমণ গৌতমের নিকট গমন করো এবং অনুসন্ধান করো যে তাঁহার সম্বন্ধে যে যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, উহা যথার্থ কি না, তিনি যেরূপে ঘোষিত হইয়াছেন সেইরূপ কি না; এইরূপেই আমরা গৌতমকে জানিতে পারিব।”

অম্বট্ঠের বুদ্ধের নিকট গমন

২৫৮. “কিন্তু, ব্রাহ্মণ, আমি কীরূপে জানিব যে গৌতমের সম্বন্ধে যে যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, উহা যথার্থ কি না, তিনি যেইরূপে ঘোষিত হইয়াছেন সেইরূপ কি না?”

“বৎস, অম্বট্ঠ, আমাদিগের মন্ত্রসমূহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণপ্রাপ্ত হওয়া যায়, ওই লক্ষণ-সমন্বিত মহাপুরুষের মাত্র দুই প্রকার গতি, অন্য নাই। গৃহবাসী হইলে তিনি রাজচক্রবর্তী, ধার্মিক, ধর্মরাজ, চতুরন্তবিজেতা, প্রজাবর্গের নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সপ্তরত্ন-সমন্বিত। এই সকল তাঁহার সপ্তরত্ন; যথা : চক্ররত্ন, হস্তীরত্ন, অশ্বরত্ন, মনিরত্ন, স্ত্রীরত্ন, গৃহপতি রত্ন এবং সপ্তরত্নস্বরূপ মন্ত্রীরত্ন। তাঁহার সহস্রাধিক পুত্র সাহসী, বীরোপম, শত্রুসেনামর্দন; তিনি সসাগরা পৃথিবী বিনাদণ্ডে ও বিনা অস্ত্রে, মাত্র ধর্মের দ্বারা জয় করিয়া বাস করেন। যদি তিনি গৃহত্যাগ করিয়া প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেন, তিনি পৃথিবীতে আবরণমুক্ত সম্যকসম্বুদ্ধ অর্হত্ত্বপদ প্রাপ্ত হন। বৎস অম্বট্ঠ, আমি মন্ত্রদাতা, তুমি মন্ত্রর গ্রহীতা।”

২৫৯. অম্বট্ঠ, প্রত্যুত্তরে “উত্তম” বলিয়া আসন হইতে উত্থান করিয়া ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতিকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণপূর্বক বড়বা-রথে আরোহণপূর্বক বহুসংখ্যক যুবকের সহিত ইচ্ছানঙ্কল অরণ্যে গমন করিলেন। যতদূর যানভূমি ততদূর যানে গমন করিয়া পরে পদব্রজে আরামে প্রবেশ করিলেন।

ওই সময়ে বহুসংখ্যক ভিক্ষু উন্মুক্ত স্থানে পদচারণা করিতেছিলেন। অম্বট্ঠ ওই সকল ভিক্ষুদিগের নিকটে গমন করিয়া বলিলেন, “পূজনীয় গৌতম এক্ষণে কোথায় অবস্থান করিতেছেন? আমরা তাঁহার দর্শনের নিমিত্ত এই স্থানে আগত হইয়াছি।”

২৬০. তদনন্তর ভিক্ষুগণ চিন্তা করিলেন, “এই যুবক অম্বট্ঠ প্রসিদ্ধ বংশজাত এবং বিখ্যাত ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির অন্তেবাসী। এবম্বিধ কুলপুত্রের সহিত বাক্য বিনিময় ভগবানের অরুচিকর হইবে না।” তাঁহারা অম্বট্ঠকে বলিলেন, “ওই রুদ্ধদ্বার বিহার, ওই স্থানে নিঃশব্দে ধীর পদবিক্ষেপে গমনপূর্বক অলিন্দে প্রবেশ করিয়া কাশির শব্দ করিবে, পরে অর্গলে আঘাত করিবে। ভগবান তোমার জন্য দ্বার খুলিয়া দিবেন।”

২৬১. অনন্তর অম্বট্ঠ নিঃশব্দে রুদ্ধদ্বার বিহারে গমনপূর্বক ধীর পদবিক্ষেপে অলিন্দে প্রবেশ করিলেন এবং কাশির শব্দ করিয়া অর্গলে আঘাত করিলেন। ভগবান দ্বার খুলিয়া দিলেন, অম্বট্ঠ ভিতরে প্রবেশ করিলেন। সঙ্গী যুবকগণও ভিতের প্রবেশ করিয়া ভগবানের সহিত প্রীত্যালাপব্যঞ্জক বাক্যের বিনিময়ান্তে এক প্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন। কিন্তু অম্বট্ঠ চঙ্ক্রমণ করিতে করিতেও উপবিষ্ট ভগবানের সহিত স্বল্পমাত্রায় বাক্যালাপ করিলেন এবং স্থিত হইয়াও ওইরূপ করিলেন।

২৬২. তৎপরে ভগবান অম্বট্ঠকে বলিলেন, “অম্বট্ঠ, তুমি কি এইরূপেই বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আচার্য-প্রাচার্যগণের সহিত বাক্যালাপ করিয়া থাক যেরূপ আমি উপবিষ্ট হইলেও তুমি চলিতে চলিতে এবং স্থিত হইয়া আমার সহিত করিতেছ?”

২৬৩. “না, গৌতম। যে ব্রাহ্মণ চলিতেছেন, চলিতে চলিতে তাঁহার সহিত বাক্যালাপ বিধেয়; যে ব্রাহ্মণ স্থিত, স্থিত হইয়া তাঁহার সহিত বাক্যালাপ বিধেয়; যে ব্রাহ্মণ উপবিষ্ট, উপবিষ্ট হইয়া তাঁহার সহিত বাক্যালাপ বিধেয়। যে ব্রাহ্মণ শায়িত, শায়িত হইয়া তাঁহার সহিত বাক্যালাপ বিধেয়। কিন্তু গৌতম, যাহারা মুণ্ডিত-মস্তক, কৃত্রিম শ্রমণ, ইভ্য (নিচ) কৃষ্ণকায়, ব্রহ্মার পাদ হইতে উৎপন্ন, তাহাদের সহিত আমার এইরূপই বাক্যালাপ হয় যেরূপ গৌতমের সহিত হইল।”

“কিন্তু, অম্বট্ঠ, তুমি অর্থীরূপে এইস্থানে আগত, যে অভীষ্ট লইয়া তুমি আসিয়াছ উহাতেই উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো। অম্বট্ঠ অশিক্ষিত, তথাপি যে তিনি শিক্ষাভিমানী শিক্ষার অভাবই তাহার কারণ, তদ্ভিন্ন অন্য কী কারণ থাকিতে পারে?”

