লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৫]

পঞ্চত্রয় সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

এক সময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে অবস্থান করিতেছিলেন। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিকে আহ্বান করিলেন, “হে ভিক্ষুগণ।” “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে ভগবানকে সম্মতি জানাইলেন। ভগবান বলিলেন :

ভিক্ষুগণ, এমন শ্রমণ ও ব্রাহ্মণ আছেন যাহারা অপরান্তকল্পিক, অপরান্তানুদৃষ্টি, যাঁহারা অপরান্ত সম্বন্ধে নানাবিধ মত প্রকাশ করেন। তাঁহাদের কেহ কেহ বলেন, মরণান্তে আত্মা নিত্য সচৈতন্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। কেহ কেহ বলেন, মরণান্তে আত্মা নিত্য ও অচৈতন্য অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। কেহ কেহ বলেন, মরণান্তে আত্মা নিত্য এবং সচৈতন্য থাকে না, অচৈতন্যও থাকে না। তাঁহারা বিদ্যমান সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ ও বিভব ঘোষণা করেন। কেহ কেহ (জীবের) দৃষ্টধর্ম নির্বাণ লাভ সম্পর্কে বলেন। এইরূপে মরণান্তে আত্মা নিত্য বলিয়া ঘোষণা করেন। কেহ কেহ বিদ্যমান সত্ত্বের উচ্ছেদ বিনাশ ও বিভব ঘোষণা করেন। এইরূপে এইগুলি পাঁচটি হইয়া তিনটি হয়, তিনটি হইয়া পাঁচটি হয়। ইহাই পঞ্চত্রয় শব্দের বিশ্লেষণ।

ভিক্ষুগণ, ওই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা রূপী, নিত্য ও সংজ্ঞী (সচৈতন্য) অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন; মরণান্তে আত্মা অরূপী, নিত্য ও সংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন; আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী…; আত্মা রূপীও নহে, অরূপীও নহে…; আত্মা একত্ব-সংজ্ঞী…, আত্মা নানাত্ব-সংজ্ঞী…, আত্মা পরিমিত সংজ্ঞাসম্পন্ন…, ওই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা অপরিমিত সংজ্ঞাসম্পন্ন ও নিত্য-সংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন।

কেহ কেহ বলেন, মুক্ত বিজ্ঞান-কৃৎস্ন (চেতনাময় চিন্মাত্র) অপ্রমাণ ও নিশ্চলা। তথাগত জানেন, ওই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা রূপী, নিত্য ও সংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন,… আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী… আত্মা রূপীও নহে, অরূপীও নহে… আত্মা একত্ব-সংজ্ঞী… আত্মা নানাত্ব-সংজ্ঞী… আত্মা অপরিমিত-সংজ্ঞী… আত্মা মরণান্তে অপরিমিত-সংজ্ঞী, নিত্য ও সচৈনত্য অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন।

সংজ্ঞাগুলির মধ্যে সেইগুলিই পরিশুদ্ধ, পরম ও অগ্র (শ্রেষ্ঠ), অনুত্তর বলিয়া আখ্যাত যাহা রূপসংজ্ঞা ( চতুর্থ ধ্যান স্তরে লব্ধ), অরূপ-সংজ্ঞা (অনন্ত-আকাশ-আয়তন ও অনন্ত-বিজ্ঞান-আয়তন সমাপত্তিতে লব্ধ), একত্ব-সংজ্ঞা ও নানাত্ব-সংজ্ঞা। কেহ কেহ বলেন, “কিছুই নাই” অর্থবোধক যে আকিঞ্চন-আয়তন (সমাপত্তি) তাহা অপরিমেয় ও নিশ্চল। যাহা সমবায়ে গঠিত (সংস্কৃত) তাহা স্থূল এবং সংস্কার সকলের নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া সংস্কার অতিক্রান্ত (নির্বাণপ্রাপ্ত)।

ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আত্মা মরণান্তে রূপী, নিত্য ও অচৈতন্য অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। তাঁহারা আত্মা অরূপী…, আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী…, আত্মা রূপীও নহে, অরূপীও নহে… অচৈতন্য অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আত্মা মরণান্তে নিত্য ও সংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন, তাহাদের প্রতি কেহ কেহ আক্রোশ প্রকাশ করেন। তাহা কী কারণে? তাঁহারা বলেন, সংজ্ঞা রোগ, সংজ্ঞা গ-, সংজ্ঞা শল্য কিন্তু অসংজ্ঞা শান্ত ও প্রণীত। ভিক্ষুগণ, তথাগত জানেন-কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আত্মা মরণান্তে নিত্য ও অসংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। আবার যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আত্মা মরণান্তে রূপী, নিত্য ও সংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। আত্মা মরণান্তে অরূপী, নিত্য ও অসংজ্ঞী…, আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী…, আত্মা রূপীও নহে, অরূপীও নহে, নিত্য ও অসংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। ভিক্ষুগণ, কোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ এইরূপ বলিতে পারেন : রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান ছাড়াও আমি আগমন, গমন, চ্যুতি, উৎপত্তি, বৃদ্ধি, প্রসার ও বৈপুল্যের প্রজ্ঞাপনা করিতে পারিব, ইহা হইতে পারে না। যাহা সংস্কৃত (সমবায়ে গঠিত) তাহা স্থূল এবং সংস্কার সকলের নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত তাহার নিঃসরণদর্শী হইয়া সংস্কার অতিক্রান্ত (নির্বাণপ্রাপ্ত)।

ভিক্ষুগণ, কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা রূপী, নিত্য, সংজ্ঞীও নহে, অসংজ্ঞীও নহে অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন, আত্মা অরূপী…, আত্মা একাধারে রূপী ও অরূপী…, মরণান্তে আত্মা রূপীও নহে, অরূপীও নহে, নিত্য এবং সংজ্ঞীও নহে, অসংজ্ঞীও নহে অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। এখন, ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা নিত্য ও সংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন তাহাদের কেহ কেহ আক্রোশ প্রকাশ করেন। আবার যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা নিত্য ও অসংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন তাহাদের কেহ কেহও আক্রোশ প্রকাশ করেন। তাহার কারণ কী? কারণ, সংজ্ঞা রোগ, সংজ্ঞা গ-, সংজ্ঞা শল্য এবং অসংজ্ঞা সম্মোহ, অথচ সংজ্ঞাও নহে, অসংজ্ঞাও নহে বিষয়ে ইহা শান্ত ও প্রণীত (উৎকৃষ্ট)। ভিক্ষুগণ, তথাগত ইহা জানেন-ওই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা রূপী, নিত্য এবং সংজ্ঞীও নহে, অসংজ্ঞীও নহে অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন, মরণান্তে আত্মা অরূপী…, একাধারে রূপীও অরূপী…, রূপীও নহে, অরূপীও নহে, নিত্য এবং সংজ্ঞীও নহে, অসংজ্ঞীও নহে অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন। ভিক্ষুগণ, ওই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ দৃষ্ট (প্রত্যক্ষ), শ্রুত, মত (অনুমিত) বিজ্ঞাতব্য-সংস্কার মাত্রের দ্বারা আয়তনের (নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা) সম্পাদন (প্রভিলাভ) প্রজ্ঞাপন করেন।

এই আয়তনের প্রতিলাভের নিমিত্ত ইহা ব্যসন (বিনাশ) বলিয়া আখ্যাত হয়। এই আয়তন (নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা) স্থূল সংস্কার সমাপত্তি দ্বারা প্রাপ্তব্য নহে, কেবল সূক্ষ্ম সংস্কার প্রবর্তনের দ্বারা প্রাপ্তব্য যাহা সংস্কৃত (সমবায়ে গঠিত) তাহা স্থূল এবং সংস্কার সকলের নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া সংস্কার অতিক্রান্ত (নির্বাণপ্রাপ্ত)।

ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ বিদ্যামান সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ ও বিভব ঘোষণা (প্রজ্ঞাপনা) করেন, যাঁহারা মরণান্তে আত্মা-সংজ্ঞী ও নিত্য অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন, তাঁহাদের কেহ কেহ আক্রোশ প্রকাশ করেন। যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ মরণান্তে আত্মা নৈবসংজ্ঞী-না-অসংজ্ঞী অবস্থায় থাকে বলিয়া ঘোষণা করেন, তাঁহাদের কেহ কেহ আক্রোশ প্রকাশ করেন। তাহার কারণ কী? এই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আসক্তি সম্পর্কে উচ্চভাষী হন-“আমরা পরজন্মে এইরূপ হইব, আমরা পরজন্মে এইরূপ হইব।” যেমন কোনো বণিকের বাণিজ্যে যাইতে যাইতে মনে হয়-‘এইখান হইতে আমার ইহা হইবে, এইরূপে আমি ইহা লাভ করিব।’ এইরূপ আমি মনে করি, এই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ বণিক সদৃশ প্রতিভাত হয় : “আমরা পরজন্মে এইরূপ হইব, আমরা পরজন্মে এইরূপ হইব।” ভিক্ষুগণ, তথাগত জানেন-যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ বিদ্যমান সত্ত্বের উচ্ছেদ, বিনাশ ও বিভব প্রজ্ঞাপনা করেন, তাঁহারা সৎকায় ভয়বশত সৎকায় পরিজুগুপ্সাবশত সৎকায়কে কেন্দ্র করিয়া পরিধাবিত ও পরিচালিত হয়। যেমন দৃঢ় স্তম্ভে বা খীলে (খুঁটিতে) রজ্জুবদ্ধ কুকুর সেই স্তম্ভ বা খুঁটির চারি দিকে অনুধাবিত ও অনুপরিবর্তিত হয়, ঠিক এইরূপভাবে এই সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ সৎকায় ভয়বশত ও সৎকায় পরিজুগুপ্সাবশত জুগুপ্সাকে কেন্দ্র করিয়া অনুপরিধাবিত ও অনুপরিবর্তিত হয়। যাহা কিছু সংস্কৃত তাহা স্থূল এবং সংস্কারসমূহের নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া তাহা অতিক্রান্ত।

ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ অপরান্তকল্পিক, অপরান্তানুদৃষ্টি সম্পন্ন, অপরান্ত সম্বন্ধে অনেক প্রকার মন্তব্য প্রকাশ করেন, তাঁহারা সকলেই এই পঞ্চ-আয়তন বা ইহাদের যেকোনোটি সম্পর্কে বলেন। কোনো কোনো শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা পূর্বান্তকল্পিক, পূর্বান্তনুদৃষ্টিসম্পন্ন, পূর্বান্ত সম্পর্কে অনেক প্রকার মন্তব্য প্রকাশ করেন। কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ শাশ্বত, ইহাই সত্য, অন্য কিছু মিথ্যা। কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ আংশিকভাবে শাশ্বত, আংশিকভাবে অশাশ্বতও, ইহাই সত্য, অন্য কিছু মিথ্যা। কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ শাশ্বতও নহে, অশাশ্বতও নহে, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ সান্ত (অন্তবান)। ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ অনন্ত, ইহাই সত্য অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ সান্ত ও অনন্ত, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ সান্তও নহে, অনন্তও নহে ইহাই সত্য, অন্য সব মিথ্যা। কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ একত্ব-সংজ্ঞী, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ নানাত্ব-সংজ্ঞী, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ পরিমিত-সংজ্ঞী, ইহাই সত্য অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ অপরিমিত-সংজ্ঞী, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ একান্ত সুখী, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ সুখী ও দুঃখী, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। কেহ কেহ বলেন, আত্মা ও জগৎ দুঃখীও নহে, সুখীও নহে, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা। ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এইরূপ মতবাদী ও দৃষ্টিসম্পন্ন-‘আত্মা ও জগৎ শাশ্বত, ইহাই সত্য, অন্য মিথ্যা, তাঁহাদের শ্রদ্ধা, রুচি, অনুশ্রব এবং আকারপরি-বিতর্ক ও দৃষ্টি-নিধ্যান-ক্ষান্তি ব্যতীত প্রত্যাত্ম (ব্যক্তিগত) জ্ঞান পরিশুদ্ধ ও পর্যবদাত হয়-তাহা হইতে পারে না। ব্যক্তিগতভাবে জ্ঞান পরিশুদ্ধ ও পর্যবদাত না হইলেও ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ জ্ঞানের যে অংশমাত্র পর্যবদাত করেন তাহাই তাঁহাদের উপাদান বলিয়া আখ্যাত হয়। যাহা সংস্কৃত তাহা স্থূল এবং সংস্কারগুলির নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া তাহা অতিক্রান্ত (নির্বাণপ্রাপ্ত)।

