আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
১. একসময় ভগবান ভর্গরাজ্যে অবস্থান করিতেছিলেন, শিশুমারগিরে, ভেসকলাবন মৃগদাবে। সেই সময়ে আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়ন উন্মুক্ত আকাশতলে পাদচারণ করিতেছিলেন। তখন পাপাত্মা মার আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়নের কুক্ষিগত, জঠরপ্রবিষ্ট হইল। আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়নের মনে চিন্তা হইল : ‘একি! আমার কুক্ষিতে যেন গুরুগুরু (ভারী ভারী) কী রহিয়াছে, মনে হইতেছে যেন তাহা এক মাসের আহারে পরিপূর্ণ।’ অনন্তর আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়ন চঙ্ক্রমণ (পাদচারণ-স্থান) হইতে নামিয়া বিহারে প্রবেশ করিয়া নির্দিষ্ট আসনে উপবেশন করিলেন। উপবিষ্ট হইয়া তিনি স্বত-ই পাপাত্মা মারের প্রতি সম্যক মনোনিবেশ করিলেন।
২. আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়ন দেখিতে পাইলেন যে, পাপাত্মা মারই তাঁহার কুক্ষিগত, জঠরপ্রবিষ্ট হইয়াছে। তাহা দেখিয়া তিনি পাপাত্মা মারকে কহিলেন, ‘বাহির হও পাপাত্মা, বাহির হও পাপাত্মা, তুমি তথাগতকে ব্যথিত করিও না, তথাগতের শ্রাবকগণের প্রতি বিদ্বেষ করিও না, তুমি তোমার দীর্ঘকাল দুঃখ ও অহিতের কারণ উৎপন্ন হইতে দিও না।’ তখন পাপাত্মা মারের মনে হইল : এই শ্রমণ আমাকে না জানিয়া না দেখিয়াই বলিতেছেন, বাহির হও পাপাত্মা, বাহির হও পাপাত্মা, তুমি তথাগতকে ব্যথিত করিও না, তুমি তোমার দীর্ঘকাল দুঃখ ও অহিতের কারণ উৎপন্ন হইতে দিও না। তাঁহার যিনি শাস্তা তিনিই আমাকে এত সত্বর জানিতে পারেন না, কী করিয়া তাঁহার এই শ্রাবক আমাকে জানিতে পারিবেন?’ আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়ন পাপাত্মা মারকে কহিলেন, ‘আমি তথাগতের শ্রাবক হইলেও তোমাকে আমি জানি। তুমি যে পাপাত্মা মার। তোমার মনে হইতেছে, বুঝি এই শ্রমণ তোমাকে না জানিয়া না দেখিয়াই বলিতেছেন, বাহির হও পাপাত্মা, বাহির হও পাপাত্মা ইত্যাদি।’ তখন পাপাত্মা মারের মনে হইল : ‘এই শ্রমণ আমাকে জানিয়া এবং দেখিয়াই বলিতেছেন, বাহির হও পাপাত্মা, বাহির হও পাপাত্মা ইত্যাদি।’ অনন্তর পাপাত্মা মার আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়নের কুক্ষি হইতে নির্গত হইয়া বাহিরে পর্ণশালার কপাটে গিয়া দাঁড়াইল।
