আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। বহুসংখ্যক ভিক্ষু পূর্বাহ্ণে বহির্গমন-বাস পরিধান করিয়া, পাত্রচীবর লইয়া শ্রাবস্তীতে ভিক্ষান্নসংগ্রহের জন্য প্রবেশ করিলেন। তখন তাঁহাদের মনে এই চিন্তা উদিত হইয়াছিল : শ্রাবস্তীতে ভিক্ষার্থ বিচরণের পক্ষে এখনো অতি সকাল, অতএব আমরা বরং ইত্যবসরে যেখানে অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকদিগের আরাম সেখানে গিয়া উপস্থিত হইব। অতঃপর তাঁহারা তদবসরে যেখানে অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকদিগের আরাম সেখানে গিয়া উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ওই অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকদিগের সহিত প্রীত্যালাপচ্ছলে কুশলপ্রশ্নাদি বিনিময় করিয়া সসম্ভ্রমে একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট হইলে ওই অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণ তাঁহাদিগকে বলিলেন, “বন্ধুগণ, শ্রমণ গৌতম কাম-পরিত্যাগের বিষয় প্রজ্ঞাপন করেন, আমরাও তাহাই করি। তিনি রূপ এবং বেদনা পরিত্যাগের বিষয় প্রজ্ঞাপন করেন, আমরাও ঠিক তাহাই করি। তাহা হইলে, বন্ধুগণ, শ্রমণ গৌতম ও আমাদের মধ্যে ধর্মদেশনা ও অনুশাসন সম্পর্কে ইতরবিশেষ কী, উদ্দেশ্যেও বা বিভিন্নতা কী? সেই ভিক্ষুগণ তাঁহাদের এই উক্তিতে আনন্দিতও হইলেন না, আক্রোশও প্রকাশ করিলেন না, আনন্দিতও না হইয়া, আক্রোশও প্রকাশ না করিয়া তাঁহারা আসন হইতে গাত্রোত্থানপূর্বক স্বকার্যে প্রস্থান করিলেন, উদ্দেশ্য তাঁহারা ভগবৎ-সন্নিধানে উক্ত বিষয়ের অর্থ বিশেষভাবে জানিয়া লইবেন।
২. অনন্তর সেই ভিক্ষুগণ শ্রাবস্তীতে ভিক্ষার্থ বিচরণ করিয়া ভোজনান্তে ভিক্ষাসংগ্রহকার্য হইতে ফিরিয়া আসিয়া ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট হইয়া তাঁহারা ভগবানকে কহিলেন, “প্রভো, আমরা পূর্বাহ্ণে বহির্গমন-বাস পরিধান করিয়া, পাত্রচীবর লইয়া শ্রাবস্তীতে ভিক্ষান্নসংগ্রহের জন্য প্রবেশ করি। আমাদের মনে এই চিন্তা উদিত হইয়াছিল : শ্রাবস্তীতে ভিক্ষার্থ বিচরণের পক্ষে এখনো অতি সকাল, ইত্যবসরে আমরা বরং যেখানে অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণের আরাম সেখানে যাইব। অতঃপর আমরা তদবসরে অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণের আরামে গিয়া উপস্থিত হইলাম, উপস্থিত হইয়া ওই অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণের সহিত প্রীত্যালাপচ্ছলে কুশলপ্রশ্নাদি বিনিময় করিয়া সসম্ভ্রমে একান্তে উপবেশন করিলাম। উপবিষ্ট হইলে ওই অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণ আমাদিগকে বলিলেন, ‘বন্ধুগণ, শ্রমণ গৌতম কাম-পরিত্যাগের বিষয় প্রজ্ঞাপন করেন, আমরাও তাহাই করি। তিনি রূপ ও বেদনা পরিত্যাগের বিষয় প্রজ্ঞাপন করেন, আমরাও ঠিক তাহাই করি। তাহা হইলে ধর্মদেশনা এবং ধর্মানুশাসন সম্পর্কে তাঁহার ও আমাদের মধ্যে ইতরবিশেষ কী, অভিপ্রায়েও বা বিভিন্নতা কী?’ আমরা তাঁহাদের এই উক্তিতে আনন্দিতও না হইয়া, আক্রোশও প্রকাশ না করিয়া, আসন হইতে গাত্রোত্থান করিয়া চলিয়া আসি, উদ্দেশ্য আমরা ভগবৎ-সন্নিধানে কথিত বিষয়ের অর্থ বিশেষভাবে জানিয়া লইব।”
