লোড হচ্ছে

অনুবাদসমূহ [৩১]

মহারাহুলোবাদ সূত্র

১১৩. আমি এইরূপ শুনিয়াছি। এক সময় ভগবান শ্রাবস্তীতে অনাথপিণ্ডিকের আরাম জেতবনে বাস করিতেছেন। তখন ভগবান পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর লইয়া ভিক্ষার নিমিত্ত শ্রাবস্তীতে প্রবেশ করিলেন। আয়ুষ্মান রাহুলও পূর্বাহ্ণ সময়ে নিবাসন পরিধান করিয়া পাত্র-চীবর লইয়া ভগবানের পদাঙ্ক অনুসরণ করিলেন। তখন ভগবান পশ্চাদ্দিকে ফিরিয়া আয়ুষ্মান রাহুলকে ডাকিলেন, “রাহুল, যাহা কিছু রূপ আছে : ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমানের, শরীরাভ্যন্তরে বা বাহিরে, স্থূল বা সূক্ষ্ম, হীন বা উৎকৃষ্ট, দূরের কিংবা সমীপের, যাবতীয় রূপ সম্বন্ধে ‘ইহা আমার নহে, আমি উহাতে (অবস্থিত) নহি, উহা আমার আত্মা নহে, এইরূপেই সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা যথাভূত দর্শন করা উচিত।”

“কেবল রূপই কি? ভগবান, রূপই কি? সুগত,”

“রূপও, রাহুল, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার, বিজ্ঞান (স্কন্ধ)ও।”

তখন আয়ুষ্মান রাহুল ভগবানের সম্মুখে উপদিষ্ট হইয়া ‘আজ আর কে ভিক্ষার্থ গ্রামে প্রবেশ করিবে?’ (চিন্তা করিয়া) তথা হইতে ফিরিয়া এক বৃক্ষের নিচে পদ্মাসন করিয়া শরীরকে সোজা রাখিয়া স্মৃতি পরিমুখে নিবদ্ধ করিয়া (ধ্যানাসনে) বসিলেন।

অতঃপর আয়ুষ্মান সারিপুত্র আয়ুষ্মান রাহুলকে… বৃক্ষের নিচে ওই অবস্থায় উপবিষ্ট দেখিলেন, দেখিয়া আয়ুষ্মান রাহুলকে বলিলেন, “রাহুল, আনাপান (আন+অপান) স্মৃতি ভাবনা (ধ্যান) করো। রাহুল, আনাপান স্মৃতি ভাবিত হইলে মহৎফলদায়ক ও মহা আনিসংশদায়ক হয়।”

১১৪. অতঃপর আয়ুষ্মান রাহুল সায়ংকালীন বিবেকবিহার (ধ্যান) হইতে উঠিয়া ভাবনা-বিধান জানিবার জন্য ভগবানের সমীপে উপস্থিত হইলেন। উপবিষ্ট হইয়া ভগবানকে অভিবাদনপূর্বক একপ্রান্তে বসিলেন। একপ্রান্তে উপবিষ্ট আয়ুষ্মান রাহুল ভগবানকে বলিলেন, “ভন্তে, আনাপান স্মৃতি কী প্রকারে ভাবিত ও বহুলীকৃত (বৃদ্ধিকৃত) হইলে মহৎফলদায়ক ও মহা উপকারদায়ক হয়?”

“রাহুল, আপন শরীরে (অধ্যাত্ম) ব্যক্তিগত (পচ্চত্তং) যে কিছু কর্কশ, কঠিন, উপাদিন্ন (কর্মজনিত) যেমন : কেশ, লোম, নখ, দন্ত, ত্বক, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, অস্থিমজ্জা, বক্ষ, হৃদয়, যকৃৎ, ক্লোম, প্লীহা, ফুস্‌ফুস্‌, অন্ত্র, অন্ত্রগুণ (অন্ত্রবন্ধনী), উদরস্থ খাদ্য, মস্তিষ্ক ও বিষ্ঠা অথবা অন্যও যাহা কিছু অধ্যাত্ম প্রত্যাত্ম শরীরে কর্কশ, কঠিন উপাদিন্ন রূপ আছে, রাহুল, ইহাই আধ্যাত্মিক পৃথিবীধাতু। যাহা আধ্যাত্মিক পৃথিবীধাতু এবং যাহা বাহিরের পৃথিবীধাতু, ইহারা পৃথিবীধাতুই। এই পৃথিবীধাতুকে ‘ইহা আমার নহে, আমি ইহাতে অবস্থিত নহি, ইহা আমার আত্মা নহে।’ এইরূপ সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা ইহা যথার্থরূপে দর্শন করা উচিত। এইরূপ সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা ইহা যথার্থরূপে দেখিয়া (ভিক্ষু) পৃথিবীধাতু হইতে উদাসীন হয়, পৃথিবীধাতু হইতে চিত্ত বিরত করে।”

