৩০০. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। একসময় ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘের সহিত অঙ্গদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে চম্পায় উপনীত হইলেন। তথায় তিনি গগ্গরা পুষ্করিণীর তীরে অবস্থিতি করিতে লাগিলেন। ওই সময় ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড রাজভোগ্য, রাজদায় ব্রহ্মদেয়রূপে মগধরাজ শ্রেণিক বিম্বিসার কর্তৃক প্রদত্ত জনাকীর্ণ তৃণকাষ্ঠ-উদক-ধান্যসম্পন্ন চম্পায় বাস করিতেছিলেন।
৩০১. চম্পানিবাসী ব্রাহ্মণ গৃহস্থগণ শুনিলেন, “শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত হইয়া পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘের সহিত অঙ্গদেশে ভ্রমণ করিতে করিতে চম্পায় উপনীত হইয়া তথায় গগ্গরা পুষ্করিণীর তীরে অবস্থান করিতেছিলেন। সেই ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, “ইনিই ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয়, দম্য-পুরুষ-সারথী, দেবমনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ ভগবন্ত; ইহলোক, দেবলোক, মারলোক, ব্রহ্মলোক এবং শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ, দেব ও মনুষ্যগণকে সাক্ষাদ্দর্শনোদ্ভূত জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং অবগত হইয়া তিনি উপদিষ্ট করেন; তিনি ধর্মের উপদেশ দান করেন-যে ধর্মের প্রারম্ভ কল্যাণময়, মধ্য কল্যাণময়, অন্ত কল্যাণময়, যাহা অর্থ ও শব্দসম্পদপূর্ণ, সর্বাঙ্গীন, পূর্ণতাপ্রাপ্ত, তিনি বিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য্য প্রকাশ করেন, তাদৃশ অর্হতের দর্শন শুভজনক।” অনন্তর চম্পার বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণ-গৃহপতি ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া চম্পা হইতে নিষ্ক্রমণপূর্বক গগ্গরা পুষ্করিণীতে গমন করিতে লাগিলেন।
৩০২. ওই সময়ে ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড দিবাশয়নের নিমিত্ত স্বীয় প্রাসাদোপরি গমন করিয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন চম্পার বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণ-গৃহপতি বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া চম্পা হইতে নিষ্ক্রমণপূর্বক গগ্গরা পুষ্করিণীর দিতে গমন করিতেছে। উহা দেখিয়া তিনি দ্বারপালকে বলিলেন :
“চম্পার অধিবাসীগণ কী হেতু এইরূপে গগ্গরা পুষ্করিণীর অভিমুখে গমন করিতেছে?”
“শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম শাক্যকুল হইতে… বুদ্ধ, ভগবন্ত। সেই ভগবান গৌতমকে দেখিবার জন্য ইহারা যাইতেছে।”
“তাহা হইলে, দ্বারপাল, তুমি চম্পার ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণের নিকট গিয়া বল-“ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড আপনাদিগকে অপেক্ষা করিতে বলিয়াছেন, তিনিও শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ যাইবেন।”
“যথা আজ্ঞা” বলিয়া দ্বারপাল চম্পার ব্রাহ্মণ-গৃহপতিদের নিকট গিয়া সমস্ত বলিল।
সোণদণ্ড ও ব্রাহ্মণগণ
৩০৩. ওই সময় বিভিন্ন রাজ্য হইতে পঞ্চশত ব্রাহ্মণ কার্যোপলক্ষে চম্পায় আসিয়া অবস্থান করিতেছিলেন। তাঁহারা সোণদণ্ড শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ যাইবেন শুনিয়া সোণদণ্ডের নিকট গমন করিয়া বলিলেন :
“সোণদণ্ড শ্রমণ গৌতমকে দর্শন করিতে যাইবেন ইহা কি সত্য?”
