আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
এক সময় ভগবান শাক্যদের রাজ্যে অবস্থান করিতেছিলেন সামগ্রামে। সেই সময় নির্গ্রন্থ নাতপুত্র (মহাবীর) পাবাতে সম্প্রতি মারা গিয়াছেন। তাঁহার মৃত্যুর পর অন্যান্য নির্গ্রন্থগণ দ্বিধাবিভক্ত, ভণ্ডনজাত (ভেদস্বভাব), কলহজাত, বিবাদরত হইয়া পরস্পর পরস্পরকে মুখতুণ্ড ব্যথিত করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন, তুমি এই ধর্মবিনয় জানো না। আমি এই ধর্মবিনয় জানি। কিরূপে তুমি এই ধর্মবিনয় জানিবে? তুমি মিথ্যা-প্রতিপন্ন। আমি সম্যক প্রতিপন্ন, আমার বাক্য অর্থযুক্ত আর তোমার বাক্য নিরর্থক। পূর্বের বচনীয় পূর্বে বলো অনভ্যস্তকে (অবিচীর্ণকে) তুমি বিপর্যস্ত করিতেছ, তোমার দোষ আরোপিত এবং তুমি নিগৃহীত, বাদ (দোষ) মোচনার্থ যত্ন করো। অথবা যদি সমর্থ হও তবে গ্রন্থি খোল। মনে হয় নির্গ্রন্থ নাতপুত্রীয়দের (মহাবীবের শিষ্যদের) মৃত্যু ঘনাইয়া আসিয়াছে। এমনকি নির্গ্রন্থ জ্ঞাতৃপুত্রের গৃহী শিষ্যদের যাহারা শ্বেতবসন পরিহিত, তাঁহারা ধর্মবিনয়ে দুরাখ্যাত, দুঃপ্রচারিত, অপরিচালিত, শান্তিতে অননুবর্তিত, অসম্যকসম্বুদ্ধ-প্রবেদিত। ভিন্ন মতাবলম্বী ও অপ্রতিশরণ নির্গ্রন্থ নাতপুত্রীদের প্রতি বিরূপ, বিরক্ত ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বিরত আছেন।
সেই সময়ে শ্রামণের চুন্দ পাবাতে বর্ষাবাস যাপন করিয়া সামগ্রামে আয়ুষ্মান আনন্দের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া আয়ুষ্মান আনন্দকে অভিবাদন করিয়া একপার্শ্বে উপবেশন করিলেন। একপার্শ্বে উপবিষ্ট শ্রামণের চুন্দ আয়ুষ্মান আনন্দকে বলিলেন, ভদন্ত, নির্গ্রন্থ নাতপুত্র সম্প্রতি পাবাতে দেহত্যাগ করিয়াছেন। তাঁহার মৃত্যুর পর অন্যান্য নির্গ্রন্থগণ দ্বিধাবিভক্ত, ভণ্ডনজাত, কলহজাত, বিবাদাপন্ন হইয়া পরস্পর পরস্পরকে মুখতুণ্ড ব্যথিত করিয়া অবস্থান করিতেছেন… অপ্রতিশরণ নাতপুত্রীয়দের প্রতি বিরূপ, বিরক্ত ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বিরত আছেন। এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান আনন্দ শ্রামণের চুন্দকে বলিলেন, বন্ধু চুন্দ, ভগবানের সাক্ষাতে ইহা একটি আলোচ্য বিষয়, আমরা ভগবানের নিকট উপস্থিত হইব। উপস্থিত হইয়া ভগবানের নিকট ইহা গোচর করিব। “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া শ্রামণের চুন্দ আয়ুষ্মান আনন্দকে প্রত্যুত্তর দিলেন।
