আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
এক সময় ভগবান রাজগৃহ সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন তপোদারামে। তখন আয়ুষ্মান সমৃদ্ধি রাত্রির শেষের দিকে প্রত্যুষে উঠিয়া গাত্র পরিষেক করিতে তপোদায় উপস্থিত হইলেন। তপোদায় গাত্র পরিষেকান্তে উঠিয়া গাত্র শুকাইবার জন্য এক চীবরে দাঁড়াইয়া রহিলেন। রাত্রি যখন অতিক্রান্ত সেই সময় অন্য একজন দেবতা তাঁহার জ্যোতিতে সমগ্র তপোদা উদ্ভাসিত করিয়া আয়ুষ্মান সমৃদ্ধির নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া একান্তে দাঁড়াইলেন এবং একান্তে দাঁড়াইয়া আয়ুষ্মান সমৃদ্ধিকে বলিলেন, ‘ভিক্ষুমহোদয়, আপনি কি ভদ্রকরক্তের (ধার্মিকের) উদ্দেশ ও বিভঙ্গ স্মরণ করিতে পারেন?’
বন্ধু, আমি ভদ্রকরক্তের উদ্দেশ… স্মরণ করিতে পারি না, কিন্তু আপনি কি তাহা পারেন?
‘ভিক্ষু মহোদয়, আমি তাহা পারি না। আপনি কি ভদ্রকরক্তের গাথা স্মরণ করিতে পারেন?’
বন্ধু, আমি ভদ্রকরক্তের গাথা স্মরণ করিতে পারি না, আপনি পারেন কি? শিক্ষা করুন, তাহা আয়ত্ত করুন, স্মরণ করুন, কারণ ইহা অর্থসংহিত ও ব্রহ্মচর্যের আদিভূত নিদান।’
দেবতা ইহা বিবৃত করিলেন, বিবৃত করিয়া তথা হইতে অন্তর্ধান করিলেন। অতঃপর আয়ুষ্মান সমৃদ্ধি রাত্রির অবসানে ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান সমৃদ্ধি ভগবানকে বলিলেন, ‘আমি রাত্রির শেষের দিকে… দেবতা অন্তর্ধান করিলেন। সাধু ভদন্ত, ভগবান, আমাকে ভদ্রকরক্তের উদ্দেশ ও বিভঙ্গ দেশনা করুন।’
‘তাহা হইলে, ভিক্ষু, মনোযোগ-সহকারে শ্রবণ করো, আমি ভাষণ দিব।’
‘হ্যাঁ ভদন্ত’ বলিয়া আয়ুষ্মান সমৃদ্ধি ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন।
ভগবান বলিলেন :
অতীত অননুসরণীয়… সুবিখ্যাত।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন, বিবৃত করিয়া সুগত আসন হইতে উঠিয়া বিহারে প্রবেশ করিলেন।
ভগবান চলিয়া যাইবার পরক্ষণেই ভিক্ষুগণ চিন্তা করিলেন, ‘বন্ধুগণ, ভগবান সংক্ষিপ্তভাবে উদ্দেশ বর্ণনা করিয়া ও বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ না করিয়া আসন হইতে উঠিয়া এখন বিহারে প্রবেশ করিয়াছেন।
অতীত অননুসরণীয়… সুবিখ্যাত।
ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত উদ্দেশের অর্থকে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করিবেন যাহা বিশ্লেষণ করা হয় নাই?
