আমি এইরূপ শুনিয়াছি।
১. একসময় ভগবান শ্রাবস্তী-সমীপে অবস্থান করিতেছিলেন, জেতবনে, অনাথপিণ্ডিকের আরামে। আয়ুষ্মান সারিপুত্র ভিক্ষুদিগকে আহ্বান করিলেন, ‘বন্ধুগণ’। প্রত্যুত্তরে ভিক্ষুগণ বন্ধুভাবে সম্মতি জানাইলেন। আয়ুষ্মান সারিপুত্র কহিলেন :
২. জগতে চারি প্রকার লোক বর্তমান আছে। চারি প্রকার কী কী? প্রথম, এক শ্রেণির লোক নিজের মধ্যে অঞ্জন (মালিন্য) থাকা সত্ত্বে যথার্থভাবে জানেন না যে, নিজের মধ্যে অঞ্জন আছে। দ্বিতীয়, সাঞ্জন অপর এক শ্রেণির লোক যথার্থভাবে জানেন যে, নিজের মধ্যে অঞ্জন আছে। তৃতীয়, অঞ্জনবিহীন (নিরঞ্জন) এক শ্রেণির লোক যথার্থভাবে জানেন না যে, নিজের মধ্যে অঞ্জন নাই। চতুর্থ, নিরঞ্জন অপর এক শ্রেণির লোক যথার্থভাবে জানেন যে, নিজের মধ্যে অঞ্জন নাই। যে ব্যক্তি সাঞ্জন হইয়া নিজের অঞ্জন যথার্থভাবে জানেন না এবং যিনি তাহা জানেন, এই দুইয়ের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হীন ও দ্বিতীয় ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ পুরুষ। যে ব্যক্তি নিরঞ্জন হইয়া নিজের নিরঞ্জনতা জানেন না এবং যিনি তাহা জানেন, এই দুইয়ের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি হীন ও দ্বিতীয় ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলিয়া আখ্যাত হন।
৩. ইহা বিবৃত হইলে আয়ুষ্মান মৌদ্গল্যায়ন আয়ুষ্মান সারিপুত্রকে কহিলেন, “সারিপুত্র, কী হেতু, কী কারণে সাঞ্জন দুই ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তি হীন ও অপর ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলিয়া আখ্যাত হন? কী হেতু, কী কারণে নিরঞ্জন দুই ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তি হীন ও অপর ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলিয়া আখ্যাত হন?” (তদুত্তরে আয়ুষ্মান সারিপুত্র কহিলেন,) ‘মৌদ্গল্যায়ন, যে ব্যক্তি সাঞ্জন হইয়া যথার্থভাবে জানেন না যে, তাঁহার মধ্যে অঞ্জন আছে তিনি সত্যসত্যই উহার প্রতিরোধের জন্য ছন্দ (ইচ্ছা) জনন করিবেন না, বিশেষভাবে চেষ্টা করিবেন না, আরব্ধবীর্য (কর্মতৎপর) হইবেন না, সেই অঞ্জন পরিত্যাগের জন্য। যদি কোনো পাত্রস্বামী কোনো দোকান বা কাঁসারির ঘর হইতে আনীত রজাবৃত মলসমাচ্ছন্ন কাংস্যপাত্র যথাবিধি ব্যবহার ও পরিষ্কার না করেন এবং [অধিকন্তু] তাহা রজাকীর্ণ স্থানে রাখেন, তাহাতে ওই কাংস্যপাত্র পরে অধিকতর সংক্লিষ্ট বা মলগ্রাহী হইবে না কি?’ ‘হাঁ, হইবে।’ ‘সেইরূপ, মৌদ্গল্যায়ন, যে ব্যক্তি সাঞ্জন হইয়া নিজের অঞ্জন যথার্থভাবে জানেন না, তিনি তাহা প্রতিরোধের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয় ছন্দ জনন করিবেন না, বিশেষভাবে চেষ্টা করিবেন না, আরব্ধবীর্য হইবেন না, সেই অঞ্জন পরিত্যাগের জন্য। তিনি সরাগ, সদ্বেষ, সমোহ, সাঞ্জন, সংক্লিষ্টচিত্ত হইয়াই কাল-কবলে গমন করিবেন। মৌদ্গল্যায়ন, যে ব্যক্তি সাঞ্জন হইয়া নিজের মধ্যে যে অঞ্জন আছে তাহা যথার্থভাবে জানেন, তিনি তাহার প্রতিরোধের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয় ছন্দ জনন করিবেন, বিশেষভাবে চেষ্টা করিবেন, আরব্ধবীর্য হইবেন সেই অঞ্জন পরিত্যাগের জন্য। তিনি বীতরাগ, বীতদ্বেষ বীতমোহ, নিরঞ্জন, অসংক্লিষ্ট-চিত্ত হইয়া কাল-কবলে গমন করিবেন। যদি কোনো পাত্রস্বামী দোকান বা কাঁসারির ঘর হইতে আনীত রজাবৃত মলসমাচ্ছন্ন কাংস্যপাত্র যথাবিধি ব্যবহার ও পরিষ্কার করেন এবং তাহা রজাকীর্ণ স্থানে না রাখেন, তাহাতে উহা পরে অধিকতর পরিশুদ্ধ বা পরিষ্কৃত হইবে না কি?’ ‘হাঁ, হইবে।’ ‘সেইরূপ, মৌদ্গল্যায়ন, যিনি সাঞ্জন হইয়া নিজের অঞ্জন যথার্থভাবে জানেন, তিনি তাহা প্রতিরোধের জন্য অবশ্যপ্রয়োজনীয় ছন্দ জনন করিবেন, বিশেষভাবে চেষ্টা করিবেন, আরব্ধবীর্য হইবেন, সেই অঞ্জন পরিত্যাগের জন্য। মৌদ্গল্যায়ন, যেই ব্যক্তি নিরঞ্জন হইয়াও নিজের মধ্যে যে অঞ্জন নাই তাহা যথার্থভাবে জানেন না, তিনি সত্যসত্যই শুভনিমিত্ত (ইষ্টবস্তু) মনে করিবেন, এবং শুভনিমিত্ত (ইষ্টবস্তু) মনে করিবার ফলে রাগাসক্তি তাঁহার চিত্ত পশ্চাৎ ধ্বংস করিবে। তিনি সরাগ, সদ্বেষ, সমোহ, সাঞ্জন ও সংক্লিষ্ট-চিত্ত হইয়াই কাল-কবলে গমন করিবেন। যদি কোনো পাত্রস্বামী কোনো দোকান বা কাঁসারির ঘর হইতে আনীত রজাবৃত মলসমাচ্ছন্ন কাংস্যপাত্র যথাবিধি ব্যবহার ও পরিষ্কার করেন না, এবং তাহা রজাকীর্ণ স্থানে রাখেন, তাহাতে ওই কাংস্যপাত্র পরে অধিকতর সংক্লিষ্ট বা মলগ্রাহী হইবে না কি?’ ‘হাঁ, হইবে।’ ‘সেইরূপ, মৌদ্গল্যায়ন, যে-ব্যক্তি নিরঞ্জন হইয়াও নিজের মধ্যে যে অঞ্জন নাই তাহা যথার্থভাবে জানেন না, তিনি সত্যসত্যই শুভনিমিত্ত (ইষ্টবস্তু) মনে করিবেন, এবং শুভনিমিত্ত (ইষ্টবস্তু) মনে করিবার ফলে রাগাসক্তি পশ্চাৎ তাঁহার চিত্ত ধ্বংস করিবে। তিনি সরাগ, সদ্বেষ, সমোহ, সাঞ্জন ও সংক্লিষ্টচিত্ত হইয়াই কাল-কবলে গমন করিবেন। মৌদ্গল্যায়ন, যে ব্যক্তি নিরঞ্জন হইয়া নিজের মধ্যে যে অঞ্জন নাই তাহা যথার্থভাবে জানেন, তিনি সত্যসত্যই শুভনিমিত্ত (ইষ্টবস্তু) মনে করিবেন না, এবং শুভনিমিত্ত মনে না করিবার ফলে রাগাসক্তি তাঁহার চিত্ত পশ্চাৎ ধ্বংস করিবে না। তিনি বীতরাগ, বীতদ্বেষ, বীতমোহ, নিরঞ্জন ও অসংক্লিষ্টচিত্ত হইয়াই কাল-কবলে গমন করিবেন। যদি কোনো পাত্রস্বামী দোকান বা কাঁসারির ঘর হইতে আনীত রজাবৃত মলসমাচ্ছন্ন কাংস্যপাত্র যথাবিধি ব্যবহার ও পরিষ্কার করেন এবং তাহা রজাকীর্ণ স্থানে না রাখেন, তাহাতে উহা পরে অধিকতর পরিশুদ্ধ বা পরিষ্কৃত হইবে না কি?’ ‘হাঁ, হইবে।’ ‘সেইরূপ, মৌদ্গল্যায়ন, যে ব্যক্তি নিরঞ্জন হইয়া নিজের মধ্যে যে অঞ্জন নাই তাহা যথার্থভাবে জানেন, তিনি সত্যসত্যই শুভনিমিত্ত (ইষ্টবস্তু) মনে করিবেন না, এবং শুভনিমিত্ত মনে না করিবার ফলে রাগাসক্তি তাঁহার চিত্ত পশ্চাৎ ধ্বংস করিবে না। তিনি বীতরাগ, বীতদ্বেষ, বীতমোহ, নিরঞ্জন ও অসংক্লিষ্টচিত্ত হইয়া কাল-কবলে গমন করিবেন। মৌদ্গল্যায়ন, এইজন্য সাঞ্জন দুই ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তি হীন এবং অপর ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলিয়া আখ্যাত হন। এইজন্য নিরঞ্জন দুই ব্যক্তির মধ্যে এক ব্যক্তি হীন এবং অপর ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ পুরুষ বলিয়া আখ্যাত হন।’
৪. [আয়ুষ্মান মৌদ্গল্যায়ন কহিলেন,] “সারিপুত্র, তুমি ‘অঞ্জন’ ‘অঞ্জন’ বলিতেছ, এই অঞ্জন কিসের প্রতিবচন?” ‘মৌদ্গল্যায়ন, অঞ্জন পাপজনক, অকুশলজনক স্বেচ্ছাচারেরই প্রতিবচন।’
৫. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো ভিক্ষুর মধ্যে এইরূপ ইচ্ছা উৎপন্ন হইবে : ‘আমি দোষাপন্ন হইয়াছি। অথচ অপর ভিক্ষুগণ জানিবেন না যে, আমি দোষাপন্ন হইয়াছি।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অপর ভিক্ষুগণ জানিতে পারিলেন যে, সে ভিক্ষু আপত্তির লক্ষ্য হইয়াছেন। তিনি যে আপত্তির লক্ষ্য হইয়াছেন তাহা অপর ভিক্ষুগণ জানিতে পারিয়াছেন, ইহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। মৌদ্গল্যায়ন, এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি তদুভয়ই অঞ্জন।
৬. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা উৎপন্ন হইবে : ‘আমি দোষাপন্ন হইয়াছি। তজ্জন্য অপর ভিক্ষুগণ আমাকে গোপনেই অভিযুক্ত করিবেন, প্রকাশ্যে সংঘমধ্যে নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অপর ভিক্ষুগণ তাঁহাকে সংঘমধ্যে অভিযুক্ত করিবেন, গোপনে নহে। ভিক্ষুগণ তাঁহাকে সংঘমধ্যে অভিযুক্ত করিলেন, গোপনে নহে। তাহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন।
৭. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা উৎপন্ন হইবে : ‘আমি দোষাপন্ন হইয়াছি। তজ্জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি আমাকে অভিযুক্ত করিবেন, অনুপযুক্ত লোক নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অনুপযুক্ত লোকই তাঁহাকে অভিযুক্ত করিবেন, উপযুক্ত লোক নহে। অনুপযুক্ত লোকই তাঁহাকে অভিযুক্ত করিলেন, উপযুক্ত লোক নহে, তাহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। মৌদ্গল্যায়ন, এই যে কোপ এবং অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন।