অতঃপর আয়ুষ্মান আনন্দ ও শ্রামণের চুন্দ ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপার্শ্বে উপবেশন করিলেন এবং একপার্শ্বে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে এইরূপ বলিলেন, ভদন্ত শ্রামণের চুন্দ এইরূপ বলিয়াছে, “নির্গ্রন্থ নাতপুত্র… শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বিরত আছেন।” ভদন্ত, তখন আমার এইরূপ মনে হইল : ভগবানের মৃত্যুর পরে যেন সংঘে বিবাদ উৎপন্ন না হয়। বিবাদ বহুজনের অহিত, সুখহীনতা, অনর্থ এবং দেবমনুষ্যের অহিত ও দুঃখের কারণ।
“আনন্দ, তুমি কী মনে করো? আমার দ্বারা যে-সকল অভিজ্ঞাসম্পন্ন ধর্ম দেশিত হইয়াছে; যথা : চারি স্মৃতিপ্রস্থান, চারি সম্যকপ্রধান, চারি ঋদ্ধিপাদ, পঞ্চ-ইন্দ্রিয়, পঞ্চবল, সপ্তবোধ্যঙ্গ, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ,-আনন্দ, তুমি কি দেখিয়াছ যে এই সকল ধর্মে দুইজন ভিক্ষুও ভিন্নমত পোষণ করেন?” “ভদন্ত, যে-সকল অভিজ্ঞাসম্পন্ন ধর্ম ভগবান কর্তৃক দেশিত হইয়াছে; যথা : চারি স্মৃতিপ্রস্থান… মার্গ, এই সকল ধর্মে দুইজন ভিক্ষুকেও ভিন্নমত পোষণ করিতে আমি দেখি নাই। ভদন্ত, যে-সকল ব্যক্তি ভগবানকে আশ্রয় করিয়া অবস্থান করিতেছেন, ভগবানের মৃত্যুর পর তাঁহারা সংঘ মধ্যে আজীব (জীবিকা) ও প্রাতিমোক্ষ নিয়ম প্রসঙ্গে বিবাদ সৃষ্টি করিতে পারেন এবং এই বিবাদ বহুজনের অহিত, অ-সুখ, অনর্থ, দেবমনুষ্যের অহিত ও দুঃখের কারণ হইবে।” আনন্দ, আজীব ও প্রাতিমোক্ষসংক্রান্ত বিবাদ সামান্যমাত্র। কিন্তু মার্গ বা প্রতিপদসংক্রান্ত সংঘে বিবাদ বহুজনের অহিত, অসুখ, অনর্থ এবং দেবমনুষ্যের অহিত ও দুঃখের কারণ।
আনন্দ, এই ছয়টি বিবাদমূল। ছয়টি কী কী? আনন্দ, কোনো ভিক্ষু ক্রোধপরায়ণ ও বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়। যে ভিক্ষু ক্রোধপরায়ণ ও বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়, সে শাস্তা (বুদ্ধ), ধর্ম ও সংঘের প্রতি অশ্রদ্ধ ও দুর্বিনীত হয় এবং শিক্ষায় পরিপূর্ণকারী হয় না। আনন্দ, যে ভিক্ষু শাস্তা, ধর্ম ও সংঘের প্রতি অশ্রদ্ধ ও দুর্বিনীত এবং শিক্ষায় পরিপূর্ণকারী নহে, সে সংঘের বিবাদ সৃষ্টি করে। সেই বিবাদ বহুজনের অহিত, অসুখ, অনর্থ এবং দেবমনুষ্যের অহিত ও দুঃখের কারণ হয়। এইরূপে আনন্দ, তোমরা বিবাদমূলকে অধ্যাত্মভাবে ও বাহিরে দেখো এবং বিবাদমূলকে দূরীভূত করিবার জন্য চেষ্টা করো। যদি এইরূপে বিবাদমূলকে অধ্যাত্মভাবে ও বাহিরে না দেখো তাহা হইলে তোমরা অনাগতে (ভবিষ্যতে) পাপস্বরূপ বিবাদমূলের অনাসবে প্রতিপাদন করো। এইভাবে পাপস্বরূপ বিবাদমূলের পরিত্যাগ হয় ও অনাগতে অনাসব হয়।