৩. হে ভিক্ষুগণ, এই মতবাদী অন্যতীর্থিক পরিব্রাজকগণকে এ কথা বলিতে হইবে : ‘বন্ধুগণ, কামের আস্বাদ কী, আদীনব (উপদ্রব) কী, তাহা হইতে নিঃসরণই (মুক্তিই) বা কী? বেদনার আস্বাদ কী, আদীনব কী, তাহা হইতে নিঃসরণই বা কী?’ এইরূপে প্রশ্ন করিলে তাঁহারা শুধু উহার সমাধান করিতে পারিবেন না নহে, অধিকন্তু মনোব্যথা পাইবেন। ইহার কারণ কী? যেহেতু ইহা তাঁহাদের জ্ঞানের বিষয় নহে। হে ভিক্ষুগণ, আমি কী দেবলোকে কী মারভুবনে কী ব্রহ্মলোকে কী শ্রমণ-ব্রাহ্মণদিগের মধ্যে, সর্ব দেব এবং মনুষ্যলোকে তথাগত ব্যতীত কিংবা তথাগতের শিষ্য ব্যতীত কিংবা যিনি এখান হইতে মত শুনিয়াছেন তিনি ব্যতীত অপর কাহাকেও দেখি না যিনি উক্ত প্রশ্নসমূহের সদুত্তরদানে চিত্তে সন্তোষ বিধান করিবেন।
৪. হে ভিক্ষুগণ, কামের আস্বাদ কী? পঞ্চকামগুণ এই [ভিক্ষুগণ, এই পঞ্চকামগুণ]। কী কী? চক্ষু-বিজ্ঞেয় রূপ, শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় শব্দ, ঘ্রাণ-বিজ্ঞেয় গন্ধ, জিহ্বা-বিজ্ঞেয় রস, এবং কায় (ত্বক)-বিজ্ঞেয় স্পর্শ ইষ্ট, কান্ত, মনোজ্ঞ, প্রিয়রূপ (প্রিয়জাতীয়), কামোপসংহিত ও মনোরঞ্জক। হে ভিক্ষুগণ, ইহারাই পঞ্চকামগুণ যাহার কারণ সুখ ও সৌমনস্য উৎপন্ন হয়। ইহাই কামের আস্বাদ।
৫. হে ভিক্ষুগণ, কামের আদীনব (উপদ্রব) কী? হে ভিক্ষুগণ, মুদ্রা হউক, গণনা হউক, সংখ্যা হউক, কৃষি হউক, বাণিজ্য হউক, গোরক্ষা হউক, শস্ত্রজীবিকা হউক, রাজপুরুষপদ (সৈনিকপদ, রাজসেবা) হউক, অপর কোনো শিল্প হউক, কুলপুত্র শীতোষ্ণের সম্মুখীন হইয়া, দংশ, মশক, বাতাতপ ও সরীসৃপ সংস্পর্শে কম্পমান, এবং ক্ষুৎপিপাসায় ম্রিয়মাণ হইয়া যেকোনো এক শিল্প (জীবনোপায়) অবলম্বনে জীবিকানির্বাহ করেন। হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামের নিমিত্ত, কামাধিকরণে, কাম্যবশে দৃষ্টধর্মে, এই প্রত্যক্ষজীবনে, দুঃখস্কন্ধ, দুঃখের রাশি।
হে ভিক্ষুগণ, যদি এইরূপে উত্থানশীল, উদ্যমশীল এবং পরিশ্রমী হইবার ফলেও তাঁহার বাঞ্ছিত ভোগৈশ্বর্য অভিনিষ্পন্ন (সিদ্ধ) না হয়, তাহা হইলে তিনি অনুশোচনা করেন, ক্লান্তি (অবসাদ) বোধ করেন, বিলাপ করেন, ঊরু চাপড়াইয়া ক্রন্দন করেন, সম্মোহপ্রাপ্ত হন-অহো, আমার সকল উদ্যম ব্যর্থ, সর্ব পরিশ্রম নিষ্ফল হইল! হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামকারণ, কামাধিকরণে, কাম্যবশে দৃষ্টধর্মে, এই প্রত্যক্ষজীবনে, দুঃখস্কন্ধ।
