লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৮]

ইন্দ্রিয়-ভাবনা সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

এক সময় ভগবান কজঙ্গল সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন মুখেলুবনে। তখন পারাশরীয় অন্তেবাসী উত্তরনায়ক মাণবক ভগবানের নিকট উপস্থিত হইলেন, উপস্থিত হইয়া ভগবানের সহিত প্রীত্যালাপ ও কুশলাদি বিনিময় সমাপন করিয়া একান্তে উপবেশন করিলেন। একান্তে উপবিষ্ট উত্তর মাণবককে ভগবান বলিলেন, উত্তর, পারাশরীয় ব্রাহ্মণ কী শিষ্যদের নিকট ইন্দ্রিয়ভাবনা দেশনা করেন?

হে গৌতম, পারাশরীয় ব্রাহ্মণ শিষ্যদের নিকট ইন্দ্রিয়ভাবনা দেশনা করেন।

কিন্তু উত্তর, পারাশরীয় ব্রাহ্মণ যথাযথরূপে শিষ্যদের নিকট ইন্দ্রিয়ভাবনা দেশনা করেন?

হে গৌতম, ‘কেহ চক্ষু দ্বারা রূপ দেখিবে না, শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শুনিবে না’ এইরূপে পারাশরীয় ব্রাহ্মণ শিষ্যদের নিকট ইন্দ্রিয়ভাবনা দেশনা করেন।

উত্তর, এইরূপ হইলে পারাশরীয়ের কথানুযায়ী, অন্ধ হইবে ভাবিতইন্দ্রিয়, বধির হইবে ভাবিত-ইন্দ্রিয়। কারণ, অন্ধ চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিতে পারে না, বধির শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শুনিতে পারে না।

এইরূপ কথিত হইলে পারাশরীয় অন্তেবাসী উত্তর মাণবক তূষ্ণীম্ভূত, মঙ্কুভূত, অধোশির, অধোমুখ হইয়া চিন্তিতভাবে নির্বাক হইয়া উপবিষ্ট রহিলেন।

তখন ভগবান… উত্তরকে তূষ্ণীম্ভূত… নির্বাক জানিয়া আনন্দকে আহ্বান করিলেন, আনন্দ, পারাশরীয় ব্রাহ্মণ শিষ্যদের ইন্দ্রিয়ভাবনা সম্পর্কে অন্যরূপ দেশনা করেন, আর আর্যবিনয়ে অনুত্তর ইন্দ্রিয়ভাবনা অন্যরকম।

ভগবান, ইহাই উপযুক্ত সময়, সুগত, ইহাই উপযুক্ত সময় যেন ভগবান অনুত্তর ইন্দ্রিয়ভাবনা দেশনা করেন, ভগবানের নিকট শুনিয়া ভিক্ষুগণ অবধারণ করিবেন।

তাহা হইলে, আনন্দ, তোমরা মনোনিবেশ-সহকারে শ্রবণ করো, আমি বলিতেছি। “হ্যাঁ ভদন্ত” বলিয়া আয়ুষ্মান আনন্দ ভগবানকে প্রত্যুত্তর দিলেন। ভগবান বলিলেন :

আনন্দ, আর্যবিনয়ে অনুত্তর ইন্দ্রিয়ভাবনা কিরূপ? এইস্থলে, আনন্দ, চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া ভিক্ষুর যাহা মনোজ্ঞ, যাহা অমনোজ্ঞ, যাহা মনোজ্ঞ ও অমনোজ্ঞ তাহা উৎপন্ন হয়। তিনি ইহা প্রকৃষ্টরূপে জানেন : আমার মধ্যে যাহা মনোজ্ঞ, অমনোজ্ঞ, মনোজ্ঞ-অমনোজ্ঞ উৎপন্ন হইয়াছে, তাহা সংস্কৃত ও স্থূল কারণে সমুৎপন্ন, ইহা শান্ত, ইহা প্রণীত যেমন এই উপেক্ষা। তাঁহার যাহা উৎপন্ন মনোজ্ঞ-অমনোজ্ঞ তাহা নিরুদ্ধ হয়, উপেক্ষা সংস্থিত থাকে। যেমন, আনন্দ, চক্ষুষ্মান পুরুষ চক্ষু উন্মীলিত করিয়া নিমীলিত করে, নিমীলিত করিয়া উন্মীলিত করে, ঠিক এইরূপে আনন্দ, যাহার এইরূপ দ্রুত, এইরূপ ত্বরিতগতিতে, এইরূপ সহজে উৎপন্ন মনোজ্ঞ… তাহা যখন নিরুদ্ধ হয় তখন উপেক্ষা সংস্থিত হয়। আনন্দ, ইহা আর্য বিনয়ে চক্ষুবিজ্ঞেয় রূপে অনুত্তর ইন্দ্রিয়ভাবনা বলিয়া কথিত হয়।