ভিক্ষুগণ, যে-সকল শ্রমণ-ব্রাহ্মণ এইরূপ মতবাদ ও দৃষ্টি পোষণ করেন, “আত্মা ও জগৎ অশাশ্বত… শাশ্বত এবং অশাশ্বত… শাশ্বতও নহে, অশাশ্বতও নহে… সান্ত এবং অনন্ত… সান্তও নহে, অনন্তও নহে… একত্ব-সংজ্ঞী… নানাত্ব-সংজ্ঞী… পরিমিত-সংজ্ঞী… অপরিমিত-সংজ্ঞী… একান্ত সুখী… একান্ত দুঃখী… দুঃখী ও নহে, সুখী ও নহে, ইহাই সত্য, অন্যরূপ মিথ্যা, তাঁহাদের শ্রদ্ধা, রুচি, অনুশ্রব, আকারপরি-বিতর্ক ও দৃষ্টি-নিধ্যান-ক্ষান্তি ব্যতীত জ্ঞান পরিশুদ্ধ ও পর্যবদাত হইবে, তাহা হইতে পারে না। ভিক্ষুগণ, ব্যক্তিগতভাবে জ্ঞান পরিশুদ্ধ ও পর্যবদাত না হইলেও শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ জ্ঞানের যে অংশমাত্র পর্যবদাত করেন, তাহাই তাঁহাদের উপাদান বলিয়া আখ্যাত হয়। যাহা সংস্কৃত তাহা স্থূল এবং সংস্কার সকলের নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া তাহা (সংস্কার) হইতে অতিক্রান্ত।

ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি ও অপরান্তানুদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া এবং সর্বপ্রকার কাম সংযোজনের অধিষ্ঠান না করিয়া প্রবিবেক ও প্রীতি লাভ করিয়া অবস্থান করেন-যে প্রবিবেকজনিত প্রীতি লাভ করিয়া আমি বিহার করি তাহা শান্ত ও প্রণীত। তাঁহার প্রবিবেকজনিত প্রীতি নিরুদ্ধ হইলে দৌর্মনস্য উৎপন্ন হয়, দৌর্মনস্য নিরুদ্ধ হইলে প্রবিবেকজনিত প্রীতি উৎপন্ন হয়। ভিক্ষুগণ, যেমন, কোনো স্থান হইতে ছায়া চলিয়া গেলে তাহাতে উত্তাপ স্ফুরিত হয়। আবার উত্তাপ চলিয়া গেলে ছায়া স্ফুরিত হয়। এইরূপে, ভিক্ষুগণ, প্রবিবেকজনিত প্রীতি নিরুদ্ধ হইলে দৌর্মনস্য উৎপন্ন হয় এবং দৌর্মনস্য নিরুদ্ধ হইলে প্রবিবেকজনিত প্রীতি উৎপন্ন হয়। ভিক্ষুগণ, তথাগত ইহা জানেন, এই ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি ও অপরান্তানুদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া সর্বপ্রকার কামসংযোজনের অধিষ্ঠান না করিয়া প্রবিবেকজনিত প্রীতি লাভ করিয়া বিহার করেন। যে প্রবিবেক প্রীতি লাভ করিয়া আমি বিহার করি তাহা শান্ত ও প্রণীত। তাঁহার সেই প্রবিবেকজনিত প্রীতি নিরুদ্ধ হইলে দৌর্মনস্য উৎপন্ন হয়, দৌর্মনস্য নিরুদ্ধ হইলে প্রবিবেকজনিত প্রীতি উৎপন্ন হয়। যাহা সংস্কৃত তাহা স্থূল এবং সংস্কার সকলের নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া তাহা (সংস্কার) অতিক্রান্ত।

ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি ও অপরান্তানুদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া এবং সর্বপ্রকার কাম সংযোজনের অধিষ্ঠান না করিয়া প্রবিবেকজনিত প্রীতি অতিক্রম করিয়া নিরামিষ (কামমুক্ত) সুখ লাভ করিয়া বিহার করেন: যে নিরামিষ সুখ লাভ করিয়া আমি বিহার করি তাহা শান্ত ও প্রণীত। সেই নিরামিষ সুখ নিরুদ্ধ হইলে প্রবিবেকজনিত প্রীতি উৎপন্ন হয় এবং প্রবিবেকজনিত প্রীতি হইলে নিরামিষ সুখ উৎপন্ন হয়। ভিক্ষুগণ, যেমন, কোনো স্থান হইতে ছায়া চলিয়া গেলে সেই স্থানে উত্তাপ স্ফুরিত হয়… নিরামিষ সুখ উৎপন্ন হয়। ভিক্ষুগণ, তথাগত ইহা জানেন-এই ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি ও অপরান্তানুদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া নিরামিষ সুখ উৎপন্ন হয়। যাহা সংস্কৃত তাহা স্থূল… উৎপন্ন সংস্কার অতিক্রান্ত।

ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি, অপরান্তানুদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া, সর্বপ্রকার কামসংযোজনের অধিষ্ঠান না করিয়া, প্রবিবেকজনিত প্রীতি অতিক্রম করিয়া ও নিরামিষ সুখ অতিক্রম করিয়া ‘দুঃখও নহে, সুখও নহে’ বেদনা লাভ করিয়া বিহার করেন। যে ‘অদুঃখ-অসুখ’ বেদনা লাভ করিয়া আমি বিহার করি তাহা শান্ত ও প্রণীত। তাহার সেই অদুঃখ-অসুখ বেদনা নিরুদ্ধ হইলে নিরামিষ সুখ উৎপন্ন হয়… যেমন ছায়া… তথাগত ইহা জানেন… সংস্কার অতিক্রান্ত।

ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি ও অপরান্তানুদৃষ্টি পরিত্যাগ করিয়া, সর্বপ্রকার কামসংযোজনের অধিষ্ঠান না করিয়া, প্রবিবেকজনিত প্রীতি, নিরামিষ সুখ, অদুঃখ বেদনা অতিক্রম করিয়া নিজেকে ‘আমি শান্ত’ আমি নির্বাণপ্রাপ্ত, আমি অনুপাদান (অনাসক্ত)’ বলিয়া সম্যক দর্শন করেন। তথাগত ইহা জানেন, এই ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ… অনুপাদান বলিয়া সম্যক দর্শন করেন। তথাগত ইহা জানেন-এই ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ… সম্যক দর্শন করেন, নিশ্চয়ই এই আয়ুষ্মান নির্বাণ-উপযোগী প্রতিপদ সম্পর্কে বলেন। অথচ এই ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ পূর্বান্তানুদৃষ্টি অপরান্তানুদৃষ্টি।

কামসংযোজন, প্রবিবেকজনিত প্রীতি, নিরামিষ সুখ, না-দুঃখ-না-সুখ বেদনার প্রতি অনুরাগযুক্ত হয়, যাহাতে এই আয়ুষ্মান, আমি শান্ত, অনুপাদান হইয়া নির্বাণ প্রাপ্ত হইয়াছি বলিয়া সম্যক দর্শন করেন, তাহাকে এই ভবদীয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণের উপাদান বলা হয়। যাহা সংস্কৃত তাহা স্থূল এবং সংস্কার নিরোধ আছে জানিয়া তথাগত নিঃসরণদর্শী হইয়া তাহা (সংস্কার) হইতে অতিক্রান্ত।

ভিক্ষুগণ, অনুত্তর শান্তিবরপদ (নির্বাণ) লাভ যাহা ছয় স্পর্শ আয়তনের উৎপত্তি (সমুদয়), বিলয়, আস্বাদ, আদীনব, নিঃসরণ এই তত্ত্বস্থান যথার্থ জানিয়া অনুৎপাদ (অনাসক্ত) বিমুক্তি তাহা তথাগত কর্তৃক অভিসম্বুদ্ধ হইয়াছে।

ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ প্রসন্নমনে ভগবানের ভাষণ শ্রবণ করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলেন।

পঞ্চত্রয় সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]