“ইহাই আমার ইচ্ছা, আমিও গৌতমকে দর্শন করিতে যাইব।”
“মাননীয় সোণদণ্ড গৌতমের দর্শনার্থ যাইবেন না, যাওয়া যুক্ত নহে।” সোণদণ্ড গৌতমের দর্শনার্থ যাইলে তাঁহার যশের হ্রাস হইবে, গৌতমের যশ বৃদ্ধি পাইবে। এই কারণে সোণদণ্ডের যাওয়া যুক্ত নহে। শ্রমণ গৌতমেরই সোণদণ্ডের নিকট আগমন করা উচিত। সোণদণ্ড মাতৃ এবং পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্ত পুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক, নির্দোষ। এই কারণে সোণদণ্ডের যাওয়া উচিত নহে, গৌতমেরই সোণদণ্ডের নিকট আগমন করা উচিত। মাননীয় সোণদণ্ড আঢ্য, ধনশালী, ঐশ্বর্যশালী… তিনি অধ্যায়ক, মন্ত্রধারক; ত্রিবেদ, নির্ঘণ্ট, বেদনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পদ্ধতিসমূহ, শব্দতত্ত্ব এবং ইতিহাসরূপ পঞ্চম বেদে পারদর্শী; পদ-পাঠজ্ঞ ও বৈয়াকরণিক; কূটতর্কবিদ্যায় নিপুণ এবং মহাপুরুষক্ষণ জ্ঞানসম্পন্ন। তিনি অভিরূপ, দর্শনীয়, প্রাসাদিক, পরম বর্ণসৌন্দর্যলব্ধ, ব্রহ্মবর্ণী, ব্রহ্মদেহী, মহদ্দর্শন। তিনি শীলবান, শীলবৃদ্ধ, বর্ধিতশীলসম্পন্ন। তিনি প্রিয়বাদী; শিষ্ট, স্পষ্ট, শুদ্ধ ও অর্থবিজ্ঞাপনীয় বাক্যের কথনকারী। অনেকের আচার্যদিকের গুরু হইয়া তিনি তিন শত বিদ্যার্থীকে মন্ত্র শিক্ষা দেন; নানা দিক নানা জনপদ হইতে বহু বিদ্যার্থী, মন্ত্রার্থী ও মন্ত্রাধ্যয়নেচ্ছু হইয়া তাঁহার নিকট আগমন করে। তিনি জীর্ণ, বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ, অদ্ধগত, বয়ঃঅনুপ্রাপ্ত; শ্রমণ গৌতম তরুণ পরিব্রাজক। তিনি মগধরাজ শ্রেণিয় বিম্বিসার কর্তৃক সম্মানিত, গৌরবে প্রতিষ্ঠিত, মানিত, পূজিত, প্রশংসিত। তিনি ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি কর্তৃক সম্মানিত, গৌরবে প্রতিষ্ঠিত, মানিত, পূজিত, প্রশংসিত। তিনি রাজভোগ্য, রাজদায় ব্রহ্মদেয়রূপে মগধরাজ শ্রেণিয় বিম্বিসার কর্তৃক প্রদত্ত জনাকীর্ণ তৃণকাষ্ঠ-উদক-ধান্যসম্পন্ন চম্পায় বাস করিতেছেন। এই কারণে সোণদণ্ডের শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ গমন উচিত নহে, গৌতমেরই উচিত সোণদণ্ডের দর্শনার্থ আগমন করা।”
৩০৪. এইরূপ উক্ত হইলে সোণদণ্ড ওই ব্রাহ্মণদিগকে বলিলেন :
“তাহা হইলে, ব্রাহ্মণগণ, তোমরা আমার বাক্যও শ্রবণ করো, যে কারণে আমারই গৌতমের দর্শনার্থ হওয়া উচিত, গৌতমের আমাকে দর্শনার্থ আগমন যুক্ত নহে, তাহা বলিতেছি।
গৌতমের প্রাধান্য
শ্রমণ গৌতম মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্ত পুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক, নির্দোষ। শ্রমণ গৌতম বৃহৎ জাতিকুল পরিত্যাগ করিয়া প্রব্রজিত হইয়াছেন। শ্রমণ গৌতম ভূমিগত ও বিহায়সস্থ প্রভূত হিরণ্য-সুবর্ণ পরিত্যাগ করিয়া প্রব্রজিত হইয়াছেন। শ্রমণ গৌতম প্রথম বয়সেই গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা অবলম্বন করিয়াছেন-যখন তিনি তরুণ, গভীর কৃষ্ণকেশ ও ভদ্রযৌবনসম্পন্ন। শ্রমণ গৌতম, মাতাপিতা অসম্মত, অশ্রুমুখ ও রোদনপরায়ণ হইলেও কেশ ও শ্মশ্রু মোচনপূর্বক কাষায়বস্ত্র পরিহিত হইয়া গৃহ হইতে গৃহহীন প্রব্রজ্যা আশ্রয় করিয়াছেন। শ্রমণ গৌতম অভিরূপ, দর্শনীয়, প্রাসাদিক, পরম বর্ণসৌন্দর্যলব্ধ, ব্রহ্মবর্ণী, ব্রহ্মদেহী, মহদ্দর্শন। শ্রমণ গৌতম শীলবান, আর্যশীলী, কুশলশীলীসম্পন্ন। শ্রমণ গৌতম প্রিয়বাদী, শিষ্ট, স্পষ্ট