পুনশ্চ, আনন্দ, শ্রোত্র দ্বারা শব্দ শ্রবণ করিয়া… উপেক্ষা সংস্থিত হয়। যেমন, আনন্দ, কোনো বলবান পুরুষ সহজেই অঙ্গুলি স্ফোটন করিতে পারে, ঠিক এইরূপে… শ্রোত্রবিজ্ঞেয় শব্দে… কথিত হয়।

পুনশ্চ আনন্দ, ঘ্রাণের দ্বারা গন্ধ আঘ্রাণ করিয়া… সংস্থিত হয়। যেমন, আনন্দ, অর্ধনমিত পদ্মপত্রে বারিবিন্দু পতিত হইয়া গড়াইয়া যায়, সংস্থিত হয়, ঠিক এইরূপে… কথিত হয়।

পুনশ্চ, আনন্দ, জিহ্বা দ্বারা রস আস্বাদন করিয়া… সংস্থিত হয়। যেমন, আনন্দ, বলবান পুরুষ জিহ্বাগ্রে সঞ্চিত খেড়পিণ্ড (থুথু) সহজেই বাহিরে নিক্ষেপ করিতে পারে। ঠিক এইরূপে… কথিত হয়।

পুনশ্চ, আনন্দ, কায় দ্বারা স্প্রষ্টব্য স্পর্শ করিয়া… সংস্থিত হয়। যেমন, আনন্দ, বলবান পুরুষ সঙ্কোচিত বাহুকে প্রসারিত করিতে অথবা প্রসারিত বাহুকে সঙ্কোচিত করিতে পারে, ঠিক এইরূপে… কথিত হয়।

পুনশ্চ, আনন্দ, মন দ্বারা ধর্মকে জানিয়া… সংস্থিত হয়। যেমন, আনন্দ, কোনো পুরুষ প্রতিদিবস সন্তপ্ত লৌহথালিতে দুইটি বা তিনটি বারিবিন্দু নিপাতিত করে, আনন্দ, যত আস্তেই উদকবিন্দু নিপাতিত হউক না কেন, তাহা দ্রুত পরিক্ষয় ও বিনাশ প্রাপ্ত হইবে। ঠিক এইরূপে… সংস্থিত হয়। ইহা আর্য বিনয়ে মনোবিজ্ঞেয় ধর্মে অনুত্তর ইন্দ্রিয়ভাবনা বলিয়া কথিত হয়। এইরূপে, আনন্দ,… ইন্দ্রিয়ভাবনা হয়।

আনন্দ, শৈক্ষ্য প্রতিপদ কিরূপ? আনন্দ, চক্ষু দ্বারা রূপ দর্শন করিয়া ভিক্ষুর যাহা মনোজ্ঞ… উৎপন্ন… হেতু দুঃখিত হয়, রাগান্বিত হয় ও হতাশ হয়। শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায় ও মন সম্পর্কেও এইরূপ।

আনন্দ, কিরূপে আর্য ভাবিত-ইন্দ্রিয় হয়? আনন্দ, চক্ষু দ্বারা রূপ… উৎপন্ন হয়। যদি তিনি এইরূপ আকাঙ্ক্ষা করেন: “আমার প্রতিকূলে অপ্রতিকূল-সংজ্ঞী হইয়া অবস্থান করেন। যদি এইরূপ আকাঙ্ক্ষা করেন: অপ্রতিকূলে অপ্রতিকূল-সংজ্ঞী… অবস্থান করেন। যদি এইরূপ আকাঙ্ক্ষা করেন : “প্রতিকূল এবং অপ্রতিকূল এই উভয় বর্জন করিয়া স্মৃতিমান, সম্প্রজ্ঞাত হইয়া উপেক্ষা-সহকারে আমার অবস্থান করা উচিত” এই চিন্তা করিয়া… অবস্থান করেন।

শ্রোত্র, ঘ্রাণ, জিহ্বা, কায়, মন সম্পর্কেও এইরূপ। আনন্দ, এইরূপে আর্য ভাবিত-ইন্দ্রিয় হন।

আনন্দ, এইরূপে আমি আর্য বিনয়ে অনুত্তর ইন্দ্রিয়-ভাবনা শৈক্ষ্য প্রতিপদ ও আর্যোচিত ভাবিত-ইন্দ্রিয় দেশনা করিয়াছি।

আনন্দ, শিষ্যদের প্রতি হিতৈষণা, অনুকম্পাবশত শাস্তার যাহা করণীয়, তাহা তোমাদের জন্য আমার দ্বারা কৃত হইয়াছে। আনন্দ, এইগুলিই বৃক্ষমূল, এইগুলিই শূন্যাগার। আনন্দ, তোমরা ধ্যান করো, প্রমাদগ্রস্ত হইবে না, ইহাই তোমাদের প্রতি আমার অনুশাসন।

ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। আয়ুষ্মান আনন্দ সন্তুষ্ট মনে ভগবানের ভাষণে আনন্দ প্রকাশ করিলেন।

ইন্দ্রিয়ভাবনা সূত্র সমাপ্ত।

পঞ্চম বিভঙ্গ-বর্গ সমাপ্ত।

উপরি-পঞ্চাশ সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৩]