লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [২৭]

মীমাংসক-সূত্র

আমি এইরূপ শুনিয়াছি।

১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। তথায় ভগবান ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ’। ‘হাঁ ভদন্ত’ বলিয়া প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ তাঁহাদের সম্মতি জানাইলেন। ভগবান কহিলেন :

২. হে ভিক্ষুগণ, পরচিত্তগতি-অবিদিত মীমাংসক ভিক্ষুর পক্ষে তথাগত-বিষয়ে গবেষণা করা কর্তব্য, তিনি কি সম্যকসম্বুদ্ধ কিংবা সম্যকসম্বুদ্ধ নন ইহা বিশেষভাবে জানিবার জন্য। ‘প্রভো, ভগবানই আমাদের ধর্মের মূল উৎস, তিনিই ইহার নেতা, তিনিই প্রতিশরণ। অতএব প্রভো, ভগবানই স্বয়ং কথিত বিষয়ের অর্থ পরিস্ফুট করুন, ভগবৎ-প্রমুখাৎ শ্রবণ করিয়া ভিক্ষুগণ তাহা অবধারণ করিবেন।’ ‘তাহা হইলে, হে ভিক্ষুগণ, তোমরা শ্রবণ করো, উত্তমরূপে মনোনিবেশ করো, আমি তাহা বিবৃত করিতেছি।’ ‘যথা আজ্ঞা, প্রভো’ বলিয়া ভিক্ষুগণ প্রত্যুত্তরে তাঁহাদের সম্মতি জানাইলেন। ভগবান কহিলেন :

