লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৫]

কূটদন্ত সূত্র

৩২৩. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। একসময় ভগবান পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘের সহিত মগধে ভ্রমণ করিতে করিতে ওই দেশের খানুমত নামক ব্রাহ্মণগ্রামে উপনীত হইলেন। ওই সময় ব্রাহ্মণ কূটদন্ত রাজভোগ্য, রাজদায় ব্রহ্মদায়রূপে মগধরাজ শ্রেণিক বিম্বিসার কর্তৃক প্রদত্ত জনাকীর্ণ তৃণকাষ্ঠ-উদক-ধান্যসম্পন্ন খানুমতে বাস করিতেছিলেন। ওই সময় কূটদন্ত ব্রাহ্মণের মহাযজ্ঞ উপস্থিত হইয়াছিল। সাতশত বৃষ, সাতশত বৎসতর, সাতশত বৎসতরী, সাতশত ছাগ এবং সাতশত মেষ যজ্ঞার্থে যূপকাষ্ঠে নীত হইয়াছিল।

৩২৪. খানুমতের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ শুনিলেন, “শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম… শুভজনক” (সোণদণ্ড সূত্রের ৩০১ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)।

৩২৫. তদনন্তর খানুমতের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া খানুমত হইতে নিষ্ক্রমণপূর্বক অম্বলট্ঠিকা উদ্যানে গমন করিতে লাগিলেন।

৩২৬. ওই সময়ে ব্রাহ্মণ কূটদন্ত দিবাশয়নের নিমিত্ত স্বীয় প্রাসাদোপরি গমন করিয়াছিলেন। তিনি দেখিলেন খানুমতের ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হইয়া খানুমত হইতে নিষ্ক্রমণপূর্বক অম্বলট্ঠিকার অভিমুখে গমন করিতেছে। উহা দেখিয়া তিনি দ্বারপালকে বলিলেন :

“খানুমতের ব্রাহ্মণ গৃহপতিগণ কী হেতু এইরূপে অম্বলট্ঠিকার অভিমুখে গমন করিতেছে?”

৩২৭. “শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত হইয়া পঞ্চশত ভিক্ষু-সমন্বিত মহাভিক্ষুসংঘের সহিত মগধে ভ্রমণ করিতে করিতে খানুমতে উপনীত হইয়া তথায় অম্বলট্ঠিকা উদ্যানে অবস্থান করিতেছেন। সেই ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে :

“ইনিই… বুদ্ধ ভগবন্ত।” সেই ভগবান গৌতমকে দেখিবার জন্য ইহারা যাইতেছে।”

৩২৮. তদনন্তর কূটদন্ত চিন্তা করিলেন :

“আমি শুনিয়াছি শ্রমণ গৌতম ষোড়শ অঙ্গযুক্ত ত্রিবিধ যজ্ঞ বিদিত আছেন। উহা কিন্তু আমার বিদিত নয়, অথচ আমি মহাযজ্ঞ সম্পাদনে ইচ্ছুক। অতএব আমি শ্রমণ গৌতমের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে ষোড়শাঙ্গ ত্রিবিধ যজ্ঞ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করিব।”

৩২৯. তৎপরে কূটদন্ত দ্বারপালকে বলিলেন :

“দ্বারপাল, তুমি খানুমতের ব্রাহ্মণ গৃহপতিগণের নিকট গিয়া বল, “ব্রাহ্মণ কূটদন্ত আপনাদিগকে অপেক্ষা করিতে বলিয়াছেন, তিনিও শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ যাইবেন।”

কূটদন্ত ও ব্রাহ্মণগণ

“যথা আজ্ঞা” বলিয়া দ্বারপাল খানুমতের ব্রাহ্মণ গৃহপতিগণের নিকট গিয়া সমস্ত বলিল।

৩৩০. ওই সময়ে বহু শত ব্রাহ্মণ কূটদন্তের মহাযজ্ঞে যোগদান করিবার নিমিত্ত খানুমতে অবস্থান করিতেছিলেন। তাঁহারা শুনিলেন যে কূটদন্ত শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ যাইতেছেন।

৩৩১. ইহা শুনিয়া তাঁহারা কূটদন্তের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে বলিলেন :

“কূটদন্ত শ্রমণ গৌতমকে দর্শন করিতে যাইবেন ইহা কি সত্য?

“ইহাই আমার ইচ্ছা, আমিও গৌতমকে দর্শন করিতে যাইব।”

৬. “মাননীয় কূটদন্ত গৌতমের দর্শনার্থ যাইবেন না, যাওয়া যুক্ত নহে। কূটদন্ত গৌতমের দর্শনার্থ যাইলে তাঁহার যশের হ্রাস হইবে, গৌতমের যশ বৃদ্ধি পাইবে। এই কারণে কূদটদন্তের যাওয়া যুক্ত নহে, শ্রমণ গৌতমেরই কূটদন্তের নিকট আগমন করা উচিত। কূটদন্ত মাতৃ এবং পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই… নির্দোষ (সোণদণ্ড সূত্রের ৩০৩ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)। এই কারণে কূটদন্তের যাওয়া উচিত নহে, গৌতমেরই কূটদন্তের নিকট আগমন করা উচিত। মাননীয় কূটদন্ত আঢ্য… সম্পন্ন খানুমতে বাস করিতেছেন। এই কারণে কূটদন্তের শ্রমণ গৌতমের দর্শনার্থ গমন উচিত নহে, গৌতমেরই উচিত কূটদন্তের দর্শনার্থ আগমন করা।