হে ভিক্ষুগণ, যদি এইরূপে উত্থানশীল, উদ্যোগী এবং পরিশ্রমী হইবার ফলে বাঞ্ছিত ভোগৈশ্বর্য সুসিদ্ধও হয়, তিনি ইহার রক্ষণাবেক্ষণের কারণ দুঃখ-দৌর্মনস্য বোধ করিতে থাকেন-কি জানি যদি রাজা ইহা স্বাধিকারে লইয়া যান, চোর অপহরণ করে, অগ্নিদগ্ধ করে, জলে ভাসাইয়া নেয়, অপ্রিয় দায়াদই বা অপসারিত করে। যদি তাঁহার এইরূপে রক্ষিত এবং গুপ্ত ভোগৈশ্বর্য রাজা স্বাধিকারে লইয়া যান, চোর অপহরণ করে, অগ্নিদগ্ধ করে, জলে ভাসাইয়া নেয়, কিংবা অপ্রিয় দায়াদ অপসারিত করে, তাহাতে তিনি অনুশোচনা করেন, ক্লান্তি বোধ করেন, বিলাপ করেন, ঊরু চাপড়াইয়া ক্রন্দন করেন, সম্মোহপ্রাপ্ত হন-অহো! যাহা আমার ছিল তাহাও এখন আমার নাই। হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামকারণ, কামাধিকরণে, কাম্যবশে দৃষ্টধর্মে, এই প্রত্যক্ষজীবনে, দুঃখস্কন্ধ।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, কামহেতু, কামকারণ, কামাধিকরণে, কাম্যবশে রাজা রাজার সহিত, ক্ষত্রিয় ক্ষত্রিয়ের সহিত, ব্রাহ্মণ ব্রাহ্মণের সহিত, গৃহপতি গৃহপতির সহিত, মাতা পুত্রের সহিত, পুত্র মাতার সহিত, পিতা পুত্রের সহিত, পুত্র পিতার সহিত, ভ্রাতা ভ্রাতার সহিত, ভ্রাতা ভগিনীর সহিত, ভগিনী ভ্রাতার সহিত, সহায় সহায়ের সহিত বিবাদ করেন। তাঁহারা পরস্পর কলহ-বিগ্রহ-বিবাদাপন্ন হইয়া পরস্পরকে পাণির দ্বারা, লোষ্ট্রের দ্বারা, দণ্ডের দ্বারা, এমনকি শস্ত্রের দ্বারাও প্রহার করেন, তাহাতে তাঁহারা মৃত্যুকবলে গমন করেন অথবা মরণতুল্য দুঃখ পান। হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামকারণ, কামাধিকরণে, কাম্যবশে দৃষ্টধর্মে, এই প্রত্যক্ষজীবনে, দুঃখস্কন্ধ।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, কামহেতু, কামকারণ, কামাধিকরণে, কাম্যবশে অসিচর্ম গ্রহণ করিয়া ধনুহস্তে শরকলাপ সংযোজিত করিয়া উভয় পক্ষ ব্যূহ রচনা করিয়া (সদলবলে) সংগ্রামে অগ্রসর হয়। শর নিক্ষিপ্ত হইলে, শক্তি নিক্ষিপ্ত হইলে, প্রদীপ্ত অসি আবর্তিত হইলে, তাহারা শরেও বিদ্ধ হয়, শক্তিতেও বিদ্ধ হয়, অসিতেও তাহাদের মস্তক ছিন্ন হয়, তাহাতে তাহারা মৃত্যুমুখে পতিত হয় অথবা মরণতুল্য দুঃখ পাইয়া থাকে। হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামকারণ, কামাধিকরণে, কাম্যবশে দৃষ্টধর্মে, এই প্রত্যক্ষজীবনে, দুঃখস্কন্ধ।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, কামহেতু, কামনিমিত্ত, কামাধিকরণে, কামকারণেই তাহারা অসিচর্ম গ্রহণ করিয়া, ধনুহস্তে শরকলাপ সংযোজিত করিয়া আর্দ্রসুধাবলেপনে মসৃণ নগর-প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করিতে যায়। শর নিক্ষিপ্ত হইলে, শক্তি নিক্ষিপ্ত হইলে, প্রদীপ্ত অসি আবর্তিত হইলে তাহারা শরেও বিদ্ধ হয়, শক্তিতেও বিদ্ধ হয়, নিক্ষিপ্ত উষ্ণ ভস্মে আচ্ছাদিত হয়, নগরদ্বারপাল্লার চাপে অবমর্দিত (নিষ্পেষিত) হয়, অসি দ্বারা তাহাদের মস্তক ছিন্ন হয়, তাহাতে তাহারা মৃত্যুমুখে পতিত হয় অথবা মরণতুল্য দুঃখ পাইয়া থাকে। হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামনিমিত্ত, কামাধিকরণে, কামকারণেই ইহা দৃষ্টধর্মে (প্রত্যক্ষজীবনে) দুঃখস্কন্ধ।