২৬৪. অম্বট্ঠ ভগবান কর্তৃক অশিক্ষিত উক্ত হইয়া কুপিত ও অসন্তুষ্ট হইলেন; “আমি শ্রমণ গৌতমের বিরাগভাজন” ইহা চিন্তা করিয়া তিনি ভগবানের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করিয়া, তাঁহাকে বিদ্রুপ করিয়া, তাঁহার নিন্দাবাদ করিয়া বলিলেন, “হে গৌতম, শাক্যজাতি কোপনস্বভাব, পুরুষভাষী, অব্যবস্থিতচিত্ত এবং দুর্দান্ত। ওই নীচ জাতি ব্রাহ্মণের সৎকার করে না, ব্রাহ্মণের গুরুত্ব স্বীকার করে না; ব্রাহ্মণকে সম্মান করে না, পূজা করে না, সম্ভ্রম করে না। এইরূপ ব্যবহার অযোগ্য, বিসদৃশ।” এইরূপে শাক্যদিগকে নীচ আখ্যা দিয়া অম্বট্ঠের প্রথম আক্রমণ হইল।

২৬৫. অম্বট্ঠ, শাক্যগণ তোমার নিকট কীরূপে অপরাধী?”

গৌতম, একদা ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির কোনো কার্যোপলক্ষে আমি কপিলবাস্তু গমন করিয়াছিলাম। এবং তত্রস্থ শাক্যদিগের মন্ত্রণাগৃহে উপনীত হইয়াছিলাম। ওই সময়ে বহু শাক্য এবং শাক্য কুমারগণ মন্ত্রণাগৃহে উচ্চাসনে উপবিষ্ট ছিলেন। তাঁহারা পরস্পর পরস্পরের দেহে অঙ্গুলি সঞ্চালনপূর্বক হাস্য-কৌতুকে রত ছিলেন। আমার ধারণা তাঁহারা নিঃসন্দেহ আমাকেই লক্ষ করিয়া ওইরূপ করিতেছিলেন। তাঁহারা কেহই আমাকে একখানি আসন পর্যন্ত দান করেন নাই। হে গৌতম, শাক্যগণ স্বয়ং নীচ, নীচ সমান হইয়াও তাঁহাদের ব্রাহ্মণের সৎকারে, ব্রাহ্মণের গুরুত্ব স্বীকারে, ব্রাহ্মণের সম্মানে, ব্রাহ্মণের পূজায় এবং ব্রাহ্মণের সম্ভ্রমকরণে বিরতি অযোগ্য, বিসদৃশ।” এইরূপে শাক্যদিগকে নীচ আখ্যা দিয়া অম্বট্ঠের দ্বিতীয় আক্রমণ হইল।

২৬৬. “অম্বট্ঠ, তিতির পক্ষীগণও আপন নীড়ে স্বচ্ছন্দে আলাপ করে, সেইরূপ কপিলবাস্তুও শাক্যদিগের আপন স্থান। এই সামান্য বিষয়ের জন্য ক্রোধপরবশ হওয়া তোমার উচিত নয়।”

“হে গৌতম, “বর্ণ চতুর্বিধ-ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বৈশ্য এবং শূদ্র। এই চতুর্বর্ণের মধ্যে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্ররূপ ত্রিবর্ণ অবশ্যই ব্রাহ্মণের পরিচারক। হে গৌতম, শাক্যগণ স্বয়ং নিচ… বিসদৃশ,” এইরূপে শাক্যদিগকে নীচ আখ্যা দিয়া অম্বট্ঠের তৃতীয় আক্রমণ হইল।

২৬৭. তৎপরে ভগবান এইরূপ চিন্তা করিলেন, “এই অম্বট্ঠ শাক্যদিগকে নীচ আখ্যা দ্বারা অতিশয় নিগৃহীত করিতেছে। আমি তাহাকে তাহার গোত্র জিজ্ঞাসা করিব।” তদনন্তর ভগবান অম্বট্ঠকে বলিলেন, “অম্বট্ঠ, তোমার গোত্র কী?”

“হে গৌতম, আমি “কহ্নায়ন” গোত্র।”

“অম্বট্ঠ, তোমার মাতাপিতার পুরাতন নামগোত্র অনুসরণ করিলে শাক্যেরা তোমার আর্যপুত্র হয়, তুমি শাক্যদিগের দাসীপুত্র হও। শাক্যগণ রাজা ইক্ষাকুকে পিতামহরূপে গ্রহণ করেন। অম্বট্ঠ, পূর্বকালে ইক্ষাকু প্রিয়া মনোহারিণী মহিষীর পুত্রকে রাজ্যের উত্তরাধিকারী করিবার অভিপ্রায়ে জ্যেষ্ঠ কুমারগণকে রাষ্ট্র হইতে নির্বাসিত করিয়াছিলেন; তাহাদের নাম-ওক্কামুখ, করণ্ডু, হত্থিনিক এবং সিনিপুর। তাহারা রাজ্য হইতে নির্বাসিত হইয়া হিমালয়ের পার্শ্বদেশে এক পুষ্করিণীর তীরে যেখানে এক বিশাল শাকবৃক্ষ ছিল সেইস্থানে বাস করিয়াছিল। তাহারা জাতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য স্বীয় ভগ্নীগণের সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিল।

একদিন রাজা ইক্ষাকু অমাত্য পরিষদবর্গকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “কুমারগণ, এক্ষণে কোথায়?”

“দেব, হিমালয়ের পার্শ্বদেশে এক পুষ্করিণীর তীরে যেখানে এক বিশাল শাকবৃক্ষ আছে সেইস্থানে কুমারগণ এক্ষণে অবস্থিতি করিতেছেন। তাঁহারা জাতির বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য স্বীয় ভগ্নীগণের সহিত পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছেন।”

“ইহা শুনিয়া রাজা ইক্ষাকুর মুখ হইতে প্রশংসার উচ্ছ্বাস নির্গত হইল, “কুমারগণ সত্যই শাক্য, তাহারা পরম শাক্য।”

কৃষ্ণের জন্ম

“অম্বট্ঠ, উহা হইতেই শাক্য নামের উৎপত্তি হইয়াছে। তিনিই শাক্যদিগের পূর্বপুরুষ। কিন্তু রাজা ইক্ষাকুর দিশা নাম্নী এক দাসী ছিল। সে কৃষ্ণবর্ণ সন্তান প্রসব করিয়াছিল। ভূমিষ্ঠ হইয়া কৃষ্ণকায় সন্তান বলিল, “মা, আমাকে ধৌত করো, স্নাত করো, এই অশুচি হইতে আমাকে মুক্ত করো, ইহা করিলে আমি তোমার উপকারকরণে সক্ষম হইব।” অম্বট্ঠ, এক্ষণে যেরূপ মনুষ্য পিশাচকে পিশাচ বলিয়া জানে, সেইরূপ ওই সময় তাহারা পিশাচকে কৃষ্ণ অভিহিত করিত। তাহারা বলিল, “ভূমিষ্ঠ হইয়াই ইহার বাক্যস্ফুরণ হইয়াছে, ইহা কৃষ্ণবর্ণ, ইহা পিশাচ।” ওই সময় হইতেই কহ্নায়নদিগের উৎপত্তি। সে-ই কহ্নায়নদিগের পূর্বপুরুষ। অম্বট্ঠ এইরূপে তোমার মাতাপিতার পুরাতন নামগোত্র অনুসরণ করিলে শাক্যগণ তাহাদের প্রভু হয়, তুমি শাক্যদিগের দাসীপুত্র হও।”

২৬৮. এইরূপ কথিত হইলে তরুণ ব্রাহ্মণগণ ভগবানকে বলিলেন, “পূজ্য গৌতম, আপনি দাসীপুত্ররূপ কঠিন অপবাদ দ্বারা অম্বট্ঠকে নিগৃহীত করিবেন না, অম্বট্ঠ সুজাত, কুলপুত্র, বহুশ্রুত, সুভাষ, পণ্ডিত; তিনি এই বিষয়ে গৌতমকে প্রত্যুত্তর দানে সক্ষম।”