৩৩২. এইরূপ উক্ত হইলে কূটদন্ত ওই ব্রাহ্মণদিগকে বলিলেন :

“তাহা হইলে, ব্রাহ্মণগণ, তোমরা আমার বাক্যও শ্রবণ করো, যে কারণে… আমাদের কর্তব্য। যেহেতু তিনি খানুমতে উপনীত হইয়া তথায় অম্বলট্ঠিকা উদ্যানে অবস্থিতি করিতেছেন, সেই হেতু তিনি আমাদের অতিথি এবং অতিথি আমাদের… কর্তব্য। এই সকল কারণে… অপরিসীম।” (সোণদণ্ডের সূত্রের ৩০৪ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)।

৩৩৩. এইরূপ উক্ত হইলে ব্রাহ্মণগণ কূটদন্তকে বলিলেন :

“মাননীয় কূটদন্ত যেরূপে শ্রমণ গৌতমের প্রশংসোক্তি করিলেন, তাহাতে… যাইব।” (সোণদণ্ডের সূত্রের ৩০৫ অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)।

৩৩৪. তৎপরে কূটদন্ত বৃহৎ ব্রাহ্মণসংঘের সহিত অম্বলট্ঠিকা উদ্যানে ভগবানের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাকে অভিবাদন ও তাঁহার সহিত প্রীত্যালাপান্তে এক প্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন। খানুমতের ব্রাহ্মণ-গৃহস্থগণ কেহ কেহ ভগবানকে… একান্তে বসিলেন।

৩৩৫. এইরূপে উপবিষ্ট হইয়া কূটদন্ত ভগবানকে বলিলেন :

“হে গৌতম, আমি শুনিয়াছি শ্রমণ গৌতম ষোড়শাঙ্গ ত্রিবিধ যজ্ঞসম্পদা অবগত আছেন। আমি উহা জানি না, কিন্তু আমি মহাযজ্ঞ করিতে ইচ্ছুক। গৌতম আমাকে অনুগ্রহপূর্বক ওই যজ্ঞ-সম্পদা শিক্ষা দিন।”

৩৩৬. “তাহা হইলে, ব্রাহ্মণ, শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো, আমি বলিতেছি।”

যজ্ঞের পূর্বকৃত্য

প্রত্যুত্তরে কূটদন্ত সম্মতি জ্ঞাপন করিলেন। ভগবান বলিলেন :

“ব্রাহ্মণ, পূর্বকালে মহাবিজিত নামে এক রাজা ছিলেন। তিনি আঢ্য, মহাধনী, মহাভোগী ছিলেন, তাঁহার রাজভাণ্ডার প্রভূত স্বর্ণ-রৌপ্যাদি বিত্ত-উপকরণ ও ধনধান্যে পরিপূর্ণ ছিল। রাজা মহাবিজিত নির্জনে ধ্যানরত হইলে তাঁহার চিত্তে এইরূপ পরিবিতর্কের উদয় হইল, “বিপুল মানুষী-ভোগ আমার অধিকারে, আমি সুবিশাল পৃথিবীমণ্ড জয় করিয়াছি; অতএব আমি মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিব, উহা দীর্ঘকাল আমার সুখ ও হিতবিধান করিবে”।

৩৩৭. তৎপরে রাজা মহাবিজিত পুরোহিত ব্রাহ্মণকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “হে ব্রাহ্মণ, আমি নির্জনে ধ্যানরত হইলে আমার চিত্তে এইরূপ পরিবিতর্কের উদয় হইল, “বিপুল মানুষী-ভোগ… করিবে। হে ব্রাহ্মণ, আমি মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতে ইচ্ছা করি, দীর্ঘকাল আমার হিত ও সুখের জন্য আমাকে শিক্ষা দিন।”

৩৩৮. “রাজা এইরূপ কহিলে ব্রাহ্মণ পুরোহিত মহাবিজিতকে বলিলেন, “নৃপতির জনপদ সকণ্টক স-উৎপীড়ক, রাজ্যে গ্রাম ও নগর লুণ্ঠনকারী চোরের প্রাদুর্ভাব, পথসমূহ ভয়পূর্ণ। রাজা যদি এই সকণ্টক স-উৎপীড়ক জনপদ হইতে কর গ্রহণ করেন, তাহা হইলে উহা ন্যায় বিগর্হিত হইবে। রাজা হয়তো মনে করিতে পারেন, “এই দস্যু-কণ্টক আমি বধ, বন্ধন, হানি, নিন্দা অথবা নির্বাসন দ্বারা উৎপাটিত করিব”, কিন্তু এইরূপে ওই দস্যুকণ্টক সম্যক প্রকারে দূরীভূত হইবে না। হতাবশিষ্টগণ রাজার জনপদে উপদ্রব করিবে। কিন্তু এক উপায় আছে যার দ্বারা এই উপদ্রব সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হইতে পারে। রাজ্যে কৃষি-গোরক্ষ কর্মে যাহাদের উৎসাহ, রাজা তাহাদিগকে বীজ ও অন্নদান করুন, বাণিজ্যে যাহাদের উৎসাহ, রাজা তাহাদিগকে মূলধন দান করুন, যাহারা রাজকার্যে নিযুক্ত, রাজা তাহাদিগকে অন্ন ও বেতন দান করুন, ওই সকল মনুষ্য স্বকর্ম নিরত হইয়া আর রাজ্যে উপদ্রব করিবে না; রাজার আয়বৃদ্ধি হইবে, রাজ্য ক্ষেমযুক্ত, অকণ্টক, অনুপদ্রুত হইবে, প্রজাবর্গ আনন্দিত চিত্তে ক্রোড়ে পুত্র নাচাইয়া নিরর্গল গৃহে সুখে বিহার করিবে।”

