লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৮]

গোপক মৌদ্গল্লায়ন সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

এক সময় আনন্দ ভগবানের পরিনির্বাণের অনতিকাল পরে রাজগৃহের বেণুবনে কলন্দক-নিবাপে অবস্থান করিতেছিলেন। সেই সময় মগধের রাজা বৈদেহী পুত্র অজাতশত্রু রাজা প্রদ্যোতের (আক্রমণের) আশঙ্কায় রাজগৃহকে প্রতিসংস্কৃত (সুরক্ষিত) করাইতেছিলেন, তখন আয়ুষ্মান আনন্দ পূর্বাহ্ণ সময়ে বহির্গমনবাস পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর লইয়া ভিক্ষাচর্যার জন্য রাজগৃহে প্রবেশ করিলেন। সেই সময় আয়ুষ্মান আনন্দ এইরূপ চিন্তা করিলেন, ‘রাজগৃহে ভিক্ষান্ন সংগ্রহের পক্ষে ইহা অতীব সকাল। ইহা কেমন হয় যদি আমি গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণের কর্মস্থলে উপস্থিত হই, তখন আয়ুষ্মান আনন্দ গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণের কর্মস্থলে উপস্থিত হইলেন। গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান আনন্দকে দূর হইতে আসিতে দেখিলেন, দেখিয়া তাঁহাকে এইরূপ বলিলেন, ‘আসুন ভবদীয় আনন্দ, ভবদীয় আনন্দকে স্বাগত, দীর্ঘদিন পর ভবদীয় আনন্দ এইখানে আগমনের ব্যবস্থা করিলেন, এই প্রজ্ঞাপ্ত আসনে আপনি উপবেশন করুন।’ আয়ুষ্মান আনন্দ প্রজ্ঞাপ্ত (নির্ধারিত) আসনে উপবেশন করিলেন। গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণও অন্য একটি আসন গ্রহণ করিয়া একপার্শ্বে উপবেশন করিলেন। একপার্শ্বে উপবিষ্ট গোপক মৌদ্গল্লায়ন আয়ুষ্মান আনন্দকে এই কথা বলিলেন, যেই সকল ধর্মে সমন্বাগত হইয়া ভবদীয় গৌতম অর্হৎ সম্বুদ্ধ হইয়াছেন সেই সকল ধর্মে কি সর্বতোভাবে একজন ভিক্ষুও সমন্বাগত হইয়াছেন? “হে ব্রাহ্মণ, যেই সকল ধর্মে সমন্বাগত হইয়া ভগবান অর্হৎ ও সম্যকসম্বুদ্ধ হইয়াছেন, সেই সকল ধর্মে সর্বতোভাবে একজন ভিক্ষুও সমন্বাগত হন নাই।-হে ব্রাহ্মণ, সেই ভগবান অনুৎপন্ন মার্গের উৎপাদনকারী, অসঞ্জাত মার্গের সঞ্জাতা, অনাখ্যাত মার্গের আখ্যাতা, মার্গাজ্ঞ, মার্গাবিদ এবং মার্গকোবিদ। এইখানে (ভগবানের) শিষ্যগণ মার্গানুগামী হইয়া বিহার করিয়া শেষে পারদর্শী হন।”

গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণের সহিত আয়ুষ্মান আনন্দের এই আলোচনা বিঘ্নিত (বিপ্রকৃত) হইল। মগধের মহামাত্য বর্ষকার ব্রাহ্মণ রাজগৃহে কর্মোপলক্ষে আসিয়া গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণের কর্মস্থলে আয়ুষ্মান আনন্দের নিকট উপস্থিত হইয়া প্রীত্যালাপচ্ছলে কুশল সংবাদ জানাইলেন। প্রীতিকর কুশলবাদ বিনিময়ের পর একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট হইয়া মগধের মহামাত্য বর্ষকার ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান আনন্দকে বলিলেন, হে আনন্দ, আপনারা এখন কী কথা লইয়া সমাসীন আছেন? আপনাদের মধ্যে কী কথাই বা বিপ্রকৃত হইল (অসমাপ্ত রহিল)?

