আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
এক সময় ভগবান শাক্য রাজ্যে বিচরণ করিতেছিলেন শাক্যদের নিগম দেবদহে। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, “হে ভিক্ষুগণ”, “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া ভিক্ষুগণ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন :
হে ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা এইরূপ মতবাদী এইরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন : কোনো পুরুষ-পুদ্গল (ব্যক্তিবিশেষ) সুখ, দুঃখ, অদুঃখ-অসুখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হয়। হে ভিক্ষুগণ, নির্গ্রন্থগণ এরূপ মতবাদ পোষণ করেন। এই নির্গ্রন্থদের নিকট উপস্থিত হইয়া আমি এইরূপ বলি-বন্ধুগণ, ইহা কি সত্য যে তোমরা নির্গ্রন্থগণ এরূপ মতবাদী ও দৃষ্টিবাদী : “কোনো পুরুষ-পুদ্গল (ব্যক্তিবিশেষ) সুখ, দুঃখ, অদুঃখ-অসুখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে।” হে ভিক্ষুগণ, এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া নির্গ্রন্থগণ উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’ আমি তাহদিগকে বলিলাম, “বন্ধুগণ, তোমরা কি জানো যে তোমরা পূর্বে জন্মাইয়াছিলে কিংবা জন্মাইয়াছিলে না?” “বন্ধুবর, আমরা ঠিক তাহা জানি না।” “তোমরা কি ঠিক জানো যে তোমরা পূর্বে পাপকর্ম করিয়াছিলে কিংবা করো নাই?” “আমরা ঠিক তাহা জানি না।” “তোমরা কি ঠিক জানো যে পূর্বে তোমরা এইরূপ পাপকর্ম করিয়াছিলে?”
“না, আমরা ঠিক তাহা জানি না।” “তোমরা কি ঠিক জানো যে এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইয়াছে। এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ করিতে হইবে অথবা এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইবে?” “না, আমরা তাহা ঠিক জানি না।” “তোমরা কি ঠিক জানো যে দৃষ্টধর্মে (ইহ-জীবনে) অকুশলধর্ম প্রহীন এবং কুশলধর্ম সম্পাদিত হয়?”
“না, আমরা তাহা জানি না।”
“তাহা হইলে, হে নির্গ্রন্থ বন্ধুগণ, তোমরা জানো না যে তোমরা পূর্বে জন্মাইয়াছিলে কিংবা জন্মাইয়াছিলে না। তোমরা পূর্বে পাপকর্ম করিয়াছিলে কিংবা করো নাই, তোমাদের এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইয়াছে, এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ করিতে হইবে। এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইলে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে, দৃষ্টধর্মে অকুশলধর্ম প্রহীন ও কুশলধর্ম সম্পাদিত হয়। এইরূপ হইলে আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের ইহা বর্ণনা করা যুক্তিযুক্ত নহে : “কোনো পুরুষ-পুদ্গল (ব্যক্তিবিশেষ) সুখ, দুঃখ, অদুঃখ-অসুখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে।” হে নির্গ্রন্থ বন্ধুগণ, যদি তোমরা জানো যে “পূর্বে আমরা জন্মাইয়াছিলাম, কিংবা জন্মাইয়াছিলাম না তাহা নহে, পূর্বে পাপকর্ম করিয়াছিলাম কিংবা করি নাই তাহা নহে, তোমাদের এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইয়াছে, এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ করিতে হইবে। এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইলে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে, দৃষ্টধর্মে অকুশলধর্ম প্রহীন ও কুশলধর্ম সম্পাদিত হয়। এইরূপ হইলে আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থ বন্ধুদের এইরূপ বলা যুক্তিযুক্ত : কোনো পুরুষ-পুদ্গল (ব্যক্তিবিশেষ) সুখ, দুঃখ, অদুঃখ-অসুখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে।