ও অর্থ বিজ্ঞাপনীয় বাক্যের কথনকারী। শ্রমণ গৌতম অনেকের আচার্যদিগের গুরু। শ্রমণ গৌতম ক্ষীণ-কামরাগ ও বিগত-চাপল্য। শ্রমণ গৌতম কর্মবাদী, ক্রিয়াবাদী, ব্রাহ্মণদিগের প্রতি উপদেশে তিনি পাপহীনতাকেই প্রাধান্য দেন। শ্রমণ গৌতম উচ্চ, আদি ক্ষত্রিয়কুল হইতে প্রব্রজিত হইয়াছেন। শ্রমণ গৌতম আঢ্য, ধনশালী, ঐশ্বর্যশালী কুল হইতে প্রব্রজিত হইয়াছেন। দূর রাষ্ট্র এবং জনপদ হইতে জনগণ শ্রমণ গৌতমকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসার্থ আগমন করে। সহস্র সহস্র দেবতা শ্রমণ গৌতমের শরণাগত। তাঁহার সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, “ইনিই ভগবান, অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন সুগত, লোকজ্ঞ, অতুলনীয় দম্য-পুরুষ-সারথি, দেব-মনুষ্যের শাস্তা, বুদ্ধ, ভগবন্ত।” তিনি দ্বাত্রিংশ মহাপুরুষ লক্ষণযুক্ত। তিনি স্বাগতবাদী, প্রিয়ভাষী, বিনয়ী, ভ্রূকুটিহীন, উত্তানমুখ, পূর্বভাষী। তিনি চারি পরিষদ কর্তৃক সম্মানিত, গৌরবে প্রতিষ্ঠিত, মানিত, পূজিত, প্রশংসিত। বহু দেব ও মনুষ্য তাঁহার প্রতি শ্রদ্ধাবান। তিনি যে গ্রাম অথবা নিগমে অবস্থান করেন তথায় অমনুষ্যগণ মনুষ্যগণের অনিষ্ট করে না। তিনি সংঘ প্রতিষ্ঠাপক, শিষ্যবর্গণ্ডসমন্বিত, গণাচার্য এবং সর্ব তীর্থকরদিগের প্রধানরূপে আখ্যাত। কোনো কোনো শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ যেকোনো উপায়ে যশ অর্জন করেন, কিন্তু শ্রমণ গৌতমের সেরূপে যশলাভ হয় না, তিনি অনুত্তর বিদ্যাচরণ-সম্পদা দ্বারা যশ অর্জন করেন। মগধরাজ শ্রেণিয় বিম্বিসার সুপুত্র, সুভার্যা, সপারিষদ, সামাত্য শ্রমণ গৌতমের শরণাগত। কোশলরাজ প্রসেনজিৎ এবং ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতিও ওইরূপেই তাঁহার শরণাগত। তিনি মগধরাজ বিম্বিসার কর্তৃক, কোশলরাজ প্রসেনজিৎ কর্তৃক, ব্রাহ্মণ পৌঙ্করসাতি কর্তৃক সম্মানিত, গৌরবে প্রতিষ্ঠিত, মানিত, পূজিত, প্রশংসিত।
সোণদণ্ডের ভয়
তিনি চম্পায় উপনীত হইয়া তথায় গগ্গরা পুষ্করিণীর তীরে অবস্থান করিতেছেন। যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ আমাদিগের গ্রামক্ষেত্রে আসেন, তাঁহারা সকলেই আমাদের অতিথি। অতিথি আমাদের সম্মানের যোগ্য; অতিথিকে গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করা, সম্মান করা, পূজা করা, প্রশংসা করা আমাদের কর্তব্য। যেহেতু তিনি চম্পায় উপনীত হইয়া গগ্গরা পুষ্করিণীর তীরে অবস্থান করিতেছেন, সেই হেতু তিনি আমাদের অতিথি এবং অতিথি আমাদের… কর্তব্য। এই সকল কারণে শ্রমণ গৌতমের আমাদিগকে দর্শন করিতে আসা যুক্ত নয়, আমাদিগেরই উচিত তাঁহার দর্শনার্থ গমন করা। শ্রমণ গৌতমের উৎকর্ষ যাহা আমার বিদিত তাহা যে মাত্র উক্ত প্রকার তাহাই নহে, তাঁহার উৎকর্ষ অপরিসীম।”
৩০৫. এইরূপ উক্ত হইলে ব্রাহ্মণগণ সোণদণ্ডকে বলিলেন, “মাননীয় সোণদণ্ড যেরূপে শ্রমণ গৌতমের প্রশংসোক্তি করিলেন, তাহাতে গৌতম শতযোজন দূরে অবস্থান করিলেও শ্রদ্ধাবান কুলপুত্র পৃষ্ঠে খাদ্যভাণ্ড বহন করিয়াও তাঁহার দর্শনার্থে যাইতে প্রস্তুত হইবেন। অতএব আমরা সকলেই শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ যাইব।”
৩০৬. তৎপরে ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড বৃহৎ ব্রাহ্মণসংঘের সহিত গগ্গরা পুষ্করিণীর দিকে চলিলেন।