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, কামহেতু, কামনিমিত্ত, কামাধিকরণে, কামকারণেই তাহারা সন্ধিচ্ছেদ করে, লুণ্ঠন করে, একাকার করে, পথে দৌরাত্ম্য করে, অথবা পরদারগমন করে। তাহাদিগকে রাজা ধৃত করিয়া তাহাদিগের প্রতি বিবিধ কর্মকরণ (শাস্তি) বিধান করেন : কশাঘাত করা হয়, বেত্রাঘাত করা হয়, অর্ধদণ্ডে (মুদ্গরাদির দ্বারা) প্রহার করা হয়, হস্ত ছিন্ন করা হয়, পদ ছিন্ন করা হয়, হস্তপদ ছিন্ন করা হয়, কর্ণচ্ছেদ করা হয়, নাসাচ্ছেদ করা হয়, কর্ণ-নাসাচ্ছেদ করা হয়, বিলগ্নস্থালী করা হয়, শঙ্খমুণ্ড করা হয়, রাহুমুখ করা হয়, জ্যোতিমাল করা হয়, হস্ত প্রদ্যোতিত করা হয়, ছাগচর্মিক করা হয়, চীর্ণচীরবাস করা হয়, পেরেক বিদ্ধ করা হয়, বড়শির দ্বারা মাংস বিদ্ধ করা হয়, কার্ষাপণ-পরিমিত করা হয়, ক্ষার প্রয়োগ করা হয়, পলিঘ-বিদ্ধ করা হয়, পলাল-পীঠ করা হয়, তপ্ত তৈলে অভিষিক্ত করা হয়, ক্ষিপ্ত কুক্কুর দ্বারা খাওয়ান হয়, জীবন্ত শূলে দেওয়া হয়, অসি দ্বারা শিরশ্ছেদ করা হয়, তাহাতে তাহারা মৃত্যুমুখে পতিত হয় কিংবা মরণতুল্য দুঃখ পায়।
হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামনিমিত্ত, কামাধিকরণে, কামকারণেই ইহা দৃষ্টধর্মে (প্রত্যক্ষজীবনে) দুঃখস্কন্ধ।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, কামহেতু, কামনিমিত্ত, কামাধিকরণে, কামকারণেই তাহারা কায়ে, বাক্যে ও মনে দুরাচরণ করে। তাহারা কায়ে, বাক্যে ও মনে দুরাচরণ করিয়া দেহাবসানে মৃত্যুর পর অপায়দুর্গতি বিনিপাত নরকে উৎপন্ন হয়। হে ভিক্ষুগণ, ইহাও কামের আদীনব, কামহেতু, কামনিমিত্ত, কামাধিকরণে, কামকারণেই ইহা সাম্পরায়িক (পারত্রিক) দুঃখস্কন্ধ।
৬. পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, কাম হইতে নিঃসরণ কী? হে ভিক্ষুগণ, কামে তাহা ছন্দরাগ-দমন, ছন্দরাগ-পরিত্যাগ, তাহাই কাম হইতে নিঃসরণ। হে ভিক্ষুগণ, যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ এইরূপে কামের আস্বাদ, আদীনব, এবং তাহা হইতে নিঃসরণ যথার্থভাবে জানেন না, আস্বাদকে আস্বাদের ভাবে, আদীনবকে আদীনবে ভাবে এবং নিঃসরণকে নিঃসরণের ভাবে জানেন না, তিনি যে স্বয়ং কাম পরিত্যাগ করিবেন অথবা অপরকে তদর্থে অনুপ্রাণিত করিবেন, যাহাতে সিদ্ধপ্রতিপন্ন হইলে তাঁহারা কাম পরিত্যাগ করিতে পারিবেন, এহেন সম্ভাবনা নাই। [পক্ষান্তরে] যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ এইরূপে কামের আস্বাদ, আদীনব, এবং তাহা হইতে নিঃসরণ যথার্থভাবে জানেন, আস্বাদকে আস্বাদের ভাবে, আদীনবকে আদীনবের ভাবে ও নিঃসরণকে নিঃসরণের ভাবে জানেন, তিনি যে সত্যই কাম পরিত্যাগ করিবেন এবং অপরকে তদর্থে অনুপ্রাণিত করিবেন, যাহাতে সিদ্ধপ্রতিপন্ন হইলে তাঁহারা কাম পরিত্যাগ করিতে পারিবেন, এহেন সম্ভাবনা আছে।
