লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩৬]

ধর্মদায়াদ-সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। ভগবান (সমবেত) ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ’। ‘হাঁ ভদন্ত’ বলিয়া ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে সম্মতি জানাইলেন। ভগবান কহিলেন :

২. তোমরা ধর্মদায়াদ হও, ধর্মত আমার উত্তরাধিকারী হও, আমিষদায়াদ নহে, আমিষদায়াদ হইও না। তোমাদের প্রতি আমার এই অনুকম্পা, যেন আমার শ্রাবকগণ (উন্নত শিষ্যগণ) ধর্মদায়াদ হয়, আমিষদায়াদ নহে। হে ভিক্ষুগণ, যদি তোমরা আমার আমিষদায়াদ হও, ধর্মদায়াদ না হও, তাহা হইলে তোমরা ‘অপদেশ্য’ (নিন্দনীয়) হইবে : ‘শাস্তার শ্রাবকগণ আমিষদায়াদরূপে বিচরণ করেন ধর্মদায়াদরূপে নহে’। তাহাতে আমিও ‘অপদেশ্য’ হইব। [পক্ষান্তরে] হে ভিক্ষুগণ, যদি তোমরা আমার ধর্মদায়াদ হও, আমিষদায়াদ না হও, তাহা হইলে তোমরা ‘অপদেশ্য’ হইবে না। (যেহেতু তখন লোকে বলিবে) : ‘শাস্তার শ্রাবকগণ ধর্মদায়াদরূপে বিচরণ করে, আমিষদায়াদরূপে নহে।’ তাহাতে আমিও ‘অপদেশ্য’ হইব না। (যেহেতু তখন লোকে বলিবে) : ‘শাস্তার শ্রাবকগণ ধর্মদায়াদরূপে বিচরণ করে আমিষদায়াদরূপে নহে।’ অতএব হে ভিক্ষুগণ, তোমরা আমার ধর্মদায়াদ হও, আমিষদায়াদ নহে। তোমাদের প্রতি আমার এই অনুকম্পা : ‘আমার শ্রাবকগণ ধর্মদায়াদ হউক, আমিষদায়াদ নহে।’