২৬৯. ভগবান ওই তরুণদিগকে বলিলেন, “যদি তোমরা মনে করো “অম্বট্ঠ দুর্জাত, অকুলপুত্র, অল্পশ্রুত, দুর্ভাষ, দুষ্প্রাজ্ঞ, শ্রমণ গৌতমকে এই বিষয়ে প্রত্যুত্তর দানে অক্ষম”, তাহা হইলে অম্বট্ঠ ক্ষান্ত হউক, তোমরাই আমার সহিত বিচারে প্রবৃত্ত হও। কিন্তু যদি তোমরা মনে করো, “অম্বট্ঠ সুজাত, কুলপুত্র, বহুশ্রুত, সুভাষ, পণ্ডিত; শ্রমণ গৌতমকে এই বিষয়ে প্রত্যুত্তর দানে সক্ষম”, তাহা হইলে তোমরা ক্ষান্ত হও, অম্বট্ঠই আমার সহিত বিচারে প্রবৃত্ত হউক।”

“হে গৌতম, অম্বট্ঠ সুজাত, কুলপুত্র… সক্ষম। আমরা কিছুই বলিব না। অম্বট্ঠই পূজ্য গৌতমের সহিত এই বিষয়ে বিচার করিবেন।”

২৭০. তৎপরে ভগবান অম্বট্ঠকে এইরূপ বলিলেন, “অম্বট্ঠ, এক্ষণে একটি যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন আসিতেছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তোমাকে উহার উত্তর দিতে হইবে। যদি না দাও, অথবা বিক্ষেপের আশ্রয় লও, অথবা তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করো, অথবা চলিয়া যাও, তাহা হইলে এই স্থানেই তোমার মস্তক সপ্তধা বিদীর্ণ হইবে।

বজ্রপাণি যক্ষ

অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? কহ্নায়নদিগের উৎপত্তি কিসে হইল, কে তাহাদের পূর্বপুরুষ, ইহা কি বৃদ্ধ-অতিবৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আচার্য-প্রাচার্যগণকে বলিতে শুনিয়াছ?”

এইরূপ উক্ত হইলে অম্বট্ঠ মৌন রহিলেন। দ্বিতীয়বার ভগবান অম্বট্ঠকে একই প্রশ্ন করিলেন। দ্বিতীয়বারও অম্বট্ঠ মৌন রহিলেন।

তদনন্তর ভগবান অম্বট্ঠকে বলিলেন, “অম্বট্ঠ, উত্তর দাও, এখন তোমার মৌনাবলম্বনের সময় নয়। যে কেহ তথাগত কর্তৃক তৃতীয়বারও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইয়া উত্তরদানে বিরত হয়, তৎক্ষণাৎ তাহার মস্তক সপ্তধা বিদীর্ণ হয়।”

২৭১. ওই সময় ব্রজপাণি যক্ষ আদীপ্ত, সম্প্রজ্জ্বলিত, জ্যোতিসংযুক্ত লৌহদণ্ড লইয়া আকাশে অম্বট্ঠের শিরোপরি স্থিত হইলেন, “যদি এই অম্বট্ঠ ভগবান কর্তৃক তৃতীয়বারও যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইয়া উত্তরদানে বিরত হয়, তাহা হইলে এই স্থানেই তাহার মস্তক সপ্তধা বিদীর্ণ করিব।” বজ্রপাণি যক্ষকে ভগবান এবং অম্বট্ঠ উভয়েই দর্শন করিলেন।

২৭২. অনন্তর ওই দৃশ্য দেখিয়া অম্বট্ঠ ভীত, সংবিগ্ন, লোমহর্ষজাত হইয়া ভগবানের নিকট ত্রাণ ভিক্ষা করিলেন, আশ্রয় ভিক্ষা করিলেন, শরণ ভিক্ষা করিলেন, উপবিষ্ট হইয়া ভগবানকে বলিলেন, “পূজ্য গৌতম কী বলিলেন? পুনরায় বলুন।”

“অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? কহ্নায়নদিগের উৎপত্তি কিসে হইল, কে তাহাদের পূর্বপুরুষ, ইহা কি বৃদ্ধ-অতিবৃদ্ধ-ব্রাহ্মণ আচার্য-প্রাচার্যগণকে বলিতে শুনিয়াছ?”

“পূজ্য গৌতম যেরূপ বলিলেন আমি সেইরূপই শুনিয়াছি; ওইরূপেই কহ্নায়নদিগের উৎপত্তি হইয়াছে, সে-ই কহ্নায়নদিগের পূর্বপুরুষ।

২৭৩. এইরূপ উক্ত হইলে যুবকগণ উন্নাদ, উচ্চশব্দ, মহাশব্দ করিতে আরম্ভ করিল, “অম্বট্ঠ দুর্জাত, অকুলপুত্র, শাক্যদিগের দাসীপুত্র, শাক্যগণ অম্বট্ঠের প্রভু। ধর্মবাদী শ্রমণ গৌতমকে আমরা অশ্রদ্ধেয় মনে করিয়াছিলাম।”

২৭৪. তৎপরে ভগবান চিন্তা করিলেন, “এই তরুণগণ, অম্বট্ঠকে দাসীপুত্ররূপে অভিহিত করিয়া অতিশয় নিগৃহীত করিতেছে, আমি তাহাকে এই নিগ্রহ হইতে মুক্ত করিব।” এইরূপ চিন্তা করিয়া তিনি তাহাদিগকে বলিলেন, “তরুণগণ, তোমরা অম্বট্ঠকে দাসীপুত্র বলিয়া তাঁহার অত্যধিক নিগ্রহ করিও না। সেই কহ্ন মহাঋষি হইয়াছিলেন।

জাতিগর্বের ব্যর্থতা

তিনি দক্ষিণ জনপদে গমনপূর্বক ব্রহ্মমন্ত্র অধ্যয়ন করেন এবং পরে রাজা ইক্ষাকুর নিকট গমন করিয়া তাঁহার ক্ষুদ্ররূপী নামক কন্যার পাণি প্রার্থনা করেন। রাজা ইক্ষাকু “কে রে এই দাসীপুত্র যে আমার ক্ষুদ্ররূপী কন্যার পাণি প্রার্থনা করে?” বলিয়া ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট হইয়া শর সন্ধান করিলেন। কিন্তু তিনি ওই শর নিক্ষেপ করিতেও পারিলেন না, বিযুক্ত করিতেও পারিলেন না। তৎপরে অমাত্য ও পরিষদবর্গ ঋষি কহ্নের নিকট গমন করিয়া বলিলেন :

“ভদন্ত, রাজার মঙ্গল হউক, রাজার মঙ্গল হউক।”

“রাজার মঙ্গল হইবে যদি তিনি অধোদিকে শর নিক্ষেপ করেন, কিন্তু যতদূর রাজার রাজ্য ততদূর পৃথ্বী বিদীর্ণ হইবে।”

“ভদন্ত, রাজার মঙ্গল হউক, জনপদের মঙ্গল হউক।”