৭. হে ভিক্ষুগণ, রূপের আস্বাদ কী? যখন কোনো ক্ষত্রিয়-কন্যা, ব্রাহ্মণ-কন্যা, গৃহপতি-কন্যা, পঞ্চদশবর্ষীয়া অথবা ষোড়শবর্ষীয়া হয় এবং নাতিদীর্ঘা, নাতিহ্রস্বা, নাতিস্থূলা, নাতিকৃষ্ণা, নাতিগৌরীরূপে পরমা সুন্দরী হয়, তখন তাহাকে সুরূপা বলিয়া দেখায় তো? ‘হাঁ, প্রভো।’ সেই সুরূপ-জনিত যে সুখ ও সৌমনস্য উৎপন্ন হয়, তাহাই রূপের আস্বাদ।
৮. হে ভিক্ষুগণ, রূপের আদীনব কী? যখন সেই পরমা সুন্দরী নবযুবতীকে অপর সময়ে অশীতিবয়স্কারূপে, নবতিবয়স্কারূপে অথবা শতবর্ষিকারূপে জীর্ণশীর্ণা, কুব্জদেহা, শিথিলকলেবরা, যষ্টিহস্তা, গমনে কম্পমানা, আতুরা, গতযৌবনা, খণ্ডদন্তা, বিরল-কেশা, স্খলিতশিরা, লোলচর্মা, তিলকাহতগাত্রারূপে দেখ, তখন তোমরা কি মনে করিবে না যে, তাহার সেই পূর্বসৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়া আদীনব (জীর্ণতা) প্রাদুর্ভূত হইয়াছে? ‘হাঁ প্রভো।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাই রূপের আদীনব।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, যদি তোমরা সেই যুবতীকে দেখ, সে ব্যাধিগ্রস্তা, দুঃখপ্রাপ্তা, উৎকট-রোগগ্রস্তা হইয়াছে, স্বীয় মলমূত্রে পড়িয়া আছে, এমতাবস্থায় অপরে তাহাকে তুলিয়া উঠাইতেছে, অপরে তাহাকে সমবেদনা জানাইতেছে, তখন কি তোমরা মনে করিবে না যে, তাহার সেই পূর্বসৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়া এই আদীনব উপস্থিত হইয়াছে? ‘হাঁ, প্রভো।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাও রূপের আদীনব।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, যদি তোমরা দেখিতে পাও, সীবথিকায় (শিবালয়ে, শ্মশানে) পরিত্যক্ত অবস্থায় সেই সুন্দরী যুবতীর মৃতদেহ মাত্র এক দিন, কি দুই দিন, কি তিন দিন হইল স্ফীত, বিবর্ণ, পুঁজযুক্ত হইয়াছে, তখন কি তোমরা মনে করিবে না যে, তাহার সেই পূর্বসৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়া আদীনব উপস্থিত হইয়াছে? ‘হাঁ, প্রভো।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাও রূপের আদীনব।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, যখন তোমরা দেখিতে পাও, শ্মশানে পরিত্যক্ত অবস্থায় সেই সুন্দরী যুবতীর মৃতদেহ কাক, কুণাল, শকুন, কুক্কুর, শৃগাল অথবা বিবিধ কৃমিকীট ভক্ষণ করিতেছে, তখন কি তোমরা মনে করিবে না যে, তাহার সেই পূর্বসৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়া আদীনব উপস্থিত হইয়াছে? ‘হাঁ প্রভো।