হে ব্রাহ্মণ, গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণ এইখানে আমাকে ইহা বলিতেছেন, হে আনন্দ, যেই সকল ধর্মে সমন্বাগত… একজন ভিক্ষুও সমন্বাগত হইয়াছেন? এইরূপ উক্ত হইলে আমি বলিলাম, ‘সেই সকল ধর্মে… পারদর্শী হন। গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণের সহিত এই কথা অসমাপ্ত রহিয়াছে। সেই সময় আপনি সমাগম হইয়াছেন।’

হে আনন্দ, এখন কোনো ভিক্ষু আছেন কি যিনি ভবদীয় গৌতমের দ্বারা এইভাবে প্রতিষ্ঠিত : “আমার মৃত্যুর পর এইটি প্রতিশরণ যাহার প্রতি তোমরা ধাবিত হইবে (অর্থাৎ সম্মুখীন হইবে)?”

হে ব্রাহ্মণ, একজন ভিক্ষুও নাই যিনি সেই জ্ঞাতা ও দ্রষ্টা ভগবানের অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের দ্বারা এইভাবে প্রতিষ্ঠিত : ‘আমার মৃত্যুর পর এইটি তোমাদের প্রতিশরণ যাহার প্রতি তোমরা ধাবিত হইবে।’

হে আনন্দ, একজন ভিক্ষুও কি বহু স্থবির ও সংঘের দ্বারা এইভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত; ইহাই ভগবানের মৃত্যুর পর আমাদের প্রতিশরণ তোমরা যাহার প্রতি ধাবিত হইবে?

হে ব্রাহ্মণ, একজন ভিক্ষুও বহুসংখ্যক স্থবিরও সংঘের দ্বারা সম্মানিত ও এইভাবে প্রতিষ্ঠিত নহে-“ইহাই… যাহার প্রতি তোমরা ধাবিত হইবে।” হে আনন্দ, এইরূপ অপ্রতিশরণ হওয়া সত্ত্বেও (তোমাদের) অখণ্ডতার (ঐক্যের) কারণ কী?

হে ব্রাহ্মণ, আমরা অপ্রতিশরণ নহি, আমরা সপ্রতিশরণ, ধর্ম প্রতিশরণ। হে আনন্দ, “একজন ভিক্ষুও কি ভবদীয় গৌতমের দ্বারা… ধাবিত হইবে?” এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া “হে ব্রাহ্মণ, একজন ভিক্ষুও নাই যিনি… ধাবিত হইবে” এইরূপ উত্তর দিলেন। হে আনন্দ, ‘একজন ভিক্ষুও কি বহু স্থবির ও সংঘের দ্বারা… ধাবিত হইবে, এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া ‘একজন ভিক্ষুও বহু সংখ্যক স্থবির… ধাবিত হইবে’ আপনি এইরূপ উত্তর দিলেন। হে আনন্দ, এইরূপে অপ্রতিশরণ… কারণ কী? জিজ্ঞাসিত হইয়া, আপনি ‘আমরা অপ্রতিশরণ নহি… ধর্ম প্রতিশরণ’ এইরূপ উত্তর দিলেন। হে আনন্দ, এই ভাষণের কিরূপ অর্থ দ্রষ্টব্য?

হে ব্রাহ্মণ, সেই জ্ঞাতা, দ্রষ্টা ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের দ্বারা ভিক্ষুদের জন্য শিক্ষাপদ প্রজ্ঞাপ্ত ও প্রাতিমোক্ষ উদ্দিষ্ট (নির্ধারিত) হইয়াছে। প্রত্যেক উপোসথ দিবসে আমরা যাহারা একই গ্রামক্ষেত্রকে নির্ভর করিয়া বিহার করি, সকলেই একত্র সমবেত হইয়া (পক্ষকালে) প্রত্যেকের ঘটনা বিষয়ে অম্বেষণ করি। তাহা উক্ত হইলে কোনো ভিক্ষুর যদি অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহা হইলে যথাধর্ম (নিয়মানুযায়ী), যথাশাস্ত্র (শাস্তি) বিধান করি। বাস্তবিক ভবদীয়গণ আমাদের এই বিধান করেন না। ধর্মই আমাদের বিধান করেন।

হে আনন্দ, এমন কোনো ভিক্ষু আছেন কি যাঁহাকে আপনারা সৎকার করেন, গুরুর মতো সম্মান করেন, মান্য করেন, পূজা করেন এবং সৎকার সম্মান করিয়া (তাঁহার) আশ্রয়ে বিহার করেন?