৩. হে ভিক্ষুগণ, পরচিত্তগতি-অবিদিত মীমাংসক ভিক্ষুর পক্ষে তথাগত-সম্পর্কে দুই বিষয়ে গবেষণা করা কর্তব্য : চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম। যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম সংক্লিষ্ট তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিংবা নাই? তাহা যথার্থ অনুসন্ধান করিয়া তিনি জানিতে পারেন যে, যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম সংক্লিষ্ট তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান নাই। যতদূর অনুসন্ধান করিয়া তিনি ইহা জানিতে পারেন তিনি তদতিরিক্ত অনুসন্ধান করেন : যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম বিমিশ্র (কখনো কৃষ্ণ, কখনো-বা শুক্ল) তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিংবা নাই? তাহা যথার্থ অনুসন্ধান করিয়া তিনি জানিতে পারেন যে, তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান নাই। যতদূর অনুসন্ধান করিয়া তিনি তাহা জানিতে পারেন তিনি তদতিরিক্ত অনুসন্ধান করেন : যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম পরিশুদ্ধ তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিংবা নাই? তাহা যথার্থ অনুসন্ধান করিয়া তিনি জানিতে পারেন যে, তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে। যতদূর অনুসন্ধান করিয়া তিনি তাহা জানিতে পারেন তিনি তদতিরিক্ত অনুসন্ধান করেন : এই আয়ুষ্মান শাস্তা দীর্ঘকাল ব্যাপিয়া কুশল ধর্ম-সমাপন্ন কিংবা মাত্র অধুনা-সমাপন্ন? তাহা যথার্থ অনুসন্ধান করিয়া তিনি জানিতে পারেন যে, এই আয়ুষ্মান শাস্তা দীর্ঘকাল ব্যাপিয়া কুশল ধর্ম-সমাপন্ন, মাত্র অধুনা-সমাপন্ন নহেন। যতদূর অনুসন্ধান করিয়া তিনি তাহা জানিতে পারেন তিনি তদতিরিক্ত অনুসন্ধান করেন : ‘এই যে আমাদের জ্ঞাত, খ্যাত, যশস্বী শাস্তা তাঁহার মধ্যে আদীনব (পাপ-উপদ্রব) আছে কি?’ হে ভিক্ষুগণ, তাবৎ ভিক্ষুর মধ্যে কোনো আদীনব থাকে না যাবৎ তিনি জ্ঞাত, খ্যাত, যশস্বী হন না। যখনই, হে ভিক্ষুগণ, ভিক্ষু জ্ঞাত, খ্যাত যশস্বী হন তখনোই তাঁহার মধ্যে কতকগুলি আদীনব বিদ্যমান থাকে। তাহা যথার্থ অনুসন্ধান করিয়া তিনি জানিতে পারেন যে, এই আয়ুষ্মান ভিক্ষু জ্ঞাত, খ্যাত, যশস্বী, কিন্তু তাঁহার মধ্যে কোনো আদীনব বিদ্যমান নাই। যতদূর অনুসন্ধান করিয়া তিনি তাহা জানিতে পারেন তিনি তদতিরিক্ত অনুসন্ধান করেন : এই আয়ুষ্মান ভিক্ষু অভয়পদ লাভ করিয়াই কি উপরত, ভয়বশত উপরত নহেন; বীতরাগ হইয়াছেন, রাগক্ষয় করিয়াছেন বলিয়াই কি কামসেবা করেন না? তাহা যথার্থ অনুসন্ধান করিয়া তিনি জানিতে পারেন যে, এই আয়ুষ্মান ভিক্ষু অভয়পদ লাভ করিয়া উপরত, ভয়বশত উপরত নহেন; বীতরাগ হইয়াছেন, রাগক্ষয় করিয়াছেন বলিয়া কামসেবা করেন না। হে ভিক্ষুগণ, যদি ওই ভিক্ষুকে অপরে জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনার যুক্তির আকার এবং অন্বয় কী যাহাতে আপনি বলিতেছেন-অভয়পদ লাভ করিয়া এই আয়ুষ্মান ভিক্ষু উপরত, ভয়বশত উপরত নহেন; বীতরাগ হইয়াছেন, রাগক্ষয় করিয়াছেন বলিয়া কামসেবা করেন না।’ হে ভিক্ষুগণ, ইহার যথার্থ উত্তর দিতে গিয়া ভিক্ষু এ কথা বলিবেন : “এই আয়ুষ্মান ভিক্ষু সংঘমধ্যে অবস্থান করুন অথবা একাই থাকুন, যাঁহারা সুগত এবং যাঁহারা দুর্গত, যাঁহারা তথায় গণাচার্য, এখানে যাঁহাদের কেহ কেহ আমিষলোভী, আমিষলিপ্ত, তিনি কাহাকেও তৎকারণ অবজ্ঞা করেন না। ভগবৎ-প্রমুখাৎ আমি ইহা শুনিয়াছি, ভগবৎ-প্রমুখাৎ ইহা গ্রহণ করিয়াছি। (তিনি বলিয়াছেন) ‘অভয়পদ লাভ করিয়া আমি উপরত, ভয়বশত নহে; বীতরাগ হইয়া, রাগক্ষয় করিয়া আমি কামসেবা করি না।’”