এইরূপ বনপ্রদেশের মধ্য দিয়া চলিতে চলিতে সোণদণ্ডের মনে এইরূপ পরিবিতর্কের উদয় হইল :
“আমি শ্রমণ গৌতমকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে যদি তিনি বলেন, “এই প্রশ্ন এরূপে জিজ্ঞাসা করিতে নাই, ইহা এইরূপে জিজ্ঞাসা করিতে হয়, “তাহা হইলে এই পরিষদ এইরূপ বলিয়া আমাকে অবজ্ঞা করিবে; “ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড নির্বোধ, অনভিজ্ঞ, তিনি শ্রমণ গৌতমকে যথার্থরূপে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিতে অসমর্থ।” এইরূপে অবজ্ঞাত হইলে আমার যশের হ্রাস হইবে, যশের হ্রাস হইলে ভোগেরও হ্রাস হইবে, যশেরই উপর আমাদের ভোগ নির্ভর করে। কিন্তু শ্রমণ গৌতম আমাকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে আমার উত্তর তাঁহার অনুমোদিত না হইতে পারে। ওই ক্ষেত্রে যদি শ্রমণ গৌতম আমাকে বলেন, “এই প্রশ্নের উত্তর এইরূপে দিতে নাই, এইরূপে উহার উত্তর দিতে হয়,” তাহা হইলে এই পরিষদ আমাকে অবজ্ঞা করিয়া বলিবে, “ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড নির্বোধ, অনভিজ্ঞ, গৌতমের প্রশ্নের উত্তর দিয়া তিনি তাঁহার অনুমোদন লাভে অক্ষম।” এইরূপে অবজ্ঞাত হইলে আমার যশের হ্রাস হইবে, যশের হ্রাস হইলে ভোগেরও হ্রাস হইবে, যশেরই উপর আমাদিগের ভোগ নির্ভর করে। অপরপক্ষে সমীপে আগত হইয়াও যদি আমি গৌতমকে দর্শন না করিয়া ফিরিয়া যাই, তাহা হইলে এই পরিষদ আমাকে অবজ্ঞা করিয়া বলিবে, “ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড নির্বোধ, অনভিজ্ঞ; তিনি অহংকারে অভিভূত ও ভীত; শ্রমণ গৌতমকে দর্শন করিবার সাহস তাঁহার নাই; কী হেতু সমীপে আগত হইয়াও গৌতমকে দর্শন না করিয়া তিনি ফিরিয়া যান।”
এইরূপে অবজ্ঞাত হইলে আমার যশের হ্রাস হইবে, যশের হ্রাস হইলে ভোগেরও হ্রাস হইবে, যশেরই উপর আমাদিগের ভোগ নির্ভর করে।”
৩০৭. তৎপরে সোণদণ্ড ভগবানের নিকট গমন করিলেন ও তাঁহাকে অভিবাদন এবং তাঁহার সহিত প্রীত্যালাপপূর্বক এক প্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন। চম্পার ব্রাহ্মণ-গৃহস্থগণ কেহ কেহ ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একান্তে আসন গ্রহণ করিলেন, কেহ কেহ ভগবানের সহিত প্রীত্যালাপপূর্বক ওইরূপে উপবিষ্ট হইলেন, কেহ কেহ ভগবানের দিকে অঞ্জলি প্রণত করিয়া পূর্বোক্তরূপে উপবেশন করিলেন, কেহ কেহ নামগোত্র প্রকাশপূর্বক উক্তবিধরূপে আসন গ্রহণ করিলেন, কেহ কেহ মৌনী হইয়া একান্তে বসিলেন।
৩০৮. ওইস্থানেও সোণদণ্ড সংশয়পূর্ণ হইয়া রহিলেন :
“আমি শ্রমণ গৌতমকে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে যদি তিনি বলেন, “… ভোগ নির্ভর করে।” অহো! যদি শ্রমণ গৌতম আমার নিজের ত্রৈবিদ্যক জ্ঞান সম্বন্ধে আমাকে প্রশ্ন করেন, তাহা হইলে আমি নিশ্চয়ই উত্তর দ্বারা তাঁহার সন্তুষ্টি বিধান করিতে পারি।”
৩০৯. তদনন্তর ভগবান সোণদণ্ডের চিত্তের পরিবিতর্ক অবগত হইয়া চিন্তা করিলেন, “ব্রাহ্মণ সোণদণ্ড স্বচিত্ত দ্বারা বিনষ্ট হইতেছে। অতএব আমি তাহার নিজের ত্রৈবিদ্যক জ্ঞান সম্বন্ধে তাহাকে প্রশ্ন করিব।”
তৎপরে ভগবান সোণদণ্ডকে বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, কতগুলি গুণযুক্ত হইলে ব্রাহ্মণগণ কাহাকেও ব্রাহ্মণ বলিয়া থাকেন, যাহাতে ওই পুরুষ “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না?”