যেমন, হে নির্গ্রন্থ বন্ধুগণ, কোনো ব্যক্তি গাঢ়লিপ্ত বিষযুক্ত শল্যের দ্বারা বিদ্ধ হইল। সে শল্যের বেদনাহেতু তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে। তখন তাহার সলোহিত-জ্ঞাতি, মিত্র-সুহৃদগণ কোনো শল্যকর্তা ভিষককে উপস্থিত করিল। সেই শল্যকর্তা ভিষক শস্ত্রের দ্বারা ব্রণমুখ পরিকর্তন করেন এবং পরিকর্তন-হেতু সে (আহত ব্যক্তি) তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে, শল্যকর্তা ভিষক এষণী (লৌহবাণ) দ্বারা শল্য অন্বেষণ করেন এবং অন্বেষণ-হেতু সে তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে, তখন শল্যকর্তা ভিষক শল্য টানিয়া বাহির করেন এবং তাহার ফলে সে তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে, তখন শল্যকর্তা ভিষকব্রণমুখে অগদ-অঙ্গার স্থাপন করেন এবং অগদ-অঙ্গার স্থাপন-হেতু তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে। পরে সে ক্ষত শুকাইয়া রোগমুক্ত, সুখী, স্বাধীন, স্বয়ংবশী ও যথেচ্ছ-গমনশীল হয়। তখন তাহার এইরূপ মনে হইতে পারে : আমি পূর্বে গাঢ়লিপ্ত বিষযুক্ত শল্যের দ্বারা বিদ্ধ হইয়াছিলাম সে শল্যের বেদনাহেতু তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে। তখন তাহার সলোহিত-জ্ঞাতি, মিত্র-সুহৃদগণ কোনো শল্যকর্তা ভিষককে উপস্থিত করিল। সেই শল্যকর্তা ভিষক শস্ত্রের দ্বারা ব্রণমুখ পরিকর্তন করেন এবং পরিকর্তনহেতু সে (আহত ব্যক্তি) তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে, শল্যকর্তা ভিষক এষণী (লৌহবাণ) দ্বারা শল্য অন্বেষণ করেন এবং অন্বেষণহেতু সে তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে, তখন শল্যকর্তা ভিষক শল্য টানিয়া বাহির করেন এবং তাহার ফলে সে তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে, তখন শল্যকর্তা ভিষক ব্রণমুখে অগদ-অঙ্গার স্থাপন করেন এবং অগদ-অঙ্গার স্থাপন-হেতু তীব্র কঠোর যন্ত্রণা অনুভব করে। পরে সে ক্ষত শুকাইয়া এখন রোগমুক্ত, সুখী, স্বাধীন, স্বয়ংবশী ও যথেচ্ছা গমনশীল হইয়াছি। ঠিক এইভাবে, বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, যদি তোমরা জানো যে পূর্বে আমরা জন্মাইয়াছিলাম না তাহা নহে, পূর্বে পাপকর্ম করিয়াছিলাম কিংবা করি নাই তাহা নহে, তোমাদের এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইয়াছে, এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ করিতে হইবে। এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইলে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে, দৃষ্টধর্মে অকুশলধর্ম প্রহীন ও কুশলধর্ম সম্পাদিত হয়।” তাহা হইলে আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের এইরূপ ভাষণ করাই যুক্তিযুক্ত; কোনো ব্যক্তিবিশেষ (পুরুষপুদ্গল) সুখ, দুঃখ, অদুঃখ-অসুখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে। বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, যেহেতু তোমরা জানো না যে ‘পূর্বে আমরা জন্মাইয়াছিলাম, জন্মাইয়াছিলাম না তাহা নহে পূর্বে পাপকর্ম করিয়াছিলাম কিংবা করি নাই তাহা নহে, তোমাদের এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইয়াছে, এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ করিতে হইবে। এতটা দুঃখ নির্জীর্ণ হইলে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে, দৃষ্টধর্মে অকুশলধর্ম প্রহীন ও কুশলধর্ম সম্পাদিত হয়, ‘সেই হেতু আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের এইরূপ ভাষণ করা যুক্তিযুক্ত নহে; “কোনো ব্যক্তি বিশেষ (পুরুষপুদ্গল) সুখ, দুঃখ, অদুঃখ-অসুখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে।” এইরূপ উক্ত হইলে, হে ভিক্ষুগণ, নির্গ্রন্থগণ আমাকে বলিলেন, বন্ধুবর, নির্গ্রন্থ জ্ঞাতিপুত্র (মহাবীর) সর্বজ্ঞ, সর্বদর্শী, অপরিশেষ জ্ঞানদর্শন জানেন, ‘গমনকালে, দণ্ডায়মান অবস্থায়, সুপ্ত বা জাগ্রত অবস্থায় সতত সর্বদাই আমার মধ্যে জ্ঞানদর্শন প্রত্যুপস্থিত।’ তিনি আমাদের এইরূপ বলেন : “হে নির্গ্রন্থগণ, তোমাদের পূর্বকৃত যে পাপকর্ম আছে তাহা তোমরা এই প্রকার কষ্টকর দুষ্করচর্যা দ্বারা নির্জীর্ণ করিতেছ। এখন যে তোমরা কায়ে সংযত, বাক্যে সংযত ও মনে সংযত হইয়া চলিতেছে, তাহা অনাগতে পাপকর্ম না করিবার জন্য। এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া ও নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়, অনাগতে অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়, কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে।” ইহা আমাদের নিকট রুচিকর ও যুক্তিসহ, তজ্জন্য আমরা এত প্রসন্ন।
এইরূপ উক্ত হইলে, হে ভিক্ষুগণ, আমি নির্গ্রন্থদিগকে বলিলাম, “বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, এই পঞ্চবিধ ধর্ম ইহ-জীবনে দুই প্রকার বিপাক (ফল) দিয়া থাকে। সেই পঞ্চবিধ ধর্ম কী কী? শ্রদ্ধা, রুচি, অনুশ্রব, আকার-পরিবিতর্ক ও দৃষ্টি-নিধ্যান-ক্ষান্তি। এই পঞ্চবিধ ধর্ম দৃষ্টধর্মে দুই প্রকার ফল প্রদান করে। অতীত শাস্তার প্রতি আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের কী শ্রদ্ধা, কী রুচি, কী অনুশ্রব, কী আকার-পরিবিতর্ক ও কী দৃষ্টি-নিধ্যান-ক্ষান্তি ছিল? হে ভিক্ষুগণ, আমি এইরূপ মতবাদী নির্গ্রন্থদের মধ্যে সহধার্মিকোচিত কোনো বাদপরিহার দেখিতে পাই নাই। পুনরায় আমি নির্গ্রন্থদের এইরূপ বলিলাম, “বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, তোমরা কী মনে করো? যেই সময়ে তোমাদের তীব্র উপক্রম হয়, তীব্র প্রধান হয়, সেই সময়ে তোমরা অবক্রমী (উদ্ভ্রষ্ট) হইয়া কেন তীব্র কঠোর দুঃখদায়ক বেদনা অনুভব করো অথচ যে সময়ে তোমাদের তীব্র উপক্রম ও প্রধান হয় না, সেই সময়ে উদ্ভ্রষ্ট হইয়া তীব্র দুঃখদায়ক কঠোর বেদনা অনুভব করো না?
তাঁহারা উত্তর দিলেন, “বন্ধু গৌতম, যে সময়ে আমাদের তীব্র উপক্রম ও তীব্র প্রধান হয়, সেই সময়ে আমরা অবক্রমী হইয়া তীব্র কঠোর দুঃখদায়ক বেদনা অনুভব করি অথচ যেই সময়ে আমাদের তীব্র উপক্রম (প্রচেষ্টা) ও প্রধান (তপশ্চর্যা) হয় না, সেই সময়ে আমরা অবক্রমী হইয়া তীব্র দুঃখদায়ক কঠোর বেদনা অনুভব করি না।” “বাস্তবিক, বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, যেই সময়ে তোমাদের উপক্রম (প্রচেষ্টা) হয়, প্রধান হয় সেই সময়ে তীব্র অবক্রমী হইয়া তীব্র, কঠোর যন্ত্রণা অনুভব কর।”
“বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, সত্যই যেই সময়ে তোমাদের তীব্র উপক্রম ও তীব্র প্রধান হয়, সেই সময়ে তোমরা অবক্রমী হইয়া তীব্র কঠোর দুঃখদায়ক বেদনা অনুভব করো অথচ যেই সময়ে তোমাদের তীব্র উপক্রম (প্রচেষ্টা) ও প্রধান (তপশ্চর্যা) হয় না, সেই সময়ে তোমরা অবক্রমী হইয়া তীব্র দুঃখদায়ক কঠোর বেদনা অনুভব করো না। এইরূপ হইলে আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের এইভাবে ব্যাখ্যা করা যুক্তিযুক্ত; কোনো ব্যক্তি বিশেষ সুখ, দুঃখ, অসুখ-অদুঃখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া এবং নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়। অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়। কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয় হয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় হয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হয়। যদি বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, যেই সময়ে তীব্র উপক্রম ও প্রধান হয়, সেই সময়ে কৃচ্ছ্রসাধনজনিত-তীব্র দুঃখ, কঠোর বেদনা থাকিতে পারে, আর যেই সময়ে তীব্র উপক্রম ও প্রধান থাকে না অথচ সেই সময়ে