হে ব্রাহ্মণ, সেইরূপ ভিক্ষু আছেন যাঁহাকে আমরা সৎকার করি, গুরুর মতো সম্মান করি, মান্য করি, পূজা করি এবং সৎকার সম্মান করিয়া তাঁহার আশ্রয়ে বিহার করি।

হে আনন্দ, ‘একজন ভিক্ষুও কি আছেন যিনি ভবদীয় গৌতমের দ্বারা… ধাবিত হইবে? এইরূপে জিজ্ঞাসিত হইয়া আপনি, ‘একজন ভিক্ষুও নাই যিনি… ধাবিত হইবে।’ এইরূপ উত্তর দিলেন। আবার একজন ভিক্ষুও কি বহু সংখ্যক স্থবিরও সংঘের দ্বারা… ধাবিত হইবে? এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া আপনি, ‘একজন ভিক্ষুও নাই… ধাবিত হইবে’, এইরূপ উত্তর দিলেন। হে আনন্দ, একজন ভিক্ষুও কি আছেন যাঁহাকে আপনারা সৎকার… বিহার করেন? এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া আপনি ‘একজন ভিক্ষু আছেন যাঁহাকে আমরা সৎকার… বিহারকারী’ এইরূপ উত্তর দিলেন। হে আনন্দ, এই ভাষণের অর্থ কিরূপ দ্রষ্টব্য?

হে ব্রাহ্মণ, জ্ঞাতা, দ্রষ্টা ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের দ্বারা দশ প্রসাদনীয় ধর্ম আখ্যাত হইয়াছে। আমাদের যাঁহার মধ্যে এই ধর্মগুলি বিদ্যমান, তাঁহাকে আমরা সৎকার করি… আশ্রয়ে বিহার করি। দশটি (ধর্ম) কী কী? এইখানে, হে ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু শীলবান হয়, প্রাতিমোক্ষ সংযম… শিক্ষাপদগুলি গ্রহণ করিয়া শিক্ষালাভ করে, বহুশ্রুত, শ্রুতিধর (যিনি শ্রুতির বা গৃহীত বিদ্যার আধারস্বরূপ-প-সূ, বড়ুয়া-২৩২), শ্রুতিসঞ্চয়ী (যাঁহার দ্বারা গৃহীত ধর্মোপদেশ সুনিহিত, সুসঞ্চিত, সুগৃহিত হয়-প-সূ,) হন। যে-সকল (বুদ্ধবর্ণিত) ধর্মের আদিতে কল্যাণ, মধ্যে কল্যাণ ও অন্তে কল্যাণ, যে-সকল ধর্ম সার্থক, সব্যঞ্জন, কেবল পরিপূর্ণ ও পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য প্রকাশিত করে, এই যে ধর্মগুলি (ভিক্ষুর দ্বারা) বহুবার শ্রুত, উত্তমরূপে ধৃত, বচনের দ্বারা সুপরিচিত, মননের দ্বারা অনুবীক্ষিত ও দৃষ্টি দ্বারা সুপ্রতিবিদ্ধ (প্রজ্ঞার দ্বারা সুপ্রবিষ্ট) হয়। তিনি চীবর, পিণ্ডপাত (ভিক্ষান্ন), শয়নাসন, রোগের প্রতিকার ভৈষজ্য প্রভৃতি প্রয়োজনীয় জীবনোপকরণে সন্তুষ্ট। সুস্পষ্ট চিত্তে ও দৃষ্টধর্মের (ইহ-জীবনের) সুখবিহারে ইহ-জীবনের