“রাজার মঙ্গল হইবে, জনপদের মঙ্গল হইবে, যদি রাজা ঊর্ধ্বে শর নিক্ষেপ করেন, কিন্তু যতদূর রাজার রাজ্য ততদূর সাত বৎসর ধরিয়া বৃষ্টি হইবে না।”

“ভদন্ত, রাজার মঙ্গল হউক, জনপদের মঙ্গল হউক, বারি বর্ষণ হউক।”

“রাজার মঙ্গল হইবে, জনপদের মঙ্গল হইবে, বৃষ্টি হইবে, যদি রাজা জ্যেষ্ঠ কুমারের প্রতি শর নিক্ষেপ করেন, কুমার স্বস্তির সহিত নিরাপদ রহিবেন।”

“হে ব্রাহ্মণগণ, তৎপরে অমাত্যবর্গ ইক্ষাকুর নিকট নিবেদন করিলেন, “রাজা জ্যেষ্ঠ কুমারের প্রতি শর নিক্ষেপ করুন, কুমার স্বস্তির সহিত নিরাপদ রহিবেন।” রাজা ইক্ষাকু জ্যেষ্ঠ কুমারের প্রতি শর নিক্ষেপ করিলেন; কুমার স্বস্তির সহিত নিরাপদে রহিলেন। তদনন্তর রাজা ইক্ষাকু ব্রহ্মদণ্ডভয়ে ভীত হইয়া কন্যা ক্ষুদ্রারূপীকে ঋষির হস্তে সমর্পণ করিলেন। হে ব্রাহ্মণগণ, তোমরা অম্বট্ঠকে দাসীপুত্র বলিয়া তাঁহার অত্যধিক নিগ্রহ করিও না। সেই কহ্ন মহাঋষি ছিলেন।”

২৭৫. তদনন্তর ভগবান অম্বট্ঠকে বলিলেন :

“তুমি কীরূপ মনে করো, অম্বট্ঠ? ক্ষত্রিয় কুমার ব্রাহ্মণ কন্যার সহিত সহবাস করিল। ওই সহবাসের ফলে পুত্র জন্মিল। ক্ষত্রিয় কুমার দ্বারা ব্রাহ্মণ কন্যার জাত পুত্র ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে আসন এবং জল পাইবে কি?

“পাইবে, গৌতম।”

“কিন্তু ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে শ্রাদ্ধে, স্থালীপাকে , যজ্ঞে কিম্বা ব্রাহ্মণ ভোজনে আহারের জন্য নিমন্ত্রণ করিবে?”

মিশ্র জাতি

“করিবে, গৌতম।”

“কিন্তু ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে মন্ত্রশিক্ষা দিবে অথবা দিবে না?”

“দিবে, গৌতম।”

“কিন্তু ব্রাহ্মণ জাতির মধ্য হইতে স্ত্রী গ্রহণ তাহার পক্ষে কি নিষিদ্ধ, অথবা নহে?”

“নিষিদ্ধ নহে।”

“কিন্তু ক্ষত্রিয়গণ কি তাহাকে ক্ষত্রিয়ের অভিষেকে অভিষিক্ত করিবে?”

“না, তাহা করিবে না।”

“কী কারণে করিবে না?”

“মাতৃপক্ষ হইতে তাহার জাতি বিশুদ্ধ নয়।”

“অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? ব্রাহ্মণকুমার ক্ষত্রিয় কন্যার সহিত সহবাস করিল। ওই সহবাসের ফলে পুত্র জন্মিল। ব্রাহ্মণকুমার দ্বারা ক্ষত্রিয় কন্যার জাত পুত্র ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে আসন এবং জল পাইবে কি?”

“পাইবে।”

“কিন্তু ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে শ্রাদ্ধে, স্থালীপাকে, যজ্ঞে কিম্বা ব্রাহ্মণ ভোজনে আহারের জন্য নিমন্ত্রণ করিবে?”

“করিবে।”

“কিন্তু ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে মন্ত্রশিক্ষা দিবে অথবা দিবে না?”

“দিবে।”

“কিন্তু ব্রাহ্মণ জাতির মধ্য হইতে স্ত্রী গ্রহণ তাহার পক্ষে কি নিষিদ্ধ অথবা নহে?”

“নিষিদ্ধ নহে।”

“কিন্তু ক্ষত্রিয়গণ কি তাহাকে ক্ষত্রিয়ের অভিষেকে অভিষিক্ত করিবে?”

“না, তাহা করিবে না।”

“কী কারণে করিবে না?”

“পিতৃপক্ষ হইতে তাহার জাতি বিশুদ্ধ নয়।”

২৭৬. “এইরূপে, অম্বট্ঠ, স্ত্রী কিম্বা পুরুষ উভয় পক্ষ হইতেই ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ এবং ব্রাহ্মণ হীন। তুমি কীরূপ মনে করো? যদি ব্রাহ্মণগণ কোনো কারণে অপর এক ব্রাহ্মণের মস্তক মুণ্ডন করিয়া, তাহার মস্তক ভস্মাবৃত করিয়া, তাহাকে রাষ্ট্র কিম্বা নগর হইতে বহিষ্কৃত করে, সে ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে আসন এবং জল পাইবে কি?

“পাইবে না, গৌতম।”

“ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে শ্রাদ্ধে, স্থালীপাকে, যজ্ঞে কিম্বা ব্রাহ্মণ ভোজনে আহারের নিমন্ত্রণ করিবে?”

“হে গৌতম, করিবে না।”

“ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে মন্ত্রশিক্ষা দিবে অথবা দিবে না?”

“দিবে না, গৌতম।

“ব্রাহ্মণ জাতির মধ্য হইতে স্ত্রী গ্রহণ তাহার পক্ষে কি নিষিদ্ধ অথবা নহে?”

“উহা নিষিদ্ধ, গৌতম।”

“অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? যদি ক্ষত্রিয়গণ কোনো কারণে অপর এক ক্ষত্রিয়ের মস্তক মুণ্ডন করিয়া, তাহার মস্তক ভস্মাবৃত করিয়া, তাহাকে রাষ্ট্র হইতে কিম্বা নগর হইতে বহিষ্কৃত করে, সে ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে আসন এবং জল পাইবে কি?”

“পাইবে, গৌতম।”

“ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে শ্রাদ্ধে, স্থালীপাকে, যজ্ঞে কিম্বা ব্রাহ্মণ ভোজনে আহারের নিমন্ত্রণ করিবে?”

“করিবে।”

“ব্রাহ্মণগণ কি তাহাকে মন্ত্রশিক্ষা দিবে অথবা দিবে না?”

“দিবে, গৌতম।”

“ব্রাহ্মণ জাতির মধ্য হইতে স্ত্রী গ্রহণ তাহার পক্ষে কি নিষিদ্ধ অথবা নহে?”