তীব্র কঠোর দুঃখ বেদনাও থাকে। এইরূপ হইলে আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের পক্ষে এইভাবে ব্যাখ্যা করা যুক্তিযুক্ত; “কোনো ব্যক্তিবিশেষ সুখ, দুঃখ, অসুখ-অদুঃখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া এবং নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়। অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়। কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয় হয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় হয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে।” যেহেতু, বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, যে সময়ে তীব্র উপক্রম ও তীব্র প্রধান হয়, সেই সময়ে তোমরা অবক্রমী হইয়া তীব্র কঠোর দুঃখদায়ক বেদনা অনুভব করো অথচ যেই সময়ে তোমাদের তীব্র উপক্রম (প্রচেষ্টা) ও প্রধান (তপশ্চর্যা) হয় না, সেই সময়ে তোমরা অবক্রমী হইয়া তীব্র দুঃখদায়ক কঠোর বেদনা অনুভব করো না। কাজেই তোমরা নিজেরাই কৃচ্ছ্রসাধনজনিত তীব্র কঠোর দুঃখ বেদনা অনুভব করিয়া অবিদ্যা-অজ্ঞান-মোহবশত ফলভোগ করো। কোনো ব্যক্তিবিশেষ সুখ, দুঃখ অসুখ-অদুঃখ যাহা কিছু অনুভব করেন, তাহা সবই পূর্বকৃত-হেতু, এইভাবে পুরাতন কর্ম তপশ্চর্যা দ্বারা বিনষ্ট করিয়া এবং নতুন কোনো (পাপ) কর্ম না করিয়া অনাগতে অনাসব হইতে পারা যায়। অনাসব হইলে কর্মক্ষয় হয়। কর্মক্ষয়ে দুঃখক্ষয় হয়, দুঃখক্ষয়ে বেদনাক্ষয় হয় এবং বেদনাক্ষয়ে সর্বদুঃখ নির্জীর্ণ হইবে। হে ভিক্ষুগণ, এইরূপ বলিয়া আমি নির্গ্রন্থদের মধ্যে সহধর্মী উপযোগী কোনো প্রতিবাদ দেখিতে পাই নাই।
পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, আমি নির্গ্রন্থদের এইরূপ বলি : বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, তোমরা কী মনে করো? যাহা কিছু দৃষ্টধর্র্মে অনুভবযোগ্য তাহা উপক্রম ও প্রধানের দ্বারা ভবিষ্যৎ জন্মে অনুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব? তাঁহারা উত্তর দিলেন, “বন্ধু, তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম পরজন্মে অনুভবযোগ্য তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা দৃষ্টধর্মে (ইহজন্মে) অনুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
তাহা হইলে বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, তোমরা কী মনে করো? যাহা কিছু কর্ম সুখানুভবযোগ্য তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা দুঃখানুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম দুঃখানুভবযোগ্য তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা সুখানুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম পরিপক্ব-অনুভবযোগ্য, তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা অপরিপক্ব অনুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম অপরিপক্ব-অনুভবযোগ্য, তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা পরিপক্ব অনুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম বহু-অনুভবযোগ্য, তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা অল্প অনুভব যোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম অল্প-অনুভবযোগ্য, তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা বহু-অনুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম অনুভবযোগ্য, তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা অননুভব হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না তাহা সম্ভব নহে।”
“যাহা কিছু কর্ম অননুভবযোগ্য তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা অনুভবযোগ্য হউক, ইহা কি সম্ভব?”
