লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩২]

জীবক সূত্র

৫১. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান রাজগৃহ সমীপে কোমারভচ্চ (কুমার পোষিত) জীবকের আম্রবনে অবস্থান করিতেছিলেন। সেই সময় জীবক কোমারভচ্চ যেখানে ভগবান আছেন তথায় উপস্থিত হইলেন। উপস্থিত হইয়া ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে উপবেশন করিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট জীবক ভগবানকে বলিলেন :

“ভন্তে, শোনা যায় : ‘শ্রমণ গৌতমোদ্দেশ্যে জীবহত্যা হয়, আর শ্রমণ গৌতম সজ্ঞানে সেই উদ্দেশ্যকৃত মাংস ভোজন করেন, নিমিত্তকর্মের ভাগী হন।’ ভন্তে, যাহারা এরূপ বলে : ‘শ্রমণ গৌতমের উদ্দেশ্যে জীবহত্যা হয়, আর শ্রমণ গৌতম সেই উদ্দেশ্যকৃত মাংস ভোজন করেন, নিমিত্তকর্মের ভাগী হন।’ কেমন ভন্তে, তাহারা ভগবান সম্বন্ধে সত্যবাদী, ভগবানকে মিথ্যা দোষারোপ করে না, যুক্তি-ধর্মানুরূপ ঘোষণা করে এবং আপনার যুক্তিসঙ্গত কোনো বাদানুবাদ (বিজ্ঞদের) নিন্দার কারণ নহে তো?”

৫২. “জীবক, যাহারা এইরূপ বলে : ‘শ্রমণ গৌতমের উদ্দেশ্যে (লোকে) প্রাণিহত্যা করে, আর শ্রমণ গৌতম সজ্ঞানে সেই উদ্দেশ্যকৃত মাংস পরিভোগ করেন, নিমিত্তকর্মের ভাগী হন।’ তাহারা আমার সম্বন্ধে সত্যবাদী নহে, তাহারা অসত্য, অভূত কারণে আমাকে অপবাদ করে। জীবক, আমি তিন কারণে মাংস অপরিভোগ্য বলি; যথা : দৃষ্ট, শ্রুত ও পরিশঙ্কিত। জীবক, এই ত্রিবিধ কারণে আমি মাংস অপরিভোগ্য বলি। জীবক, ত্রিবিধ কারণে আমি মাংস পরিভোগ্য বলে বর্ণনা করি; যথা : অ-দৃষ্ট, অ-শ্রুত, ও অ-পরিশঙ্কিত। জীবক, এই ত্রিবিধ কারণে আমি মাংস পরিভোগ্য বলি।”

৫৩. “জীবক, কোনো ভিক্ষু গ্রাম অথবা নগর আশ্রয়ে বাস করে। সে মৈত্রীসংযুক্ত চিত্তে একদিক বিস্ফুরিত করিয়া বাস করে, তথা দ্বিতীয় দিক, তৃতীয় দিক ও চতুর্থদিক। এইরূপে ঊর্ধ্ব, অধ তির্যক (চতুষ্কোনে), সর্বদিকে, সর্বত্র, সমগ্র জগৎ বৈরী ও বিদ্বেষ বিহীন বিপুল, মহদ্গত, অপ্রমাণ মৈত্রী-সহগত চিত্তে বিস্ফুরিত করিয়া বাস করে। কোনো গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্র তাহার নিকট গিয়া আগামীকল্যের জন্য ভোজনের নিমন্ত্রণ করে। জীবক, ভিক্ষু আকাঙ্ক্ষা করিলে নিমন্ত্রণ স্বীকার করিতে পারে। সে রাত্রি অবসানে পূর্বাহ্ণ সময়ে সেই ভিক্ষু উত্তরীয় পরিধানপূর্বক পাত্র-চীবর লইয়া যেখানে সেই গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্রের নিবাস, তথায় উপস্থিত হয়, সুসজ্জিত আসনে উপবেশন করে। তাহাকে সেই গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্র উত্তম পিণ্ডপাত (খাদ্য ভোজ্য) পরিবেশন করে। তখন তাহার এই ইচ্ছা হয় না, ‘সাধু, বেশ, এই গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্র আমাকে উত্তম পিণ্ডপাত পরিবেশন করুন। অহো, এই গৃহপতি বা গৃহপতিপুত্র আমাকে ভবিষ্যতেও এইরূপ উত্তম পিণ্ডপাত পরিবেশন করুন’ এই ইচ্ছাও তাহার হয় না। সে অ-লুব্ধ, অ-মূর্ছিত হইয়া অনাসক্তভাবে প্রতিকূল বা পরিণামদর্শী হইয়া নিঃসরণ (মুক্তি) জ্ঞানে বিচারপূর্বক সেই পিণ্ডপাত ভোজন করে। তবে জীবক, তুমি কী মনে করো, তখন কি সে ভিক্ষু আত্ম-নিপীড়নার্থ চিন্তা করে, অথবা আত্ম-পর উভয় নিপীড়নার্থ চিন্তা করিতে পারে?”

