আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। ভগবান সমবেত ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ’। ‘হাঁ ভদন্ত’ বলিয়া ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে সম্মতিজ্ঞাপন করিলেন।
২. হে ভিক্ষুগণ, এখানেই (এই শাসনেই) প্রথম শ্রমণ, দ্বিতীয় শ্রমণ, তৃতীয় শ্রমণ ও চতুর্থ শ্রমণ-শূন্য পরপ্রবাদ, পরপ্রবাদে (অন্যতীর্থে) এই চারিজাতীয় শ্রমণ নাই, অপর চারিজাতীয় শ্রমণও নাই। তোমরা এইরূপেই যথার্থ সিংহনাদ নিনাদিত কর। ইহা সম্ভব যে, অন্যতীর্থিক (অপর সম্প্রদায়ভুক্ত) পরিব্রাজকগণ বলিবেন, ‘ভদ্রগণের এমন কী আশ্বাস, কী বল আছে, যাহা নিজের মধ্যে আছে দেখিয়া আপনারা এমন কথা বলিতেছেন : এখানেই প্রথম শ্রমণ, দ্বিতীয় শ্রমণ, তৃতীয় শ্রমণ ও চতুর্থ শ্রমণ-শূন্য পরপ্রবাদ, পরপ্রবাদে এই চারিজাতীয় শ্রমণ নাই, অপর চারিজাতীয় শ্রমণও নাই।’ হে ভিক্ষুগণ, যাঁহারা ইহা বলিবেন, সেই অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণকে বলিতে হইবে : ‘বন্ধুগণ, আমাদের নিকট চারি ধর্ম আছে, যাহা ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ জানিয়া-দেখিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তাহা আমাদের মধ্যে আছে দেখিয়াই আমরা এ কথা বলিতেছি : এখানেই প্রথম শ্রমণ, দ্বিতীয় শ্রমণ, তৃতীয় শ্রমণ ও চতুর্থ শ্রমণ-শূন্য পরপ্রবাদ, পরপ্রবাদে এই চারিজাতীয় শ্রমণ নাই, অপর চারিজাতীয় শ্রমণও নাই। চারি ধর্ম কী কী? বন্ধুগণ, আমাদের আছে শাস্তার প্রতি চিত্তপ্রসাদ, ধর্মে চিত্তপ্রসাদ, শীলাচরণে পরিপূর্ণকারিতা এবং গৃহস্থ ও প্রব্রজিত সহধর্মিগণ আমাদের নিকট প্রিয় ও মনোজ্ঞ। এই চারি ধর্মই ভগবান অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ জানিয়া-দেখিয়া ব্যাখ্যা করিয়াছেন, যাহা আমাদের মধ্যে আছে দেখিয়াই আমরা এ কথা বলিতেছি : এখানেই প্রথম শ্রমণ, দ্বিতীয় শ্রমণ ইত্যাদি।’
হে ভিক্ষুগণ, ইহা সম্ভব যে, অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণ বলিবেন, “বন্ধুগণ, আমাদের চিত্তপ্রসাদ আছে শাস্তার প্রতি যিনি আমাদের শাস্তা (গুরু), চিত্তপ্রসাদ আছে ধর্মে যাহা আমাদের ধর্ম, পরিপূর্ণকারিতা আছে শীলাচরণে যাহা আমাদের শীলাচরণ, আমাদেরও আছে প্রিয় ও মনোজ্ঞ গৃহস্থ ও প্রব্রজিত সহধর্মী। বন্ধুগণ, এক্ষেত্রে আপনাদের ও আমাদের মধ্যে ইতরবিশেষ কী, অভিপ্রায়েও তারতম্য কী, ‘নানাকরণ’ (পৃথক করিবার উপায়ই) বা কী?” যাঁহারা এ কথা বলিবেন, তাঁহাদিগকে বলিতে হইবে : ‘বন্ধুগণ, নিষ্ঠা কি এক, না বহু?’ যথার্থ উত্তর প্রদান করিলে, তাঁহারা বলিবেন, ‘নিষ্ঠা এক, বহু নহে।’ ‘সেই নিষ্ঠা কাহার, যিনি সরাগ তাঁহার, না যিনি বীতরাগ তাঁহার? যিনি সদ্বেষ তাঁহার, না যিনি বীতদ্বেষ তাঁহার? যিনি সমোহ তাঁহার, না যিনি বীতমোহ তাঁহার? যিনি সতৃষ্ণ তাঁহার, না যিনি বীততৃষ্ণ তাঁহার? যিনি স-উপাদান (আসক্ত) তাঁহার না যিনি নিরুপাদান (অনাসক্ত) তাঁহার? যিনি অবিদ্বান তাঁহার, না যিনি বিদ্বান তাঁহার? যিনি অনুরুদ্ধ-প্রতিরুদ্ধ (রাগানুরক্ত-ক্রোধাভিভূত) তাঁহার, না যিনি অননুরুদ্ধ-অপ্রতিবিরুদ্ধ (অননুরক্ত-অক্রোধাভিভূত) তাঁহার? যিনি প্রপঞ্চারাম প্রপঞ্চরত তাঁহার, না যিনি প্রপঞ্চবিরত নিষ্প্রপঞ্চ তাঁহার?’ যথার্থ উত্তর প্রদান করিলে, তাঁহারা বলিবেন : ‘বীতরাগের নিষ্ঠা, সরাগের নহে; বীতদ্বেষের নিষ্ঠা, সদ্বেষের নহে; বীতমোহের নিষ্ঠা, সমোহের নহে; অনাসক্তের নিষ্ঠা, আসক্তের নহে; বিদ্বানের নিষ্ঠা, অবিদ্বানের নহে; অননুরক্ত অনভিভূতের নিষ্ঠা, অনুরক্ত ও ক্রোধাভিভূতের নহে; প্রপঞ্চবিরত নিষ্প্রপঞ্চের নিষ্ঠা, প্রপঞ্চরতের নহে।’
৩. হে ভিক্ষুগণ, দ্বিবিধ মিথ্যাদৃষ্টি-ভবদৃষ্টি ও বিভবদৃষ্টি। যেকোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ ভবদৃষ্টি-লীন, ভবদৃষ্টি-উপগত, ভবদৃষ্টি-নিবিষ্ট, তিনি বিভবদৃষ্টিবিরোধী। [পক্ষান্তরে] যেকোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ বিভবদৃষ্টি-লীন, বিভবদৃষ্টি-উপগত, বিভবদৃষ্টিনিবিষ্ট তিনি ভবদৃষ্টি-বিরোধী। হে ভিক্ষুগণ, শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ যিনি এই দ্বিবিধ মিথ্যাদৃষ্টির সমুদয় (উদ্ভব), অস্তগমন, আস্বাদ ও আদীনব (দুঃখ-পরিণাম) এবং তাহা হইতে নিঃসরণ (মুক্তি) কী তাহা যথার্থ জানেন না, আমি বলি তিনি সরাগ, সদ্বেষ, সমোহ, সতৃষ্ণ, স-উপাদান, অবিদ্বান, রাগানুরক্ত, ক্রোধাভিভূত, প্রপঞ্চরত, প্রপঞ্চগত, তিনি জন্ম, জরামরণ, শোক, পরিদেবন, দুঃখ, দৌর্মনস্য ও হতাশা হইতে, (সংক্ষেপে) দুঃখ হইতে বিমুক্ত হন না। হে ভিক্ষুগণ, শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ যিনি উক্ত দ্বিবিধ দৃষ্টির সমুদয় ও অস্তগমন, আস্বাদ ও আদীনব, এবং তাহা হইতে নিঃসরণ কী যথার্থ জানেন, আমি বলি তিনি বীতরাগ, বীতদ্বেষ, বীতমোহ, বীততৃষ্ণ, অনাসক্ত, বিদ্বান, অননুরক্ত, অনভিভূত, প্রপঞ্চবিরত, নিষ্প্রপঞ্চ, তিনি জন্ম, জরামরণ, শোক-পরিদেবন, দুঃখ-দৌর্মনস্য ও হতাশা হইতে, (সংক্ষেপে) দুঃখ হইতে বিমুক্ত হন।
৪. হে ভিক্ষুগণ, উপাদান (আসক্তি) চারি প্রকার। কী কী? কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত এবং আত্মবাদ। হে ভিক্ষুগণ, এমন কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা মনে করেন যে, তাঁহারা সর্ব-উপাদান, সর্ব-আসক্তি পরিবর্জনের উপায় বিদিত আছেন, অথচ সম্পূর্ণভাবে সর্ব-উপাদান, সর্ব-আসক্তি পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন না। কাম-উপাদান পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করিলে দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন না। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহারা প্রথম বিষয়টি জানেন, অপর তিনটি বিষয় যথার্থ জানেন না। কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছে যাঁহারা সর্ব-উপাদান পরিবর্জনের উপায় বিদিত আছেন বলিয়া মনে করেন, অথচ সম্পূর্ণরূপে সর্ব-উপাদান পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন না। তাঁহারা কাম-উপাদান ও দৃষ্টি-উপাদান পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন, কিন্তু শীলব্রত ও আত্মবাদ পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন না। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহারা প্রথম দুইটি বিষয় জানেন, অপর দুইটি বিষয় যথার্থ জানেন না। কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা সর্ব-উপাদান পরিবর্জনের উপায় বিদিত আছেন মনে করেন, অথচ সম্পূর্ণভাবে সর্ব-উপাদান পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন না। তাহারা কাম-উপাদান, দৃষ্টি-উপাদান ও শীলব্রত পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন, কিন্তু আত্মবাদ পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন না। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহারা প্রথম তিনটি বিষয় জানেন, চতুর্থ বিষয়টি যথার্থ জানেন না। হে ভিক্ষুগণ, এহেন ধর্মবিনয়ে শাস্তার প্রতি যে চিত্তপ্রসাদ তাহা সম্যক-গত (সম্পূর্ণ) হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না, ধর্মের প্রতি যে চিত্তপ্রসাদ, শীলাচরণে যে পরিপূর্ণকারিতা, সহধর্মিগণের প্রতি যে প্রিয়ভাব ও মনোজ্ঞতা তাহা সম্যক-গত (সম্পূর্ণ) হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয় না। ইহার কারণ কী? যেহেতু যে-ধর্মবিনয় দুর্ব্যাখ্যাত দুর্জ্ঞাপিত, যাহা লক্ষ্যাভিমুখী নহে, যাহা উপশমের প্রতি সংবর্তিত হয় না, যাহা সম্যকসম্বুদ্ধ দ্বারা প্রবেদিত (প্রবর্তিত) হয় না, তাহাতে এইরূপই হইয়া থাকে।
৫. হে ভিক্ষুগণ, তথাগত অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ সর্ব-উপাদান পরিবর্জনের উপায় বিদিত আছেন বলিয়া সম্পূর্ণরূপে তাহা পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন, কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ, এই চারি উপাদান পরিবর্জনের উপায় নির্দেশ করেন। হে ভিক্ষুগণ, এহেন ধর্মবিনয়ে শাস্তার প্রতি যে চিত্তপ্রসাদ তাহা সম্যক-গত, ধর্মের প্রতি যে চিত্তপ্রসাদ তাহা সম্যক-গত, এবং সহধর্মিগণের প্রতি যে প্রিয়ভাব ও মনোজ্ঞতা তাহা সম্যক-গত (সম্পূর্ণ) হয়। ইহার কারণ কী ? যেহেতু যে-ধর্মবিনয় সু-আখ্যাত, সুপ্রবেদিত, যাহা লক্ষ্যাভিমুখী, যাহা উপশমের প্রতি সংবর্তিত, যাহা সম্যকসম্বুদ্ধ দ্বারা প্রবেদিত (প্রবর্তিত) হয়, তাহাতে এইরূপই হইয়া থাকে।