৩. হে ভিক্ষুগণ, যদি আমি ভুক্ত হই, পরিপূর্ণভাবে, আর প্রয়োজন নাই বলা পর্যন্ত ভুক্ত হই, যতটা প্রয়োজন সেই পরিমাণ প্রদত্ত হওয়ায় আমার পরিপূর্ণ ও সুখভোজন হয়, যদি তাহার পরেও তদতিরিক্ত ‘ফেলে দেবার’ মতো ভিক্ষান্ন অবশিষ্ট থাকে, এবং সেই সময়ে সেখানে দুইজন ভিক্ষু অভ্যাগত হয়, এবং আমি তাহাদিগকে বলি, “হে ভিক্ষুগণ, আমি ভুক্ত হইয়াছি, প্রয়োজন-অনুরূপ প্রদত্ত হওয়ায় আমার পরিপূর্ণ ও সুখভোজন হইয়াছে, তথাপি তদতিরিক্ত ‘ফেলে দেবার’ মতো এই ভিক্ষান্ন অবশিষ্ট আছে, যদি তোমরা ইচ্ছা করো, এই ভিক্ষান্ন ভোজন করিতে পার। যদি তোমরা ভোজন না করো, তাহা হইলে আমি তৃণবিরলস্থানে ইহা নিক্ষেপ করিব, অথবা অল্পপ্রাণবিহীন গভীর উদকে নিমজ্জন করিয়া দিব।” তন্মধ্যে জনৈক ভিক্ষুর মনে এই চিন্তা হইতে পারে : “ভগবান ভুক্ত হইয়াছেন, প্রয়োজন-অনুরূপ প্রদত্ত হওয়ায় তাঁহার পরিপূর্ণ ও সুখভোজন হইয়াছে, তথাপি তদতিরিক্ত ‘ফেলে দেবার’ মতো ভিক্ষান্ন অবশিষ্ট আছে, যদি আমরা এই ভিক্ষান্ন ভোজন না করি, তাহা হইলে ভগবান তাহা নষ্ট হইবার পূর্বেই দূরে নিক্ষেপ করিবেন, অথবা অল্পপ্রাণরহিত উদকে নিমজ্জন করিবেন। এদিকে ভগবান বলিয়াছেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমরা আমার ধর্মদায়াদ হও, আমিষদায়াদ নহে।’ কিন্তু এই পিণ্ডপাত বা ভিক্ষান্নও তো আমিষের মধ্যে অন্যতম। অতএব আমি ক্ষুধাতৃষ্ণার পীড়নহেতু এই ভুক্তাবশিষ্ট ভিক্ষান্ন ভোজন না করিয়াই অদ্য রাত্রিদিন অতিবাহিত করিব।” দ্বিতীয় ভিক্ষুর মনে এই চিন্তা হইতে পারে : “ভগবান ভুক্ত হইয়াছেন, পরিপূর্ণভাবে, আর প্রয়োজন নাই বলা পর্যন্ত ভুক্ত হইয়াছেন, প্রয়োজন-অনুরূপ তাঁহার পরিপূর্ণ ও সুখভোজন হইয়াছে, তথাপি তদতিরিক্ত ‘ফেলে দেবার’ মতো এই ভিক্ষান্ন অবশিষ্ট আছে, যদি আমরা সেই ভিক্ষান্ন ভোজন না করি, তাহা হইলে ভগবান তাহা নষ্ট হইবার পূর্বেই দূরে নিক্ষেপ করিবেন, অথবা অল্পপ্রাণরহিত উদকে নিমজ্জন করিবেন। অতএব আমি এই ভুক্তাবশিষ্ট ভিক্ষান্ন ভোজন করিয়া ক্ষুধাতৃষ্ণার পীড়ন প্রতিহত করিয়া অদ্য রাত্রিদিন অতিবাহিত করিব।” অতঃপর তিনি সেই ভিক্ষান্ন ভোজন করিয়া, ক্ষুধাতৃষ্ণার পীড়ন প্রতিহত করিয়া, সেই রাত্রিদিন অতিবাহিত করিলেন। হে ভিক্ষুগণ, তাঁহাদের মধ্যে যিনি ভিক্ষান্ন ভোজন দ্বারা ক্ষুধাতৃষ্ণার পীড়ন প্রতিহত না করিয়া সেই রাত্রিদিন অতিবাহিত করিলেন, আমার বিবেচনায় এই প্রথম ভিক্ষুই পূজ্যতর, অধিকতর প্রশংসাভাজন। ইহার কারণ কী? যেহেতু তিনি তাঁহার কার্যে দীর্ঘকাল স্বল্পেচ্ছুতা, সন্তুষ্টি, ‘সৎলেখ’, সুভরতা এবং বীর্যারম্ভের প্রতি সংবর্তন করিবেন, অগ্রসর হইবেন। তদ্ধেতু, হে ভিক্ষুগণ, তোমরা আমার ধর্মদায়াদ হও, আমিষদায়াদ নহে। তোমাদের প্রতি আমার এই অনুকম্পা : ‘আমার শ্রাবকগণ ধর্মদায়াদ হউক, আমিষদায়াদ নহে।’ ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ইহা বিবৃত করিয়া সুগত আসন হইতে গাত্রোত্থান করিয়া বিহারে প্রবেশ করিলেন।

৪. ভগবান প্রস্থান করিলে পর অচিরে আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘বন্ধুগণ’। প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বন্ধুভাবে আয়ুষ্মান সারিপুত্রকে তাঁহাদের সম্মতি জানাইলেন। সারিপুত্র কহিলেন, “‘কীসে বিবেক-বৈরাগ্যরত’ শাস্তার শিষ্যগণ বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন না, এবং কী করিলেই বা তাঁহারা তাহা অনুশিক্ষা করেন?” তদুত্তরে ভিক্ষুগণ বলিলেন, ‘ওহে, আমরা দূরদেশ হইতে আয়ুষ্মান সারিপুত্রের নিকটে ভগবদ্ভাষিত এই বাক্যের অর্থ জানিবার জন্য আসিয়াছি। আয়ুষ্মান সারিপুত্রই বরং ইহার অর্থ প্রতিভাত করুন, যাহা শ্রবণ করিয়া ভিক্ষুগণ অবধারণ করিবেন।’ ‘বন্ধুগণ, তাহা হইলে তোমরা শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনোনিবেশ করো, আমি বিবৃত করিতেছি।’ ‘তথাস্তু’ বলিয়া ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে সম্মতিজ্ঞাপন করিলেন। আয়ুষ্মান সারিপুত্র কহিতে লাগিলেন :