পুনরায়, আনন্দ, কোনো ভিক্ষু মৰী (ভ- বা কপট), পর্যাসী (নিষ্ঠুর)… ঈর্ষাপরায়ণ ও মাৎসর্যপরায়ণ… শঠ, মায়াবী হয়… পাপেচ্ছু ও মিথ্যাদৃষ্টিসম্পন্ন হয়… লৌকিক মতাবলম্বী দৃঢ়গ্রাহী ও দুর্পরিহারী হয়। সে শাস্তা, ধর্ম ও সংঘের প্রতি অশ্রদ্ধ ও দুর্বিনীত ও শিক্ষায় পরিপূরণকারী হয় না। আনন্দ, যে শাস্তা, ধর্ম ও সংঘের প্রতি অশ্রদ্ধ ও দুর্বিনীত হয়, সে সংঘে বিবাদ সৃষ্টি করে। সেই বিবাদ বহু জনের অহিত, অ-সুখ অনর্থ এবং দেব-মনুষ্যের অহিত ও দুঃখের কারণ। এইরূপ আনন্দ, তোমরা বিবাদমূলকে অধ্যাত্মভাবে… অনাগতে অনাসব হয়। আনন্দ, এই ছয়টিই বিবাদমূল।
আনন্দ, এই চারিটি অধিকরণ, (বিবাদ) মীমাংসার বিষয়। চারিটি কী কী? বিবাদ অধিকরণ, অনুবাদ-অধিকরণ, আপত্তি-অধিকরণ ও কৃত্য-অধিকরণ। এই চারিটি অধিকরণ। সময়ে সময়ে উৎপন্ন বিবাদাদি অধিকরণের শমথ বা উপশমের জন্য এই সাতটি অধিকরণ শমথ আছে। যথা : সম্মুখবিনয় দাতব্য, স্মৃতিবিনয় দাতব্য, অমূঢ়বিনয় দাতব্য, প্রতিজ্ঞাকরণ কর্তব্য, যদ্ভূয়সিকা, তস্যপাপীয়সিকা ও তৃণবস্তারক। আনন্দ, কীভাবে সম্মুখ বিনয় হয়? আনন্দ, কোনো কোনো ভিক্ষু এইভাবে বিবাদ করেন : “ইহা ধর্ম, ইহা অধর্ম, ইহা বিনয়, ইহা অবিনয়।” এই ভিক্ষুগণকে সামগ্রিকভাবে সমবেত হইতে হইবে এবং যাহা ধর্মসঙ্গত (ধর্মনেত্রী) তাহা বাছিয়া লইয়া প্রয়োজন অনুসারে সেই বিবাদের মীমাংসা করিতে হইবে। আনন্দ, এইভাবেই সম্মুখবিনয় হয় এবং এইভাবে কতিপয় অধিকরণের (বিচার) মীমাংসা হয়, যেমন সম্মুখবিনয়ের দ্বারা।
আনন্দ, কিরূপে যদ্ভূয়সিকা হয়? যদি সেই ভিক্ষুগণ সেই আবাসে সেই অধিকরণের (বিচার্য বিষয়ের) মীমাংসা করিতে না পারেন, তাহা হইলে যে আবাসে বহুসংখ্যক ভিক্ষু আছেন সেখানে যাইতে হইবে এবং তথায় সকলকেই সামগ্রিকভাবে সমবেত হইয়া যাহা… মীমাংসা করিতে হইবে। এইভাবে যদ্ভূয়সিকা হয় যাহাতে কতিপয় বিবাদের মীমাংসা হয়।
আনন্দ, কিরূপে স্মৃতিবিনয় হয়? আনন্দ, ভিক্ষুগণ কোনো ভিক্ষুকে পারাজিক কিংবা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করিয়া এইভাবে বলেন : “আয়ুষ্মান কি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া স্মরণ করেন? তিনি বলিলেন, “বন্ধুগণ, আমি পারজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্মরণ করি না। তখন সেই ভিক্ষুকে স্মৃতিবিনয় দিতে হইবে। আনন্দ এইরূপে স্মৃতিবিনয় হয় এবং এইভাবে কতিপয় অধিকরণের মীমাংসা হয় যেমন স্মৃতিবিনয়ের দ্বারা।
