আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
এক সময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, “হে ভিক্ষুগণ,” “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া ভিক্ষুগণ, ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন, “ভিক্ষুগণ, আমি তোমাদিগকে উদ্দেশ বিভঙ্গ সম্পর্কে দেশনা করিব, তোমরা উত্তমরূপে মনোনিবেশ করিয়া তাহা শ্রবণ করো। “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া… প্রত্যুত্তর দিলেন।
ভগবান বলিলেন, ভিক্ষুগণ, যেইভাবে বাহ্যিকভাবে ও অধ্যাত্মভাবে অবিক্ষিপ্ত অবিসৃত এবং অসংস্থিত বিজ্ঞানকে উপপরীক্ষা করার ফলে ও উপাদেয়রূপে গ্রহণ না করিবার ফলে ভিক্ষুর পরিত্রাস হয় না সেইভাবেই ভিক্ষুর বিষয়কে উপপরীক্ষা করা উচিত। ভিক্ষুগণ, বিজ্ঞান বাহ্যিকভাবে অবিক্ষিপ্ত ও অবিসৃত এবং অধ্যাত্মভাবে অসংস্থিত হইলে এবং উপাদেয়রূপে গ্রহণ না করিবার ফলে অপরিত্রাসিত থাকিলে ভবিষ্যতে জন্ম-জরা-মরণ দুঃখের হেতু সম্ভব হয় না। ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ইহা বিবৃত করিয়া সুগত আসন হইতে উঠিয়া বিহারে প্রবেশ করিলেন।
ভগবান চলিয়া যাইবার পরেই সেই ভিক্ষুগণ এইরূপ চিন্তা করিয়া বলিলেন বন্ধুগণ, ভগবান এই উদ্দেশ সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করিয়া বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা না করিয়া আসন হইতে উঠিয়া বিহারে প্রবেশ করিয়াছেন-“যেভাবে বিজ্ঞানকে… সম্ভব হয় না।” কেহ কি ভগবান কর্তৃক সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত এই উদ্দেশের বিস্তৃত ব্যাখ্যা করিবেন?
তখন সেই ভিক্ষুদের এইরূপ মনে হইল : এই আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন যিনি শাস্তা দ্বারা প্রশংসিত ও বিজ্ঞ সব্রহ্মচারী দ্বারা সম্মানিত তিনি ভগবান কর্তৃক… ব্যাখ্যা করিতে সক্ষম, চলুন আমরা মহাকাত্যায়নের নিকট উপস্থিত হই… আয়ষ্মান মহাকাত্যায়ন ব্যাখ্যা করুন। বন্ধুগণ, যেমন… ব্যাখ্যা করুন।
বন্ধুগণ, তাহা হইলে মনোনিবেশ-সহকারে শ্রবণ করো, আমি বলিতেছি। “হ্যাঁ বন্ধু” বলিয়া ভিক্ষুগণ আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নকে প্রত্যুত্তর দিলেন। আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন বলিলেন :
বন্ধুগণ, ভগবান সংক্ষিপ্তভাবে… আমি বিস্তৃতভাবে অর্থ জানি। কিরূপে? বন্ধুগণ, বাহ্যিকভাবে বিজ্ঞান বিক্ষিপ্ত ও বিসৃত’ বলিয়া কথিত হয়? চক্ষু দ্বারা রূপদর্শন করিয়া যদি ভিক্ষুর রূপনিমিত্তানুসারী বিজ্ঞান রূপ-নিমিত্ত-আস্বাদ দ্বারা গ্রথিত, রূপ-নিমিত্ত আস্বাদ দ্বারা বিনিবদ্ধ, রূপনিমিত্ত-আস্বাদ সংযোজনে সংযুক্ত হয়, তখন ইহাকে বাহ্যিকভাবে… কথিত হয়। শ্রোত্র দ্বারা শুনিয়া… ঘ্রাণ দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া… জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া… কায় দ্বারা স্পর্শযোগ্যকে স্পর্শ করিয়া… মন দ্বারা ধর্ম জানিয়া যদি… কথিত হয়।