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাও রূপের আদীনব।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, যদি তোমরা দেখিতে পাও, সেই সুন্দরীর মৃতদেহ শ্মশানে পরিত্যক্ত অবস্থায় ক্রমে স্নায়ুবদ্ধ মাংসলোহিতসম্পন্ন অস্থিশৃঙ্খলে (কঙ্কালে), নির্মাংস অথচ লোহিতম্রক্ষিত স্নায়ুবদ্ধ অস্থিশৃঙ্খলে, অপগতমাংসলোহিত অথচ স্নায়ুবদ্ধ অস্থিশৃঙ্খলে পরিণত হইয়াছে, অস্থিগুলি স্নায়ুসম্বন্ধবিহীন হইয়া চতুর্দিকে বিক্ষিপ্ত হইয়াছে, এক স্থানে হাতের অস্থি, এক স্থানে পায়ের অস্থি, এক স্থানে জঙ্ঘার অস্থি, এক স্থানে ঊরুর অস্থি, এক স্থানে কটির অস্থি, এক স্থানে পিঠের অস্থি, এক স্থানে বুকের ও পার্শ্বের অস্থি, এক স্থানে বাহুর অস্থি, এক স্থানে স্কন্ধের অস্থি, এক স্থানে গ্রীবাস্থি, এক স্থানে হনুর অস্থি, এক স্থানে দন্ত, এক স্থানে শীর্ষকটাহ (মাথার খুলি) পড়িয়া আছে, তাহা হইলে তোমরা কি মনে করিবে না যে, তাহার সেই পূর্বসৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়া আদীনব উপস্থিত হইয়াছে? ‘হাঁ, প্রভো।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাও রূপের আদীনব।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, যদি তোমরা দেখিতে পাও, শ্মশানে পরিত্যক্ত অবস্থায় সেই সুন্দরী যুবতীর মৃতদেহের অস্থিগুলি ক্রমে শ্বেতশঙ্খবর্ণসদৃশ এবং বর্ষকাল পরে পুঞ্জীকৃত, বাতাতপে গলিত ও চূর্ণীকৃত হইয়াছে, তাহা হইলে কি তোমরা মনে করিবে না যে, তাহার সেই পূর্বসৌন্দর্য অন্তর্হিত হইয়া আদীনব উপস্থিত হইয়াছে? ‘হাঁ, প্রভো।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাও রূপের আদীনব।
৯. হে ভিক্ষুগণ, রূপ হইতে নিঃসরণ কী? রূপসম্পর্কে যাহা ছন্দরাগ-দমন ছন্দরাগ-পরিহার (সম্পূর্ণভাবে আসক্তি পরিত্যাগ), তাহাই রূপ হইতে নিঃসরণ।
হে ভিক্ষুগণ, যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ আস্বাদের ভাবে রূপের আস্বাদ, আদীনবের ভাবে রূপের আদীনব, এবং নিঃসরণের ভাবে রূপ হইতে নিঃসরণ যথার্থভাবে জানেন না, তিনি যে স্বয়ং রূপ পরিত্যাগ করিবেন অথবা তদর্থে অপরকে অনুপ্রাণিত করিবেন, যাহাতে সিদ্ধপ্রতিপন্ন হইলে তাঁহারা রূপ পরিত্যাগ করিতে পারিবেন, এহেন সম্ভাবনা নাই। [পক্ষান্তরে] যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ আস্বাদের ভাবে রূপের আস্বাদ, আদীনবের ভাবে রূপের আদীনব এবং নিঃসরণের ভাবে রূপ হইতে নিঃসরণ যথার্থভাবে জানেন, তিনি যে স্বয়ং রূপ পরিত্যাগ করিবেন অথবা অপরকে তদর্থে অনুপ্রাণিত করিবেন, যাহাতে সিদ্ধপ্রতিপন্ন হইলে তাঁহারা সত্যই রূপ পরিত্যাগ করিতে পারিবেন, এহেন সম্ভাবনা আছে।