৬. হে ভিক্ষুগণ, এই চারি উপাদানের নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে তাহাদের জন্ম, কিসেই বা তাহাদের সম্ভব হয়? এই চারি উপাদানের তৃষ্ণাই নিদান, তৃষ্ণা হইতে তাহাদের সমুদয় (সমুদ্ভব), তৃষ্ণাতেই তাহাদের জন্ম, তৃষ্ণা হইতেই তাহাদের সম্ভব হয়। এই তৃষ্ণার নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে তৃষ্ণার জন্ম ও সম্ভব হয়? তৃষ্ণার নিদান বেদনা, বেদনা হইতে তৃষ্ণার সমুদয়, বেদনায় তৃষ্ণার জন্ম, বেদনায় তৃষ্ণার সম্ভব হয়। এই বেদনার নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে বেদনার জন্ম, কিসে বেদনার সম্ভব হয়? বেদনার নিদান স্পর্শ, স্পর্শ হইতে বেদনার সমুদয়, স্পর্শে বেদনার জন্ম, স্পর্শে বেদনার সম্ভব হয়। স্পর্শের নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে স্পর্শের জন্ম, কিসে বেদনার সম্ভব? স্পর্শের নিদান ষড়ায়তন, ষড়ায়তন হইতে স্পর্শের সমুদয়, ষড়ায়তনেই স্পর্শের জন্ম ও সম্ভব হয়। এই ষড়ায়তনের নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে ষড়ায়তনের জন্ম, কিসেই বা ইহার সম্ভব হয়? ষড়ায়তনের নিদান নামরূপ, নামরূপ হইতে ষড়ায়তনের সমুদয়, নামরূপেই ইহার জন্ম ও সম্ভব হয়। এই নামরূপের নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে নামরূপের জন্ম ও সম্ভব হয়? নামরূপের নিদান বিজ্ঞান, বিজ্ঞান হইতে নামরূপের সমুদয়, বিজ্ঞানেই নামরূপের জন্ম ও সম্ভব হয়। এই বিজ্ঞানের নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে বিজ্ঞানের জন্ম ও সম্ভব হয়? বিজ্ঞানের নিদান সংস্কার, সংস্কার হইতেই বিজ্ঞানের সমুদয়, সংস্কারেই বিজ্ঞানের জন্ম ও সম্ভব হয়। এই সংস্কারের নিদান কী, সমুদয় কী, কিসে সংস্কারের জন্ম ও সম্ভব হয়? সংস্কারের নিদান অবিদ্যা, অবিদ্যা হইতেই সংস্কারের সমুদয়, অবিদ্যায় সংস্কারের জন্ম ও সম্ভব হয়। যেহেতু, হে ভিক্ষুগণ, ভিক্ষুর অবিদ্যা প্রহীন এবং বিদ্যা উৎপন্ন হয়, অবিদ্যার পরিত্যাগে এবং বিদ্যার উৎপত্তিতে ভিক্ষু কাম, দৃষ্টি, শীলব্রত ও আত্মবাদ উপাদেয়রূপে গ্রহণ করেন না, উপাদেয়রূপে গ্রহণ না করিবার ফলে তাঁহার পরিত্রাস হয় না, পরিত্রাস না হইবার ফলে তিনি স্বয়ং পরিনির্বৃত হন, জন্মবীজ ক্ষীণ হয়, ব্রহ্মচর্যব্রত উদযাপিত হয়, করণীয় কার্য কৃত হয়, অতঃপর অত্র আর আগমন হইবে না বলিয়া তিনি প্রকৃষ্টরূপে জানিতে পারেন।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ তাহা প্রসন্নমনে শ্রবণ করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
ক্ষুদ্রসিংহনাদ-সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৫]
English
Việt Ngữ