বন্ধুগণ, কিরূপে বাহ্যিকভাবে বিজ্ঞান অবিক্ষিপ্ত ও অবিসৃত’ বলিয়া কথিত হয়? বন্ধুগণ, চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া যদি ভিক্ষুর বিজ্ঞান রূপনিমিত্ত-অনুসারী বিজ্ঞান… গ্রথিত হয় না… বিনিবদ্ধ হয় না… সংযুক্ত হয় না, ইহাকেই… শ্রোত্র… ঘ্রাণ… জিহ্বা… কায়… কথিত হয় মন… সম্পর্কে এইরূপ ইহাকে বিজ্ঞান বাহ্যিকভাবে অবিক্ষিপ্ত ও অবিসৃত বলিয়া কথিত হয়।
কিরূপে, বন্ধুগণ, ‘অধ্যাত্মভাবে চিত্ত সংস্থিত’ বলিয়া কথিত হয়? ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া, অকুশলধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া সবির্তক, সবিচার, বিবেকজ, প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে অবস্থান করেন। যদি তাঁহার বিজ্ঞান বিবেকজ প্রীতিসুখ অনুসারী হয় বিবেকজ প্রীতিসুখ… আস্বাদ গ্রহিত, বিবেকজ প্রীতিসুখ-আস্বাদ-বিনিবদ্ধ, বিবেকজ প্রীতিসুখ-আস্বাদ সংযোজনে সংযুক্ত হয়, তখন চিত্ত… কথিত হয়। পুনশ্চ, বন্ধুগণ, ভিক্ষু বির্তক-বিচার উপশমে অধ্যাত্মসম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব-আনয়নকারী, বির্তকাতীত, বিচারাতীত সমাধিজ প্রীতি-সুখ-মণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে অবস্থান করেন। যদি তাঁহার বিজ্ঞান সমাধিজ প্রীতিসুখ-অনুসারী হয়… সংযুক্ত হয়, তখন চিত্ত সংস্থিত বলিয়া কথিত হয়। পুনশ্চ, বন্ধুগণ, ভিক্ষু প্রীতিতেও বিরাগ হইয়া উপেক্ষার ভাবে অবস্থান করেন, স্মৃতিমান ও সম্প্রজ্ঞাত হইয়া স্বচিত্তে (প্রীতি-নিরপেক্ষ) সুখ অনুভব করেন, আর্যগণ যে ধ্যানস্তরে আরোহণ করিলে ‘ধ্যায়ী উপেক্ষাসম্পন্ন ও স্মৃতিমান হইয়া (প্রীতি-নিরপেক্ষ) সুখে বিচরণ করেন’ বলিয়া বর্ণনা করেন, সেই তৃতীয় ধ্যানস্তরে উন্নীত হইয়া তাহাতে অবস্থান করেন। যদি তাঁহার বিজ্ঞান উপেক্ষা-অনুসারী, উপেক্ষা সুখ-আস্বাদ গ্রহিতা… সংযুক্ত হয়, তখন চিত্ত অধ্যাত্মভাবে সংস্থিত বলিয়া কথিত হয়। পুনশ্চ, বন্ধুগণ, ভিক্ষু (সর্ব দৈহিক) সুখ-দুঃখ পরিত্যাগ করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য অস্তমিত করিয়া না-দুঃখ, না-সুখ, উপেক্ষা ও স্মৃতি পরিশুদ্ধ চতুর্থ ধ্যান স্তরে উন্নীত হইয়া তাহাতে অবস্থান করেন। যদি তাঁহার বিজ্ঞান না-দুঃখ-না-সুখ-অনুসারী হয়… সংযুক্ত হয়, তখন চিত্ত অধ্যাত্মভাবে সংস্থিত বলিয়া কথিত হয়।
কিরূপে, বন্ধুগণ, “চিত্ত অধ্যাত্মভাবে অসংস্থিত” বলিয়া কথিত হয়? বন্ধুগণ, ভিক্ষু কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া… প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে অবস্থান করেন। তাঁহার বিজ্ঞান প্রীতি সুখ অনুসারী হয় না… দ্বিতীয় ধ্যান… চতুর্থ ধ্যানস্তরে উন্নীত হইয়া তাহাতে অবস্থান করেন। কিন্তু তাঁহার বিজ্ঞান না-দুঃখ-না-সুখ অনুসারী হয় না… সংযুক্ত হয় না… এইরূপে, বন্ধুগণ ‘চিত্ত অধ্যাত্মভাবে অসংস্থিত’ বলিয়া কথিত হয়।
কিরূপে, বন্ধুগণ, অনুৎপাদ পরিত্রাস (পরিক্লেশ) হয়?