রাজা মহাবিজিত “উত্তম” বলিয়া পুরোহিত ব্রাহ্মণের বাক্যানুসারে রাজ্যের কৃষক-গোরক্ষগণকে বীজ ও অন্ন দান করিলেন, বণিকগণকে মূলধন দান করিলেন, রাজপুরুষগণকে অন্ন ও বেতন দান করিলেন। ওই সকল মনুষ্য স্বকর্ম নিরত হইয়া আর রাজ্যে উপদ্রব করিল না, রাজার আয় বৃদ্ধি হইল; ক্ষেমযুক্ত, অকণ্টক, অনুপদ্রুত রাজ্যে প্রজাবর্গ আনন্দিত চিত্তে ক্রোড়ে পুত্র নাচাইয়া নিরর্গল গৃহে সুখে বিহার করিতে লাগিল।

যজ্ঞের পূর্বকৃত্য

১২. “অনন্তর রাজা মহাবিজিত পুরোহিত ব্রাহ্মণকে আহ্বান করিয়া তাঁহাকে বলিলেন, “দস্যুকণ্টক উৎপাটিত হইয়াছে, আপনার বিধানে আমার কোষ পরিপূর্ণ, রাজ্য ক্ষেমযুক্ত, অকণ্টক, অনুপদ্রুত। প্রজাবর্গ আনন্দিত চিত্তে ক্রোড়ে পুত্র নাচাইয়া নিরর্গল গৃহে সুখে বাস করিতেছে। হে ব্রাহ্মণ, আমি মহা যজ্ঞানুষ্ঠান করিতে ইচ্ছুক, দীর্ঘকাল আমার হিত ও সুখের জন্য আমাকে শিক্ষা দিন।”

৩৩৯. “তাহা হইলে, মহারাজ, রাজ্যের নৈগম এবং জানপদ ক্ষত্রিয় সামন্তরাজগণকে, অমাত্য পারিষদগণকে, ব্রাহ্মণ মহাশালগণকে, ধনী গৃহস্থগণকে আমন্ত্রণপূর্বক বলুন, “আমি মহা যজ্ঞানুষ্ঠানে অভিলাষী, দীর্ঘকাল আমার হিত ও সুখের জন্য আমাকে শিক্ষা দিন।”

“হে ব্রাহ্মণ, রাজা মহাবিজিত পুরোহিত ব্রাহ্মণের বাক্যে সম্মত হইয়া রাজ্যের নৈগম এবং জানপদ ক্ষত্রিয় সামন্তরাজগণকে, অমাত্য পারিষদগণকে, ব্রাহ্মণ মহাশালগণকে, ধনী গৃহস্থগণকে আমন্ত্রণপূর্বক বলিলেন :

“আমি মহাযজ্ঞানুষ্ঠানে… শিক্ষা দিন।” উত্তরে তাঁহারা সকলেই বলিলেন, মহারাজ, যজ্ঞানুষ্ঠান করুন, যজ্ঞকাল উপস্থিত।”

“এইরূপে ওই চারি অনুমতি-পক্ষ সেই যজ্ঞের উপাদানস্বরূপ হইলেন।”

৩৪০. “রাজা মহাবিজিত অষ্টাঙ্গযুক্ত ছিলেন-তিনি মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্তপুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক, নির্দোষ;

“তিনি অভিরূপ, দর্শনীয়, প্রাসাদিক, পরম বর্ণসৌন্দর্যলব্ধ, ব্রহ্মবর্ণী, ব্রহ্মদেহী, মহদ্দর্শন;

“তিনি আঢ্য, মহাধনী, মহাভোগী, প্রভূত স্বর্ণ-রৌপ্যাদি বিত্ত-উপকরণ ও ধনধান্যে পরিপূর্ণ রাজভাণ্ডারসম্পন্ন;

“তিনি পরাক্রান্ত; রাজভক্ত আদেশানুবর্তী চতুরঙ্গিণী সেনাসমন্বিত; স্বীয় যশগৌরব দ্বারা যেন শত্রুদহনকারী;

“তিনি শ্রদ্ধাবান, দায়ক, দানপতি, অবারিত দ্বার, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ-নিঃস্ব-দরিদ্র-যাচকগণের তৃষ্ণানিবারী উৎস, তিনি পুণ্য কর্মকারী-“তিনি সর্ববিধ বিদ্যায় বহুশ্রুত;

“তিনি ভাষিতের অর্থজ্ঞানসম্পন্ন-“এই কথার এই অর্থ, এই কথার এই অর্থ”;

তিনি পণ্ডিত, নিপুণ, মেধাবী, ভূত, ভবিষ্যৎ ও বর্তমানের চিন্তাকরণে সক্ষম।

“রাজা মহাবিজিত এই অষ্টাঙ্গযুক্ত ছিলেন। এই অষ্টাঙ্গও সেই যজ্ঞে উপাদানস্বরূপ হইল।

ত্রিবিধ

৩৪১. “পুরোহিত ব্রাহ্মণ চতুরঙ্গযুক্ত-তিনি মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতেই সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্ত পুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক, নির্দোষ;