৩. আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়ন দেখিতে পাইলেন যে, পাপাত্মা মার বাহিরে পর্ণশালার কপাটে গিয়া দাঁড়াইয়াছে। তাহা দেখিয়া তিনি পাপাত্মা মারকে কহিলেন, ‘এখনো পাপাত্মা আমি তোমাকে দেখিতে পাইতেছি। তুমি মনে করিও না যে আমি তোমাকে দেখিতেছি না। তুমি এই পর্ণশালার কপাটে গিয়া দাঁড়াইয়া আছ। পুরাকালে আমি দূষী নামে মার ছিলাম, কালী ছিল আমার ভগিনী, তুমি ছিলে আমার ভগিনীর পুত্র ভাগিনেয়। সেই সময়ে জগতে ভগবান ককুৎসন্ধ সম্যকসম্বুদ্ধরূপে আবির্ভূত হইয়াছিলেন। তাঁহার বিদূর এবং সঞ্জীব নামে মহাশ্রাবকযুগল ভদ্রযুগল ছিলেন। তাঁহার শ্রাবকগণের মধ্যে ধর্মদেশনার ক্ষমতায় আয়ুষ্মান বিদূরের সমকক্ষ কেহ ছিলেন না। এই কারণে আয়ুষ্মান বিদূরের বিদূর (বিধুর, অসমধুর, অসমপ্রাজ্ঞ) খ্যাতি উৎপন্ন হইয়াছিল। আয়ুষ্মান সঞ্জীব অরণ্যগত, বৃক্ষমূলগত অথবা শূন্যাগারগত হইয়া অনায়াসে সংজ্ঞা-বেদয়িত-নিরোধসমাপত্তি লাভ করিতেন। একদা আয়ুষ্মান সঞ্জীব এক বৃক্ষমূলে সংজ্ঞা-বেদয়িত-নিরোধসমাপত্তি লাভ করিয়া সমাসীন ছিলেন। যত গোপালক, পশুপালক, কৃষক ও পথিক দেখিতে পাইল যে আয়ুষ্মান সঞ্জীব ওই বৃক্ষমূলে সংজ্ঞা-বেদয়িত-নিরোধসমাপত্তি লাভ করিয়া আসীন আছেন। তাহা দেখিয়া তাহাদের মনে এই চিন্তা উদিত হইল : ‘ইহা বড়ই আশ্চর্যকর, বড়ই অদ্ভুত যে, এই শ্রমণ উপবিষ্ট অবস্থাতেই কালপ্রাপ্ত হইয়াছেন। এখন আমরা তাঁহাকে দাহ করিব।’ এই ভাবিয়া তাহারা তৃণ, কাষ্ঠ এবং শুষ্ক গোময় সংগ্রহ করিয়া আয়ুষ্মান সঞ্জীবের দেহের উপর চিতা সজ্জিত করিয়া তাহাতে অগ্নি প্রদান করিয়া প্রস্থান করিল। আয়ুষ্মান সঞ্জীব ওই রাত্রিগতে সেই সমাপত্তি হইতে উঠিয়া পরিহিত চীবরসমূহ ঝাড়িয়া পূর্বাহ্ণে বহির্গমন-বাস পরিধান করিয়া পাত্রচীবর লইয়া ভিক্ষান্নসংগ্রহের জন্য গ্রামে প্রবেশ করিলেন। ওই গোপালক, পশুপালক, কৃষক ও পথিকগণ দেখিতে পাইল যে আয়ুষ্মান সঞ্জীব ভিক্ষান্নসংগ্রহের জন্য (লোকালয়ে) বিচরণ করিতেছেন। তাহা দেখিয়া তাহাদের মনে হইল : ‘ইহা বড়ই আশ্চর্যকর, বড়ই অদ্ভুত যে, এই শ্রমণ সমাসীন অবস্থায় কালপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন, এখন তিনি পুনর্জীবিত হইয়াছেন।’ এই কারণে আয়ুষ্মান সঞ্জীবের সঞ্জীব খ্যাতি উৎপন্ন হইয়াছিল।