“তাহা অসম্ভব, ভন্তে,”

“তখন সে ভিক্ষু অনবদ্য আহার গ্রহণ করে নহে কি?”

“হ্যাঁ, ভন্তে, আমি পূর্বে শুনিয়াছি ভন্তে, ‘ব্রহ্মাই মৈত্রীবিহারী (সতত সকলকেই মিত্ররূপে দেখেন)’। প্রভু, ভগবানকেই আজ সাক্ষাৎ স্বরূপে দেখিলাম। প্রভু, ভগবানই যথার্থ মৈত্রীবিহারী।”

“জীবক, যেই রাগ, দ্বেষ, মোহের দরুন ব্যাপাদ বা হিংসার উদয় হয় সেই রাগ, দ্বেষ, মোহ তথাগতের পরিত্যক্ত; ছিন্নমূল তালবৃক্ষবৎ কৃত, ক্রমে অভাব কৃত এবং ভবিষ্যতে অনুৎপত্তি স্বভাব হইয়াছে। জীবক, যদি তুমি এই কারণে বলিয়া থাক, তবে তোমার অভিমত সমর্থন করি।”

“হ্যাঁ, ভন্তে, এই কারণেই আমি ইহা বলিয়াছি।”

৫৪. “জীবক, এখানে কোনো ভিক্ষু অন্যতর গ্রাম বা নগরাশ্রয়ে অবস্থান করেন। তিনি করুণা-সহগত চিত্তে, মুদিতা-সহগত চিত্তে-উপেক্ষা সহগত চিত্তে একদিক বিস্ফুরিত করিয়া বাস করেন, তথা দ্বিতীয় দিক… জ্ঞানে বিচারপূর্বক সেই পিণ্ডপাত ভোজন করেন। তিনি আত্ম-নিপীড়নার্থ, পর-নিপীড়নার্থ অথবা আত্ম-পর উভয় নিপীড়নার্থ চিন্তা করিতে পারেন না। যেই রাগ, দ্বেষ ও মোহের দরুন লোকের মনে হিংসার উদয় হয় সেই রাগ, দ্বেষ ও মোহ তথাগতের পরিত্যক্ত,… ভবিষ্যতে অনুৎপত্তি স্বভাব হইয়াছে।”

৫৫. “জীবক, যে ব্যক্তি তথাগতের কিংবা তথাগত শ্রাবকদের উদ্দেশ্যে জীব হত্যা করে, সে পঞ্চ কারণেই বহু অপুণ্য অর্জন করে। যেমন : (১) সে যখন এইরূপ বলে : ‘তোমরা যাও, অমুক প্রাণীকে বধের জন্য লইয়া আস।’ এই আদেশ মাত্রই সে প্রথম কারণে বহু অপুণ্য সঞ্চয় করে। (২) যখন সেই প্রাণী রজ্জুবদ্ধযুগলে, কম্পিত কলেবরে টানিয়া আনিবার সময় যে দুঃখ-দৌর্মনস্য ভোগ করে, তখন সে দ্বিতীয় কারণে বহু অপুণ্য প্রসব করে। (৩) যখন সে এইরূপ আদেশ করে, ‘যাও, এই জীবকে হত্যা করো।’ তখন সে তৃতীয় কারণে বহু অপুণ্য প্রসব করে। (৪) যখন সেই প্রাণিহত্যার সময় দুঃখ-দৌর্মনস্য (সন্তাপ) অনুভব করে, তখন সে চতুর্থ কারণে বহু অপুণ্য প্রসব করে। (৫) যখন সে এই অকপ্পিয় (অ-বিহিত) বস্তু (মাংস) দ্বারা তথাগতকে কিংবা তথাগত শ্রাবককে আ-সাদন (অপ্রস্তুত) বা অপবাদ করে, তখন সে এই পঞ্চ কারণে বহু অপুণ্য প্রসব করে। জীবক, যে কেহ তথাগত কিংবা তথাগত শ্রাবকের উদ্দেশ্যে প্রাণী-হিংসা করে সে নিশ্চিত এই পঞ্চ কারণে বহু অপুণ্য সঞ্চয় করে।”

জীবক সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]