মহালি সূত্র

৩৫৯. আমি এইরূপ শ্রবণ করিয়াছি। এক সময়ে ভগবান বৈশালিস্থ মহাবনে কূটাগারশালায় অবস্থান করিতেছিলেন। ওই সময়ে কোশল এবং মগধ হইতে আগত বহু ব্রাহ্মণ-দূত কার্যোপলক্ষে বৈশালিতে বাস করিতেছিলেন। ওই সকল ব্রাহ্মণগণ শুনিলেন, “শাক্যপুত্র শ্রমণ গৌতম শাক্যকুল হইতে প্রব্রজিত হইয়া বৈশালিস্থ মহাবনে কূটাগারশালায় অবস্থান করিতেছেন। সেই ভগবান গৌতমের সম্বন্ধে এইরূপ যশোগীতি বিস্তৃত হইয়াছে, “ইনিই ভগবান অর্হৎ… তাদৃশ অর্হতের দর্শন শুভজনক।”

৩৬০. তদনন্তর ওই সকল ব্রাহ্মণ মহাবনে কূটাগারশালায় গমন করিলেন। ওই সময় আয়ুষ্মান নাগিত ভগবানের উপস্থাপক ছিলেন। ব্রাহ্মণগণ নাগিতের নিকট গমন করিয়া তাঁহাকে বলিলেন :

“নাগিত, পূজ্য গৌতম এক্ষণে কোথায় আছেন? আমরা তাঁহার দর্শনকামী।”

“আবুসো, ভগবানের দর্শনের ইহা উপযুক্ত সময় নয়, তিনি এক্ষণে ধ্যাননিবিষ্ট।” ব্রাহ্মণগণ ভগবানকে দেখিয়া তবে যাইব” এইরূপ স্থির করিয়া সেই স্থানেই একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন।

৩৬১. লিচ্ছবি ওট্ঠদ্ধও বৃহৎ লিচ্ছবি পরিষদের সহিত মহাবনে কূটাগারশালায় আয়ুষ্মান নাগিতের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাকে অভিবাদনান্তে একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইলেন। পরে তিনি নাগিতকে বলিলেন :

“ভন্তে নাগিত, ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ এক্ষণে কোথায় আছেন? আমরা তাঁহার দর্শনকামী।”

“মহালি, ভগবানের দর্শনের ইহা উপযুক্ত সময় নহে, তিনি ধ্যানস্থ।” লিচ্ছবি ওট্ঠদ্ধও “ভগবানকে দেখিয়া তবে যাইব” এইরূপ স্থির করিয়া সেই স্থানেই একপ্রান্তে উপবিষ্ট হইলেন।

৩৬২. অনন্তর শ্রমণোদ্দেশ সিংহ আয়ুষ্মান নাগিতের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাকে অভিবাদনান্তে একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইয়া বলিলেন :

“ভন্তে কাশ্যপ , কোশল এবং মগধের এই সকল বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণদূত ভগবানের দর্শনার্থে আগমন করিয়াছেন। ওট্ঠদ্ধ, লিচ্ছবি ও বৃহৎ লিচ্ছবি পরিষদের সহিত ওই উদ্দেশ্যে আগত। ভন্তে কাশ্যপ, এই জনতার ভগবানের দর্শনলাভ আনন্দের বিষয় হইবে।”

“তাহা হইলে, সিংহ, তুমিই ভগবানের নিকট সংবাদ জ্ঞাপন করো।”

“তাহাই হউক”, বলিয়া শ্রমণোদ্দেশ সিংহ আয়ুষ্মান নাগিতের বাক্যে সম্মত হইয়া ভগবানের নিকট গমনপূর্বক তাঁহাকে অভিবাদনান্তে একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইলেন। পরে তিনি ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, কোশল এবং মগধের এই সকল বহুসংখ্যক ব্রাহ্মণদূত ভগবানের দর্শনার্থে এই স্থানে আগমন করিয়াছেন। লিচ্ছবি ওট্ঠদ্ধও বৃহৎ লিচ্ছবি পরিষদের সহিত ওই উদ্দেশ্যে এই স্থানে আগত। ভন্তে, এই জনতার ভগবানের দর্শনলাভ আনন্দের বিষয় হইবে।”