তিনি অধ্যায়ক, মন্ত্রধারক, ত্রিবেদ, নির্ঘণ্ট, বেদনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পদ্ধতিসমূহ, শব্দতত্ত্ব এবং ইতিহাস রূপ পঞ্চম বেদে পারদর্শী; পাদ-পাঠজ্ঞ ও বৈয়াকরণিক; কূটতর্কবিদ্যা নিপুণ এবং মহাপুরুষ লক্ষণজ্ঞানসম্পন্ন-তিনি শীলবান, শীলবৃদ্ধ, বর্ধিত শীলসম্পন্ন;

তিনি পণ্ডিত, নিপুণ, মেধাবী, যাজ্ঞিকদিগের মধ্যে প্রথম অথবা দ্বিতীয়।

পুরোহিত ব্রাহ্মণ এই চতুরঙ্গ যুক্ত। এই চতুরঙ্গও সেই যজ্ঞের উপাদানস্বরূপ হইল।

৩৪২. “তদনন্তর, ব্রাহ্মণ, পুরোহিত ব্রাহ্মণ রাজা মহাবিজিতকে যজ্ঞের পূর্বে ত্রিবিধি শিক্ষা দিলেন, “মহাযজ্ঞ করণেচ্ছু আপনার চিত্তে যদি এইরূপ অনুতাপ উপস্থিত হয়, “আমার বিপুল ধনরাশি ব্যয়িত হইবে”, তাহা হইলে রাজা ওই অনুতাপ পোষণ করিবেন না। যজ্ঞকালে যদি আপনার চিত্তে এইরূপ অনুতাপ উপস্থিত হয়, “আমার বিপুল ধনরাশি ব্যয়িত হইতেছে” তাহা হইলে রাজা ওই অনুতাপ পোষণ করিবেন না। যজ্ঞ সমাপনান্তে যদি আপনার চিত্তে এইরূপ অনুতাপ উপস্থিত হয়, “আমার বিপুল ধনরাশি ব্যয়িত হইয়াছে”, তাহা হইলে রাজা ওই অনুতাপ পোষণ করিবেন না।

“পুরোহিত ব্রাহ্মণ রাজা মহাবিজিতকে যজ্ঞের পূর্বে এই ত্রিবিধি শিক্ষা দিলেন।”

৩৪৩. তৎপরে পুরোহিত ব্রাহ্মণ যজ্ঞের পূর্বেই রাজা মহাবিজিতের প্রতিগ্রাহকদিগের প্রতি যে দশ প্রকারে চিত্ত বিকার উৎপন্ন হইতে পারে তাহা দূর করিলেন। “আপনার যজ্ঞে প্রাণাতিপাতীও আসিবে, যাহারা প্রাণাতিপাত হইতে বিরত তাহারাও আসিবে। উহাদিগের মধ্যে যাহারা প্রাণাতিপাতী তাহারা আপনাদিগের প্রাণাতিপাত লইয়াই থাকিবে, যাহারা প্রাণাতিপাত হইতে বিরত রাজা তাহাদের জন্যই যজন করিবেন, তাহাদেরই প্রীতি উৎপাদন করিবেন, তাহারাই রাজার হৃদয়াভ্যন্তরে প্রসন্নতা আনয়ন করিবে।

প্রকৃত যজ্ঞ

যাহারা অদত্তের গ্রহণকারী তাহারাও আপনার যজ্ঞে আসিবে, যাহারা অদত্তের গ্রহণ হইতে বিরত তাহারাও আসিবে… যাহারা ব্যভিচারী তাহারাও আসিবে, যাহারা ব্যভিচার হইতে বিরত তাহারাও আসিবে, যাহারা মিথ্যাবাদী এবং যাহারা মিথ্যাবাদ হইতে বিরত, যাহারা পিশুনভাষী এবং যাহারা পিশুনভাষ হইতে বিরত, যাহারা পুরুষভাষী এবং যাহারা পুরুষভাষ হইতে বিরত, যাহারা বৃথা প্রলাপকারী এবং যাহারা উহা হইতে বিরত, যাহারা লোভী তাহারা এবং যাহারা অলোভী তাহারা, যাহারা ব্যাপন্ন চিত্ত তাহারা এবং যাহারা অব্যাপন্ন চিত্ত তাহারা, যাহারা মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন তাহারা এবং যাহারা সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন তাহারা-উহারা সকলেই আসিবে। যাহারা মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন তাহারা উহা লইয়াই থাকিবে, যাহারা সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন রাজা তাহাদের জন্যই যজন করিবেন, তাহাদেরই প্রীতি উৎপাদন করিবেন, তাহারাই রাজার হৃদয়াভ্যন্তরে প্রসন্নতা আনয়ন করিবে।” পুরোহিত ব্রাহ্মণ যজ্ঞের পূর্বেই রাজা মহাবিজিতের প্রতিগ্রাহকদিগের প্রতি এই দশ প্রকারে যে চিত্তবিকার উৎপন্ন হইতে পারে তাহা দূর করিলেন।

৩৪৪. তৎপরে পুরোহিত ব্রাহ্মণ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানের সময় রাজা মহাবিজিতের চিত্তকে ষোড়শ প্রকারে সমুপদিষ্ট সমুদ্দীপ্ত, সমুত্তেজিত ও সম্প্রহৃষ্ট করিলেন :