আনন্দ, কিরূপে অমূঢ়বিনয় হয়? আনন্দ, ভিক্ষুগণ কোনো ভিক্ষুকে পারাজিক বা পারাজিককল্পের মত কোনো গুরুতর অপরাধের জন্য এইভাবে অভিযুক্ত করেন : “আয়ুষ্মান কি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর করিয়াছেন বলিয়া স্মরণ করেন?” তিনি বলিলেন, “আমি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্মরণ করিতে পারিতেছি না।” (অপরাধ) উদ্ঘাটনের জন্য আবার বলা হইল-“বন্ধু, উত্তমরূপে জ্ঞাত হও যে তুমি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছ কি না স্মরণ করো।” তিনি এইরূপ বলিলেন, ‘বন্ধুগণ, আমি উন্মাদ অবস্থা ও চিত্তের বিপর্যাস প্রাপ্ত হইয়াছিলাম এবং সেই উন্মত্ত অবস্থায় বহু শ্রমণ-অনুচিত আচরণ ও ভাষণ করিয়াছি। মূঢ় অবস্থায় ইহা আমি করিয়াছি। এখন তাহা স্মরণ করিতে পারিতেছি না।” আনন্দ, তাহাকে অমূঢ়বিনয় দিতে হইবে। আনন্দ, এইরূপে অমূঢ়বিনয় হয় এবং এইভাবে কতিপয় অধিকরণের মীমাংসা হয়, যেমন, অমূঢ়বিনয়ের দ্বারা।
আনন্দ, কিরূপে প্রতিজ্ঞাকরণ বিনয় হয়? আনন্দ, কোনো ভিক্ষু অভিযুক্ত হইয়া বা অভিযুক্ত না হইয়া স্বীয় অপরাধ স্মরণ, বিবৃত ও প্রকাশ করেন। সেই ভিক্ষুর কোনো জ্যেষ্ঠ ভিক্ষুর নিকট উপস্থিত হইয়া একাংশে চীবর রাখিয়া পদে বন্দনা করিয়া উৎকুটিকভাবে উপবেশন করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া এইরূপ বলা উচিত : “ভদন্ত, আমি অপরাধ করিয়াছি, তাহা প্রতিদেশনা (স্বীকার) করিতেছি।” তিনি বলেন, “তুমি দেখিতেছ?” “হ্যাঁ, আমি দেখিতেছি।” “ভবিষ্যতে সংযত, আচরণ করিতে হইবে।” “হ্যাঁ সংযম গ্রহণ করিব।” আনন্দ এইরূপে প্রতিজ্ঞা করা হয় এবং এইভাবে কতিপয় অধিকরণের মীমাংসা হয় যেমন প্রতিজ্ঞাকরণের দ্বারা।
আনন্দ, কিরূপে তস্যপাপীয়সিকা হয়? আনন্দ, ভিক্ষুগণ কোনো ভিক্ষুকে পারাজিক বা পারাজিককল্প গুরুতর অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করেন, “আয়ুষ্মান কি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া স্মরণ করেন?” তিনি উত্তর দেন, “বন্ধুগণ, আমি পারাজিক বা পরাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্মরণ করিতে পারিতেছি না।” (অপরাধ) উদ্ঘাটনের জন্য বলা হইল : “আয়ুষ্মান, উত্তমরূপে জ্ঞাত হইয়া স্মরণ করুন যে পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছেন কি না।” “বন্ধুগণ, আমি এইরূপ পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্মরণ করি না, অবশ্য সামান্যমাত্র অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্মরণ করি।” অপরাধ উদ্ঘাটনের জন্য তাঁহাকে আবার বলা হইল : “আয়ুষ্মান উত্তমরূপে জানিতে চেষ্টা করুন যদি আপনি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া স্মরণ করিতে পারেন।” তিনি এইরূপ বলিতে গুরুতর অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া স্মরণ করিতে পারেন।” তিনি এইরূপ বলিতে পারেন, “জিজ্ঞাসিত না হইয়াও আমি স্বীকার করিব যে সামান্যমাত্র অপরাধ আমি করিয়াছি, কাজেই জিজ্ঞাসিত হইয়া আমি কি পারাজিক বা পারাজিককল্প গুরুতর অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্বীকার করিব না?” (তাঁহাকে) কেহ এইরূপ বলিতে পারেন : “বন্ধু, তুমি জিজ্ঞাসিত না হইয়া সামান্যমাত্র অপরাধ করিয়া স্বীকার করিবে না, তুমি কি জিজ্ঞাসিত হইয়া পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছ বলিয়া স্বীকার করিবে? হে আয়ুষ্মান, উত্তমরূপে জানিতে চেষ্টা করুন যদি আপনি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছেন বলিয়া স্মরণ করিতে পারেন।” তিনি এইরূপ বলিতে পারাজিক বা পারাজিককল্প গুরুতর অপরাধ করিয়াছি বলিয়া স্মরণ করিতে পারি, কৌতুক বা তামাসা করিবার জন্যই ইহা বলিয়াছি, আমি পারাজিক বা পারাজিককল্প কোনো গুরুতর অপরাধ করিয়াছি স্মরণ করিতে পারিতেছি না।” আনন্দ, এইরূপে তস্যপাপীয়সিক হয় এবং এইভাবে কতিপয় অধিকরণের উপশম হয় যেমন তস্যপাপীয়সিকার দ্বারা।
আনন্দ, কিরূপে তৃণবস্তারক হয়? আনন্দ, ভিক্ষুদের ভেদস্বভাবজাত, কলহজাত ও বিবাদাপন্ন হইয়া বিহারকালে বহু শ্রামণের অনুচিত আচরণ করেন বা ভাষণ দেন। আনন্দ, সেই সকল ভিক্ষুকে সামগ্রিকভাবে সমবেত হইতে হইবে, সমবেত হইয়া যেকোনো পক্ষের একজন পণ্ডিত ভিক্ষুকে আসন হইতে উঠিয়া একাংশে চীবর ধারণ করিয়া কৃতাঞ্জলি হইয়া প্রণামপূর্বক সংঘকে জ্ঞাপন করিতে হইবে : “মাননীয় সংঘ, আমার প্রস্তাব শ্রবণ করুন। ভেদস্বভাবজাত, কলহজাত ও বিবাদপন্ন হইয়া বিহারকালে আমাদের দ্বারা বহু শ্রামণের অনুচিত আচরণ কৃত ও ভাষণ প্রদত্ত হইয়াছে। যদি সংঘ উচিত মনে করেন তাহা হইলে এই আয়ুষ্মানদের এবং আমার নিজের অপরাধের জন্য স্থূল দোষ ও গৃহী প্রতিসংযুক্ত বাদে আয়ুষ্মানদের ও আমার মঙ্গলের জন্য সংঘমধ্যে তৃণবস্তারকের দ্বারা দেশনা করা হইবে।” অতঃপর যেকোনো পক্ষের ভিক্ষুদের একজন পণ্ডিততর ভিক্ষুকে আসন হইতে উঠিয়া একাংশে চীবর ধারণ করিয়া কৃতাঞ্জলি প্রণামপূর্বক সংঘকে জ্ঞাপন করিতে হইবে : মাননীয় সংঘ, আমার একটি প্রস্তাব শ্রবণ করুন। আমাদের দ্বারা ভেদস্বভাবজাত, কলহজাত… দেশনা করিতে হইবে। আনন্দ, এইরূপে তৃণবস্তারক হয় এবং এইভাবে কতিপয় অধিকরণ মীমাংসা হয় যেমন তৃণবস্তারকের দ্বারা।