৮. মৌদ্গল্যায়ন, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা উৎপন্ন হয় : ‘আহা যেন আমাকেই শুধু শাস্তা (ভগবান) জিজ্ঞাসা করিয়া ভিক্ষুদিগকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিবেন, অপর কোনো ভিক্ষুকে জিজ্ঞাসা করিয়া নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, শাস্তা অন্য ভিক্ষুকেই জিজ্ঞাসা করিয়া ভিক্ষুদিগকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিবেন, তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিয়া নহে। শাস্তা অন্য ভিক্ষুকেই জিজ্ঞাসা করিয়া ভিক্ষুদিগকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিলেন, তাঁহাকে নহে; তাহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। মৌদ্গল্যায়ন, এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন।
৯. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা উৎপন্ন হয় : ‘আহা যেন আমাকেই পুরোবর্তী করিয়া ভিক্ষুগণ ভিক্ষান্নের জন্য গ্রামে প্রবেশ করিবেন, অন্য কোনো ভিক্ষুকে পুরোবর্তী করিয়া নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অন্য ভিক্ষুকে পুরোবর্তী করিয়া ভিক্ষুগণ ভিক্ষান্নের জন্য গ্রামে প্রবেশ করিবেন, তাঁহাকে নহে। অন্য ভিক্ষুকে পুরোবর্তী করিয়া ভিক্ষুগণ ভিক্ষান্নের জন্য গ্রামে প্রবেশ করিলেন, তাঁহাকে নহে; তাহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন।
১০. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা উৎপন্ন হয় : ‘আহা যেন আমিই শুধু ভোজনকালে অগ্রাসন, অগ্রোদক, অগ্রপিণ্ড লাভ করি, অন্য কোনো ভিক্ষু নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অপর ভিক্ষু ভোজনকালে অগ্রাসন, অগ্রোদক, অগ্রপিণ্ড লাভ করিবেন, সেই ভিক্ষু নহে। ভোজনকালে অন্য ভিক্ষুই অগ্রাসন, অগ্রোদক, অগ্রপিণ্ড লাভ করিলেন, তিনি তাহা লাভ করিলেন না। ইহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। মৌদ্গল্যায়ন, এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন।
১১. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা হয় : ‘আহা যেন আমিই ভোজনান্তে, ভোজন সমাপন করিয়া, দান অনুমোদন করিতে পারি, অন্য ভিক্ষু নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, ভোজনান্তে, ভোজন সমাপন করিয়া, অন্য ভিক্ষু দান অনুমোদন করিবেন, সেই ভিক্ষু নহে। অন্য ভিক্ষুই ভোজনান্তে দান অনুমোদন করিলেন, তিনি করিতে পারিলেন না। ইহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন।
১২-১৩. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা হয় : ‘আহা যেন আমিই শুধু আরামগত, বিহারগত ভিক্ষুগণকে ধর্মোপদেশ প্রদান করি, অন্য কোনো ভিক্ষু নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অন্য ভিক্ষুই আরামগত ভিক্ষুদিগকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিবেন, সেই ভিক্ষু নহে। অন্য ভিক্ষুই আরামগত ভিক্ষুদিগকে ধর্মোপদেশ প্রদান করিলেন, তিনি করিলেন না। ইহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন। আরামগত ভিক্ষুণী, উপাসক এবং উপাসিকা সম্বন্ধেও এইরূপ।