“না, তাহা সম্ভব নহে।”
বন্ধু নির্গ্রন্থগণ, ইহা সত্য যে যাহা কিছু কর্ম দৃষ্টধর্মে অনুভবযোগ্য তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা পরজন্মে অননুভবযোগ্য হউক, ইহা সম্ভব নহে যাহা কিছু কর্ম পরজন্মে অনুভবযোগ্য… যাহা কিছু কর্ম অননুভবযোগ্য, তাহা উপক্রম বা প্রধানের দ্বারা অনুভবযোগ্য হউক, ইহা সম্ভব নহে। এইরূপ হইলে আয়ুষ্মান নির্গ্রন্থদের উপক্রম বা প্রধান নিষ্ফল। হে ভিক্ষুগণ, নির্গ্রন্থগণ এইরূপ মতবাদ পোষণ করেন। নির্গ্রন্থদের দশটি সহধার্মিক বাদানুবাদ নিন্দার কারণ হয়।
হে ভিক্ষুগণ, যদি সত্ত্বগণ পূর্বকৃত-হেতু সুখ ও দুঃখ অনুভব করে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নির্গ্রন্থগণ পূর্বদুষ্কৃত কর্মকারী। সেই জন্য তাহারা এখন তীব্র কঠোর দুঃখ ভোগ করিতেছে। হে ভিক্ষুগণ, যদি সত্ত্বগণ ঈশ্বর দ্বারা সৃষ্ট হইয়া সুখদুঃখ ভোগ করে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নির্গ্রন্থগণ দুষ্ট ঈশ্বরের সৃষ্ট, যেই জন্য তাহারা এখন তীব্র কঠোর দুঃখ ভোগ করিতেছে। হে ভিক্ষুগণ, যদি সঙ্গতি (সংযোগ) ভাব-হেতু সত্ত্বগণ সুখ ও দুঃখ ভোগ করে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নির্গ্রন্থগণ পাপ সংযোগকারী, যেই জন্য তাহারা এখন এইরূপ তীব্র কঠোর দুঃখ ভোগ করিতেছে। হে ভিক্ষুগণ, যদি সত্ত্বগণ ছয় প্রকার অভিজাতি (বিশেষ শ্রেণিতে জন্ম)-হেতু সুখ ও দুঃখ ভোগ করে, তাহা হইলে নির্গ্রন্থগণ পাপ আভিজাতিক যেই জন্য তাহারা এখন এইরূপ তীব্র কঠোর দুঃখ ভোগ করিতেছে। হে ভিক্ষুগণ, যদি সত্ত্বগণ দৃষ্টধর্মে উপক্রম-হেতু সুখ ও দুঃখ ভোগ করে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই নির্গ্রন্থগণ পাপ দৃষ্টধর্মে উপক্রমী, যেই জন্য তাহারা এখন তীব্র কঠোর দুঃখ ভোগ করে। যদি সত্ত্বগণ পূর্বকৃতহেতু সুখ ও দুঃখ ভোগ করে তাহা হইলে নির্গ্রন্থগণ নিন্দনীয়, আর যদি পূর্বকৃতহেতু সুখ ও দুঃখ ভোগ করে না, তাহা হইলেও নির্গ্রন্থগণ নিন্দনীয়… দৃষ্টধর্মে উপক্রম-হেতু… এইরূপ। এইভাবে নির্গ্রন্থদের এই দশটি সহধার্মিক মতবাদ নিন্দার কারণ হয়। এইভাবে তাহাদের উপক্রম ও প্রধান নিষ্ফল হয়।
হে ভিক্ষুগণ, কিরূপে উপক্রম ও প্রধান সফল হয়? এস্থলে, ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু অনভিভূত নিজেকে দুঃখ দ্বারা অভিভূত হইতে দেন না, ধর্মসঙ্গত সুখ পরিত্যাগ করেন না, বরং সেই সুখে অনুপক্লিষ্ট থাকেন। তিনি প্রকৃষ্টরূপে জানেন, “আমার এই দুঃখনিদানের সংস্কার দূরীভূত করার প্রধানের জন্য বিরাগ হয়। কিন্তু যখন আমি দুঃখ নিদানের প্রতি উপেক্ষাপরায়ণ হই, তখন উপেক্ষা-ভাবনা করিবার ফলে আমার বিরাগ হয়।” সেই দুঃখ নির্জীর্ণ হয়। সেই দুঃখনিদানের প্রতি উপেক্ষাপরায়ণ হইয়া ভাবনা করিবার ফলে বিরাগ হয় এবং এইরূপে সেই দুঃখ নির্জীর্ণ হয়।
ভিক্ষুগণ, যেমন কোনো পুরুষ কোনো স্ত্রীলোকের প্রতি অনুরক্ত, প্রতিবদ্ধচিত্ত, তীব্রচ্ছন্দ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রাপ্ত হয়। সে সেই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা ও হাস্যরতা দেখিতে পায়। ভিক্ষুগণ, তোমরা কী মনে করো, ওই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা ও হাস্যরতা দেখিয়া ওই পুরুষের মনে কি শোক-পরিদেব-দুঃখ-দৌর্মনস্য-উপায়াস উৎপন্ন হইতে পারে না?