তখন সেই ভিক্ষুদের মনে হইল, এই আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন যিনি শাস্তা কর্তৃক প্রশংসিত এবং বিজ্ঞ ব্রহ্মচারীদের শ্রদ্ধেয়, তিনিই ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত উদ্দেশের যাহা পূর্বে বিশ্লেষণ করা নাই তাহা বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করিতে সক্ষম। চলুন আমরা আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নের নিকট উপস্থিত হইয়া ইহার অর্থ জিজ্ঞাসা করি। তখন ভিক্ষুগণ আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নের নিকট উপস্থিত হইয়া আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নের সহিত প্রীত্যালাপ ও কুশল প্রশ্নাদি বিনিময় করিয়া একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট ভিক্ষুগণ আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নকে বলিলেন, বন্ধু কাত্যায়ন, ভগবান সংক্ষিপ্তভাবে উদ্দেশ বর্ণনা করিয়া উহার অর্থ বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ না করিয়া আসন হইতে উঠিয়া বিহারে প্রবেশ করিয়াছেন।
অতীত অননুসরণীয়… সুবিখ্যাত।
“বন্ধু কাত্যায়ন, ভগবান চলিয়া যাইবার পরক্ষণেই আমাদের মনে হইল… জিজ্ঞাসা করি। আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন, বিশ্লেষণ করুন।”
যেমন বন্ধুগণ, কোনো সারার্থী, সারগবেষী পুরুষ বড় সারবান বৃক্ষের অন্বেষণ করিতে করিতে মূল অতিক্রম করিয়া যায় এবং মনে করো শাখা প্রশাখায় সার অন্বেষণ করিতে হইবে।’ আয়ুষ্মানগণ শাস্তার সম্মুখীভূত হইলেও ভগবানকে এড়াইয়া “আমাকে প্রতিজিজ্ঞাসা করা উচিত” বলিয়া মনে করিয়াছেন। বন্ধুগণ, ভগবান জ্ঞাতব্য বিষয় জানেন, দর্শনীয় বিষয় দর্শন করেন, চক্ষুভূত, জ্ঞানভূত, ধর্মভূত, ব্রহ্মভূত, বক্তা, প্রবক্তা, অর্থ নির্ণয়কারী, অমৃতদাতা, ধর্মস্বামী তথাগত। ভগবানকে ইহার অর্থ প্রতিজিজ্ঞাসা করিবার ইহাই উপযুক্ত সময়। ভগবান যাহা ব্যাখ্যা করিবেন আপনারা তাহা ধারণ করিবেন।
বন্ধু কাত্যায়ন, ভগবান জ্ঞাতব্যকে জানেন… ভগবানকে ইহার অর্থ আমাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত। কিন্তু আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন শাস্তা কর্তৃক প্রশংসিত… বিশ্লেষণ করিতে সমর্থ। আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন ইহাকে গুরুস্থানীয় মনে না করিয়া বিশ্লেষণ করুন।
তাহা হইলে বন্ধুগণ… বিহারে প্রবেশ করিলেন।
অতীত অননুসরণীয়… সুবিখ্যাত।
বন্ধুগণ, ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে… বিস্তৃতভাবে অর্থ জানি।
সেই লোক মনে করে সুদীর্ঘ অতীতে ‘আমার এই চক্ষু ছিল’ আমার এইরূপ ছিল, তাহার বিজ্ঞান ছন্দরাগের দ্বারা প্রতিবদ্ধ এবং প্রতিবদ্ধতা-হেতু সে তাহাতে আনন্দ লাভ করে, আনন্দ লাভ করিতে করিতে অতীতকে অনুসরণ করে। শ্রোত্র এবং শব্দ, ঘ্রাণ এবং গন্ধ, জিহ্বা ও রস, কায় ও স্পর্শ, মন ও ধর্ম সম্পর্কেও এইরূপ। বন্ধুগণ, এইরূপে লোক কোনো অতীতকে অনুসরণ করে।
বন্ধুগণ, কিরূপে লোকে অতীতকে অনুসরণ করে না? সে মনে করে “সুদীর্ঘ অতীতে আমার এই চক্ষু ছিল, আমার এইরূপ ছিল” কিন্তু তাহার বিজ্ঞান ছন্দরাগ দ্বারা প্রতিবদ্ধ নহে বলিয়া সে তাহাতে আনন্দ লাভ করে না এবং আনন্দ লাভ করে না বলিয়া অতীতকে অনুসরণ করে না। শ্রোত্র ও শব্দ, ঘ্রাণ ও গন্ধ, জিহ্বা ও রস, কায় ও স্পর্শ, মন ও ধর্ম সম্পর্কেও এইরূপ। এইরূপে, বন্ধুগণ, সে অতীতকে অনুসরণ করে না।