১১৫. “রাহুল, আপধাতু কী প্রকার? আপধাতু আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক দ্বিবিধ। রাহুল, আধ্যাত্মিক আপধাতু কী? যাহা অধ্যাত্ম প্রত্যাত্ম আপ (জল), আপজাতীয় উপাদিন্ন যেমন : পিত্ত, শ্লেষ্মা, পুঁজ, লোহিত, স্বেদ, মেদ, অশ্রু, বশা, থুথু, সিঙ্ঘনিকা, লসিকা ও মুত্র…।” [পৃথিবীধাতুর ন্যায় আপধাতুকে বিস্তার করিতে হইবে।]

১১৬. “রাহুল, তেজধাতু কী? তেজধাতু আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক ভেদে দ্বিবিধ। আধ্যাত্মিক তেজধাতু কী? যাহা অধ্যাত্ম প্রত্যাত্ম তেজ, তেজ-জাতীয় শরীরস্থ যেমন : যদ্বারা সন্তপ্ত হয়, জীর্ণ হয়, পরিদাহ হয় এবং যদ্বারা অশীত-পীত-খাদিত-আস্বাদিত বস্তু উত্তমরূপে জীর্ণ হয়।…।”

১১৭. “রাহুল, বায়ুধাতু কী?… যেমন : ঊর্ধ্বগামী বায়ু, অধঃগামী বায়ু, কুক্ষিশায়ী বায়ু, কোষ্ঠাশয় বায়ু, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গানুসারী বায়ু এবং আশ্বাস-প্রশ্বাস বায়ু।…।”

১১৮. “রাহুল, আকাশধাতু কী? আকাশধাতু আধ্যাত্মিক ও বাহ্যিক আছে। রাহুল, আধ্যাত্মিক আকাশধাতু কী?… যেমন : কর্ণছিদ্র, নাসাছিদ্র, মুখদ্বার অশীত-পীত-খাদিত-স্বাদিত (অন্নপান-খাদন-আস্বাদন) আহার্য ভিতরে প্রবেশ করে, যে স্থানে অন্নপানীয়-খাদ্য-ভোজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়; আর যদ্বারা ইহার অধঃভাগ দিয়া বাহির হয়। অথবা শরীরে, প্রতি শরীরে অপরও যে কিছু আকাশ, আকাশস্বরূপ শরীরে আছে, রাহুল, ইহাকে আধ্যাত্মিক আকাশধাতু বলা হয়। আধ্যাত্মিক-বাহ্যিক উভয়বিধ আকাশধাতু-ধাতু মাত্রই ‘ইহা আমার নহে, উহাতে আমি অবস্থিত নহি, উহা আমার আত্মা নহে’ এই প্রকারে ইহা সম্যক প্রজ্ঞা দ্বারা যথাভূত দর্শন করা উচিত। এইরূপ দেখিয়া যোগী আকাশধাতুর প্রতি উদ্বিগ্ন হয়, আকাশ-ধাতু হইতে চিত্ত নিবৃত্ত করে।”