“হ্যাঁ ভদন্ত।” “তাহা কী হেতু? অমুখ পুরুষ অমুখ স্ত্রীলোকের প্রতি অনুরক্ত, প্রতিবদ্ধচিত্ত, তীব্রচ্ছন্দ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রাপ্ত। সেই কারণে ওই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা, পরিহাসরতা ও হাস্যরতা দেখিয়া তাহার মধ্যে শোক-পরিদেব-দুঃখ-দৌর্মনস্য-উপায়াস উৎপন্ন হয়।”
তখন, ভিক্ষুগণ, ওই পুরুষের এইরূপ মনে হইল : আমি ওই স্ত্রীলোকের প্রতি অনুরক্ত, প্রতিবদ্ধ চিত্ত, তীব্রচ্ছন্দ ও তীব্র-আকাঙ্ক্ষা প্রাপ্ত। ওই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা, পরিহাসরতা ও হাস্যরতা দেখিয়া আমার মধ্যে শোক-পরিদেব-দুঃখ-দৌর্মনস্য-উপায়াস উৎপন্ন হয়। আমি যদি ওই স্ত্রীলোকের প্রতি ছন্দরাগ (আসক্তি) পরিত্যাগ করি তাহা হইলে কেমন হয়, সে ওই স্ত্রীলোকের প্রতি ছন্দরাগ পরিত্যাগ করে। পরে সে অন্য সময়ে সেই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা, পরিহাসরতা ও হাস্যরতা দেখিতে পায়। ভিক্ষুগণ, তোমরা কী মনে করো? ওই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা, পরিহাসরতা ও হাস্যরতা দেখিয়া তাহার মধ্যে কি শোক পরিদেব-দুঃখ-দৌর্মনস্য-উপায়াস উৎপন্ন হয়?
“ভদন্ত, তাহা হয় না।” “তাহা কী হেতু? কারণ, ওই পুরুষ সেই স্ত্রীলোকের উপর বীতরাগ, সেইজন্য ওই স্ত্রীলোককে অন্য পুরুষের সহিত দণ্ডায়মানা, আলাপরতা, পরিহাসরতা ও হাস্যরতা দেখিয়া তাহার মধ্যে শোক-পরিদেব-দুঃখ-দৌর্মনস্য-উপায়াস উৎপন্ন হয় না।
ভিক্ষুগণ, ঠিক এইভাবে ভিক্ষু অনভিভূত নিজেকে… দুঃখ নির্জীর্ণ হয়। ভিক্ষুগণ, এইরূপে উপক্রম ও প্রধান সফল হয়।
পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : যথেচ্ছ সুখে বিহার-হেতু আমার মধ্যে অকুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয় এবং কুশলধর্ম হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। আর দুঃখজয়ের চেষ্টায় আত্মনিয়োগ-হেতু অকুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়। যদি আমি দুঃখজয়ের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করি তাহা হইলে কেমন হয়? তিনি দুঃখজয়ের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন এবং তাহাতে অকুশলধর্ম হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং কুশলধর্ম পরিবর্ধিত হয়। তিনি অন্য সময়ে দুঃখ জয়ের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন না। কী কারণে? হে ভিক্ষুগণ, যেই উদ্দেশ্যে ভিক্ষু দুঃখজয়ের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করিতে পারেন সেই উদ্দেশ্য তাঁহার নিষ্পন্ন হইয়াছে। সেই জন্য তিনি অন্য সময়ে