৪. অনন্তর, হে পাপাত্মন, দূষী মারের মনে চিন্তা হইল : ‘আমি এই সকল শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুর গতি-অগতি জানি না। অতএব আমি এখন আবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণকে প্ররোচিত করিব : তোমরা আইস, শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণের উপর আক্রোশ প্রকাশ করো, তাঁহাদিগকে গালি দাও, রাগাও, ব্যথিত করো। তোমরা আক্রোশ প্রকাশ করিলে, গালি দিলে, রাগাইলে এবং ব্যথিত করিলে অল্পেই তাঁহাদের চিত্তের ভাবান্তর হইবে, যাহাতে দূষী মার তাঁহাদের মধ্যে ছিদ্র খুঁজিয়া পাইবে।’ এই স্থির করিয়া দূষী মার আবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণকে তাহা করিতে প্ররোচিত করিল। অতঃপর, হে পাপাত্মন, ওই ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ দূষী মার কর্তৃক প্ররোচিত হইয়া শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণের উপর আক্রোশ প্রকাশ করিতে, তাঁহাদিগকে গালি দিতে, রাগাইতে ও ব্যথিত করিতে থাকে : “এই মুণ্ডিতমস্তক শ্রমণগণ ইতর, কৃষ্ণজাতীয়, ব্রহ্মার পাদজাত (শূদ্রাধম)। ‘আমরা ধ্যায়ী, ধ্যায়ী আমরা’ মনে করিয়া ঘাড় হেঁট করিয়া, অধোমুখে, অলসভাবে ধ্যান করিতে, প্রধ্যান করিতে, নিধ্যান করিতে, অপধ্যান করিতে থাকে। যেমন উলূক মূষিক-অন্বেষণে বৃক্ষশাখায়, শৃগাল মৎস্য-অন্বেষণে নদীতীরে, বিড়াল ইন্দুর-অন্বেষণে গৃহসন্ধিতে, সমলস্থানে অথবা আবর্জনারাশিতে, গর্দভ ছিন্নবহ হইয়া সন্ধিস্থলে, সমলস্থানে অথবা আবর্জনারাশিতে ধ্যান করে, প্রধ্যান করে, নিধ্যান করে, অপধ্যান করে, তেমন এই মুণ্ডিতমস্তক শ্রমণগণ ইতর, কৃষ্ণজাতীয়, ব্রহ্মার পাদজাত (শূদ্রাধম)। ‘আমরা ধ্যায়ী, ধ্যায়ী আমরা’ মনে করিয়া ঘাড় হেঁট করিয়া, অধোমুখে, অলসভাবে ধ্যান করিতে, প্রধ্যান করিতে, নিধ্যান করিতে, অপধ্যান করিতে থাকে।” হে পাপাত্মন, সেই সময়ে যে-সকল লোক কালগত হয়, তাহাদের অধিকাংশ দেহাবসানে মৃত্যুর পর অপায় দুর্গতি বিনিপাত নিরয়ে উৎপন্ন হয়।
৫. অনন্তর, হে পাপাত্মন, ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিয়া বলিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, এই ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ দূষী মার কর্তৃক প্ররোচিত হইয়াছে : তোমরা আইস, শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণের উপর আক্রোশ প্রকাশ করো, তাঁহাদিগকে গালি দাও, রাগাও, ব্যথিত করো, তোমরা আক্রোশ প্রকাশ করিলে, গালি দিলে, রাগাইলে, ব্যথিত করিলে অল্পেই তাঁহাদের চিত্তের ভাবান্তর হইবে যাহাতে দূষী মার তাঁহাদের মধ্যে ছিদ্র খুঁজিয়া লইবে। হে ভিক্ষুগণ, তোমরা