“নিষিদ্ধ নহে।”

২৭৭. “কিন্তু, অম্বট্ঠ, যদি ক্ষত্রিয়গণ কোনো ক্ষত্রিয়ের মস্তক মুণ্ডন করিয়া, তাহার মস্তক ভস্মাবৃত করিয়া, তাহাকে রাষ্ট্র কিম্বা নগর হইতে বহিষ্কৃত করে, তাহা হইলে উহা তাহার পক্ষে চরম অধঃপতন। এইরূপে, অম্বট্ঠ, ক্ষত্রিয়ের চরম অধঃপতন হইলেও ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ এবং ব্রাহ্মণ হীন।

“হে অম্বট্ঠ, ব্রহ্মা সনৎকুমার ও এই গাথায় উচ্চারণ করিয়াছিলেন :

“যাহারা গোত্রসেবী তাহাদের মধ্যে ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ,
যিনি বিদ্যাচরণসম্পন্ন, তিনি দেবমনুষ্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”

“হে অম্বট্ঠ, ব্রহ্মা সনৎকুমার কর্তৃক গীত সেই গাথা সুগীত, দুর্গীত নহে; সুভাষিত, দুর্ভাষিত নহে; অর্থসংহতি, নিরর্থক নহে। আমিও উহার অনুমোদন করি। আমিও বলি :

“যাহারা গোত্রসেবী তাহাদের মধ্যে ক্ষত্রিয় শ্রেষ্ঠ,
যিনি বিদ্যাচরণসম্পন্ন, তিনি দেবমনুষ্যের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।”

প্রথম ভাণবার সমাপ্ত।

জাত্যাভিমান

২৭৮. “হে গৌতম, গাথায় উক্ত সেই আচরণ এবং বিদ্যা কী?” অম্বট্ঠ, যেখানে বিদ্যাচরণ পূর্ণতাপ্রাপ্ত, যেখানে জাতিবাদের স্থান নাই, গোত্রবাদের স্থান নাই, “তুমি আমার যোগ্য অথবা তুমি আমার অযোগ্য” এইরূপ মানবাদের স্থান নাই। অম্বট্ঠ, যেখানে আবাহ কিম্বা বিবাহ কিম্বা আবাহ-বিবাহ হয়, সেখানেই জাতিবাদের উল্লেখ হয়, গোত্রবাদের উল্লেখ হয়, “তুমি আমার যোগ্য অথবা তুমি আমার অযোগ্য” এইরূপ মানবাদের উল্লেখ হয়। অম্বট্ঠ, যাহারাই জাতিবাদ বিনিবদ্ধ, গোত্রবাদ বিনিবদ্ধ অথবা আবাহ বিনিবদ্ধ, তাহারাই অনুত্তর বিদ্যাচরণ হইতে দূরে। অম্বট্ঠ, জাতিবাদ, গোত্রবাদ, মানবাদ এবং আবাহ-বিবাহরূপ বন্ধন পরিহার করিয়াই অনুত্তর বিদ্যাচরণ পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়।”

২৭৯. “হে গৌতম, কী সেই আচরণ, কী সেই বিদ্যা?”

“মহারাজ, মনে করুন জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে…

[এইস্থানে শ্রামণ্যফল সূত্রের ১৯১ অনুচ্ছেদের ন্যায় পুনরাবৃত্তি হইয়াছে] অম্বট্ঠ, এইরূপে ভিক্ষু শীলসম্পন্ন হন।

[তৎপরে ব্রহ্মজাল সূত্রের ৮–২৭ নং পদচ্ছেদে উক্ত শীলসমূহ উল্লিখিত হইয়াছে, বর্ণিত প্রত্যেক শীলের শেষে “এইরূপে শীলসম্পত্তি হয়” পাঠ করিতে হইবে। তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ১৯৪–২১২ নং পদচ্ছেদে উক্ত আচরণসমূহ উল্লিখিত হইয়াছে, বর্ণিত প্রত্যেক আচরণের শেষে “এইরূপে শীলসম্পত্তি হয়” পাঠ করিতে হইবে। তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ২২৬–২৩৩ নং পদচ্ছেদে উক্ত চারি ধ্যান উল্লিখিত হইয়াছে, বর্ণিত প্রত্যেক ধ্যানের শেষে “এইরূপে আচরণসম্পত্তি হয়” পাঠ করিতে হইবে।] অম্বট্ঠ ইহাই আচরণ সম্পত্তি।

[তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ২৩৬–২৪৯ নং পদচ্ছেদসমূহে উক্ত জ্ঞানদর্শন, মনোময় কায়, ঋদ্ধি, দিব্যশ্রোত্র, চেতপর্যায় জ্ঞান, পূর্বজন্মানুস্মৃতি, দিব্যচক্ষু এবং আসবক্ষয় উল্লিখিত হইয়াছে, বর্ণিত প্রত্যেক বিষয়ের শেষে “ইহাই বিদ্যাসম্পত্তি” পাঠ করিতে হইবে।] অম্বট্ঠ, ইহাই বিদ্যা।

তপশ্চর্যা

“অম্বট্ঠ, এই ভিক্ষুই বিদ্যাসম্পন্ন, আচরণসম্পন্ন, বিদ্যাচরণসম্পন্ন হন। অম্বট্ঠ, এই বিদ্যাসম্পদা, এই চরণসম্পদা অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর, মধুরতর অপর কোনো বিদ্যাচরণ-সম্পদা নাই।

২৮০. “অম্বট্ঠ, এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার চারিটি বিঘ্ন আছে। ওই চারি বিঘ্ন কী কী? অম্বট্ঠ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া অরণি, কমণ্ডলু, সূচী ইত্যাদি তাপসের ব্যবহার্য দ্রব্যাদি বহন করিয়া “ফলাহারী হইব” এই সংকল্পে দূর বনে প্রবেশ করিলে তিনি নিঃসন্দেহ বিদ্যাচরণসম্পন্নের পরিচারক হইবার যোগ্য প্রমাণিত হন। অম্বট্ঠ, ইহাই সেই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার প্রথম বিঘ্ন।

“পুনশ্চ, অম্বট্ঠ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া, ফলাহার ব্রত উদ্‌যাপন না করিয়া, কুদাল ও পিটক গ্রহণপূর্বক “কন্দ মূলফলাহারী হইব” এই সংকল্পে দূর বনে প্রবেশ করিলে তিনি নিঃসন্দেহ বিদ্যাচরণসম্পন্নের পরিচারক হইবার যোগ্য প্রমাণিত হন। অম্বট্ঠ, ইহাই সেই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার দ্বিতীয় বিঘ্ন।

“পুনশ্চ, অম্বট্ঠ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদা সম্পন্ন না হইয়া, ফলাহার ব্রত, কন্দমূল ফলাহার ব্রত, উদ্‌যাপন না করিয়া, নিকটস্থ গ্রাম কিম্বা নিগমে অগ্নিশালা নির্মাণ করিয়া অগ্নির পরিচর্যায় নিযুক্ত হইলে তিনি নিঃসন্দেহ বিদ্যাচরণসম্পন্নের পরিচারক হইবার যোগ্য প্রমাণিত হন। অম্বট্ঠ, ইহাই সেই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার তৃতীয় বিঘ্ন।

“পুনশ্চ, অম্বট্ঠ, কোনো শ্রমণ অথবা ব্রাহ্মণ এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া, ফলাহার ব্রত, কন্দমূল ফলাহার ব্রত, অগ্নি পরিচর্যা ব্রত, উদ্‌যাপন না করিয়া চতুর্মহাপথের সম্মিলন স্থলে চতুর্দ্বার আগার নির্মাণ করিয়া “এই স্থানে চতুর্দিক হইতে আগত শ্রমণ বা ব্রাহ্মণকে আমি যথাশক্তি যথাবল পূজা করিব” এই সংকল্পে অবস্থান করিলে, তিনি নিঃসন্দেহ বিদ্যাচরণসম্পন্নের পরিচারক হইবার যোগ্য প্রমাণিত হন। অম্বট্ঠ, ইহাই সেই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার চতুর্থ বিঘ্ন।

