৮৩. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান রাজগৃহে বেণুবনে কলন্দক নিবাপে বাস করিতেছেন। তখন রাজকুমার অভয় নিগণ্ঠ নাতপুত্রের নিকট উপস্থিত হইলেন। উপস্থিত হইয়া নিগণ্ঠ নাতপুত্রকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট রাজকুমার অভয়কে নাতপুত্র নিগণ্ঠ বলিলেন :
“আসুন, রাজকুমার, আপনি শ্রমণ গৌতমের সাথে বাদারোপ করুন। ইহাতে আপনার কল্যাণ-কীর্তি শব্দ বিঘোষিত হইবে যে রাজকুমার অভয় কর্তৃক এমন মহাঋদ্ধি ও মহানুভবসম্পন্ন শ্রমণ গৌতমের বিরুদ্ধে বাদারোপিত হইয়াছে।”
“প্রভু, আমি কিরূপে শ্রমণ গৌতমের বিরুদ্ধে বাদারোপ করিব?”
“আসুন, রাজকুমার, যেখানে শ্রমণ গৌতম তথায় যান। সে-স্থানে উপস্থিত হইয়া শ্রমণ গৌতমকে জিজ্ঞাসা করুন-প্রভু, তথাগত ঈদৃশ বাক্য বলেন কি যাহা পরের অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ? যদি শ্রমণ গৌতম জিজ্ঞাসিত হইয়া বলেন, রাজকুমার, তথাগত তদ্রূপ বাক্য বলেন, যাহা পরের অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তবে আপনি বলিবেন, প্রভু, প্রাকৃতজনের সহিত আপনার বিশেষত্ব কী? প্রাকৃতজনও সেরূপ বাক্য বলে, যাহা পরের অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। যদি এইরূপ জিজ্ঞাসিত হইয়া শ্রমণ গৌতম আপনাকে প্রকাশ করেন যে, রাজকুমার, তথাগত এইরূপ বাক্য ভাষণ করেন না, যাহা পরের অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ। তবে আপনি বলিবেন, প্রভু, অপায়িক দেবদত্ত, নৈরয়িক দেবদত্ত, কল্পস্থায়ী দেবদত্ত, অচিকিৎস দেবদত্ত বলিয়া আপনি কীরূপে ঘোষণা করিলেন? আপনার এই বাক্য দ্বারা দেবদত্ত কোপিত ও অসন্তুষ্ট হইয়াছিল। রাজকুমার, আপনার এই উভয় কোটিক (সমস্যাজনক) প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইয়া শ্রমণ গৌতম উদ্গীরণ বা অধোকরণ (গলাধঃকরণ) কোনোটাই করিতে সমর্থ হইবে না। যেমন কোনো ব্যক্তির লৌহ শৃংগাটক (বড়শি?) কণ্ঠলগ্ন হয়, সে তাহা উদ্গীরণ কিংবা গলাধঃকরণ করিতে অসমর্থ হয়; সেইরূপ রাজকুমার, আপনার উভয় কোটিক প্রশ্ন জিজ্ঞাসিত হইয়া শ্রমণ গৌতম উদ্গীরণ কিম্বা গলাধঃকরণ করিতে সমর্থ হইবেন না।”
“যে আজ্ঞা প্রভু,” বলিয়া রাজকুমার অভয় নিগণ্ঠ নাতপুত্রকে প্রতিশ্রুতি দিয়া আসন হইতে উঠিলেন এবং নিগণ্ঠ নাতপুত্রকে অভিবাদনপূর্বক প্রদক্ষিণ করিয়া ভগবানের নিকট উপনীত হইলেন। তথায় ভগবানকে অভিবাদন করিয়া একপ্রান্তে বসিলেন।
৮৪. রাজকুমার অভয় সূর্য (সময়) দেখিয়া চিন্তা করিলেন, “আজ ভগবানের সহিত বাদারোপের উপযুক্ত সময় নহে। আগামীকল্য আমার প্রাসাদে ভগবানের সহিত বাদারোপ করিব।” আর ভগবানকে বলিলেন :
“ভন্তে, ভগবান, আগামীকল্য আপনিসহ চারিজন ভিক্ষুর নিমন্ত্রণ গ্রহণ করুন।” ভগবান মৌনভাবে স্বীকার করিলেন।
রাজকুমার অভয় ভগবানের স্বীকৃতি অবগত হইয়া আসন হইতে উঠিলেন এবং ভগবানকে অভিবাদন ও প্রদক্ষিণ করিয়া প্রস্থান করিলেন।
সেই রাত্রি অবসানে পূর্বাহ্ণ সময়ে ভগবান চীবর পরিধানপূর্বক পাত্র-চীবর লইয়া তিনজন ভিক্ষু রাজকুমার অভয়ের প্রাসাদে উপনীত হইলেন এবং সজ্জিত আসনে উপবেশন করিলেন। অভয় রাজকুমার স্বহস্তে, উৎকৃষ্ট খাদ্য-ভোজ্য দ্বারা ভগবানকে সন্তর্পিত করিলেন, সম্প্রবারিত করিলেন। তখন ভোজন শেষে ভগবান পাত্র হইতে হস্ত, অপনীত করিলে রাজকুমার অভয় নিচ আসন লইয়া একপ্রান্তে বসিলেন।
৮৫. একপ্রান্তে বসিয়া অভয় রাজকুমার ভগবানকে বলিলেন :
“প্রভু, তথাগত তাদৃশ বাক্য বলিতে পারেন কি যাহা পরের অপ্রিয় ও অমনোরম?”