দুঃখজয়ের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন না। যেমন হে ভিক্ষুগণ, কোনো শর প্রস্তুতকারী জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ডদ্বয়ে শরকে সন্তপ্ত করে, পরিতপ্ত করে, ঋজু ও কর্মনীয় করে। যেহেতু শর প্রস্তুতকারীর শর জ্বলন্ত কাষ্ঠখণ্ডদ্বয়ের মধ্যে সন্তপ্ত, পরিতপ্ত, ঋজু ও কর্মনীয় হয়, সেই কারণে সে অন্য সময়ে শরকে জ্বলন্ত কাঠখণ্ডদ্বয়ে সন্তপ্ত, পরিতপ্ত, ঋজু ও কর্মনীয় করে না। তাহার কী কারণ? যে উদ্দেশ্যে শর প্রস্তুতকারী শরকে জ্বলন্ত কাঠখণ্ডদ্বয়ের মধ্যে সন্তপ্ত, পরিতপ্ত, ঋজু ও কর্মনীয় করিতে পারে তাহা অভিনিষ্পন্ন হইতেছে। সেই হেতু শর প্রস্তুতকারী শরকে… করে না।
ভিক্ষুগণ, ঠিক এইভাবে কোনো ভিক্ষু প্রত্যবেক্ষণ করেন… সেই কারণে অন্য সময়ে দুঃখজয়ের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন না। এইভাবে উপক্রম ও প্রধান (প্রচেষ্টা) সফল হয়। পুনরায়, হে ভিক্ষুগণ, তথাগত ইহলোকে আবির্ভূত হন, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, বিদ্যাচরণসম্পন্ন, সুগত, লোকবিদ,… চিত্ত পরিশুদ্ধ করেন।
তিনি চিত্তের উপক্লেশ ও প্রজ্ঞার দৌর্বল্যের কারণ এই পঞ্চ নীবরণ পরিত্যাগ করিয়া সর্বপ্রকার কাম ও অকুশলধর্ম হইতে বিচ্যুত হইয়া সবিতর্ক, সবিচার বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া বিহার করেন। ভিক্ষুগণ, এইরূপে ভিক্ষুর উপক্রম প্রধান সফল হয়।
পুনরায়, ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু বিতর্ক-বিচার-উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব-আনয়নকারী, বিতর্কাতীত, বিচারাতীত, সমাধিজ প্রীতি-সুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া বিহার করেন। ভিক্ষুগণ, এইরূপে ভিক্ষুর উপক্রম ও প্রধান সফল হয়।
পুনরায়, ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু প্রীতিতেও বীতরাগ হইয়া উপেক্ষার ভাবে অবস্থান করেন, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া দেহের মধ্যে (প্রীতি নিরপেক্ষ) সুখ অনুভব করেন, আর্যগণ যে ধ্যানস্তরে উপনীত হইলে ধ্যায়ী উপেক্ষাসম্পন্ন ও স্মৃতিমান হইয়া সুখে বিহার করেন বলিয়া বর্ণনা করেন, সেই তৃতীয় ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া বিহার করেন। ভিক্ষুগণ, এইরূপে ভিক্ষুর উপক্রম ও প্রধান সফল হয়।
পুনরায়, ভিক্ষুগণ, (দৈহিক) সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করিয়া পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য (মনের হর্ষ ও বিষাদ ভাব) অস্তমিত করিয়া, না দুঃখ-না সুখ, উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যানস্তরে উপনীত হইয়া বিহার করেন। ভিক্ষুগণ, এইরূপে ভিক্ষুর উপক্রম ও প্রধান সফল হয়।
