লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৫]

আনিঞ্জ্য সাম্প্রেয় সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

এক সময় ভগবান কুর্বদের মধ্যে অবস্থান করিতেছিলেন কর্মাশ্বদম্য নামক কুর্বদের নিগমে। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, “হে ভিক্ষুগণ,” “হ্যাঁ, ভদন্ত” বলিয়া ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন, হে ভিক্ষুগণ, কাম অনিত্য, তুচ্ছ, মিথ্যা, মোহধর্মী, ইহা মায়াকৃত, নির্বোধের প্রলাপ। যাহা দৃষ্টধার্মিক (ইহকালের) কাম, যাহা অনাগত কাম, যাহা দৃষ্টধার্মিক কামসংজ্ঞা, যাহা সাম্প্ররায়িক কামসংজ্ঞা, ইহাদের উভয়ই মারপ্রভাবিত, মারবিষয়, মারনিবাপ, মারের বিচরণভূমি। এই কামগুলির মধ্যে পাপময় অকুশল মানস (ইচ্ছা) অভিধ্যা, ব্যাপাদ ও ধ্বংসের দিকে সংবর্তিত হয় এবং এইগুলি এখানে আর্যশ্রাবকের অনুশিক্ষায় অন্তরায় সৃষ্টি করে। তখন আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন; যাহা দৃষ্টধার্মিক কাম, যাহা অনাগত কাম… সৃষ্টি করে। অতএব আমার বিপুল মহদ্গতচিত্তে পৃথিবীকে জয়, অধিষ্ঠান মানসে বিহার করার জন্য যাহা পাপময় অকুশল মানস, অভিধ্যা, ব্যাপাদ ও বিনাশ, তাহা উৎপন্ন হইতে পারিবে না। তাহাদের প্রহান-হেতু আমার চিত্ত অসামান্য, অপ্রমেয় ও সুভাবিত হইবে। এইভাবে প্রতিপন্ন তাঁহার (আর্যশ্রাবক) আয়তনে (অর্হত্ত্ব বা অর্হত্ত্ব-বিদর্শন বা চতুর্থ ধ্যানন্তরে) চিত্ত প্রসন্নতা লাভ করে এবং প্রসন্নতা লাভ করিবার পর এখন স্থিতি লাভ করে ও প্রজ্ঞার জন্য নমিত হয়। মৃত্যুর পর বিলীন হইলে ইহা সম্ভব যে সংবর্তনিক বিজ্ঞান (বা প্রশান্তি) লাভ করে। ভিক্ষুগণ, ইহাকে আনিঞ্জ্যসাম্প্রেয়ের (স্থায়ী মঙ্গল উপযোগী) প্রথম প্রতিপদ বলা হয়।

পুনরায় ভিক্ষুগণ, আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : এই সকল দৃষ্টধার্মিক কাম, এইগুলি অনাগত কাম, এইগুলি দৃষ্টধার্মিক কামসংজ্ঞা, এইগুলি সাম্প্ররায়িক (পারত্রিক) কামসংজ্ঞা, চারি মহাভূত এবং চারিভূতোৎপন্ন রূপ। এইভাবে প্রতিপন্ন ও বহুল পরিমাণে প্রতিপদবিহারী তাঁহার চিত্ত প্রসন্নতা লাভ করে… সংবর্তনিক বিজ্ঞান অনড়তা (বা প্রশান্তি) লাভ করে। ভিক্ষুগণ, ইহাকেই দ্বিতীয় আনিঞ্জ্য-সাম্প্রেয় প্রতিপদ বলা হয়।

পুনরায়, ভিক্ষুগণ, আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : এইগুলি দৃষ্টধার্মিক কাম, এইগুলি দৃষ্টধার্মিক কামসংজ্ঞা, এইগুলি অনাগত কামসংজ্ঞা, এইগুলি দৃষ্টধার্মিক রূপ, এইগুলি সাম্প্ররায়িক রূপ, এইগুলি দৃষ্টধার্মিক রূপসংজ্ঞা, এইগুলি সাম্প্ররায়িক রূপসংজ্ঞা, ইহাদের উভয়ই অনিত্য। যাহা অনিত্য তাহার জন্য আনন্দ করিবার, প্রকাশ করিবার বা তাহার প্রতি অনুরক্ত হইবার প্রয়োজন নাই। এইভাবে প্রতিপন্ন… অনড়তা (প্রশান্তি) লাভ করে। ইহাকেই তৃতীয় আনিঞ্জ্য-সাম্প্রেয় প্রতিপদ বলা হয়।