আনন্দ, এই ছয়টি ধর্ম স্মরণীয়, প্রীতিকর, গৌরবকর, যাহা মিলন, অবিসম্বাদ, অখণ্ডতা ও ঐক্য অভিমুখে সংবর্তিত হয়। ছয়টি কী কী? আনন্দ, সব্রহ্মচারীদের (সতীর্থগণের) প্রতি প্রকাশ্যে বা গোপনে ভিক্ষুর মৈত্রীপূর্ণ কায়কর্ম প্রত্যুপস্থিত (আরব্ধ) হয়, এই ধর্ম স্মরণীয় প্রীতিকর… সংবর্তিত হয়। পুনরায়, আনন্দ, সতীর্থগণের প্রতি… মৈত্রীপূর্ণ বাক্কর্ম… সংবর্তিত হয়। পুনশ্চ, আনন্দ, সতীর্থগণের প্রতি মৈত্রীপূর্ণ মনোকর্ম… সংবর্তিত হয়। পুনশ্চ, আনন্দ, ধর্মত যাহা লাভ হয়, যাহা ধর্মলব্ধ, এমনকি ভিক্ষাপাত্রেও যাহা প্রদত্ত হয়, এইরূপ কোনো লব্ধবস্তুই অবিভক্তভাবে একা ভোগ না করিয়া ভিক্ষু তাহা শীলবান সব্রহ্মচারীদের সহিত সমভাবে ভাগ করিয়া ভোগ করেন। এই ধর্ম… সংবর্তিত হয়। পুনশ্চ, আনন্দ, যে-সকল শীলাচারণ অখণ্ড, নিশ্ছিদ্র, নিষ্কলঙ্ক, নিষ্কলুষ, (পাপ হইতে) মুক্তিদায়ক, বিদ্বজ্জন প্রশংসিত, অপরামৃষ্ট ও সমাধি অভিমুখী, ভিক্ষু সেই সকল সমম্বিত শীলগুণে হই প্রকাশ্যে অথবা গোপনে সব্রহ্মচারীদের মধ্যে বিচরণ করেন। এই ধর্ম… সংবর্তিত হয়। পুনশ্চ, আনন্দ, যে দৃষ্টি আর্য (নির্দোষ) মুক্তি অভিমুখী, যাহা তদনুবর্তী ব্যক্তির পক্ষে যথার্থ দুঃখ ক্ষয়ের উপায় হয়, ভিক্ষু সেইরূপ দৃষ্টি দ্বারা সমম্বিত হইয়া প্রকাশ্যে অথবা গোপনে সব্রহ্মচারীদের মধ্যে বিচরণ করেন। এই ধর্ম স্মরণীয়, প্রীতিকর, গৌরবকর, যাহা মিলন, অবিসম্বাদ, অখণ্ডতা ও ঐক্য অভিমুখে সংবর্তিত হয়।
আনন্দ, এই ছয়টি ধর্ম স্মরণীয়, প্রীতিকর, গৌরবকর, যাহা মিলন, অবিসম্বাদ, অখণ্ডতা ও ঐক্য অভিমুখে সংবর্তিত হয়। আনন্দ, এই ছয়টি স্মরণীয় ধর্ম গ্রহণ করিয়া যদি তোমরা পালন করো তাহা হইলে কি সূক্ষ্ম বা স্থূল বচনপথ দেখিবে না যাহা তোমরা সমর্থন করিবে না? “ভদন্ত, না।”
অতএব, আনন্দ। এই স্মরণীয় ধর্ম গ্রহণ করিয়া পালন করো, দীর্ঘকাল তাহা তোমাদের হিত ও সুখের কারণ হইবে।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। আয়ুষ্মান আনন্দ, সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
সামগ্রাম সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