১১৯. “রাহুল, (নিজকে) পৃথিবীসম ভাবনা বর্ধিত (ধ্যান) করো। পৃথিবীসম রাহুল, ভাবনা ভাবিলে উৎপন্ন মনোরম স্পর্শ তোমার চিত্তকে অধিকার করিয়া থাকিবে না (ছন্দ-রাগ উৎপন্ন হইতে পারিবে না), যেমন : রাহুল, পৃথিবীতে শুচিও (পবিত্র বস্তুও) নিক্ষেপ করা যায়, অশুচিও নিক্ষেপ করা যায়, পায়খানা, প্রস্রাব, কফ, পুঁজ, রক্তও নিক্ষেপ করা যায়; উহাতে পৃথিবী দুঃখিত হয় না, গ্লানি বা ঘৃণা করে না। এই প্রকারেই রাহুল, তুমি (নিজকে) পৃথিবীসম ভাবনা (ধারণা) বর্ধন (গঠন) করো। রাহুল, পৃথিবীসম ধারণা পোষণ করিলেও উৎপন্ন মনোরম-অমনোরম সংস্পর্শ (বিষয় ও ইন্দ্রিয় সম্মেলন) তোমার চিত্তকে অধিকার করিয়া থাকিবে না।”

“রাহুল, আপ (জল) সম… যেমন রাহুল, জলে শুচি অশুচি ধৌত করা যায়…।”

“রাহুল, তেজ (অগ্নি) সম… যেমন রাহুল, তেজ শুচিকেও অশুচিকেও দগ্ধ করে…।”

“রাহুল, বায়ুসম… যেমন রাহুল, বায়ু শুচিকেও প্রবাহিত করে, অশুচিকেও প্রবাহিত করে…।”

“রাহুল, আকাশসম… যেমন রাহুল, আকাশ কোথাও প্রতিষ্ঠিত (লিপ্ত) নহে, সেই প্রকার তুমি নিজকে আকাশসম ধারণা পোষণ করো। রাহুল, আকাশসম ভাবনা পোষণ করিলে উৎপন্ন মনোরম-অমনোরম স্পর্শ তোমার চিত্তকে অধিকার করিয়া থাকিবে না।”

১২০. রাহুল, মৈত্রী (সকলের প্রতি মিত্রভাব) ভাবনা পোষণ করো, মৈত্রীভাবনা পোষণ করিলে (উপচার, অর্পণা সমাধি প্রাপ্ত হইলে) তোমার যে ব্যাপাদ (বিদ্বেষ), উহা প্রহীন হইয়া যাইবে।”

“রাহুল, করুণা (সর্ব জীবে দয়া) ভাবনা পোষণ করো। করুণা ভাবনা ভাবিত হইলে (উপচার অর্পণা সমাধিতে) তোমার যে বিহিংসা (পরপীড়ন প্রবৃত্তি) আছে, তাহা প্রহীন হইবে।”

“রাহুল, মুদিতা (সুখীর প্রতি প্রসন্নতা) ভাবনা গঠন করো। মুদিতা ভাবনা বৃদ্ধি করিলে তোমার যে অরতি (অপ্রসাদ) আছে, তাহা প্রহীন হইবে।”

“রাহুল, উপেক্ষা ভাবনা পোষণ করো। উপেক্ষা ভাবনা করিলে তোমার যে প্রতিঘ (প্রতিহিংসাবৃত্তি) আছে, তাহা প্রহীন হইবে।”

“রাহুল, অশুভ (ভোগের অশুচিতা)… ভাবনা সাধন করো, তোমার যে ভোগানুরাগ আছে ইহার দ্বারা তাহা প্রহীন হইয়া যাইবে।”

“রাহুল, অনিত্য (সকল পদার্থ পরিবর্তনশীল) ভাবনা বৃদ্ধি করো।… তোমার যে অস্মিমান (অহংকার) আছে, তাহা প্রহীন হইবে।”