১৪-১৫. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা হয় : ‘আমাকেই শুধু ভিক্ষুগণ সমীহ-সৎকার করিবেন, গুরুস্থানীয় মনে করিবেন, মানিবেন, পূজিবেন, অন্য কোনো ভিক্ষুকে নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, ভিক্ষুগণ অন্য এক ভিক্ষুকেই সমীহ-সৎকার করিবেন, গুরুস্থানীয় মনে করিবেন, মানিবেন, পূজিবেন, তাঁহাকে নহে। ভিক্ষুগণ অন্য ভিক্ষুকেই সমীহ-সৎকার করিলেন, গুরুস্থানীয় মনে করিলেন, মানিলেন, পূজিলেন, তাঁহাকে নহে। তাহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন। ভিক্ষুণী, উপাসক এবং উপাসিকা সম্বন্ধেও এইরূপ।
১৬-১৭. মৌদ্গল্যায়ন, ইহা সম্ভব যে, কোনো কোনো ভিক্ষুর এইরূপ ইচ্ছা হয় : ‘আহা যেন আমিই শুধু উৎকৃষ্ট চীবর (পরিধেয় বস্ত্র) লাভ করিতে পারি, অন্য ভিক্ষু নহে।’ পুনঃ ইহা সম্ভব যে, অন্য ভিক্ষুই উৎকৃষ্ট চীবর লাভ করিবেন, সেই ভিক্ষু নহে। অন্য ভিক্ষুই উৎকৃষ্ট চীবর লাভ করিলেন, তিনি নহে। ইহাতে তিনি কুপিত ও অপ্রস্তুত হন। এই যে কোপ ও অপ্রস্থতি দুই-ই অঞ্জন। পিণ্ডপাত (ভিক্ষান্ন), শয্যাসন, রোগীপথ্য এবং ভৈষজ্যোপকরণ সম্বন্ধেও এইরূপ। মৌদ্গল্যায়ন, অঞ্জন এই সকল পাপজনক, অকুশলজনক স্বেচ্ছাচারেরই প্রতিবচন (নামান্তর)।
১৮. মৌদ্গল্যায়ন, যে ভিক্ষুর এই সকল পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হন নাই বলিয়া দৃষ্ট ও শ্রুত হয়, তিনি যতই অরণ্যবাসী, আরণ্যক, বিজনপ্রান্তবাসী, পিণ্ডপাতী (ভিক্ষান্নজীবী), (লোলুপচারী না হইয়া) ‘সপদানচারী’, পাংশুচেলী ও রুক্ষচীবরধারী হউন না কেন, সব্রহ্মচারী সতীর্থগণ তাঁহাকে সমীহ-সৎকার করেন না, গুরুস্থানীয় মনে করেন না, মানেন না, পূজেন না। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহার পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হয় নাই বলিয়াই সকলের নিকট দৃষ্ট ও শ্রুত (প্রকটিত) হয়। মৌদ্গল্যায়ন, যদি পাত্রস্বামী কোনো দোকান বা কাঁসারির ঘর হইতে আনীত পরিশুদ্ধ ও পরিষ্কৃত পাত্রে মৃতসর্প, মৃতকুক্কুর বা মৃতমনুষ্যদেহ রাখিয়া এবং তাহা অপর কাংস্যপাত্রের দ্বারা আবৃত করিয়া জনসমাকীর্ণ রাজপথে আগমন করে, তাহা দেখিয়া লোকে বলিতে থাকে : “ওহে, এ কী, যাহা ‘জন্য জন্য’ ‘মোক্ষম মোক্ষম’ মনে হইতেছে,” এবং পাত্র অনাবৃত করিয়া দেখামাত্র তাহাদের মধ্যে অমনোজ্ঞতা (অপ্রীতিকর ভাব), প্রতিকূলতা (বিরক্তি), এবং জুগুপ্সতা (ঘৃণা) আসিয়া উপস্থিত হয়, ক্ষুধার্তের বুভুক্ষা হয় না, ভোজনে পরিতৃপ্ত ব্যক্তির তো দূরের কথা। সেইরূপ মৌদ্গল্যায়ন, যে ভিক্ষুর এই সকল পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হয় নাই বলিয়া দৃষ্ট ও শ্রুত হয়, তিনি যতই অরণ্যবাসী, আরণ্যক, বিজনপ্রান্তবাসী, পিণ্ডপাতী, ‘সপদানচারী’, পাংশুচেলী, রুক্ষচীবরধারী হউন না কেন, সব্রহ্মচারী সতীর্থগণ তাঁহাকে সমীহ-সৎকার করেন না, গুরুস্থানীয় মনে করেন না, মানেন না, পূজেন না। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহার পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হয় নাই বলিয়াই সকলের নিকট দৃষ্ট ও শ্রুত হয়।
মৌদ্গল্যায়ন, যে ভিক্ষুর পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হইয়াছে বলিয়া দৃষ্ট ও শ্রুত হয়, তিনি যতই গ্রামান্তবিহারী, নিমন্ত্রণভোজী, গৃহীবেশধারী হউন না কেন, তাঁহাকে সব্রহ্মচারী সতীর্থগণ সমীহ-সৎকার করেন, গুরুস্থানীয় মনে করেন, মানেন, পূজেন। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহার পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হইয়াছে বলিয়া সকলের নিকট দৃষ্ট ও শ্রুত (প্রকটিত) হয়। যদি পাত্রস্বামী কোনো দোকান কিংবা কাঁসারির ঘর হইতে আনীত পরিশুদ্ধ বা পরিষ্কৃত কাংস্যপাত্র নির্মল ওদন ও বিবিধ সূপব্যঞ্জন দ্বারা পূর্ণ করিয়া এবং তাহা অপর পাত্র দ্বারা আবৃত করিয়া জনসমাকীর্ণ রাজপথে আগমন করেন, তাহা দেখিয়া লোকে বলিতে থাকে : “এ কী, যাহা ‘মোক্ষম মোক্ষম’ মনে হইতেছে?” এবং তাহা পাত্র অনাবৃত করিয়া উঠাইয়া দেখে এবং দেখামাত্র তাহাদের মধ্যে মনোজ্ঞতা, অপ্রতিকূলতা ও অজুগুপ্সতা আসিয়া দেখা দেয়, ভোজনপরিতৃপ্ত ব্যক্তিরও বুভুক্ষা হয়, ক্ষুধার্তের তো হইবেই। সেইরূপ মৌদ্গল্যায়ন, যে ভিক্ষুর পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হইয়াছে বলিয়া দৃষ্ট ও শ্রুত হয়, তিনি যতই গ্রামান্তবিহারী, নিমন্ত্রণভোজী, গৃহস্থবেশধারী হউন না কেন, তাঁহাকে সব্রহ্মচারী সতীর্থগণ সমীহ-সৎকার করেন, গুরুস্থানীয় মনে করেন, মানেন, পূজেন। ইহার কারণ কী? যেহেতু তাঁহার পাপমূলক, অকুশলমূলক ইচ্ছাবশতা প্রহীন হইয়াছে।
১৯. ইহা বিবৃত হইলে আয়ুষ্মান মহামৌদ্গল্যায়ন আয়ুষ্মান সারিপুত্রকে কহিলেন, ‘সারিপুত্র, আমার মধ্যে একটি উপমা প্রতিভাত হইতেছে।’ ‘মৌদ্গল্যায়ন, তুমি তাহা প্রতিভাত করো।’ ‘সারিপুত্র, আমি একদা রাজগৃহে, গিরিব্রজে অবস্থান করিতেছিলাম। পূর্বাহ্ণে যথারীতি বহির্গমন-বাস পরিধান করিয়া, পাত্রচীবর লইয়া রাজগৃহে ভিক্ষান্নসংগ্রহের জন্য প্রবেশ করি। তখন সমীতি নামক জনৈক যানকারপুত্র রথনেমির যে-স্থান বক্র, আঁকাবাঁকা ও দোষযুক্ত, সে-স্থান তক্ষণ করিতেছিল। তাহা দেখিয়া পূর্বজীবনে (গৃহীভাবে থাকিতে) যানকারপুত্র পাণ্ডুপুত্র নামক জনৈক আজীবক (নগ্নপ্রব্রজিত) তুষ্টমনা হইয়া তুষ্টিবচন উচ্চারণ করিলেন, ‘মনে হইতেছে হৃদয় যেন হৃদয়কে জানিয়া ঘা দিতেছে।’ সেইরূপ সারিপুত্র, যে-সকল শ্রদ্ধাহীনব্যক্তি শুধু জীবিকার জন্য অশ্রদ্ধায় গৃহ হইতে গৃহহীনরূপে প্রব্রজিত হইয়া শঠ, মায়াবী, কৈতবী (জাদুকর), উদ্ধত, গর্বিত, চপল, মুখর, প্রগল্ভ, অসংযতেন্দ্রিয়, অপরিমিতভোজী, অজাগ্রত, শ্রামণ্যে অগ্রাহ্যকারী, শিক্ষণীয় বিষয়ে তীব্রগৌরব অননুভবকারী, দ্রব্যবহুল, শিথিলকর্মী, অধোগমনে পুরোগামী, বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে বিপথগামী, অলস, হীনবীর্য, পথবিমূঢ়, অসম্প্রজ্ঞাত, অসমাহিত, বিভ্রান্ত, দুষ্প্রাজ্ঞ ও লালামুখ (বোকা) হইয়া বিচরণ করে, মনে হয়, যেমন হৃদয়কে জানিয়া হৃদয় স্পর্শ করে, তেমনভাবে আয়ুষ্মান সারিপুত্রের এই ধর্মোপদেশ তাহাদের অন্তর স্পর্শ করিবে না। [পক্ষান্তরে] যে-সকল কুলপুত্র শ্রদ্ধায় গৃহ হইতে গৃহহীনরূপে প্রব্রজিত হইয়া অশঠ, অমায়াবী, অকৈতবী, অনুদ্ধত, অগর্বিত, অচপল, অমুখর, অপ্রগল্ভ, সংযতেন্দ্রিয়, পরিমিতভোজী, জাগরণযুক্ত, শ্রামণ্যে গ্রাহ্যকারী, শিক্ষণীয় বিষয়ে তীব্রগৌরবসম্পন্ন, অদ্রব্যবহুল, অশিথিলকর্মী, অধোগমন-পরিহারী, বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে পুরোগামী, আরব্ধবীর্য, ‘প্রহিতাত্ম’ (ধ্যাননিবিষ্ট), স্মৃতিমান, সম্প্রজ্ঞাত, সমাহিত, একাগ্রচিত্ত, প্রজ্ঞাবান ও অমুগ্ধস্বভাব হইয়া বিচরণ করেন, মনে হয়, আয়ুষ্মান সারিপুত্রের এই ধর্মোপদেশ স্মরণ করিয়া তাঁহারা সুধাপান করিবেন, অমৃত ভোজন করিবেন, বাক্যে ও মনে সব্রহ্মচারী (সতীর্থ) শোভনভাবে অকুশলসমূহ উত্তোলন করিয়া কুশলসমূহ প্রতিষ্ঠিত করিবেন। সারিপুত্র, যেমন স্ত্রী বা পুরুষ, অথবা মণ্ডনস্বভাব যুবা শিরস্নাত হইয়া উৎপলমাল্য, বার্ষিকমাল্য, অথবা অতিমৌক্তিক মাল্য লাভ করিয়া, দুই হস্তে তাহা গ্রহণ করিয়া, উত্তমাঙ্গে স্বশীর্ষে স্থাপন করেন, তেমন, সারিপুত্র, যে-সকল কুলপুত্র শ্রদ্ধায় গৃহ হইতে গৃহহীনরূপে প্রব্রজিত হইয়া অশঠ, অমায়ারী, অকৈতবী, অনুদ্ধত, অগর্বিত, অচপল, অমুখর, অপ্রগল্ভ সংযতেন্দ্রিয়, পরিমিতভোজী, জাগরণযুক্ত, শ্রামণ্যে গ্রাহ্যকারী, শিক্ষণীয় বিষয়ে তীব্রগৌরবসম্পন্ন, অদ্রব্যবহুল, অশিথিলকর্মী, অধোগমনপরিহারী, বিবেক-বৈরাগ্যসাধনে পুরোগামী, আরব্ধবীর্য, ‘প্রহিতাত্ম’ (ধ্যাননিবিষ্ট), স্মৃতিমান, সম্প্রজ্ঞাত, সমাহিত, একাগ্রচিত্ত, প্রজ্ঞাবান ও অমুগ্ধস্বভাব হইয়া বিচরণ করেন, তাঁহার আয়ুষ্মান সারিপুত্রের এই ধর্মোপদেশ স্মরণ করিয়া সুধাপান করিবেন, অমৃত ভোজন করিবেন, বাক্যে ও মনে সব্রহ্মচারী শোভনভাবে অকুশলসমূহ উত্তোলন করিয়া কুশলসমূহ প্রতিষ্ঠিত করিবেন।
এইভাবে উত্তর-প্রত্যুত্তর করিয়া দুই মহারথী পরস্পরের সুভাষিত বাণী অনুমোদন করিলেন।
অনঞ্জন-সূত্র সমাপ্ত।
ব্যাখ্যা [৪]
English
Việt Ngữ