৫. বন্ধুগণ, বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার সে-সকল শিষ্যই বিবেক-বৈরাগ্যসাধন শিক্ষা করেন না যাঁহারা স্বয়ং শাস্তা যে-সকল অনাচরণীয় ধর্ম পরিত্যাগ করিতে বলিয়াছেন সে-সকল ধর্ম পরিত্যাগ না করিয়া তাঁহারা দ্রব্যবহুল শিথিলকর্মী হন, অবক্রমণে (অধোগমনে) পুরোগামী হন, বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে পথভ্রষ্ট হন। ত্রিবিধ কারণে স্থবির ভিক্ষুগণ নিন্দাভাজন হন : প্রথম, তাঁহারা বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার শিষ্য হইয়াও বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন না; দ্বিতীয়, শাস্তা যে-সকল অনাচরণীয় ধর্ম পরিত্যাগ করিতে বলিয়াছেন তাঁহারা সেই সকল ধর্ম পরিত্যাগ করেন না; তৃতীয়, তাঁহারা দ্রব্যবহুল ও শিথিলকর্মী, অধোগমনে পুরোগামী এবং বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে পথভ্রষ্ট হন। এই ত্রিবিধ কারণেই স্থবির ভিক্ষুগণ নিন্দাভাজন হইয়া থাকেন। মধ্যবয়স্ক এবং নবীন ভিক্ষুগণ সম্বন্ধেও এইরূপ। বন্ধুগণ, ইহাতেই বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার শিষ্যগণ বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন না।

৬. বন্ধুগণ, কিসে বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার শিষ্যগণ বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন? বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার সে-সকল শিষ্যই বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন, যাঁহারা স্বয়ং শাস্তা যে-সকল অনাচরণীয় ধর্ম পরিত্যাগ করিতে বলিয়াছেন সে-সকল ধর্ম পরিত্যাগ করেন; দ্রব্যবহুল, শিথিলকর্মী, অবক্রমণে (অধোগমনে) পুরোগামী ও পথভ্রষ্ট না হইয়া বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে পুরোগামী হন। ত্রিবিধ কারণে স্থবির ভিক্ষুগণ প্রশংসাভাজন হন : প্রথম, বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার শিষ্যগণ বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন; দ্বিতীয়, স্বয়ং শাস্তা যে-সকল অনাচরণীয় ধর্ম পরিত্যাগ করিতে বলিয়াছেন সে-সকল ধর্ম পরিত্যাগ করেন; তৃতীয়, দ্রব্যবহুল, শিথিলকর্মী, অবক্রমণে (অধোগমনে) পুরোগামী এবং পথভ্রষ্ট না হইয়া বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে পুরোগামী হন। মধ্যবয়স্ক এবং নবীন ভিক্ষু সম্বন্ধেও এইরূপ। বন্ধুগণ, ইহাতেই বিবেক-বৈরাগ্যরত শাস্তার শিষ্যগণ বিবেক-বৈরাগ্যসাধন অনুশিক্ষা করেন।

৭. বন্ধুগণ, পাপকর লোভ এবং পাপকর দ্বেষ, এই লোভ ও দ্বেষের পরিহারের জন্য আছে মধ্যম প্রতিপদ, মধ্যপন্থা, যাহা চক্ষুকরণী, জ্ঞানকরণী এবং যাহা উপশম, অভিজ্ঞা, সম্বোধি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তন করে। সেই মধ্যম প্রতিপদ-মধ্যপন্থা কী যাহা চক্ষুকরণী, জ্ঞানকরণী এবং যাহা উপশম, অভিজ্ঞা, সম্বোধি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তন করে? তাহা এই আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ; যথা : সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক আজীব, সম্যক ব্যায়াম, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। বন্ধুগণ, এই মধ্যম প্রতিপদ-মধ্যপন্থাই চক্ষুকরণী, জ্ঞানকরণী; এবং তাহাই উপশম, অভিজ্ঞা, সম্বোধি ও নির্বাণের অভিমুখে সংবর্তন করে (ধাবিত হয়)।

ক্রোধ এবং ‘উপনাহ’ (ক্রোধান্ধতা), ‘ম্রক্ষ’ এবং ‘পর্যাস’, ঈর্ষা এবং মাৎসর্য, মায়া এবং শাঠ্য, ‘স্তম্ভ’ এবং ‘সংরম্ভ’, মান এবং অতিমান, মদ এবং প্রমাদ সম্বন্ধেও এইরূপ।

আয়ুষ্মান সারিপুত্র ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ তাহা প্রফুল্লমনে শ্রবণ করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলেন।

ধর্মদায়াদ-সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]