“রাজকুমার, এই প্রশ্নের একাংশে (নিশ্চিতরূপে) উত্তর হয় না।”
“প্রভু, এখানেই নিগণ্ঠগণ বিনষ্ট হইল।”
“রাজকুমার, কেন তুমি এ কথা বলিতেছ যে এখানেই নিগণ্ঠগণ বিনষ্ট হইল?”
“প্রভু, অধুনা আমি নিগণ্ঠ নাতপুত্রের নিকট গিয়াছিলাম। তথায় গিয়া নিগণ্ঠ নাতপুত্রকে অভিবাদন করিয়া বসিলাম। তখন নাতপুত্র নিগণ্ঠ আমাকে বলিলেন, ‘আসুন রাজকুমার,… উদ্গীরণ কিম্বা গলাধঃকরণ করিতে সমর্থ হইবে না।’”
৮৬. সেই সময় উত্তানশায়ী অবোধ শিশু-কুমার অভয় রাজকুমারের অঙ্কে উপবিষ্ট ছিল। ভগবান রাজকুমার অভয়কে বলিলেন :
“তাহা কী মনে করো, রাজকুমার, তোমার কিম্বা ধাত্রীর প্রমাদবশত যদি এই শিশু কাষ্ঠ কিংবা কাঁকর মুখে পূরিয়া দেয় তখন তুমি কী করিবে?”
“আমি তাহা বাহির করিব, ভন্তে, যদি প্রথমত তাহা বাহির করিতে না পারি তবে বামহস্তে, শিশুর মস্তক ধরিয়া দক্ষিণ হস্তে, অঙ্গুলি বক্র করিয়া রক্তস্রাব হইলেও তাহা বাহির করিব। কারণ ভন্তে, শিশুর প্রতি আমার যথেষ্ট করুণা আছে।”
“তদ্রূপই রাজকুমার, যেই বাক্য অভূত, অসত্য, অনর্থসংযুক্ত বলিয়া তথাগত জানেন, আর সেই বাক্য, পরের অপ্রিয় ও অমনোরম হয়, তথাগত তাদৃশ বাক্য বলেন না। যেই বাক্য ভূত, সত্য, অনর্থসংযুক্ত বলিয়া তথাগত জানেন, আর সেই বাক্য যদি পরের অপ্রিয় ও অমনোরম হয়, তথাগত সেই বাক্যও ভাষণ করেন না। যাহা তথাগত জানেন যে ভূত, সত্য ও অর্থসংযুক্ত এবং তাহা পরের অপ্রিয় ও অমনোজ্ঞ, তথাগত সেই বাক্য প্রকাশের নিমিত্তও কাল বিচার করেন। যেই বাক্য অভূত, অসত্য, অনর্থযুক্ত এবং তাহা পরের প্রিয় ও মনোরম হয়, তথাগত তাহাও ভাষণ করেন না। যেই বাক্য তথাগত জানেন যে সত্য, ভূত, অর্থযুক্ত এবং তাহা পরের প্রিয় ও মনোরম, সেই বাক্য ভাষণেও তথাগত কালজ্ঞ হন। তাহার কারণ এই, রাজকুমার, জীবগণের প্রতি তথাগতের অসীম করুণা আছে।”
৮৭. “ভন্তে, যে-সকল ক্ষত্রিয় পণ্ডিত, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত, গৃহপতি পণ্ডিত এবং শ্রমণ পণ্ডিত প্রশ্ন প্রস্তুত করিয়া তথাগতের নিকট আসিয়া জিজ্ঞাসা করেন; প্রভু, পূর্বেই কি ইহা ভগবানের চিত্তে পরিকল্পিত হয় যে যাহারা আসিয়া এইরূপ জিজ্ঞাসা করিবে তাহাদিগকে আমি এই উত্তর দিব অথবা স্থান ভেদে কি তথাগতের উপস্থিত বুদ্ধিতে ইহা প্রতিভাত হয়?”
“রাজকুমার, তোমাকেই এই বিষয় জিজ্ঞাসা করিব, তোমার অভিরুচি অনুসারে উত্তর করিবে। রাজকুমার, রথের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে তুমি অভিজ্ঞ কী?”
“হ্যাঁ, প্রভু, আমি রথের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে অভিজ্ঞ।”
“বেশ, যদি কেহ আসিয়া তোমাকে জিজ্ঞাসা করে, ইহা রথের কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ? ইহা কি পূর্বেই তোমার চিন্তিত ছিল যে যাহারা আমার নিকট জিজ্ঞাসা করিবে আমি তাহাদিগকে এই উত্তর দিব অথবা ইহা কি স্থানোচিত রূপেই তোমার প্রতিভাত হইবে?”
“প্রভু, আমি রথের মালিক, রথের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে বিখ্যাত ও দক্ষ। রথের সমুদয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই আমার সুবিদিত। সুতরাং স্থানোচিত জ্ঞানেই ইহা আমার প্রতিভাত হইবে।”
“রাজকুমার, তদ্রূপই যে-সকল ক্ষত্রিয় পণ্ডিত,… স্থানোচিত (প্রত্যুৎপন্ন) জ্ঞানেই আমার প্রতিভাত হয়। তাহার কারণ কী? রাজকুমার, তথাগতের সেই ধর্মধাতু (সর্বজ্ঞতা) সুপ্রতিবিদ্ধ (সুপরিজ্ঞাত) হইয়াছে, যেই ধর্মধাতুর সুপ্রতিবিদ্ধতা-হেতু স্থানোচিতভাবেই তথাগতের যাবতীয় প্রশ্নের সমাধান প্রতিভাত হয়।”
এইরূপ উক্ত হইলে অভয় রাজকুমার ভগবানকে বলিলেন, “আশ্চর্য ভন্তে,… আজ হইতে যাবজ্জীবন আমাকে শরণাগত উপাসকরূপে ধারণা করুন।”
অভয় রাজকুমার সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