দিব্যরূপ

“তাহা হইলে, সিংহ, বিহারের ছায়ায় আসন প্রস্তুত করো।”

“যে আজ্ঞা” বলিয়া শ্রমণোদ্দেশ সিংহ ভগবানের বাক্যে সম্মত হইয়া বিহারের ছায়ায় আসন প্রস্তুত করিলেন।

৩৬৩. অনন্তর ভগবান বিহার হইতে নির্গত হইয়া বিহারের ছায়ায় প্রস্তুত আসনে উপবেশন করিলেন।

তৎপরে কোশল ও মগধের ব্রাহ্মণদূতগণ ভগবানের নিকট গমনপূর্বক তাঁহার সহিত চিত্তরঞ্জক প্রীত্যালাপান্তে একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন। লিচ্ছবি ওট্ঠদ্ধও স্বীয় পরিষদের সহিত ওই স্থানে গমন করিয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একান্তে উপবিষ্ট হইলেন।

৩৬৪. এইরূপে উপবিষ্ট হইয়া লিচ্ছবি ওট্ঠদ্ধও ভগবানকে বলিলেন :

“ভন্তে, কতিপয় দিবস পূর্বে লিচ্ছবিবংশীয় সুনক্ষত্ত আমার নিকট আগমনপূর্বক বলিয়াছিলেন, “মহালি , আমি তিন বৎসরের অনধিককাল ভগবৎ সন্নিধানে রহিয়াছি; আমি দিব্যরূপ দেখিতে পাই-যাহা প্রিয়, বাসনা-তৃপ্তিকর, মনোহর। কিন্তু ওইরূপ প্রিয়, বাসনা-তৃপ্তিকর, মনোহর দিব্যশব্দ আমি শুনিতে পাই না।” ভন্তে, ওইরূপ দিব্যশব্দের অস্তিত্ব সত্ত্বেও কি সুনক্ষত্ত উহা শুনিতে পান নাই, অথবা উহার অস্তিত্ব নাই?”

৩৬৫. “মহালি, ওইরূপ প্রিয়, বাসনা-তৃপ্তিকর, মনোহর দিব্যশব্দের অস্তিত্ব সত্ত্বেও সুনক্ষত্ত উহা শুনিতে পান নাই, উহার অস্তিত্বের অভাবে শুনিতে পান নাই, তাহা নয়।”

“ভন্তে, ওই সকল দিব্যশব্দের অস্তিত্ব সত্ত্বেও যে সুনক্ষত্ত উহা শুনিতে পান না, তাহার কী হেতু, কী প্রত্যয়?”

৩৬৬. “মহালি, কোনো ভিক্ষু পূর্বদিকে প্রিয়, বাসনা-তৃপ্তিকর, মনোহর দিব্যরূপ দর্শনার্থ একাঙ্গী সমাধি প্রাপ্ত হন, কিন্তু ওই প্রকার দিব্যশব্দের শ্রবণার্থ নহে। তিনি পূর্বদিকে দিব্যরূপ দর্শন করেন, কিন্তু ওইরূপ দিব্যশব্দ শ্রবণ করেন না। কী হেতু? মহালি, যেহেতু ভিক্ষু পূর্বদিকে ওই প্রকার দিব্যরূপ দর্শনার্থই একাংশ একাঙ্গী সমাধি প্রাপ্ত হন, দিব্যশব্দ শ্রবণার্থ নহে।