আইস, মৈত্রীসহগত চিত্তে, করুণাসহগত চিত্তে, মুদিতাসহগত চিত্তে, উপেক্ষাসহগত চিত্তে এক দিক স্ফুরিত করিয়া অবস্থান করো, তথা দ্বিতীয় দিক, তৃতীয় দিক, চতুর্থ দিক, ক্রমে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সকল দিক সর্বতোভাবে সর্বজগৎ মৈত্রীসহগত, করুণাসহগত, মুদিতাসহগত, উপেক্ষাসহগত, বিপুল, মহদ্গত, অপ্রমেয়, অবৈর, অবাধ চিত্তে স্ফুরিত করিয়া অবস্থান করো।’
৬. অনন্তর, হে পাপাত্মন, ওই ভিক্ষুগণ ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক আদিষ্ট ও উপদিষ্ট হইয়া অরণ্যগত, বৃক্ষমূলগত ও শূন্যাগারগত হইয়া মৈত্রীসহগত চিত্তে, করুণাসহগত চিত্তে, মুদিতাসহগত চিত্তে, উপেক্ষাসহগত চিত্তে, এক দিক স্ফুরিত করিয়া, তথা দ্বিতীয় দিক, তৃতীয় দিক, চতুর্থ দিক, ক্রমে ঊর্ধ্ব, অধঃ, তির্যক, সর্বদিক সর্বতোভাবে মৈত্রীসহগত, করুণাসহগত, মুদিতাসহগত, উপেক্ষাসহগত, বিপুল, মহদ্গত, অপ্রমেয়, অবৈর ও অবাধ চিত্তে স্ফুরিত করিয়া অবস্থান করেন।
৭. অনন্তর, হে পাপাত্মন, দূষী মারের মনে এই চিন্তা উদিত হইল : এইরূপে কার্য করিয়াও আমি এই শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণের অগতি কিংবা গতি জানিলাম না। অতএব আমি আবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণকে প্ররোচিত করিব : ‘তোমরা আইস, শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণকে সম্মান করো, গুরুস্থানীয় করো, মান, পূজ। তোমরা তাঁহাদিগকে সম্মান করিলে গুরুস্থানীয় করিলে, মানিলে, পূজিলে অল্পেই তাঁহাদের চিত্তের ভাবান্তর হইবে, যাহাতে দূষী মার তাঁহাদের ছিদ্র খুঁজিয়া পাইবে।’ এই স্থির করিয়া দূষী মার আবিষ্ট হইয়া ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণকে তাহা করিতে প্ররোচিত করিল। অতঃপর, হে পাপাত্মন, ওই ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ দূষী মার কর্তৃক প্ররোচিত হইয়া শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণকে সম্মান করিতে, গুরুস্থানীয় করিতে, মানিতে, পূজিতে থাকে। হে পাপাত্মন, সেই সময়ে যে-সকল লোক কালগত হয় তাহাদের অধিকাংশ দেহাবসানে মৃত্যুর পর সুগতি স্বর্গলোকে উৎপন্ন হয়।