৩১০. সোণদণ্ড এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া চিন্তা করিলেন :
“যাহা আমার ইচ্ছিত, আকাঙ্ক্ষিত, অভিপ্রেত, প্রার্থিত ছিল-“অহো! যদি শ্রমণ গৌতম… বিধান করিতে পারি।” তদনুরূপই গৌতম আমাকে আমার নিজের ত্রৈবিদ্যক জ্ঞান সম্বন্ধে প্রশ্ন করিয়াছেন, আমি অবশ্যই উত্তর দ্বারা তাঁহাকে সন্তুষ্ট করিব।”
৩১১. তৎপরে সোণদণ্ড দেহকে ঋজুভাবে রক্ষা করিয়া পরিষদের চতুর্দিকে দৃষ্টিপাতপূর্বক ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, পঞ্চবিধ গুণযুক্ত হইলে ব্রাহ্মণগণ পুরুষকে ব্রাহ্মণ বলিয়া থাকেন, যাহাতে ওই পুরুষ “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না। পঞ্চগুণ কী কী? তিনি মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্ত পুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক, নির্দোষ। তিনি অধ্যায়ক, মন্ত্রধারক; ত্রিবেদ, নির্ঘণ্ট, বেদনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পদ্ধতিসমূহ, শব্দতত্ত্ব এবং ইতিহাসরূপ পঞ্চম বেদে পারদর্শী; পদ পাঠজ্ঞ ও বৈয়াকরণিক; কূটতর্কবিদ্যানিপুণ এবং মহাপুরুষলক্ষণ জ্ঞানসম্পন্ন। তিনি অভিরূপ, দর্শনীয়, প্রাসাদিক, পরম বর্ণসৌন্দর্যলব্ধ, ব্রহ্মবর্ণী, ব্রহ্মদেহী, মহদ্দর্শন। তিনি শীলবান, শীলবৃদ্ধ, বর্ধিত শীলসম্পন্ন। তিনি পণ্ডিত, মেধাবী, যাজ্ঞিকদিগের মধ্যে প্রথম অথবা দ্বিতীয়। হে গৌতম, এই পঞ্চবিধ গুণযুক্ত হইলে পুরুষ ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ কথিত হন, যাহাতে তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না।”
“হে ব্রাহ্মণ, যদি এই পঞ্চগুণ হইতে এক গুণকে পৃথক করা যায়, তাহা হইলে অবশিষ্ট চারি গুণযুক্ত পুরুষকে কি ব্রাহ্মণ অভিহিত করা যায়, যাহাতে তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না?”
“হে গৌতম, তাহা সম্ভব। এই পঞ্চবিধ গুণ হইতে বর্ণকে পৃথক করা যায়। বর্ণ কী করিতে পারে? ব্রাহ্মণ যদি পূর্বোক্ত অপর চারিটি গুণযুক্ত হন, তাহা হইলে তিনি ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ অভিহিত হইবেন এবং তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না।”
৩১২. “কিন্তু, হে ব্রাহ্মণ, যদি এই চারিটি গুণ হইতে একটিকে পৃথক করা যায়, তাহা হইলে অবশিষ্ট তিনটি গুণযুক্ত পুরুষকে কি ব্রাহ্মণ অভিহিত করা যায়, যাহাতে তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না?”