সুখবিহারস্বরূপ চারিধ্যানের অনায়াসলাভী, যথেচ্ছলাভী ও অপরিমেয়লাভী হন এবং নানা প্রকার অলৌকিক ক্ষমতা অনুভব করেন। (তিনি) এক হইয়া বহু, বহু হইয়া এক হন, (ইচ্ছাক্রমে) আবির্ভাব তিরোভাব সাধন করিতে পারেন, প্রাচীর-প্রাকার ও পর্বত স্পর্শ না করিয়া অতিক্রম করিতে পারেন, আকাশে উড্ডীয়মান হইবার মতো পৃথিবীতে (স্থলে) উঠা-নামা করিতে পারেন, উদকে (জলে) ডুবা-উঠার মতো উদকে পদব্রজে গমন করিতে পারেন, স্থলে গমনের মতো আকাশেও পর্যঙ্কবদ্ধ হইয়া পক্ষীদের মতো চলিতে পারেন, মহাঋদ্ধিসম্পন্ন, মহাশক্তিসম্পন্ন চন্দ্রসূর্যকে হস্ত দ্বারা স্পর্শ ও পরিমর্দন করিতে (হাত বুলাইতে) পারেন, ব্রহ্মলোক পর্যন্ত স্ববশে আনিতে পারেন, দিব্য, পরিশুদ্ধ ও অতিমানবীয় শ্রোত্রধাতু (কর্ণ) দ্বারা উভয় শব্দ শুনিতে পারেন, যাহা দিব্য ও যাহা মানুষীয়, যাহা দূরে ও যাহা নিকটে, (তিনি) স্বচিত্তে অপর ব্যক্তির চিত্তের অবস্থা প্রকৃষ্টরূপে জানিতে পারেন, চিত্ত সরাগ হইলে সরাগ, বীতরাগ হইলে বীতরাগ, সদ্বেষ হইলে সদ্বেষ, বীতদ্বেষ হইলে বীতদ্বেষ, সমোহ হইলে সমোহ, বীতমোহ হইলে বীতমোহ, সংক্ষিপ্ত (বিক্ষিপ্তের বিপরীত) হইলে সংক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত হইলে বিক্ষিপ্ত, মহদ্গত (মহৎ অবস্থা প্রাপ্ত) হইলে মহদ্গত, অমহদ্গত হইলে অমহদ্গত, স-উত্তর (যাহা অনুত্তরের বিপরীত) হইলে স-উত্তর, অনুত্তর হইলে অনুত্তর, সমাহিত হইলে সমাহিত, অসমাহিত হইলে অসমাহিত, বিমুক্ত হইলে বিমুক্ত, অবিমুক্ত হইলে অবিমুক্ত। (তিনি) বহু প্রকারে বহুবিধ পূর্বজন্ম স্মরণ করিতে পারেন। যথা : এক জন্ম, দুই জন্ম, তিন জন্ম… । (তিনি) বিশুদ্ধ ও অতিমানবীয় দিব্যচক্ষু দ্বারা অপর সত্ত্বদের (জীবগণকে) দেখিতে পারেন, তাহারা চ্যুত হইতেছে, পুনরায় উৎপন্ন হইতেছে, হীন, উৎকৃষ্ট, সুবর্ণ, দুবর্ণ, সুগত, দুর্গত, কর্মানুযায়ী জীবগণ জন্মগ্রহণ করিতেছে জানিতে পারেন। (তিনি) আসবক্ষয়ে অনাসব হইয়া দৃষ্টধর্মে স্বয়ং অভিজ্ঞা দ্বারা চেতোবিমুক্তি, প্রজ্ঞাবিমুক্তি সাক্ষাৎ করিয়া (উপলব্ধি করিয়া) বিহার করেন। হে ব্রাহ্মণ, এই দশটি প্রসাদনীয় ধর্মের জ্ঞাতা দ্রষ্টা… আখ্যাত হয়েছে… আশ্রয়ে বিহার করি।