৮. অনন্তর, হে পাপাত্মন, ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিয়া কহিলেন, ‘হে ভিক্ষুগণ, ব্রাহ্মণ-গৃহপতিগণ দূষী মার কর্তৃক প্ররোচিত হইয়াছে-তোমরা আইস, শীলবান কল্যাণধর্মী ভিক্ষুগণকে সম্মান করো, গুরুস্থানীয় করো, মান, পূজ। তোমরা তাঁহাদিগকে সম্মান করিলে, গুরুস্থানীয় করিলে, মানিলে, পূজিলে অল্পেই তাঁহাদের চিত্তের ভাবান্তর হইবে, যাহাতে দূষী মার তাঁহাদের মধ্যে ছিদ্র খুঁজিয়া পাইবে। হে ভিক্ষুগণ, তোমরা আইস, স্বকায়ে অশুভানুদর্শী, আহারে প্রতিকূল-সংজ্ঞী, সর্বলোকে অনভিরতি-সংজ্ঞী, সর্বসংস্কারে অনিত্যদর্শী হইয়া অবস্থান করো।’
৯. অনন্তর, হে পাপাত্মন, ওই ভিক্ষুগণ ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক আদিষ্ট ও উপদিষ্ট হইয়া, অরণ্যগত, বৃক্ষমূলগত ও শূন্যাগারগত হইয়া স্বকায়ে অশুভানুদর্শী, আহারে প্রতিকূল-সংজ্ঞী, সর্বলোকে অনভিরতি-সংজ্ঞী সর্বসংস্কারে অনিত্যদর্শী হইয়া অবস্থান করেন।
১০. অনন্তর, হে পাপাত্মন, ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ পূর্বাহ্ণে বহির্গমন-বাস পরিধান করিয়া, পাত্রচীবর লইয়া অনুগামী শ্রমণ আয়ুষ্মান বিদূরসহ ভিক্ষান্নসংগ্রহের জন্য গ্রামে প্রবেশ করিলেন। তখন, হে পাপাত্মন, দূষী মার জনৈক বালকের মধ্যে আবিষ্ট হইয়া হস্তে ক্ষুদ্র প্রস্তরখ- লইয়া আয়ুষ্মান বিদূরের শিরে প্রহার করিল, তাহাতে তাঁহার শির বিদীর্ণ হইল। অতঃপর, হে পাপাত্মন, আয়ুষ্মান বিদূর বিদীর্ণ রক্তবিগলিত শির লইয়াই ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের ‘পিছু পিছু’ অনুগমন করিলেন। তখন, হে পাপাত্মন, ভগবান ককুৎসন্ধ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ গজেন্দ্র-দৃষ্টিতে পশ্চাৎ অবলোকন করিয়া কহিলেন, ‘এই দূষী মার জানে না তাহার পাপের মাত্রা কত!’ অবলোকনের সঙ্গে সঙ্গেই দূষী মার সে স্থান হইতে চ্যুত হইয়া মহানিরয়ে উৎপন্ন হইল। হে পাপাত্মন, সেই মহানিরয়ের তিনটি নাম-ছয় স্পর্শায়তনও বটে, শঙ্কু-সমাহতও বটে, প্রত্যাত্মবেদনীয়ও বটে। অনন্তর, হে পাপাত্মন, নিরয়পালগণ আমার নিকট আসিয়া কহিল : ‘যখন, মারিষ, শঙ্কু দ্বারা শঙ্কু আপনার হৃদয়ে প্রবিষ্ট হইবে তখন আপনি জানিবেন যে, সহস্রবর্ষ আপনি নিরয়ে পচিয়াছেন।’ সেই আমি বহুবর্ষ, বহুশতবর্ষ, বহুসহস্রবর্ষ সেই মহানিরয়ে পচিয়াছিলাম, দশ-সহস্র-বর্ষ সেই মহানিরয়ের উৎসদে উত্থিত দুঃখবেদনা অনুভব করিয়া পচিয়াছিলাম। তখন, হে পাপাত্মন, আমার দেহ ছিল যেন মানুষের মতো, শীর্ষ ছিল যেন মাছের মতো।
কীদৃশ নিরয় ঘোর যেথা দূষী মার
পচিল পাইল ব্যথা বেদনা অপার
আক্রমণ করি পাপী বিদূর শ্রমণে
আক্রমিয়া ককুৎসন্ধে সম্বুদ্ধে ব্রাহ্মণে?