পুনরায়, ভিক্ষুগণ, আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : এই সকল দৃষ্টধার্মিক… এই সকল অনাগত রূপসংজ্ঞা, এই সকল অনেজ-সংজ্ঞা সম্পূর্ণরূপে নিরুদ্ধ হয়। আকিঞ্চন-আয়তন বিষয়ে ইহা শান্ত ও প্রণীত। এইভাবে প্রতিপন্ন… সংবর্তনিক বিজ্ঞান আকিঞ্চন-আয়তন স্তরে উপনীত হয়। ইহাকে প্রথম আকিঞ্চন-আয়তন সাম্প্রেয় প্রতিপদ বলা হয়।

পুনরায়, ভিক্ষুগণ, অরণ্যগত বা বৃক্ষমূলে বাসরত আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : যাহা আত্মা এবং আত্মনীয় তাহা শূন্য।

এইভাবে প্রতিপন্ন… সংবর্তনিক বিজ্ঞান আকিঞ্চন-আয়তন সমাপত্তি স্তরে উপনীত হয়। ইহাকে দ্বিতীয় আকিঞ্চন-আয়তন সাম্প্রেয় প্রতিপদ বলা হয়।

পুনরায়, ভিক্ষুগণ, আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : আমি কাহারও মধ্যে, কোথাও কিছুর মধ্যে নাই, আমারও কিছুর মধ্যে কিছুই নাই। এইভাবে প্রতিপন্ন… সংবর্তনিক বিজ্ঞান আকিঞ্চন-আয়তন স্তরে উপনীত হয়। ইহাকে তৃতীয় আকিঞ্চন-আয়তন সাম্প্রেয় প্রতিপদ বলা হয়।

পুনরায়, আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : এই সকল দৃষ্টধার্মিক… এই সকল আকিঞ্চন-আয়তন-সংজ্ঞা, সমস্ত সংজ্ঞা, সমস্ত সংজ্ঞাই সম্পূর্ণরূপে নিরুদ্ধ হয়, নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা বিষয়ে ইহা শান্ত ও প্রনীত। এইভাবে প্রতিপন্ন… সংবর্তনিক বিজ্ঞান নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন স্তরে উপনীত হয়। ইহাকে নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞা-আয়তন-সাম্প্রেয় প্রতিপদ বলা হয়।

এইরূপ উক্ত হইলে আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে বলিলেন, ভদন্ত, এখানে ভিক্ষু এইরূপ প্রতিপন্ন হন-ইহা না হইলে আমার এইরূপ হইত না, এইরূপ হইবে না, যাহা আছে, যাহা ভূত, তাহা আমি পরিত্যাগ করি। এইভাবে তিনি উপেক্ষা লাভ করেন। ভদন্ত, এই ব্যক্তি পরিনির্বাণ লাভ করেন কি? -“আনন্দ, কতিপয় ভিক্ষু পরিনির্বাণ লাভ করিতে পারেন। কিন্তু কেহ কেহ লাভ করিতে পারেন না।” -“ভদন্ত, কী হেতু কী প্রত্যয় যে কেহ কেহ পরিনির্বাণ লাভ করিতে পারেন, আবার কেহ কেহ পারেন না?”-আনন্দ, কোনো ভিক্ষু এইরূপে প্রতিপন্ন হন-ইহা না হইলে আমার এইরূপ হইত না… উপেক্ষা লাভ করেন। তিনি উপেক্ষাতে আনন্দ করেন, তাহা প্রকাশ করেন এবং তাহাতে সংলগ্ন থাকেন। যখন তিনি উপেক্ষাতে আনন্দ লাভ করেন, তাহা প্রকাশ করেন ও তাহাতে সংলগ্ন থাকেন। তাহাতে বিজ্ঞান তারপর উপাদান নিশ্রিত হয় (কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদকে দৃঢ়ভাবে গ্রহণ) আনন্দ, উপাদানযুক্ত ভিক্ষু পরিনির্বাণ লাভ করেন না।