১২১. “রাহুল, আনাপান স্মৃতি ভাবনা অভ্যাস করো। আনাপান স্মৃতি অভ্যাস ও বর্ধন করিলে মহাফলপ্রদ ও মহা উপকারদায়ক হয়। রাহুল, কী প্রকারে ভাবিত ও বহুলীকৃত আনাপান স্মৃতি মহাফলপ্রদ ও মহা উপকারদায়ক হয়? রাহুল, ভিক্ষু অরণ্যে, বৃক্ষমূলে কিংবা শূন্যাগারে গিয়া শরীর সোজা বিন্যস্ত, করিয়া, স্মৃতি পরিমুখে স্থাপন করিয়া, পদ্মাসন বদ্ধ হইয়া ধ্যানাসনে বসে। সে স্মৃতিমান হইয়া শ্বাস গ্রহণ করে, স্মৃতিমান হইয়া প্রশ্বাস ত্যাগ করে। যেমন : (১) দীর্ঘশ্বাস গ্রহণের সময় দীর্ঘশ্বাস গ্রহণ করিতেছি বলিয়া জানে এবং দীর্ঘপ্রশ্বাস ত্যাগের সময় দীর্ঘপ্রশ্বাস ত্যাগ করিতেছি বলিয়া জানে। (২) হ্রস্বশ্বাস গ্রহণের সময় হ্রস্বশ্বাস গ্রহণ করিতেছি… সময় ত্যাগ করিতেছি বলিয়া জানে। (৩) ‘সর্বকায় (শ্বাস) অনুভব (প্রতিসংবেদন) করিয়া শ্বাস গ্রহণ করিব’ এরূপ শিক্ষা করে এবং ‘সর্বকায় অনুভব করিয়া প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ এরূপ শিক্ষা করে। (৪) ‘কায়সংস্কার (শ্বাস-প্রশ্বাস) প্রশমিত করিয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ শিক্ষা করে। (৫) ‘(ধ্যানজ) প্রীতি জ্ঞাত হইয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ শিক্ষা করে। (৬) ‘সুখ (বেদনা) অবগত হইয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ শিক্ষা করে। (৭) ‘চিত্ত-সংস্কার (সংজ্ঞা-বেদনা) অনুভব করিতে করিতে শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ শিক্ষা করে। (৮) ‘স্থূল চিত্তসংস্কার প্রশমিত করিয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ অভ্যাস করে। (৯) ‘চিত্ত প্রতিসংবেদী হইয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ অভ্যাস করে। (১০) (সমাধি ও বিদর্শন ভেদে) ‘চিত্ত প্রমোদিত করিয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ অভ্যাস করে। (১১) (প্রথম ধ্যানাদি ভেদে আলম্বনে) ‘চিত্ত সম্যকরূপে স্থাপন শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ প্রচেষ্টা করে। (১২) (নীবরণ ও স্থূল ধ্যানাঙ্গ হইতে) ‘চিত্ত বিমোচন করিয়া শ্বাস গ্রহণ করিব ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ অভ্যাস করে। (১৩) ‘(পঞ্চস্কন্ধের) অনিত্যানুদর্শী হইয়া (নিত্য সংজ্ঞামুক্ত অবস্থায়) শ্বাস গ্রহণ করিব ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ অভ্যাস করে। (১৪) (ক্ষয় ও অত্যন্ত বিরাগ ভেদে দ্বিবিধ) ‘বিরাগানুদর্শী (রাগমুক্ত) হইয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ অভ্যাস করে। (১৫) ‘নিরোধানুদর্শী (সমুদয় মুক্ত) হইয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ এরূপ অভ্যাস করে। (১৬) (পরিত্যাগ ও প্রধাবন দ্বিবিধ) ‘প্রতিবিসর্জনানুদর্শী (আদানমুক্ত চিত্ত) হইয়া শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ করিব’ এরূপ অভ্যাস করে।”

“রাহুল, এই ষোলো প্রকারে ভাবিত ও বহুলীকৃত আনাপান স্মৃতি (ঐহিক) মহাফলপ্রদ ও (পারত্রিক) অভিলাষিত বিপাকপ্রদ হয়। রাহুল, এই প্রকারে ভাবিত ও বৃদ্ধিকৃত আনাপান স্মৃতি দ্বারা যে-সকল অন্তিম শ্বাস গ্রহণ ও প্রশ্বাস ত্যাগ হয়, ইহারাও জ্ঞাতসারেই নিরুদ্ধ হয়, অজ্ঞাতসারে নহে।”

ভগবান ইহা বলিলেন, আয়ুষ্মান রাহুল ভগবানের ভাষণ অভিনন্দন করিলেন।

মহারাহুলোবাদ সূত্র সমাপ্ত।

ব্যাখ্যা [৪]