“মহা যজ্ঞানুষ্ঠানকালে যদি রাজাকে কেহ কহে-“রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, কিন্তু তিনি নৈগম এবং জানপদ ক্ষত্রিয় সামন্তগণকে নিমন্ত্রণ করেন নাই, অথচ রাজা এইরূপ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন”, রাজাকে ধর্মত কেহ এরূপ বলিতে পারে না, তিনি নৈগম এবং জানপদ ক্ষত্রিয় সামন্তগণকে নিমন্ত্রণ করিয়াছে অতএব আপনি যজন করুন, প্রীতিপূর্ণ হউন, হৃদয়ে প্রসন্নতা অনুভব করুন। যদি কেহ রাজাকে এরূপ কহে, “রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, কিন্তু নিগম ও জনপদ হইতে অমাত্য পারিষদবর্গকে নিমন্ত্রণ করেন নাই… ব্রাহ্মণ মহাশালগণকে নিমন্ত্রণ করেন নাই… ধনী গৃহস্থগণকে নিমন্ত্রণ করেন নাই, অথচ তিনি মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন,” রাজাকে ধর্মত কেহ এরূপ বলিতে পারেন, তিনি ওই সকল নিমন্ত্রণ সম্পন্ন করিয়াছেন, অতএব আপনি যজন করুন, প্রীতিপূর্ণ হউন, হৃদয়ে প্রসন্নতা অনুভব করুন। যদি কেহ রাজাকে এরূপ কহে, “রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, কিন্তু তিনি মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতে সুজাত নহেন, ঊর্ধ্বতন সপ্তপুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত নহেন, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক নির্দোষ নহেন, অথচ তিনি মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন”, রাজাকে ধর্ম কেহ এরূপ বলিতে পারে না, আপনি মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতে সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্তদশ পুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক নির্দোষ। অতএব আপনি যজন করুন, প্রীতিপূর্ণ হউন, হৃদয়ে প্রসন্নতা অনুভব করুন। যদি কেহ রাজাকে এরূপ কহে, “রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, কিন্তু তিনি অভিরূপ, দর্শনীয়, প্রাসাদিক, পরম বর্ণসৌন্দর্যলব্ধ, ব্রহ্মবর্ণী, ব্রহ্মদেহী, মহদ্দর্শন নহেন… তিনি আঢ্য, মহাধনী, মহাভোগী, প্রভূত স্বর্ণরৌপ্যাদি বিত্ত-উপকরণ ও ধনধান্যে পরিপূর্ণ রাজভাণ্ডারসম্পন্ন নহেন… তিনি পরাক্রান্ত রাজভক্ত আদেশানুবর্তী চতুরঙ্গিণী সেনা সমন্বিত, স্বীয় যশগৌরব দ্বারা শত্রু দহনকারী নহেন… তিনি শ্রদ্ধাবান, দায়ক, দানপতি, অবারিতদ্বার, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ-নিঃস্ব-দরিদ্র-যাচকগণের তৃষ্ণানিবারী উৎস এবং পুণ্য কর্মকারী নহেন… তিনি সর্ববিধ বিদ্যায় বহুশ্রুত নহেন… তিনি “এই কথার এই অর্থ, এই কথার এই অর্থ” এইরূপ ভাষিতের অর্থজ্ঞানসম্পন্ন নহেন… তিনি পণ্ডিত, নিপুণ, মেধাবী, ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানের চিন্তাকরণে সক্ষম নহেন… অথচ তিনি এইরূপ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন”, রাজাকে ধর্মত কেহ এরূপ বলিতে পারে না, আপনি পণ্ডিত, নিপুণ, মেধাবী, ভূত-ভবিষ্যৎ বর্তমানের চিন্তাকরণে সক্ষম, অতএব আপনি যজন করুন, প্রীতিপূর্ণ হউন, হৃদয়ে প্রসন্নতা অনুভব করুন। যদি কেহ রাজাকে এরূপ কহে, “রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, কিন্তু তাঁহার পুরোহিত ব্রাহ্মণ মাতৃ ও পিতৃ উভয় পক্ষ হইতে সুজাত, ঊর্ধ্বতন সপ্তদশ পুরুষ পর্যন্ত বিশুদ্ধ গর্ভজাত, জাতি সম্বন্ধে নিষ্কলঙ্ক নির্দোষ নহেন। অথচ তিনি এইরূপ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন,” রাজাকে ধর্মত কেহ এরূপ বলিতে পারে না, রাজার পুরোহিত ব্রাহ্মণ মাতৃ ও পিতৃ… নিষ্কলঙ্ক নির্দোষ। অতএব আপনি যজন করুন, প্রীতিপূর্ণ হউন, হৃদয়ে প্রসন্নতা অনুভব করুন। যদি কেহ রাজাকে এরূপ কহে, “রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, কিন্তু তাঁহার পুরোহিত ব্রাহ্মণ অধ্যায়ক ও মন্ত্রধারক নহেন; ত্রিবেদ, নির্ঘণ্ট, বেদনির্দিষ্ট অনুষ্ঠান পদ্ধতিসমূহ, শব্দতত্ত্ব এবং ইতিহাসরূপ পঞ্চমবেদ পারদর্শী নহেন; পদপাঠজ্ঞ ও বৈয়াকরণিক নহেন; কূটতর্কবিদ্যানিপুণ এবং মহাপুরুষলক্ষণ জ্ঞানসম্পন্ন নহেন।… তিনি শীলবান, শীলবৃদ্ধ, বর্ধিত শীলসম্পন্ন নহেন… তিনি পণ্ডিত, নিপুণ, মেধাবী যাজ্ঞিকদিগের মধ্যে প্রথম অথবা দ্বিতীয় নহেন, অথচ রাজা এইরূপ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, “রাজাকে ধর্ম কেহ এরূপ বলিতে পারে না, রাজার পুরোহিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, নিপুণ, মেধাবী, যাজ্ঞিকদিগের মধ্যে প্রথম অথবা দ্বিতীয়। অতএব আপনি যজন করুন, প্রীতিপূর্ণ হউন, হৃদয়ে প্রসন্নতা অনুভব করুন।”