বন্ধুগণ, অশ্রুতবান পৃথগ্জন, যে আর্যগণের দর্শন লাভ করে নাই, আর্যধর্মে অকোবিদ, আর্যধর্মে অবিনীত, সৎপুরুষগণের লাভ করেন নাই, সৎপুরুষধর্মে অকোবিদ, সৎপুরুষধর্মে অবিনীত, রূপকে আত্মদৃষ্টিতে দেখে, আত্মাকে রূপবান দেখে, আত্মায় রূপ দেখে, রূপে আত্মা দেখে। তাহার সেই রূপ পরিবর্তিত হয়, অন্যরূপ হয়, তাহার রূপবিপরিণাম-অন্যথাভাব-হেতু বিজ্ঞান রূপবিপরিণাম-অনুপরিবর্তী হয়, তাহার রূপবিপরিণাম অনুপরিবর্তজাত পরিত্রাস হয়, ধর্মের (চিন্তনীয় বিষয়) সমুৎপাদ চিত্তকে অধিকার করিয়া থাকে, চিত্তের অধিকার-হেতু ভীত বিরক্ত ও অপেক্ষাবান হয় ও উপাদান (বাসনা)-হেতু পরিত্রাস হয়। বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান সম্পর্কেও এইরূপ। এইরূপে, বন্ধুগণ, অনুৎপাদ পরিত্রাস হয়।
বন্ধুগণ, কিরূপে অনুৎপাদ অপরিত্রাস হয়? বন্ধুগণ, শ্রুতবান আর্যশ্রাবক যিনি আর্যদের দর্শন লাভ করিয়াছেন, আর্যধর্মে কোবিদ… তিনি রূপকে আত্ম-দৃষ্টিতে দেখেন না, তাঁহার পরিত্রাস হয় না। শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায় ও মন সম্পর্কেও এইরূপ। বন্ধুগণ, এইরূপে অনুৎপাদ অপরিত্রাস হয়।
বন্ধুগণ, ভগবান সংক্ষিপ্তভাবে যে উদ্দেশ… তাহার অর্থ আমি বিস্তৃতভাবে এইরূপ জানি। ইচ্ছা করিলে আয়ুষ্মানগণ আপনারা ভগবানের নিকট উপস্থিত হইয়া ইহার অর্থ জিজ্ঞাসা করিতে পারেন। ভগবান যেইরূপ যাহা ব্যাখ্যা করিবেন, আপনারা তাহা ধারণ করিবেন।
অতঃপর ভিক্ষুগণ, আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নের ভাষণকে অভিনন্দিত করিয়া অনুমোদন করিয়া আসন হইতে উঠিয়া ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে বলিলেন, ভদন্ত… আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়নকে ইহার অর্থ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলাম। আয়ুষ্মান মহাকাত্যায়ন আমাদিগকে ইহার অর্থ বিভিন্নভাবে পদে ও ব্যঞ্জনায় বিশ্লেষণ করিলেন।
ভিক্ষুগণ, মহাকাত্যায়ন পণ্ডিত, মহাপ্রাজ্ঞ, তোমরা আমাকে জিজ্ঞাসা করিলে আমিও মহাকাত্যায়নের মতো ব্যাখ্যা করিতাম। ইহার অর্থ তোমরা এইভাবে ধারণ করিবে।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
উদ্দেশ বিভঙ্গ সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