লৌহশঙ্কু শত শত বিঁধিল শরীর,
সর্ব অঙ্গ বেদনায় হইল অধীর,
ঈদৃশ নিরয় জান যেথা দূষী মার
পচিল, যাতনা পেল বেদনা অপার,
আক্রমণ করি পাপী বিদূর শ্রমণে,
আক্রমিয়া ককুৎসন্ধে সম্বুদ্ধে ব্রাহ্মণে।
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন,
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
অগাধ সলিল-মাঝে বিরাজে বিমান
কল্পস্থায়ী, বর্ণে তাহা বৈদূর্য-সমান
সুরুচির দীপ্তিমান, অতি প্রভাস্বর,
সেথা নৃত্য করে, সেথা গায় নিরন্তর
নানাবর্ণে নানারূপে অপ্সরার দল
অপূর্ব সঙ্গীতে মত্ত নর্তকী-সকল।
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন।
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
বুদ্ধের আদেশক্রমে সংঘের সাক্ষাৎ
কাঁপাইল মৃগারের মাতার প্রাসাদ,
পাদাঙ্গুষ্ঠে অবহেলে, আমি সেই জন
[বুদ্ধের শ্রাবক শাক্যপুত্রীয় শ্রমণ]।
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন,
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
কাঁপাইল বৈজয়ন্তী দেবের ভবন
পাদাঙ্গুষ্ঠে টলমল প্রাসাদ-রতন,
যেবা এই ঋদ্ধিবলে স্তম্ভিত করিল,
দেবগণ যাহে সবে বিস্ময় মানিল,
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন,
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
বৈজয়ন্তে একদা সে গিয়া উত্তরিল,
দেবের প্রাসাদে শক্রে প্রশ্ন জিজ্ঞাসিল-
তৃষ্ণাক্ষয়ে বিমুক্তি কী জানাও সত্বর;
জিজ্ঞাসিত হয়ে শক্র দিল সদুত্তর।
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন,
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
জিজ্ঞাসিল যে বা ব্রহ্মে প্রশ্ন অকপটে
সুরম্য সুধর্মা-দেবসভার নিকটে
‘আজিও সে দৃষ্টি তব পূর্বের মতন,
ব্রহ্মে ছাপি প্রভাস্বর করো কি দর্শন?’
যথার্থ উত্তর ব্রহ্মা করিল তাহার :
‘মারিষ, পূর্বের দৃষ্টি নাহিক আমার,
দেখি ব্রহ্মলোক ছাপি আছে প্রভাস্বর।
ঘুচিয়াছে ভ্রম মম, নির্মল অন্তর;
নিত্য আমি, শাশ্বতাত্মা, ধ্রুব সনাতন,
সেই উক্তি নিন্দনীয় হয়েছে এখন।’
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন,
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
বিমোক্ষ-বলেতে স্পর্শ করেছে যে-জন
সুমের্ব-শিখর আর এই জম্বুবন
কিংবা পূর্ববিদেহেতে করে যারা বাস,
কিংবা অন্য দ্বীপে দুই যাদের নিবাস।
অভিজ্ঞায় জানে সত্য পরম রতন
বুদ্ধের শ্রাবক ভিক্ষু সুগত সুজন,
তাদৃশ ভিক্ষুরে পাপী করি আক্রমণ
কৃষ্ণমার পাবি দুঃখ কঠোর যাতন।
অগ্নি নিজে এই ইচ্ছা করে না কখন :
‘অজ্ঞানে, অবোধ জনে, করিব দাহন।’
মূর্খ নিজে জ্বালে অগ্নি দাহন কারণ,
তা’ই অগ্নি মূঢ়জনে করেরে দাহন।
তেমনি তুমি যে মার করো আস্ফালন,
তথাগতে দশবলে করো আক্রমণ,
নিজে যে হইবে দগ্ধ জান না দুর্জন,
অগ্নির পরশে যথা দগ্ধ মূঢ়জন।
তথাগতে আক্রমণ করি পাপী মার
প্রসবিল শুধু পাপ, অপুণ্য অপার।
তুমি বুঝি মনে ভাব, হে পাপাত্মা মার,
‘পাপ মোর রহিবে না, পাইব নিস্তার।’
পাপ যদি করো তাহা হইবে সঞ্চয়
চিরতরে, হে অন্তক, নাহিক সংশয়।
বুদ্ধজয়-ভোগবাঞ্ছা ছাড় তুমি মার,
ছাড় আশা ভিক্ষুগণে করিবে সংহার।
ইহা বলি দুষ্ট মারে করিল তর্জন
ভেসকলাবনে ভিক্ষু ধীর বিচক্ষণ।
তাহাতে দুর্মন যক্ষ পরাজয় মানি
ওই স্থানে অন্তর্ধান হইল অমনি।
মারতর্জন-সূত্র সমাপ্ত।
ক্ষুদ্রযমক-বর্গ পঞ্চম সমাপ্ত।
মূল-পঞ্চাশ সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