আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। ভগবান সমবেত ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ’। ‘হাঁ ভদন্ত’ বলিয়া ওই ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে তাঁহাদের সম্মতি জানাইলেন। ভগবান কহিলেন :
২. হে ভিক্ষুগণ, এই চারি প্রকার ধর্মসমাদান (আছে)। চারি প্রকার কী কী? হে ভিক্ষুগণ, এক প্রকার ধর্মসমাদান আছে যাহা বর্তমানে সুখকর, অনাগতে দুঃখবিপাক; এক প্রকার ধর্মসমাদান আছে যাহা বর্তমানেও দুঃখকর অনাগতেও দুঃখবিপাক; এক প্রকার ধর্মসমাদান আছে যাহা বর্তমানে দুঃখকর, অনাগতে সুখবিপাক; (আর) এক প্রকার ধর্মসমাদান আছে যাহা বর্তমানেও সুখকর অনাগতেও সুখবিপাক।
৩. হে ভিক্ষুগণ, সেই ধর্মসমাদান কী যাহা বর্তমানে সুখকর, অনাগতে দুঃখবিপাক? হে ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা এই মতবাদী, এইরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন :‘কামে দোষ নাই।’ (এই মতানুবর্তী হইয়া) তাঁহারা কামরসপানে প্রবৃত্ত হন। তাঁহারা মৌলিবদ্ধা পরিব্রাজিকাগণের সহিত কামাচারে রত হন। তাঁহারা বলেন, ‘কামে অনাগত-ভয় দেখিয়া মহানুভব শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ কাম-পরিহারের কথা বলেন, জ্ঞানত কাম-পরিত্যাগের উপায় নির্দেশ করেন। কিন্তু এই তরুণী, কোমল-কায় ও ‘লোমশা’ পরিব্রাজিকাগণের বাহুস্পর্শে কত সুখ!’ (এই ভাবিয়া) তাঁহারা কামোপভোগে রত হন। কামোপভোগে রত হইয়া তাঁহারা দেহাবসানে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হন। তাঁহারা তথায় তীব্র দুঃখ, কঠোর বেদনা অনুভব করিতে থাকেন। তখন তাঁহারা এ কথা বলেন, ‘কামে অনাগত-ভয় দেখিয়া মহানুভব শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ কাম-পরিহারের কথা বলেন, জ্ঞানত কাম-পরিত্যাগের উপায় নির্দেশ করেন; (আর) আমরা কামহেতু, কাম-কারণ তীব্র দুঃখ, কঠোর বেদনা অনুভব করিতেছি।’ হে ভিক্ষুগণ, মনে করো গ্রীষ্মের শেষ মাসে মালুর (পত্রলতার) ফল ধরিয়া পক্ক হইল। অতঃপর, হে ভিক্ষুগণ, ওই মালুবীজ কোনো এক শালমূলে পতিত হইল। উহাতে ওই শালবৃক্ষবাসী দেবতা ভীত ও উদ্বিগ্ন হইয়া সন্ত্রাস প্রাপ্ত হইল। অনন্তর ওই শালবৃক্ষবাসী দেবতার মিত্র-পরিজন ও জ্ঞাতিকুটুম্ব, যত আরাম-দেবতা, বনদেবতা, বৃক্ষদেবতা, ওষধি-তৃণ-বনস্পতি-অধিবাসী দেবতা আসিয়া ও সমবেত হইয়া তাঁহাকে এইরূপে আশ্বস্ত করিলেন, ‘মাভৈ! তুমি ভয় করিও না। শালমূলে পতিত মালুবীজ এত অল্প যে তাহা হয়ত ময়ূর গিলিয়া ফেলিবে, অথবা মৃগ ভক্ষণ করিবে, অথবা দাবানল দগ্ধ করিবে, অথবা বনকর্মীগণ তুলিয়া লইবে, অথবা উই উঠিবে, যাহাতে মালুবীজ অবীজে পরিণত হইবে।’ কিন্তু কার্যত ওই মালুবীজ ময়ূরও গিলিল না, মৃগও ভক্ষণ করিল না, দাবানলও দগ্ধ করিল না, বনকর্মীরাও উঠাইল না, উইও উঠিল না, মালুবীজ মালুবীজই রহিল। তাহা সুমেঘের জলে যথাযথভাবে বিরূঢ় হইল। ওই বীজ হইতে তরুণ, কোমল, রোমশ ও বিলম্বী মালুলতা উৎপন্ন হইয়া ওই শালবৃক্ষ বেষ্টন করিয়া বসিল। তখন ওই শালবৃক্ষবাসী দেবতার মনে এই চিন্তা উদিত হইতে পারে : “এ কী হইল! মালুবীজে অনাগত-ভয় দেখিয়া আমার যত মহানুভব মিত্র-পরিজন ও জ্ঞাতিকুটুম্ব, যত আরাম-দেবতা, বনদেবতা, বৃক্ষদেবতা, ওষধি-তৃণ-বনস্পতি-অধিবাসী দেবতা আসিয়া ও সম্মিলিত হইয়া আমাকে এইরূপে আশ্বস্ত করিলেন : ‘মাভৈ! তুমি ভয় করিও না। শালমূলে পতিত মালুবীজ এত অল্প যে তাহা হয়ত ময়ূর গিলিয়া ফেলিবে, অথবা মৃগ ভক্ষণ করিবে, অথবা দাবানল দগ্ধ করিবে, অথবা বনকর্মীরা উঠাইয়া লইবে, অথবা উই উঠিবে, যাহাতে মালুবীজ অবীজে পরিণত হইবে।’ [কিন্তু দেখিতেছি] এই তরুণ, মৃদুকায়, লোমশ ও শাখাবিলম্বী মালুলতার সংস্পর্শ সুখদ।” মালুলতা ওই শালবৃক্ষকে পরিবেষ্টন করিল। মালুলতা ওই শালবৃক্ষ পরিবেষ্টন করিয়া শালশাখার উপর বিটপী (ছত্র) নির্মাণ করিয়া (নিম্নে) অবঘন জন্মাইয়া ওই শালবৃক্ষের বৃহৎ কাণ্ড প্রদালিত করিল। তখন ওই শালবৃক্ষবাসী দেবতার মনে এই চিন্তা হইতে পারে : “মালুবীজে অনাগত-ভয় দেখিয়া আমার যত মহানুভব মিত্র-পরিজন ও জ্ঞাতিকুটুম্ব, যত আরাম-দেবতা, বনদেবতা, বৃক্ষদেবতা, ওষধি-তৃণ-বনস্পতি-অধিবাসী দেবতা আসিয়া ও সম্মিলিত হইয়া আমাকে এইরূপে আশ্বস্ত করিলেন : ‘মাভৈ! তুমি ভয় করিও না। শালমূলে পতিত মালুবীজ এত অল্প যে তাহা হয়ত ময়ূর গিলিয়া ফেলিবে, অথবা মৃগ ভক্ষণ করিবে, অথবা দাবানল দগ্ধ করিবে, অথবা বনকর্মীরা উঠাইয়া লইবে, অথবা উই উঠিবে, যাহাতে মালুবীজ অবীজে পরিণত হইবে।’ (অথচ) আমি মালুবীজ-হেতু তীব্র দুঃখ ও কঠোর বেদনা অনুভব করিতেছি।” সেইরূপ, হে ভিক্ষুগণ, কতিপয় শ্রমণ-ব্রাহ্মণ আছেন যাঁহারা এই মতবাদী, এইরূপ দৃষ্টিসম্পন্ন : ‘কামে দোষ নাই।’ [এই মতানুবর্তী হইয়া] তাঁহারা কামরসপানে প্রবৃত্ত হন। তাঁহারা মৌলিবদ্ধা পরিব্রাজিকাগণের সহিত কামাচারে রত হন। তাঁহারা বলেন, ‘কেন কামে অনাগত-ভয় দেখিয়া মহানুভব শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ কাম পরিহারের কথা নির্দেশ করেন? কিন্তু এই তরুণী, কোমলকায় ও লোমশা পরিব্রাজিকাগণের বাহুস্পর্শে কত সুখ।’ [এই ভাবিয়া] তাঁহারা কাম-উপভোগে রত হন। কাম-উপভোগে রত হইয়া তাঁহারা দেহাবসানে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হন। তাঁহারা তথায় তীব্র দুঃখ, কঠোর বেদনা অনুভব করিতে থাকেন। তখন তাঁহারা এ কথা বলেন, ‘কামে অনাগত-ভয় দেখিয়া মহানুভব শ্রমণ-ব্রাহ্মণগণ কাম পরিহারের উপায় নির্দেশ করেন; (আর) আমরা কামহেতু, কাম-কারণ তীব্র দুঃখ, কঠোর বেদনা অনুভব করিতেছি।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহাকেই বলে সেই ধর্মসমাদান যাহা বর্তমানে সুখকর, অনাগতে দুঃখবিপাক।