“এইরূপে পুরোহিত ব্রাহ্মণ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠানের সময় রাজা মহাবিজিতের চিত্তকে ষোড়শ প্রকারে সমুপদিষ্ট, সমুদ্দীপ্ত, সমুত্তেজিত ও সম্প্রহৃষ্ট করিলেন।

৩৪৫. “হে ব্রাহ্মণ, সেই যজ্ঞে গো-হনন হইল না, অজ ও মেষ, কুক্কুট ও শূকরের প্রাণ বিনাশ হইল না, নানাবিধ প্রাণীর জীবন নষ্ট হইল না, যূপকাষ্ঠের নিমিত্ত বৃক্ষ ছিন্ন হইল না, যজ্ঞ-তৃণার্থে দর্ব কর্তিত হইল না; দাস, সংবাদবাহক, কর্মকারকগণ দণ্ড-তর্জিত ও ভস্ম-তর্জিত হইয়া অশ্রুমুখে রোদনপরায়ণ হইয়া কর্মে প্রবৃত্ত হইল না। যাহার ইচ্ছুক তাহারাই কর্ম করিল, যাহারা অনিচ্ছুক তাহারা করিল না; যাহারা যে কর্মে প্রবৃত্তি সে তাহাই করিল, যাহার যাহাতে অপ্রবৃত্তি সে তাহা করিল না। ঘৃত-তৈল-নবনীত-দধি-মধু-গুড় দ্বারা সেই যজ্ঞ নিষ্ঠিত হইল।

৩৪৬. “হে ব্রাহ্মণ, তৎপরে নৈগম ও জানপদ ক্ষত্রিয় সমান্তগণ, অমাত্য পারিষদগণ, ব্রাহ্মণ মহাশালগণ, ধনী গৃহস্থগণ প্রভূত ধন-সম্পত্তি লইয়া রাজা মহাবিজিতের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাকে বলিল, “দেব, প্রভূত এই ধন-সম্পত্তি দেবোদ্দেশ্যে আহৃত হইয়াছে, আপনি ইহা গ্রহণ করুন।”

“আমার ধর্মোপার্জিত বহু অর্থ আছে, আপনাদের ধন আপনাদেরই হউক, এই স্থান হইতে আপনারা আরও গ্রহণ করুন।”

“রাজা ধনগ্রহণে অস্বীকৃত হইলে তাঁহারা স্থানান্তরে গমনপূর্বক এই প্রকার মন্ত্রণা করিলেন, “এই ধন যদি আমরা পুনরায় গৃহে লইয়া যাই, তাহা হইলে উহা অযুক্ত হইবে; রাজা মহাবিজিত মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করিতেছেন, আমরা তাঁহার অনুযোগী হইব।”

৩৪৭. “হে ব্রাহ্মণ, তৎপরে যজ্ঞবাটের পূর্বদিকে নৈগম এবং জানপদ ক্ষত্রিয় সামন্তগণ আপনাদিগের দান স্থাপিত করিলেন, দক্ষিণে অমাত্য পারিষদবর্গ, পশ্চিমে ব্রাহ্মণ মহাশালগণ এবং উত্তরে ধনী গৃহস্থগণ আপন আপন দান স্থাপিত করিলেন। ওই সকল যজ্ঞে গো-হনন হইল না… সেই যজ্ঞ নিষ্ঠিত হইল।

“ইহাই চারি অনুমতি পক্ষ, রাজা মহাবিজিত অষ্টাঙ্গযুক্ত, পুরোহিত ব্রাহ্মণ চারি অঙ্গযুক্ত; এবং তিন বিধি। হে ব্রাহ্মণ, ইহাই ষোড়শাঙ্গ ত্রিবিধ যজ্ঞ-সম্পদা কথিত হয়।”

৩৪৮. এইরূপ উক্ত হইলে ব্রাহ্মণগণ উন্নাদ, উচ্চশব্দ, মহাশব্দ করিতে লাগিল, “অহো যজ্ঞ, অহো যজ্ঞ-সম্পদা!” কিন্তু ব্রাহ্মণ কূটদন্ত মৌন হইয়া উপবিষ্ট রহিলেন, অনন্তর ব্রাহ্মণগণ কূটদন্তকে বলিলেন :

“কূটদন্ত, আপনি কি নিমিত্ত শ্রমণ গৌতমের সুভাষিত বাক্য সুভাষিতরূপে অনুমোদন করিতেছেন না?”