৩৬৭-৩৭১. “পুনশ্চ, মহালি, ভিক্ষু দক্ষিণে, পশ্চিমে, উত্তরে, ঊর্ধ্বে অধোদিকে, তির্যকদিকে দিব্যরূপ দর্শনার্থ একাংশ একাঙ্গী সমাধি প্রাপ্ত হন, কিন্তু ওইরূপ শব্দ শ্রবণার্থ নহে। ওই কারণে তিনি সর্বদিকে দিব্যরূপ দর্শন করেন, কিন্তু ওইরূপ শব্দ শ্রবণ করেন না। কী হেতু? যেহেতু, মহালি, ভিক্ষু সর্বদিকে ওই প্রকার দিব্য দর্শনার্থই একাংশ একাঙ্গী সমাধি প্রাপ্ত হন, দিব্যশব্দ শ্রবণার্থ নহে।

“এইরূপে, মহালি, ভিক্ষু যদি দিব্যশব্দ শ্রবণের জন্য একাঙ্গ সমাধি প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে ওই একই কারণে তিনি দিব্যশব্দ শ্রবণ করেন, কিন্তু দিব্যরূপ দর্শন করেন না।

ভিক্ষুর লক্ষ্য

কিন্তু, মহালি, ভিক্ষু যদি কোনো দিকে দর্শন এবং শ্রবণ উভয়বিধ উদ্দেশ্যে উভয়াংশ সমাধি প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে, যেহেতু তিনি উভয়বিধ উদ্দেশ্যে সমাধিস্থ হইয়াছেন, তিনি দিব্যরূপও দর্শন করেন, দিব্যশব্দও শ্রবণ করেন। কী হেতু? যেহেতু তাঁহার সমাধি উভয়াঙ্গী।”

৩৭২. “ভন্তে, এই সকল সমাধি ভাবনার সাক্ষাৎকারের জন্যই কি ভিক্ষুগণ ভগবানের সমীপে ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন?”

“না মহালি, তাহা নহে। অন্য ধর্ম আছে যাহা উৎকৃষ্টতর ও মধুরতর, যাহার সাক্ষাৎকার-হেতু ভিক্ষুগণ আমার নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন।”

৩৭৩. “ভন্তে, ওই সকল ধর্ম কী কী?”

“মহালি, প্রথমত ত্রিবিধ সংযোজনের ক্ষয়হেতু ভিক্ষুর আর পতন হয় না, তিনি সম্বোধিপরায়ণ হইয়া স্রোতাপন্ন হইয়া থাকেন। মহালি, ইহাও সেই ধর্ম-উৎকৃষ্টতর ও মধুরতর, যাহার সাক্ষাৎকার-হেতু ভিক্ষুগণ আমার নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন।

“পুনশ্চ, মহালি, ভিক্ষু ত্রিবিধ সংযোজনের ক্ষয়জ রাগ-দোষ-মোহের তনুত্ব-হেতু সকৃদাগামী হন, একবার মাত্র এই লোকে আসিয়া দুঃখের অন্ত করেন। মহালি, ইহাও সেই ধর্ম-উৎকৃষ্টতর ও মধুরতর, যাহার সাক্ষাৎকার-হেতু ভিক্ষুগণ আমার নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন।

“মহালি, পুনশ্চ, ভিক্ষু পঞ্চ অবরভাগী সংযোজনের ক্ষয়হেতু ঔপপাতিক হইয়া ওইস্থান হইতেই নির্বাণপ্রাপ্ত হন, তথা হইতে তাঁহার আর পুনরাগমন নাই। মহালি, ইহাও সেই ধর্ম-উৎকৃষ্টতর ও মধুরতর, যাহার সাক্ষাৎকার-হেতু ভিক্ষুগণ আমার নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন।

“পুনশ্চ, মহালি, ভিক্ষু আসবের ক্ষয়হেতু এই জন্মেই চিত্তবিমুক্তি ও প্রজ্ঞাবিমুক্তিসহ নির্বাণ স্বয়ং জানিয়া ও উপলব্ধি করিয়া বিহার করেন। মহালি, ইহাও সেই ধর্ম-উৎকৃষ্টতর ও মধুরতর, যাহার সাক্ষাৎকার-হেতু ভিক্ষুগণ আমার নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন।

“মহালি, এই সকলই সেই ধর্ম-উৎকৃষ্টতর ও মধুরতর, যাহার সাক্ষাৎকার-হেতু ভিক্ষুগণ আমার নিকট ব্রহ্মচর্য্য পালন করেন।

৩৭৪. কিন্তু ভন্তে, এই ধর্মের সাক্ষাৎকারের জন্য কোনো মার্গ, কোনো প্রতিপদ আছে কি?”