৪. হে ভিক্ষুগণ, সেই ধর্মসমাদান কী যাহা বর্তমানে দুঃখকর অনাগতেও দুঃখবিপাক? হে ভিক্ষুগণ, এখানে কেহ কেহ মুক্তচারী ও হস্তাবলেহী অচেলক হন। ‘ভদন্ত, আসুন, ভিক্ষা গ্রহণ করুন’ বলিলে ভিক্ষান্ন গ্রহণ করেন না, পূর্ব হইতে কেহ ভিক্ষান্ন প্রদানের জন্য অপেক্ষা করিয়া থাকিলে সে ভিক্ষান্ন গ্রহণ করেন না, তাঁহাদের জন্য ভিক্ষান্ন প্রস্তুত করা হইয়াছে বলিয়া জানাইলে তাহা গ্রহণ করেন না, কোনো নিমন্ত্রণও গ্রহণ করেন না, কুম্ভিমুখ হইতে ভিক্ষা গ্রহণ করেন না (পাছে তাহা হাতার আঘাতে ব্যথা পায়), কটোরাভ্যন্তর হইতে ভিক্ষা গ্রহণ করেন না (পাছে তাহা চামচের আঘাতে ব্যথা পায়), উনান মধ্যে রাখিয়া ভিক্ষা দিলে তাহা গ্রহণ করেন না (পাছে সে উনানে পড়িয়া যায়), মুষলমধ্যে রাখিয়া ভিক্ষা দিলে তাহা গ্রহণ করেন না, যেখানে দুইজন ভোজন করিতেছে তন্মধ্যে একজনকে ভোজন ত্যাগ করিয়া উঠিয়া ভিক্ষা দিতে হইলে তাহা গ্রহণ করেন না (পাছে তাহার আহার নষ্ট হয়), গর্ভবতী স্ত্রীলোক ভিক্ষা দিলে তাহা গ্রহণ করেন না (পাছে গর্ভস্থ সন্তান কষ্ট পায়), শিশুকে স্তন্যপান করাইবার সময় ভিক্ষা দিলে তাহা গ্রহণ করেন না (পাছে শিশুর কষ্ট হয়), স্বামী-সহবাস কালে স্ত্রীলোক হইতে ভিক্ষা গ্রহণ করেন না (পাছে তাহার রতিসুখে বিঘ্ন ঘটে), ঘোষিত ‘ভাণ্ডার’ হইতে ভিক্ষা গ্রহণ করেন না, যেখানে আহারের আশায় কুক্কুর দাঁড়াইয়া থাকে, যেখানে মক্ষিকা আহার-উদ্দেশ্যে একত্রে সঞ্চরণ করে সেখানে ভিক্ষা গ্রহণ করেন না, সুরা, মৈরেয় ও মদ্য পান করেন না, মাত্র এক গৃহ হইতে সংগৃহীত ভিক্ষান্ন হইতে এক গ্রাস ভোজন করেন… মাত্র সপ্ত গৃহ হইতে সংগৃহীত ভিক্ষান্ন হইতে সাত গ্রাস ভোজন করেন, মাত্র এক দত্তিতে দিনযাপন করেন… মাত্র সাত দত্তিতে দিনযাপন করেন, এক দিন অন্তর, দুই দিন অন্তর,… সপ্তাহ অন্তর, এইরূপে অর্ধমাস অন্তর অন্তর ভিক্ষান্ন ভোজন-নিরত হইয়া অবস্থান করেন। শাকভোজী, শ্যামাকভোজী, নীবারভোজী, দর্দুরভোজী, শৈবালভোজী, কণভোজী, আচামভোজী, পিণ্যাকভোজী, তৃণভোজী, গোময়ভোজী, ফলমূলাহারী কিংবা ভূপতিত-ফলভোজী হইয়া দিনযাপন করেন। শাণ-বাকচেল পরিধান করেন, মশানলব্ধ বসন পরিধান করেন, শবাচ্ছাদন পরিধান করেন, পাংশুকূল পরিধান করেন, তিরীট (বল্কল) পরিধান করেন, অজিন