“হে গৌতম, তাহা সম্ভব। এই চতুর্বিধ গুণ হইতে মন্ত্রকে পৃথক করা যায়। মন্ত্র কী করিতে পারে? ব্রাহ্মণ যদি পূর্বোক্ত অপর তিনটি গুণযুক্ত হন, তাহা হইলে তিনি ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ অভিহিত হইবেন এবং তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ বলিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না।”
“কিন্তু, হে ব্রাহ্মণ, যদি এই তিনটি গুণ হইতে একটিকে পৃথক করা যায়, তাহা হইলে অবশিষ্ট দুইটি গুণযুক্ত পুরুষকে কি ব্রাহ্মণ অভিহিত করা যায়, যাহাতে তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না?”
“হে গৌতম, তাহা সম্ভব। এই ত্রিবিধ গুণ হইতে জাতিকে পৃথক করা যায়। জাতি কী করিতে পারে? ব্রাহ্মণ যদি পূর্বোক্ত অপর দুইটি গুণযুক্ত হন, তাহা হইলে তিনি ব্রাহ্মণগণ কর্তৃক ব্রাহ্মণ অভিহিত হইবেন এবং তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না।”
৩১৩. এইরূপ উক্ত হইলে ব্রাহ্মণগণ সোণদণ্ডকে বলিল :
“পূজ্য সোণদণ্ড, আপনি এরূপ বলিবেন না! আপনি এরূপ বলিবেন না! মাননীয় সোণদণ্ড বর্ণের অপবাদ করিতেছেন, মন্ত্রের অপবাদ করিতেছেন, জাতির অপবাদ করিতেছেন, তিনি একান্তই শ্রমণ গৌতমের মতবাদ গ্রহণ করিতেছেন।”
৩১৪. তৎপরে ভগবান ব্রাহ্মণগণকে বলিলেন :
“ব্রাহ্মণগণ, যদি তোমরা মনে করো “সোণদণ্ড অল্পশ্রুত, দুর্ভাষ, দুষ্প্রাজ্ঞ, শ্রমণ গৌতমকে এই বিষয়ে প্রত্যুত্তর দানে অক্ষম,” তাহা হইলে সোণদণ্ড ক্ষান্ত হউক, তোমরাই আমার সহিত বিচারে প্রবৃত্ত হও। কিন্তু যদি তোমরা মনে করো “সোণদণ্ড” বহুশ্রুত, সুভাষ, পণ্ডিত, শ্রমণ গৌতমকে এই বিষয়ে প্রত্যুত্তর দানে সক্ষম,” তাহা হইলে তোমরা ক্ষান্ত হও, সোণদণ্ডই আমার সহিত বিচারে প্রবৃত্ত হউক।”
৩১৫. এইরূপ কথিত হইলে সোণদণ্ড ভগবানকে বলিলেন, “গৌতম, আপনি ক্ষান্ত হউন, মৌন ধারণ করুন, আমিই তাহাদের সহিত ধর্মানুরূপ বিচার করিব।”
তৎপরে সোণদণ্ড ব্রাহ্মণদিগকে বলিলেন, “আপনারা এরূপ বলিবেন না, এরূপ বলিবেন না, সোণদণ্ড বর্ণের অপবাদ করিতেছেন, মন্ত্রের অপবাদ করিতেছেন, জাতির অপবাদ করিতেছেন, তিনি একান্তই শ্রমণ গৌতমের মতবাদ গ্রহণ করিতেছেন।” আমি বর্ণ, অথবা মন্ত্র, অথবা জাতির অপবাদ করিতেছি না।”
৩১৬. ওই সময়ে সোণদণ্ডের ভাগিনেয় অঙ্গক নামক যুবক সেই পরিষদে উপবিষ্ট ছিলেন। সোণদণ্ড ব্রাহ্মণগণকে বলিলেন :
“আপনারা আমাদের ভাগিনেয় অঙ্গককে দেখিতেছেন?”