“মহালি, আছে।”

৩৭৫. “সেই মার্গ কী, সেই প্রতিপদ কী?”

“উহা আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ; যথা : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্মান্ত, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি। মহালি, ইহাই সেই মার্গ, সেই প্রতিপদ।

৩৭৬. “মহালি, একদা আমি কৌশাম্বীস্থ ঘোষিতারামে অবস্থিতি করিতেছিলাম। ওই সময় দুইজন প্রব্রজিত, পরিব্রাজক মণ্ডিষ্য এবং দারুপাত্রিকের শিষ্য জালিয় আমার নিকট আসিয়াছিলেন। আমাকে অভিবাদনপূর্বক আমার সহিত প্রীত্যালাপান্তে তাঁহারা একপ্রান্তে দণ্ডায়মান হইলেন। পরে তাঁহারা আমাকে বলিলেন।

ভিক্ষুর লক্ষ্য

“আবুসো গৌতম, জীব এবং শরীর কি একই অথবা ভিন্ন?”

৩৭৭. “তাহা হইলে, আবুসো, শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনঃসংযোগ করো, আমি বলিতেছি।”

“উত্তম, আবুসো” বলিয়া প্রব্রজিতদ্বয় সম্মতি প্রকাশ করিলেন। অতঃপর আমি বলিলাম :

[এইস্থলে শ্রামণ্যফল সূত্রের ১৯০ অনুচ্ছেদ হইতে ২২৬ নং অনুচ্ছেদ আবৃত্ত হইয়াছে] আবুসো, যে ভিক্ষু এইরূপ জানেন, এইরূপ দর্শন করেন তাঁহার পক্ষে কি “জীব এবং শরীর একই” অথবা “জীব এবং শরীর ভিন্ন” এরূপ বাক্য যুক্তিসঙ্গত?”

“আবুসো, ইহা যৌক্তিক।”

“কিন্তু আবুসো, আমি এইরূপ জানি, এইরূপ দর্শন করি। তথাপি আমি কহি না-“জীব এবং শরীর একই” অথবা “জীব এবং শরীর ভিন্ন”।

[তৎপরে শ্রামণ্যফল সূত্রের ২২৮ অনুচ্ছেদ হইতে ২৩২ অনুচ্ছেদে উক্ত দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ ধ্যানলব্ধ ভিক্ষুর বিষয় এবং উক্ত সূত্রের ২৩৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জ্ঞানদর্শন উল্লিখিত হইয়াছে; এবং প্রত্যেক ক্ষেত্রে উপরোক্ত একই প্রশ্ন, উত্তর ও প্রত্যুত্তর প্রদত্ত হইয়াছে।]

“পুনর্জন্ম আর নাই” ইহা জানিতে পারেন (পূর্বোক্ত সূত্রের ২৪৮–২৪৯ অনুচ্ছেদ)। আবুসো, যে ভিক্ষু এইরূপ জানেন, এইরূপ দর্শন করেন তাঁহার পক্ষে কি “জীব ও শরীর একই” অথবা “জীব এবং শরীর ভিন্ন” এরূপ বাক্য যুক্তিসঙ্গত?”

“আবুসো, ইহা অযৌক্তিক।”

“আবুসো, আমিও এইরূপ জানি, এইরূপ দর্শন করি, তথাপি আমি কহি না- “জীব ও শরীর একই” অথবা “জীব ও শরীর ভিন্ন।”

ভগবান এইরূপ বলিলেন। হৃষ্ট হইয়া ওট্ঠদ্ধ লিচ্ছবি ভগবাদ্বাক্যের অভিনন্দন করিলেন।

মহালি সূত্র সমাপ্ত।