“অম্বট্ঠ, সেই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার ইহাই চতুবির্ধ বিঘ্ন।

২৮১. “অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি কি আচার্যের সহিত এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদা লাভ করিয়াছ।”

“না, গৌতম। কোথায় আচার্য সহিত আমি, আর কোথায় অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদা! হে গৌতম, আমি আচার্য সহিত অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদা হইতে দূরে।”

“অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি কি এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া কমণ্ডলু ইত্যাদি তাপসের ব্যবহার্য দ্রব্যাদি বহন করিয়া আচার্য সহিত “ফলাহারী হইব” এই সংকল্পে দূর বনে প্রবেশ করো?”

“না, গৌতম।”

অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি কি এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া, ফলাহার ব্রত উদযাপন না করিয়া, কন্দমূল ফলাহার ব্রত উদ্‌যাপন না করিয়া, নিকটস্থ গ্রাম কিম্বা নিগমে অগ্নিশালা নির্মাণ করিয়া আচার্য সহিত অগ্নির পরিচর্যায় নিযুক্ত হও?

“না, গৌতম।”

“অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি কি এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া, ফলাহার ব্রত উদযাপন না করিয়া, কুদাল ও পিকট গ্রহণপূর্বক “আচার্য সহিত কন্দমূল ফলাহারী হইব” এই সংকল্পে দূর বনে প্রবেশ করো?”

“না, গৌতম।”

“অম্বট্ঠ, তুমি কীরূপ মনে করো? তুমি কি এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাসম্পন্ন না হইয়া, ফলাহার ব্রত, কন্দমূল ফলাহার ব্রত, অগ্নিপরিচর্যা ব্রত উদযাপন না করিয়া, চতুর্মহাপথের সম্মিলন স্থলে চতুর্দ্বার আগার নির্মাণ করিয়া “এই স্থানে চতুর্দিক হইতে আগত শ্রমণ ও ব্রাহ্মণকে আমি যথাশক্তি যথাবল পূজা করিব” এই সংকল্পে আচার্য সহিত অবস্থান করো?”

“না, গৌতম।”

২৮২. “অম্বট্ঠ, এইরূপে তুমি আচার্য সহিত এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদাহীন, এই অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদার যে চারি বিঘ্ন আছে, আচার্য সহিত উহাদেরও জ্ঞানহীন। তোমার আচার্য ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি বলিয়াছেন :

“কোথায় মুণ্ডিত মস্তক, নীচ, কৃষ্ণকায়, ব্রহ্মার পাদ হইতে জাত শ্রমণাধম, আর কোথায় তাহাদের ত্রিবেদজ্ঞ ব্রাহ্মণদিগের সহিত বাক্যালাপ!” অথচ তিনি স্বয়ং অপায়গ্রস্ত এবং অকৃতকর্তব্য। অম্বট্ঠ, দেখ, আচার্য ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি তোমার প্রতি কতদূর অন্যায় করিয়াছেন।

২৮৩. “অম্বট্ঠ, ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি রাজা প্রসেনজিৎ প্রদত্ত দান উপভোগ করেন। তাঁহার কোশলরাজ প্রসেনজিতের সম্মুখে উপস্থিত হইবারও অনুমতি নাই। এমনকি রাজা যখন তাঁহার সহিত মন্ত্রণা করেন তখনো তাঁহাকে যবনিকার অন্তরালে থাকিতে হয়। অম্বট্ঠ, পৌঙ্করসাতি যাঁহার ধর্মানুমোদিত বিশুদ্ধ দান গ্রহণ করেন সেই কোশলরাজ প্রসেনজিৎ কী হেতু তাঁহাকে সম্মুখে উপস্থিত হইবার অনুমতি দেন না? অম্বট্ঠ, দেখ, আচার্য ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি তোমার প্রতি কতদূর অন্যায় করিয়াছেন।

ব্রাহ্মণদিগের পূর্বজ ঋষিগণ

২৮৪. “অম্বট্ঠ, তুমি কী মনে করো? কোশলরাজ প্রসেনজিৎ হস্তী কিম্বা অশ্বপৃষ্ঠে উপবিষ্ট হইয়া অথবা রথোপরি দণ্ডায়মান হইয়া উচ্চ কর্মচারী কিম্বা রাজন্যবর্গের সহিত কোনো বিষয়ে মন্ত্রণা করিলেন, পরে তিনি স্থান ত্যাগ করিয়া এক প্রান্তে দণ্ডায়মান হইলেন। যদি কোনো শূদ্র অথবা শূদ্রের দাস ঐস্থানে আসিয়া ও দণ্ডায়মান হইয়া তাঁহার ন্যায় মন্ত্রণা করে এবং কহে, “রাজা প্রসেনজিৎ এইরূপ বলিয়াছেন”, তাহা হইলে, যদিও সে রাজবাক্যেরই আবৃত্তি করিল কিম্বা রাজারই ন্যায় মন্ত্রণা করিল, সে কি ওইরূপে রাজা অথবা রাজ-অমাত্য হইবে?”

“না, গৌতম, তাহা হইবে না।”

২৮৫. “অম্বট্ঠ, এই প্রকার যাঁহারা ব্রাহ্মণদিগের পূর্বজ ঋষি মন্ত্রকর্তা, মন্ত্রপ্রবক্তা ছিলেন, যাঁহাদিগের গীত, প্রোক্ত, সমীহিত, পুরাতন মন্ত্র এক্ষণে ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক অনুগীত, অনুভাষিত, পুনঃপুন আবৃত হয়; যথা : অষ্টক, বামক, বামদেব, বিশ্বমিত্র, যমদগ্নি, অঙ্গিরা, ভরদ্বাজ, বশিষ্ঠ, কাশ্যপ, ভৃগু-“আমি আচার্য সহিত তাঁহাদের মন্ত্র অধ্যয়ন করি” মাত্র ইহা বলিয়া যে তুমি ঋষি হইবে কিম্বা ঋষিত্বের মার্গে আরূঢ় হইবে তাহা সম্ভব নয়।

২৮৬. “অম্বট্ঠ, তুমি কী মনে করো? তুমি বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ ব্রাহ্মণ আচার্য প্রাচার্যগণকে কি বলিতে শুনিয়াছ? যাঁহারা ব্রাহ্মণদিগের পূর্বজ ঋষি মন্ত্রকর্তা… ভৃগু, তাঁহারা কি সুস্নাত, সুবিলিপ্ত, সুবিন্যস্ত কেশশ্মশ্রু, মণিকুণ্ডলাভরণযুক্ত, শ্বেতবস্ত্র পরিহিত, পঞ্চকাম ভোগে লিপ্ত ও যুক্ত হইয়া আনন্দানুভব করিতেন, যেরূপ এক্ষণে তুমি এবং তোমার আচার্য করিতেছ?”