“দেখিতেছি।”
“অঙ্গক অভিরূপ, দর্শনীয়, প্রাসাদিক, পরম বর্ণসৌন্দর্যলব্ধ, ব্রহ্মবর্ণী, ব্রহ্মদেহী, মহদ্দর্শন; এই পরিষদে বর্ণ বিষয়ে গৌতম ব্যতীত তাঁহার সমকক্ষ কেহই নাই। তিনি অধ্যায়ক, মন্ত্রধারক; ত্রিবেদ, নির্ঘণ্ট, বেদনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পদ্ধতিসমূহ, শব্দতত্ত্ব এবং ইতিহাসরূপ পঞ্চম বেদে পারদর্শী, পদ পাঠজ্ঞ ও বৈয়াকরণিক; কূটতর্কবিদ্যানিপুণ ও মহাপুরুষ লক্ষণ জ্ঞানসম্পন্ন। আমিই তাঁহাকে মন্ত্রশিক্ষা দিয়াছি। অঙ্গক মাতৃ এবং পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্তপুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক, নির্দোষ। আমি তাঁহার মাতাপিতাকে জানি। যদি অঙ্গক প্রাণনাশ করেন, অদত্ত গ্রহণ করেন, পরদার গমন করেন, মিথ্যা বলিলেন, মদ্য পান করেন, তাহা হইলে বর্ণ তাঁহার কী করিবে? মন্ত্র ও জাতি কী করিবে? ব্রাহ্মণ যখন শীলবান, শীলবৃদ্ধ, বর্ধিত শীলসম্পন্ন হন, যখন তিনি পণ্ডিত, মেধাবী, যাজ্ঞিকদিগের মধ্যে প্রথম অথবা দ্বিতীয় হন, তখন এই দ্বিবিধ গুণযুক্ত ব্রাহ্মণকে ব্রাহ্মণগণ “ব্রাহ্মণ” অভিহিত করেন এবং তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না।”
৩১৭. “ব্রাহ্মণ, যদি এই দুই গুণ হইতে এককে পৃথক করা যায়, তাহা হইলে অবশিষ্ট একটি গুণযুক্ত পুরুষকে কি ব্রাহ্মণ অভিহিত করা যায়, যাহাতে তিনি “আমি ব্রাহ্মণ” এইরূপ কহিলে তাঁহার বাক্য সত্য হইবে, মিথ্যা হইবে না?”
“না, গৌতম। কারণ প্রজ্ঞা শীল দ্বারা প্রক্ষালিত এবং শীল প্রজ্ঞা দ্বারা প্রক্ষালিত; যেখানে শীল সেখানে প্রজ্ঞা, যেখানে প্রজ্ঞা সেখানে শীল, শীলবান প্রজ্ঞাসম্পন্ন, প্রজ্ঞাবান শীলসম্পন্ন; শীল ও প্রজ্ঞা লোকে সর্বোৎকৃষ্ট কথিত হয়। হে গৌতম, যেরূপ হস্ত দ্বারা হস্ত ধৌত হয়, পাদ দ্বারা পাদ ধৌত হয়, সেইরূপেই শীল প্রক্ষালিত প্রজ্ঞা, প্রজ্ঞা প্রক্ষালিত শীল; যেখানে শীল সেখানে প্রজ্ঞা, যেখানে প্রজ্ঞা সেখানে শীল; শীলবান প্রজ্ঞাসম্পন্ন, প্রজ্ঞাবান শীলসম্পন্ন, শীল ও প্রজ্ঞা লোকে সর্বোৎকৃষ্ট কথিত হয়।”
৩১৮. “ব্রাহ্মণ, ইহাই বটে। কারণ প্রজ্ঞা শীল দ্বারা… কতিত হয়। কিন্তু সেই শীল কী, এবং সেই প্রজ্ঞা কী?”