১০. হে ভিক্ষুগণ, বেদনার আস্বাদ কী? ভিক্ষু কাম-সম্পর্ক হইতে বিবিক্ত হইয়া, সর্ব অকুশল ধর্ম পরিহার করিয়া, সবিতর্ক, সবিচার এবং বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। হে ভিক্ষুগণ, যে-সময়ে ভিক্ষু কাম-সম্পর্ক হইতে বিবিক্ত হইয়া, সর্ব অকুশল ধর্ম পরিহার করিয়া, সবিতর্ক, সবিচার এবং বিবেকজ প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন, তখন তিনি আত্মব্যাধি (নিজের দুঃখতা), পরব্যাধি (অপরের দুঃখতা), আত্ম-পর উভয় ব্যাধি আনয়নের জন্য চেতনা (চিত্তবৃত্তি) উৎপাদন করেন না, তখন তিনি নীরোগ বেদনাই অনুভব করেন। হে ভিক্ষুগণ, আমি নীরোগ-পরমতাকেই বেদনার আস্বাদ বলি।
পুনশ্চ, হে ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু বিতর্ক-বিচার-উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব-আনয়নকারী, বিতর্কাতীত, বিচারাতীত, সমাধিজ প্রীতিসুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান… তৃতীয় ধ্যান… চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। হে ভিক্ষুগণ, যে-সময়ে ভিক্ষু সর্বদৈহিক সুখ পরিত্যাগ করিয়া, পূর্বেই সৌমনস্য-দৌর্মনস্য (মনের হর্ষ-বিষাদ) অস্তমিত করিয়া, না-দুঃখ-না-সুখ, উপেক্ষা ও স্মৃতি দ্বারা পরিশুদ্ধ চিত্তে চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন, তখন তিনি আত্মব্যাধি, পরব্যাধি, আত্ম-পর উভয় ব্যাধি আনয়নের চেতন উৎপাদন করেন না, তখন তিনি নীরোগ বেদনাই অনুভব করেন। হে ভিক্ষুগণ, আমি নীরোগ-পরমতাকেই বেদনার আস্বাদ বলি।
১১. হে ভিক্ষুগণ, বেদনার আদীনব কী? বেদনা অনিত্য, দুঃখাত্মক ও বিপরিণামী, ইহাই বেদনার আদীনব।
১২. হে ভিক্ষুগণ, বেদনা হইতে নিঃসরণ কী? বেদনা-সম্পর্কে যাহা ছন্দরাগ-দমন, ছন্দরাগ-পরিহার, তাহাই বেদনা হইতে নিঃসরণ।
হে ভিক্ষুগণ, যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ আস্বাদের ভাবে বেদনার আস্বাদ, আদীনবের ভাবে বেদনার আদীনব, এবং নিঃসরণের ভাবে বেদনা হইতে নিঃসরণ যথার্থভাবে জানেন না, তিনি যে স্বয়ং বেদনা পরিত্যাগ করিবেন অথবা অপরকে তদর্থে অনুপ্রাণিত করিবেন, যাহাতে সিদ্ধপ্রতিপন্ন হইলে তাঁহারা বেদনা পরিত্যাগ করিতে পারিবেন, এহেন সম্ভাবনা নাই। [পক্ষান্তরে] যেকোনো শ্রমণ বা ব্রাহ্মণ আস্বাদের ভাবে বেদনার আস্বাদ, আদীনবের ভাবে বেদনার আদীনব, এবং নিঃসরণের ভাবে বেদনা হইতে নিঃসরণ যথার্থভাবে জানেন, তিনি যে স্বয়ং বেদনা পরিত্যাগ করিবেন অথবা অপরকে তদর্থে অনুপ্রাণিত করিবেন, যাহাতে সিদ্ধপ্রতিপন্ন হইলে তাঁহারা সত্যই বেদনা পরিত্যাগ করিতে পারিবেন, এহেন সম্ভাবনা আছে। ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ তাহা প্রসন্নমনে শ্রবণ করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
মহাদুঃখস্কন্ধ-সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