“আমি যে ওই বাক্যের অনুমোদন করিতেছি না তাহা নহে, যে শ্রমণ গৌতমের সুভাষিত বাক্য সুভাষিতরূপে অনুমোদন না করিবে তাহার মস্তক বিদীর্ণ হইবে। কিন্তু আমি এইরূপ মনে করিতেছি, “শ্রমণ গৌতম বলিতেছেন না, “আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি” অথবা “এইরূপ হইতে পারে, কিন্তু তিনি বলিতেছেন, “তখন উহাই ছিল, ওই সময় এইরূপই ছিল।” এইরূপে আমার মনে হইতেছে, “শ্রমণ গৌতম নিশ্চয়ই ওই সময় যজ্ঞ-স্বামী রাজা মহাবিজিত ছিলেন; অথবা সেই যজ্ঞের যাজক পুরোহিত ব্রাহ্মণ ছিলেন।” এইরূপ যজ্ঞের কারক কিংবা কারয়িতা মরণান্তে সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হন, ইহা কি পূজ্য গৌতমের স্বকীয় অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান?”

মহত্তর যজ্ঞ

“হে ব্রাহ্মণ, উহা আমার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। আমি সেই সময়ে সেই যজ্ঞের যাজক পুরোহিত ব্রাহ্মণ ছিলাম।”

৩৪৯. “হে গৌতম, এই ষোড়শাঙ্গ ত্রিবিধ যজ্ঞ-সম্পদা হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী অন্য কোনো যজ্ঞ আছে কি?”

“আছে।”

“উহা কী?”

“উহা শীলবান প্রব্রজিতদিগের উদ্দেশ্যে অনুকূল নিত্য দানযজ্ঞ।”

“হে গৌতম, শীলবান প্রব্রজিতদিগের উদ্দেশ্যে অনুকূল নিত্য দানযজ্ঞ যে ষোড়শাঙ্গ ত্রিবিধ যজ্ঞ-সম্পদা হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী, তাহার হেতু কী, প্রত্যয় কী?”

“হে ব্রাহ্মণ, যাঁহারা অর্হৎ অথবা অর্হত্ত্বমার্গারূঢ় তাঁহারা এবম্বিধ যজ্ঞে গমন করেন না। কী কারণে? যেহেতু ওই স্থানে দণ্ড-প্রহারও দৃষ্ট হয়, গলগ্রহও দৃষ্ট হয়। এই কারণে যাঁহারা অর্হৎ অথবা অর্হত্ত্বমার্গারূঢ় তাঁহার এবম্বিধ যজ্ঞে গমন করেন না। কিন্তু তাঁহারা শীলবান প্রব্রজিতদিগের উদ্দেশ্যে যে অনুকূল নিত্য দানযজ্ঞ তাহাতে গমন করেন। কী কারণে? যেহেতু ওই স্থানে দণ্ড-প্রহারও দৃষ্ট হয় না, গলগ্রহও দৃষ্ট হয় না। এই কারণে তাঁহারা ওই রূপ স্থানে গমন করেন। হে ব্রাহ্মণ, এই অনুকূল নিত্য দানযজ্ঞ যে ষোড়শাঙ্গ ত্রিবিধ যজ্ঞ-সম্পদা হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর ও অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী, ইহাই তাহার হেতু, ইহাই প্রত্যয়।”

৩৫০. “হে গৌতম, উক্ত দ্বিবিধ যজ্ঞ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী অন্য যজ্ঞ আছে কি?”

“আছে।”

“উহা কী?”

“চতুর্দিকস্থ সংঘের উদ্দেশ্যে নির্মিত বিহার।”

৩৫১. “হে গৌতম, উক্ত ত্রিবিধ যজ্ঞ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী অন্য যজ্ঞ আছে কি?”

“আছে।”

“উহা কী?”

“প্রসন্ন চিত্তে বুদ্ধের শরণ গ্রহণ, ধর্মের শরণ গ্রহণ, সংঘের শরণ গ্রহণ।”

৩৫২. “হে গৌতম, উক্ত চতুর্বিধ যজ্ঞ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী অন্য যজ্ঞ আছে কি?”

“আছে।”

“উহা কী?”

“প্রসন্ন চিত্তে শিক্ষাপদসমূহের গ্রহণ-প্রাণাতিপাত হইতে বিরতি, অদত্তের গ্রহণ হইতে বিরতি, ব্যভিচার হইতে বিরতি, মৃষাবাদ হইতে বিরতি, সুরা-মেরয়-মদ্য-প্রমাদ স্থান হইতে বিরতি।”

৩৫৩. “হে গৌতম, উক্ত পঞ্চবিধ যজ্ঞ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী অন্য যজ্ঞ আছে কি?”

“আছে।”

“উহা কী?”

“হে ব্রাহ্মাণ, জগতে তথাগতের আবির্ভাব হইয়াছে… [এইস্থলে শ্রামণ্যফল সূত্রের ১৯০ অনুচ্ছেদ হইতে ২২৬ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত প্রথম ধ্যান পর্যন্ত উক্ত হইয়াছে] হে ব্রাহ্মণ, এই যজ্ঞ পূর্বকথিত যজ্ঞসমূহ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী।

… [তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ২২৮ অনুচ্ছেদ হইতে ২৩২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্যান উক্ত হইয়াছে] হে ব্রাহ্মণ, এই যজ্ঞ পূর্বকথিত যজ্ঞসমূহ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী।

… [তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ২৩৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জ্ঞানদর্শন উক্ত হইয়াছে] হে ব্রাহ্মণ, এই যজ্ঞ পূর্বকথিত যজ্ঞসমূহ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী।