“হে গৌতম, এই বিষয়ে আমরা মাত্র এই পর্যন্ত জানি। পূজ্য গৌতমই অনুগ্রহপূর্বক এই বাক্যের অর্থ প্রকাশ করুন।”
“তাহা হইলে, হে ব্রাহ্মণ, শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো, আমি বলিতেছি।”
প্রত্যুত্তরে সোণদণ্ড বলিলেন, “উত্তম।”
ভগবান বলিলেন, “ব্রাহ্মণ, মনে করো জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ… [এই স্থলে শ্রামণ্যফল সূত্রের ১৯০–২১২ নং পদচ্ছেদ উক্ত হইয়াছে] ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু এইরূপেই শীলসম্পন্ন হইয়া থাকেন। ইহাই ওই শীল।
[এই স্থলে শ্রামণ্যফল সূত্রের ১৯০–২১২ অনুচ্ছেদ অনুসারে বুঝতে হবে] “এইরূপেই তিনি প্রজ্ঞাসম্পন্ন হইয়া থাকেন। ব্রাহ্মণ, ইহাই ওই প্রজ্ঞা।
৩১৯. এইরূপ কথিত হইলে সোণদণ্ড ভগবানকে বলিলেন :
“উত্তম, গৌতম, উত্তম! যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথ প্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলদীপ ধৃত হয়, সেইরূপ পূজনীয় গৌতম অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমিও ভগবান গৌতমের, ধর্মের এবং ভিক্ষুসংঘের শরণ লইতেছি। পূজ্য গৌতম আজ হইতে জীবনের অন্তকাল পর্যন্ত আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে গ্রহণ করুন। পূজ্য গৌতম অনুগ্রহপূর্বক আগামীকল্য ভিক্ষুসংঘের সহিত আমার অন্ন গ্রহণ করিবেন।”
৩২০. ভগবান তূষ্ণীম্ভাব দ্বারা সম্মতি প্রকাশ করিলেন। তৎপরে সোণদণ্ড ভগবানের সম্মতি জ্ঞাত হইয়া আসন হইতে উত্থানপূর্বক ভগবানকে অভিবাদন এবং প্রদক্ষিণ করিয়া প্রস্থান করিলেন। রাত্রির অবসানে সোণদণ্ড স্বীয় আবাসে উৎকৃষ্ট খাদ্য-ভোজ্য প্রস্তুত করিয়া ভগবানের নিকট বার্তা প্রেরণ করিলেন :
“হে গৌতম, অন্ন প্রস্তুত।”
ভগবানের নিকট সোণদণ্ডের প্রণতি
তদনন্তর ভগবান পূর্বাহ্নের বস্ত্র পরিহিত হইয়া পাত্র ও চীবর গ্রহণপূর্বক ভিক্ষুসংঘের সহিত সোণদণ্ডের গৃহে উপস্থিত হইয়া নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। তৎপরে সোণদণ্ড বুদ্ধপ্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে উত্তম উত্তম খাদ্য ও ভোজ্য স্বহস্তে পরিবেশনপূর্বক তাঁহাদিগের তৃপ্তি সাধন করিলেন।
৩২১. ভোজনাবসানে ভগবান পাত্র হইতে হস্ত অপসারিত করিলে সোণদণ্ড নিম্ন আসন গ্রহণপূর্বক একপ্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন। পরে সোণদণ্ড ভগবানকে বলিলেন :
“হে গৌতম, পরিষদ মধ্যে আগত হইয়া যদি আমি আসন হইতে উত্থানপূর্বক ভগবান গৌতমকে অভিবাদন করি, তাহা হইলে পরিষদ কর্তৃক আমি তিরস্কৃত হইব। যে পরিষদ কর্তৃক তিরস্কৃত হইবে, তাহার যশের হ্রাস হইবে, যাহার যশের হ্রাস হইবে তাহার ভোগেরও হ্রাস হইবে, যশ হইতেই আমাদের ভোগপ্রাপ্তি হয়। হে গৌতম, পরিষদে আসনোপবিষ্ট হইয়া যদি আমি অঞ্জলিবদ্ধ হই, তাহা হইলে উহা আসন হইতে আমার প্রত্যুপস্থানরূপে গ্রহণ করুন। হে গৌতম, পরিষদে উপবিষ্ট হইয়া যদি আমি শিরোবেষ্টন উন্মোচন করি, ভগবান গৌতম উহা আমার শির দ্বারা অভিবাদনরূপে গ্রহণ করুন। হে গৌতম, যদি আমি যানারূঢ় হইয়া যান হইতে অবতরণপূর্বক ভগবান গৌতমকে অভিবাদন করি, তাহা হইলে পরিষদ কর্তৃক নিন্দিত হইব। পরিষদ কর্তৃক নিন্দিত হইলে যশের হ্রাস হইবে, যশের হ্রাস হইলে ভোগেরও হ্রাস হইবে, যশ হইতে ভোগপ্রাপ্তি হয়। হে গৌতম, যদি আমি যানারূঢ় হইয়া প্রতোদ যষ্টি উত্তোলন করি, উহা আমার যান হইতে অবতরণরূপে গ্রহণ করুন। হে গৌতম, যদি আমি যানারূঢ় হইয়া হস্ত নমিত করি, উহা শির দ্বারা আমার অভিবাদনরূপে গ্রহণ করুন।”
৩২২. অনন্তর ভগবান সোণদণ্ডকে ধর্মকথা দ্বারা উপবিষ্ট, সমুদ্দীপ্ত, সমুত্তেজিত, সম্প্রহৃষ্ট করিয়া আসন হইতে উত্থানপূর্বক প্রস্থান করিলেন।
সোণদণ্ড সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৩]
English
Deutsch
Việt Ngữ