পরিধান করেন, কুশচীর, বাকচীর, ফলকচীর পরিধান করেন, কেশকম্বল পরিধান করেন, ব্যালকম্বল পরিধান করেন, উলূকপক্ষ-নির্মিত বসন পরিধান করেন, কেশ-শ্মশ্রু উৎপাটনে নিরত হন, উদ্ভ্রষ্ট হইয়া আসন পরিত্যাগী হন, উৎকুটিক হইয়া উৎকুটিক সাধনে নিরত হন, কণ্টকশায়ী হইয়া কণ্টক-শয্যায় শয়ন করেন, দিবসে তিনবার উদকাবরোহণ কার্যে নিরত হন। এইরূপে বহুপ্রকার, বহুবিধ কায়তাপন পরিতাপন অভ্যাসে নিযুক্ত হইয়া বিচরণ করেন। [ফলে] দেহাবসানে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হন। হে ভিক্ষুগণ, ইহাকেই বলে সেই ধর্মসমাদান যাহা বর্তমানেও দুঃখকর অনাগতেও দুঃখবিপাক।
৫. হে ভিক্ষুগণ, সেই ধর্মসমাদান কী যাহা বর্তমানে দুঃখকর, অনাগতে সুখবিপাক? হে ভিক্ষুগণ, এখানে কেহ কেহ প্রকৃতিতে তীব্ররাগজাতীয় হইয়া অনুক্ষণ রাগজ দুঃখ-দৌর্মনস্য অনুভব করেন, প্রকৃতিতে তীব্রমোহজাতীয় হইয়া অনুক্ষণ মোহজ দুঃখ-দৌর্মনস্য অনুভব করেন। দুঃখ-দৌর্মনস্য দ্বারা স্পৃষ্ট হইয়া অশ্র্বসিক্তমুখে রোদন করিতে করিতে পরিপূর্ণ পরিশুদ্ধ ব্রহ্মচর্য আচরণ করেন, [এবং] দেহাবসানে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হন। হে ভিক্ষুগণ, ইহাকেই বলে সেই ধর্মসমাদান যাহা বর্তমানে দুঃখকর, অনাগতে সুখবিপাক।
৬. হে ভিক্ষুগণ, সেই ধর্মসমাদান কী যাহা বর্তমানেও সুখকর অনাগতেও সুখবিপাক? এখানে কেহ কেহ প্রকৃতিতে তীব্ররাগজাতীয় নহেন [বলিয়া] অনুক্ষণ রাগজ দুঃখ-দৌর্মনস্য অনুভব করেন না; প্রকৃতিতে তীব্রদ্বেষজাতীয় নহেন [বলিয়া] অনুক্ষণ দ্বেষজ দুঃখ-দৌর্মনস্য অনুভব করেন না; প্রকৃতিতে তীব্রমোহজাতীয় নহেন [বলিয়া] অনুক্ষণ মোহজ দুঃখ-দৌর্মনস্য অনুভব করেন না। এহেন ব্যক্তি কাম হইতে বিবিক্ত হইয়া, অকুশল ধর্ম হইতে বিবিক্ত হইয়া সবিতর্ক, সবিচার, প্রীতিসুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন; বিতর্ক-বিচার উপশমে অধ্যাত্ম-সম্প্রসাদী, চিত্তের একীভাব-আনয়নকারী নির্বিতর্ক, নির্বিচার, সমাধিজ প্রীতিসুখমণ্ডিত দ্বিতীয় ধ্যান, ক্রমে তৃতীয় ধ্যান ও চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া তাহাতে বিচরণ করেন। তিনি দেহাবসানে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হন। হে ভিক্ষুগণ, ইহাকেই বলে সেই ধর্মসমাদান যাহা বর্তমানেও সুখকর অনাগতেও সুখবিপাক। হে ভিক্ষুগণ, ইহাই চতুর্বিধ ধর্মসমাদান।
ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন। ভিক্ষুগণ তাহা শ্রবণ করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলেন।
ক্ষুদ্রধর্মসমাদান-সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