তিনি এইরূপে সমাহিত চিত্তের… (মধ্যমনিকায় ১ম খণ্ড বেণীমাধব বড়ুয়া… পৃ. ২৫৫ পঙ্ক্তি ১১ হইতে ২১ পঙ্ক্তি দ্রষ্টব্য পূর্বজন্ম অনুস্মরণ করেন। ভিক্ষুগণ, এইরূপে ভিক্ষুর উপক্রম ও প্রধান সফল হয়।
তিনি এইরূপে সমাহিত চিত্তের (মধ্যমনিকায় ১ম পৃ. ২৫৫ পঙ্ক্তি ২৫ হইতে পৃ. ১৯৯ পঙ্ক্তি ৬ পর্যন্ত)… সুগতি-দুর্গতি প্রাপ্ত হইতেছে। ভিক্ষুগণ, এইরূপে ভিক্ষুর উপক্রম ও প্রধান সফল হয়।
তিনি এইরূপে সমাহিত চিত্তের… (১ম খণ্ড পৃ. ২৫৬ পঙ্ক্তি ১০ হইতে পঙ্ক্তি ২৩ পর্যন্ত)… এখানে আর আসিতে হইবে না।
ভিক্ষুগণ, তথাগত এইরূপ বলেন। তথাগতের দশ সহধার্মিক যুক্তিসঙ্গত মতবাদ প্রশংসাভাজন হয়। যদি সত্ত্বগণ পূর্বকৃতহেতু সুখ দুঃখ অনুভব করে তাহা হইলে নিশ্চয়ই তথাগত পূর্বে সুকর্ম করিয়াছেন যেজন্য তিনি এখন আসবমুক্ত সুখ অনুভব করিতেছেন। যদি সত্ত্বগণ ঈশ্বর সৃষ্ট বলিয়া সুখ ও দুঃখ অনুভব করে তাহা হইলে তথাগত নিশ্চয়ই ভদ্র ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট যেই জন্য এখন আসবমুক্ত হইয়া সুখময় বেদনা অনুভব করিতেছেন। যদি সত্ত্বগণ সঙ্গতিভাব (সংযোগভাব)-হেতু সুখ-দুঃখ অনুভব করে তাহা হইলে নিশ্চয়ই তথাগত, কল্যাণ সংযোগসম্পন্ন, যেই জন্য এখন এইরূপ আসবমুক্ত হইয়া সুখময় বেদনা অনুভব করিতেছেন। হে ভিক্ষুগণ, যদি সত্ত্বগণ (ষড়বিধ) জাতিতে সুখ দুঃখ ভোগ করিতে থাকে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তথাগত কল্যাণ জাতিতে জাত যেই জন্য এখন আসবমুক্ত হইয়া সুখময় বেদনা অনুভব করিতেছেন। যদি সত্ত্বগণ দৃষ্টধর্ম-উপক্রমহেতু (ইহ-জীবনে প্রচেষ্টা-হেতু) সুখ-দুঃখ অনুভব করে, তাহা হইলে নিশ্চয়ই তথাগত কল্যাণময় দৃষ্টধর্ম-উপক্রমী যে জন্য এখন এইরূপ আসবমুক্ত হইয়া সুখময় বেদনা অনুভব করিতেছেন। যদি সত্ত্বগণ পূর্বকৃত-হেতু সুখ-দুঃখ ভোগ করিয়া থাকে, তাহা হইলে তথাগত প্রশংসাভাজন। যদি সত্ত্বগণ পূর্বকৃত ব্যতীত সুখ-দুঃখ ভোগ করে তাহা হইলেও তথাগত প্রশংসাভাজন।
এইরূপে যদি সত্ত্বগণ ঈশ্বর সৃষ্ট হইয়া, ঈশ্বর সৃষ্ট না হইয়া… সঙ্গতিভাবহেতু… সঙ্গতিভাব ব্যতীত… (ষড়বিধ) জাতিতে জাত হইয়া… জাতিতে জাত না হইয়া… দৃষ্টধর্ম উপক্রমহেতু… দৃষ্টধর্ম উপক্রম ব্যতীত-সুখ-দুঃখ ভোগ করে, তাহা হইলেও তথাগত প্রশংসাভাজন। ভিক্ষুগণ, তথাগত এইরূপ মতবাদী এবং তথাগতের দশ সহধার্মিক মতবাদ প্রশংসার কারণ হয়।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ প্রসন্ন মনে ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
দেবদহ সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