“না, গৌতম, তাহা নয়।”

“তাঁহারা কি কৃষ্ণ কণিকা শূন্যশালী অন্ন অনেক প্রকার সূপ-ব্যঞ্জনের সহিত উপভোগ করিতেন, যেরূপ তুমি এবং তোমার আচার্য এক্ষণে করিয়া থাক?”

“না, গৌতম।”

“তাঁহারা কি বিন্যস্তবাল বড়বা-রথে আরোহণ করিয়া দীর্ঘ প্রতোদ-যষ্টি দ্বারা বাহনকে প্রহার করিতে করিতে বিচরণ করিতেন, যেরূপ তুমি এবং তোমার আচার্য এক্ষণে করিয়া থাক?”

“না, গৌতম।”

“তাঁহারা কি কিঙ্কিণী পরিহিত নারীগণ দ্বারা সেবিত হইতেন, যেরূপ এক্ষণে তুমি এবং তোমার আচার্য হইয়া থাক?”

“না, গৌতম।”

“তাঁহারা কি পরিখা-বেষ্টিত, পরিঘ-বদ্ধ নগরদুর্গে অবস্থান করিয়া দীর্ঘ অসিবদ্ধ পুরুষগণ কর্তৃক রক্ষিত হইতেন, যেরূপ তুমি এবং তোমার আচার্য এক্ষণে হইয়া থাক?”

“না, গৌতম।”

“এইরূপে, অম্বট্ঠ, তুমি ঋষিও নহ, আচার্যের সহিত ঋষিত্বের মার্গেও আরূঢ় নহ। অম্বট্ঠ, আমার সম্বন্ধে তোমার কোনো প্রকার সংশয় বা দ্বিধা থাকিলে তুমি প্রশ্ন করো, আমি উত্তর দ্বারা উহা দূর করিব।”

অম্বট্ঠের প্রত্যাবর্তন

২৮৭. অনন্তর ভগবান বিহার হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া চঙ্ক্রমণে নিরত হইলেন। অম্বট্ঠও ওইরূপ করিলেন। অম্বট্ঠ ভগবানের পশ্চাদ্বর্তী হইয়া চঙ্ক্রমণ করিতে করিতে ভগবানের দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ অনুসন্ধান করিলেন। তিনি দেখিলেন যে ভগবানের দেহে মাত্র দুইটি ব্যতীত অপর সমস্ত লক্ষণই বিদ্যমান। দুইটি লক্ষণ সম্বন্ধে তাঁহার সংশয় ও দ্বিধা হইল, তিনি নিশ্চিত হইতে পারিলেন না, সন্তুষ্টি লাভ করিলেন না-কোষ-রক্ষিত গুপ্তেন্দ্রিয় এবং বৃহৎ জিহ্বা।

২৮৮. তৎপরে ভগবান চিন্তা করিলেন, “অম্বট্ঠ আমার দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণের দুইটি ব্যতীত অপর সকলগুলিই দেখিতেছে; দুইটির সম্বন্ধে তাহার সংশয় ও দ্বিধা উপস্থিত হইয়াছে, সে নিশ্চিত ও সন্তুষ্ট হইতেছে না-কোষ-রক্ষিত গুপ্তেন্দ্রিয় এবং বৃহৎ জিহ্বা।

তদনন্তর ভগবান এরূপভাবে স্বীয় অলৌকিক ক্ষমতার পরিচালনা করিলেন যে অম্বট্ঠ ভগবানের কোষ-রক্ষিত গুপ্তেন্দ্রিয় দর্শন করিলেন। তৎপরে ভগবান জিহ্বা নিঃসৃত করিয়া উভয় কর্ণ ও উভয় নাসাবিবর স্পর্শ করিলেন, সমুদয় ললাটদেশ জিহ্বাচ্ছাদিত করিলেন।

তৎপরে অম্বট্ঠ “শ্রমণ গৌতমের দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান, অপরিপূর্ণরূপে নহে”, এইরূপ চিন্তা করিয়া ভগবানকে বলিলেন :

“তাহা হইলে, গৌতম, আমরা এখন যাই, আমাদের বহু কৃত্য বহু করণীয় আছে।”

“অম্বট্ঠ, তোমার যেরূপ অভিরুচি।”

তৎপরে অম্বট্ঠ বড়বা-রথে আরোহণ করিয়া প্রস্থান করিলেন।

২৮৯. ওই সময় ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি উক্কট্ঠা হইতে নিষ্ক্রান্ত হইয়া বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণের সহিত স্বীয় আরামে উপবিষ্ট হইয়া অম্বট্ঠের প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। অতঃপর অম্বট্ঠ আরামে উপস্থিত হইলেন। যতদূর যানোপযুক্ত ভূমি ততদূর যানে গমন করিয়া পরে যান হইতে অবরোহণপূর্বক তিনি ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির নিকট গমন করিলেন এবং তাঁহাকে অভিবাদনান্তে এক প্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন।

২৯০. অম্বট্ঠ আসন গ্রহণ করিলে ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি তাঁহাকে বলিলেন :

“তাত অম্বট্ঠ, তুমি ভগবান গৌতমের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছ?”

“ভগবান গৌতমের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হইয়াছে।

“ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে যে যশ বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে তাহা সত্যমূল, অসত্যমূল নহে? তিনি কি তাদৃশ, অন্য প্রকার নহেন?”

“ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে যে যশ বিস্তৃতি লাভ করিয়াছে তাহা সত্যমূল, অসত্যমূল নহে। তিনি তাদৃশ, অন্য প্রকার নহেন। তাঁহার দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান, অপরিপূর্ণরূপে নহে।

“বৎস অম্বট্ঠ, শ্রমণ গৌতমের সহিত তোমার বাক্যালাপ হইয়াছিল?”

“হইয়াছিল।”

পৌঙ্করসাতির ভগবানের সহিত সাক্ষাৎ

কীরূপ বাক্যালাপ হইয়াছিল?

তৎপরে অম্বট্ঠ ভগবানের সহিত তাঁহার যেরূপ বাক্যালাপ হইয়াছিল তৎসমস্ত ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির নিকট নিবেদন করিলেন।

২৯১. তৎপরে পৌঙ্করসাতি অম্বট্ঠকে বলিলেন, “এই তোমার পাণ্ডিত্য, এই তোমার বহুশ্রুতি, এই তোমার ত্রিবিদ্যা! যে পুরুষ এই প্রকারে স্বকর্তব্য সম্পাদন করে, মৃত্যুর পর দেহের বিনাশে সে অপায় দুর্গতি বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়। অম্বট্ঠ, তুমি যেরূপ ভগবান গৌতমকে আঘাত করিয়া কথা বলিয়াছ, তিনিও সেইরূপ আমাদিগকে অভিযুক্ত করিয়াছেন। এই তোমার পাণ্ডিত্য, এই তোমার বহুশ্রুতি, এই তোমার ত্রিবিদ্যা! যে পুরুষ এই প্রকারে… উৎপন্ন হয়।”

কুপিত ও অসন্তুষ্ট হইয়া তিনি অম্বট্ঠকে পদাঘাতে দূর করিলেন এবং তৎক্ষণাৎ ভগবানের দর্শন কামনায় গমনেচ্ছু হইলেন।