বন্ধুগণ, কিরূপে লোক অনাগতকে প্রত্যাশা করে? সে মনে করে ‘সুদীর্ঘ অনাগতে আমার চক্ষু (দৃষ্টি) এবং রূপ এইরূপ হউক’ ইহা ভাবিয়া অপ্রতিলব্ধকে লাভ করিবার জন্য চিত্তের প্রণিধান করে, চিত্তের প্রণিধান-হেতু তাহাতে আনন্দ লাভ করে এবং আনন্দ লাভ করিবার সময় অনাগতকে প্রত্যাশা করে। শ্রোত্র ও শব্দ… মন ও ধর্ম সম্পর্কেও এইরূপ। এইরূপে অনাগতকে প্রত্যাশা করে।
বন্ধুগণ, কিরূপে লোক অনাগতকে প্রত্যাশা করে না? সে মনে করে… অনাগতকে প্রত্যাশা করে না।
বন্ধুগণ, কিরূপে লোক প্রত্যুৎপন্ন ধর্মে আকর্ষিত হয়? বন্ধুগণ, এই যে চক্ষু এবং রূপ উভয়ই প্রত্যুৎপন্ন এবং সে বিজ্ঞান প্রত্যুৎপন্ন ছন্দরাগ দ্বারা প্রতিবদ্ধ, বিজ্ঞানে ছন্দরাগে প্রতিবদ্ধতা-হেতু সে তাহাতে আনন্দ লাভ করে এবং আনন্দ লাভ করিতে করিতে প্রত্যুৎপন্ন ধর্মে আকর্ষিত হয়। শ্রোত্র ও শব্দ… মন ও ধর্ম সম্পর্কেও এইরূপ। বন্ধুগণ, এইরূপে সে প্রত্যুৎপন্ন ধর্মে আকর্ষিত হয়।
বন্ধুগণ, কিরূপে লোক প্রত্যুৎপন্ন ধর্মে আকর্ষিত হয় না? সে মনে করে… আনন্দ লাভ করে না। এইরূপে… আনন্দ লাভ করে না। এইরূপে… আকর্ষিত হয় না।
বন্ধুগণ, ভগবান সে উদ্দেশ সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ না করিয়া আসন হইতে উঠিয়া বিহারে প্রবেশ করিয়াছেন, তাহা হইতেছে:
অতীত অননুসরণীয়… সুবিখ্যাত।
ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত বিস্তৃতভাবে অবিশিৱষ্ট উদ্দেশের অর্থ আমি এইরূপে বিস্তৃতভাবে জানি। আয়ুষ্মানগণ, তোমরা যদি ইচ্ছা করো তাহা হইলে ভগবানের নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করো। ভগবান যেইভাবে ব্যাখ্যা করেন, তোমরা সেইভাবে ধারণ করো।
অতঃপর ভিক্ষুগণ আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নের ভাষণকে অভিনন্দিত ও অনুমোদন করিয়া আসন হইতে উঠিয়া ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন। উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট ভিক্ষুগণ ভগবানকে বলিলেন, ভদন্ত, ভগবান এই উদ্দেশ সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করিয়া ইহার অর্থ বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ না করিয়া আসন হইতে উঠিয়া বিহারে প্রবেশ করিয়াছেন-অতীত অননুসরণীয়… সুবিখ্যাত। ভদন্ত, ভগবান চলিয়া যাইবার পরক্ষণেই আমাদের এইরূপ মনে হইল : ভগবান এই উদ্দেশ… সুবিখ্যাত। ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে… কে বিশ্লেষণ করিবেন? এই আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন যিনি শাস্তা কর্তৃক প্রশংসিত… তাঁহাতে ইহার অর্থ জিজ্ঞাসা করিয়াছি। ভদন্ত, আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন এই পদ্ধতিতে, পদ ও ব্যঞ্জনার দ্বারা ইহার অর্থ আমাদের নিকট বিশ্লেষণ করিয়াছেন।
ভিক্ষুগণ, মহাকাত্যায়ন একজন পণ্ডিত ও মহাপ্রাজ্ঞ ব্যক্তি। তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে আমিও মহাকাত্যায়নের মতো ব্যাখ্যা করিতাম। ইহা তাহার প্রকৃত অর্থ, তোমরা ইহা এইরূপেই ধারণ করো।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
মহাকাত্যায়ন-ভদ্রকরক্ত সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৩]
English
Việt Ngữ