এইরূপ উক্ত হইলে মগধের মহামাত্য ব্রাহ্মণ বর্ষকার সেনাপতি উপনন্দকে বলিলেন, আপনি কী মনে করেন? যাঁহারা সৎকার যোগ্য তাহাদের সৎকার, গুরুস্বরূপকে (শ্রদ্ধাভাজন) শ্রদ্ধাজ্ঞাপন, মাননীয়কে মান্য করা, পূজনীয়কে পূজা করা উচিত? এই ভবদীয়গণ অবশ্যই সৎকারের যোগ্যকে সৎকার… পূজনীয়কে পূজা করেন। যদি তাঁহারা সৎকারযোগ্যকে সৎকার… পূজনীয়কে পূজা না করিতেন, তাহা হইলে এই ভবদীয়গণ কাহার আশ্রয়ে বাস করিয়া বিহার করিতেন?

তখন মগধের মহামাত্য বর্ষকার ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান আনন্দকে এইরূপ বলিলেন, ভবদীয় আনন্দ, এখন কোথায় বাস করিতেছেন? হে ব্রাহ্মণ, আমি এখন বেণুবনে বাস করিতেছি। হে আনন্দ, বেণুবন কি রমণীয়, শব্দহীন ঘোষরহিত (গোলমালবিহীন) ও জন-বাতবিরল, মানুষের গুপ্ত মন্ত্রণাযোগ্য ও ধ্যান সমাধির উপযোগী? অবশ্যই, হে ব্রাহ্মণ, বেণুবন রমণীয়… উপযোগী যাহা আপনাদের মত রক্ষকের উপযুক্ত। অবশ্যই, হে আনন্দ, বেণুবন… উপযোগী যাহা ভবদীয়গণের মত ধ্যানী ও ধ্যানশীলদের… উপযুক্ত। (প্রকৃতই) ভবদীয়গণ ধ্যানী ও ধ্যানশীল। হে আনন্দ, এক সময় ভবদীয় গৌতম বৈশালীর মহাবনে কূটাগারশালায় বাস করিতেছিলেন। সেই সময় আমি মহাবনে কূটাগারশালায় ভবদীয় গৌতমের নিকট উপস্থিত হই। তথায় তিনি বহুভাবে ধ্যানের কথা বলিলেন। ভবদীয় গৌতম ধ্যানী ও ধ্যানশীল ছিলেন। তিনি সমস্ত ধ্যানের বিবরণ দিলেন। হে ব্রাহ্মণ, ভগবান সমস্ত ধ্যান বর্ণনা করেন নাই, ইহাও ঠিক নহে যে ভগবান সমস্ত ধ্যান বর্ণনা করেন নাই। হে ব্রাহ্মণ, ইহা কিরূপ যে ভগবান ধ্যান বর্ণনা করেন নাই? হে ব্রাহ্মণ, কোনো কোনো লোক কামরাগাভিভূত, কামরাগ পরিবৃত চিত্তে বসবাস করে। এবং সে উৎপন্ন কামরাগ হইতে নিঃসরণ উপায় যথাভূত জানে না, কামরাগ পরিত্যাগ করিয়া ধ্যান করে, প্রধ্যান করে, নিধ্যান করে, অভিধ্যান করে। (সে) ব্যাপাদাভিভূত চিত্তে ব্যাপাদ পরিবৃত চিত্তে বিহার করে এবং উৎপন্ন ব্যাপাদ হইতে নিঃসরণ উপায় যথাভূত জানে না। সে ব্যাপাদকে দূরীভূত করিয়া ধ্যান করে… অভিধ্যান করে। স্ত্যানমিদ্ধ, ঔদ্ধত্য-কৌকৃত্য, বিচিকিৎসা (সন্দেহ) সম্বন্ধেও এইরূপ। হে ব্রাহ্মণ, ভগবান (বুদ্ধ) এইভাবে ধ্যান বর্ণনা করেন নাই। কীভাবে, ব্রাহ্মণ, ভগবান ধ্যান বর্ণনা করিয়াছেন? এইখানে, হে ব্রাহ্মণ, ভিক্ষু কাম ও অকুশলধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া সবিতর্ক সবিচার বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিহার করেন, বিতর্ক বিচার উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী চিত্তের একীভাব আনয়নকারী বিতর্কাতীত সমাধিজ প্রীতিসুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান, তৃতীয় ধ্যান, চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিহার করেন। এইরূপে ব্রাহ্মণ। ভগবান ধ্যান বর্ণনা করিয়াছেন।

হে আনন্দ, ভবদীয় গৌতম নিন্দনীয় ধ্যানের নিন্দা করিয়াছেন, প্রশংসনীয়ের প্রশংসা করিয়াছেন। আচ্ছা এখন আমরা যাইব। আমাদের বহুকৃত্য বহু করণীয় আছে। ব্রাহ্মণ, আপনি যাহা কালোপযোগী মনে করেন।

অতঃপর মগধের মহামাত্য বর্ষকার ব্রাহ্মণ আয়ুষ্মান আনন্দের ভাষণকে অভিনন্দিত ও অনুমোদন করিয়া আসন হইতে উঠিয়া চলিয়া গেলেন। তখন গোপক মৌদ্গল্লায়ন ব্রাহ্মণ মগধের মহামাত্য বর্ষকার ব্রাহ্মণ চলিয়া যাইবার অনতিকাল পরে আয়ুষ্মান আনন্দকে বলিলেন, আমরা ভবদীয় আনন্দকে যাহা জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম, তাহা ব্যাখ্যা করেন নাই।

হে ব্রাহ্মণ, আমরা কি বলি নাই যে ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ, ভগবান যে-সকল গুণের দ্বারা সর্বতোভাবে সমন্বাগত একজন ভিক্ষুও… সমন্বাগত হন নাই। ভগবান অনুৎপন্ন মার্গের উৎপাদনকারী… পারদর্শী হন।

গোপক মৌদ্গল্লায়ন সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]