… [তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ২৪৮–২৪৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আসবক্ষয় জ্ঞান উক্ত হইয়াছে] হে ব্রাহ্মণ, এই যজ্ঞ পূর্বকথিত যজ্ঞসমূহ হইতে অপেক্ষাকৃত সুকর এবং অনায়াসসাধ্য; কিন্তু মহত্তর ফলপ্রদায়ী ও মহোপকারী। হে ব্রাহ্মণ, এই যজ্ঞ-সম্পদা হইতে উন্নততর ও মধুরতর যজ্ঞ-সম্পদা আর নাই।”

৩৫৪. এইরূপ উক্ত হইলে কূটদন্ত ব্রাহ্মণ ভগবানকে এইরূপ বলিলেন :

অতি উত্তম, গৌতম, অতি উত্তম! যেরূপ উৎপাতিতের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়, লুক্কায়িত প্রকাশিত হয়, মূঢ় পথ প্রদর্শিত হয়, চক্ষুষ্মানের দেখিবার নিমিত্ত অন্ধকারে তৈলদীপ ধৃত হয়, সেইরূপ পূজনীয় গৌতম অনেক প্রকারে ধর্ম প্রকাশিত করিয়াছেন। আমি ভগবান গৌতমের, ধর্মের এবং ভিক্ষুসংঘের শরণ লইতেছি। পূজ্য গৌতম আজ হইতে জীবনের অন্তকাল পর্যন্ত আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে গ্রহণ করুন। আমি সাতশত বৃষভ, সাতশত বৎসতর, সাতশত বৎসতরী, সাতশত অজ, সাতশত মেষ মুক্ত করিতেছি, তাহাদের জীবন দান করিতেছি। তাহারা হরিৎ তৃণ ভক্ষণ করুক, শীতল বারি পান করুক, স্নিগ্ধ বায়ু তাহাদের জন্য প্রবাহিত হউক।”

৩৫৫. তৎপরে ভগবান কূটদন্ত ব্রাহ্মণকে যথাক্রমে দান, শীল, স্বর্গ, কামের দৈন্য, ব্যর্থতা ও সংক্লেশ এবং নৈষ্ক্রম্যের উপকারিতা সম্বন্ধে উপদেশ দান করিলেন। ভগবান যখন অবগত হইলেন যে ব্রাহ্মণ কূটদন্ত উপযুক্ত-চিত্ত, মৃদু-চিত্ত, বিনীবরণ-চিত্ত, উদগ্র-চিত্ত, প্রসন্ন-চিত্ত হইয়াছেন, তখন তিনি মাত্র বুদ্ধগণ দ্বারা লব্ধ ধর্মের প্রকাশ করিলেন, দুঃখ, দুঃখের উৎপত্তি, দুঃখের নিরোধ এবং দুঃখ নিরোধক মার্গ। যেরূপ শুদ্ধ কলঙ্কহীন বস্ত্র সম্যকরূপে রঞ্জন গ্রহণ করে, সেইরূপই ব্রাহ্মণ কূটদন্তের সেই আসনেই বিরজ, বীতমল, ধর্মচক্ষু উৎপন্ন হইল, “যাহা কিছু উৎপত্তিশীল তাহাই ধ্বংসশীল।”

৩৫৬. অনন্তর ব্রাহ্মণ কূটদন্ত দৃষ্ট-ধর্ম, প্রাপ্ত-ধর্ম, বিদিত-ধর্ম, পর্যবগাহিত-ধর্ম হইয়া, বিচিকিৎসা ও সংশয়হীন হইয়া, বৈশারদ্য প্রাপ্ত হইয়া, ভগবৎ শাসনে অপরপ্রত্যয় হইয়া ভগবানকে বলিলেন, “পূজ্য গৌতম আগামীকল্য ভিক্ষুসংঘের সহিত আমার অন্ন গ্রহণ করিবেন।” ভগবান তূষ্ণীম্ভাব অবলম্বনপূর্বক সম্মতি প্রকাশ করিলেন।

৩৫৭. তৎপরে ব্রাহ্মণ কূটদন্ত ভগবানের সম্মতি বিদিত হইয়া, আসন হইতে উত্থানপূর্বক ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া প্রস্থান করিলেন। রাত্রির অবসানে কূটদন্ত স্বীয় যজ্ঞবাটে উৎকৃষ্ট খাদ্য ও ভোজ্য প্রস্তুত করিয়া ভগবানের নিকট সংবাদ প্রেরণ করিলেন, “হে গৌতম, সময় উপস্থিত, অন্ন প্রস্তুত।”

৩৫৮. অনন্তর ভগবান পূর্বাহ্নের বস্ত্র পরিহিত হইয়া পাত্র ও চীবর গ্রহণপূর্বক ভিক্ষুসংঘের সহিত কূটদন্তের যজ্ঞবাটে গমন করিলেন এবং তথায় নির্দিষ্ট আসনে উপবিষ্ট হইলেন। তৎপরে কূটদন্ত বুদ্ধপ্রমুখ ভিক্ষুসংঘকে উত্তম খাদ্য ও ভোজ্য স্বহস্তে অর্পণপূর্বক তাঁহাদিগকে তৃপ্ত করিলেন। তদনন্তর কূটদন্ত, ভগবান আহারান্তে পাত্র হইতে হস্ত অপসারিত করিলে, নিম্ন আসন গ্রহণপূর্বক একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন। ভগবান তাঁহাকে ধর্মকথা দ্বারা উপদিষ্ট, সমুদ্দীপ্ত, সমুত্তেজিত, সম্প্রহৃষ্ট করিয়া আসন হইতে উত্থানপূর্বক প্রস্থান করিলেন।

কূটদন্ত সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৩]