৪. সে-স্থলে, হে ভিক্ষুগণ, তথাগতকে উপরোত্তর প্রশ্ন করা কর্তব্য : যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম সংক্লিষ্ট (মলিন) তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিংবা নাই? হে ভিক্ষুগণ, এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে গিয়া তিনি এ কথা বলিবেন যে, যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম সংক্লিষ্ট তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান নাই। যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম বিমিশ্র তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিংবা নাই? হে ভিক্ষুগণ, এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে গিয়া তিনি এ কথা বলিবেন যে, যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম বিমিশ্র তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান নাই। যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম পরিশুদ্ধ তাহা তথাগতের মধ্যে বিদ্যমান আছে কিংবা নাই? হে ভিক্ষুগণ, এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর দিতে গিয়া তিনি এ কথা বলিবেন যে, যে-সকল চক্ষু এবং শ্রোত্র-বিজ্ঞেয় ধর্ম পরিশুদ্ধ তাহা তথাগতের মধ্যে আছে, ‘তাহা আমার দৃষ্টিপথে, তাহা আমার দৃষ্টিগোচরে, কিন্তু আমি তাহাতে তন্ময় নহি।’ হে ভিক্ষুগণ, শ্রাবকের পক্ষে এই মতবাদী শাস্তার নিকট উপস্থিত হওয়া কর্তব্য ধর্মশ্রবণের জন্য। শাস্তা তাঁহাকে উত্তরোত্তর উৎকৃষ্ট-অনুৎকৃষ্ট, কৃষ্ণ-শুক্ল ধর্মোপদেশ প্রদান করেন। হে ভিক্ষুগণ, শাস্তা ভিক্ষুকে যেমন যেমন উত্তরোত্তর উৎকৃষ্ট-অনুৎকৃষ্ট, সবিপাক কৃষ্ণ-শুক্ল ধর্মোপদেশ প্রদান করেন তেমন তেমন তিনি ওই ধর্ম অভিজ্ঞা দ্বারা জানিয়া উহার কোনো কোনোটিতে নিষ্ঠা লাভ করেন, শাস্তার প্রতি তাঁহার চিত্ত প্রসন্ন হয়-সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান, সুব্যাখ্যাত ধর্ম, সুপ্রতিপন্ন শিষ্যসংঘ। হে ভিক্ষুগণ, যদি ওই ভিক্ষুকে অপরে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আয়ুষ্মান ভিক্ষুর কী কারণ আছে, কী যুক্তি আছে যাহাতে তিনি এ কথা বলিলেন : সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান, সুব্যাখ্যাত ধর্ম, সুপ্রতিপন্ন শিষ্যসংঘ!’ তাহা হইলে, হে ভিক্ষুগণ, এইভাবে উত্তর দিলেই তিনি যথার্থ উত্তর দিবেন : ‘বন্ধু, আমি যেখানে ভগবান ছিলেন সেখানে ধর্মশ্রবণের জন্য উপস্থিত হই; ভগবান আমাকে উত্তরোত্তর, উৎকৃষ্ট-অনুৎকৃষ্ট, সবিপাক কৃষ্ণ-শুক্ল ধর্মোপদেশ প্রদান করেন। বন্ধু, যেমন যেমন ভগবান আমাকে উত্তরোত্তর, উৎকৃষ্ট-অনুৎকৃষ্ট, সবিপাক কৃষ্ণ-শুক্ল ধর্মোপদেশ প্রদান করেন তেমন তেমন আমি ওই ধর্ম অভিজ্ঞা দ্বারা জানিয়া উহার কোনো কোনোটিতে নিষ্ঠা লাভ করি, শাস্তার প্রতি আমার চিত্ত প্রসন্ন হয় : সম্যকসম্বুদ্ধ ভগবান, সুব্যাখ্যাত ধর্ম, সুপ্রতিপন্ন শিষ্যসংঘ।’

৫. হে ভিক্ষুগণ, এই এই আকারে, এই এই পদব্যঞ্জনে তথাগতের প্রতি যে কাহারও শ্রদ্ধা নিবিষ্ট, সঞ্জাতমূল, সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তাহাকেই বলে আকার-বিশিষ্ট, দর্শনমূলক, দৃঢ় শ্রদ্ধা, যাহা কোনো শ্রমণ কিংবা ব্রাহ্মণ, দেবতা, মার কিংবা ব্রহ্মা, জগতে কেহই টলাইতে পারে না। এইরূপেই, হে ভিক্ষুগণ, তথাগতের স্বরূপ অন্বেষণ করিতে হয় এবং এইরূপেই তথাগতের স্বভাব সুগবেষিত হয়।

ভগবান ইহা বিবৃত করিলেন; ওই ভিক্ষুগণ তাহা প্রসন্নমনে শ্রবণ করিয়া আনন্দ প্রকাশ করিলেন।

মীমাংসক-সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]