১৭. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় আয়ুষ্মান আনন্দ বৈশালী নগর সমীপে বেলুব (বেণু) গ্রামে বাস করিতেছিলেন। সেই সময় অট্টক নাগরবাসী দশম গৃহপতি পাটলীপুত্রে উপস্থিত হইলেন কোনো কার্যোপলক্ষে। অতঃপর অট্টক নাগরীক দশম গৃহপতি স্থানীয় কুক্কুটারামে অন্যতর ভিক্ষুর নিকট উপনীত হইলেন; উপস্থিত হইয়া সেই ভিক্ষুকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট দশম গৃহপতি সেই ভিক্ষুকে জিজ্ঞাসা করিলেন :
“ভন্তে, এখন আয়ুষ্মান আনন্দ কোথায় বাস করেন? আমরা আয়ুষ্মান আনন্দকে দেখিতে চাই।”
“গৃহপতি, আয়ুষ্মান আনন্দ বৈশালীর বেলুব গ্রামে অবস্থান করিতেছেন।”
অতঃপর দশম গৃহপতি পাটলীপুত্রে সে কার্য সমাধা করিয়া বৈশালীর বেলুব গ্রামে যথায় আয়ুষ্মান আনন্দ অবস্থান করেন তথায় উপস্থিত হইলেন। উপস্থিত হইয়া আয়ুষ্মান আনন্দকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন।
১৮. একপ্রান্তে উপবিষ্ট দশম গৃহপতি আয়ুষ্মান আনন্দকে প্রশ্ন করিলেন :
“ভন্তে, আনন্দ, সেই ভগবান সর্বজ্ঞ সর্ব্বদর্শী অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ভাষিত কোনো ধর্মতত্ত্ব আছে কি যাহাতে অপ্রমত্ত, বীর্যবান অভিনিবিষ্ট চিত্ত হইয়া অবস্থানকারী ভিক্ষুর অবিমুক্ত চিত্ত বিমুক্ত হয়, অপরিক্ষীণ আসবরাশি পরিক্ষীণ হয় এবং অনুপলব্ধ অনুত্তর যোগক্ষেম (নির্বাণ) ক্রমে উপলব্ধি হয়।”
“নিশ্চয় আছে, হে গৃহপতি, সেই ভগবান সর্বজ্ঞ সর্বদর্শী অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক ভাষিত এক ধর্মমার্গ, যাহাতে অপ্রমত্ত বীর্যবান তৎপর হইয়া অবস্থানকারী ভিক্ষুর অবিমুক্ত চিত্ত বিমুক্ত হয়,… অনুত্তর যোগক্ষেম উপলব্ধি হয়।”
“ভন্তে, আনন্দ,… সেই এক ধর্ম কী, যাহাতে… অনুত্তর যোগক্ষেম প্রাপ্ত হয়?”
১৯. “এখানে গৃহপতি, কোনো ভিক্ষু যাবতীয় কামবাসনা পরিহার করিয়া, অকুশলবৃত্তি হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া সবিতর্ক সবিচার বিবেকজ প্রীতি-সুখমণ্ডিত প্রথম ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন। তদবস্থায় তিনি এই চিন্তা করেন, ‘এই প্রথম ধ্যানও অভিসংস্কৃত-উদ্ভাসিত। যাহা কিছু সংস্কৃত ও উদ্ভাবিত, তাহা অনিত্য, নিরোধধর্মী (ধ্বংসশীল)’ ইহা বুঝিতে পারেন। তিনি তদবস্থায় (শমথ-বিদর্শনে) স্থির থাকিয়া আসবসমূহের ক্ষয় সাধন করেন। যদি আসবের সম্পূর্ণ ক্ষয় সাধন করিতে অসমর্থ হন, তাহা হইলে তিনি সেই শমথ-ধর্মানুরাগ ও বিদর্শন-ধর্মানন্দ দ্বারা পঞ্চবিধ অবরভাগীয় (নিম্নস্তরের) সংযোজন ক্ষয় করিয়া ঔপপাতিক (অ-যোনিসম্ভব) হন, তথায় (শুদ্ধাবাস ব্রহ্মলোকে) পরিনির্বাণ লাভ করেন, সেই লোক হইতে তাঁহাকে আর পুনরাবর্তন করিতে হয় না।”
“গৃহপতি, সেই ভগবান সর্বজ্ঞ সর্বদর্শী অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ এই ধর্মও উপদেশ করিয়াছেন, যাহাতে অপ্রমত্ত, বীর্যবান ও নির্বাণপ্রবণ চিত্ত (পহিতত্ত, প্রেষিতাত্ম) হইয়া অবস্থানকারী ভিক্ষুর অমুক্তচিত্ত বিমুক্ত হয়, অপরিক্ষীণ আসব পরিক্ষীণ হয় এবং অপ্রাপ্ত অনুত্তর যোগক্ষেম অধিগত হয়।” (১)
২০. “গৃহপতি, পুনরায় সেই ভিক্ষু বিতর্ক-বিচারের উপশম করিয়া চিত্তের আধ্যাত্মিক সম্প্রসাদজনক দ্বিতীয় ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন,…।” (২)
পুনরায় গৃহপতি, সেই ভিক্ষু প্রীতির প্রতিও বিরাগ-হেতু তৃতীয় ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন।…।” (৩)
“গৃহপতি, পুনরায় সুখের প্রহান-হেতু কোনো ভিক্ষু যাবতীয় কামবাসনা পরিহার করিয়া, অকুশলবৃত্তি হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া সবিতর্ক সবিচার বিবেকজ প্রীতি-সুখমণ্ডিত চতুর্থ ধ্যান লাভ করিয়া অবস্থান করেন।…।” (৪)
“গৃহপতি, সেই ভিক্ষু পুনঃ মৈত্রী-সহগত চিত্ত দ্বারা এক দিক বিস্ফারিত করিয়া বিহার করে। সেইরূপ দুই দিক, তিন দিক, চারি দিক, এই প্রকারে ঊর্ধ্ব-অধঃ-তির্যকক্রমে সর্বথা সর্বস্থান ব্যাপিয়া সর্বলোক মৈত্রী-সহগত, বিপুল, মহদ্গত, অপ্রমেয়, অবৈর ও অহিংস চিত্ত দ্বারা বিস্ফারিত করিয়া অবস্থান করেন। করুণা-সহগত, মুদিতা-সহগত, উপেক্ষা-সহগত চিত্ত সম্বন্ধেও এইরূপ।” (৫-৬-৭-৮)
“গৃহপতি, পুনঃ সেই ভিক্ষু সর্বতোভাবে রূপ-সংজ্ঞার অতিক্রম করিয়া, প্রতিঘ (হিংসা) সংজ্ঞার অন্তসাধন করিয়া, নানাত্ব সংজ্ঞার প্রতি মনোনিবেশ না দিয়া ‘অনন্ত, আকাশ’-রূপে আকাশ-অনন্ত-আয়তন (ধ্যান) লাভ করিয়া অবস্থান করেন।…।” (৯)
“গৃহপতি, পুনঃ সেই ভিক্ষু সর্বতোভাবে আকাশ-অনন্ত-আয়তন অতিক্রম করিয়া ‘অনন্ত, বিজ্ঞান’ রূপে বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন (ধ্যান) লাভ করিয়া অবস্থান করেন।…।” (১০)
“গৃহপতি, পুনরায় সেই ভিক্ষু সর্বতোভাবে বিজ্ঞান-অনন্ত-আয়তন অতিক্রম করিয়া ‘নাস্তিকিঞ্চি-রূপে আকিঞ্চনায়তন (ধ্যান) লাভ করিয়া অবস্থান করেন। তিনি এইরূপ চিন্তা করেন, ‘এই আকিঞ্চনায়তন সমাপত্তিও অভিসংস্কৃত-উদ্ভাবিত।’ যাহা কিছু সংস্কৃত ও উদ্ভাবিত তাহাই অনিত্য, নিরোধ স্বভাব; ইহা অবগত হন। তিনি সেই অবস্থাতেই আসব-ক্ষয়জ্ঞান লাভ করেন। যদি আসব ক্ষয় করিতে অসমর্থ হন, সেই ধর্মানুরাগ ও ধর্মানন্দ দ্বারা পঞ্চবিধ অধোভাগীয় (নিম্নস্তরের) সংযোজন ক্ষয় করিয়া ঔপপাতিক (অযোনিজ দেব) হন, তথায় (শুদ্ধাবাসে) পরিনির্বাণলাভী সেই লোক হইতে অপুনরাবর্তনশীল হন।”
গৃহপতি, সেই ভগবান সর্বজ্ঞ সর্বদর্শী অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ কর্তৃক দেশিত ইহাও এক ধর্মমার্গ, যাহাতে অপ্রমত্ত, বীর্যবান, প্রেষিতাত্ম হইয়া অবস্থানকারী ভিক্ষুর অবিমুক্ত চিত্ত বিমুক্ত হয়, অপরিক্ষীণ আসব পরিক্ষয় হয় এবং অপ্রাপ্ত অনুত্তর যোগক্ষেম অধিগত হয়।” (১১)
২১. এইরূপ উক্ত হইলে অট্টক নাগর দশম গৃহপতি আয়ুষ্মান আনন্দকে বলিলেন :
“প্রভু আনন্দ, যেমন কোনো ব্যক্তি এক নিধিমুখ (কুম্ভ) অন্বেষণ করিতে গিয়া একইবারে একাদশ নিধিমুখ লাভ করে, সেইরূপ ভন্তে, আমি এক অমৃতদ্বার অন্বেষণ করিতে গিয়া একইবারে একাদশ অমৃতদ্বারের সন্ধান পাইলাম। ভন্তে, যেমন কোনো ব্যক্তির গৃহ একাদশ দ্বারবিশিষ্ট, সেই গৃহে আগুন লাগিলে সে প্রত্যেক দ্বারের সাহায্যেই নিজকে রক্ষা করিতে পারে, সেইরূপ ভন্তে, আমি এই একাদশ অমৃতদ্বারের যেকোনো দ্বারের সাহায্যেই নিজকে স্বস্তি (নিরাপদ) করিতে সমর্থ হইব। এই সকল ভন্তে, অন্য তির্থীয় (মতাবলম্বী) গণও আচার্যের [পূজার] নিমিত্ত আচার্য-ধন (অন্বেষণ করিয়া) আয়োজন করিয়া থাকে; আর আমি আয়ুষ্মান আনন্দকে কেন পূজা করিব না”?
অতঃপর দশম গৃহপতি পাটলিপুত্র ও বৈশালীর ভিক্ষুসংঘকে সম্মিলিত করিয়া স্বহস্ত্তে, উত্তম খাদ্য-ভোজ্য দ্বারা সন্তৃপ্ত ও সম্প্রবারিত করিলেন। এক এক ভিক্ষুকে এক এক চীবরযুগলে আচ্ছাদন করিলেন। আর আয়ুষ্মান আনন্দকে ত্রিচীবরে আচ্ছাদন করিলেন এবং আয়ুষ্মান আনন্দের জন্য পঞ্চ শতার্হ বিহার নির্মাণ করাইলেন।
অট্টক নাগর সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