২৯২. কিন্তু ব্রাহ্মণগণ পৌঙ্করসাতিকে বলিলেন, “দেব, শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ গমনের সময় আজ নাই, আগামীকল্য পৌঙ্করসাতি গমন করিতে পারেন।”

এইরূপে ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি স্বীয় আবাসে প্রণীত খাদ্য-ভোজ্য প্রস্তুত করাইয়া উহা যানে স্থাপিত করিয়া উল্কালোক সাহায্যে উক্কট্ঠা হইতে বহির্গত হইয়া ইচ্ছানঙ্কল বনখণ্ডে গমন করিলেন। যতদূর যানোপযুক্ত ভূমি ততদূর যানে গমন করিয়া পরে যান হইতে অবরোহণপূর্বক পদব্রজে ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন। ভগবানকে অভিবাদন ও তাঁহার সহিত প্রীত্যালাপ করিয়া তিনি একপ্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন। পরে তিনি ভগবানকে বলিলেন :

“গৌতম, আমাদের অন্তেবাসী অম্বট্ঠ এখানে আসিয়াছিল কি?”

“আসিয়াছিল।”

“অম্বট্ঠের সহিত গৌতমের কোনো বাক্যালাপ হইয়াছিল কি?”

“হইয়াছিল।”

“কীরূপ বাক্যালাপ হইয়াছিল?”

তৎপরে ভগবান অম্বট্ঠের সহিত যেরূপ বাক্যালাপ হইয়াছিল, তৎসমস্ত পৌঙ্করসাতির নিকট প্রকাশ করিলেন।

তদনন্তর ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি ভগবানকে বলিলেন :

“হে গৌতম, অম্বট্ঠ নির্বোধ। গৌতম তাহাকে ক্ষমা করুন।”

“হে ব্রাহ্মণ, অম্বট্ঠ সুখী হউক।”

২৯৪. অতঃপর ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি ভগবানের দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ অন্বেষণ করিলেন। তিনি মাত্র দুই লক্ষণ ব্যতীত অপর সকল লক্ষণই দেখিলেন। দুইটি লক্ষণ সম্বন্ধে তাঁহার সংশয় ও দ্বিধা হইল, তিনি নিশ্চিত হইতে পারিলেন না, সন্তুষ্টি লাভ করিলেন না, কোষ-রক্ষিত গুপ্তেন্দ্রিয় এবং বৃহৎ জিহ্বা।

দ্বাত্রিংশ লক্ষণ

২৯৫-২৯৬. তখন ভগবান চিন্তা করিলেন, “অম্বট্ঠ আমার দেহে… জিহ্বা।”

তদনন্তর ভগবান এইরূপভাবে স্বীয় অলৌকিক ক্ষমতার… জিহ্বাচ্ছাদিত করিলেন। তখন পৌঙ্করসাতি “শ্রমণ গৌতমের দেহে দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণ পরিপূর্ণরূপে বিদ্যমান, অপরিপূর্ণরূপে নহে” এইরূপ চিন্তা করিয়া ভগবানকে বলিলেন :

“গৌতম অনুগ্রহপূর্বক ভিক্ষুসংঘের সহিত অদ্য আমার অন্ন গ্রহণ করিবেন।”

ভগবান মৌন হইয়া সম্মতি দান করিলেন।

২৯৭. তদনন্তর ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি ভগবানের সম্মতি বিদিত হইয়া (পরদিন) তাঁহাকে সময় নিবেদন করিলেন :

“হে গৌতম, সময় আগত, অন্ন প্রস্তুত।” তখন ভগবান পূর্বাহ্নের বস্ত্র পরিহিত হইয়া পাত্র-চীবর গ্রহণপূর্বক ভিক্ষুসংঘের সহিত পৌঙ্করসাতির পরিবেশনস্থানে গমন করিয়া নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। পরে পৌঙ্করসাতি উৎকৃষ্ট খাদ্য-ভোজ্য স্বহস্তে পরিবেশন করিয়া ভগবানকে তৃপ্ত করিলেন, তরুণ ব্রাহ্মণগণও ওইরূপে ভিক্ষুসংঘের তৃপ্তি সাধন করিলেন। তদনন্তর ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি, ভগবান আহারান্তে পাত্র হইতে হস্ত অপসারিত করিলে, নিম্ন আসন গ্রহণপূর্বক একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন।

২৯৮. এইরূপে উপবিষ্ট হইলে ভগবান ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির সহিত ক্রমানুসারে ধর্মালাপ করিলেন; যথা : দানকথা, শীলকথা, স্বর্গকথা; কামের দৈন্য, ব্যর্থতা, মালিন্য এবং নৈষ্ক্রম্যের মাহাত্ম্য। ভগবান যখন দেখিলেন যে পৌঙ্করসাতি উপযুক্ত চিত্ত, মৃদুচিত্ত, আবরণমুক্ত চিত্ত, উদগ্র চিত্ত এবং প্রসন্ন চিত্ত হইয়াছেন, তখন তিনি যাহা বুদ্ধগণের অনুত্তর ধর্মদেশনা তাহা প্রকাশ করিলেন, দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, উহার নিরোধ এবং নিরোধের মার্গ। যেরূপ শুদ্ধ নির্মল বস্ত্র উত্তমরূপে রঞ্জন গ্রহণ করে সেইরূপ ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতির সেই আসনেই বিরজ, বীতমল, ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হইল, “যাহা কিছু উৎপত্তিশীল, তাহাই নাশশীল।”

২৯৯. অনন্তর ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি দৃষ্টধর্ম, প্রাপ্তধর্ম, বিদিত ধর্ম, পর্যবগাহিত ধর্ম হইয়া, বিচিকিৎসা ও সংশয়হীন হইয়া, বৈশারদ্য প্রাপ্ত হইয়া, ভগবদ্‌শাসনে অপর প্রত্যয় হইয়া ভগবানকে বলিলেন :

“অতি উত্তম, গৌতম, অতি উত্তম! যেরূপ উৎপাটিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথ প্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলদীপ ধৃত হয়, সেইরূপ পূজনীয় গৌতম অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমি সপুত্র, সভার্যা, সপারিষদ, সামাত্য ভগবান গৌতমের, ধর্মের এবং ভিক্ষুসংঘের শরণ লইতেছি। পূজ্য গৌতম আজ হইতে জীবনের অন্তকাল পর্যন্ত আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে গ্রহণ করুন। পূজনীয় গৌতম যেরূপ উক্কট্ঠায় অন্যান্য উপাসককুলে গমন করিয়া থাকেন, সেইরূপ পৌঙ্করসাতির গৃহেও আগমন করিবেন। তথাকার যে-সকল স্ত্রী ও পুরুষ ভগবান গৌতমকে অভিবাদন করিবে, আসন ত্যাগ করিয়া তাঁহাকে সম্মান প্রদর্শন করিবে, তাঁহাকে উদক ও আসন দান করিবে, তাঁহাতে প্রসন্নচিত্ত হইবে, তাহাদের ওই সকল কর্ম দীর্ঘকাল তাহাদের সুখবিধান ও হিতসাধন করিবে।”

“ব্রাহ্মণ উত্তম বলিয়াছেন।”

অম্বট্ঠ সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৩]