“ভদন্ত, কোথায় আসক্তিগ্রস্ত ভিক্ষু আসক্তি উৎপাদন করে।”

“আনন্দ, নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন স্তরে।”

“বাস্তবিক, ভদন্ত, আসক্তিগ্রস্ত ভিক্ষু শ্রেষ্ঠ উপাদানে (শ্রেষ্ঠ ভাব প্রতিসন্ধি) আসক্তি উৎপাদন করেন।” “আনন্দ, আসক্তিগ্রস্ত ভিক্ষু শ্রেষ্ঠ উপাদানে আসক্তি উৎপাদন করেন। নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তনই উপাদান শ্রেষ্ঠ। আনন্দ, ভিক্ষু এইরূপে প্রতিপন্ন হয়-ইহা না হইলে আমার এইরূপ হইত না, এইরূপ হইবে না, যাহা আছে, যাহা ভূত তাহা আমি পরিত্যাগ করি, এইভাবে তিনি উপেক্ষা লাভ করেন। কিন্তু উপেক্ষাতে তিনি আনন্দ লাভ করেন না, তাহা প্রকাশ করেন না ও তাহাতে প্রতিসংলগ্ন থাকেন না। তাঁহার উপেক্ষাতে আনন্দ লাভ না করা, তাহা প্রকাশ না করা ও তাহাতে প্রতিসংলগ্ন না থাকার জন্য তাহাতে বিজ্ঞান ও তারপর উপাদান নিশ্রিত হয় না এবং উপাদান মুক্ত ভিক্ষু পরিনির্বাণ লাভ করেন।” আশ্চর্য ভদন্ত, অদ্ভুত ভদন্ত, ভগবান কর্তৃক বিভিন্ন সমাপত্তি অবলম্বন করিয়া ওঘ (অবিদ্যা, তৃষ্ণা ইত্যাদি) অতিক্রম আখ্যাত হইয়াছে। ভদন্ত, আর্য বিমোক্ষ কী?” “এখানে, আনন্দ, আর্যশ্রাবক এইরূপ প্রত্যবেক্ষণ করেন : যাহা দৃষ্টধার্মিক কাম, অনাগত কাম, দৃষ্টধার্মিক কামসংজ্ঞা, অনাগত কামসংজ্ঞা, দৃষ্টধার্মিক রূপ, অনাগত রূপ, দৃষ্টধার্মিক রূপসংজ্ঞা, অনাগত রূপসংজ্ঞা, অনিঞ্জ্য-সংজ্ঞা, আকিঞ্চন-আয়তন-সংজ্ঞা, নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তনসংজ্ঞা যাহা সৎকায় (কাম-রূপ-অরূপলোকে বর্তমান) তাহাই সৎকায়, ইহাই অমৃত (নির্বাণ) অর্থাৎ অনুৎপাদ চিত্তে বিমুক্তি। আনন্দ, এইভাবেই আমার দ্বারা অনিঞ্জ সাম্প্রেয় প্রতিপদ, আকিঞ্চন-আয়তন-সামেপ্রয় প্রতিপদ, নৈবসংজ্ঞা-না-অসংজ্ঞায়তন-সাম্প্রেয় প্রতিপদ, বিভিন্ন সমাপত্তি অবলম্বনে ওঘ অতিক্রম এবং আর্য বিমোক্ষ দেশিত হইয়াছে। আনন্দ, শ্রাবকদের মঙ্গলের জন্য শাস্তার করণীয় আমি অনুকম্পাবশত তোমাদের জন্য করিয়াছি। এইগুলি হইতেছে বৃক্ষমূল ও শূন্যাগার। আনন্দ, ধ্যান করো, প্রমাদগ্রস্ত হইও না এবং পরে অনুতাপ করিও না। ইহাই তোমাদের প্রতি আমার অনুশাসন।”

ভগবান ইহা বলিলেন। সন্তুষ্ট মনে আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।

আনিঞ্জ্য সাম্প্রেয় সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]